হায়রোগ্লিফের দেশে- ৬ হেতেফেরিসের রহস্য!!

Anirban & Arijit, বাংলা, হায়রোগ্লিফের দেশে

 

– আজ থেকে ৪৭০০ বছর আগের একটা দিন, মিশরের ফারাও হুনি নিজের প্রাসাদে মাথা নিচু করে বসে আছেন। দেশের মানুষ তাকে ভগবানের মতো পুজো করে। হেন কোন পার্থিব সম্পদ নেই যা তার আয়ত্তের বাইরে। তবুও হুনি আজকে নিঃস্ব। যে কোন পিতার সবচেয়ে কষ্টের কাজটা এইমাত্র তাকে করে আসতে হল। কবর দিয়ে এলেন নিজের একমাত্র পুত্রসন্তানকে। হটাৎ করেই একদম কম বয়সেই ছেলেটা চলে গেল। হুনির সামনে এখন একটা বড় প্রশ্ন, পরের ফারাও কে হবে? কোন পুরুষকেই তো বসতে হবে মেমফিসের মসনদে। কিন্ত হুনির বাকি সন্তানেরা তো সবাই কন্যা। এদিকে তার চারিদিকে শত্ররও তো অভাব নেই। শকুনের মতো তাকে তারা ঘিরে রাখবে। হুনি মারা গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সিংহাসনের জন্য। হুনির বয়স হয়েছে। এই বয়সে নতুন করে আর সন্তানের বাবা হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে উপায়?

এই বলে ভবেশদা একটা ভ্রু ওপরে তুলে আমাদের দিকে চাইল। দু নম্বর কবিরাজীটা এই একটু আগেই দিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু অর্ডার করিনি। এমনিতেই বাড়ি থেকে বেশি টাকা পাওয়া যায় না মাসের হাত খরচার জন্য। একদিনে দুটো করে ফিস কবিরাজী সাঁটালে পরের উইকএন্ডে হোস্টেলের ক্যান্টিনের ট্যালট্যালে ডাল ভাত দিয়েই পেট ভরাতে হবে। তার চেয়ে এই ভাল। ভবেশদাকে অন্তত আরেকটা কবিরাজী দিয়ে আটকে রাখা গেছে।

আমি ভবেশদার প্রশ্নর উত্তরে বললাম,

– হুম, খুব চাপের কেস বটে। তবে হুনি চাইলেই নিজের জামাইকেই দেশের রাজা বানাতে পারতেন তো। রাজত্ব আর রাজকন্যা দুটোই পাবে সে তাহলে।

– একদম ঠিক ধরেছ স্পন্দন ভাই। ফারাও হুনি ঠিক এই কাজটাই করেছিলেন। নিজের সবচেয়ে বড় মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন এমন একজনের যার বংশ নাম করা হলেও সেই বংশের কেউ কোনদিন আগে ফারাও হননি। হুনির পরে ইনিই ফারাও হন। হটাৎ করে ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া এই লোকটির নাম ছিল নেফ্রু।

– মানে খুফুর বাবা?

– হ্যাঁ, আর নেফ্রুর স্ত্রী, হুনির বড় মেয়ে যার জন্য নেফ্রুর ফারাও হওয়া সম্ভব হল সে হল রানী হেতেফেরিস! হেতেফেরিস শব্দের মানে হল সেই মেয়েটা যার হাসি মুখ।

পিজি এবারে ফিচ করে হেসে বলল,

– বুঝেছি, হেতেফেরিস বাঙালী হলে নাম হত সুহাসিনী!

– চ্যাংরামি শুরু করলে কিন্তু আমি উঠে যাব।

– না না, সরি সরি। আর কিছু বলব না, আপনি বলুন।

পিজি জিভ কেটে চুপ করে বসল।

– যেটা বলছিলাম, আরো অনেক রানী থাকলেও ফারাও নেফ্রু হেতেফেরিসকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন। কারণটা খুব স্বাভাবিক। ওই মেয়েটির জন্যই যে তিনি সম্রাট হতে পেরেছিলেন। আগেই বলেছি নেফ্রুর দুটো পিরামিড ছিল, একটা মেইদামে আরেকটা দাশুর নামের একটা জায়গায়। দাশুরের পিরামিডেই নেফ্রুকে সমাধিস্থ করা হয়। হেতেফেরিসকেও কবর দেওয়া হয় নেফ্রুরই পিরামিডের পাশে।

– বলছেন টা কি? হেতেফেরিসের সমাধি দাশুরে? আমরা তো জানতাম গিজাতে। খুফুর পিরামিডের পাশে।

ভবেশদার কথায় আমি একটু অবাকই হলাম এবারে।

– তুমি যেটা বলছ ঠিক, আবার আমার কথাও ঠিক।

– তার মানে হেতেফেরিসকে দুবার সমাধিস্থ করা হয়?

মুখে সেই ট্রেডমার্ক রহস্যাবৃত হাসিটা এনে ভবেশদা এবারে বলল,

– সেটা এখনই বলব না, আগে খুফুর একটা গল্প শোনো।

একদিন খুফুর দরবারে একটা লোক ভয়ে ভয়ে হাজির। খারাপ একটা খবর সে নিয়ে এসেছে, ফারাও জানতে পারলে হয়ত তার জন্য চরম শাস্তিও পেতে হতে পারে একে, কিন্তু খবরটা এমনই যে ফারাওকে জানাতেই হবে।

– কি খবর?

– ডাকাতির।

– কোথায়?

– দাশুরে, খুফুর মায়ের সমাধিতে।

-বলেন কি!

– হুমম, তবে আর বলছি কি। দাশুরের সমাধিক্ষেত্রকে যারা পাহারা দেয়, ইনি তাদের প্রধান। অনেক সাবধানতা নেওয়া সত্ত্বেও রাতের অন্ধকারে নাকি রানী হেতেফেরিসের সমাধিতে ডাকাত ঢুকেছিল। তবে খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। সমাধির একটা দেওয়ালই শুধু ভেঙে গেছে। ডাকাতেরা ভিতর থেকে প্রায় কিছুই নিয়ে পালাতেও পারেনি। পাহারাদারদের তৎপরতায় ওরা পালাতে বাধ্য হয়। তবে যেহেতু ওরা একবার সমাধিটার কথা জেনে গেছে তাই ফের কখনও সিঁধ কাটবার চেষ্টা করতেই পারে।

আমি বললাম,

– আচ্ছা এবারে বুঝলাম, তাই জন্যই খুফু ওর মায়ের সমাধিকে দাশুর থেকে সরিয়ে গিজাতে নিজের পিরামিডের কাছে নিয়ে চলে এলেন।

– একদম ঠিক ধরেছ।

– কিন্তু ভবেশদা তাহলে তো গিজার সমাধিতে হেতেফেরিসের মমি থাকার কথা। কিন্তু ছিল না কেন?!

– এত অধৈর্য হলে কি চলবে স্পন্দন ভাই? হেতেফেরিসের মমির কথা তো ছেড়েই দাও। সমাধিটাও খুঁজে পাওয়া যেত না যদি না একজন ফোটোগ্রাফারের ট্রাইপড পিছলাতো।

গল্পের মধ্যে আবার একটা নতুন গল্প, আমি আর পিজি এবারে শিরদাঁড়া সোজা করে বসলাম। ভবেশদা বলে চলল,

– পয়লা নভেম্বর ১৯২৪ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্পনসরশিপেতে খুফুর পিরামিডের দক্ষিণ-পূর্বদিকে নতুন এক্সক্যাভেশন শুরু হয়, আমেরিকান আর্কিওলজিস্ট জর্জ রেসনারের নেতৃত্বে। কিন্তু জানুয়ারির শেষের দিকে রেসনারকে কয়েকমাসের জন্য হার্ভার্ডে ফিরে যেতে হয়। যাওয়ার সময় জর্জ কাজের দায়িত্ব দিয়ে যান সাইট ম্যানেজার অ্যালান রো কে। আরেকটা বড় কাজ দেন মিশনের ফোটোগ্রাফার আবদৌকে। আবদৌ-এর কাজ ছিল রোজ কি কি কাজ হচ্ছে তার ডিটেলে ছবি তুলে রাখা। ভোরবেলায় আবদৌ সাইটে চলে আসত ক্যামেরা আর ট্রাইপড কাঁধে, শ্রমিকদের আসার ঘন্টা খানেক আগে, কাজ শুরু হওয়ার আগে একবার ভাল করে ছবি তুলে রাখত। আবার বিকেল বেলায় সেদিনের মত কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নতুন যা যা কিছু পাওয়া গেল সেগুলোর ছবি তুলত। সবমিলিয়ে হাজারের ওপরে ছবি তুলেছিল আবদৌ।

১৯২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটা ভোরবেলা। অন্য বাকি দিন গুলোর মতোই আবদৌ আজও পৌঁছে গেছে সাইটে। খুফুর পিরামিডের পূর্বদিকে একটা উঁচু জায়গা দেখে ট্রাইপড বসাতে গেল। কিন্তু কি অদ্ভুত! খরখরে বালির মধ্যেও ট্রাইপডটা স্লিপ করে গেল! ভাগ্যিস ক্যামেরার স্ট্র‍্যাপটা গলা দিয়ে ঝোলানো ছিল! নয়ত ওইটার বারোটা বাজত। আবদৌ এবারে ওই খান থেকে আরেকটু সরে এসে ট্রাইপড বসালো। কিন্তু খেয়াল করল ট্রাইপডটা বালির নিজে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে কি এখানে বালির নিচে অন্য কিছু আছে? সামান্য একটু বালির আস্তরণ হাত দিয়ে সরাতেই সেই অন্য কিছুটা দেখতে পাওয়া গেল। ঝুরো ঝুরো ময়লা আর সাদা চুনাপাথরের গুঁড়ো! এমনটা তো এখানে থাকার কথা নয়। তাহলে কি….!

তখনই আবদৌ একছুটে ডেকে আনল অ্যালান রোকে। শ্রমিকদের দিয়ে ওপরের বালি পরিষ্কার দেখা গেল একটা আয়তকার গর্তের মুখ। সেখানে জমে থাকা চুনাপাথরের টুকরোগুলোকে সরানোর পরে বেড়িয়ে এল বারো ধাপের একটা সিঁড়ি। কিন্তু সিঁড়ির শেষে কিছু নেই।

– যাহ! তারমানে ধাপ্পা!

– মোটেই তা নয়। সমাধিটা যাতে কেউ খুঁজে না পায় তাই সমাধির মুখ পাথরের টুকরো দিয়ে এই ভাবেই বুজিয়ে রাখা হত। শ্রমিকরা এবারে নতুন উদ্যমে ভারী ভারী পাথর গুলোকে সরাতে লাগল। সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই ন’মিটার গভীর গর্তে পৌঁছনোর পরে একটা মসৃণ পাথর পাওয়া গেল। পাথরের পিছনেই একটা লোকানো কুঠুরি। যেখানে রাখা আছে একটা মানুষের মাথার খুলি আর আর ষাঁড়ের তিনটে পায়ের হাড়।

– মাথার খুলি না হয় বুঝলাম। কিন্তু ষাঁড়!

– হ্যাঁ, দেবতাকে খুশি করার জন্য ষাঁড়ের বলি দেওয়া হত। রো এই হাড় দেখেই নিশ্চিত হলেন যে খুব কাছাকাছি কোন সমাধিই আছে। গর্তটা আরো গভীর হতে হতে ২৫ মিটারে এসে থামল। এবারে একটা বড় পাথরের চাঁই সরাতেই বেড়িয়ে পড়ল একটা অন্ধকার ঘর! কিন্তু মাটির অত নিচে থাকা সেই ঘরে সূর্যের আলো তো পৌঁছতেই পারছে না। শ্রমিকরা এবারে দারুণ একটা বুদ্ধির আশ্রয় নিল। কাঁচের আয়না দিয়ে সেই খাঁড়াই গর্তের মধ্যে সূর্যের আলো ফেলা হল

 

তারপরে সেই আলো রিফ্লেক্ট করানো হল আরেকটা আয়নায়, তারপরে আরেকটায়, এই ভাবে অন্ধকার ঘরটাতে অবশেষে আলো এসে পৌঁছল। ওই আলোয় ঘরের যেটুকু দেখা গেল তাতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল সবার!

ঘরের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে আছে সোনার টুকরো। কাঠের বড় পালঙ্ক, চেয়ার রাখা আছে। সেগুলোও জায়গায় জায়গায় সোনায় মোড়া। একটা বড় কাঠের বাক্স পাওয়া গেল। তাতে আটখানা ছোট ছোট পাথরের কৌটো রাখা, যার মধ্যে রাখা আছে সুগন্ধী তেল। মেয়েদের সাজগোজের সরঞ্জামও পাওয়া গেল। আর আছে অ্যালাবাস্টার পাথরের একটা কফিন! নাও পিজি, এবারে তোমার হেতেফেরিসের কবরে পৌঁছেছি।

পিজি একটু গোমরা মুখ করে বলল,

– বুঝলেন কি করে যে ওটা অন্য কারোর নয়, হেতেফেরিসেরই?

– নাম লেখা ছিল যে।

– অ্যাঁ, নাম লেখা ছিল?

– হ্যাঁ, একটা কাঠের পাতের ওপরে লেখা ছিল,

“ উপরের আর নিচের ইজিপ্টের মাতা, হোরাসের অনুগামী, রানী হেতেফেরিস!”

আমি এবারে বললাম,

– তাহলে হেতেফেরিসের এই সমাধির খোঁজ ডাকাতরা আর পায়নি।

– না পায়নি, তাই তো এত কিছু পাওয়া গিয়েছিল এর মধ্যে। তবে এবারে মুশকিলটা হল অন্য জায়গায়। জর্জ রেসনার হার্ভার্ড থেকে ফিরে আসার পরে হেতেফেরিসের সমাধির জিনিসপত্রগুলো বার করা শুরু হয়। সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো কাঠের খাট, চেয়ার, বাক্স গুলোর হাল খুব খারাপ ছিল। অনেক গুলো জায়গাতে শত টুকরো হয়ে পড়েছিল মেঝেতে। সেই সব টুকরো গুলোকে খুব সাবধানে গুছিয়ে ওই ২৫ মিটার লম্বা গর্ত থেকে বার করতে লেগে গেল ৩২১ দিন। মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট সোনার টুকরোগুলো ওই আসবাবপত্র থেকেই খসে পড়েছিল। মোম গলিয়ে মাটিতে ফেলে তোলা হল ওগুলোকে। কিন্তু এই শত সহস্র টুকরো গুলোকে জোড়া লাগাবে কে? রেসনার নিজে পৃথিবীর তাবড় তাবড় এক্সপার্টের দ্বারস্থ হলেন। তাতেও কোন সুবিধা করে উঠতে পারলেন না। শেষে কায়রো মিউজিয়ামের ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যান্টিক্যুইটি থেকে পাঠানো হল আহমেদ ইউসুফ নামের একজনকে। রেসনার প্রথম প্রথম তাকে পাত্তা দেননি। কিন্তু চারিদিকে অনেক চেষ্টা করেও কোনও আশার আলো না দেখে রেসনার যখন হাল ছেড়ে দিতে বসেছেন তখন আহমেদ ওকে বললেন,

‘ সুযোগ পেলেই আমি এই টুকরোগুলো জুড়ে দিতে পারি।’

এই কথায় রেসনার বেশ হাসলেন। কিন্তু আহমেদ একদম অবিচলিত ভাবে আবার বললেন,

‘ আমাকে এক সপ্তাহ একদম একা ছেড়ে দিন,’

এক সপ্তাহ ও লাগল না,ছদিনের মাথাতেই রেসনার অবাক হয়ে দেখলেন আহমেদ একটা গোটা বাক্স জোড়া লাগিয়ে ফেলেছে। ওপরের সোনার সুক্ষ কাজ নিয়ে! এই ঘটনার পরে রেস্টোরেশনের কাজটা রেসনার আহমেদের ওপরেই ছেড়ে দেন। আহমেদ একে একে রানীর খাট আর চেয়ারগুলোও জোড়া লাগিয়ে ফেলেন। এগুলো এখন কায়রোর মিউজিয়ামে রাখা আছে।

 

 

 

 

– আর হেতেফেরিসের মমি?

– হ্যাঁ, এবারে তার কথায় আসি। হেতেফেরিসের অ্যালাবাস্টার কফিনটা দারুণ ভাল অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। ৩রা মার্চ, ১৯২৭ সালে জর্জ রেসনার এই কফিনটা খোলেন। কিন্তু ভিতরে কিছু পাননি! হেতেফেরিসের মমি হাওয়া! অথচ কফিনের সাথেই চারটে ছোট ছোট পাথরের জারও পাওয়া গিয়েছিল। ওগুলোর মধ্যে ছিল হেতেফেরিসের ফুসফুস, স্টমাক, লিভার আর ইন্টেস্টাইন।

– হেতেফেরিসের মমিটা তাহলে গেল কোথায়?! ওটাকে তো দাশুর থেকে তুলে নিয়ে এসে গিজার ওই কবরেই রাখা হয়েছিল বললেন?

– না তো, আমি কি বলেছি হেতেফেরিসের মমি শুদ্ধু সব কিছু আনা হয়েছিল দাশুর থেকে?

– মানে?

– মানে মিথ্যে।

– মিথ্যে?

– হ্যাঁ, ফারাও খুফুকে সেদিন মিথ্যে কথা বলা হয়েছিল। ডাকাতরা হেতেফেরিসের সমাধি লুট করার সময় মমিটাকেও নষ্ট করে ফেলে। খুব সম্ভবত মমির গায়ে লাগানো সোনার জুয়েলারি আর দামী পাথরের জন্যই। কিন্তু সেই খবর খুফুকে দিলে কারোর শরীরে আর মাথা থাকত না। তাই সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাটাকে। খুব তাড়াহুড়ো করে দাশুর থেকে সমাধির যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেই টুকুকে তুলে নিয়ে চলে আসা হয় গিজার সমাধি। ফাঁকা কফিনটাও সেই সময়তেই নিয়ে এসে রেখে দেওয়া হয়। খুফু তো আর কফিন খুলে মৃত মায়ের মমি দেখতে চাইতেন না!

-কিন্তু এই ঘটনাটা জানা গেল কিভাবে? কোথাও লেখা ছিল নাকি?

– না লেখা থাকবে কি করে? হেতেফেরিসের ফাঁকা কফিনের কারণটা জর্জ রেসনারেরই হাইপোথেসিস বলতে পারো। পাক্কা গোয়েন্দার মতো তিনি এই স্বিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।

– কি ভাবে!

– হেতেফেরিসের সমাধিতে ঢুকেই রেসনার খেয়াল করেন সমাধিতে অনেক আসবাবপত্র থাকলেও সেগুলো সব অগোছালো ভাবে রাখা আছে। যেন কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে কাজটা করতে চেয়েছে। তার একমাত্র লক্ষই ছিল যত জলদি সম্ভব হেতেফেরিসের জিনিসপত্র গুলোকে এক জায়গাতে রেখে সমাধিটা বন্ধ করে দেওয়া। আর পাথরের জার গুলোতে পাওয়া দেহের অংশই বলে দিচ্ছে যে কফিনের মধ্যেও একসময় হেতেফেরিস শুয়েছিলেন।

– তার মানে মমিটা সত্যিই পাওয়া যায়নি!

– না, যায়নি। তবে পরে আবার সেটা কফিনে ফিরেও আসেনি। শুনতে খারাপ লাগলেও এই জায়গাতে সুনীল গাঙ্গুলী ভুল ছিলেন। তাও ওনার জন্যই তোমরা হেতেফেরিসের নামটা অন্তত শুনেছিলে।

তবে বুঝলে মানিকজোড়, বইটাতে আরো দুটো ভুল আছে। হেতেফেরিসের সমাধির বর্ণনা ঠিক নেই। ১২৪ নম্বর পাতায় কি অফ লাইফের ছবিটাও ভুল আঁকা আছে।

– কি অফ লাইফ!

– হুমম, সেটা কি জিনিস পরে বলব খন। এখন চল ওঠা যাক। অনেকক্ষণ ধরে ফাঁকা প্লেট সামনে রেখে আমরা গল্প করে যাচ্ছি। রেস্ট্যুরেন্টের লোকেরা না তেড়ে আসে।

দিলখুশা থেকে বেড়িয়ে এম জি রোডের ওপরে এসে দাঁড়ালাম। ভবেশদা শিয়ালদার বাস ধরে নিলেই আমরা উল্টোদিকে হোস্টেলের পথে হাঁটা লাগাবো। দূরে দেখলাম শিয়ালদার বাস আসছে। ভবেশদা সেই দিকে তাকিয়ে বলল,

– তোমাদের তাহলে গিজার পিরামিড চত্বরের প্রায় সব কিছুই বলে দিলাম, বাকি রয়ে গেল শুধু হোর-এম-আখেতের গল্প।

– হোর-এম-আখেত? সেটা কি?

– সেটা? সেটা হল…

স্ফিংস!!

বলেই ভবেশদা টপ করে বাসে উঠে পড়ল।

(চলবে)

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
লেখক ~ অনির্বাণ ঘোষ

কভারের ছবি- সৌমিক পাল

Leave a Reply