দেবীর দুশমনেরা

Anirban & Arijit, Conversation, Durgapuja, Humor, Satire, Short Story, বাংলা

আরে সর্দার যে! কেমন আছো?

বলেই মাড়ি বার করে হাসল সাম্বা।

গব্বরের মন মেজাজ একদম ভাল নেই, জেলে খুব পিটিয়েছিল ব্যাটারা। এক কালে যে হাতে বেল্ট নিয়ে ঘুরেছে সেই হাত দিয়ে ওরা হাতপাখা আর ধুপকাঠি বানিয়েছে ওকে দিয়ে। কি ভাগ্যে কোনমতে জেল ভেঙ্গে পালিয়েছিল ও! তাপ্পর তো দাঁড়ি, গোঁফ, মাথা কামিয়ে ঘাপটি মেরে ছিল এই কটা বছর। মোমিনপুরের বাস স্ট্যান্ডে পাইরেটেড সিডি বেচে দিন চলছিল। কিন্তু আজকের মিটিংয়ে ওকে আসতেই হত। খোদ সিইও ডাক পাঠিয়েছে যে! না গেলে হয়ত কালকেই পুলিশে ধরিয়ে দেবে।

কিন্তু হারামি সাম্বাটা ঠিক চিনেছে ওকে!

– খুব চুলকুনি না! তখন একটা গুলি তোর খুলিতেও ঠুসে দিলে হত দেখছি।

বলে গব্বর সিং মোটা ভুঁড়িটা নিয়ে ধপ করে বসে পড়ল কাঠের চেয়ারটায়। ঘরটা বেশ অন্ধকার মতো, এককালে অনেক ক্রিমিনাল নাকি এই ঘরেই সময় কাটিয়ে গেছে। কিন্তু আজকাল রাইটার্স বিল্ডিং একদম শুনশান, আর কাছাকাছি কোন বড় পুজোও নেই। পুলিশ গুলো শালা উত্তরে আর দক্ষিণে ভীড় সামলাতেই ব্যস্ত। তাই এখানে মিটিং করলে ধরা পরার নো চান্স।

এক এক করে বাকিরাও চুপচাপ এসে চেয়ারে বসতে শুরু করল, সবার মুখ থমথমে, কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছে না। মগনলাল একবার মোগ্যাম্বোকে ‘কেমোন আচেন’ বলতে গিয়ে চেরি টম্যাটোর মতো চোখটা দেখে চুপ করে গেল। সবারই চিন্তা একটা, বস হঠাৎ করে এতদিন বাদে কেন ডাকলেন!

আরো বেশ মিনিট তিরিশ পরে অন্ধকার করিডোরে ধুপ ধুপ আওয়াজ পাওয়া গেল, তিনি ঘরে ঢুকলেন! গায়ের রঙ ব্ল্যাকবোর্ডের থেকে এক টোন ফর্সা, ইয়াব্বড় গোঁফ, কপালে ধ্যাবড়া কালো টিপ, স্লিভলেস জড়িওয়ালা সবুজ জামা। মোটের ওপরে অদ্ভুত বাজে ড্রেস সেন্স। ইনিই মহিষাসুর।

হ্যা হ্যা করে হাঁপাচ্ছিল মহিষাসুর, কপাল দিয়ে টস টস করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। ঢক ঢক করে এক গেলাস জল খেয়েই বলল-

– শালাচ্ছেলে বাঙালি গুলো, বানের জলের মতো প্যান্ডেলে ভীড় করে, আর বউগুলো গোল গোল চোখ করে আমার মাসল গুলোকে গেলে…

-এতে তো আপনার ভালোই স্যার! আবার সেই মাড়ি বার করা হাসিটা হাসল সাম্বা।

– একটা কানের গোড়ায় দেব তোমার শুয়ার, ওতে আমার কি লাভ হয় শুনি? পাঁচটা দিন আমাকে মেয়েটার পায়ের তোলায় ঠায় বসে থাকতে হয়, একদম অ্যাক্রোবেটিকালি আনসেফ একটা পশ্চারে, ঘাড় টুকুও ঘোরাতে পারিনা। এদিকে বাতের ব্যথাটাও বেড়েছে, অতক্ষণ ধরে হাঁটু ভাজ করে থাকা যায় নাকি! কবে যে এই হিউমিলিয়েশন টা বন্ধ হবে জানি না।

– তা আজকে তাহলে এলেন কি ভাবে?

সাম্বার প্রশ্নর শেষ নেই।

– উফফ, আর বলিস না, সন্ধিপুজোর সময় যেই একটু ঠাকুরটা ঢেকেছে কাপড় দিয়ে, অমনি আমি এক ছুট। মাঝে ধর্মতলায় একটা লেবুর জলওলাকে দেখে বললাম এক গেলাস সরবত দাও, সে ব্যাটা মুখে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করে দৌড় লাগাল। দিন কে দিন আকাট হয়ে যাচ্ছে পচ্চিমবঙ্গটা।

গব্বর এতক্ষণ নিজের মনে দাঁত খোঁচাচ্ছিল, এবারে বলল,

-কিন্তু আজকে ডাকাটা কি জন্য স্যার? একটা টেক্সট করে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যেত।

-উফফ, সব কথা কি মেসেজ করে হয়? যেটা আজকে বলছি সেটা কান খুলে সবাই শুনুন, এই প্রবলেমটা তো আর আজকের নয়, কবেকার। কিন্তু কোন সলিউশন তো বার করতে পারল না কেউ। আজ এই ঘরে শেষ ১০০০ বছরের তাবড় তাবড় ভিলেনরা আছে। একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে এবারে। আপনাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন-

– মেয়েটা বার বার আমাদের হারিয়ে দিচ্ছে কি করে ?!!

একটা বুড়ো লোক, হুইল চেয়ারে বসা, ক্যাথেটারের ব্যাগটা ঝুলে আছে পায়ের পাশে, সে এবারে বলল-

– মেরে পাস ইস কা উত্তর নেহি হ্যায় গুরুশ্রী।

– ভায়া দুর্যোধন, এটা রামানন্দ সাগরের মহাভারত নয়, এখানে কেউ তোমার হিন্দি বুঝবে না, বাংলায় বল।

-ওহ, সরি সরি।

এবারে দুর্যোধন একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

–  আমি কি এমন খারাপ কাজ করেছিলাম বলুন। নারীর লজ্জাহরন, এ তো এক বীরপুংগব পুরুষকেই শোভা পায় নাকি?!

সবাই সমস্বরে ব্রাভো ব্রাভো করে উঠল।

– ভেবেছিলাম এক রত্তি মেয়েটার জামা কাপড় খুলে নিলে বেশ মজা হবে। তো সেই শালী ভিমের কানে গিয়ে কি ফুস মন্তর দিল কে জানে, দামড়াটা মেরে আমার পেলভিক ফ্র‍্যাকচার করে দিল। আজ অব্দি হাঁটতে পারলাম না, আমার ঈমান দন্ডটাও ঘুমিয়েই রয়ে গেল।

দাদার চোখে জল দেখে গব্বরও আর নিজেকে চেপে রাখতে পারল না,

– আমারো এক কেস গো, ওই বসন্তীকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল কোন চাক্কির আটা খেয়ে এমন একটা আঁটোসাটো মেয়ে জন্মেছে! তাই ক্লাইম্যাক্সে বীরু কে মারতেই গেছিলাম, তখন কি হল মাথার মধ্যে, ভাবলাম ওই সরু কোমরের লাচটা একটু দেকে নি। ব্যাস, সব গুল হয়ে গেল। শেষে কিনা হাতকাটা ঠাকুরটাও লাথ মারল! বহুত না ইনসাফি হেয়!

– ভ্রাতাশ্রী, যুদ্ধের সময় আপনার ইয়ের ওপরে একটু কাবু রাখা উচিত ছিল।

– ঠিক বলেছ গো দুর্যো দাদা, শুয়োরের বাচ্ছা ওই রামগড়ের লোক গুলোকে একবার পেলেই….

গব্বরের কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা উদ্ভট ইইইইইইইইক করে আওয়াজ আসতে লাগল টেবিলের আরেকপ্রান্ত থেকে। আরেকটা বুড়ো ফিট হয়ে মাটিতে পরে ছটকাচ্ছে যে। শেষমেশ গব্বরের মোজা শুঁকিয়ে বাগে আনতে হল তাকে।

উঠে বসে এক চুমুকে আধ জাগ জল খেল সে, তারপরে তার মুখ খুলল,

– আমার সামনে প্লিজ রামের নাম কেউ নেবেন না।

– সরি রাবণ দা, খেয়াল ছিল না।

– ইটস ওকে গাবু, আর বলিস না প্লিজ।

– ও হ্যাঁ রাবণবাবু, আপনার কেসটাও তো শুনেছিলাম দুর্যোধনের মতোই।

– একদম ঠিক স্যার, আপনিই বলুন। আমি একটা সোমত্থ পুরুষ মানুষ, যেটা অ্যাচিভ করতে পারব না সেটাকে ছিনিয়ে তো নিতেই হবে নাকি!

সবাই আবার এক গলায়, – কারেক্ট!

– আর ঠিক সেটাই আমি করেছিলাম, আর ওই মেয়েটা কি করল,  আমার সব কিছু কেড়ে নিল। একটা হনুমান দিয়ে কিনা জ্বালিয়ে দিল আমার মেগাসিটি টাকে! আর ওর ওই ভেড়ুয়া বরটা আমার ছেলেটাকেও ছাড়ল না!

– আমার এই হাল দেখেও আপনারা কিচ্ছু শিক্ষা পেলেন না দেখছি, আপনাদের ওই সীতা আর গীতা, থুড়ি বসন্তি। আর আমার এই দুর্গা, আমি ১০০ পারসেন্ট শিওর যে ওরা এক মেয়ে, বারবার আমাদের মুরগী করছে আর আমরা বুঝতেও পারছি না…

গোল টেবিলটার আরেক দিক থেকে এবারে টকা টক শব্দ এল, মোগাম্বো এতক্ষণ ধরে সব শুনছিল, এবারে আর কিছু না বলে থাকতে পারল না,

– স্যার! এবারে আমি বুঝলাম, আমার কেসটাও খেয়েছিলাম ওই একটা দেবীর জন্যই, শ্রীদেবী! ওই হাওয়া হাওয়াইয়ের বয়ফ্রেন্ডটা আমাকেই হাওয়া করে দিল!

– স্যারজি, হামি কিছু বলতে পারি?

– বলুন মেঘরাজ জী।

– ওই দেভীর বাহন আমার কিমতি চিজ নুকিয়ে রাকল, আর আমিও মিস্টার মিত্তিরের কাচে ধোরা পোরে গেলুম, তার চেয়ে ওই শারবাতে বিষ মিশিয়ে দিলেই কাম তামাম হয়ে যেত।

তখনই তালিবান লিডারটাও টেবিল চাপড়ে বলে উঠল-

!نةىدذد ىةودرسر وةةذذذى وىببنحتل  ات

নেহাত গুগুল ট্রান্সলেটর টা ছিল, পাশতু থেকে বাংলা করে যা দাঁড়াল তা হল-

– এতোদিনে আমরাও বুঝলাম মেয়েটাকে কেন মারতে পারিনি, ওর নামও তো মা-লালা!

এবারে মহিষাশুরের লিডারশিপ স্কিলটা দেখানোর পালা,

– ভাই সকল, আমি নিশ্চিত যে এর জন্য দায়ী ওই দশ হাতের দুর্গা, কাল নবমী, কালকেই মেয়েটাকে দেখিয়ে দেব ওর জায়গা আমাদেরই পায়ের নিচে, আপনারা সবাই আমাকে একটু হেল্প করুন। ভয় না পেয়ে এগিয়ে আসুন, এবারে একদম ফাটিয়ে দিতে হবে।

– ভেরি গুড, আর এই সিডি বেচার জীবন পোষাচ্ছে না, দু’হাত কাটার পিএইচডি আছে, এবারে দশ হাত কেটে পোস্ট ডক করে নেব।

– অসুর স্যার আমি আপনাকে আমার লংকার এলটিটিই ট্রুপ এনে দেব।

– আর আমি আমার বাকি ৯৯ ভাইকে নিয়ে আসব, লং লিভ মাই ফার্টাইল ফাদার।

– আমার কাছে দাগা আর তেজা আছে, আর একটা পিংক অ্যাসিডের বোতলও আছে, মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারব।

– হামি আপনাকে ওর্জুন দেব, নাইফ থ্রোয়িংয়ে উস্তাদ আছে।

– খুব খুব ভাল গাইজ!  এবারে আমাদের আর কেউ আটকাতে পারবে না তাহলে, মেয়েটার দিন শেষ…

এমন সময় দরজায় টোকা, এতো রাতে কে?!

সাম্বা দরজা খুলে দিয়ে দেখে একটা ছাপোষা বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে, চোখে চশমা, মাথার চুল একপাশে পাট করা। গটমট করে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল লোকটা,

–  আমার স্টেটের মায়ের এগেন্সটে কন্সপিরেসি! গুলি করে মারব শালা তোদের!

– তুই কে বে?

– আমি বব,  বব বিশ্বাস, গাধার দল, মা তো এখানে বছরে পাঁচদিন থাকেন, বাকি ৩৬০ দিন আর লিপিয়ারে ৩৬১ দিন কে থাকে জানিস তোরা!!??

এবারে বাকিদের অবাক হওয়ার পালা,

– কে?

-কে রে?

– কৌন ভাই?

বব কে উত্তর দিতে হল না, এতক্ষন ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ ছিল তাই বোঝা যায়নি, এবারে দরজা দিয়ে রাস্তা থেকে একটা গান ভেসে এল, ট্রাফিক সিগনালে বাজছে।

“ মা গো তুমি সার্বজনীন আছো হৃদয় জুড়ে, মা-আম্মি- মাদার একই ভুলি তা কি করে….”

পরের দিনের খবরের কাগজে দুটো খবর বেড়িয়েছিল,

১. ম্যাডক্স স্কোয়ারে সন্ধিপুজোর পরে কাপড় সরিয়ে উদ্যোক্তারা দেখেন অসুর গায়েব!

২. রাইটার্সের দারোয়ান কয়েক জনকে চুপি চুপি বিল্ডিং থেকে বেড়িয়ে দৌড়তে দেখেছে, কিন্ত ধাওয়া করার আগেই সব কেমন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

দুটো খবরকেই কেউ পাত্তা দেয়নি যদিও।

কিন্তু তবু খবর তো!

 

 

লেখক ~ অনির্বাণ ঘোষ, অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদচিত্র উৎস ~ https://www.youthkiawaaz.com/2014/09/hands-create-goddesses-dingy-lanes-kolkata/

প্রচ্ছদচিত্র অলঙ্করণ ~ Anari Minds

Leave a Reply