বহুরূপী

Anirban & Arijit, Dad & Daughter, Freedom, History, Love Story, Short Story, Story, আদতে আনাড়ি, বাংলা

আবার বেজে উঠল সাইরেন!! এক মাসের মধ্যেই এই নিয়ে তিনবার।

একতলা থেকে মায়ের গলা শোনা গেল, “এরিন, তাড়াতাড়ি নেমে আয়, পুলওভার গলিয়ে নিস, বাইরে বেশ ঠান্ডা।” সত্যিই হাড় কাঁপানো বাতাস বইছে আজ বিকেল থেকেই। শীতের শুরুতেই এতটা ঠান্ডা হলে এরপরে কি হবে ভেবেই শিউরে ওঠে জেকব, চিন্তা যে শুধু বউ মেয়ে কে নিয়েই। হিটারটাও কদিন হল দেহ রেখেছে, সারাবারও উপায় নেই এখন, কম্বল দিয়ে আর কতো কাজ চালানো যায়। দরজার পাশের আঁকশি তে ঝুলে থাকা কোট টা নামিয়ে গায়ে গলিয়ে নিল জেকব। এরিন এসে দাঁড়াল পাশেই, হাতে আঙটায় ঝোলানো একটা লোহার খাঁচা।

– মা কে বল তাড়াতাড়ি আসতে, এরপর দাঁড়াবার জায়গাও পাওয়া যাবে না।
– বলছি তো, মা তো জানলা বন্ধ করতেই ব্যস্ত।

হন্তদন্ত হয়ে গলায় স্কার্ফ জড়াতে জড়াতে এগিয়ে এল নাওমি, “চলো চলো, চাবি নিয়েছ তো?”

দরজা আটকে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করল এরিন বাবা মায়ের পিছু পিছু। রাত ১১ টার সময় এইভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ার মধ্যে একটা দুঃসাহসিক ব্যাপার আছে ঠিকই, তবে বাবার মুখ টা দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায় এরিনের, মনে হয় বাবা খুব চিন্তা করে ওকে নিয়ে। তবে চিন্তা কার না হবে এই পরিস্থিতিতে, রাতের শহর হঠাৎ যেন কাঁচা ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে, চারিদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণদামামা। সবাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রাণপণে ছুটতে ব্যস্ত, বাচ্চাগুলোকে আগে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে পারলে তবেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। এখান থেকে ১ মাইল মতো হাঁটাপথ, টাউন সেন্টার পেরিয়ে যেতে হয়। শহরের চৌহদ্দিতে এই একটাই মাত্র বাঙ্কার বোমার হাত থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য। আগে আর একখানা ছিল স্টেশনের কাছে, পাথরের তৈরি বিশাল কেল্লা মতন, কিন্তু গেল বছর সে নিজেও ধূলিসাৎ হল, আর সাথে কমিয়ে দিল জেকবের অনেকগুলো বন্ধুর সংখ্যা। এই নতুন বাঙ্কার টা মাটির নিচে, কাউন্সিলারই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়ে দিয়েছেন। যদিও আগেরবারের সেই ভয়াবহ রাতের পর থেকে অনেকবার এয়ার রেড হলেও তার আঁচ এদিকে খুব একটা পড়েনি, কিন্তু কখন কোথায় শক্তিশালী মারণ বোমা এসে আছড়ে পড়ে, তার ভবিষ্যৎবাণী যে ক্যাথিড্রালের ফাদারও করতে পারেন না।

টাউন সেন্টারের ঠিক মাঝখানেই শ্বেতশুভ্র প্রভু যীশুর ক্রুশ সমেত বিশাল লম্বা মূর্তি। মাথা নীচু, কিন্তু চোখের দিকে তাকালে মন শান্ত হয়ে যায়। দুই হাতের তালুতে গোল পেরেকের চিহ্ন। ক্রুশের নিচের প্রান্ত একটা মাঝারি সাইজের ঘরের ছাদের মাথায় বসানো। মূর্তির পাদদেশে এই ঘরে নাকি যীশু বাস করেন, এমনটাই বিশ্বাস সকল শহরবাসীর। ক্রিস্টমাসের দিন ভিড় উপচে পড়ে এই টাউন সেন্টারে, ছোট ঘরটার ভেতরে নানানরকম গিফ্ট দিয়ে সাজানো হয়, একটা লোহার খাটের পাশে রাখা টেবিলে ওয়াইন রেখে দেওয়া হয়। আশেপাশের কাউন্টি থেকেও লোকজন এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যায়। যে শহরে যীশু নিজে বাস করেন, সেখানকার অধিবাসীদেরও যে কেন এমন ভয়ে ভয়ে রাত কাটাতে হয়, এর কারণ খুঁজে পায় না এরিন। স্কুলে আবার বন্ধ হওয়ার নোটিশ পড়ে গেছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য, কিন্তু এরিনের যে পড়তে ভালো লাগে, বন্ধুদের সাথে খেলতে ইচ্ছে করে রোজ। মাসখানেক আগে এরিনের ১৬ বছরের জন্মদিনে স্কুলের ম্যাম এই স্যান্টা গিফ্ট করেছিলেন, সেই থেকে স্যান্টাই এরিনের বেস্ট ফ্রেন্ড। বাবা প্রথমদিন দেখেই বলেছিলেন যে এই জাতের পায়রা নাকি আজ অবধি কোনদিনও দেখেননি এর আগে কোথাও, যেমন দুধসাদা গায়ের রঙ, তেমন কুচকুচে কালো চোখদুটো, ডানায় আবার গোল কালো ছোপ। স্যান্টা নামটা এরিনেরই দেওয়া, হয়তো গুবলু গাবলু দেখতে বলেই।

খাঁচার গায়ে একটা মোটা চাদর জড়িয়ে নিয়েছে এরিন, যাতে স্যান্টার ঠান্ডা না লাগে। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে জোরে জোরে হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে যায় এরিন, মুখ চোখ যেন কেটে নিচ্ছে তীব্র ঠান্ডা হাওয়ায়, সাইরেনের শব্দ আরও জোরালো আগের থেকে, দূর থেকে হাল্কা ভেসে আসছে ফাইটার প্লেনের ভয় ধরানো এঞ্জিনের আওয়াজ, তাড়াতাড়ি পা চালায় নাওমি। বাঙ্কারের সামনে এসে পড়ে জেকব, ভিড়ের মাঝেই কায়দা করে নাওমি আর এরিন কে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। বেশ খানিকটা মাটির নিচে নামতে হয় এখানে। ভেতরটা তুলনামূলক গরম। আজ মোটামুটি ভরে গেছে এই এয়াররেড শেল্টার। তাড়াতাড়ি একটা জায়গা দখল করে মা কে পাশে বসিয়ে দেয় এরিন, কোলে নিয়ে নেয় স্যান্টা কে, জেকব বসে পড়ে মাটিতে। এবার শুধুই অপেক্ষা গোটা একটা রাতের।

চেনা চেনা মুখের সারিতে ভর্তি সামনে পিছনে, কিন্তু সকলেরই যেন মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে, প্রতিবেশী কে দেখেও যেন হাসতে ভুলে গেছে এই শহর। কান খাড়া করে সবাই শুনতে থাকে বাইরের আকাশে বিমানের গর্জন। ঐ দূরে কোথাও বোমার আওয়াজ শোনা গেল না! বুকের ভেতর টা কেঁপে উঠল এরিনের। এখানে এলেই মনে হয় সকালে হয়তো বাইরে বেরিয়ে দেখবে শহরটাই আর নেই, হয়তো ওদের বাড়ির আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। কতোদিন, আর কতোদিন এইভাবে ভয়ে ভয়ে রাত কাটাতে হবে জানে না এরিন। কেন যুদ্ধ হয়, এতে কারা জেতে, এইসব নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করে না ওর। খাঁচার ভেতর হাত ঢুকিয়ে স্যান্টার মাথায় আলতো করে স্পর্শ করে, বেচারা এইসব জানেও না, বোঝেও না, অথচ কতো ধকল সইতে হয় ওকে।

বাইরের বীভৎস আওয়াজ একটু বাদে কানে সয়ে আসে, যেন কোনও এক উপায়ে ওকে বশ করার চেষ্টা চলছে মনের মধ্যে। আগের দুবার একটা সোনালি চুলের ছেলে খুব সুন্দর গান গেয়ে ভুলিয়ে রেখেছিল সবাইকে, আজ তাকে খোঁজার চেষ্টা করল কয়েকবার এরিন, উঠে এক দুবার দুপাশে দেখল, কিন্তু না, ভয় হয় কখন কাকে হারাতে হয় ভগবানও বোধহয় জানে না। মনটা না চাইতেও কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল এরিনের, এমন তো আগে কোনদিন হয়নি, এ আবার কি অদ্ভুত রকমের চিন্তা! ছেলে টা কে তো সেইভাবে চেনেও না, বা নামও শোনেনি। ঠিক এমন সময় ওর মিষ্টি গলা টা ভেসে এল দেওয়ালের পিছন দিক থেকে। এতটা ঘুরে ওদিকে যে যাওয়াও যাবে না, কিন্তু খুব দেখতে ইচ্ছে করছে যে এরিনের। বাবা নিচে থেকে বলে উঠল, “কি মিষ্টি গলা না ছেলেটার, আমার বন্ধু এডওয়ার্ডের ছেলে, নাম হচ্ছে নিক। আগেরবারের সেই অ্যাটাকে মারা যায় এডওয়ার্ড।”

উঠে উল্টোদিকে যাবে বলেই ঠিক করছিল এরিন, কিন্তু হঠাৎ দেখতে পেল নিক নিজেই গান গাইতে গাইতে চলে এসেছে এইদিকে, চারিদিকের ভিড়ে কাউকে খুঁজছে মনে হয়। এরিনের দিকে চোখ পড়তেই কেমন লজ্জা পেয়ে গেল, মুচকি হাসি খেলে গেল ওর ঠোঁটের কোণে। এরিনও কেমন একটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল নিজের মধ্যেই, মনটা যেন হঠাৎ এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠল, আর স্যান্টাও হঠাৎ ডানা ঝাপটে উঠল কয়েকবার। বেশ কয়েকজনকে ডিঙিয়ে পাশ কাটিয়ে কোনরকমে এরিনের উল্টোদিকের বেদী তে এসে বসল নিক।

জেকব হেঁসে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো নিক? মা কেমন আছেন?” ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দিল নিক, “ভালো আছে আঙ্কেল, যতোটা পারি ভালো রাখার চেষ্টা করছি মা কে, কিন্তু এখনও সেই রাতের কথা মনে পড়লেই আতঙ্কে কেঁদে ওঠে। খালি বলে গড আমার পা টাই কেন নিল শুধু, আমাকেও তো নিতে পারতো।”

এরিনের কেন জানে না চোখ ফেরাতেই ইচ্ছে করছে না নিকের দিক থেকে। আলো আঁধারি পরিবেশে ওর সোনালি চুলগুলো মুখের ওপর পড়ে চকচক করছে। একই বয়স হবে মনে হয় ওরও, বা একটু বড়ও হতে পারে। কোথায় বাড়ি কে জানে, বাবা কে জিজ্ঞেস করলে হয়তো জানা যেতে পারে। নিক ওর ছোট্ট উকুলেলে বাজিয়ে আবার গান ধরল। মনভোলানো সুর ছেলেটার গলায়। বাইরের কাঠখোট্টা জগতের দ্বেষ বিদ্বেষ সব যেন মলিন হয়ে যায়। বাঙ্কারের প্রতিটা মানুষকে যেন একই সুরে বেঁধে ফেলে মোহাচ্ছন্ন করে দেয়। এরিন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। রাত বেড়ে চলে।

||

স্যান্টার বকম বকম আওয়াজে ঘুম ভাঙল এরিনের। মায়ের কোলেই শুয়ে পড়েছিল কখন খেয়ালই নেই। দরজার দিক দিয়ে দিনের আলো চুঁয়ে ঢুকছে কিছুটা। চোখ কচলে উঠে বসল এরিন। আশেপাশের লোকজনও ধীরে ধীরে বাইরে বেরোতে শুরু করেছে। সামনের বেদী ফাঁকা, নিক মনে হয় চলে গেছে। উঠে পড়ে এরিন, স্যান্টা কে নিয়ে নেয় হাতে।

“বাইরের কি খবর বাবা?” বেরোতে বেরোতে জিজ্ঞেস করে এরিন।
– জানি না রে, খুব একটা জোরালো আওয়াজ তো শোনা যায়নি এদিকে। মন বলছে এ যাত্রাও বেঁচে গেলাম আমরা। দেখি, নিজের চোখে নিজের বাড়ি না দেখা অবধি তো নিশ্চিন্ত হওয়ার জো নেই।
– আচ্ছা বাবা, এডওয়ার্ড আঙ্কেল কোথায় থাকতেন?
– ওদের বাড়ি তো টাউন সেন্টার থেকে বাঁদিকে যে রাস্তা টা ক্যাথিড্রালের দিকে যায়, সেইদিকে। আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে গেলে ১০ মিনিট।

বাইরে বেরিয়ে আসে এরিন। নাহ্, বাবার কথাই ঠিক, এদিকে কাল খুব একটা প্রভাব পড়েনি। নাওমির পাশে পাশে হাঁটতে থাকে এরিন। টাউন সেন্টার আজ জমজমাট। সবাই নিজের বাড়ির দিকে দৌড়তে ব্যস্ত। যীশুর মূর্তিটার সামনে এসে দাঁড়ায় জেকব, বুকের ক্রুশ লকেট টা কে চুমু খেয়ে বলে, “এরিন কে দেখো প্রভু!” ঝটপট করে ডানা ঝাপটাতে শুরু করে স্যান্টা, খাঁচার ওপর থেকে চাদর সরিয়ে নেয় এরিন। স্যান্টাও ঘাড় উঁচু করে যীশুর দিকে মিটিমিটি চোখে তাকায়। “দেখ এরিন, স্যান্টাও প্রার্থনা করছে তোর জন্য,” জেকব বলে ওঠে।

বাড়ির গলির কাছে এসে শেষ বাঁক টা ঘুরেই নিজের সাধের বাড়ি কে অটুট অবস্থায় দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় জেকব আর নাওমি। তিলে তিলে জমানো বহু কষ্টার্জিত অর্থে তৈরি তাদের এই একচিলতে কাঠের কুটির। তিনবছর আগে দোতলা বানিয়েছিল জেকব। যুদ্ধের আভাস যে পায়নি তখন। তবে নাওমির মন কু গায়, এই ভিটে বেশিদিন টিকবে না আর, যুদ্ধের গ্রাসে হারিয়ে যাবে একদিন। এরিন এগিয়ে এসে মায়ের হাত ধরে, “খুব খিধে পেয়েছে মাম্মা, চলো না ঘরে।”

||

বোমাবর্ষণের রেশ একটু কমেছে দু-এক সপ্তাহ হল। এরিন আজ সাহস করে অনেকটাই চলে এসেছে হেঁটে, হাতে ধরা স্যান্টার খাঁচা। খুব মজা করে স্যান্টা বরফের মধ্যে। খাঁচা খুলে বাইরে ছাড়তে ভয় করে, যদি পালিয়ে যায়। ক্যাথিড্রাল দেখা যাচ্ছে ঐ রাস্তার শেষে, তার মানে এডওয়ার্ড আঙ্কেলের বাড়ি এই রাস্তা তেই। এই কদিন প্রবল তুষারপাতের জন্য বাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি এরিন, খুব কষ্ট হয়েছে, যে কষ্ট স্যান্টা ছাড়া আর কাউকে বলতে পারেনি। নিক-এর মুখ টা আর একবার দেখতে না পাওয়ার কষ্ট। তাই আজ সাহস করে বাবার বলে দেওয়া পথে নিজেই এসে হাজির। কিন্তু এখন সমস্যা হচ্ছে যে নিক কে খুঁজবে কি করে, আর দেখতে পেলেই বা কি বলবে। খেই হারিয়ে ফেলে এরিন। গুটিগুটি পায়ে এগোতে থাকে সব বাড়িগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে। টাইটেল ও জানা নেই যে নেমপ্লেট দেখে আন্দাজ করবে।

রাস্তার শেষপ্রান্ত এসে যাচ্ছে, আর ৫-৬ টা বাড়ি বাকি। জোরে “নিইইইক” বলে একবার ডেকে দেখবে? নাহ্, বোকামি হবে খুব। রাস্তার শেষে এসে দাঁড়ায় এরিন। মাথা নীচু করে ফেলে বিষণ্ণতায়। কিভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে নিক কে। এমন সময় পেছনে বেশ দূর থেকে ডাক টা আসে, “এরিইইইন, এরিইইইন, এদিকে এসো।”

এ তো চেনা গলা না হয়েও যেন খুব কাছের। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকায় এরিন। বরফাবৃত রাস্তায় দূরে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিক, হাত নাড়ছে। লজ্জায় হেসে ফেলে এরিন। হাঁটার গতি বেড়ে যায়, ছুটতে শুরু করে নিক-এর দিকে।

||

লেকের ধারের বেঞ্চে বসে এরিন জিজ্ঞেস করে,

– তুমি ভয় পাও না নিক? যদি এই শহর পুরো ধ্বংস হয়ে যায় কোনদিন?

– সে তো হবেই এরিন, আমরাও আর কেউ থাকবো না, থাকবে শুধু আমাদের এই সময়ের স্মৃতি।

– এই যুদ্ধ বন্ধ করা যায় না? আমরা চেষ্টা করতে পারি না?

– আমরা খুব সাধারণ মানুষ এরিন। যুদ্ধের ক্যাজুয়ালটি তেই শুধু আমাদের নাম আসে। তবে ভালো কথা। কাল কাউন্সিলার সভা ডেকেছেন, বাচ্চা আর স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাড়া সকলকে হাজির থাকতে বলেছেন বিশপ রোডের মাঠে। সেখানেই আলোচনা হবে কিভাবে আমরা এই যুদ্ধের মোকাবিলা করতে পারি।

– বিশপ রোড তো অনেক দূর!

– হ্যাঁ, তবে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তোমার বাবা মা-ও তলব পেয়েছেন মনে হয়। আমার মা পারবে না যেতে, জানিয়ে দিয়েছি। আমার খুব যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ঢুকতে দেবে না বয়সের জন্য।

– আমার খুব ভয় হয় নিক। আমি তোমাদের কাউকে আর হারাতে পারবো না।

– ভরসা রাখো, তোমার গায়ে আমি কোনও আঁচ লাগতে দেব না।

নিক-এর কাঁধে মাথা রাখে এরিন। খাঁচার ভেতর থেকে চেয়ে থাকে স্যান্টা।

||

দুপুর থেকেই আজ বাইরের রাস্তায় ভিড়। সবাই সারি বেঁধে চলেছে কাউন্সিলারের ডাকে।

– এরিন মা, দরজা বন্ধ রাখিস। কোনও চিন্তা করবি না আমাদের নিয়ে। সাইরেন বাজলেই বাঙ্কারের দিকে চলে যাস, তবে মনে হয় না আজ কিছু হবে বলে।

– তোমাদের সভা থেকে বাঙ্কার কত দূর বাবা?

– অনেকটাই দূর আছে রে, তবে আমি বলছি নিশ্চিন্ত থাক, আজ সব শান্ত থাকবে। আমি আর নাওমি ফিরে ডিনার করব সবাই একসাথে। আর হ্যাঁ, একটা সারপ্রাইজ আছে তোর জন্য।

– কি বলো না বাবা!

– একি, সারপ্রাইজ আবার বলে নাকি!

নাওমি হেসে ওঠে। “কেন খেপাচ্ছ ওকে? বলে দাও না। আমি বলছি শোন। আজ ডিনারে আমাদের একজন স্পেশাল গেস্ট আসছে…… নাম তার নিক।”

এরিন লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যায় জেকব আর নাওমি।

||

তুষারপাতের যেন বিরাম নেই। একঘেয়ে লাগে এরিনের এই সাদা সাদা রাস্তাঘাট। বাবা মা বেরিয়ে যাওয়ার পর ২ ঘন্টা কেটে গেছে। দুপুরের খাবার খেয়ে স্যান্টার জন্য কৌটো খুলে দানা বার করে। একমাত্র খাওয়ানোর সময়ই খাঁচার দরজা খুলে দেয়। শান্ত পাখি, ও ভেতরেই থাকে, কিন্তু খাবার দিতে সুবিধে হয়। হঠাৎ রাস্তার দিকে চোখ পড়ে এরিনের, মুহূর্তের জন্য চমকে ওঠে, কিন্তু এক অজানা ভালোলাগায় ভরে যায় মন টা। নিক আসছে বাড়ির দিকেই। দুষ্টু ছেলে, ডিনারের নিমন্ত্রণ সারতে দুপুরবেলাতেই বেরিয়ে পড়েছে।

এরিন ছুটে এসে হাসিমুখে দরজা খোলে। নিক হাত নাড়ে দূর থেকে। সাদা ধবধবে রাস্তায় সোনালী চুলের নিক কে যেন রাজকুমার লাগছে আজ। কাছাকাছি আসতেই অকস্মাৎ কানফাটানো শব্দে বাজতে শুরু করে আশেপাশের সবকটা সাইরেন! ছুটে এরিনের কাছে চলে আসে নিক, ওর হাত টা ধরে বলে, “এরিন, খুব তাড়াতাড়ি চলো আমাদের বাঙ্কারে যেতে হবে। আমি মা কে নিয়ে আসছি।”

ঘাবড়ে যায় এরিন। কি হবে বাবা মার। ঘরে ঢুকতে গিয়ে ডানার ঝটপটানি তে চমকে ওঠে। স্যান্টা বেরিয়ে পড়েছে খাঁচা থেকে। একদম ভুলে গেছিল এরিন ওর খাঁচার দরজা বন্ধ করতে। স্যান্টা উড়ে গিয়ে বসে সামনের পাঁচিলে। এরিন তাড়াতাড়ি নেমে পাঁচিলের দিকে ছুটে যায়, কিন্তু স্যান্টার আজ মুক্তির স্বাদ, উড়ে গিয়ে বসে সামনের বাড়ির কার্নিশে। নিক ছুটে এসে চেঁচাতে থাকে, “এরিন, ওকে ছেড়ে দাও, আমাদের হাতে সময় খুব কম, চলো আমরা রওনা দি।” হাত ছাড়িয়ে নেয় এরিন, পায়রার দিকে ছুটে যায়, আর সেও এগোতে থাকে এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়ি, এক কার্নিশ থেকে আর এক কার্নিশ। এরিনের এই পাগলামি তে ওকে ছেড়ে পালাতেও পারে না নিক, পেছন পেছন ছুটতে থাকে, “এরিইইইন, বোকামি কোরো না, ওকে যেতে দাও।” এরিন ছুটতে ছুটতে জবাব দেয়, “না, ও মরে যাবে, ওকে ছাড়তে পারব না নিক, তুমি ফিরে যাও।”

সাইরেনের আওয়াজ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রাস্তাঘাট মোটামুটি খালি আজ। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ফাইটার বিমানের শব্দ। এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে এরিন, আজ কি তবে এই শহরের শেষ দিন! চকিত ভেঙে আবার স্যান্টার পেছনে দিশাহারা হয়ে ছুটতে থাকে। বাধ্য হয়ে নিক দৌড়তে থাকে পিছু পিছু।

এই রাস্তা দিয়েই টাউন সেন্টার যাওয়া যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিক আঁতকে ওঠে। শয়ে শয়ে ফাইটার প্লেনে ছেয়ে গেছে আকাশ। আর কিছুক্ষণ বাদেই বম্বিং শুরু হবে নির্ঘাত। এরিন ছুটে চলেছে স্যান্টা কে ধাওয়া করতে করতে। বোকা মেয়েটাকে কে বোঝাবে আজ। সামনের গলি টা পেরোলেই টাউন সেন্টার। ঠান্ডা হাওয়ায় দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে যাচ্ছে এরিন। তবু ওর রোখ চেপে গেছে আজ, স্যান্টা কে বাঁচাতেই হবে। সামনেই দেখা যাচ্ছে টাউন সেন্টার। ফাইটার বিমান গুলো খুবই নিচ দিয়ে উড়তে শুরু করেছে। টারগেট ঠিক করছে মনে হয়। বাঙ্কার অবধি যাওয়ার আর সময় পাওয়া যাবে না এখন।

হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দের সাথে কেঁপে উঠল পায়ের তলার মাটি। চমকে গিয়ে কানে হাত দিল এরিন। বেশ কিছুটা দূরেই পড়ল প্রথম বম্ব, আগুনের ঝলকানি আর ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। নিক এরিনের হাত ধরে চেঁচিয়ে ওঠে, “এরিইইইন, আমাদের এক্ষুনি কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।” কথা শোনে না এরিন। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আঙুল দিয়ে দেখায় ল্যাম্পপোস্টের ওপর বসে থাকা স্যান্টা কে। চাইলে তো আরও উঁচু তে উড়ে পালিয়ে যেতে পারতো ও, কিন্তু এতদিন বন্দী অবস্থায় থেকে হয়তো ঘাবড়ে গেছে। ডানা ঝাপটে টাউন সেন্টারের মধ্যে দিয়ে উড়তে থাকে স্যান্টা, অনেকটা উড়ে গিয়ে যীশুর মূর্তির পায়ের ওপর বসে। এরিন আর নিক দূরে দেখতে পায় স্যান্টা কে।

কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মূর্তির পেছনের দিকের একটা বাড়ির ছাদ উড়ে যায় বোমার আকস্মিক আঘাতে। পুরো শহরটা ঘিরে ফেলেছে ফাইটার প্লেনে, আর নিস্তার নেই। স্যান্টা উড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ে যীশুর পায়ের নিচের ছোট ঘরে। এরিন আর নিক ছুটতে শুরু করে সেইদিকে। মাথার ওপরেই পাক খাচ্ছে আর একটা প্লেন। নিক ছুটতে ছুটতে ওপরে তাকিয়ে নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারে না, দেখে প্লেনের তলা থেকে মাটির দিকে নেমে আসছে লম্বা আকৃতির একটা বম্ব। আরও দ্রুত গতিতে এরিনের হাত ধরে টেনে ছুটতে থাকে নিক। যীশুর মূর্তির পাদদেশে এসে এরিন ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর স্যান্টা কে ধরার জন্য। নিক একবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকায়। আগে যে ল্যাম্পপোস্টের সামনে ওরা দাঁড়িয়েছিল, সেখানে সজোরে আছড়ে পড়ে একটা প্রকাণ্ড বম্ব। চারিদিক অন্ধকার হয়ে কানে তালা লেগে যায়। ছিটকে ঘরের ভেতর গিয়ে পড়ে নিক।

~ || ~

মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। নিষ্ঠুরতার রক্তাক্ত ও বর্বরোচিত নিদর্শন সে রেখে যায় ইতিহাসের প্রত্যেক পাতায়। যুদ্ধের রূপ বদলায়, কিন্তু মানসিকতা বদলায় না।

হঠাৎ কানের সামনে বকম বকম শব্দে ঘুম ভাঙে এরিনের। চোখ খুলে দেখে সারা ঘরময় ধুলো। মুখের সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছে সাদা ধবধবে স্যান্টা। জানলা দিয়ে আসা ভোরের আলো তে ওর ডানা গুলো আরও চকচক করছে। ঘরের দেওয়াল আর সিলিং থেকে সিমেন্ট খসে পড়েছে অনেক জায়গায়। কোনরকমে মাথা তোলে এরিন। মেঝেতে পড়ে নিক-এর নিথর দেহ। উঠে গিয়ে তাড়াতাড়ি নিক-এর মাথা কোলে নিয়ে ওকে ডাকতে শুরু করে এরিন। দু-তিনবার ডাকবার পর নিক কেঁপে ওঠে। দু হাত দিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে নিক-এর মাথা। দরজা দিয়ে বাইরে তাকায় এরিন। যতদূর চোখ যায় শুধুই ভগ্নাবশেষের ছবি। আর কোনও বাড়িই দাঁড়িয়ে নেই। বাবা মার কথা মনে পড়ে এরিনের। এক অমোঘ সত্য কে মনে মনে মেনে নেয়।

নিক-এর জ্ঞান ফিরছে, ওকে আবার শুইয়ে দিয়ে দরজা দিয়ে বাইরে আসে এরিন। চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। এক নির্মম ধ্বংসলীলা, যার গ্রাসে গোটা শহর আজ ধূলিসাৎ, সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একমাত্র মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রভু যীশুর সেই বিশাল মূর্তি। একটা সামান্য আঁচও লাগেনি সেই মূর্তির গায়ে। এরিন আর নিক ছাড়া মনে হয় শহরজুড়ে আর কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। কাল স্যান্টা কে ধরতে ওরা এই ছোট ঘরে এসে আশ্রয় না নিলে ওরাও সকলের সাথে হাত মিলিয়ে অন্তিমের পথে পাড়ি দিত। ঘরের ভেতর থেকে ডানা ঝাপটে বেরিয়ে যীশুর পায়ের কাছে গিয়ে বসে স্যান্টা। এরিনের দিকে একপলক তাকিয়ে মেলে দেয় দু ডানা। ছোট হতে থাকে এরিন আর প্রভু যীশুর মূর্তি, ছোট হতে থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটা ছোট্ট সুন্দর শহর। তবু সে উড়তে থাকে নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। দুই ডানায় তার আজ নতুন সঞ্জীবনী শক্তি।

দুই ডানাতেই তার সমান মাপের ছোট গোল কালো ছোপ।

♣~~~♥সমাপ্ত♥~~~♣

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply