আমার সিকিম ডায়েরি

Subhra's Chronicles

যাত্রা শুরুর আর দুদিন বাকি। কুনাল হঠাৎ অসুস্থ, পেটের কিছু একটা বাধিয়েছে আবার, শেষ ১ বছরে ব্যাটার জ্বালায় অনেক প্ল্যানই ভেস্তে গেছে তাই প্রথমে সিচুয়েশান টা মেকি মনে হলেও ব্যাপারটা সত্যি ছিল বটে। অগত্যা ওকে ছাড়াই যেতে হবে এরূপ মাইন্ড সেট টা প্রায় করে ফেলেছি ওমনি আর এক শেয়াল ছানা, গৌরব, প্ল্যান টা ভেস্তে দেওয়ার জন্য ময়দানে নামবে নামবে করছিল, যদিও সেটা কোনোরকমে বাইপাস করা গেছিল ।

১০ নভেম্বর, রাত ১০.০৫ এর দার্জিলিং মেল। গন্তব্য ওয়েস্ট সিকিম এর পেলিং, সেখান থেকে রাভাংলা,নামচি হয়ে ফিরে আসা সমতলে। অফিস ফেরত ৩ টে ক্লান্ত শরীর- আমি,অর্ণব আর প্রিয়ব্রত ট্রেনে উঠেই সোজা বাঙ্কারে জায়গা করে নিলাম। অল্পবিস্তর গল্প,হাসি,ঠাট্টা, সৌভিক এর অনবদ্য বাওয়াল, আর কটা কেক আর চিপস এর প্যাকেট ভক্ষণ করার পর সোজা ঘুমের দেশে পাড়ি।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর লোয়ার বার্থে এসে বসেছি, ট্রেন নিজবারি ক্রস করছে, উপর দিয়ে টপাটপ বাকি ৪ জন নেমে পড়ল। আকাশ একদম পরিষ্কার, এক চিলতে মেঘের দেখা নেই কোথাও। পরিষ্কার আকাশ আর পাহাড় এই দুই একে অপরের পরিপূরক, মন টা এক অদ্ভুত আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গেল। ট্রেন রাঙ্গপানি ছাড়িয়ে এগোতে লাগল অর্থাৎ এবার নেমে পড়ার পালা। একহাত দরজার হাতলে দিয়ে আর একহাতে গরম চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল, শরীর এর মধ্যে দিয়ে যেন কয়েক হাজার ভল্টের বিদ্যুৎ বয়ে গেল, সেই সুদূরে দেখা যাচ্ছে মাউন্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা। শ্বেতশুভ্র তার চূড়া, এক এবং অনন্তকাল ধরে বিরাজমান। পেপারে পড়েছিলাম শিলিগুড়ি দিয়ে নাকি দেখা যায় মাঝেসাঝে কিন্তু এতবার এই তল্লাটে এলেও কোনোদিন এনজেপি থেকে দেখতে পাইনি। চটপট ক্যামেরা টা বের করে গোটা দশেক ক্লিক করলাম। পুরো গ্রুপ টার মধ্যে এক চরম উত্তেজনা তখন। ঘড়িতে বাজে ০৮.২৫, ট্রেন পৌঁছল এনজেপি, পাক্কা ২৫মিনিট লেট , কিন্তু সে খেয়াল কারো নেই, সবাই কাঞ্চনজঙ্ঘার রুপে মত্ত।

গাড়ি আগে থেকেই বলা ছিল আমাদের, নাম্বার – SK01T220 । স্টেশন থেকে বেরিয়েই উঠে পড়লাম ৮সিটার এর বোলেরো টায়। পাহাড় আমার দ্বিতীয় ভালোবাসা হলেও রাস্তাঘাট এত দুর্গম যে ভয় একটু লেগেই থাকে। তাই সবসময় গাড়িতে ওঠার আগে একবার ড্রাইভার কে বলে দি – ভাইয়া থোরা সাম্ভাল কে চালানা। শিলিগুড়ি তিস্তা নদীর উপর তৈরি করোনেশন সেতু ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটতে লাগল মেলিবাজার অর্থাৎ সিকিম বর্ডারের দিকে। নভেম্বর মাস পড়লেও ঠাণ্ডা সেরকম পড়েনি, জানালার কাঁচ নামিয়েই রেখেছিলাম। সিকিম এলে মনে হয় তিস্তা শুধু নদী নয় এক অতন্দ্র প্রহরীও বটে, যত এঁকেবেঁকেই গাড়ি চলুক না কেন পাহাড় এর যেকোনও ঢাল দিয়েই গাড়ি যাক না কেন তিস্তা তোমায় ছাড়বে না। কখনো খুব সামনে কখনো বা গভীর খাদের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ নীল রঙের নদীটি। কোথাও বা ভীষণ খরস্রোতা,অশান্ত, কোথাও আবার একদম স্থির। সিকিম বর্ডার অর্থাৎ ওয়েস্ট বেঙ্গল এর শেষপ্রান্তের কাছে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম, একে একে সবার আইডি চেক হল, এখান থেকে পুরোদমে সিকিম পর্ব শুরু। ঘড়িতে তখন ১০.৪৫, মেলি বাজার পেরিয়ে গাড়ি থামল তিস্তা ক্যাফে তে। যেমনি নাম তেমনি পরিবেশ। ক্যাফের দোতলায় তিস্তা কে ফেস করে পর পর ৪টে টেবিল রাখা। সেখানে বসেই কফি, চিকেন স্যান্ডউইচ দিয়ে ব্রেকফাস্ট কাম সেমি লাঞ্চ সারার পর আবার যাত্রা শুরু। আমরা সবাই জানি পাহাড় মানেই বুক ভরে শ্বাস নেওয়া আর ঠাণ্ডা, কিন্তু দুটোই ভুল প্রমাণ হল এইবার। আগেই বলে রাখি যদি আগামী ১-২ বছরের মধ্যে পেলিং যাওয়ার প্ল্যান করে থাকেন তবে সেটা ক্যানসেল করাই ভাল, আর যদি যেতেই হয় তবে জরথাং হয়ে না গিয়ে নামচি হয়ে যাওয়া উচিত। পাহাড় কেটে রাস্তা বড় হচ্ছে, ২ লেন এর রাস্তা প্রায় ৪ লেন সমান হচ্ছে। মাঝে মধ্যে তো মনেই হবে না পাহাড়ে আছি, না সমতলে । ভায়া জরথাং হয়ে পেলিং অবধি প্রায় ৭০ শতাংশ রাস্তাই নির্মীয়মাণ। অসম্ভব ধুলো ভর্তি রাস্তা আর তার সাথে রোদের তেজ, সবমিলিয়ে আমাদের সবার হাতে মুখে চাপ চাপ ধুলো জমে সে এক একাকার কাণ্ড, পাহাড় যাচ্ছি নাকি কয়লার খাদানে বোঝা দায়। ধুলোর চোটে গাড়ির কাঁচ তুলে দিলেই গরমে হাঁসফাঁস করছে ৫টা প্রাণ আর কাঁচ নামালেই মুখে রুমাল চাপা দিতে হচ্ছে, সে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা। ১ ঘণ্টার রাস্তা লেগে যাচ্ছিল ১.৩০ – ১.৪৫ ঘণ্টার মতো। গাড়িতে বসে প্রকৃতি দেখা তো দূরে থাক, চুপ করে বসে থাকাই দুষ্কর ব্যাপার। সবশেষে গাড়ি যখন এসে পৌঁছলো জরথাং তখন প্রায় ১.৪৫ বাজে।
সামনের দোকানে গিয়ে মুখ চোখ ভাল করে জল দিয়ে ধুয়ে নিলাম। এতবার পাহাড়ে এসেছি কিন্তু এরকম অভিজ্ঞতা কোনওবার হয়নি। মোবাইল টা বের করে দেখি ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দোকানের ভেতরে মালিকের মাথার উপর বোঁ বোঁ করে পাখা চলছে। গরমের চোটে এখানে দেদার বিকোচ্ছে ঠাণ্ডা পানীয়, আমরাও ১ লিটারের কোক নিয়ে নিলাম সাথে। ড্রাইভার কে জিজ্ঞাসা করে বুঝলাম আরও ঘণ্টা তিনেকের যাত্রা বাকি। গাড়িতে উঠেই চোখটা ঢুলে এসেছিল, কিছুক্ষণ বাদে চোখ খোলার পর দেখি সামনে সারি দিয়ে গাড়ির লাইন, কেউ এক পা ও নড়ছে না। ড্রাইভার ও নেই সিটে, পেছন ফিরে দেখলাম গাড়ি ফাঁকা, চমকে উঠলাম হঠাৎ করে। চটপট গাড়ি থেকে নেমে দেখি অন্য গাড়ির যাত্রীরা সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে, আমাদের গাড়ির ড্রাইভার আর আমার বন্ধুরাও আছে ওখানে। দেখলাম সামনে ল্যান্ড স্লাইড !! সময় লাগবে রাস্তা ঠিক হতে। একটা বিশালাকার মেশিন বড় বড় ধসে পরা পাথরগুলোকে ঠেলে খাদে ফেলে দিচ্ছে। সামান্য এগিয়ে দেখি রাস্তা অর্ধেক ধসে গেছে, কোনওরকমে একটা গাড়ি যাওয়ার রাস্তা আছে। ৪.৫০ নাগাদ রাস্তা খুলে দিল, প্রায় ১ ঘণ্টা নষ্ট হবার পর। ততক্ষণে সূর্য পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়েছে। ঠাণ্ডাটা এবার ভালই অনুভব করতে পারছিলাম, এই এতক্ষণ পর গায়ে একটা সোয়েটার চাপাতে হল। পেলিং পৌঁছাতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল। কিছু খাওয়া দাওয়ার পর আপার পেলিং এর হোটেল স্যারেডিনার তিন তলার রুম নাম্বার ৩০১ আর ৩০২ এ ৫টা ক্লান্ত শরীর তখন শায়িত ।

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার বেরিয়ে পড়া, ঘড়িতে তখন ৭.৪০। এক কাপ গরম কফি আর তার সাথে কিছু গরম গরম তেলেভাজা- শরীর, মন দুটোই চাঙ্গা করে দেয়। আগামীকাল পেলিং এর সাইটসিয়িং টা সেরে ফেলতে হবে তাই চটপট কটা ত্রাভেলার এর সাথে দরদাম করে একটা গাড়ি ফিক্স করে ফেললাম। লোকাল বাজার থেকে কিছু আখরোট আর চা পাতা কিনে ফিরে এলাম হোটেলে। ঘুরতে এসে বাড়ির জন্য কিছু না নিয়ে গেলে মা এর মুখভার হয়, তাই পাহাড়ে এলেই একটাই জিনিস মাস্ট, চা পাতা !! ব্যাগে ভরে নিলাম সেগুলো আগে। আখরোট খাওয়া খুবই কষ্টকর, তাই নিলাম না। গৌরব বেশ অনেকটাই নিয়েছিল আর সেটাই যে হোটেল মালিক এর কাল হবে তখনও ভাবিনি। রাত্রিবেলা ডিনার সেরে আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে, হঠাৎ করে আখরোট খাবার ভুত টা মাথায় চেপে বসল সৌভিক এর। অন্যের খাবারে নজর ওর কলেজ লাইফ থেকেই, পেটে ধরে না কিন্তু তাও ছোবল মারা স্বভাব। যেমন বলছিলাম আখরোট খাওয়া খুব কষ্টের, একদম সত্যি। প্রথমে দাঁত, তারপর চাবির রিং, শেষে রুম এর তালা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঠোকাঠুকি করেও কাজ হল না। ততক্ষণে প্রিয়ব্রত, গৌরব ও হাত লাগিয়েছে। আখরোট টাকে একবার হাতে নিয়ে দেখলাম খুব বেশি হলে কটা জায়গায় ছাল চামড়া উঠেছে কিন্তু ভাঙ্গা তাকে তখনও যায়নি। রাত্রে শোবার আগে টুথব্রাশ টায় পেস্ট লাগিয়ে সবে মাত্র বাথরুমে ঢুকেছি ব্রাশ করতে, হঠাৎ একটা কড়মড় শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি রুমের দরজার উপরের দিকটা খুলে হাতে চলে এসেছে, আর সেটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গৌরব, পাশে প্রিয়ব্রত আর সৌভিক টা অত্যন্ত বাজে ভাবে দাঁত দেখাচ্ছে। নরম প্লাইয়ুড এর দরজা, তার ফাঁকে আখরোট গুঁজে জোরসে দরজা বন্ধ করলে আখরোট ভেঙে যাবে, এটাই ছিল সৌভিক এর প্ল্যান আর সেটা কার্যকর করেছে গৌরব। হাতে বেশি ক্যাশ নেই, এটিএমে টাকা নেই ডিউ টু ডিমনিটাইজেশান, এই অবস্থায় যদি দরজার খরচ দিতে হয় তাহলে ট্যুর খরচার পুরো হিসেব ঘেঁটে যাবে। ওদের গোটা খানেক খিস্তি ঝেরে কোনওরকমে দরজাটা পেরেক ঠুকে সাঁটিয়ে শুয়ে পড়লাম, যা হবে দেখা যাবে শালা। লাইট টা নেভাবার জন্য বিছানায় শুয়েই হাতটা বাড়িয়েছি, দেখলাম খাটের পাশে তখনও পরে আধভাঙ্গা আখরোট টা।

সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গতেই মুড টা খারাপ হয়ে গেল, কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। চারিদিকে রৌদ্র ঝলমল সুন্দর আবহাওয়া কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝাপসা মেঘে ঢাকা। গতকাল অবধি নাকি দেখা গেছে, ঘরে চা দিতে এসে বলে গেল বাচ্ছা ছেলেটা, তবে এটা পাহাড়ের পেটেন্ট ডায়লগ। ব্রেকফাস্ট করে বেরোনোর জন্য ঘরের দরজায় তালা দিতে গিয়ে মুডটা আরও বিগড়ে গেল। সে এক ঝক্কি, দরজা এমন ভাবে হেলেছে যে হাতলটা কিছুতেই ফুটোয় ঢুকছে না। কিছুক্ষণের চেষ্টায় আমি আর অর্ণব দুজন মিলে দরজা টা লক করলাম। সিঁড়ির কাছে সৌভিক দাঁড়িয়ে যাতে কোন হোটেল স্টাফ উপরে এলে আমাদের জানায় কারণ আমরা কার্যতঃ দুমদাম ঠোকাঠুকি করছিলাম দরজা টা নিয়ে। চোখের সামনে গৌরব টাকে দেখতে পাচ্ছি না, নিশ্চয়ই ধোঁয়া ছাড়তে গেছে, আর প্রিয়ব্রত ? ওটা থাকাও যা; না থাকাও তাই।
পেলিং এর সাইটসিয়িং এর লম্বা একটা ফর্দ থাকলেও বেশীরভাগ টাই এই ঝর্ণা নয়ত সেই ঝর্ণা, যেমন Rimbi Waterfall, Knachenjunga fall, Changey Fall। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হল Knachenjunga fall, যেমন জলের স্রোত তেমনি আওয়াজ, কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই জলের ঝাপটায় পুরো জামাকাপড় স্যাঁতস্যাঁতে করে দেবে। তবে সব চাইতে আকর্ষণীয় বলতে গেলে Singshore Bridge। সিকিমের উচ্চতম ঝুলন্ত সেতু, অনেকে মিলে হাঁটলে সেতুটা যে ধীরে ধীরে দুলছে সেটা রীতিমত ফিল করা যায়। ছবি তোলার আদর্শ জায়গা, প্রায় শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে সব কটা পোজে ছবি তুলে দিতে হল প্রিয়ব্রত কে, ছেলেটার বিয়ের তাড়া তাই না ও করা যায় না। তবে একটা কথা বলে রাখা ভাল, লাস্ট যে কটা ট্যুর করেছি তার সবকটাতেই প্রিয়ব্রত আমাদের সাথে ছিল আর প্রতিটা ট্রিপেই কিছু এমন স্মৃতি ও আমাদের দিয়েছে যে ওকে ছাড়া ভবিষ্যতে কোনও ট্রিপের কথা আমরা ভাবতে পারিনা। তবে শুধু ভাল ভাল কথা দিয়ে প্রিয়ব্রতর কথা শেষ করা সম্ভব না, তাই বলি সেই স্মৃতিগুলো নিয়ে কেউ জানতে চাইবেন না প্লিজ, ওসব বলার অযোগ্য।
রক গার্ডেনে সংস্কারের কাজ চলছে, ঢোকা নিষেধ, তাই এসে পৌঁছালাম Khecheopalri lake। বৌদ্ধ এবং হিন্দু উভয়ের কাছেই এটি একটি ঐশ্বরিক হ্রদ। দিন প্রায় শেষ, সূর্য ঢলে পড়েছে পাহাড়ের কোলে, ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে গাড়ি তখন ছুটে চলেছে হোটেলের উদ্দেশ্যে।
নেক্সট ডে অর্থাৎ আমাদের ট্যুরের শেষ দিন। এই দিন দেখা মিলল কাঞ্চনজঙ্ঘার, মেঘের আস্তরণ ভেদ করে বিরাজমান, ঠিক যার জন্য পাহাড়ে আসা। কমপক্ষে ২০-২৫ টা ক্লিক করে, যতটা সম্ভব কাঞ্চনজঙ্ঘা কে ক্যামেরাবন্দি করে বেরিয়ে পড়তে হল। একদম টানটান শিডিউল, রাভাংলা এবং নামচি হয়ে রাত ৮টার মধ্যে নেমে যেতে হবে এনজেপি। বেশ খানিকটা গাড়ি চলল, মাঝে রাস্তায় ব্রেকফাস্ট টা সেরে আবার বেশ অনেকটা রাস্তা, এসে পৌঁছালাম রাভাংলার Buddha park পার্কে। ঢোকার বেশ কয়েক কিলোমিটার আগে থেকে রাস্তা এতটাই চওড়া যে বোঝা দায় পাহাড়ে আছি নাকি সমতলে। এই পার্কের মূল আকর্ষণ হল এক বিশালাকার ১৩০ ফুটের বুদ্ধ মূর্তি, যা আকারে এতটাই বড় যে রাভাংলার বেশ কিছুটা জায়গা থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমান। এরপর Temi Tea Garden ঘুরে এসে পৌঁছালাম নামচির Samdupche – Statue Of guru Rinpoche সিকিমের এক পৃষ্ঠপোষক সন্ত। Ropway activity, লাঞ্চ আর সাথে প্রিয়ব্রতর দেওয়া কিছু স্মৃতি, সব মিলিয়ে বেশ দেরী হয়ে গেল। এবার গন্তব্য Char Dham, ঘড়িতে তখন প্রায় ৩টে ।
ড্রাইভার আশ্বাস দিল পৌঁছে দেবে এনজেপি ঠিক সময়ে। আমরাও আর কিছু না বলে প্রায় বুড়িছোঁয়ার মত Char Dham ঘুরে নামতে লাগলাম। নামচির রাস্তা বেশ ভাল, তাই গাড়ির গতিও বেড়ে গেল কিন্তু হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটল, গাড়ির পেছনের চাকা পাংচার। সাথে স্তেফনি ছিল বটে কিন্তু কিছুতেই পুরনো চাকাটা খুলে বের করা যাচ্ছিল না,নাট বল্টু গুলো প্রায় খয়ে গেছে, কিছুতেই গ্রিপ নিচ্ছিল না। ড্রাইভারের বয়স মেরেকেটে ১৭ কিংবা ১৮, তাই পেশীর বল তেমন নেই, তাই আমরাও হাত লাগালাম, কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছিল না। শেষে এক ট্রাক ড্রাইভার আমাদের অবস্থা দেখে এগিয়ে এল, চটপট কিছু মাটি তুলে পুরে দিল হাতল টার মধ্যে। এবার দিব্বি গ্রিপ পেয়ে গেল ড্রাইভার টা, তারপর হাতের এক হ্যাঁচকা টানে ঘুরে গেল নাট বল্টু গুলো। পাহাড়ের মানুষ না চাইতেই যেভাবে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ায় সেটা আমাদের মত সমতলের মানুষের কাছে দিবাস্বপ্ন। ঠিক ৪ টে বেজে ১০ মিনিট, গাড়ি চলতে শুরু করল। তীরের গতিতে পাহাড়ের বুক চিরে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। অন্ধকারে এভাবে পাহাড়ের রাস্তায় কোনওদিন নামিনি, বুকটা বেশ দুরুদুরু করছিল ভয়ে। মাঝে মাঝে তিস্তা উঁকি দিচ্ছিল রাস্তার ভাঁজে, তিস্তার জল পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। পেছন ফিরে দেখলাম সবাই ঘুমোচ্ছে, ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলাম- অওর কিতনা টাইম ? উত্তর এল – আপ সো যাইয়ে, হাম পঁউচা দেঙ্গে !!
এনজেপি স্টেশানের বাইরে পেটপুরে ডিনার টা সেরে নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম। একদম রাইট টাইম।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

লেখক- শুভ্র রাহা

ছবি- অনির্বাণ ঘোষ

Leave a Reply