হিস্ট্রির মিস্ট্রি – ১০ ~ আদমের জন্ম

Anirban & Arijit, History, Series, বাংলা

৯ই অক্টোবর, ১৯৯০,

অ্যানডারসন, ইন্ডিয়ানা, ইউ.এস.এ

 

….. আমরা কৃতজ্ঞ যে আপনি আপনার খোঁজটা আমাদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। আপনার আর্টিকেলটা কালকের এডিশনেই বেরোচ্ছে জানেন নিশ্চয়। অনেক অনেক ধন্যবাদ।

 

– ধন্যবাদ আপনাকেও, শুভরাত্রি।

 

ফোনটা নামিয়ে রাখলেন ফ্র‍্যানক মেশবার্জার। সেন্ট জন মেডিকাল সেন্টারের মেডিসিনের ডাক্তার তিনি। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথায় কাঁচা পাকা চুল, মাঝারি চেহারা। বুদ্ধির ঝলক চোখদুটোতে। কিন্তু এখন সেখানে কি একটু চাপা টেনশন ধরা পড়ছে?

 

কলটা এসেছিল কলিন স্মিথের কাছ থেকে, জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশনের চিফ এডিটর। আর্টিকেলটা যে এবারের অক্টোবর এডিশনেই বেরোচ্ছে সেটা ফ্র‍্যানক আগে থেকেই জানতেন। অ্যাসোসিয়েশনের নিয়ম মতো বাড়িতে চিঠি এসেছিল কয়েকদিন আগেই। তবে আজকে ডঃ স্মিথ নিজেই উৎসাহী হয়ে কল করলেন ওকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য। সত্যিই এমন কিছু আগে কখনো বেরোয়নি জার্নালে। আর ফ্র‍্যানকের এই ‘খোঁজ’ টাই ফ্র‍্যানকের চিন্তার একমাত্র কারণ।

 

ডিনার টেবিলে খেতে বসেও খুব একটা কথা আজকে বললেন না ফ্র‍্যানক। নিজের স্ত্রী মেয়ের দিকে তাকাতেও অস্বস্তি হচ্ছে আজকে। তার পরিবার ধর্মভীরু ক্যাথোলিক। প্রতি রবিবার চার্চে দেখা যায় তাদের। সেই পরিবারের একজনের হাত দিয়ে যদি এমন কিছু একটা বেরোয় তাহলে এই সমাজ তাকে ক্ষমা করবে তো?

 

যাই হোক, এই কাজটা ওকে করতেই হত। ধর্ম মানুষকে এক করে ধরে রাখে, কিন্তু বিজ্ঞান তাকে আলো দেয়। সেই আলো অমূল্য। তাকে চেপে রাখাটাও পাপই।

 

সত্যিটা সবার জানা দরকার। একটা সত্যি যেটা খুঁজতে সময় লাগল চারশ বছর!

 

১৪৮৮, সান্তা মারিয়া নোভেলা চার্চ, ফ্লোরেন্স

 

ফ্রেস্কো, দেওয়ালে সদ্য লেপা চুনের প্রলেপের ওপরে রঙ তুলি দিয়ে আঁকার নাম ফ্রেস্কো। ইতালিতে এখন ফ্রেস্কোর খুব রমরমা। প্রায় প্রতিটা চার্চের দেওয়ালই সেজে উঠছে ফ্রেস্কোতে। তাতে ভগবানের জয়গান গাইছেন রেনেসাঁর শিল্পীরা। আর ভক্তিতে অবনত হচ্ছে ভক্তের মাথা।

 

ফ্লোরেন্সের সব চেয়ে বিখ্যাত চার্চগুলোর একটা হল সান্তা মারিয়া। তারই টর্নাবুওনি চ্যাপেলে রঙ করতে ডেকে আনা হয়েছে ফ্লোরেন্সের সেরা ফ্রেস্কো শিল্পীকে। নাম তার দমেনিকো ঘিরল্যান্দেও।

 

দমেনিকোর কাজের জুড়ি মেলা ভার। রোজ রোজ তিনি আবিস্কার করছেন ফ্রেস্কো আঁকার নতুন নতুন পন্থা। তার অ্যাকাদেমিতে ছাত্রও এখন অনেক। গুরুর সাথে থেকেই তারা কাজ শেখে। এই যেমন সান্তা মারিয়াতেও তার সাথে কাজ করছে কয়েকজন ছাত্র। তাদের কাজ মইতে উঠে চুনের প্রলেপ লাগানো, রঙ তৈরি করা, তুলি গুলোকে ভাল করে ধুয়ে রাখা।

 

দমেনিকো কালকে কাজে আসতে পারেননি, শরীরটা ঠিক জুত লাগছিল না। তাই ভাই দাভিদকেই বলে দিয়েছিলেন একটা দিনের মতো সামলে নিতে। দাভিদও দমেনিকোর মতোই প্রতিভাবান। ওর ওপর পুর্ণ আস্থা আছে দমেনিকোর।

 

আজকে চ্যাপেলে ঢুকে বেশ খুশিই হলেন দমেনিকো। দাভিদ বেশ ভালোই কাজ করেছেন একদিনে, জোসেফ আর মেরির বিয়ের যে ফ্রেস্কোটা বানাচ্ছিলেন তার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। খুব ভাল। এবারে ডান দিকের দেওয়ালে কিছু একটা আঁকতে হবে।

টর্নাবুয়োনি চ্যাপেলের ফ্রেস্কো

 

দেওয়ালে রঙ করার জন্য মইয়ে উঠতে যাবেন, এমন সময় নজর গেল মইয়ের নিচে লাগানো কাপড়ের পর্দার দিকে। যাতে রঙ পরে মেঝে না নোংরা হয়ে যায় তাই জন্যই এটা লাগানো থাকে। কিন্তু আজকে সেখানে অন্যকিছু একটা।

 

টাস্কানীর ল্যান্ডস্কেপের একটা স্কেচ। তার ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নারী পুরুষেরা। প্রতেকের দেহ বিভঙ্গ অনন্য,নিখুঁত। এমন স্কেচ তো দমেনিকো নিজেই আঁকেন। তারপরে তা দেখে দেওয়ালে তৈরি করেন ফ্রেস্কোগুলো। কিন্তু এই আঁকাটা কার? নাহ, দাভিদের নয় সেটা বোঝাই যাচ্ছে। তবে?

 

দাভিদকে এই প্রশ্ন করতে সে চোখের ইশারাতে দেখাল চ্যাপেলের এক কোণের দিকটায়। যেখানে একটা বছর তেরোর একরত্তি ছেলে বসে একটা পাথর নিয়ে খুটখাট কিসব করে যাচ্ছে। এদিকে কোন খেয়ালই নেই।

 

ওহ এই ছেলের কাজ এটা, দমেনিকো কিন্তু একটুও অবাক হলেন না। এর কাছে এমনটা প্রত্যাশা করাই যায়। এইতো কদিন আগেই ওর নিজেরই আঁকা একটা স্কেচের ওপরে আবার পেন চালিয়ে সেটাকে আরো নিখুঁত করে এঁকে দেখিয়ে। এই ছেলেই তার একমাত্র ছাত্র যার কাছ থেকে তার এক পয়সা উপার্জন তো হয়ই না, উলটে ওর বাবাকেই বছরে ছয় ফ্লোরিন দিতে হয় দমেনিকোকে। শুধুমাত্র ওকে নিজের কাছে ছাত্র হিসাবে রাখার জন্য। একদিন ওর জন্যই দমেনিকোকে সবাই মনে রাখবে, এটা তার আর বুঝতে বাকি নেই। তার জন্য ওইটুকু মূল্য চোকানোই যায়।

 

কিন্তু মুশকিল হল এই ছোকরার রং-তুলি নিয়ে কোন আগ্রহই নেই। এই যে দমেনিকো জোর করে সান্তা মারিয়াতে এখন নিয়ে এসেছেন ফ্রেস্কোর কাজ শেখানোর জন্য তাতে ওর মনই থাকেনা। নিজের খামখায়েলেই স্কেচটা করে দিয়েই আবার দেখ কেমন বসে গেছে ওই মার্বেলের টুকরোটা নিয়ে।

 

ছেনি বাটালিই ওর তুলি। পাথরই ওর ক্যানভাস। ফ্রেস্কো আঁকা শিখতে বয়েই গেছে মিকেলের।

 

২৬ শে এপ্রিল, ১৫০৬, রোম

 

ইস, কিভাবে সিলিংটাতে চিড় ধরেছে খেয়াল করেছ?

 

বলে মাথার উপরে আঙুল তুলে ব্রামান্তেকে দেখালেন পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস। দুজনেই এখন দাঁড়িয়ে রয়েছেন সিস্টিন চ্যাপেলের ঠিক মাঝখানটাতে।

 

সিস্টিন চ্যাপেলটা তৈরি করেছিলেন পোপ চতুর্থ সিক্সটাস, ১৪৮০ তে। ওর নামেই চ্যাপেলের নাম। ভ্যাটিকানের এই চ্যাপেলের মূল্য অপরিসীম। কার্ডিনালদের সমাবেশ গুলো হয় এখানেই। পোপের নির্বাচনও হয় এই সিস্টিন চ্যাপেলেই।

 

প্রায় চল্লিশ মিটার চওড়া আর চোদ্দ মিটার লম্বা চ্যাপেলটার সিলিং প্রায় তেরো মিটার উঁচুতে। গোটা চ্যাপেলের দেওয়াল জুড়ে ইতালির সেরার সেরা শিল্পীদের কাজের ছাপ। শেষ কুড়ি বছরে বত্তিচেল্লি, পেরুজিনো,কোসিমো, রাফায়েলের মতো মায়েস্ত্রোদের হাতের জাদুতে ভরে উঠেছে চ্যাপেলটা। ইউরোপের আর যেকোন গীর্জাকে হেলায় হার মানাবে এখন।

 

শুধু চ্যাপেলের সিলিংটাই যা একটু ম্যাড়ম্যাড়ে। ওত উঁচুতে ওই দশ হাজার স্কোয়ারফুটের জায়গাতে কে যাবে ছবি আঁকতে? শিল্পী দি’অ্যামেলিয়া তাই খুব সহজ একটা নকশায় ভরে দিয়েছিলেন সিলিংটা। এখন গাড় নীল রঙ সিলিং জুড়ে। আর তার ওপরে সোনালি তারাদের ভীড়।

 

কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তৈরি হবার পঁচিশ বছরের মধ্যেই চিড় ধরল চ্যাপেলের সিলিংয়ে। সেটাই এখন পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াসের চিন্তার কারণ।

 

এই জুলিয়াস কিন্তু আগের পোপেদের থেকে একদম আলাদা। ইনি বেশ আগ্রাসী প্রকৃতির, একটু বদমেজাজীও বটে। ভ্যাটিকানে বসে এনার দিন কাটে না। বছরের বেশির ভাগ সময়টা এনাকে দেখা যায় যুদ্ধ করতে। ইতালিকে ভ্যাটিকানের এক ছাতার তলায় আনাই এনার লক্ষ্য। দেশে সবাই ওঁকে জানে যুদ্ধবাজ পোপ নামেই।

 

ভ্যাটিকানকে ঘিরেই নিয়ন্ত্রিত হবে ইউরোপের খ্রীষ্টধর্ম। তাই ভ্যাটিকানকে বানাতে হবে সবার থেকে আলাদা, সর্বশ্রেষ্ঠ। যাতে বাকি সবাই একবার ভ্যাটিকানে পা দিয়েই তাকিয়ে থাকে অবাক বিষ্ময়ে।

 

সেই কাজটি করতেই পোপ এই শেষ কয়েক বছরে উঠে পরে লেগেছেন। সেন্ট পিটার্সের ব্যাসিলিকাটা তাই তো ভেঙে ফেলে আবার নতুন করে বানানো হচ্ছে। সেই কাজটার জন্যই গতবছর থেকে এখানে আছেন ব্রামান্তে।

 

ব্রামান্তেই এই ব্যাসিলিকার আর্কিটেক্ট। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী তিনি। মিলানের সান্তা মারিয়া দেলা গ্রাজির ব্যাসিলিকাটা তো ওরই বানানো। এবারে মাস দুয়েক হল কাজ শুরু করেছেন সেন্ট পিটার্সের, যেমন নকশা করে পোপকে দেখিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে এই ব্যাসিলিকা একবার তৈরি হলে এর মতো বড় আর সুন্দর প্রাসাদ শুধু ইউরোপ নয়, গোটা বিশ্বেও আর পাওয়া যাবে না।

 

– হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, চিড়টা বেশ নজরে আসছে কিন্তু।

 

-হুম।

 

– চিন্তার কোন কারণ নেই। ওইটার মেরামত আমি করে দেব।

 

– বাহ, আপনি পারবেন? জুলিয়াসের মুখে এবারে যেন একটু হাসি ফুটল।

 

– হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা খুব একটা বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু আমার চিন্তা অন্য জিনিস নিয়ে।

 

– আবার কি?

 

– দেখুন, সিলিংয়ের ফাটল তো জোড়া লেগে যাবে। কিন্তু তারপরের দাগটা? কিরকম বিশ্রী লাগবে ভেবে দেখেছেন একবার?

 

– তাই তো, কি করা যায় তাহলে?

 

– একটা উপায় আছে বটে। যদি ধরুন এই সিলিং জুড়ে ফ্রেস্কো এঁকে দেওয়া যায়?

 

– এতোবড় সিলিংয়ে ফ্রেস্কো? কে করবে? ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি?

 

– ইয়ার্কি নয়। ফ্রেস্কো আঁকার লোক তো আপনার হাতেই মজুত। সে এখন আপনারই কাজ করছে।

 

বলে মুচকি হাসল ব্রামান্তে।

 

এবারে সবটা পরিস্কার হল জুলিয়াসের কাছে।

পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস

 

সেন্ট পিটার্সের ব্যাসিলিকা বানানোর পিছনে যীশুর মহিমা প্রচার করা ছাড়াও আরেকটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল জুলিয়াসের। ব্যাসিলিকার মধ্যেই নিজের সমাধি সৌধটা বানানো। তার জন্য তিনি ডেকে এনেছিলেন ইতালির সেরা স্থপতিকে।

 

বলা বাহুল্য সেই মানুষটি হল মিকেলঅ্যাঞ্জেলো বুয়োনারোত্তি।

 

– আপনার নিজের জীবদ্দশাতেই নিজের সমাধি বানাচ্ছেন, এ কিন্তু চরম অশুভ। আমাদের মহামান্য পোপের আয়ু কবে যাবে যে এতে।

 

– হুম, এরকম করে ভেবে দেখিনি আগে।

 

– আমার কথাটা শুনুন, এই অপয়া কাজটা করা এখুনি বন্ধ করুন। আর মিকেলকে বলুন এই চ্যাপেলের সিলিংটায় ফ্রেস্কো এঁকে দিতে।

 

– মিকেল কি পারবে?

 

সেদিন বিকেলেই মিকেলকে দেখা করতে হল পোপের সাথে, জরুরী তলব।

 

– শুনুন, একটা প্রয়োজনে আপনাকে ডেকে পাঠাতে হল।

 

– বলুন।

 

– আমার সমাধির কাজটা কতোটা এগিয়েছে?

 

– বেশ অনেকটাই, আমি ভেবেছি বারোটা মূর্তি বানাবো, তার একটা হবে মোজেসের, আর বাকিগুলো….

 

– বেশ বেশ, একটা কাজ করুন। আপাতত সমাধি বানানো বন্ধ রাখুন।

 

মিকেল এবারে আকাশ থেকে পড়ল। এই খ্যাপা বুড়োই এতোদিন সমাধি বানাতে হবে বলে মিকেলের পিছনে পড়েছিল। এর জন্যই মিকেল এখন উদয়াস্ত খাটছে। আর এখন বলে কিনা কাজ বন্ধ করে দিতে!

 

– সমাধির কাজ আর করব না এখন? অনেকটা পাথর যে নষ্ট হবে তাহলে…

 

– পাথরের কথা ছাড়ুন। আপনি একটা কাজ করুন তো দেখি, সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিংটা জুড়ে একটা ফ্রেস্কো এঁকে ফেলুন।

 

এবারে ভুত দেখার মতো চমকে উঠল মিকেল। ফ্রেস্কো! সে তো তার দু চক্ষের বিষ। শেষ কবে রঙ তুলি হাতে ধরেছেন তা ভুলেই গেছেন প্রায়। আর তাকে দেওয়া হচ্ছে সিস্টিন চ্যাপেলের ফ্রেস্কো আঁকার কাজ!

 

– আ..আমি পাথরের কাজই ভাল পারি একমাত্র। জীবনে কোনদিন ফ্রেস্কো আঁকিনি বিশ্বাস করুন।

 

– বিশ্বাস করতে পারলাম না একদমই। আপনি বিখ্যাত ফ্রেস্কো আঁকিয়ে। ফ্লোরেন্সে নাকি দারুণ দারুণ ফ্রেস্কো এঁকে এসেছেন। এসব কি মিথ্যা কথা নাকি?

 

– এসব কে বলল আপনাকে?

 

– কে আবার, ব্রামান্তে। আপনার আঁকার অনেক সুখ্যাতি করেছে সে।

 

মিকেলের চোয়ালটা এবারে শক্ত হয়ে গেল। এসবই তাহলে ব্রামান্তের চক্রান্ত!

 

ভ্যাটিকানে মিকেলকে দেখেই ব্রামান্তে প্রমাদ গুনেছিল। যে মানুষটা পাথরের জাদুকর সে পোপের সমাধি বানিয়ে ফেলার পর তা দেখে আপ্লুত হয়ে পোপ যে তাকে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকাটার বাকিটাও বানাতে দিয়ে দেবেন না তার কি নিশ্চয়তা আছে? তাহলে তো ব্রামান্তের চাকরি যাবে! অতএব যেভাবেই হোক মিকেলকে রোম ছাড়া করতেই হবে।

 

মিকেলের অসহায়তা কোথায় সেটা ঠিক জানত ব্রামান্তে। ব্যাটা পাথর পেলে যা খুশি তাই বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু তুলি দেখলেই ওর গায়ে জ্বর আসে। এই কাজটা ও একদমই পারে না। ফ্রেস্কো তো দুরের কথা। গত দশ বছরে বলার মতো মাত্র একটা ছবি ও এঁকেছে। সেটাও বেশ ছোট মাপের। একে যদি এবারে বলা হয় সিস্টিন চ্যাপেলের ওই গোটা সিলিংটাতেই এঁকে ফেলতে তাহলে ব্যাটা নির্ঘাত পালাবে।

 

২৭শে এপ্রিল, ১৫০৬

 

ব্রামান্তের অনুমান সত্যি করে তার পরদিনেই পোপকে না জানিয়েই মিকেল পালালো রোম থেকে। কতটা নিজের অক্ষমতার ওপরে লজ্জিত হয়ে আর কতটা পোপের অবিবেচনার ওপরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে। রাতের অন্ধকারে ঘোড়ার গাড়ী ছুটল ফ্লোরেন্সের উদ্যেশে।

 

হেইও রোক্কে!

 

ভোরের আলো তখন সবে ফুটছে। ফ্লোরেন্স আর ঘন্টা তিনেকের পথ। এমন সময়ই ঘোড়ার খুরের শব্দ পিছন থেকে।

 

মিকেলের রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়াল ছয় ঘোড়সওয়ার। সারা রাত ধরে সওয়ারির করার ক্লান্তি তাদের চোখে মুখে। আর আছে একরাশ বিরক্তি। পরণের বেশ ভুষা দেখলেই বোঝা যায় এরা ভ্যাটিকানেরই সৈন্য। জামার ওপরে লাগানো বড় প্যাপাল ক্রস, এরা সুইস গার্ড। পোপ জুলিয়াসই এদের বানিয়েছেন। পোপের কাছে তাহলে ওর পালানোর খবরটা পৌঁছে গেছে!

 

একজন মুশকো মতন গার্ড মিকেলের দিকে এগিয়ে দিল একটা চিঠি। খোদ পোপের লেখা।

 

মিকেল পোপের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পালিয়ে এসেছে ভ্যাটিকান থেকে। এই মুহূর্তে যেন সে ফিরে আসে, নাহলে তার পরিণাম খুব খারাপ হতে পারে।

 

মিকেল নির্বিকার মুখে চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়ে দেখলেন। তারপরে তার উল্টোপিঠে খসখস করে লিখে দিলেন-

 

মাফ করবেন, আসতে পারলাম না। আমার মনের মতো কোন কাজ থাকলে বলবেন, তখন দেখা যাবে।

 

৮ই জুলাই, ১৫০৬, ফ্লোরেন্স

 

পিয়েরো সোদারিনি এখন খুব মুশকিলে পরেছেন। ফ্লোরেন্সের সিগনোরির মাথা এখন তিনি। এই সিগনোরিরই আশ্রয়ে এখন মিকেল রয়েছেন।

 

এই নিয়ে তিনবার চিঠি পেলেন তিনি। পাঠাচ্ছেন ভ্যাটিকানের পোপ। প্রতিটা চিঠিরই মর্মার্থ একই,

 

মিকেলকে যেন স্বত্বর ভ্যাটিকানে ফেরত পাঠানো হয়।

 

আজকের চিঠিটা আবার একটু কড়া টাইপের। পোপ এবারে বলছেন সোজা আঙুল ঘি না উঠলে তা ব্যাঁকাতেও তিনি রাজি। এর অর্থ ফ্লোরেন্সের জন্য একদমই ভাল নয়।

 

– আজকে আবার পোপ চিঠি পাঠিয়েছে বুঝলেন?

 

– খুব ভাল, তাতে আমার কি?

মিকেলের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই পোপকে নিয়ে।

 

– আপনার আগ্রহ নাই থাকতে পারে কিন্তু ফ্লোরেন্সের ভবিষ্যত নিয়ে আমি চিন্তিত।

 

– ফ্লোরেন্স আবার এর মধ্যে আসছে কি করে?

 

– আজকের চিঠিটার বক্তব্য একদম ভাল ঠেকলো না, পোপ যদি রাগের মাথায় এখন ফ্লোরেন্স আক্রমণ করে বসেন তাহলে সেটা ঠেকাবার মতো ক্ষমতা সিগনোরির নেই।

 

– তাহলে আমাকে কি করতে বলছেন?

 

– আপনি দয়া করে রোমে ফিরে যান আপাতত। কয়েক বছর কাটিয়ে পোপকে খুশি করে না হয় ফিরে আসবেন।

 

– আপনার কি মতিভ্রম হল পিয়েরো?! ওই পাগল পোপ আমাকে একবার পেলে খুনও করে ফেলতে পারেন।

 

– না, সেই চিন্তা নেই। আমরা আপনাকে ফ্লোরেন্সের দূত করে পাঠাব। দূতের ওপরে আঘাত হানা মানে রাজ্যকেই অপমান করা। পোপ আপনার গায়ে আঁচড়ও কাটতে পারবেন না।

 

১৬ই মার্চ, ১৫০৮, রোম

 

মিকেল এখন দাঁড়িয়ে আছে সিস্টিন চ্যাপেলে। তার চোখ আটকে রয়েছে নীলচে সিলিংয়ে। এর জন্যই তাকে শেষ দুটো বছর এতো কষ্ট পেতে হল।

 

১৫০৬ এর নভেম্বরেই মিকেল বোলোনা শহরে যেতে হয়, কারণ পোপ তখন সেখানে। তার নিজের শহর ফ্লোরেন্স তাকে রক্ষা করার সাহস দেখাতে পারেনি। পোপের সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া ছাড়া ওর কোন গতি ছিল না। সেই দিনটার কথা ভাবলে এখনও ওর চোখ জ্বালা করে।

 

সেই দিন পোপ ওকে যে কাজটা করতে দেন সেটাকে শাস্তিই বলা চলে। মিকেল স্থাপত্য ভালবাসেন, তাই জুলিয়াস তাকে তার নিজের একটা বিশাল মূর্তি বানাতে বলেন। কিন্তু পাথর দিয়ে নয়, ব্রোঞ্জের। ব্রোঞ্জ, যার ব্যবহার ইতালির প্রায় কেউই ভাল জানেনা।

 

মিকেলের বুঝতে বাকি ছিলনা যে পোপ তাকে শায়েস্তা করতেই এই ফন্দিটা এঁটেছেন। যাই হোক, অনেক কষ্টে মিকেল একবছর ধরে বানিয়েছে মূর্তিটা। আর বানাতে বানাতে প্রতিটা মুহূর্তে ভেবেছে একটাই কথা, এই সব কিছুর কারণ একটাই, সিস্টিন চ্যাপেলের ওই সিলিংটা। মিকেলের গর্বের ওপরে যেন একটা কালির ছিটে ফেলে দিয়েছে ওটা। তাই আজকে কাউকে কিছু না বলে  চ্যাপেলে এসেছে ও। দেখা করতে নিজের নেমেসিসের সাথে।

 

প্রায় ঘন্টাখানেক ফাঁকা গীর্জাটাতে বসেছিল মিকেল। তারপরে ধীর পায়ে বেড়িয়ে এসেছিল। তাকে এখন একবার পোপের সাথে দেখা করতে হবে।

 

– আসুন মিকেল, কি ব্যাপার?

 

– আমার ফেলে রাখা কাজটা শেষ করতে চাই এবারে।

 

– আপনাকে তো বলেইছিলাম আমার সৌধটা বানানোর কোন দরকার নেই।

 

জুলিয়াসের কথাটা যেন কানেই গেল না মিকেলের,

– সিস্টিন চ্যাপেলের ফ্রেস্কোটা আমি এবারে আঁকতে চাই।

 

বলে কি এই ছেলে! এর জন্যই রাতারাতি রোম ছেড়ে পালিয়েছিল। দুবছর ধরে গোঁ ধরে বসেছিল। আজকে হটাৎ করে কি হয়ে গেল!

 

নিজের বিষ্ময়টাকে চেপে রেখে বললেন এবারে জুলিয়াস,

 

– কি আঁকবেন ভেবেছেন কিছু?

 

– আপনার কি ইচ্ছা?

 

– মিকেল আমি ভাবছিলাম যদি যীশুর বারোজন..

 

– ব্যাস? মাত্র বারো? আমি তো আরো বড়সড় কিছু ভেবে রেখেছি।

 

– তাই নাকি? তবে দেখবেন, কোন কিছু যেন বাইবেলের বাইরে না হয়।

 

– হুম, আমি আরো একমাস সময় নেব, তারপরে কাজ শুরু করব।

 

পরের একটা মাস মিকেল নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখলেন। জীবনের কঠিনতম যুদ্ধ শুরুর আগের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত তখন সে। অস্ত্র নিজের অ্যানাটমির খাতাগুলো আর কুড়িবছর আগের সান্তা মারিয়া নোভেলায় কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি।

 

১০ই মে, ১৫০৮, রোম

 

সিস্টিন চ্যাপেলকে এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য। এখন সেখানে প্রবেশের অধিকার মিকেল বাদ দিয়ে হাতে গোনা আর কয়েকজনের। চ্যাপেলের দরজার দিক থেকে কাজ শুরু করবে বলে ভেবেছেন মিকেল। সেই মতো কাঠের মই বানানো হয়েছে। তার ওপরে উঠেই আঁকা শুরু হল মিকেলের। এতোদিনের শিক্ষা আর স্মৃতির সবটুকু উজাড় করে দিতে লাগলেন তিনি।

 

অন্য ফ্রেস্কো শিল্পীরা দেওয়ালে যে ছবি আঁকা হবে তার সমান মাপের কাগজের ওপরে আগে এঁকে নেন। তারপরে সেই কাগজ দেওয়ালে লাগিয়ে তার অবয়ব তুলে নেন দেওয়ালে। তারপরে চলে রঙ চাপানোর কাজ। কিন্তু মিকেল করলেন অন্যরকম কিছু। স্কেচগুলো নিজের ছোট খাতাতেই করে রেখেছিলেন। সেগুলো দেখেই একেবারে সিলিংয়ের ওপরেই আঁকতে লাগলেন। মাঝে মাঝে নিচে নেমে এসে দেখেন মাপ ঠিক আছে কিনা। সাধারনত ফ্রেস্কো শিল্পীদের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে আঁকার কৌশলও

তার অজানা। তাই ওই কাঠের মইয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই রঙ তুলির কাজ চালাতে লাগলেন।

 

অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে কাজ করতে করতে পিঠে ব্যথা হয়ে যায়। তাও তো কাজের অন্ত নেই। একদিন সন্ধ্যেতে কাজ সেরে ঘরে ফিরে নিজেই নিজের ওপরে মজা করে লিখে ফেললেন একটা ছড়া , আর তার সাথে আঁকলেন নিজেরই ব্যাঁকা টেরা ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার একটা ছবি।

 

করতে গিয়ে দেওয়াল জুড়ে হরেক রকম রঙ,
ঘাড়ের ব্যথায় হচ্ছি কাবু,যাত্রাপালার সঙ,
উর্ধ্বপানে তাকিয়ে দেখি আকাশছোঁয়া ভুড়ি
দাঁড়ি’ও দেখি গগন চুমে, ভীষণ তাড়াতাড়ি।


লম্বা খাড়া শিরদাঁড়াতে, হাড়ের নকশা কাজ
রঙ তুলির এই মন্তাজে আর মন লাগে না আজ
তুলির রঙেই মুখটা হল আজব একটা আর্ট
ক্লান্ত পিঠ চাইছে এখন ঘুমিয়ে পড়ার খাট।


পিঠের এখন কাজ বেশী খুব,ওজন ওর’ই ঘাড়ে
পা দুটো বেশ কাটায় ছুটি,দিব্য ফাঁকি মেরে
এদিক ঝুঁকি,ওদিক বেঁকি,রঙ’ই করি আমি
দেহের আকার ফাঁসির মতো,হাসেন অর্ন্তযামী।

 

মিকেলের আঁকা নিজের কার্টুন

পয়লা নভেম্বর, ১৫১২, রোম

 

আজকের দিনটা খুব পবিত্র। আজ অল সেন্টস ডে। ক্যাথোলিক চার্চের সব সন্তদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করার দিন আজ। আর আজকের এই দিনেই সিস্টিন চ্যাপেলের দরজা খুলে গেল রোমের সাধারণ মানুষের জন্য।

 

চার বছর পর।

 

এই চার বছর সিস্টিন চ্যাপেল ছিল মিকেলের একার। শুধু তার। সে একাই গোটা সিলিংটায় ফ্রেস্কো এঁকে ফেলেছে। কারোর সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি তার।

 

ভোররাত থেকেই চ্যাপেলের দরজার বাইরে সবাই অপেক্ষা করছিল। চ্যাপেল খোলার সাথে সাথেই সেই স্রোত ভাসিয়ে দিল চ্যাপেলের মেঝে। তারপরেই কোন এক জাদুবলে তা শান্ত হয়ে গেল। একটুকুও ঢেউ নেই আর তাতে।

 

সবার দৃষ্টি মাথার ওপরে। স্বয়ং ঈশ্বর যেন আজকে ধরা দিয়েছেন!

 

ঈশ্বরের পৃথিবী সৃষ্টি, মানুষের জন্ম, তার পদস্খলন, তার ঈশ্বরের থেকে দূরে চলে যাওয়া আর সব শেষে সেই আগ্রাসী বন্যা, এই গল্প গুলোই ছড়িয়ে আছে সিলিং জুড়ে। কিন্তু এমন ফ্রেস্কো তো আগে কখনও কেউ দেখেনি? একে কি ফ্রেস্কো বলা চলে? উজ্জ্বল রঙের ব্যাবহার চারিদিকে। তুলির নিখুঁত টানে তৈরি হয়েছে মানব শরীর। একটা দুটো নয়, তিনশো তেতাল্লিশটা ! সেই শিল্প এতো সুন্দর আর এতো জটিল গোটা সিলিংটা ভাল করে দেখতেই হয়ত লাগবে কয়েক সপ্তাহ। এক জন শিল্পী একা এমন কাজ করলেন কিভাবে! কোন শক্তিতে হল এমন অসাধ্য সাধন?

এমন চিন্তা পোপের মনেও হচ্ছিল। প্রার্থনা কক্ষের পোডিয়াম থেকে তিনি তাকিয়ে ছিলেন সিলিংয়ের দিকে। চোখ সরছিল না। কখন যে মিকেল পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করেননি।

 

– এবারে আপনি খুশি তো?

 

মিকেলকে দেখেই আজকে জড়িয়ে ধরলেন জুলিয়াস। তার চোখে জল।

 

-আপনাকে এই ফ্রেস্কো আঁকতে ঈশ্বর নিজেই সাহায্য করেছেন, আমি নিশ্চিত।

 

মিকেলঅ্যাঞ্জেলো তখন হাসছেন, সেই হাসিতে অনেকটা স্বস্তি আর খুঁজে পাওয়া আত্মবিশ্বাস লুকিয়ে আছে যেন। তার ঈশ্বর তার মধ্যেই আছেন। এ নিয়ে কোন দ্বিধা দ্বন্দ নেই মিকেলের মনে।

 

– আচ্ছা ওই ছবিটাতে কি এঁকেছেন বলুন তো?

সিলিংয়ে সব মিলিয়ে ন’টা আলাদা আলাদা গল্পের ফ্রেস্কো আঁকা।পোপ এবারে আঙুল তুলে দেখালেন সিলিংয়ের মাঝখান বরাবর।

 

– কোনটা?

 

– ওই যে, যেটাতে একজন বুড়ো মানুষ হাত বাড়িয়ে রয়েছেন, আর তার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে এক নগ্ন যুবক।

 

– ওহ, ওইটায় তো ভগবান আদমের শরীরে প্রাণ দিচ্ছেন।

 

– ওই দাড়িওয়ালা মানুষ তাহলে ভগবান? আর ওই এলিয়ে পরা যুবক আদম? এমন ভাবে আঁকলেন কেন? বোঝা যাচ্ছে ঠিক?

 

– যে একটু মন দিয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টটা পড়েছেন সেই বুঝতে পারবেন। জেনেসিসের প্রথম অধ্যায়ের সাতাশ নম্বর ছত্রটি মনে করুন,

 

ঈশ্বর তার নিজের প্রতিবিম্বে সৃষ্টি করলেন মানুষ।

 

তাই খেয়াল করুন আদম আর ঈশ্বর একে ওপরের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে, প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে প্রথম পুরুষের মধ্যে।

 

– বাহ! কি অসামান্য আপনার চিন্তাধারা! প্রভুর এই মহিমা যুগ যুগ ধরে আলোকিত করবে এই পৃথিবীকে। সবাই এখানে এসে গাইবে পরম পিতার জয়গান!

 

বলেই আবেগে আপ্লুত জুলিয়াস আরেকবার মিকেলকে জড়িয়ে ধরলেন।

 

মিকেল তখন মনে মনে হাসছেন,

 

বুড়োটাকে বেশ বোকা বানানো গেছে!

 

এপ্রিল, ১৯৯০, সিস্টিন চ্যাপেল।

 

‘ ঈশ্বর নিজের প্রতিবিম্বে সৃষ্টি করলেন মানুষ..’

 

নিজের মনেই কথা গুলো বললেন ফ্র‍্যানক মেশবার্জার। সপরিবারে ইতালি বেড়াতে এসেছেন ডাক্তারবাবু। আর এখন দাঁড়িয়ে রয়েছেন সিস্টিন চ্যাপেলে। গোটা চ্যাপেলই ভরে আছে টুরিস্টে। কিন্তু কারোর নজর দুপাশের দেওয়ালের বত্তিচেলি, রাফায়েলের অসামান্য কীর্তির দিকে নেই। সবাইয়ের নজর সিলিংয়ে। রেনেসাঁর সেরা ফ্রেস্কোটা সেখানে এঁকে রেখেছেন একজন বছর পয়ত্রিশের যুবক। চারশ বছর আগে।

 

ঘরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভীড় কিন্তু মাঝখানটাতে। সেখানে ফ্র‍্যানকও রয়েছেন। সেই ভীড়ের বাকিদের মতোই তারও চোখ আটকে আছে প্রথম থেকে চার নম্বর ফ্রেস্কোর দিকে,

 

আদমের জন্ম, ঈশ্বর নিজের প্রতিবিম্বে..

 

ছবির একেবারে বাঁদিকে আধশোয়া হয়ে আছে আদম। সম্পূর্ন নগ্ন সে, বাঁ হাত বাড়ানো সামনের দিকে। ছবির ডানদিকে সাদা জামা পড়ে ভগবান। মধ্যবয়স্ক, সাদা দাড়ি। পরম আগ্রহে নিজের ডানহাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আদমের দিকে। তর্জনী সামনের দিকে বাড়ানো। এই স্পর্শেই প্রাণ আসবে আদমের শরীরে.. কিন্তু একি?! ঠিক দেখছেন তো ফ্র‍্যানক? নাকি চোখের ভূল। মাটি থেকে এত ওপরে থাকে ছবিটার জন্য এমনটা লাগছে না তো?

 

চ্যাপেলের মধ্যে ছবি তোলা মানা। তাই ভ্যাটিকানের শোরুম থেকে এই ফ্রেস্কোরই একটা বড় পোস্টার কিনে নিলেন। রাতে হোটেলে ফিরেই পোস্টারটা বিছানাতে ফেলে আবার ভাল করে দেখলেন। নাহ, তার অনুমানই সঠিক।

 

ইতালির বাকি দিন গুলো অন্যমনস্ক ভাবেই কেটে গেল ফ্র‍্যানকের। মনে একটাই চিন্তা তখন, কবে আমেরিকাতে ফিরবেন।

 

দেশে নিজের বাড়িতে ফিরেই কাজে লেগে গেলেন ফ্র‍্যানক। ছবিটা খুঁটিয়ে দেখা শুরু হল, পাশে রাখা নেটারের নিউরো অ্যানাটমির বই।

 

জেনেসিসে লেখা আছে ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মিকেল অ্যাঞ্জেলোর ঈশ্বর তো ওই জন্যই আদমের দিকে হাত বাড়িয়ে আছেন। কিন্তু আদমের চোখ যে খোলা! সেও হাত বাড়িয়ে আছে ভগবানের দিকে। অর্থাৎ তার দেহে প্রাণ এসে গেছে আগেই। তবে ভগবান কিসের জন্য হাত বাড়িয়ে রয়েছেন? কি দিচ্ছেন আদমকে? মিকেল এতো বড় ভুলটা করলেন কি ভাবে!

 

আচ্ছা, ভগবানের পিছনে ওই লাল ডিম্বাকার বস্তুটা কি? একঝলক দেখলে কাপড় বলে মনে হয়। কিন্তু তার ভাঁজ গুলো কেমন অদ্ভুত না?

 

মানুষের মাথাকে যদি দুই চোখের মাঝ বরাবর কেটে ফেলা হয়, তারপরে যদি একটা অর্ধকে ভিতর থেকে দেখা হয় তবে মস্তিষ্কটাকে ঠিক এই লাল জিনিসটার মতোই দেখতে লাগবে। এমন একটা মস্তিষ্কের ছবি ট্রেসিং পেপারে এঁকে তা মিকেলের ছবির লাল অংশটার ওপরে রাখলেন এবারে ফ্র‍্যানক।

 

নাহ, কোন ভুল হয়নি। হুবহু এক। কাপড়ের ভাঁজ মিলে যাচ্ছে মস্তিষ্কের সালকাস বা ভাঁজের সাথে, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সামনের ফ্রন্টাল লোব, তার নিচে টেম্পোরাল, পিছনের কোঁচকানো অংশটা সেরিবেলাম। ঈশ্বরের পা যেখানে বেড়িয়েছে সেটা ব্রেনস্টেম, যা থেকে সুষুম্নাকান্ডের শুরু হয়। মিকেল তাহলে কোন ভুল করেননি!

মানুষের শরীরের রহস্য মিকেলের কাছে ধরা দিয়েছিল। তাই সুকৌশলে ছবির মধ্যে মানব মস্তিষ্ককে লুকিয়ে রাখতে খুব বেশি খাটতে হয়নি তাকে।

 

ঈশ্বর আর আদমের আঙুলের মধ্যের সাইন্যাপ্স দিয়ে যা প্রবাহিত হচ্ছে তা প্রাণ নয়, বুদ্ধি। যা মানুষকে বাকি প্রানীদের থেকে আলাদা করেছে। আর সেই বুদ্ধি জমা হয়ে আছে মস্তিষ্কে। খুলির মধ্যে বসে থাকা এই বস্তুটিই মানুষের ঈশ্বর। যা তাকে ভাবায়, হাসায়, কাঁদায়, চালনা করে।

 

১৯৯০ সালের ১০ই অক্টোবর জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে ফ্র‍্যানক মেশবার্জারের প্রবন্ধটি বেরোয়। তার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রবন্ধের কথা ছাপা হয় আমেরিকার তাবড় তাবড় সংবাদপত্রে। দেশের ক্যাথোলিক চার্চ গুলোতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তারপরেও ২০০৫ এ আর ২০১৫ তে আরো দুটো রিসার্চ পেপার লেখা হয়েছে সিস্টিন চ্যাপেলের এই সিলিং নিয়ে। অনেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ভ্যাটিকানে চিঠিও লিখেছেন এর সত্যতা জানতে চেয়ে।

 

কিন্তু ভ্যাটিকান আজও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। কোন উত্তর তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

 

ঠিক যেমন তাদের কাছে কোন উত্তর নেই ওই সিস্টিন চ্যাপেলেরই দেওয়াল জুড়ে আঁকা আরেকটা ফ্রেস্কোর রহস্যের।

 

সেও মিকেলঅ্যাঞ্জেলোরই কাজ, সেই গল্প অন্য আরেকদিন হবে না হয়।

 

 

লেখক ~ অনির্বাণ ঘোষ

প্রচ্ছদচিত্র উৎস ~ http://www.independent.co.uk

প্রচ্ছদচিত্র অলঙ্করণ ~ Anari Minds

 

Leave a Reply