হায়রোগ্লিফের_দেশে- ৭ স্ফিংস!

Anirban & Arijit, বাংলা, হায়রোগ্লিফের দেশে

 

-আচ্ছা বলো দেখি সেটা কি যেটা ভোরবেলায় চারপেয়ে, দুপুরে দুপেয়ে আর সন্ধ্যেবেলায় তিন পেয়ে?

এ শহরে বসন্ত বলে কিছু নেই যেন। ঠান্ডাটা যেতে না যেতেই আবার গরম পড়েছে। তার সাথে সেই চ্যাটচ্যাটে ঘামটাও ফিরেছে। সন্ধ্যের দিকটায় তবু একটু হাওয়া দিচ্ছিল। আমরা তিনজনে বেনুদার দোকানে বসেছিলাম। পিজি গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে কি সব হাবিজাবি জ্ঞান দিচ্ছিল। হটাৎ করে ভবেশদা ধাঁধাটা জিজ্ঞাসা করল আমাদের।

আমি বললাম,

– ধাঁধা? কি ব্যাপার? আগের দিন কিসের গল্প বলবেন বলেছিলেন সেটা মনে আছে তো?

– মনে আছে রে বাবা। তাই তো ধাঁধাটা জিজ্ঞাসা করলাম। তোমরা এর উত্তর ভাবতে থাকো। আমি ততক্ষণে সাড়ে তিনহাজার বছরের পুরনো একটা গল্প বলি, শোনো।

গ্রীষ্মকালের একটা দিন, খুফুর পিরামিড তৈরির হাজার বছর পরের কথা। রাজকুমার চতুর্থ তুতমোসিস গিজার মরুভূমিতে হরিন শিকার করতে বেড়িয়েছিলেন। দুপুরের দিকে মাথার ওপরের গনগনে সূর্য থেকে বাঁচতে একটা বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে বসলেন। একটু পরেই ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এল।

হটাৎ করেই তুতমোসিসের সামনে এসে দাঁড়ালেন দেবতা হোরাস! হোরাস তুতমোসিসকে বললেন বালির মধ্যে ডুবে থাকা তার মূর্তিটাকে বাঁচাতে। তাহলেই নাকি তুতমোসিস হবেন ভবিষ্যতের ফারাও!

ধড়ফড় করে উঠে বসলেন তুতমোসিস। স্বপ্ন দেখছিলেন এতক্ষণ ধরে! কিন্তু ফারাও কি করে হবেন তিনি? বাবা আমেনহোটেপের চতুর্থ সন্তান তিনি। প্রথম সন্তানদেরই তো ফারাও হওয়ার কথা। যাইহোক, যে পাথরের ছায়ায় তুতমোসিস এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিলেন এবারে সেটিকে ভাল করে দেখলেন। একটা মাথার আদল মনে হচ্ছে না?

বেশ কয়েক মাস ধরে শ্রমিকদের সাহায্যে পাথরের চারপাশের বালি সরানো সম্ভব হল। যেটা বেড়িয়ে এল সেটা দেখে তুতমোসিস অবাক হয়ে গেলেন! তার সামনে বসে আছে একটা বিশাল সিংহ! তার মুখটা মানুষের। তুতমোসিস মূর্তিটার একটা ভাঙা পা সারালেন। লাল, নীল আর আর হলুদ রঙও করালেন মুর্তিটার। তারপরে বসে থাকা সিংহটার দুপায়ের মাঝখানে একটা শিলা বসালেন। যাতে লেখা হল তুতমোসিসের স্বপ্নের কথা। এখানেই এই ভগবানের নাম দেওয়া হল হোর-এম-আখেত। যার মানে হল দিগন্তের হোরাস। অবাক কান্ড এই যে বাকি তিন ভাইকে টপকে তুতমোসিস ফারাও ও হয়ে গেলেন! ফারাও তুতমোসিসই পৃথিবীর প্রথম আর্কিওলজিস্ট। তুতমোসিসের বসানো সেই শিলার নাম এখন ড্রিম স্টেলা।

পিজি এবারে বলল,

– বুঝেছি। আর ওই বিশাল মুর্তিটাই হল স্ফিংস। কিন্তু স্ফিংসটা বানালো কে?

– এ নিয়ে অনেক ধন্দ্ব আছে বুঝলে। স্ফিংসের বয়স ঠিক কতো সেটা কেউ জানে না। স্ফিংস কে কেন বানিয়েছিলেন সেটা কোথাও লেখা নেই। অনেকে ভাবে খুফুর সন্তান খাফরে, যিনি গিজার দ্বিতীয় পিরামিড বানিয়েছিলেন, তিনিই বানিয়েছিলেন স্ফিংসকে। স্ফিংসের মুখটা খাফরেরই। কেউ কেউ আবার বলে না খাফরে না, স্ফিংস বানিয়েছিলেন খাফরের আরেক ভাই দেজাফ্রে। আবার অনেকে বলে স্ফিংস খুফুর পিরামিডেরও আগের। তবে ইজিপ্ট দেশটা জুড়ে কিন্তু আরো অনেক স্ফিংস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোন মন্দির বা ফারাওয়ের সমাধির বাইরে স্ফিংসের মূর্তি রাখার চল ছিল। মিশরীয়রা ভাবত স্ফিংসই সেই মন্দিরকে পাহারা দেবে। লাক্সর আর কার্নাকের দুটো মন্দিরের মাঝের রাস্তার দুধারে রাখা ছিল হাজারেরও ওপরের স্ফিংস। এত গুলো একই রকম মূর্তি থাকলেও গিজার স্ফিংস বিখ্যাত ওর আকারের জন্য। লম্বায় ৭৩ মিটার, হাইটে ২০ মিটার।

 

 

 

আমি এবারে বললাম,

– আচ্ছা স্ফিংসের মুখটা এরকম ভাঙা কেন?

– সেটারও একটা গল্প আছে বুঝলে, ১৩৭৮ সাল, মিশরে তখন মুসলিম ধর্ম একটু একটু করে ঢুকছে। স্থানীয় মানুষ সেই সময় স্ফিংসের পুজো করত। ওরা ভাবত এই স্ফিংসের জন্যই নীল নদে বন্যা আসে।যার জন্য নদীর দুপাশের জমি উর্বর হয়। শেখ-সাইম-আল-দার নামের একজন সুফি ছিল। ইসলামে তো মূর্তি পুজোর চল নেই। এই সুফি একদিন রেগে মেগে একটা ছেনি বাটালি নিয়ে স্ফিংসের ওপরে চড়াও হয়। ভেঙে দেয় স্ফিংসের নাকটা। তারপরে নাকি হোরাসের অভিশাপে চারপাশের গ্রামগুলো বালিতে ঢেকে যায়। গ্রামবাসীরা তখন সেই সুফিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। স্ফিংসের ভাঙা নাকের টুকরো গুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও থুতনির কাছে লেগে থাকা একটা লম্বা দাড়ি পাওয়া গিয়েছিল। সেই দাড়ির টুকরোটা এখন আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে।

– আমাদের কোলকাতা মিউজিয়ামেই তো স্ফিংস রাখা আছে তাই না?

 

– হ্যাঁ আছে তো। মমির ঘরটাতে ঢোকার মুখেই রাখা আছে একটা পাথরের মাঝারী স্ফিংস। তবে মিউজিয়াম ছাড়াও কোলকাতার আরেকটা জায়গাতে স্ফিংস রাখা আছে, একটা নয় আবার, একজোড়া। কোথায় বলতো? হালের ইকোপার্কের স্ফিংসটা বাদ দিয়ে বলো।

– কোলকাতাতে আরো দুটো স্ফিংস? কোথায়? জানিনা তো!

– শুনলে অবাক হবে, রাজভবনের ছোট গেটের ওপরে। ছফুট মতন লম্বা। টেরাকোটার ওপরে চুনের প্রলেপ দিয়ে বানানো। তার মধ্যে একটা ২০০৯ সালের আয়লাতে ভেঙে যায়। এগুলো কেন বানানো হয়েছিল কেউ জানে না। আরো অবাক করা একটা জিনিস তোমাদেরকে বলি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ১৯১৫ সালে কাঠের ওপরে আঁকা একটা কালী ঠাকুরের ছবি আছে। এই কোলকাতা থেকেই গিয়েছিল সেই ছবি। ছবিতে ঠাকুরের মাথার ওপরের যে চালা থাকে তার দুপাশে দুটো স্ফিংস আঁকা আছে!

 

– বলেনকি! মা কালীর ছবিতেও স্ফিংস!

– ইতিহাস বড় অদ্ভুত স্পন্দন ভাই। এই স্ফিংসগুলোর এই কোলকাতায় বসে থাকার কোনও কারণ আমি জানি না।

পিজি এবারে বলল,

– ভবেশদা আমি শুনেছিলাম স্ফিংসের ভিতরে নাকি লোকানো ঘর আছে। এটা কি সত্যি?

– কিছুটা সত্যি বুঝলে। ১৯৮৭ সালে টোকিয়োর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি থেকে একটা টিম এসে স্ফিংসের শরীরের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পরীক্ষা করে। ১৯৯১ সালে জন ওয়েস্ট নামের এক বিজ্ঞানী আবার স্ফিংসের পরীক্ষা করেন সিসমিক রিফ্র‍্যাকশন দিয়ে। দুবারেই যে তথ্য সামনে আসে তাতে চমকে যায় সবাই! স্ফিংসের শরীরের মধ্যে দুটো ফাঁপা জায়গার আভাস পাওয়া গেছে। ওর দুপায়ের মাঝেও মাটির নিচে দুটো ঘর আছে নাকি। কিন্তু সেগুলো খুঁড়ে দেখার পারমিশন কাউকে এখনো দেওয়া হয়নি।

– কেন?

– কারণ স্ফিংসের অবস্থা এখন বেশ খারাপ। কায়রো শহরের পলিউশনে মূর্তিটার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় ২০০০ পাথরের টুকরো ৬ বছর ধরে জোড়া লাগানো হয়েছে। এখন স্ফিংসের বাঁ কাধের রেস্টোরেশন চলছে। সংরক্ষণের সব কাজ শেষ হলে হয়ত মাটির নিচের ঘরগুলোর খোঁজ শুরু করা যাবে। ততদিন স্ফিংস নিজের রহস্য নিজের কাছেই রেখে দেবে।

আমি এবারে বললাম,

– আপনি বললেন স্ফিংসের উল্লেখ মিশরের কোন প্রাচীন লেখাতেই নেই। আর এখন স্ফিংসের মুখটাও তো ভাঙা। তাহলে আসলে এটাকে কেমন দেখতে ছিল সেটা কেউ জানতেই পারবে না কোনদিন?

– ভাল প্রশ্ন করেছ স্পন্দন ভায়া। তোমাদের তাহলে একটা পাগলা লোকের গল্প বলি। আমেরিকান ইজিপ্টোলজিস্ট মার্ক লেনার। এই লোকটার গোটা জীবনের একটাই লক্ষ্য, সেটা হিল স্ফিংসের সংরক্ষণ। একসময় মার্ক লেনার বছরের পর বছর কাটিয়েছেন ইজিপ্টে। গিজার ধুধু মরভুমিতে স্ফিংসের দুপায়ের মাঝখানে তাবু বানিয়ে থেকেছেনন একটানা। নাওয়া খাওয়া ভুলে মূর্তিটার মাথা থেকে পা অবধি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন। স্টিরিওস্কোপিক ক্যামেরা দিয়ে প্রতিটা অ্যাঙ্গেল থেকে স্ফিংসের অজস্র ছবি তুলেছিলেন লেনার। পরে উনি এই ছবিগুলো দেন আমেরিকান আর্কিটেক্ট টমাস জ্যাগারসকে। জ্যাগার এবারে ছবিগুলোর হেল্প নিয়ে কম্পিউটারে স্ফিংসের থ্রি-ডাইমেনশনাল একটা ছবি বানিয়ে ফেলেন! যে যে জায়গা গুলো ক্ষয়ে গেছে সেখান গুলোও ভরে ফেলেন। বাকি থাকল শুধু মুখটা। লেনার এবারে জ্যাগারকে স্ফিংসের আশেপাশের সময়কার প্রায় সব ফারাওদের মুখের ছবি দেন। অবাক করার ব্যাপার হল এই যে সবার মুখের মধ্যে শুধু ফারাও খাপরেও মুখটাই স্ফিংসের সাথে একদম মিলে গেছে। এখন তোমরা একটু গুগুল করলেই স্ফিংসের এই রিকন্সট্রাকটেড ছবিটা দেখতে পাবে।

 

একটানা এতটা বলে ভবেশদা একটু থামল। তারপরে প্লাস্টিকের জগ থেকে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে বলল,

– উফফ, অনেক বকাও তোমরা আমাকে। স্ফিংসের গল্প তো শুনলে। এবারে বলত এই নামটার মানে কি?

– নামের মানে? সেভাবে তো কখনো ভেবে দেখিনি।

– স্ফিংস শব্দটা কিন্তু ইজিপশিয়ান নয়, গ্রীক। গ্রীকদের সাথে ইজিপশিয়ানদের ব্যবসা বানিজ্যের খাতিরে বেশ ভাল যোগাযোগ ছিল। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওরা ইজিপ্টে ওই অদ্ভুত জীবের মূর্তি দেখে এসেছিল। তারপরে কখন যে স্ফিংস গ্রীক মাইথলজির একটা অংশ হয়ে গেল সেটা কেউ জানে না।

– বলেন কি! গ্রীক মাইথলজিতেও স্ফিংস!

– হ্যাঁ, ঠিকই শুনছ। গ্রীক পুরাণে স্ফিংস হল একটা রাক্ষস। যার শরীরটা একটা সিংহীর, মুখটা মেয়ের, তার একজোড়া ঈগলের ডানা আছে, লেজটা আবার সরীসৃপের। এই স্ফিংস নাকি থেবস নামের এক শহরকে পাহারা দেয়। শহরে যেই ঢুকতে যায় তাকেই স্ফিংস একটা ধাঁধা জিজ্ঞাসা করে। তার উত্তর না দিতে পারলেই স্ফিংস সেই লোকটার গলা টিপে মেরে ফেলে তাকে খেয়ে নেয়। গ্রীক শব্দ স্ফিংগো থেকে স্ফিংস শব্দটা এসেছে। স্ফিংগো মানে নিংড়ে নেওয়া।

– তাহলে স্ফিংসের ধাঁধার উত্তর কেউ পেরেছিল দিতে?

– পেরেছিল তো। ইডিপাসের নাম শুনেছ নিশ্চয়ই।

– হ্যাঁ হ্যাঁ, ফ্রয়েডের ইডিপাস কমপ্লেক্সের নাম শুনেছি।

– ঠিক, এই ইডিপাস ছিলেন একজন গ্রীক বীর। ওর গল্প তোমাদের অন্য কোন একসময় বলব না হয়। যাই হোক, ইডিপাস যখন থেবস শহরে ঢুকতে যায় তখন স্ফিংস ওকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞাসা করে। ইডিপাসই প্রথম যে ওর উত্তরটা পেরে যায়। এর পরেই পাহাড়ের চুড়ো থেকে লাফিয়ে স্ফিংস আত্মহত্যা করে।

পিজি এবারে বলল,

– হুম, এই ইডিপাস ভদ্রলোক দেখছি বেশ স্মার্ট ছিলেন। তা ধাঁধাটা কি ছিল?

ভবেশদা এর উত্তর না দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগল। এবারে সব কিছু পরিষ্কার হল আমার কাছে!

– বুঝেছি বুঝেছি! আপনার প্রথমে বলা ধাঁধাটাই স্ফিংস ইডিপাসকে জিজ্ঞাসা করেছিল! সেটা কি যেটা ভোরবেলায় চারপেয়ে, দুপুরে দুপেয়ে আর সন্ধ্যেবেলায় তিন পেয়ে?

– ঠিক, এবারে বল দেখি উত্তরটা।

আমরা এবারে একে অন্যের মুখের দিকে চাইলাম, পিজি বলল,

– আপনার গল্পটা শুনতে শুনতেই ভাবছিলাম উত্তরটা। কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না তো।

– হুম, তাহলে তো তোমরা স্ফিংসের খাদ্য হতে!

– আপনি জানেন নাকি উত্তরটা?

– জানি তো।

– কি?!

ভবেশদা এবারে আমাদের দুজনের খুব কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল,

– মানুষ!!

(চলবে)

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

লেখক ~ অনির্বাণ ঘোষ

2 comments

  • ei dhnadhar uttor ta jantam.bhorbela mane chhele bela jokhon manush hamaguri dey..dupurbela mane jouban jokhon manus du paye hnate ar sandhyebela mane bardhakyo……..manus lathi nie teen paye hnate……..darun lagchhe porte…….

  • এক নিঃশ্বাসে এই সিরিজের সব লেখা গুলো পড়ে ফেললাম।টানটান উত্তেজনার সাথে অপূর্ব উপস্থাপনা।শেষে ধাঁধাঁটাও মন ছুঁয়ে গেল।

Leave a Reply