ভূত আমার পূত – গল্প ২ ~ ফরাসী হোটেল

Anirban & Arijit, Humor, Series, Short Story, Supernatural, বাংলা

(আমার সত্যিকারের ভয় পাওয়া অবলম্বনে)

 

আগের ঘটনা তে অনেকেই বললেন যে খুব একটা ভয় লাগেনি। ওর থেকেও বেশি ভয় লাগলে ঘটনাটা লেখার অবস্থাতেই থাকতুম না যে আর। গল্পের প্রয়োজনে একটুও বানিয়ে লিখিনি বিশ্বাস করুন, ঠিক যা ঘটেছিল তাই তুলে ধরেছিলাম। এবারেও তাই করব, তবে এই ঘটনার পরে আমার ভয় পাওয়ার লেভেল টা সত্যিই অনেক বেড়ে গিয়েছিল। দেখুন আপনাদের কেমন লাগে। বিদেশী ভূতুরে অভিজ্ঞতা তো, তাই বিদেশী কথোপকথন কিছু আছে, সেগুলোকে বাংলা তেই অনুবাদ রাখলাম, বুঝে নেবেন।

২০১০ সালের নভেম্বর মাস। ফ্রান্সের মার্সেই তে আমাকে যেতে হয়েছিল এক মাসের জন্য, অবশ্যই অফিসের কাজে। একটা সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট বুক করেছিলাম গোটা মাসের জন্যেই।

ফ্লাইট দেরি হওয়াতে রাত ৯ টা নাগাদ নামলাম মার্সেই এয়ারপোর্টে। ট্যাক্সি ধরে রওনা দিলাম কাস্তেলান বলে একটা জায়গার উদ্দেশ্যে, সেখানেই আমার হোটেল বুক্ড। সাথে আমার এক কলিগও ছিল, একই হোটেলে তারও বুকিং। কলিগটি মহিলা না হলে একসাথেই ঘর বুক করতে পারতুম, কারণ আমি জন্ম থেকেই ভীতু! আর কলিগ টা পুরুষ হলে আমার নামে এত কেচ্ছাকাহিনী রটতো না। যা রটে তার কিছুই ঘটে না বলে দিলুম, গল্পে মন দিন।

যাজ্ঞে, হোটেলে পৌঁছে পুরো পেমেন্ট করে দিয়ে রিসেপশান থেকে দুজনেই রুমের চাবি কালেক্ট করে নিলাম। এখানে হোটেলে চেক ইনের সময়তেই পুরো পে করে দেওয়া নিয়ম। আমাদের দুজনেরই রুম ৮ তলায়। আমার রুমের থেকে আর ১০ টা রুম পরেই কলিগের রুম, একই লম্বা করিডর ধরে।

ঢুকে পড়লাম চাবি খুলে। অন্ধকার ঘরের ভেতর দেওয়ালে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় চাবি গুঁজে দিলে রুমের আলো জ্বলে। এই সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট গুলোর সুবিধা হল যে এখানে কিচেনও পাওয়া যায়। রুমের দরজার সামনেই কিচেন, পাশে দুখানা বাথরুম, একটা চানের, একটা প্রকৃতির ডাকের। আর সামনেই দুখানা বিশাল ঘর পাশাপাশি। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার রাস্তা হয় এই কিচেন দিয়ে, নয়তো উল্টোদিকের একটা পুঁচকে ব্যালকনি দিয়ে।

বাঁদিকের রুমে নরম গদির একখানা বিছানা পাতা। ডানদিকের রুমে একটা সোফা। এই হল আমার আগামী একমাসের থাকার জায়গার বর্ণনা। এগুলো ফলাও করে বলার কারণ আছে বইকি, পরে বুঝবেন।

||

মোটামুটি ২-৩ দিন লাগল ঘরদোর অফিস কাছারি একটু গুছিয়ে নিয়ে সেটল হতে। জীবনে কোনদিন রান্না করিনি আগে, তাই হাত মারতে শুরু করলাম ভাত, আলুসেদ্ধ আর ডিমভাজায়। ওদিকে আমার কলিগ টি রীতিমতো তেল নুন আদা কাঁচকলা নিয়ে ফুল ফর্মে। ওর রুমের দরজা খুললেই (মন টা শুদ্ধ রাখুন, আমিও রাখছিলাম) করিডর টা পুরো তেল মশলার গন্ধে ভরে যেত।

তা ভালোই চলছিল বেশ। একদিন মেট্রো করে অফিস যাওয়ার সময় দেখি কলিগের মুখ বেশ নার্ভাস। কথা বলছে না কিছু, জিজ্ঞেস করলেও জবাব দিল না কোনও। লাঞ্চের সময় আমাকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল।

– তুমি “13B” সিনেমাটা দেখেছ? বা জন কুস্যাকের “1408”?

ভূতের সিনেমা আমি অ্যাভয়েড করি, কিন্তু বন্ধুদের কৃপায় এই দুটোই দেখা ছিল। তবে হঠাৎ এই প্রশ্নের কারণ জানতে চেয়ে যা উত্তর পেলাম, তাতে হাসব না কাঁদব ঠিক করে উঠতে পারলাম না।

কলিগের গতকাল সারা রাত ঘুম হয়নি। আলো নিভিয়ে শুতে যাওয়ার পর ওর নাকি হঠাৎ মাথায় এসেছিল এই দুটো সিনেমার কথা। হোটেলের রুম নাম্বার বা ডিজিট গুলোর যোগফল ১৩ হলে সেই রুম অশুভ হয়। ওর রুমের নাম্বার ৮১৩, যার ডিজিট যোগ করলে দাঁড়ায় ১২, কিন্তু তাতেও ওর ভয় যে ওর রুমের নাম্বারের মধ্যেই ১৩ সংখ্যা বর্তমান, এবং আরও একধাপ এগিয়ে ওনার যুক্তি যে অশুভ ৮১৪ নাম্বার রুমের পাশেই ওর রুম, তাই কোন পৈশাচিক কান্ডের অভিজ্ঞতা কলিগেরও হতে পারে।

ভয় আমি পাই, তবে এতো আকাট লেভেলের নয়। যদিও এটা ফ্যাক্ট যে হাইরাইস বিল্ডিং-এ আপনি খেয়াল করলে দেখবেন যে ১৩ তলা বলে কিছু থাকে না, ১২ তলার পরেই ১৪ তলা থাকে, আসলে ১৩ নম্বর তলা কে ১৪ দিয়ে রিপ্লেস করে দেওয়া হয় পাতি কুসংস্কারের জন্য। লিফ্টেও এই জিনিস টা দেখতে পাবেন, আমার IT অফিসেই আছে।

কলিগকে ভালো করে বুঝিয়ে শান্ত করলাম যে হোটেলের পাশেই চার্চ, তাই ভূত এখানে থাকবে না। তবে সন্ধ্যেবেলা সেই চার্চের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিজেরই গা ছমছম করতে লাগল। পেল্লাই একখানা চার্চ, কিন্তু বহুকাল থেকেই বন্ধ, দরজায় বিশাল লোহার শেকল।

যাই হোক, হোটেলে ফিরে এলাম। ভূতের গল্প বলা বা শোনার সময় দেখবেন তেমন ভয় লাগে না, মজা হয়, কিন্তু কেস টা পরে খাই আমি, ঘরে একা থাকলে। রান্না করে খাবার টা নিয়ে সোফা তে বসলাম টিভি চালিয়ে দিয়ে। এই দেশের রুমলাইট বড্ড কম জোরালো, হলদে মিটমিটে আলো সব বাড়িতে। চাইলেও হাই পাওয়ারের সাদা লাইট সহজে খুঁজে পাবেন না।

খেতে খেতে কখন যে রাত ১১ টা বেজে গেছে, খেয়ালই করিনি। সোফা টার গঠন দেখে একটু সন্দেহ হল। দুপাশে দুটো হাতল। একটা কে ধরে টানতেই পুরো ট্রান্সফরমার সিনেমার মতো গদি টা উঠে এল। তারপর বেশ কিছু হাতল অ্যাডজাস্ট করে স্ক্রু লাগিয়ে পায়া ঠেলে মুহূর্তের মধ্যে ছোট্ট সোফা টা কে বিশাল খাট বানিয়ে ফেললাম। বেডশিট একটা আনাই ছিল, পেতে দিলাম সেটা। মস্তি তে এটার ওপরেই কাল ল্যাপটপ নিয়ে বসা যাবেখন। খাটের ওপর পুলওভার টা খুলে রেখে পাশের ঘরে শুতে চলে গেলাম।

||

সকালে ঘুম ভাঙল ঠিক ৮ টায়। বিছানা থেকে নেমে কিচেনে হাত মুখ ধুতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল পাশের ঘরে আর বুক টা ধড়াস করে উঠল।

যে ঘরে আমি কাল রাতেই একটা সোফা কে বিশাল খাটে পরিণত করেছিলাম, সেখানে খাটের বদলে সেই আগের সোফাটাই রাখা, আর গদির ওপর আমার পুলওভার, তার পাশেই পরিপাটি করে রাখা আমার বেডশিট টা।

||

– বজঁ
– বজঁ, আচ্ছা আপনারা কি মাঝরাতে আমার রুমে কাউকে রুম সার্ভিসের জন্য পাঠিয়েছিলেন?
– মাঝরাতে রুম সার্ভিস! না স্যার, আমরা পাগল নই।

বেশ আশ্চর্য হলাম রিসেপশনিস্টের থেকে এটা শুনে। কাল কলিগ ভয় পেয়েছিল, আজ আমার পুরো শুকিয়ে সাতষট্টি হয়ে গেল। অফিসে কাজে ঠিক মন বসাতে পারলাম না। সোফা টা অনেক কসরত করে খাট বানিয়েছিলাম, সেটা নিজে নিজে গুটিয়ে যাওয়ার কোন চান্স নেই। যাজ্ঞে, এতো সহজে ভয় পেলে চলবে না, এক মাস থাকতে হবে এই হোটেলে। মন শক্ত করলাম। বুকে পৈতে আছে, তবে খ্রিষ্টান ভূত রা সেটা মানবে কিনা আমার সন্দেহ। কলিগ কে এই ঘটনার কিছুই বললাম না।

বিকেল ৫ টা বাজলেই এখানকার অফিস খালি হয়ে যায়। আমিও বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলে পৌঁছে চাবি খুলে অন্ধকার ঘরে ঢুকে লাইট অন করতে বেশ ফাটছিল আমার। তবে লাইট টা অন হওয়ার পর নড়তে পারলাম না জায়গা থেকে, পা দুটো যেন ঠান্ডা হয়ে মাটি তে আটকে গেল। কাল রাতে ঠিক যেভাবে খাট টা খুলে রেখে গেছিলাম, এখন ঠিক সেইভাবে রাখা, বেডশিট পাতা, আর পুলওভার টাও ওর ওপরে।

তখনো দারু খেতে শিখিনি। রাতে গাঁজা টেনেও শুইনি যে সকালে উঠে এতটা ভুল দেখব। ডিনার কে মারো গোলি। জামা প্যান্ট চেঞ্জ করে পাশের ঘরে নর্মাল বিছানা তে লেপের তলায় সেঁধিয়ে গেলাম, আজ আর রাত জাগা নয়। একবার মাথাতেও এল যে খুব যদি বাজে কিছু কেস হয় এই রুমে, তাহলে কলিগের রুমে গিয়ে শোওয়ার রিকোয়েস্ট করব কিনা, যদিও খুবই বাজে দেখাবে ব্যাপারটা। ভয় পেতে শুরু করলেই রাজ্যের ভুলভাল চিন্তা আসে মাথায়। মনে হল আমার পায়ের কাছে যদি এখন কেউ দাঁড়িয়ে থাকে, লেপ সরিয়ে দেখবার সাহস অবশ্য করলাম না। ঘুম এসে গেল।

সকালে উঠে দেখলাম পাশের ঘরে খাটরূপী সোফা এখনো খাট মোডেই আছে, আর কিছু পরিবর্তন হয়নি। অফিসে পৌঁছে আমার ভীতু কলিগ প্রশ্ন করল যে নিশাচর আমি কাল রাতে চ্যাটে অনলাইন ছিলাম না কেন, হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি কেন শুয়ে পড়েছিলাম, শরীর ঠিক আছে কিনা। একটারও জবাব দিলাম না। মাঝে মাঝে কিছু জিনিস সিক্রেট রাখতে হয়।

||

সেকেন্ড উইকের থার্ড ডে। আজ অফিস থেকে ফিরতে একটু লেটই হল, ৯ টা নাগাদ হোটেলে ঢুকলাম। ঠান্ডা টাও বেশ জমিয়ে পড়েছে।

ডিনার সেরে মনে হল ব্যালকনি তে গিয়ে একটু দাঁড়াই, ফরাসী ঠান্ডা উপভোগ করা যাবে। ব্যালকনি থেকে দুটো রুমেই ঢোকা যায়, পর্দা সরিয়ে দুটো দরজাই খুলে দিলাম। ৯ তলা থেকে পুরো শহর টাই দেখা যায় মোটামুটি। সমুদ্রতট থেকে খুব বেশি দূর নয়।

হঠাৎ পেছন থেকে বেশ জোরে একটা আওয়াজে চমক ভাঙল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমার পেছনে দুটো দরজাই বন্ধ। পর্দাটাও ভেতর থেকে টেনে ঢাকা। আর ঘরের ভেতর থেকে টিভির আওয়াজ আসছে, যেটা কিনা আমি চালিয়ে আসিনি।

হৃৎপিণ্ড টা খুলে হাতে চলে আসবে মনে হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল ব্যালকনি দিয়ে নিচে নামার কোন রাস্তা পাওয়া যায় কিনা। পাশের ব্যালকনি টাও বেশ দূরে। বেশ খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে আমার নর্মাল খাট ওয়ালা ঘরের দরজার হাতল ঘোরালাম, খুলে গেল। পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলাম। শুধু পাশের ঘরে কি করে যাব সেটাই মাথায় আসছে না। আমি সিওর হোটেলের এই রুমে আমি একা নই। সাত পাঁচ ভেবে ঠিক করলাম সকালেই যাব ওই ঘরে, এখন লেপের তলা টাই সেফেস্ট প্লেস।

||

সকালে পাশের ঘরে কেউ ছিল না। থাকলে এই ঘটনা আর লেখা হত না। তবে শেষ হয়নি। আরও বাকি। আগের বার অন্য পর্বে লিখব বলে প্রচুর খিস্তি খেয়েছিলাম। তাই শেষ টাও রইল একসাথেই।

বেশ মনস্থির করেই গেছিলাম যে রিসেপশানে জিজ্ঞেস করব আমার রুম সম্বন্ধে, কিন্তু লজ্জা লাগল, যদি হেঁসে উড়িয়ে দেয়। ইন্টারনেটে সার্চ ও মারলাম হোটেল টা নিয়ে, অনেকসময় কোন সুইসাইড বা মার্ডার কেস ঘটে থাকলে সেটা পুরনো আর্কাইভ থেকে পাওয়া যায়। এই হোটেলের সেরকম কিছু কেস পেলাম না। আমার কলিগ টি এখন বেশ মস্তি তে, আর আমার অবস্থা টাইট।

থার্ড উইকে সক্কাল সক্কাল অফিস চলে আসা শুরু করলাম, আর বেশ রাত করে হোটেলে ফেরা, যাতে হোটেলে থাকার টাইম টা কম হয়।

আমার রুমের এই করিডরে মোটামুটি আমাদের এই দুজন ছাড়া আর কেউ নেই মনে হয়, আজ পর্যন্ত অন্য কাউকে দেখিনি, বা শব্দও পাইনি অন্য রুম থেকে। আরেবাবা কথা বলার শব্দ। কি মুশকিল!

যাই হোক, আজ কিচেনে দাঁড়িয়ে রান্না করার সময় একটা অদ্ভুত ফিলিং হল। কিচেনের হটপ্লেটের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ঠিক আমার পেছনেই দুখানা বাথরুম। ডিমের অমলেট বানাচ্ছি। কিন্তু কেন জানি না মনে হচ্ছে আমার পেছনে কেউ যেন আছে। বারবার মনকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে এই রুমে যা যা হচ্ছে, সব মনের ভুল। যদিও লজিক খুঁজে পাচ্ছি না ঘটনা গুলোর, তবুও অল ইজ ওয়েল ছাড়া আর কোন উপায়ও তো নেই। হোটেল চেঞ্জ করলে পয়সা সব জলে যাবে। কলিগকে বললে তো নিজের পয়সায় টিকিট কেটে কালই দেশে ফিরে যাবে। তাই নিজের মনের সাথে নিজেকেই লড়তে হচ্ছে।

যখনই মাথায় এইসব চিন্তা ঘুরপাক খায়, তখনি কিছু একটা ঘটে আমার রুমে। ন্যাতানো অমলেট টা কে কায়দা করে তোলার চেষ্টা করছি প্লেটে, আর ঠিক তখনই শব্দ টা কানে এল আমার পেছন থেকে। বন্ধ বাথরুম টার ভেতরে কমোডের হাতল টা টেনে কেউ ফ্লাশ করল।

আর নয়, লেটস ফেস ইট। জানি না হঠাৎ এত সাহস কোথা থেকে এল, এক ঝটকায় দরজা টা খুলে ফেললাম প্রথম বাথরুম টার। কেউ নেই ভেতরে, কিন্তু কমোডে ফ্লাশের জল পড়া তখনো শেষ হয়নি। বেশ রোখ চেপে গেছে আমার, চেঁচিয়ে বললাম, “কে আছিস শালা সামনে আয়”। ঠিক তখনই পাশের বাথরুম থেকে কল খুলে জল পড়ার শব্দ শুরু হল। আমি এই বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি পাশের টা তে বেসিন থেকে জল পড়ছে!

||

শেষ সপ্তাহ। সামনের শনিবারেই ফিরতি ফ্লাইট। কোনরকমে আর কটাদিন কাটিয়ে দিতে হবে যেভাবেই হোক। এই অভিজ্ঞতা কোনদিন ভুলব না।

পাশের চার্চে কোন গোলমাল নেই তো! শুনেছি পুরনো বন্ধ চার্চ গুলো নাকি ভূতেদের আখড়া হয়। অফিসে ক্লায়েন্ট জিজ্ঞেস করল যে এখন ফিরে যেতে হবে বলে ফ্রান্সের জন্য মন কেমন করছে কিনা। ওকে সত্যি কথা বললে আমার চাকরি টাই চলে যেত, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।

চলে এল শুক্রবার সন্ধে। কাল সকালে ফ্লাইট। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নিতে নিতে মোটামুটি রাত ১০ টা হয়ে গেল। ল্যাপটপ টা নিয়ে খাটরূপী সোফা তে বসলাম ফ্লাইট চেকইন করব বলে। ঘরের মাঝখানে খাট টা, তিন দিক ফাঁকা, দরজা জানলা সব বন্ধ। আমার বাঁ দিকে খাটের পাশে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গার পর একটা কাপবোর্ড, তাতে ইস্তিরি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ইত্যাদি রাখা। আমি ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। আমার বাঁ কানের কাছে মুখ এনে কেউ যেন ফিসফিস করে কিছু বলেই সরে গেল! শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল যেন। কানে দুবার জোরে ফুঁ দিলে যেমন হয়, ঠিক তেমনই হল। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখলাম সব একইরকম। পুলওভারের ঘোমটা মাথায় টেনে ছুটলাম পাশের ঘরে। সোজা ডাইভ মেরে সেঁধিয়ে গেলাম লেপের তলায়।

||

আর হারাবার কিছু নেই, তাই জিজ্ঞেস করেই ফেললাম রিসেপশনিস্ট কে চেক আউট করবার সময়।

– আমার একটা প্রশ্ন ছিল।

– হ্যাঁ বলুন স্যার।

– আমি যে রুমে ছিলাম, সেই রুমে কি কিছু প্রবলেম আছে?

– কিরকম প্রবলেম বলুন তো।

– আসলে আমার সাথে এই কদিনে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে ওই রুমে যেগুলোর কোনও কারণ বা ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাইনি।

ওর চোখ গুলো হঠাৎ বড় বড় হয়ে গেল। সামনের কম্পিউটারে খটাখট করে মেরে কিসব দেখতে শুরু করল। পেছনে ওর কলিগ কে ডেকেও কিসব জিগেস করল, দুজনেই আমার মুখের দিকে কেমন একটা অবাক ভাবে চাইল, তারপর প্রথম জন বলল।

– স্যার, একটা রিকোয়েস্ট আছে। প্লিজ আপনি ওই ঘটনা গুলোর কথা কাউকে বলবেন না। আমরা অত্যন্ত দুঃখিত যে আপনাকে ওই রুম টা অ্যালোকেট করা হয়েছিল, আমাদের বুকিং সিস্টেমের একটা ফল্টের জন্য এমন হয়েছিল, নয়তো ওই রুম টা আমরা কাউকে দিই না। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আপনার অ্যাকাউন্টে আমরা ১০০ ইউরো রিটার্ন দিচ্ছি।

– কিন্তু কি আছে ওই রুমে!

– স্যার, সেটা সিক্রেট থাকাই ভালো। আপনার নাম আর রুম নাম্বার টা আর একবার কনফার্ম করবেন।

– অরিজিৎ গাঙ্গুলি। রুম নাম্বার ৮২৩।

 

 

গল্প ৩ ~ “কড়ে আঙুল”

প্রথমেই বলে রাখি এই ঘটনা টা আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নয়। আমার বন্ধুর মুখে শোনা। তবে সেদিন এই ঘটনা টা যারা যারা শুনেছিল, বা পরে আমি যাদের শুনিয়েছিলাম, তাদের ২-৩ রাত ঘুম হয়নি। ঘটনার সত্যতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই, কারণ বন্ধুটাকে আমরা সামনে থেকে দেখেছি, ভয় পেলে একটা মানুষের চেহারা যে এইরকম হয়ে যেতে পারে তা আমার জানা ছিল না আগে।

২০১১ সাল। আমার অফিসের ওড়িয়া এক বন্ধু ছুটির জন্য অ্যাপ্লাই করল। লম্বা ছুটি বিয়ের জন্য। নেমন্তন্ন করল সবাইকেই, কিন্তু উড়িষ্যা যাওয়ার মতো সময় আমরা কেউই বার করতে পারলাম না। তাই, বন্ধুকে দিয়ে প্রমিস করিয়ে নেওয়া হল যে বিয়ে করে এসে ওকে আমাদের ট্রীট দিতে হবে কলকাতা তেই।

ঠিক দেড় সপ্তাহ পরে বন্ধু কলকাতা ফিরে আমাদের একদিন বলল সবাইকে চলে আসতে সল্টলেকের হাক্কা রেস্টুরেন্টে। আমরাও দল বেঁধে হাজির হয়ে গেলাম। কিন্তু খাওয়ার সাথে সাথে যে এইরকম একটা গল্প অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য, সেটার কোনও আঁচ আমরা আগে থেকে পাইনি।

ওহ্, এতটা লিখতে গিয়ে হাঁপিয়ে গেলাম তো। আমার মেট্রোর জার্নি টা এত লম্বা যে পুরোটা লিখে ফেলতে পারি। তবে পরের স্টেশনে নামতে হবে। ততক্ষণ আপনাদের কমেন্ট শুনি কেমন লাগল। আর জানাতে ভুলবেন না পরের গল্প শোনার ইচ্ছে একইরকম রইল, না কমলো, নাকি বাড়লো!

 

~ ফুল সিরিজ ~

ভূত আমার পূত – গল্প ১ ~ আমার জানলা দিয়ে

ভূত আমার পূত – গল্প ২ ~ ফরাসী হোটেল

ভূত আমার পূত – গল্প ৩ ~ কড়ে আঙুল

ভূত আমার পূত – শেষ গল্প ~ কার্নিশ

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদ অলঙ্করণ ~ Anari Minds

One thought on “ভূত আমার পূত – গল্প ২ ~ ফরাসী হোটেল

Leave a Reply