এ ফর অ্যাপেল

Anirban & Arijit, Childhood, Short Story, বাংলা

“বিট্টুউউউউ, এদিকে আয় বলছি তাড়াতাড়ি! ব্যাগ কোথায় তোর? বই গুলো আবার বের করে রেখেছিস? হারি আপ, বাস মিস করবি কিন্তু আজকে।”

থুতনি ধরে বিট্টুর মুখটা একটু ডানদিকে একটু বাঁদিকে বেঁকিয়ে আর একবার ভালো করে চেক করে নিল সুচেতা, চুল টা ঠিকঠাকই আঁচড়ানো হয়েছে। সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট আর বুকপকেটে লাগানো স্কুল ব্যাজ – বড়ো নামকরা স্কুলের ইউনিফর্ম টাই আসল পরিচয়।

||

মেনগেট প্রতিদিন সকাল ৮ টা নাগাদ খুলে যায়। তবে আজ ক্লাস থ্রির সময় বরাদ্দ হয়েছে ৯ টায়। গেট খুলতেই লাইন দিয়ে বাচ্চারা ঢুকতে শুরু করল একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে।

আজ যে চিলড্রেন’স ডে!

মাঠের ঠিক মাঝখানেই ছোট্ট স্টেজ এর সামনে দুপাশে দুই বন্ধুর হাত ধরে দাঁড়াল বিট্টু। কচিকাঁচা দের হট্টগোলে সারা মাঠ যেন আজ নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা।

প্রিন্সিপ্যাল স্টেজে উঠে হাত তুলতেই মাঠ জুড়ে যেন হাজার বেলুন একসাথে ফুসস হয়ে গেল। কচি কচি বাচ্চা গুলোও কেমন টিচার দের ভয় পেতে শিখে যায়।

একটা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম। কটা ক্ষুদ্র কানে সেই কথা ঢুকল সেই হিসেব থাক। আকাশ বাতাস ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সবাইকে হাততালি দিতে দেখে বিট্টুও শুরু করে দিল। করতালির রেষ একটু কমতেই মাইকে শোনা গেল আর এক ম্যাডামের গলা, “কেউ তাড়াহুড়ো করবে না, সবাই লাইন দিয়ে দিয়ে আসবে, আর ম্যাডাম যা দেবে তা নিয়ে নেবে, থ্যাঙ্ক ইউ বলতে হবে কিন্তু।”

পুঁচকে দের লাইন মেনটেন করা যে কি চাপ, তা টিচার দের থেকে ভালো আর কেউ বোঝে না। বিট্টুর সামনে দাঁড়িয়ে সৌভিক সামন্ত, চোখে একটা নিজের থেকেও বড়ো পেল্লাই সাইজের চশমা। “দাসত্ব শৃঙ্খল কে পড়িবে পায়” – এই ভেবে সৌভিক মশাই লাইন থেকে বেড়িয়ে গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় চলে গেলেন ভগবান জানে। কয়েক মিনিট বাদে ম্যাডাম ধরে এনে আবার লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। বিট্টু কিন্তু সবার কথা শোনে, একটু ঘাড় তুলে শুধু দেখার চেষ্টা করল সামনে কি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না।

অবশেষে টার্ন এলো। ম্যাডাম বিট্টুর হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা লাল রঙের গার্ডার দিয়ে মোড়া মিষ্টির বাক্স আর…

… একটা আপেল।

||

খাওয়ার সময় গোপনীয়তা রক্ষা করা বিট্টুর কাছে মাস্ট। বন্ধুদের সাথে টিফিন শেয়ার করে খাওয়ার ছেলে বিট্টু নয়। একটা ফাঁকা নির্জন জায়গা খুঁজতে লাগল, যাতে খাওয়ার সময় অন্য বন্ধুরা কেউ দেখতে না পায়।

স্কুল বিল্ডিং এর দোতলায় ব্যালকনি টা আদর্শ জায়গা। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে ওপরে উঠে এলো বিট্টু। ক্লাস ফোর এর রুমের উল্টোদিকেই এই বারান্দা, রাস্তার ঠিক ধারেই।

চারিদিকে একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে মিষ্টির বাক্স আর আপেল টা বারান্দার পাঁচিলের ওপর রাখল। বন্ধু রা মোটামুটি মাঠে বা একতলার ক্লাসরুমেই খেলতে ব্যস্ত।

আপেল খানা জুত করে ধরে একখানা বড় কামড় বসাতে গিয়েই চোখ পড়ল রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথে। ছেলেটা বিট্টুরই বয়সী হবে, একদৃষ্টে তাকিয়ে বিট্টুর হাতে ধরা আপেলটার দিকে। পরনের জামা টা নিজের বাবা বা কাকার হবে হয়তো, তাও আবার ছেঁড়া ফাটা তাপ্পি দেওয়া, আর সাথে কোনরকমে কোমরে ঝুলে আছে কালো প্যান্ট। তবে আশ্চর্য রকমের নীল কটা চোখদুটো স্থির হয়ে আছে উল্টোদিকের স্কুলবাড়ির বারান্দায় দাঁড়ানো বিট্টুর হাতের আপেল আর মিষ্টির বাক্সের দিকে।

নজর পড়তেই পাঁচিল থেকে একটু ভেতরের দিকে বাক্স আর আপেল টা সরিয়ে নিল বিট্টু। মা বলেছে খাবারে কেউ নজর দিলে পরের দিন পেট খারাপ করে। আপেল খেতে খেতে আবার একবার রাস্তার ছেলে টার দিকে তাকালো, হাত বাড়িয়ে কিছু একটা ইশারা করছে যেন। বিট্টু আরও তাড়াতাড়ি কামড়ে কামড়ে আপেল খানা শেষ করে মিষ্টির বাক্স টাও খুলে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি খেতে লাগল।

গোগ্রাসে সব খাওয়া শেষ করে রাস্তার দিকে তাকাতেই আবার চোখ পড়ল লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকা বাচ্চা টার দিকে। মুখ ঘুরিয়ে নিল বিট্টু।

||

ডিং ডং, ডিং ডং! ডিং ডং, ডিং ডং!

– “আসছি! আসছি!”

সুচেতা দরজা খুলল হাঁপাতে হাঁপাতে, কিন্তু একি, কেউ তো নেই দরজায়!

– “কে?”

– “মাম্মা, আমি এসে গেছি!”

আওয়াজ এলো পাঁচিলের পেছন থেকে।

– “বিট্টু, এটা কি লুকোচুরি খেলার সময়? এদিকে আয় জলদি। বলবি না আজ স্কুলে কি হল?’

পাঁচিলের পাশ থেকে উঁকি মেরে তারপর ছুট্টে এসে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল বিট্টু।

– “বিট্টুউউউউ, এসব কি!! কি করেছিস তুই! বল শিগগিরি! কার জামা এটা?”

বিট্টুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল, ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।

||

পরের ব্যাচের বাচ্চা রা ঢুকতে শুরু করেছে লাইন দিয়ে। মেন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বৈশাখী ম্যাডাম দেখে নিচ্ছেন স্টুডেন্ট দের। লাইনের একদম শেষ বাচ্চা টা কে হাত দেখিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। ঝুঁকে পরীক্ষা করলেন সাদা শার্ট নীল প্যান্ট আর বুকপকেটে আটকানো ব্যাজ টা কে। ইশারা করলেন ভেতরে ঢুকে যেতে।

স্টেজের সামনে ক্লাস ফোর এর গোটা লাইন শেষ হয়ে যেতেই হাত নেড়ে ম্যাডাম ডাকলেন মাঠের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা টা কে। খুব ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল সে।

“হ্যাপি চিলড্রেন্স ডে মাই বয়, ইউ হ্যাভ বিউটিফুল ব্লু আইস,” এগিয়ে এসে ওর গাল টিপে বললেন ম্যাডাম আর ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন হরেক রকমের মিষ্টি সাজানো একটা লাল বাক্স আর…

… একটা আপেল!

 

 

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদচিত্র অলঙ্করণ ~ Anari Minds

Leave a Reply