খেলাঘর

Childhood, Conversation, Freedom, Friends, Love Story, Marriage, Short Story, Story, বাংলা

কদিন ধরে বেশ জমিয়ে শীত পরেছে, কোলকাতায় শীত মানে তো তেরো কি সারে বারো তাতেই জবু থবু অবস্থা । যাইহোক, যা পাওয়া যায় তাই ভালো, কাল রাতে খেজুর গুড় দিয়ে পায়েস রেঁধে ছিল সীমা, কিন্তু খেতে দেয়নি।

রাত্রিবেলা পায়েস খেলে যদি শরীর খারাপ হয়। অরুণ মাঝে মাঝে ভাবে,যত বয়স বাড়ছে সীমা যেন কেমন অরুণের গার্জিয়ান হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য ওকে দোষ দেয়া যায়না, মুমুর বিয়ের পরে এখন সবকিছু তো সীমা ই সামলাচ্ছে।

অরুণ সেন তিনবছর হলো রির্টায়ার করেছে, কেন্দ্রীয় সরকারে চাকরী করেছে পঁয়ত্রিশ বছর, দুটি মেয়েকে যত্ন করে মানুষ করেছে স্বামী স্ত্রী মিলে। এই ফ্ল্যাট কিনেছে, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে। বড় রুমুর বিয়ে হয়েছে তা প্রায় সাত বছর। তখন চাকরী ছিল, মুমু ছোট লেখাপড়ায় খুব ভালোছিল।
– কিব্যাপার কি এতো ভাবছো সেই থেকে, পায়েসটা খাও ,কেন ভাল হয়নি?
– হ্যাঁ এই তো খাচ্ছি, তোমার হাতের পায়েস সে যে অমৃত।
– থাক বুড়ো বয়েসে আর আদিখ্যেতা করতে হবেনা। এই পশ্চিমমুখি ফ্ল্যাট একটু রোদ্দুর পাই না, সূর্যদেব ঢলে পরবার সময় একটু চাঁটি মেরে চলে যায়। যাও খাওয়া হলে বাটি সিঙ্কে রেখে ঘরে গিয়ে বোস, আমি আসছি কথা আছে।
– যাচ্ছি যাচ্ছি, আচ্ছা কাল মুমু তোমায় আর কিছু কি বলেছে?
– হ্যাঁ সেকথা ই তো বলছি।

আয়েস করে পায়েস খেয়ে অরুণ বাবু সোফায় গিয়ে বসলেন, উনি ঠিক জানতেন তার ছোট মেয়েটা একদিন অনেক দূর যাবে।

– শোনো তবে, কাল মুমু ফোন করে বলল ওরা যে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে সেটা নাকি ওর শ্বশুর শাশুড়ীর মোটেই পছন্দ নয়।
– কিন্তু কেন?এতো ভালো খবর। কজনের ভাগ্যে এমন সুযোগ ঘটে।
– সে কথা তারা নাকি বুঝতেই চাইছেন না।
– কি বলছেন বেয়াইমশাই?
– ঠিক কি বলেছেন জানিনা,তবে তাদের ছেলে তাদের ছেড়ে দূরে যাক এটা মানতে পারছেন না।
– ও সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি চিন্তা করো না। মুমু কি আসবে কিছু বলল?

রিং___রিং___রিং___রিং__ ফোনটা বেজে উঠলো। অরুণবাবু সোফা থেকে উঠে গিয়ে ফোন টা ধরলেন।

– হ্যালো, কে বলছেন?
– আমি বিমল দেব বলছি ভবানীপুর থেকে।
– ও বেয়াইমশাই বলুন, কি খবর? কেমন আছেন?
– কেমন আর থাকবো? আপনি জানেন না আপনার মেয়ে আর জামাই কি মতলব আটছে?
– এ ভাবে বলছেন কেন?কি করেছে ওরা?
– কি না করেছে? মাত্র ছ‘মাস বিয়ে হতে না হতেই দুজনে আমাদের ছেড়ে ঐ অত দূরে চলে যাচ্ছে।
– শুনুন বেয়াইমশাই এসব কথা এ ভাবে ফোনে বলা যায় না, আপনারা আমাদের বাড়ীতে আসুন, আর না হয় আমরা আপনাদের বাড়ীতে যাই, মুখোমুখি বসে কথা বলা টাই মনে হয় ঠিক হবে।

একটু চুপচাপ অপরপ্রান্ত, আবার গলা পাওয়া গেল।

– আপনাদের অসুবিধা না থাকলে চলে আসুন আমার এখানে।
– ঠিক আছে, আমাদের কোন অসুবিধা নেই। আমি আর মুমুর মা ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি আপনাদের ওখানে।

ফোন রেখে অরুণবাবু স্ত্রী সীমা কে সব বললেন।

– ঠিক আছে চলো আমরাই যাই, দেখি কি বলতে চান ওরা।

সীমাদেবী সব সময়েই স্পষ্ট কথা বলতে এবং শুনতে ভয় পায়না। ওর ছোট মেয়ে মুমু অর্থাৎ মনামী লেখাপড়ায় দিদি রুমুর থেকে ভালো। রুমু গ্র্যাজুয়েট হতেই ওরা আর দেরি করেনি, দেখতে সুন্দরী মেয়ে শুধু শুধু ঘরে বসি য়ে না রেখে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ও থাকে জব্বলপুরে একটা তিন বছরের ছেলে বেশ জমিয়ে সংসার করছে। কিন্তু মুমু বিটেক এমটেক করে আরোকিছু হায়ার স্টাডি করতে করতেই চাকরী পেলো। ওর সবসময়ই ইচ্ছে ছিল বিদেশে যাবে, বিয়ে করবে না, আরো পড়াশোনা করবে ভালো চাকরী করবে।

অরুণবাবু আর সীমাদেবী অনেক বুঝিয়ে ওকে বিয়ের জন্য রাজী করেন, বলেন দেখ আমরা তো আর সারা জীবন বেঁচে থাকবো না। তখন তুই একা হয়ে যাবি। ভাগ্যক্রমে ওর সঙ্গেই চাকরী করে একই রকম স্কলার এই ছেলেটি রজত । এর সঙ্গেই পরিচয় হয় তারপরে পরিনয়। অরুণবাবুর রজত কে খুব পছন্দ হয়, কিন্তু প্রথম থেকে একটা ব্যাপার উনি লক্ষ্য করে দেখেছেন যে ছেলে যতই শিক্ষিত হোক না কেন, রজতের বাবা মা কিছুটা প্রাচীন পন্থী। তবে মানুষ ভালো বলেই মনে হয়। এখন দেখা যাক পরিস্থিতি কি বলে।

– কি এত ভাবছো বলোতো, তুমি এতো টেনশন্ নিও না আমি আছি।

সীমার কথায় অরুণ সেন হাসি মুখে বলে, “সে আমি জানি, যে কোন পরিস্থিতি কে সামলে নেওয়ার মতো বুদ্ধি তোমার আছে।”

দেব বাড়ীর সামনে এসে ট্যাক্সি থামে।

 

সুসজ্জিত মুমুর শ্বশুরবাড়ির ড্রয়িং রুম। চার কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ সামনে নিয়ে বসে আছেন অরুণ সেন ওর স্ত্রী সীমা সেন এবং বিমল দেব আর ওর স্ত্রী রিনা দেব।

প্রথমেই কথা বলেন মুমুর শ্বশুর মশাই।

– বেয়াই মশাই একটা কথা আমি প্রথমেই বলছি, আমি বা আমরা কিন্তু এই খোকা আর বৌমার বিদেশে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছি না।
– কেন বলুন তো? এতো অত্যন্ত গর্বের কথা। আমি তো স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমার মেয়ে এমন কিছু করবে যা আমি করতে পারিনি। কেন আপনাদের গর্ব হচ্ছে না রজতের জন্য?
– না ভালো যে লাগছে না তা নয়, তবে এই বয়সে আমরা একা একা থাকবো কি করে, আমাদের সুবিধা অসুবিধা সুস্থ অসুস্থতা কে দেখবে।
– আর তাছাড়া ছেলের বিয়ে দিলাম কোথায় বুড়ো বয়সে আরামে থাকবো তা তো হবার নয় । শুনুন একটা কথা আমি স্পষ্ট করে বলছি, আপনারা আপনাদের মেয়েকে বোঝান ওরা যেন কোলকাতায় থেকেই যা করার করে।
– সরি বেয়ান, এ কথা আমরা বলতে পারবো না, আমার মেয়ে লেখাপড়া শিখেছে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে এতে আমরা খুব খুশি, এখন সে কি করবে সেটা তাঁর ব্যাপার। আর যে কারণটা আপনারা বলছেন, আজকের দিনে এটা কোন সমস্যাই নয়।

এবার সীমা বলেন…

– আমার দুটি মেয়ে দুজনকেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি, রুমু তো থাকে সেই জব্বলপুর, আগে যাওবা আসতে পারতো এখন ছেলে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তো বছরে একবার আসে। এরপরে হয়তো তাও হবেনা।
– আপনার তো মেয়ে ,আমার ছেলে আমি কেন আশা করব না।

এবার সীমা হাসতে হাসতে বলে…

– সত্যি দুহাজার সতেরো তে এসে আপনি ছেলে মেয়ের তফাৎ করছেন, শুনুন আমরা মেয়েকে উড়তে শিখিয়েছি ডানা মেলে। সেই ডানাতো এখন আর ছাঁটতে পারবো না।
– তাহলে আপনারা চাইছেন যে এই বয়সে এসে আমরা একা হয়ে যাই।
– কেন আমরা দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে একা হয়ে যাইনি। নাকি এটা স্বীকার করছেন যে ছেলের বা ছেলেদের বাবা মায়েদের থেকে মেয়ের বাবা মায়েরা আর্থিক, শারীরিক মানষিক সবদিকেই বেশী শক্তিধর, তা না হলে কোনো মেয়ের বাবা মা তো কখনো এরকম কথা বলে না।

এবার সুর নরম করে বিমলবাবু বলেন…

না মানে শুধু আমাদের জন্য নয় আপনাদেরও তো মেয়ে জামাই কাছে থাকলে সুবিধাই হবে তাই নয় কি?
– একটা কথা বলি তবে ভালোকরে ভেবে দেখুন তো ছেলে মেয়ে বড় হয়েগেলে ওরা কি মানসিক ভাবেও দূরে চলে যায়না। জেনারেশন্ গ্যাপ। আমাদের পছন্দ ওদের সাথে কি মেলে। – না মেলেনা কারণ সময়।
– হ্যাঁ এটা আপনি ঠিকই বলেছেন। খোকার পছন্দ অনেক বদলে গেছে।

আপসোষ করে বলে রিনা দেবী।

– সেদিন বললাম চল খোকা বৌমাকে নিয়ে হরিদ্দার যাই, তা ছেলে বলল ওর সময় নেই, ভাবছে গোয়া যাবে তাই নাকি সময় হচ্ছে না।
– ঠিকএটাই আমরা বলতে চাই । ওদের ছেড়ে দিন, ওরা ওদের খুশিতে বাঁচুক আর আমরা আমাদের খুশিতে বাঁচি। চলুন আমাদের ও খুব ইচ্ছে হরিদ্বার যাবার।

মুমুর শাশুড়ীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

– সত্যি যাবেন?
– যাবো আমরা চারজন,আর আমার বড় ননদ, জানেন আমার বড় ননদ ওর থেকে পাঁচ বছরের বড়, একা থাকেন। একটা মেয়ে, বিয়ে হয়ে আজ বার বছর আছে সেই কানাডা, দু বছর হলো নন্দাই ও চলে গেছেন একা বিধবা মানুষ আমরা কত করে বলেছিলাম দিদি আমাদের কাছে এসে থাকুন, না উনি এলেননা। কি বলে জানেন? কাছে কেউ না থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, আর তোরা সবাই তো আছিস ই 
– আপনারা আমাদের চোখ খুলে দিলেন, এভাবে তো কখনো ভাবিনি। শুধু ভেবেছি ছেলে মানুষ করেছি এটা একরকম ইনভেষ্টমেন্ট, ছেলে বড়ো হয়ে দেখবে। না না আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো বাঁচবো, ঠিক ঠিক।

অরুণ সেন মুচকি মুচকি হেসে বলেন।

– আসুন আমরা পুরোনো সম্পর্ক ভুলে যাই, আমরা নতুন করে বন্ধু হতে পারি না, বুড়ো বয়সে বন্ধু, ইচ্ছেমতো একসাথে ঘুরবো বেড়াবো ছোটবেলার মতো একটা নতুন করে খেলাঘর গড়ে তুলি।
– “খেলাঘর“!! বাঃ বাঃ বেশ বলেছেন বেয়াই মশাই।
– না না আর বেয়াই মশাই নয় বন্ধু, শুধু বন্ধু।
– রিনা যাও যাও আর একরাউন্ড কফি বানাও। বন্ধুত্বের অনারে।

সীমা আর রিনা দুজনে হাসি মুখে কিচেনে ঢুকল। আর একটু পরে রজত আর মনামী ও তো ফিরবে, আজ রাতে একসাথে ডিনার করবো আমরা “খেলাঘরের” খেলুরেরা।
হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ দেব বাড়ী চার মধ্যবয়সী নতুন বন্ধুদের শোরগোলে হয়ে ওঠে সত্যি সত্যি খেলাঘর।

 

প্রায় বছর ঘুরতে চলল, রজত আর মনামী অস্ট্রেলিয়া তে আছে। দু বাড়ীর সঙ্গেই ফোনেকথা বার্তা হয়। উইকএন্ডে ল্যাপটপে র মাধ্যমে দেখাহয়। ওরা নিশ্চিন্ত আছে কারণ এখন ওদের বাবা মায়ে রা আর একা একা নয়, একসাথে সিনেমা দেখা, বেড়াতে যাওয়া! ডাক্তারখানা তে গেলেও এক সাথেই যায়। সেবা শুশ্রুষা টা নিজেদের মতো করেই করে। ওদের “খেলাঘরে” সদস্য সংখ্যা ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যুগ যুগ জিও ~ আমাদের “খেলাঘর”।

 

 

লেখিকা ~ করবী খাসনবিশ

 

প্রচ্ছদচিত্র উৎস ~ pluckys-secondthought.com

প্রচ্ছদচিত্র অলঙ্করণ ~ Anari Minds

One thought on “খেলাঘর

Leave a Reply