স্বপ্ন

Friends, Saddest Stories Are The Best Stories, Short Story, বাংলা

নীলাদ্রি তিন মাস হলো বেঙ্গালুরু’তে শিফট করেছে, আগে পুনেতে ছিল আড়াই বছর, একটা বহুজাতিক সংস্থায় ম্যানেজার পদে রয়েছে। ওদের কোম্পানি সার্ভার মেইনটেনেন্স এর কাজ করে; এর আগে যে কোম্পানি তে ছিল, সেখানে ২ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা তাই নতুন কোম্পানি তে জয়েন করতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি ওর। আজকাল যা অবস্থা তাতে ও নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলেই মনে করে, ছোটবেলা থেকেই যেটা করতে চেয়েছে সহজেই তাতে উতরে গেছে কোনরকম বাধার সাম্মুখীন বিশেষ একটা হতে হয়নি; তবে এই ব্যাপারে ওর মায়ের অবদান সবথেকে বেশী বলতে হয়। একা হাতে মা’ই ছোট থেকে মানুষ করেছে। ওকে লেখাপড়া শেখানো, বড় করা, নীলাদ্রির জন্মের দু বছরের মাথায় একটা রোড এক্সিডেন্ট’এ ওর বাবা মারা যায়, সেই থেকেই চলছে, অনেকেই প্রভা দেবী কে দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললেও তিনি ওইসব কথা কানে তোলেননি, কেউ কিছু বললে শুধু একটা কথাই বলেন “ আমি ওর বাবা কে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, সেই ভালোবাসার ভাগ আমি অন্য কাউকে দিতে পারবনা, তাতে ওর বাবা কে ঠকানো হবে”।

অতুল্য বাবু মারা যাবার পর, প্রভা দেবী একটি প্রাইমারি স্কুল’এ শিক্ষকতার চাকরি শুরু করেন, অল্প মাইনে তবুও ঠিক চালিয়ে নিতেন। অনেক অপমান, কষ্ট সহ্য করে নীলাদ্রিকে বড় করে তুলেছেন, যদিও আদরের নীলু কে কিছু বুঝতে দেননি! একে একে স্কুল, কলেজ এর গণ্ডি পেরিয়ে নীলু আজ কত বড় হয়ে গেছে, অন্য শহরে চাকরি করছে, কত দায়িত্ব সামলাতে হয়, প্রভা দেবী ভাবতেও পারেননা। ওনার কাছে আজও নীলু সেই ছোটবেলা তেই আটকে আছে, মা’না খাইয়ে দিলে যে ছেলে খেতে পারতোনা, রাত্রে মায়ের পাশে না শুলে ঘুম আসেনা, মেঘ ডাকলে মাকে জাপটে ধরে শুতে হতো, কি ভয় ছেলের এমনকি জুতোর ফিতে টা অব্দি মা কে পরিয়ে দিতে হত। এই তো সেদিনের ঘটনা ইন্টার্ভিউ দিতে যাবে ছেলে, ড্রেস টাও মাকেই পছন্দ করে দিতে হলও, নিজে হাতে ছেলে কে সাজিয়ে দিলেন; আসলে ছোট থেকে বাবা কে পায়নি, তাই প্রভা দেবী নীলুর একধারে মা আবার একদিকে বাবা, সব আদর আবদার অভিযোগ মায়ের কাছে; আজ এইসব কথা ভাবলে প্রভা দেবীর বড় কষ্ট হয়, যে ছেলে মা কে একমুহূর্ত ছেড়ে থাকতে পারতোনা, আজ সেই ছেলেই কিভাবে এতগুলো বছর মাকে ছেড়ে আছে ভাবলে অবাক হয়ে যান।

অফিস এর কাছেই নীলাদ্রির কোয়ার্টার, কোম্পানি থেকেই দিয়েছে সুন্দর সাজানো গোছানো দুটো বিশাল ঘর, ওর একার পক্ষে বেশ অনেকটাই বড়, IKEA এর ফার্নিচার সব বিদেশ থেকে আনা একদম পরিপাটি টিপটপ, দেখলেই মন ভরে যায়। সকালের টিফিন টা ও নিজেই বানিয়ে নেয়, কোনদিন টোস্ট আর অমলেট বা বড়জোর হাফ বয়েল্ড সাথে অরেঞ্জ জুস মাস্ট, আবার কোনদিন শুধু কর্ণ ফ্লেক্স বা ওটস। একটা টোস্টার কিনে নিয়েছে, কোনও অসুবিধা হয়না, লাঞ্চ টা অফিসই সেরে নেয়। এভাবে বেশ ভালই চলছে, মায়ের কথা ভেবে প্রথম প্রথম খুব মন খারাপ হত, কতদিন দেখেনি মাকে, কিন্তু অত বেশী ভাবার সময় নেই, এখানে সবাই ছুটছে, এক মুহূর্ত থেমে যাবর মানে তুমি পিছিয়ে পরলে। অনেক আগেই ও বুঝে গেছিল এ জগতে টাকা থাকলে খুব সহজেই অনেক কিছু হাসিল করা যায়; ছোটবেলার  ফেলে আসা দিন গুলোর কথা ভেবে তাই আজ আর বিশেষ মন খারাপ হয়না, আজ তো সব হাতের নাগালে। এই তো অফিস এর কলিগ’রা মিলে গোয়া যাবে ঠিক হয়েছে যদিও এই ছুটিতে নীলাদ্রি ঠিক করেছিল একবার মায়ের কাছে যাবে, দেখে আসবে মা কেমন আছে! প্রয়োজন পরে তো বেশ কিছু টাকাও নাহয় দিয়ে আসবে, আগের বার তো মা কিছুতেই নিতে চাইলনা। খালি বলে গেল তুই কতদূরে থাকিস, ওখানে অনেক খরচ শুনেছি তোরই দরকার হবে, আমার ঠিক কোনরকমে চলে যাবে, তাছাড়া এই বৃদ্ধাশ্রমে আমার কোনও অসুবিধা হয়না, ওনারা খুব খেয়াল রাখেন।

কিন্তু উপায় নেই, গোয়া তাকে যেতেই হবে আসলে ওর বস মানে মিঃ ডিসুজা এই গোয়া যাওয়ার প্ল্যান টা করেছেন তাই না গেলে খারাপ দেখাবে, তাছাড়া সামনেই ওর প্রমোশন পাওয়ার একটা সুযোগ আছে। মা’কে দেখতে যাব এই অজুহাত দিয়ে প্রমোশন পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ টা হাত ছাড়া করতে চায়না, মা’কে নাহয় অন্য কোনও সময় গিয়ে একবার দেখে এলেই হলও, আর তাছাড়া ও গিয়ে করবেই বা কি?

এদিকে প্রভা দেবী জানেন ছেলে পুজো তে কলকাতা আসবে, সেইমত উনি নীলুর প্রিয় নারকেল নাড়ু বানিয়ে রেখেছেন, তাছাড়া আরো একটা জিনিস কিনেছেন, নীলু এলে surprise দেবেন। আনন্দমেলার পুজো সংখ্যা, প্রতিবছর কিনে দিতে হত; ছেলেকে এবছর কাছে পাবেন উনি খুব খুশী, বেশ জমিয়ে পুজো টা কাটানো যাবে। সামনেই একটা ভালো পুজো হয়, বৃদ্ধাশ্রমের সকল আবাসিক পুজোর কটা দিন ওখানেই আনন্দে মেতে থাকেন। এমনিতে ওনাদের জীবনে আনন্দ আজকাল হাতে গোনা; প্রভা দেবী সব নিয়ে বেশ খুশীতে ডগমগ, ছেলে ফোন করে বলার পর থেকেই একদম যাকে বলে লাফাচ্ছেন, কি কি  করবেন, কোথায় যাবেন, ছেলের হাত ধরে কটা ঠাকুর দেখবেন সব কিছু একবারে সাজিয়ে নিয়েছেন।

১০’ই অক্টোবর, আজ মহালয়া, ভোর বেলায় উঠে আশ্রমের সকলে মিলে একসাথে  মহালয়া শুনে কেউ কেউ দ্বিতীয় বারের জন্য শুতে গেছে, কেউ বা জপ করছে, আবার কেউ সামনের বাগানে  একটু পায়চারি করে নিচ্ছেন, আর প্রভা দেবী আজ ভীষণ ব্যস্ত, সকাল থেকেই সব কিছু ভুলে শুধু বাইরে গেটের দিকে চেয়ে আছেন কখন ছেলে আসবে সেই ভাবনাতেই মশগুল। আজ যে খুব আনন্দের দিন, সকাল ৮ টা বেজে ১৫ মিনিটে চা এলো নিয়ম মাফিক, কারুর জন্য হরলিক্স। প্রভা দেবী চা আজ একটু দেরি করে দিতে বলেছেন, ছেলে এলে একসাথে খাবেন এই আসায় বসে আছেন; একটু পরে, ওনাদের অভিভাবক বিশ্বাস বাবু এসে প্রভা দেবী কে একপাশে ডেকে নিয়ে গেলেন, খুব নিচু গলায় শান্ত ভাবে জানালেন ছেলে আজ আসতে পারছে না, অফিসের কাজে গোয়া যেতে হচ্ছে, তবে খুব তাড়াতাড়ি নাকি আসবে মা’কে দেখতে; হঠাৎ করে যেন চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো, কান্না টা দলা পাকিয়ে উঠছে, প্রভা দেবী কোনরকমে একটা দেয়াল ধরতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স’এ করে কাছেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, কিন্তু ডা: জানিয়ে দিলেন আকস্মিক আঘাত সামলাতে পারেননি সেখান থেকেই হার্ট অ্যাটাক, শেষ পর্যন্ত প্রভা দেবী কে বাঁচানো গেলনা।

১১ই অক্টোবর, আশ্রমের সকলের মন খারাপ, তাদের প্রিয় দিদি আজ আর তাদের মধ্যে নেই। চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল উনি সবাই কে ছেড়ে চলে গেছেন। একটু দূরে নীলাদ্রি স্থির হয়ে দাড়িয়ে সকলের কাছে একমাত্র দোষী সেই, কিন্তু এই দোষের তো  কোনও সাজা হয়না, তাই এই যাত্রায় কোনও মৌন মিছিল বা মোমবাতি নিয়ে কলরব হলনা, কেউ কিছু জানতেও পারলনা, কিছুদিন পর সবাই আবার যে যার জীবনে ফিরে যাবে, ভুলে যাবে সবাই, নাহলে বাঁচবে কিভাবে।

আচ্ছা শুধু কি নীলাদ্রি একমাত্র দোষী? আমাদের কোনও দোষ নেই, আমরাই তো ছোটথেকে মাথায় ঢুকিয়ে দি, বড় হয়ে ভালো চাকরি করতে হব, অনেক টাকা দরকার বেঁচে থাকতে গেলে, বেশী টাকা মানে ভালো থাকা এইটা তো আমরাই মাথায় ঢুকিয়ে দি, কিন্তু সেটাই যখন আমাদের কাছে ফিরে আসে আমরা মেনে নিতে পারিনা, “ভালো হলে আমেরিকা কেড়ে নেবে, আর খারাপ হলে সারা পাড়া অভিশাপ দেবে” এত আমাদেরই শেখানো, তাই প্রকৃত দোষী কে? আমরা কি স্বপ্ন গুলো সার্থক করার তাগিদে কিছু মেশিন তৈরি করছি। আগে ভালো মানুষ তৈরি হওয়া খুব প্রয়োজন; তাই মনে প্রশ্ন জাগে স্বপ্ন টা আসলে সত্যি করে কার?

 

লেখক ~ অয়ন ভট্টাচার্য

প্রচ্ছদচিত্র উৎস ~ teemit-production-imageproxy-upload.s3.amazonaws.com

প্রচ্ছদ অলঙ্করণ ~ Anari Minds

 

Leave a Reply