বিলম্বিত লয়

Conversation, Freedom, Friends, Journey, Love Story, Marriage, Short Story, বাংলা

সায়ন আজ বড় ক্লান্ত। সারাদিন ধরে হাঁটছে, হেঁটেই চলেছে যেনো এটাই ওর একমাত্র কাজ। কলকাতার মত ব্যস্ত শহরে সায়ন বড়ই বেমানান, শুধু কলকাতা না, যেকোনো মেট্রো শহরে’র গতির সাথে এরা পাল্লা দিতে পারেনা। এখানে সবাই ছুটছে, কেউ কাজের জন্য, কেউ প্রমোশন এর জন্য, কারুর বাড়ি ফেরার তাগাদা, কেউবা ক্ষতি করার জন্য ছুটছে। এদিকে সায়ন, তার যেনো কোনো কিছুর অভাব নেই, অল্প তেই সে খুশি থাকে, চাহিদা আর যোগান এর জটিল অর্থসাস্ত্রে তার বিশ্বাস নেই। এই আস্ত জলজ্যান্ত শহর এর পুরোটাই ওর বাড়ি। খাওয়া জুটে যায় ভাগ্যক্রমে এখানে ওখানে।

সে যাইহোক, আজ সন্ধেবেলা সায়ন এসে বসলো পার্কের কোণার দিকের বেঞ্চ টায়। সকালে এই অঞ্চলের অনেকেই আসে মর্নিং ওয়াক করতে, আবার বিকেলের দিকটায় প্রেমিক যুগল দের ভিড়। এদের সবার নজর এড়িয়ে কোণার দিকের বেঞ্চ টাই সায়নের বড় পছন্দের, ওকে কেউ দেখতে পায়না, কিন্তু ও প্রায় সবাইকে দেখতে পায়। আজ খুব মায়ের মুখ টা মনে পড়ছে, কতদিন দেখে নি। সায়নের অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে, ঘুমের মধ্যে ও অনেকের সাথে কথা বলতে পারে। এদিকে চাঁদের আলো এসে পড়েছে লেক’এর জলে, অদ্ভুত একটা মায়াবী আলো চারিদিকে, এরই মধ্যে কোনো একফাঁকে সায়ন ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত অবস্থায় একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলো।

দেখলো লেকের জল আর চাঁদের আলো একে অন্যের সাথে ফিসফিস করে কি যেনো কথা বলছে, আর একটু এগিয়ে গিয়ে কান খাড়া করে শুনতে পেলো, লেকের জল বলছে,

লেকের জল: আচ্ছা তুমি সবসময় এত আনন্দে থাকো, তাও সবাই চাঁদের কলঙ্ক কেনো বলে?
চাঁদের আলো: সবাই বলেনা, তবে হ্যাঁ অনেকেই বলে বটে। আসলে দূর থেকে যেটা চাঁদের কলঙ্ক কাছে এলে সেটাই গভীর খাদ। এখন এইটা যদি খারাপ কিছু হয় তাহলে ভাই বলতেই হয় এরম অনেক খারাপ তোমাদের ওই তথাকথিত শিক্ষিত লোকেদের মধ্যেও আছে, তফাৎ একটাই ওরা ভালোর মুখোশ দিয়ে সেগুলো ঢেকে রাখে, আমি সেটা পারিনা।
লেকের জল: কিন্তু তাও তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে এরম সুন্দর আলোয় চারিদিক ভরিয়ে দাও! আঃ কী যে ভালো লাগে তোমায় কি বলবো। আমি এই সময় টা শুধু মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি তোমার দিকে।
আলো: এইটা তো আমার কাজ, আমি অন্যকে আনন্দ দিতে ভালোবাসি, আমার কাজ আমি করি, সবাই কে আলো দেওয়াটাই আমার কাজ। অন্যকে খুশি করার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা তুমি বুঝবেনা। একবার জানো একটা মজার ঘটনা হয়েছিল। আমি তখন চেরাপুঞ্জি তে।
জল: কি গো বলো বলো, শুনি আমি।
আলো: না থাক তোমায় বলা যাবেনা, এইটা পার্সোনাল।
জল: ও আচ্ছা আমাকেও আজকাল বলতে পারছনা, ঠিক আছে মনে রেখো, কাল আবার আমার ওপরেই তোমায় ফুটে উঠতে হবে তখন দেখাবো মজা।
আলো: আরে বাবা মজা করছিলাম, তুমি কিছুই বোঝ না, একটু তেই রেগে যাও। শোনো বলছি।
জল: হ্যাঁ বলো আমি তো শুনতেই চাই। বলো।
আলো: সেবার চেরাপুঞ্জি তে ভারী বৃষ্টি, টানা দুদিন ধরে ক্রমাগত হয়েই চলেছে, থামার নাম নেই। এদিকে রজত আর দীপ্তি এসেছে মধুচন্দ্রিমা করতে। পাহাড়ের কোলে সুন্দর ছিমছাম একটা কটেজ। দীপ্তি যদিও রাজি ছিলনা প্রথমে, ওর বরাবরের ইচ্ছে থাইল্যান্ড। শেষমেশ জায়গাটার ছবি দেখে না এসে আর থাকতে পারলোনা। সে যাইহোক, এভাবে টানা দুদিন কেউ ঘরে থাকতে পারে? এই নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝামেলা, দীপ্তি দোষারোপ করছে রজত কে, আর কিছুদিন পরে এলে কি ক্ষতি হতো, এই সময় এখানে কেউ আসে? তোমার যত উদ্ভট বুদ্ধি। রজতও ছাড়বার পাত্র নয়, অফিস এ কোনো রকমে চার দিনের ছুটি পেয়েছে, দীপ্তি কে কিভাবে বোঝাবে যে ওর হাতে সবটা নেই। এদিকে বৃষ্টির জন্য রান্নার লোক আসেনি, রাত্রে কি খাবে সেটাই চিন্তার বিষয়। সবমিলিয়ে রজত এর মেজাজ সপ্তম চড়ে আছে। তারমধ্যে আবার এইসব ঝামেলা।
জল: তারপর কি হলো? ওদের ঝামেলা মিটলো?
আলো: আরে সেটাই তো বলছি, শোনো মন দিয়ে।
জল: হুম বলো, আমার বেশ লাগছে।
আলো: রজত একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে বসলো, এই ভালো সময়ে এরম একটা অবস্থার জন্য নিজেকেই দোষ দিতে লাগলো। আমার না তখন ওদের দেখে কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো, এইতো কিরম নিজেদের চিনে নিচ্ছিল ওরা, সামান্য একটা ঝাগড়া ওদের ভালো সময় এভাবে নষ্ট করে দেবে। ওদিকে দীপ্তি কাঁদছে আর এদিকে রজত একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছে।
জল: তা তুমি কি করলে তখন?
আলো: বৃষ্টি থেমে গেছে কিছুক্ষন হলো। আমি তখন, মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লাম, পাহাড়ের গা বেয়ে উচু গাছ গুলো জোৎস্নার আলোয় ভরিয়ে দিলাম। সমস্ত অঞ্চল টায় আলোর চাদর বিছিয়ে দিলাম।
জল: তারপর…..
আলো: রজত চট করে ঘরে গিয়ে দীপ্তি কে টেনে আনলো বারান্দায়, পিছন থেকে চোখ দুটো দুহাত দিয়ে আগলে রেখে কানের কাছে চুপিচুপি বললো “এবার তাকিয়ে দেখো চারিদিক টা”। দীপ্তি চোখ খুলে এক দারুন দৃশ্য উপভোগ করলো, এক কথায় অপার্থিব। এবং রজত কে অনেক আদর দিয়ে জানিয়ে দিল এরম একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য ও কতটা খুশি হয়েছে।
জল: তখন তোমারও নিশ্চই খুব আনন্দ হচ্ছিল। তুমি না থাকলে এই রূপ কি ওরা দেখতে পেত!
আলো: হ্যাঁ আনন্দ হচ্ছিল বৈকি। আমি তো চাই সবাই আনন্দে মেতে থাকুক।
জল: তারপর কি হলো?
আলো: তারপর আর কি? বৃষ্টি তো থেমেই গেছিলো, ওরা দুজনে হাত ধরে সামনে গ্রামের দিকে হাঁটা লাগলো রাত্রের খাওয়ার যদি কিছু পাওয়া যায়। দূরে তখন ঝর্নার শব্দ।

 

লেখক ~ অয়ন ভট্টাচার্য

প্রচ্ছদচিত্র উৎস ~ theendlessfurther.com

প্রচ্ছদ অলঙ্করণ ~ Anari Minds

Leave a Reply