হায়রোগ্লিফের দেশে – ২ – মৃতের বই

Anirban & Arijit, History, Series, বাংলা, হায়রোগ্লিফের দেশে

না, আগের সোমবার পিজির নোটের খাতাটা আর পোড়াইনি। বেচারা কাঁচুমাচু মুখ করে ফিরছিল আমার সাথে। রুমে ঢোকার পরে মুখ খুলল,

 

– ইস, আমার জন্যই আজকের জমাটি আড্ডাটা নষ্ট হল ভাই। আসলে আমার না আনেকসুনামুর ওপরে একটা ইয়ে..

মনে হচ্ছিল পায়ের হাওয়াই চটিটা খুলে ওকে পেটাই। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে আটকে বললাম,

– যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। এখন আর কাঁদুনি গেয়ে কি হবে?

– না ভাই, লোকটা অনেক জানে বুঝলি। আমার নিজেরও হেব্বি লাগছিল শুনতে। এমন একটা মানুষকে হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না।

– কি করবি তাহলে?

– একবার গিয়ে সরি বলে আসব?

– এখন আর কোথায় পাবি ওকে, পরে একদিন ওর দোকানে যাওয়া যায়। কিন্তু তোর মার খাওয়ার একটা হাই চান্স আছে।

 

সেকেন্ড ইয়ারে ক্লাসের খুব একটা চাপ থাকে না। আর ওই বোরিং ফার্মাকোলজি, প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি কাহাতক পড়া যায়? তাই আজকে সন্ধ্যেবেলায় পিজিকে নিয়ে আবার এসেছিলাম ভবেশদার দোকানে। আমাদের দেখেই না চেনার ভান করে আবার বই পড়তে লেগেছিল, কিন্তু পিজি হাতে বিড়ির প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে অনেক সরি টরি বলে ম্যানেজ করেছে। প্রমিস করেছে আর ভবেশদার গল্প বলার মাঝে ফুট কাটবে না। তবে তাতে আমার কোন বিশ্বাস হয়নি।

 

আমরা তিনজনে এসে বসলাম বেনুদার দোকানে, আজকে ভবেশদার মুড ভাল করতে বেনুদাকে কফি বানাতে বললাম। আমি এবারে মোবাইলটাকে সাইলেন্ট করে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বললাম,

 

– ভবেশদা আজকে ওই বুক অফ দি ডেড টা নিয়ে কিছু বলুন না।

– বাহ, তোমার তো নামটা মনে আছে বেশ দেখছি। তবে ওই বই দিয়ে কিন্তু কাউকে বাঁচিয়ে তোলা যায় না। হলিউডি গাঁজাখুরি সব। বলতে পারো বুক অফ দি ডেড হল মৃত্যুর পরের রাজ্যে ঢোকার চাবি।

– মৃত্যুর পরের রাজ্য? মানে আমাদের স্বর্গ আর নরকের মতো?

– কিছুটা সেরকমই। কিন্তু আবার অনেকটা আলাদাও। সেই রাজ্যে পৌঁছনোর রাস্তাটাই ভয়ঙ্কর! ইজিপশিয়ানরা বিশ্বাস করত মানুষ মারা যাওয়ার পরে মাটির নিচে আরেকটা জীবন শুরু হয়। তাই অত যত্ন করে মমি বানানো। অত শত জিনিস মমির সাথে কবর দেওয়া।

– আচ্ছা, কবর দিয়ে দেওয়ার পরে তাহলে মৃতদেহ আবার বেঁচে উঠবে?

 

– না ঠিক তা নয়, দাঁড়াও বুঝিয়ে বলি।

বলে ভবেশদা পিজির দিকে তাকিয়ে বলল,

– আমরা ধরে নি প্রদীপ্ত একজন ফারাও। আর আজকেই সকালে বাহ্যবমি করতে করতে ও মারা গেছে।

 

পিজির এই ব্যাপারটা একদমই ভাল লাগল না,

-আমিই কেন? আমার ঠাকুমা আমার কুষ্টি বিচার করেছিল। নব্বই বছর অব্দি বাঁচব জানেন? তা নয়, এখনই আমাকে মারার তাল করছেন। বুঝেছি, আগের দিন আপনার পেছনে লেগেছিলাম বলে এখন তার শোধ নিচ্ছেন তাই না?

 

আমি বললাম, আরে বাবা ভবেশদা তো কথার কথা বলছে, এত চটছিস কেন? একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে একটু সুবিধা হয় না কি?

 

আমার কথাটা পিজির খুব একটা মনপসন্দ না হওয়ায় গোমড়া মুখে চুপ করে বসে থাকল। ভবেশদা ফিচ করে একটা ছোট হাসি দিয়ে আবার বলা শুরু করল।

-ফারাও প্রদীপ্ত মারা যাওয়ার পরে সত্তরদিন ধরে ওর শরীরটাকে মমি বানানো হল।

-মমি কি করে বানাতো?

– একদিনে সব হজম করতে পারবে না,  আজকে যেটা বলছি সেটা শুনে যাও চুপ করে।

তো যেটা বলছিলাম, ওর মমিটা বানানো হয়ে গেলে সেটা দিয়ে দেওয়া হল বাড়ির লোকজনের হাতে। তারা এবারে সেটাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করল। সেই কবরে এবারে মমিকে ঢুকিয়ে তার ওপরে মন্ত্র পড়া শুরু করল পুরোহিত। তার মধ্যে একটার নাম হল ওপেনিং অফ দা মাউথ। এতে মৃতের শরীরে প্রাণ আসবে। সে তখন তৈরী হয়ে যাবে মাটির নিচের জার্নির জন্য।

 

– গতবার বলেছিলেন বটে যে ইজিপশিয়ানরা বিশ্বাস করত সূর্য পশ্চিমে ডুবে যাওয়ার পরে মাটির নিচে যাত্রা করে।

– ঠিক, প্রদীপ্ত এবারে সূর্য দেবতা রা-য়ের পথে চলতে থাকবে। রা সারারাত ধরে মাটির নিচে পশ্চিম থেকে পূর্বে যায়। যাতে পরেরদিন ভোরে আবার আকাশে উঠতে পারে। প্রতিরাতেই এই জার্নির সময় রা-য়ের নৌকোকে আক্রমণ করে আপেপ নামের একটা বিশাল সাপ। প্রতিরাতেই রা তাকে হত্যা করে। যে রাতে আপেপ জিতে যাবে তার পরের দিন সকালে আর সূর্য উঠবে না।

– তাহলে ফারাও পিজি-ও পূর্বে পৌঁছে যাবে?

– না না, তার আগেই ওর সামনে আসবে একটা গোলকধাঁধা। ওসাইরিসের নাম শুনেছ?

 

– শুনেছি,

গোমরা মুখে বলল পিজি।

-ইজিপ্টের মৃত্যুর পরের দেবতা।

– বাহ এই তো, ইন্টারেস্ট এসছে একটু দেখছি। ঠিক বলেছ। ইজিপশিয়ানদের মৃত্যুর পরের জগৎটা পুরোটাই মাটির নিচে। সেই জগতের দেবতার নাম ওসাইরিস। অনেকটা আমাদের যম বা গ্রীক দেবতা হেইডিসের মতো। তোমার এই মরে যাওয়ার পরের যে জার্নিটা হবে সেটাতে তোমার নামের আগে ওসাইরিস বসে যাবে। মানে তুমি তখন ওসাইরিস প্রদীপ্ত।

 

বারবার মরে যাওয়ার কথাটা শুনতে পিজির একদম যে ভাল লাগছে না সেটা বুঝতেই পারছিলাম। কিন্তু এমন একটা ইন্টারেস্টিং জায়গায় এসে ও রাগও দেখাতে পারছিল না। চুপ করে রইল। ভবেশদা বিড়িতে  টান দিতে দিতে বলে চলল,

 

– তো যেটা বলছিলাম, প্রদীপ্ত এবারে এসে পড়বে একটা গোলকধাঁধার সামনে। তার সাতটা দরজা আছে। প্রতিটা দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে একজন দারোয়ান। সেখানে গিয়ে একটা স্পেসিফিক মন্ত্র বলতে হবে প্রদীপ্তকে। ঠিকঠাক মন্ত্র বললে তবেই গেট খুলবে।

 

– বাপরে! এতো হেবি চাপের জিনিস!

– চাপ তো এখনও কিছুই দেখনি ভাই স্পন্দন। এখনো অনেক খেলা বাকি। এই খান থেকেই প্রদীপ্তর দরকার লাগবে বুক ওফ দি ডেড কে। যেটা হয়ত প্যাপিরাসে লিখে ওর কফিনে ওর মমির সাথে রাখা আছে। অথবা কফিনের  দেওয়ালে বা মমির গায়ের ব্যান্ডেজে সাঁটা আছে। এই বইয়ের জন্ম কবে হয়েছিল সেটা কেউ জানে না। ইজিপ্টের ইতিহাসের একদম প্রথম দিকে এগুলো পিরামিডের ভিতরের দেওয়ালে লেখা থাকত। সেগুলোকে এখন পিরামিড টেক্সট বলে। পরে সেগুলোর একটু আধটু অদল বদল করে প্যাপিরাসে লিখে বই বানিয়ে মমির দেহর সাথে রাখা হতে থাকল। ১৮৪২ সালে জার্মান ইজিপ্টোলজিস্ট কার্ল লেপলিয়াস এই বইয়ের মানে উদ্ধার করেন। ওনারই দেওয়া নাম বুক অফ দি ডেড। যে বই মৃতকে ঠিকঠাক করে ওসাইরিসের সামনে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবে।

 

– ওসাইরিসও আবার পরীক্ষা নেবে? পিজি একটু অবাক হয়েছে মনে হল।

– নেবে না আবার? পাপ পূন্যের বিচার করেই তো ঠিক হবে যে তুমি কোনদিকে যাবে, স্বর্গে না নরকে। বুক অফ দি ডেড থেকে ঠিক ঠাক মন্ত্র আউড়ে তুমি তো কোনরকমে গোলকধাঁধা পেরোলে। কিন্তু তখনই তুমি এসে পড়বে স্বয়ং ওসাইরিসের সামনে। আরো বিয়াল্লিশ জন দেব দেবী মিলে তোমার বিচার করবে। এই জায়গাটার নাম হল ‘কোর্ট অফ টু ট্রুথ’। এখানে তুমি ওই বুক অফ দি ডেড থেকেই আওড়াতে থাকবে। নেগেটিভ কনফেশন করবে। মানে যে যে পাপ গুলো জীবদ্দশায় করনি সেটা বলবে। মানুষ পৃথিবীতে কোন না কোনও পাপ করবেই। তাই এই বিচারে ঠিক হবে সে কোন কোন পাপ করেনি। যদি ঠিকঠাক স্বীকার করতে পারো তাহলে তোমার শেষ পরীক্ষা নেবে ওসাইরিস।

 

– সেটা কিরকম?

– তোমার হৃদপিন্ডটার ওজন করা হবে।

– হৃদপিন্ডটার ওজন হবে?!

– হ্যাঁ, মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে হৃদপিন্ডই সব। একটা মানুষের শরীরের মধ্যে সব প্রয়োজনীয় সবচেয়ে পবিত্র জিনিস। তাই মমি বানানোর সময় শরীরের ভিতরের সব কিছু বার করে নিলেও হৃদপিন্ডটাকে যথাস্থানে রেখে দেওয়া হত। ওইটা ছাড়া তো মৃত মানুষটা ওসাইরিসের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না।

– আর মমি বানানোর সময় ভুল করে যদি ওটাকে কেউ উপড়ে ফেলে তো?

– এমনটা হয়েছিল তো। দ্বিতীয় রামেসিসের মমি বানানোর সময়তেই ভুল করে হৃদপিন্ডটাকে কেটে ফেলেছিল শরীর থেকে। তারপরে সেটা আবার সোনার সুতো দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। যদিও সেখানেও একটা ভুল করে ওরা। রামেসিসের মমিতে হৃদপিন্ডটা ছিল বুকের ডানদিকে লাগানো।

– এবাবা। বাজে কেস তো। যাই হোক, ওই ওজন করার ব্যাপারটা বলুন

– ও হ্যাঁ, প্রদীপ্তর হৃদপিন্ডটার ওজন হবে এবারে। আনুবিসের নাম শুনেছ তো?

– শুনব না আবার! শেয়াল দেবতা!

– ঠিক, আনুবিস হল মামিফিকেশনের দেবতা। সেই আনুবিস একটা দাঁড়িপাল্লার একদিকে চড়াবে হৃদপিন্ডটাকে,  আরেকদিকে রাখবে একটা অস্ট্রিচ পাখির পালক। যেটা দেবী মাতের মাথার মুকুট থেকে নেওয়া।

– মাত?

– হ্যাঁ, মাত হল সত্য আর ন্যায়ের দেবী। সেও দাঁড়িয়ে দেখবে দাঁড়িপাল্লার কোন দিকটা ভারী হল। যদি হৃদপিন্ড পালকের থেকে হালকা হয় তাহলে প্রদীপ্ত শেষ পরীক্ষাতেও পাস করে গেল।

– আমি খুব ভাল মানুষ, আমার হৃদপিন্ডটা ওই পালকের থেকে হালকা হবেই। আমি শিওর।

কিন্তু তার পরে কি? স্বর্গ?!

পিজির মুখটা বেশ খুশি খুশি এবারে। কিন্তু ভবেশদা ওর দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হাসল।

 

– স্বর্গ মানে তুমি কি বোঝো?

– মানে দারুণ সুন্দর একটা জায়গা। হেবি খাওয়া দাওয়া, চারিদিকে অপ্সরারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোন কাজ কর্ম নেই, সারাদিন শুধু গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াও।

– তাহলে কিন্তু তুমি বেশ হতাশ হতে। ওসাইরিস পরীক্ষায় খুশি হলে তোমার যে আত্মাটা অন্য জগতে যাবে তার নাম হল আখ। সেই জগতটা হল আরুর উপত্যকা। চারিদিকে লোহার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেখানে নদী আছে, পাহাড় আছে, আর আছে বড় বড় ক্ষেত, সেখানে বার্লি চাষ হয়। তুমি সেখানে সুখেই থাকবে, ভাল ভাল খাওয়া দাওয়াও হবে। কিন্তু তোমাকে কাজও করতে হবে ভগবানের জন্য। ক্ষেতে চাষ করতে হবে। নদী থেকে জল তুলতে হবে। গরু চড়াতে হবে।

– যাব্বাবা, এত খেটে খুটে শেষে চাষবাস করব?

– তুমি যদি সমাজের নিচের দিকের মানুষ হও তাহলে তো করতেই হবে। কিন্তু তুমি ফারাও বলে তোমার হয়ে সেই কাজ গুলো তোমার অনুগতরা করে দেবে। ফারাওদের সমাধিতেই তাদের কফিনের সাথে রাখা হত মাটি আর কাঠ দিয়ে তৈরি করা পুতুল,এরা হল উশাবতিস। মৃত ফারাও মাটির নিচের জগতে জীবন ফিরে পেলে এরাও বেঁচে ওঠে। তখন এরাই ফারাওয়ের কাজ গুলো করে।

 

– যাক তাহলে বাঁচোয়া। কিন্তু আপনি একটা কথা বললেন না তো?

– কি?

– যদি শেষ পরীক্ষায় হার্টটা পালকের থেকে ভারী হয়ে যায় তাহলে কি হবে?

– তার ফল কিন্তু মারাত্মক খারাপ হবে। এবারে গলার স্বরটা বেশ গাড় করে রহস্যময় ভাবে বলল ভবেশদা। আমি আর পিজি নিজেদের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম।

– মারাত্মক খারাপ মানে? কি হবে?

– আনুবিস যখন ওজন করছে তখন আনুবিসের পিছনেই বসে থাকে একটা রাক্ষস, নাম আমিত, যার মুখটা কুমীরের, শরীরটা সিংহর আর পিছনের পা দুটো জলহস্তীর। এই পরীক্ষায় ফেল করলেই আমিত গব করে হৃদপিন্ডটাকে খেয়ে ফেলবে। ব্যাস ওটা ছাড়া তো আত্মা এক পাও চলতে পারবে না। ওই খানেই আটকে রয়ে যেতে হবে অনন্তকালের জন্য।

– তারপর কি হবে?

– তারপর আর কি? সেই অশরীরী আত্মা পৃথিবীর মাটিতে হানা দেবে মাঝে মাঝে। ভয় দেখাতে থাকবে তার উত্তরসুরীদের। তার কোন মুক্তি নেই আর।

 

ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে দশটা বাজে। চারপাশটা খালি খালি হয়ে গেছে। বেনুদাও কখন দোকান বন্ধ করে চলে গেছে। বেশ একটা কাঁপুনি লাগছে এবারে। সেটা শীতের উত্তুরে হাওয়ার জন্য? নাকি ভয়ে? চারপাশটা আগেরদিনে শোনা জোসারের কবরখানার গোলকধাঁধার মতো লাগছে কেন?

 

ভবেশদাকে বাই বলে আমরা চুপচাপ হোস্টেলে ফিরলাম। রাতের খাওয়া শেষ করে যখন ঘরে ঢুকছি তখন পিজি বলল,

– ভাই আজ রাতে দুজনে একটা খাটেই শুয়ে পড়ি নাকি?

– হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাই ভাল।

আজকে একা শোয়ার সাহসটা নিতে পারব না। স্বপ্নে আসবে ওসাইরিস, শিয়ালদেবতা আনুবিস আর কুমীরের মাথাওয়ালা আমিত।

আজকে ঘুমটা ঠিকঠাক এলে হয়।

(চলবে)

Author – অনির্বাণ ঘোষ

Cover Image Design: অনির্বাণ ঘোষ

Leave a Reply