যখন আনাড়ি ছিলাম

Anirban & Arijit, Short Story, বাংলা

(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

~ এপ্রিল ২০১৪ ~

দ্বন্দ্ব টা এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে মনে। হাতে মাত্র আর দুটো দিন। আজকে যদি না যাই, তাহলে কোনদিনও আর সম্ভব হবে না। রাত ৯ টাও বাজতে চলল। এত রাতে কারুর বাড়ি যাব? নাহ্ থাক, যেরকম চলছে চলুক। ৮ বছর যখন কেটে গেছে, আর উৎসাহ দেখিয়ে লাভ নেই।

– “কি ঠিক করলে? বল রেডি হব? শাড়ি পড়ব না সালোয়ার?”
– “নাহ্ ছেড়েই দাও। ওর নাম্বার ও তো নেই।”
– “যাহ্‌, কেন কি হল?….. আমি একটা কথা বলি?”
– “বলে ফেল।”
– “বড়জোর অপমান করবে। মেরে তাড়িয়ে দেবে। আমি ও তো থাকব সাথে। কিন্তু চলো। এই সুযোগ কিন্তু আর আসবে না। কতদিন ইচ্ছে টা চেপে রাখবে? হয় এবার নয় নেভার। তাড়াতাড়ি নম্বর জোগাড় কর।”

এই কিক টাই দরকার ছিল। ওয়াটস্যাপ-এ মেসেজ করলাম ভিমু ওরফে আমাদের স্কুলের বন্ধু অভিমন্যু কে। বলতেই দিয়ে দিল নাম্বার টা। কারণ অবশ্য জিজ্ঞেস করল একবার। কিন্তু জবাব দেওয়ার মতো সময় ছিল না।

– “হ্যালো!”

গলা টা শুনেই পুরনো দিন গুলো ভেসে উঠল চোখের সামনে। আজও সেই এক গলা।

– “হ্যালো, পিকলু বলছি। তুই কি এখন বাড়ি তে আছিস? আমি আর মুন একবার আসতে পারি?”
– “পিকলু……. হ্যাঁ আছি। এখুনি আসবি? চলে আয়।”

অল্প একটু সময় নিলেও অপ্রস্তুত ভাব টা বেশ ভালোই বোঝা গেল। আলমারি খুলে বার করে নিলাম মিঠির অন্নপ্রাশনের কার্ড। পেন দিয়ে ওপরে লিখলাম “শ্রী তপন কুমার ঘোষ”।

||

~ ফ্ল্যাশব্যাক: নভেম্বর ২০১৩ ~

মিঠি যখন ১ মাসে পড়ল, সেদিন ই খবর টা পেলাম শ্বশুর মশাই এর কাছ থেকে। বলা বাহুল্য আমার শ্বশুরবাড়ি একই পাড়া তে। আরও খোলসা করে বললে একটা বাড়ি পরেই। সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য সেই বিতর্কে আর নাই বা গেলাম।

আমাদের বাড়ি থেকে আর ৫-৬ টা বাড়ি পরেই অনির্বাণের বাড়ি। আমার আর মুনের কমন ফ্রেন্ড। আমার ল্যাংটো বয়েসের বন্ধু না হলেও স্কুলজীবন থেকেই লাঙ্ঘোটিয়া ইয়ার আমি অনির্বাণ আর প্রসেনজিত (তোতন নামেই কুখ্যাত)।

সরে গেলাম আসল কথা থেকে। খবর পেলাম অফিস থেকে ফিরে। অনির্বাণের ও একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। খুব ইচ্ছে ছিল মিঠি হওয়ার পরেই ওকে ফোন করে জানাব। কিন্তু ২০০৬ সালের সেই ঘটনার পর থেকেই পাপবোধ টা মনে এমন ভাবে দানা বেঁধেছিল যে সাহস আর আনতে পারিনি।

তাই আশায় বুক বেঁধেছিলাম মিঠির অন্নপ্রাশনে ওদের বলবই। বলার মতো শব্দ অবশ্য একটাই ছিল, “SORRY!”

||

~এপ্রিল ২০১৪, রাত ৯ টা~

ফিরে আসা যাক যেখানে ছিলাম। বাজিয়েই ফেললাম “ডঃ অনির্বাণ ঘোষ” লেখা সাইনবোর্ড এর ওপর লাগানো কলিঙ বেল টা।

গ্রিল খুলে ভেতরে নিয়ে গেল অনির্বাণ। অদ্ভুত লাগলো এতদিন বাদে এই বাড়ি তে এসে। সবার মুখে হাসি গুলোও কত চেনা। মনে হল যেন মাঝে কিছুই হয়নি, রোজকার আসা যাওয়া।

ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। খাটের ওপর খেলা করছে ছোট্ট তিন্নি, জয়িতার তত্ত্বাবধানে। তিন্নির মুখ টা দেখে রাগ অভিমান ভয় সব হঠাৎ নিমেষে ধুয়ে মুছে গেল। মনে হল কত আনাড়ি ছিলাম ছোটবেলা তে। সত্যজিৎ বাবুর গল্প টা এতদিনে প্রথমবার হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলাম।

কার্ড দিলাম অনির্বাণ কে।
– “সবাই কে আসতে হবে কিন্তু পরশু দিন।”
– “আচ্ছা। অবশ্যই আসব। সবাই কিনা কথা দিতে পারছি না রে। বুঝতেই তো পারছিস সব। তবে হ্যাঁ, আমিও আসছি কিছুদিনের মধ্যে তোর বাড়ি। উপলক্ষ একই। চ বাবা মার সাথে দেখা করবি।”

টাফেস্ট পার্ট টা এগিয়ে এল। কাকু কাকিমা কে প্রণাম করলাম। আসবার কথাও বললাম। কিন্তু কাকুর মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না বেশিক্ষণ।

বাইরের গেটে চলে এলাম। অনির্বাণের সাথে হ্যান্ডশেক করে বললাম, “Sorry for everything! কাকু কে বলতে পারলাম না। তুই বলে দিস একটু।”

– “আরে সরি বলিস না। রাগ টা আমার ৭ মাস আগে অবধিও একইরকম ছিল রে। কিন্তু যেদিন শুনলাম মিঠি এসেছে, সেদিন মনে হল একজন বাবার ওপর কি করে রাগ দেখাব। চেঞ্জ টা খুব ই ফাস্ট হল রে। তুই যে অ্যাপ্রোচ টা করতে পারলি, সেটা হয়ত আমি কোনদিনও করতে পারতাম না। থ্যাংক ইউ তোকে।”

মুন এর শেষ মুহুর্তের কিক টা কে সম্মান জানাতে ভুলিনি অবশ্য সেদিন।

||

আজ এই anariminds.com এর এত কর্মকাণ্ড, এত বন্ধুর যোগদান ভালবাসা, এগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে মুন আর জয়ি-র ননস্টপ খিস্তি থাকলেও আজ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি যে সংসার ওয়ালা সাইড টা ওরা সামলে না নিলে আনাড়ি কেন, খিলাড়ি রাও পারত না একটা অন্যরকম কিছু শুরু করতে।

২০০৬ সালে কি হয়েছিল সেটা আর মনে করতে চাই না কেউ ই। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হচ্ছে। Anari Minds এর আসল স্রষ্টা কিন্তু দুজন ই। না, তারা কোনভাবেই অরিজিৎ আর অনির্বাণ নয়!

তারা আমাদের মিসিং লিঙ্ক। তারা আমাদের ভবিষ্যৎ।

মিঠি আর তিন্নি।

 

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

Leave a Reply