স্ক্যালপেল – ৪

বাংলা, স্ক্যালপেল

আজকের গল্পটা এমন কিছু মানুষদের নিয়ে যাদেরকে মাঝে মাঝেই খবরের কাগজের পাতায় দেখা যায়। না,প্রথম পাতায় না। ভিতরের দিকে। একটা বা দুটো অনুচ্ছেদ থাকে এদের জন্য বরাদ্দ। এদের খবর পড়তে পড়তে আমরা বলে উঠি,

ইস, কি পাষন্ড দেখ বাড়ির লোক।

এভাবে পারে কেউ!

শ্বাশুড়িটাই যত নষ্টের গোড়া।

লোকটার এরকম হয়ে গেল, এবারে সংসার সামলাবে কে?

এই মানুষগুলোর জন্য একটা ঘর ছিল আর.জি.কর হাসপাতালে। একটা মাত্র বন্ধ জানলা নিয়ে অন্ধকার মতো, এসি তে ঠান্ডা, বিষাদ মাখা। এমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ের এক তলায়। দশটা বিছানা সেখানে পাতা থাকত দুটো সারিতে। অপেক্ষা করত ওদের।

যারা পুড়ে গেছে।

আগুন ভয়ানক জিনিস আমরা সবাই জানি। আলো দেয়, খুব কাছে গেলে পুড়িয়ে দেয়। মাসে এক দুজন এমন আগুনে পোড়া মানুষ ভর্তি হতেন আমাদের ইউনিটে। শীতকালে সংখ্যাটা বাড়ত। গরীব মানুষ ঘরে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ে, অসাবধানতায় সেই হ্যারিকেন উল্টেই বিপদ ঘনিয়ে আসে। অনেকের রান্নাঘরের স্টোভ বার্স্ট করত। আর এরা ছাড়াও আসত আরো কিছু মানুষ। যাদের গায়ে আগুন লাগাটা দুর্ঘটনাবশত নয়। এদের কেউ নিজের গায়েই আগুন লাগিয়েছে, কারোর গায়ে কেরোসিন ঢেলেছে স্বামী বা স্ত্রী, অথবা বাড়ির অন্য কেউ।

পুড়ে যাওয়া মানুষ মারা যায় মূলত তিনটে কারণে। প্রথম কারণ হাইপোথার্মিয়া। চামড়া পুড়ে গিয়ে শরীরের তাপমাত্রা হটাৎ করে কমে যাওয়ার জন্য। এই চামড়া আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গ। আগুনে যখন সেটা নষ্ট হয় তখন শরীর থেকে জল বেড়িয়ে যায় প্রচুর। সেই জলের অভাবে মারা যান অনেকে। আর আগের দুটো থেকে বেঁচে গেলেও ইনফেকশনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সহজ নয়। তাই অধিকাংশ রুগীকেই আমরা বাঁচাতে পারতাম না। কিন্তু তাদের শেষের দিনগুলোতে একটু ভাল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলত।

যারা বলেন সরকারী হাসপাতালে ডাক্তাররা কাজ করেন না তাদের বলব একবার ওই ঘরটায় ঘুরে আসুন। মানুষগুলো জলের তেষ্টায় কাতরাতে থাকে। কিন্তু অনেকেই জল গিলতে পারে না। আগুনের গরম ধোঁয়ায় খাদ্যনালীও পুড়ে গেছে যে। তাদের আগুনে পোড়া চামড়ার নিচে শিরা খুঁজে পাওয়াও খুব শক্ত। আমি দেখেছি হাউসস্টাফ, জুনিয়র পিজিটিদের সেইসব মানুষগুলোর বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে। পুড়ে যাওয়া শরীরের দুর্গন্ধ, পুড়ে যাওয়া মানুষটার আর্তনাদ, সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে। স্ক্যালপেল দিয়ে খুব সাবধানে পায়ের গোড়ালির কাছের চামড়া কেটে শিরা বার করে তাতে ঢোকানো হত শরীরে জল দেওয়ার নালী। সেগুলোও আবার দিন দুই পর পর অকেজো হয়ে যেত। তখন আবার অন্য পা, সেটা না পেলে দুই হাত। পুড়ে যাওয়া চামড়া শক্ত হয়ে শরীরে বসে গেলে তাদেরকে থিয়েটারে এনে কেটে বাদ দেওয়া হত। ক্ষততে রোজ ড্রেসিং করতেন আয়া মাসিরা। লড়াই চলত মানুষটা শেষ শ্বাস নেওয়া পর্যন্ত।

ওরা কি করে পুড়ে গেল তার একটা বিবরণ নিতে হত আমাদেরকে। রুগীর নিজের মুখ থেকেই। পরে সেগুলো পুলিশকে দিতে হত যে। আমিও অনেক সদ্য দগ্ধ নারী পুরুষের পাশে বসে শুনেছি ওদের জবানবন্দি। নির্বিকার মুখে খাতায় খসখস করে লিখেও গেছি সেগুলো। একটা জিনিস খেয়াল করতাম, মানুষগুলোর শরীর আজকে পুড়েছে। কিন্তু ওদের মন পুড়ে গেছে অনেকদিন আগেই। ক্ষোভ, হতাশা, ঘৃণা সব কিছু ওই আগুনের শিখাতে ঘিয়ের কাজ করেছে। সেই সব মানুষেরা কেউই প্রায় বাঁচেনি বলতে গেলে। তাই তাদের ব্যক্তিগত কথাগুলো আজকে বলাটা অমানবিক কাজ হবে। আজকে বরং এমন একজনের কথা বলি যে পুড়েছিল এবং বেঁচেছিল।

||

লোকটার নাম আমার এখন আর মনে নেই। কিন্তু ওর কথা বলতে গেলে একটা নাম তো দিতেই হয় ওকে। ধরে নিলাম ওর নাম রতন।

আমি তখন আর.জি.কর এ ফার্স্ট ইয়ার পিজিটি। একটা ১৪ই আগস্টের অ্যাডমিশন ডে তে রতনকে নিয়ে একদল লোক ঢুকল এমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ে। রতন হাতিবাগানের বস্তিতে থাকে। ফুচকা বেচে। ব্যাটা নাকি ল্যাম্পপোস্টে উঠে হুকিং করতে গিয়েছিল। কারেন্ট খেয়ে নিচে পড়েছে। তারপরে কিছু লোকের হাতে উত্তম মধ্যম মার খেয়ে হাসপাতালে।

রতন যখন এল তখন ও অচৈতন্য। এমনটাই হওয়ার কথা। আগুনে পোড়ার থেকেও ভয়ঙ্কর হল বিদ্যুতপৃষ্ট হয়ে পোড়া। তড়িৎ শরীর স্পর্শ করার সাথে সাথেই মাটির দিকে যাওয়ার রাস্তা খোঁজে। এই যাওয়ার পথে যা কিছু পড়বে তাই ও পুড়িয়ে দেবে। চামড়া তো পুড়বেই, অনেক সময় তার সাথে সাথে শরীরের ভিতরের অঙ্গও পুড়ে যায়। সেই তড়িৎ যদি হৃদপিন্ডর ওপর দিয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। তৎক্ষণাৎ গঙ্গা প্রাপ্তি।

রতনের ভাগ্য ভাল ছিল। ইসিজিতে কোন রকম উল্টোপাল্টা রিদম পাওয়া যায়নি। হৃদপিন্ড বেঁচে গেছে। কিন্তু ওর দুটো হাত আর বুক-পেটের অনেকটা খুব বাজে ভাবে পুড়ে গিয়েছিল। সেইদিন এমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ের বার্ণ ওয়ার্ডে আর জায়গা ছিল না। তাই ওকে নিয়ে আসা হল সার্জারি বিল্ডিংয়ের এক তলার ওয়ার্ডে। আমরা ওটাকে এস.এ.ডাবলিউ বলতাম।

পরের দিন সকালে ওয়ার্ড রাউন্ডের সময় দেখলাম রতনের জ্ঞান এসেছে। ওয়ার্ডের ড্রেসার দাদা বেশ ভাল করে ঘা গুলোতে মলম লাগিয়েছেন। স্যালাইন চলছে। অ্যান্টিবায়োটিক চালু করা হল। আমরা ওকে মিনিট দুয়েকের জন্য দেখে অন্য রুগী দেখতে চলে গেলাম।

একদম জুনিয়র পিজিটি হওয়ার জন্য আমার কাজ ছিল সন্ধ্যেবেলা আরেকবার ওয়ার্ড রাউন্ড দিয়ে তারপরে বাড়ি ফেরা। এস.এ.ডাবলিউ ওয়ার্ডে ঢুকে বাকিদের দেখার সাথে রতনকেও দেখব। এই সময় এই জুনিয়র ডাক্তারের মনে হল এই রুগীটাকে একটু উপদেশ দেওয়া দরকার।

রতনের বেডের কাছে গিয়ে বেশ গম্ভীর ভাবে বললাম,

– হুকিং করার কি দরকার ছিল? জানেন না এটা ইল-লিগাল। আর আপনি মারা গেলে আপনার বাড়ির লোকেদের কে দেখত?

দেখি লোকটা মাড়ি বার করে হাসছে,

– ওরা আপনাকে বলেছে আমি হুকিং করছিলাম?

– দেখুন এখন এটা নিয়ে মিথ্যে বলে কি হবে? বেশ মারও তো খেয়েছেন এর জন্য। অজ্ঞান ছিলেন তাই বোঝেননি। এই থাইয়ের ওপরের কালশিটেটা কি কারেন্টের জন্য হয়েছে ভেবেছেন নাকি?

রতন এবারে ওর বেডের পাশের টুলটা দেখিয়ে বলল,

– একটু এখানে বসুন না ডাক্তারবাবু, দুটো কথা বলি।

ডাক্তারবাবুর তখন বাড়ি ফেরার তাড়া, কিন্তু যেচে যখন উপদেশ দিতে এসেছি তখন সবটা তো শুনতেই হবে, আমি টুলে বসার পরে রতন বলল,

– আমি সত্যিই হুকিং করিনি স্যার। আমার একটা ছেলে আছে, দশ বছর বয়স। ও ঘুড়ি ওড়াবে বলে খুব বায়না করছিল। তাই পরশু একটা একতের ঘুড়ি আর একটু মাঞ্জা সুতো কিনে এনে দিয়েছিলাম। তো ব্যাটার আর তর সইল না, হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই ওড়াতে আরম্ভ করল। কিন্তু কাল বিকেলে ঘরে ফিরে দেখি ছেলেটা মুখ কালো করে বসে আছে। ঘুড়িটা ওই ল্যাম্পপোস্টটার তারে আটকে গেছিল। সেই জন্যই তো সন্ধ্যেবেলা বিশ্বাসদের জানলা বেয়ে উঠে ল্যাম্পপোস্টটা থেকে ঘুড়িটা ছাড়াচ্ছিলাম। ছেড়েও গেল, কিন্তু তখন আর টাল সামলাতে না পেরে হাত দুটো পড়ল তারের ওপরে। তারপরে আর কিছু মনে নেই। আরেকটা নতুন ঘুড়ি কেনার জন্য পয়সা খরচ আমাদের কাছে বাড়াবাড়ি স্যার। কিন্তু কি করব বলুন, ছেলেটার শুকনো মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। আজকে ও ঘুড়িটা আবার উড়িয়েছে জানেন! বিকেলে মায়ের সাথে এসে বলে গেল আমাকে।

রতনের উজ্জ্বল চোখদুটো দেখেও সেইদিন আমার কিচ্ছু মনে হয়নি। ভেবেছিলাম বোকা, খামখেয়ালি একটা লোক। কিন্তু আজকে সেদিনের কথা আবার লিখতে বসে অন্যরকম একটা চিন্তা মাথায় এল। আমিও এখন একজন বাবা, আমার মেয়ের চারিদিকে প্রাচুর্যের কোন অভাব নেই। না চাইতেই কতকিছু পেয়ে যায়। কিন্তু রতনের ছেলের কাছে তো একটা ঘুড়িই একটা পৃথিবীর আনন্দ ছিল। সেইটা পাইয়ে দেওয়ার জন্য ওই ক্ষ্যাপা লোকটা ইলেকট্রিকের পোলে উঠতেও ভয় পায়নি।

এখানেই ফুচকাওয়ালার বাবা হওয়া ডাক্তারের বাবা হওয়ার থেকে অনেক হাজার মাইল এগিয়ে রয়েছে।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

লেখক- অনির্বাণ ঘোষ

2 comments

  • 🙏🏻 Ager gulo moton Ei series er golpo ta o ekdum mon chuye gelo… tobe last line ta thik na… Baba naam ta onno kono podobi r obodaan er jonno opekhha kore na… fuchkawala hok ba doctor e hok… baba du Jon e … dorkar porle doctor o electric post e uthe jabe kichu bhaba r age… taai na?

Leave a Reply