কলিজা

Anirban & Arijit, Childhood, Love Story, Marriage, Red, Short Story, Supernatural, Thriller, আদতে আনাড়ি, বাংলা

মুন্নির আজও এই কবরস্থান-এ এসে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়। ভয় ডর দূরের কথা, কতবার তো রাত হয়ে গেছে খেয়ালই করেনি।

শহর থেকে একটু দূরেই এই জায়গা। সকাল থেকেই অনেক লোকের ভিড় শুরু হয়ে যায়। এখানকার বিশেষত্বই এইটা, অনেক দর্শনীয় জায়গা, কিন্তু তাদের বেশিরভাগই কবরস্থান।

লোকমুখে ফেরে বিভিন্ন কবরের পেছনে লুকিয়ে থাকা হাড়হিম করা সব প্রচলিত গল্প। তার সত্যমিথ্যা যাচাই করার চেষ্টা কোনদিনই করেনি মুন্নি। কারণ সময় কেটে যায় শুধু এই বেগমের সমাধির সামনেই।

ভেবে ফেললেন তো মুন্নিই ভূত? এই এক বদ অভ্যেস আপনাদের। সুস্থ মানুষগুলোকে গল্পের শুরুতেই মেরে দেন। আরে, পড়ুন পুরোটা আগে!

যাই হোক, ফিরে আসা যাক। কবরটা ঠিক সিঁড়ির নিচে, ওপর দিয়ে লোক চলাচল করে। কবরের এই অদ্ভুত অবস্থানের কারণ হল পাপস্খালন। মানুষের পায়ের তলায় বহুবছর থাকতে থাকতে যাতে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। কি পাপ? সেটা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে তিনশ বছর।

 

ঔরঙ্গজেব বসলেন দিল্লীর মসনদে আর বাংলার দেখভালের দায়িত্ব দিলেন মুর্শিদ কে। হিন্দুর ছেলে হয়েও ছোটবেলা থেকেই মানুষ হাজি শাফির কাছে, তাই ধর্মরক্ষা আর হয়ে ওঠেনি, কিন্ত হয়ে উঠলেন বাংলার প্রথম নবাব, মুর্শিদকুলি খাঁ।

ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-শান ছিলেন সেই সময় বাংলার সুবেদার। নবাবের আসন হাতছাড়া হওয়ায় চক্রান্ত করলেন মুর্শিদ কে সরিয়ে দেওয়ার। মাসিক ভাতা আটকে যাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল আগেই, সুযোগ কে কাজে লাগালেন আজিম। সকালবেলা শ্রমিকরা ঘেরাও করবে মুর্শিদ কে, আর তার মধ্যেই ভোজালি দিয়ে কাজ সারবে একজন।

ঘেরাও হতেই বিচক্ষণ মুর্শিদ বুঝে গেলেন লক্ষণ ভালো নয়। হাত তুলে সাবধান করে সবাইকে বললেন ঔরঙ্গজেব যদি জানতে পারেন, তাহলে কিন্তু কেউ নিস্তার পাবে না। কৌশল কাজে এল, আজিমকে সরে যেতে হল বিহারে,বাংলায় শুরু হল এক নতুন অধ্যায়।

সততা আর অনুশাসণ, এই দুই ছিল মুর্শিদের মূলধন। বিলাসিতা, নারীসঙ্গ, সুরাসক্তি – এই সব হারাম থেকে অনেক দূরে থাকতেন মুর্শিদ। কিন্তু রাজধর্মে কোন ত্রুটি এলেই ওনার থেকে নিষ্ঠুর কেউ নেই। মাসের শেষে ঠিক নিয়ম করে ১ কোটি ৩০ লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা ভেট পৌঁছে যেত ঔরঙ্গজেবের কাছে, হয় নিজে নিয়ে যেতেন, নয়ত পাঠাতেন বিশ্বস্ত কাউকে।

এইরকমই একদিন ভেট পাঠানোর জন্য ডেকে পাঠালেন নিজের ছেলে ইয়াহি কে। মুদ্রার গাড়ি পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় একটা মুদ্রা ইয়াহিয়ার অজান্তে পড়ে গেল রাস্তায়। সম্রাট কে ভেট পৌঁছে দিয়ে ফিরে এল সে। ডাক পড়ল মুর্শিদের দরবারে দুদিন পর।

– “বাদশাহ কে কত রুপাইয়া দিয়েছিলে ইয়াহি?”
– “আপনি যা দিয়েছিলেন, ১ কোটি ৩০ লক্ষ।”
– “তাই? জাঁহাপনার দূত এসেছে আজ খত নিয়ে যে ভেটে ১ টি মুদ্রা কম ছিল।”
– “কিন্তু, আমি তো আব্বা পুরোটাই…”
– “যদিও উনি এই গলতি মাফ করে দিয়েছেন, কিন্তু তোমাকে এর সাজা তো মাথা পেতে নিতেই হবে।”

লঘুপাপে গুরুদণ্ডের সাথে পরিচয় ছিল না এর আগে আজিমুন্নেসার, কিন্তু ভাই ইয়াহির মাথা টা বাবার তরবারির এক কোপে নিজের পায়ের কাছে এসে পড়াটা ভুলতে পারেনি সে। মানসিক সমস্যা থেকে আস্তে আস্তে কঠিন রোগ গ্রাস করতে শুরু করল তাকে। মুর্শিদ আদরের ছোট মেয়ে আজিমুন্নেসার চিকিৎসার জন্য ডেকে পাঠালেন রাজ্যের সবচেয়ে নামজাদা হাকিম কে।

অনেকক্ষণ পরীক্ষা করে হাকিম একান্তে মুর্শিদ কে বললেন, “এর একটাই দাওয়াই হুজুর, কিন্তু তা খুবই নায়াব।”
– “আপনি শুধু বলুন কি লাগবে, বাকি আমার ওপর ছেড়ে দিন।”
– “হুজুর, বিমারী সেরে যাওয়ার পরেও এই দাওয়াইয়ের অভ্যাস থেকে যেতে পারে, বিপদ সেখানেই।”
– “বলুন কি দাওয়াই।”
– “আজ্ঞে, তিন সালের নিচের জিন্দা বাচ্ছার কলিজা, রোজ একটি করে।”

প্রবল পরাক্রমী কঠিন হৃদয়ের মধ্যেও সন্তানের প্রতি টান উপেক্ষা করতে পারতেন না মুর্শিদ। পুত্রশোক কষ্ট উপলব্ধি না করলেও, কন্যার চিন্তা তাঁকে বেশি ভাবিয়ে তুলল।

মুর্শিদের নির্দেশ জারি হল। সন্তানস্নেহ আর প্রজাপ্রীতি একসাথে ধরে রাখা গেল না। ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল আজিমুন্নেসা। বলিদান হতে থাকল ফুটফুটে প্রাণগুলোর।

২ মাসের চিকিৎসার পর সেরে উঠল রাজকন্যা। এখন আর ভাইয়ের কথা মনে পড়ে না তেমন। বাবার প্রতি যে রাগ দানা বেঁধেছিল, তাও আজ নেই। ওনার আদেশেই তো আবার এই নতুন জীবনপ্রাপ্তি। সাথে এখন ভালোবাসার মানুষ সুজা-উদ-দৌল্লা, প্রেম দানা বেঁধেছিল অনেকদিন ধরেই, শেষে পিতার ইচ্ছাতেই বিবাহ। কিন্তু বাধ সাধল শুধু একটা জায়গাতেই।

দুপুরে রাজকীয় কচি পাঁঠা, হরিণ, দিশি মুরগী থাকলেও আজিমুন্নেসার মন যেন অন্য কিছু খোঁজে। কিছুতেই সুকুন আসে না খেয়ে। সেই স্বাদ যেন আজও লেগে আছে জিভে।

কেটে যায় আরও কিছু মাস।

 

– “ওয়াজির, বাইরে এত লোক কেন?”
– “হুজুর, ওদের অন্যায় অভিযোগ, সেপাইকে বলেছি প্রবেশ করতে না দিতে।”
– “কি অভিযোগ?”
– “আপনি চিন্তা করবেন না হুজুর, মিথ্যা আরোপ ওদের।”
– “আমি জানতে চাই।”
– “আজ্ঞে, ওদের দাবি যে আজও বিভিন্ন ঘর থেকে রোজ বাচ্ছা গুম হয়। সকলের উমর তিন এর নীচে।”

 

চমক ভাঙে মুন্নির। রাত হয়ে গেছে। সমাধির মেন গেট বন্ধ করে চলে গেছে দারোয়ান। মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত টাঙাওয়ালারাও কেউ আর জেগে নেই। নিঝুম, নিস্তব্ধ চারিদিক।

উঠে পড়ে মুন্নি, এগিয়ে যায় সিঁড়ির তলায় অন্ধকার ঘরের দিকে। বেগমের সমাধি ঠিক ঘরের মাঝখানেই, চৌকো মতন বেদী। তার ওপরে উঠে পড়ে মুন্নি, একটা চাদর বিছিয়ে এলিয়ে দেয় শরীরটা। আজিমুন্নেসার ব্যাধি তো সেরে গিয়েছিল, কিন্তু তার এই জন্মের ব্যাধি টা কিভাবে সারবে, জানে না মুন্নি। আজও যে চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে বাবার হাতে নিজের জীবন্ত কবরদানের শেষ দৃশ্য। রাত বাড়লেই বেদীর চারিদিকে জড়ো হয় বাচ্চাগুলো, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মুন্নির দিকে, তাদেরকে তো চেনে না মুন্নি!

 

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদচিত্র ~ vignette1.wikia.nocookie.net

প্রচ্ছদচিত্র অলঙ্করণ ~ Anari Minds

 

One thought on “কলিজা

Leave a Reply