করুণাময় আর মিষ্টি কুল

Biography, Conversation, Facts, Short Story, Story, বাংলা

শীত যেতে গিয়েও আটকে আছে সিলিং ফ্যানে। এসির আদুরে ছোঁয়া থেকে বেরিয়ে রোদে বেশিক্ষন দাঁড়ালে আগাম গ্রীষ্মের আঁচ পাওয়া যায়। কিন্তু দুপুরে ভরপেট ভাত মাছ খাবার পর ঘুম ভাব কাটানোর মোক্ষম উপায় এখন রোদ্দুর ভ্রমণ। অবশ্য আরেকটা উৎসাহও আছে বটে। অফিস গেটের বাইরে যারা ফল বিক্রি করে, ইদানিং মিষ্টি কুলের প্রচুর আমদানি হয়েছে। কামরাঙ্গাগুলোও বেশ মিষ্টি এখন। মানে, এখন আর বেছে খেতে হয়না। “যা নেবেন, গ্যারান্টী মিষ্টি।”

বাড়ীর থেকে আনা টিফিন বক্স খুলেই মন ভরে গেলো। এঁচোড়ের শুরু আজকেই। অমৃত, জাস্ট অমৃত। যিনি গাছ পাঁঠা নাম দিয়েছিলেন, তাঁর রস এবং রসনা, দুই বোধই সমান। তা এঁচোড়ের ডাব্বাটা শেষ করে পরিতৃপ্তির অন্য মর্গে পৌঁছে, শেষ ডাব্বা খুলতেই কি বলবো, চোখে প্রায় জল চলে এলো। দুটো নধর আকৃতির চিংড়ী, সর্ষে মশলার মধ্যে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। এরকম নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখে কোন মতে চোখের জল আটকে, জিভের জল সামলে বাকি ভাতটুকু দিয়ে জাস্ট পরিষ্কার করে ফেললাম। ভীমবার, স্কর্চবাইট আর কিছু লাগবে না। লাস্ট ঢেকুঁরটা তোলার পর আশেপাশের লোকগুলোকে দেখে জাস্ট করুণা হচ্ছিল। মানে আমারই পাশের টেবিলে বসে ক্যান্টিনের খাবার খাচ্ছে, আহারে কি দুঃখ। খাবারগুলো দেখলেই, পৌষ্টিকতন্ত্র একাধারে বিদ্রোহ করে ওঠে। ও খাবার কি আর গলা দিয়ে নামে!

বলা বাহূল্য, ভাতঘুম আজ না কাটাতে পারলে পোস্ট লাঞ্চ কলে, সাদা চামড়ার ক্লায়েন্টকে আমার নাসিকা নিঃসৃত সুমধূর গীত-বাদ্য শুনতে হবেই। সুতরাং, কোথায় রোদ্দুর?

বাঁধাধরা খরিদ্দার হবার মস্ত সুবাধে হলো, মুখ ফুটে বলার আগেই জিনিস প্লেটে চলে আসে। চারটে টোপাকুল কেটে অল্প ঝাল নুন ছড়িয়ে বিগলিত হাসি হেসে, প্লেট হাজির জনাব। নিত্যদিন দেখা হবার সুবাদে ওই ফল বিক্রেতার সঙ্গে টুকটাক দু’চার কথাও হয় রোজ। তার গ্রামের বাড়ির কথা, আমাদের অফিসের ভেতরের কথা, বাজারে জিনিসের দাম। আজও মুখ চলছিল – কুল আর গল্প দুটোতেই।
কাকার (মানে ওই ফল বিক্রেতাকে কাকা বলেই ডাকি) টিভি দেখার শখের কথাও আজ জানতে পারলাম। আর জানলাম রোজ নিয়ম করে সৌরভের দাদাগিরি দেখার কথা। আলোচনা এগোলো সেইদিকেই। টিভিতে আমার সেরকম কোনো টান না থাকলেও, ক্যুইজ নিয়ে কিঞ্চিৎ ব্যক্তিগত আগ্রহ আছে। সুতরাং বেশ এগোতে লাগলো কথা।

দু’চার কথা হতে হতে, কাকার কাছে যা শুনলাম তাতে মনে হলো দাদাগিরি শুধু কাজে নয়, মনেও হয়। ওই অনুষ্ঠানের কোনো এক পর্বে বছর চব্বিশ পঁচিশের এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন, যিনি পা দিয়ে সমস্ত লেখালিখি করে আজ সরকারী স্কুলের শিক্ষিকা হয়েছেন। পা দিয়ে লেখা তাঁর শখ নয়। হাত দুটি বিশেষ কাজ করেনা বলেই অদম্য সাধনায় আর মায়ের নিরন্তর প্রচেষ্টায়, পা দুটিকেই হাত বানিয়ে নিয়েছেন তিনি। সত্যিই, এমন ঘটনায় করুণা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনা বলার শেষে কাকা যখন বললো “দেখে দুঃখ লাগছিলো খুব, কিন্তু মনে আনন্দও হচ্ছিলো। এতো কষ্ট করেও লেখা পড়া শিখে ইস্কুল মাস্টার হয়েছে তো!”
শুনে, খানিকক্ষণের জন্য যেন থমকে গেলাম। কত সহজে এই ফলবিক্রেতা ভদ্রলোক দেখিয়ে দিল শুধু করুণা নয়, এই ঘটনাগুলো ভালো লাগারও বটে। আর সত্যিই তো, ওই শিক্ষক ভদ্রমহিলা নিশ্চই কারো করুণা চাননা। তিনি তো সফল – তাঁর প্রচেষ্টায়, অধ্যাবসায়ে, অসম লড়াইতে।

একই সঙ্গে দু’জনকেই কুর্নিশ জানালাম মনে মনে। আজকের দিনটা সত্যিই ভালো। প্রান্তিক একটা মানুষের আরো খানিকটা কাছে আসা গেল। পাওনাটা আমার। কত লোক কত ভাবে নিত্যদিন দাদাগিরি করে চলেছেন। তাই নিয়েই চলুক উদযাপন।

লেখক: শান্তনু দাশ

চিত্র: www.dogsblog.com

অলংকরণ: আনাড়ি মাইন্ডস

Leave a Reply