চার্ণক দার গুল্পগুচ্ছ – ২য় কীর্তি – ডাম্বেল

Biography, Childhood, Friends, Humor, Journey, Nostalgia, Series, Story, বাংলা

“জানিস কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় লোকটা কি লেভেল এর ট্যালেন্টেড!” ম্যাগাজিনটা থেকে মুখ না তুলেই বলল মিতু।

“তুই বোঝা আমাদের” – যথারীতি দিপু আওয়াজ দিলো।

শীতের অলস সকাল। আমি তখনো কম্বলের তলায়। সিটু একটা সিগারেট ধরিয়ে বাথরুম যাওয়ার উদ্যোগ করছে। আর অ্যাজ ইউজুয়াল অগা সকাল থেকেই ডাম্বেল নিয়ে শুরু হয়ে গেছে। ওটাই এখন ওর লেটেস্ট প্যাশন – “বাইসেপস বানাতে হবে বুঝলি। ভালো সার্জেন হতে গেলে ওটা মাস্ট। আমাকে ডি. রায় স্যর বলেছেন”। আর বাধ্য ছাত্রের মত অগা তার প্রস্তুতি নিচ্ছে সকালে শরীরের কসরত করে আর রাত্রেবেলা মানসিক কসরত চালিয়ে যাচ্ছে ‘বেলি লাভ’ নিয়ে।

মিতু বোঝাতে শুরু করল। “লোকটা আমাদের মতো মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিলো। জয়েন্টে আশি rank ছিলো জানিস। নব্বই সালে ডাক্তারি পাশ করে প্রায় দশ বারো বছর প্র্যাকটিস করেছেন। তারপর আবার কি সব সিনেমা বানাচ্ছে দেখেছিস।”

“হুম্‌। আমি চাঁদের পাহাড়, মেঘে ঢাকা তারা দেখেছি। ভালই রে।” আমি কম্বল থেকে মুখ বাড়িয়ে বললাম।

“রিয়েল ট্যালেন্ট। আজকাল এরকম দেখা যায়না।” সিটু ফেলুদার স্টাইলে বলল।

“প্রেমেন মিত্তির লোকটা কিন্তু আরো বড় জিনিয়াস। একাধারে ডাক্তার, ভূগোল নিয়ে স্নাতক, বোধহয় বাংলা নিয়েও পড়েছেন। ওই লেভেলের সাহিত্যিক! আবার স্ক্রিপ্ট রাইটার, ফিল্ম ডিরেক্টর। সর্বোপরি ঘনাদার স্রস্টা” – আমি আমার মুগ্ধতা গোপন রাখতে পারিনা।

“ঘনাদার কথা শুনলাম মনে হল।”– এই মোক্ষম মুহূর্তে তাঁর আবির্ভাব। প্যাঁকাটির মত একটা হাত কপালে, আরেক টা হাতে সিগারেট। স্যান্ডো গেঞ্জি আর পেটেন্টেড তেলচিটে বারমুডা। ততক্ষনে চার্নকদার সবথেকে বাধ্য ভক্ত দিপু নিজে জায়গা ছেড়ে দিল গুরুর জন্য।

“হুম, ঘনাদার কথা হচ্ছিল”, ডাম্বেল নিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে অগা।

“ছ্যাঃ। ঘনাদার নাম নিতে গেলে কপালে হাত ঠেকাতে হয় জানিসনা।কি যে হবে তোদের!” তিনি তিরষ্কার করলেন।

-“কি করব। হাতে ডাম্বেল যে! আর তুমি ডাম্বেলের কি বুঝবে! সার্জেন হতে গেলে এটা মাস্ট।” অগা পাত্তাই দিলোনা চার্নকদাকে। দিপু ও ছাড়বার ‘পাত্র’ নয়। সেও গুরুর এই অসম্মান সহ্য করবেনা। বলে উঠল – “চার্নকদা ডাম্বেলও বোঝে আর সার্জারীও বোঝে। তোদের থেকে অনেক বেশী বোঝে। তাইতো চার্নকদা?”

“ইয়ে মানে। হ্যাঁ। নিশ্চয়ই। ডাম্বেল ও ভেঁজেছি, আর বিশ্বখ্যাত সার্জেনের সংস্পর্শে ও এসেছিলাম” – বিষম খেতে খেতে সামাল দেন চার্নকদা।

হঠাৎ করে সিটু যে আওয়াজটা করল সেটাকে কেউ কেউ হাসি চাপার আওয়াজ ভেবে বসলে আমার কিছু করার নেই কারণ সিটু স্পষ্ট বলল যে নতুন ব্র্যান্ডের সিগারেট টেনে কাশি পেয়ে গেছে। যাইহোক চার্নকদার একটা তির্যক চাহনিতে সেটাও বন্ধ হল। তবে দিপু যে সুযোগটা তৈরী করল আমি তার আঁচটা উস্কে দিতে ছাড়লাম না। বললাম – “ওই তো প্যাঁকাটির মত হাত। ওই হাতে কোনো দিন ডাম্বেল ভেঁজেছেন আপনি! সেটাও বিশ্বাস করতে হবে!”

দেখলাম এতেই কাজ হল। কারন তিনি গলা খাঁকারি দিলেন। মিতুও নতুন একা সিগারেট নিয়ে আগুন সংযোগ করে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিল নিয়মমাফিক। আর আমরা গল্পের আঁচ পেয়ে গুছিয়ে বসলাম। লম্বা একটা টান দিয়ে তিনি শুরু করলেন – “তখন আমার উঠতি বয়স। সদ্য আসামের ডিব্রুগড় থেকে জিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার একটা গোপন অ্যাসাইনমেন্ট সেরে ফিরেছি। নতুন জব খুঁজছি আর মনাকে বডি বিল্ডিং এর তালিম দিচ্ছি। আমার বাইসেপস দেখে মনার রাতে ঘুম হতোনা। রোজই জানতে চাইতো কি আমার ডায়েট, আর কি কি ব্যায়াম আমি করি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি শুধু মুচকি হেসে এড়িয়ে যাই। মনাকে বলি তুই খালি আমাকে ফলো করে যা। বিশ্বশ্রী কেউ আটকাতে পারবেনা।”

– “মনা মানে?” অগা অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।

“মনোহর…. আরে মনোহর আইচ। আমার কাছে তালিম নিয়েই তো বিখ্যাত হল। তবে ওর আপশোষটা যায়নি। বেচারা বাইসেপসটা আর আমার মত বানিয়ে উঠতে পারলোনা।” চার্নকদা ক্যাজুয়ালি বলল।

অগার হাঁ মুখটা বন্ধ হতে সময় লাগল। সিটু ফুট কাটলো – “ঢপ ঢপ পুরো ঢপ।”

– “কি বললি?” বাজখাঁই গলায় তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন।

– “আজ্ঞে বেঢপ”, সিটু ম্যানেজ করে।

“তা যা বলেছিস। আমার ফিগারের কাছে মনারটা বেঢপই বটে।” চার্নকদা শান্ত হন।

– “তখন নতুন একটা জব খুঁজছি, এই সময় একটা গোপন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে চলে যেতে হল সুদূর আফ্রিকা। সঙ্গী ডঃ কর্ন চাবজ। বিশ্বখ্যাত সার্জেন ও বন্যপ্রাণী গবেষক। কাজটা কঠিন। তাই আমাকে তলব। বিবো একটা নতুন উপন্যাস লিখবে। আফ্রিকা নিয়ে।কিন্তু নিজে ব্যস্ত, যেতে পারবেনা।তাই একটা গরিলা জাতীয় ভয়ঙ্কর কোনো জন্তু ধরে আনতে হবে। ডঃ চাবজ ওয়াইল্ড লাইফ গবেষক। আমাকে সাহায্য করতে সঙ্গে যাচ্ছেন।”

“যথারীতি উগান্ডা পৌঁছলাম। তারপর শুরু হল আমাদের অভিযান। কাজের মধ্যে দুটো। এক -ওখানকার ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্ক ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে একটা ম্যাপ বানানো আর গরিলা জাতীয় একটা জন্তু ধরে নিয়ে আসা যে দুটোর উপর বেস করে বিবো দা নতুন একটা কালজয়ী উপন্যাস লিখবে।”

“আচ্ছা এই বিবো টা কে”? মিতু প্রশ্ন করতেই চার্নকদা থামিয়ে দিল। “আগে ঘটনাটা শেষ করতে দে”। মিতু চুপ করে গেল।

– “যাই হোক হপ্তাচারেক ঘোরার পর একটা খসড়া ম্যাপ বানিয়ে ফেললাম। এবারে আসল কাজ। অমানুষিক পরিশ্রমের পর পৌঁছালাম রিখটারভেল্ডটে। লক্ষ্য গরিলা ধরা। বিস্তর মাথা খাটিয়ে ধরলাম ও…কিন্তু কি প্যাংলা চেহারা। একে নিয়ে আর যাই হোক বিবোর মত ছেলে উপন্যাস লিখতে পারবেনা। কিছুতেই কিছু না করতে পেরে সেটাকেই নিয়ে ফিরে এলাম দেশে। কিন্তু সেটাকে কি আর বিবোর হাতে তুলে দেওয়া যায়। তারপরেই ডঃ চাবজ তাঁর কেরামতি দেখালেন আর বিবো ও লিখে ফেলল বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কিশোর অ্যাডভেন্চার উপন্যাস। যেটা নিয়ে তোদের কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় সিনেমা বানালো। দেব বলে একটা নতুন ছেলে নায়ক।

“তার মানে উপন্যাসটা চাঁদের পাহাড়!” আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলামনা। “তাহলে বিবো?”

“বিভূ বন্দ্যো। আমাকে খুব শ্রদ্ধা করত।”– মুচকি হাসলেন তিনি।

“কিন্তু চাঁদের পাহাড়ে তো কোনো রোগা পটকা গরিলা ছিলোনা। ছিলো বুনিপ!!” – সিটু প্রতিবাদ করল।

“ওখানেই তো ডঃ চাবজের সার্জারীর কেরামতি। গরিলার হাতে চার্নকের মাসল প্লাস্টিক সার্জারী করে বসিয়েই তো বুনিপ তৈরী হল।”

নিজের ল্যাকপ্যাকে হাতগুলো ভাঁজ করে ডাম্বেল ভাঁজার ভান করতে করতে চার্নকদা প্রস্থান করলেন।
৩য় কীর্তি – চুরুট ->

 

লেখক পরিচিতি ~ ডঃ স্বদেশ মান্না-র জন্ম 4 April 1986, কলকাতায়। এন আর এস মেডিকাল কলেজ থেকে এম বি বি এস পাশ করে বর্তমানে হলদিয়া পোর্ট হসপিটাল এবং ডায়মন্ড হারবার জেলা হসপিটাল-এ কর্মরত। জীবসেবা-র পাশাপাশি ওনার লেখনীর দৌরাত্ম ও প্রশংসনীয়! অশেষ ধন্যবাদ স্বদেশ বাবুকে আমাদের anariminds.com এ লেখা পাঠানোর জন্য। উপভোগ করতে থাকুন ওনার ভিন্ন স্বাদের গুল্পগুচ্ছ।

 

প্রচ্ছদচিত্র ~ ডঃ স্বদেশ মান্না + Anari Minds

2 comments

  • As usual, Guru tumi bhalo! Chalie jao daktar babu.. amra achhi tomar pashe. Aro chai charnock dar kirti. Galpo gulo sesh holei mone hochhe porer ta kobe pabo.

Leave a Reply