পুজো আসছে…

Durgapuja, Friends, বাংলা

 

আইফোনটা পাশের টেবিলটায় পড়ে আছে,কিছুটা একঘরে করে রাখার মতই। সারাদিনই টুং টাং করে বেজে চলেছে। গাদা গাদা ওয়াটস্যাপ,ফেসবুক থেকে মেসেজ। তুলে দেখার সময় হয় নি উদিতার। বেশ অনেকক্ষন পর হাতের কাজ গুলো মোটামুটি সেরে একটু ফোনটা হাতে নিয়েছে সে। দেখে প্রায় গোটা ৫০ মেসেজ। আস্তে আস্তে সব পড়তে পড়তে হঠাত দেখে ফেসবুকে কোন এক বন্ধু বেশ কিছু মেঘের ছবি আপলোড করেছে। ছবি গুলো বেশভূষা বা নৈপুণ্যে কোনোটাতেই এমন উতকর্ষতা পায় নি যে আলাদা করে নজর দিয়ে দেখতে হবে। তবুও চোখ টানলো। চোখ টানলো ছবির সাথে জোড়া ক্যাপসানটা, “পুজো আসছে।। “ সেই পেঁজা পেঁজা তুলোর মত মেঘ আকাশ কে ঘিরে রাখার ছবি আর সাথে এই ক্যাপসান, এর মাহাত্য বুঝি একটা আদ্যন্ত বাঙালিই বুঝতে পারে। লাইক বাটন টায় হাত যেতে তাই বেশি সময় লাগলো না। সামনের কাঁচ খোলা জানলাটার দিকে এগিয়ে গিয়ে উদিতা হয়তো খোলা আকাশটাকেই ধরতে চাইলো একবার। শরৎকালের সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মত আকাশ কে তখন কাব্যের পাতায় আটকে রেখে কালো করে আসা আকাশ তখন আকাশ খোলা জানলার ধুলো মুছতে ব্যস্ত। মেঘ বলতে মুখ ভার করা আকাশ আর আটপৌরে বৃষ্টি। ঘুরে ফিরে বারবার কেমন ছবি গুলো দেখতে লাগলো সে। হাওয়ার দোলায় মাথা নাড়াতে থাকা কাশফুলের সারির সাথে দেবীর আগমনী গানের ধুন কেমন যেন অনুভব করতে পারছিলো উদিতা এই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে লন্ডনের এক বিকাল বেলা। মনে মনে বুঝি গেয়েও নিলো, “বাজলো তোমার আলোর বেনু…”

 

পুজো মানে কি সেটা বুঝি আলাদা করে কাউকে বুঝিয়ে দিতে হবে না। বাঙালি হলে তো কথাই নেই,এমন কি অবাঙ্গালীদের ও আজ কাল আর বলতে হয় না। যারা কোলকাতা শহরে একবার পা রেখেছে তারা খুবই ভালোভাবে জানে এই পুজোর মানে কি। হাওয়ার দোলায় কাশফুলের মাথা নাড়ানো,আকাশ ভরা পেঁজা সাদা মেঘ, শিউলি ফুলের ওই শিশির ভেজা ঘাসকে উষ্ণ আলিঙ্গন, অনেক অনেক আবেগ, ভালবাসা,শুভেচ্ছা বিনিময় আরও কতো কিছু। সব মিলিয়ে পুজো মানেই একটা আলাদা আবেগ। সেটা বুঝি বলে বোঝানো যায় না। কোলকাতার বাইরেও অনেক জায়গায় পুজো হয়,দেশে বিদেশে, কিন্তু সেই স্বাদটা যেন নেই। লন্ডনেও হয়, এই তো গেলো বছরও উদিতা গেছিলো সেখানে। চারদিনের পুজো, কিন্তু ব্যাপারটা কেমন ফ্যাকাশে; ওই যাকে সোজা বাংলা ভাষায় বলে নম নম করে পুজো সারা। মজা পায়নি সে,মানে সেই নস্টালজিয়াটা কোথাও যেন ফিকে পড়ে যাচ্ছে। তাই মন খারাপ করে চলে এসেছিলো সেবার। পুজো এলেই কেমন যেন কোলকাতা কে বড্ড মিস করে সে।মিস করে সেই ঠাকুর দেখতে গিয়ে জুতো ছেঁড়া, গলদঘর্ম হয়ে ভিড় ঠেলে বেশি দাম দিয়ে ফুচকা খাওয়া। এগরোলের দোকানের সামনে সেই লম্বা লাইন, প্যাঁ পু করে বাঁশির আওয়াজ,বন্ধুদের সাথে প্রানখোলা আড্ডা আর ফেলে আসা সেই একটা স্মৃতি। সেই সব কিছু আজ হারিয়েছে সে, রেখে গেছে এই মেঘলা আকাশ আটপৌরে বৃষ্টি। স্বপ্নের পিছনে ছুটতে ছুটতে আজ সে সবাই কে ছেড়ে অনেকটা দূর চলে এসেছে একলা একলাই। হয়তো এই কথাই ভাবছিলো ওই জানলাটার সামনে দাঁড়িয়ে। উদিতার দীর্ঘশ্বাস টুকু তেও কেমন যেন দু বছর আগের সিমলা স্ট্রিটের এগরোলের স্মৃতিটা চাগাড় দিয়ে ওঠে আর “সে”।

 

উদিতা এই কদিন আগে লন্ডনে এসেছে, পড়াশোনা করতেই এসেছে। ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে ডক্টরেট করছে। ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন শুনলেই প্রথমেই মনে আসে খুব মেধাবী নিশ্চয়ই। অনুমানটা একদমই সত্যি। সত্যিকরেই খুব মেধাবী ছাত্রী উদিতা, মানে স্কুলের প্রথম সারীর মেয়ে বলতে যা বোঝায়।  তবে বই এ মুখে স্টুডেন্ট সে নয়, যথেষ্ট কাজের মধ্যে নিমজ্জিত থাকতো সে। পাড়ার পুজো তে আলপনা দেওয়া,পুজোর যোগাড় সব দিকেই সে সিদ্ধহস্ত। খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ করতো। তাই হয়তো বাইরে চলে যাওয়ার পরেও এতোটা মিস করে এই সব কিছু। থাকতো নিউ আলিপুরে এল.আই.সি কোয়ার্টারগুলো তে। বাবা খুব বড় এল.আই.সি-র অফিসার ছিলেন। তাই আর্থিক সচ্ছলতা যে ছিল সেটা খুব ভালোভাবেই বোঝা যায়। বিদ্যাভারতী স্কুলের ছাত্রী উদিতা। স্কুলে গিয়ে উদিতা মুখার্জী নামটা বললেই ছোটো থেকে বড় সবাই এক গাল হেসে বিবরণ দিয়ে দেবে, এতটাই ফেমাস সে J । সেখান থেকে বারো ক্লাসের গন্ডি পেরিয়ে যাদবপুরের দরজায় ঘন্টি নাড়ানো,তারপর এই বিদেশ বিভূঁই, সব মিলিয়ে একটা স্বপ্নের উড়ান। কলেজেও তার পরিচিতি সেই ক্লাস টপার হিসাবে। কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্ট্মেন্টের ক্লাস টপার ছিলো সে, গোটা কতক গোল্ড মেডেলও সংগ্রহে এসেছিলো। কাজেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কতটা ভালো স্টুডেন্ট উদিতা। আর “সে”, দেখা সেই কলেজে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র ছিলো। যাদবপুরে পড়ে মানে ভালো ছেলে তো বলতেই হয়,অন্তত আদ্যন্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি সেটাই বোঝে আর সাথে এটাও বোঝে যে খরচা কম হবে। সে যাই হোক, ভালো ছেলে বলেই মেনে নিলাম। ব্যাকগ্রাউন্ড কতোটা ভালো সে ব্যাপারে বেশ কিছুটা সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। কিন্তু তবুও সে আজও উদিতার “সে” রয়ে গেছে। J  নামটা কি? নামটা সানি ওরফে সাবর্ন্য, সাবর্ন্য চৌধুরী। শুনেছি ছেলেটা নাকি ভালো ছবি আঁকত, লেখা লিখিরও হাত ছিল একটু আধটু। তবে সেসব নিয়ে আর বেশি কিছু ভাবেনি সে, পড়াশোনাই তার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর ছিল তুলি, মানে উদিতা।

 

বেশ কয়েকটা বছর আগে। তখন বাঙ্গালির মনে মানবিকতা এতটাও অবক্ষয় হয়নি। যাদবপুরে তখনও রাজনীতিটা এতো নোংরা জায়গায় যায় নি, তখনও মানুষ পার্কস্ট্রীটের রাস্তার মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ কে জিজ্ঞাসা করতো, “দাদা এই প্রথম এখানে এলাম,মোক্যাম্বোটা যাবো কি করে?”। স্কুল পাস করে বেরিয়েছে। কলেজে ঢুকেই কেমন যেন সাপের পাঁচ পা দেখার উপক্রম সানির। মানে হঠাত করে নিজেকে কেউকেটা ভেবে ফেলার একটা বদ অভ্যাস ধরা দিলো ওর ভেতরে। কারোর কথা শোনে না,জা খুশি করে, মুখে মুখে তর্ক এসব তার নখ-দর্পনে। সোজা বাংলা ভাষায় দিন দিন এমন জায়গায় যেতে লাগলো যে তাকে দেখে যেকোনো বাবা মার পরিচয় দিতে লজ্জা লাগবে। নিয়তি তো বাঁধাই আছে। প্রথম পরীক্ষায় ফেল। দুটো পেপারে সাপলি। স্কুলের সেই গরিমা এক লহমায় মিশে গেলো মাটিতে। এই ধাক্কাটা হয়তো দরকার ছিলো কিছুটা হলেও। শুধরে  গেলো সেই বিগড়ানো ছেলেটা। যাই হোক দেখেও ভালো লাগে। সেই সময় ফেস্টের মানে “সংস্কৃতি”-র সময় প্রথম উদিতা কে দেখা। দেখা মানে চোখের দেখা হলেও সেই দেখা যে পরে এরম ভয়ঙ্কর রুপ নিতে পারে সেটা ধারনার বাইরে ছিলো। একটা সমীক্ষায় পড়েছিলাম একটা ছেলের একটা মেয়ে কে ভালোলাগতে ১৮ সেকেন্ড লাগে, বিপরীতক্রমে ১৮ দিন। সত্যি সত্যি এভাবে মিলে যাবে অনুমিত ছিলো না। সেই প্রথম দেখা ভালোলাগায় পরিনত হতেও বিশেষ কাঠ খড় পোড়াতে হয় নি। পরের পর সব পন্থা ট্রাই করার পর শেষমেশ উদিতার ধার ঘেঁষতে পারলো। আস্তে আস্তে বন্ধু,সেখান থেকে ফোন নাম্বার, কলেজে দেখা, এক সাথে চা সব কিছুই যেন ফিরিয়ে দিতে লাগলো সেই ফেব্রুয়ারি মাসের লালচে আমেজ। বহুদিন এরম টাল বাহানা চলার পর একদিন বলেই ফেললো সানি,

লেখা লিখির হাত ছিলো বলেছি আগেই, তাই সেই লেখা দিয়েই প্রোপোজটা করেছিলো।

 

“ তুলি,(উদিতার ডাকনাম)

 

তোকে বলবো বলবো করেও কখনো বলতে পারিনি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি সংস্কৃতির সেই রাতটা আমার কাছে এখনও ভেসে আসে। সেদিন লাল একটা কুর্তির সাথে ব্লু জিন্সে তুই এসেছিলি। ওই লাল নীল আলোর মাঝে আমি তোকে সেভাবে বুঝতে পারিনি। কিনতু ওই লাল জামাটার কাঁধের কাছে শান্তিনিকেতনি আঙ্গিকে যে কিছু কাজ আছে সেই আঁকা গুলো কে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। যখন ওই ডিস্কো আলোর লেখা গুলো তোর গালটাকে ছুঁয়ে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছিলো আবিরের মতো, সেই বদলানো রঙগুলো কে আমি ভালবেসেছি। ভালবেসেছি ওই আলো পেরিয়ে রিমলেস চশমার পিছনে যে পটলচেরা চোখ দুটো আছে সেই চোখ দুটোকে। যে চোখ গুলো ওই উত্তাল করতালির হিল্ললেওএকেবারে অবিচল। সামনে চলতে থাকা ফ্যানের হাওয়ায় যখন এক গুচ্ছ এলোমেলো চুল নতুন করে ঘেঁটে দেয় একটা সুন্দর কোলাজ,ঘেঁটে থাকা সৌন্দর্যকেও ভালোবেসেছি আমি। আমি ভালবেসেছি আনমনে হাতের ছোঁয়ায় সরিয়ে নেওয়া এলো চুলের মেলা কে। আমি ভালবেসেছি ঠোঁটের পাসে জমে থাকা তিল টার আগাধ ভালোবাসা কে।

 

এই এতো ভালোবাসার পরেও একটু আমি বাঁচিয়ে রেখেছি তোর জন্যে। পাছে কেউ নজর না দেয় তোকে। ওই টুকু ভাগ শুধু তোর। জানি না আদৌ নিবি কিনা,তবুও জমিয়ে রাখবো সিন্দুকে। বিশ্বাস কর তুই বললে ওই বট গাছের তলায় সারা জীবন অপেক্ষা করতেও রাজি, রাজি আমি মেঘের আড়ালে রামধনু হতে, রাজি চন্দনের সুগন্ধ হয়ে তোর ফুস্ফুসে বন্দী হতে, রাজি আমি বর্ষার বর্ষাতি হতে। যখন  সারা শহর ঘুমায় তোকে একলা ফেলে রেখে সেই একলা রাতেও ধ্রুবতারা হতেও রাজি আমি। বল না তুই কি এখনও ফেরাবি আমায়?

 

কেমন ফিল্মি ডায়ালগ দিলাম না?? হে হে হে। নাই বা হলাম আমি জীবনানন্দ,কিন্তু তুই তো আমার বনলতা সেন। সত্যি টা চেপে রাখতে পারলাম না আর। আমি তোকে ভালোবাসি।

 

আই লাভ ইউ…

 

  • ইতি

সাবর্ন্য ……………… “

 

চিঠি পেয়ে কি উত্তর দেবে বুঝতে পারেনি উদিতা। হ্যাঁ ফোন করেছিলো সানি কে। উত্তর আসেনি। বেশ কটা দিন নিরবতার পর বুঝি এটাই শুনতে বাকি ছিলো। না,হয়নি। ভালোবাসা প্রেমে পরিনত হয়নি। বন্ধুত্ব রয়ে গেছে কিছুটা দায় সারা ভাবেই।

 

শেষ বার উদিতা আর সানির দেখা হয়েছিলো দু বছর আগের পুজোর নবমিতে। সেদিন মহম্মদ আলি পার্কের ভেতরের ফুচকাওয়ালা গুলোর কাছে পরমানন্দে খেয়েছিলো তুলি,মানে উদিতা। একদিকে তুলি গোগ্রাসে উপভোগ করছে ফুচকার আস্বাদ আর একদিকে সানি উপভোগ করছে তুলির মুখের সৌন্দর্য। সেদিন ওই চাঁদপানা মুখের শোভা গোগ্রাসে গিলেছিলো সানি। জানতই একদিন চলে যাবে ও। তাই শেষ বারের মতো। ওই শেষ দেখা। আশ্চর্য জনক ভাবে সেই চিঠিটা এখনও কাছে রেখে দিয়েছে উদিতা। ফেলেনি কোথাও। প্রতিবার পুজো এলেই সেটাকে খুঁজে বের করে পার্টসের সেই কোনাটা থেকে যেখানে বাকি কারো হাত পৌঁছায় না। ফেলে আসা শিউলি ফুলের শোভা, কাশফুলের সফেন দোলা, বাজলো তোমার আলোর বেনুর মাঝেও কথায় যেন নাড়া দিয়ে যায় নবমির রাতের সেই মহম্মদ আলি পার্ক। বার বার না বলার মাঝেও কোথাও যেন লুকিয়ে আছে একটা হ্যাঁ- এর আভাস। ভালো না বাসার মাঝেও রয়ে গেছে ভালো বাসার একটা ছোট্ট উপস্থিতি। হয়তো সেই চেনা স্টিরিওটাইপ নেই, কিন্তু আছে একটা নতুনত্ব । একটা অন্যও ভালোলাগা। অবশ্য সানি এসব জানে না। সাবর্ন্যর সময় এখন অনেক এগিয়ে গেছে উদিতা কে ছেড়ে, ওই প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টা মতো। কিন্তু সানির ও অপেক্ষা এখনও রয়ে গেছে। হয়তো সে জীবনানন্দ হতে পারেনি, কিন্তু উদিতাকে দিয়েছে বনলতা সেনের আসন। হয়তো এখনো সেই কালো হরিন চোখ খুঁজে যায় ফেসবুকের পর্দায়।

 

বললাম না এই পুজো শুধু মেলায় না, বানায় অনেক আবেগ। পুজো মেলায় হৃদয়,ভাসায় ভালোবাসায়।

হয়তো এমনি এক পুজোর জন্যে হন্যে হয়ে বসে আছে সানির তুলি। আসবেই সেই দিন,আজ না হোক কাল। এই পুজো যে কাউকে খালি হাতে ফেরায় না…

 

 

পুজো আসছে…

 

 

লেখক ~  সাবর্ন্য চৌধুরী

প্রচ্ছদচিত্র ~  সাবর্ন্য চৌধুরী

প্রচ্ছদচিত্র অলঙ্করণ ~ Anari Minds

 

 

 

 

Leave a Reply