ভূত আমার পূত – গল্প ৫ – লন্ডনে গণ্ডগোল (শেষ পর্ব)

Anirban & Arijit, Series, Story, Supernatural, বাংলা, ভূত আমার পূত

~ আগে যা ঘটেছে ~

লন্ডনে এসে থাকবার জায়গা খুঁজতে গিয়ে পছন্দ হল নর্থ লন্ডনের একটা বাড়ি। কিন্তু সেখানে পৌঁছবার পর থেকেই আমার অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতা হতে থাকল। বাড়ির মালিক গ্রাহামের নিমন্ত্রণে একতলায় ওনার ঘরে গেলাম এক শনিবার সন্ধেবেলা। গ্রাহাম ওর বন্ধু টমাসের গল্প শোনাবে বলল আমাকে।

~ এবার শেষ পর্ব ~

– কিন্তু আপনি যে টমাস কে কথা দিয়েছিলেন যে এই ঘটনা আর কাউকে বলবেন না।

– আমি ওর কথা রেখেওছিলাম। কিন্তু এরপর আমার মনে হয় যে কিছু লোককে যদি আমি এই গল্প না বলি, তাহলে নিজের কাছে দোষী থেকে যাব।

– আমি কি সেই ভাগ্যবান মানুষদের একজন?

– তুমি ভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান, সেটা গল্প শোনবার পরেই ঠিক কোরো না হয়। গল্প টা আমাকে যেমনভাবে টমাস বলেছিল প্রথম পুরুষে, ঠিক সেইভাবেই তোমাকে বলছি, এতে তোমারই বুঝতে সুবিধা হবে। শুরু করছি টমাসের গল্প।

||

টমাসের গল্প (ওর নিজের বয়ানে):

এমিলির মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারলাম না। তুমি তো জানোই যে আমি খুব একটা লোকসমাজে মিশতাম না। আমার বন্ধুবান্ধব, ফূর্তি এইসব পছন্দ ছিল না। কিন্তু এমিলি আমার জীবনে আসার পর থেকেই আমি নিজেকে সমর্পণ করে দি ওর কাছে। আমরা দুজনেই একে অপরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম। আমার বাড়ি তে এমিলি এসে থাকতে শুরু করল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঘরদোর গুছিয়ে নিজের মতো করে নিল। ওর খুব পছন্দের পেন্টিং ছিল পিয়েতা, কিন্তু আমার ভালো লাগত না ওটা, মাতা মেরির কোলে শোয়ানো মৃত যীশু। শোবার ঘরে ও টাঙালো সেই ছবি। আরও কত ছবি আর ফুলে আমাদের ঘরের ভোল পালটে গেল। কিন্তু বিধাতার সহ্য হল না আমাদের এই সুখ। বেছে নিল এমিলি কে। আমাদের জীবন ভালোভাবে শুরু হওয়ার আগেই এক অজানা রোগে আমাকে একা ফেলে চলে গেল এমিলি।

আমি আগের থেকেও বেশি একা হয়ে গেলাম। নিজের দুঃখের কথা বলার মতোও কাছে কেউ নেই। নিজের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকুও হারিয়ে ফেলেছি তখন। তাই মনে হল এমিলির কাছেই পৌঁছে যাই। খুব ভেবেছিন্তে ঠিক করলাম আমার বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা বহুতল কমপ্লেক্স আছে, তার ছাদ থেকেই পাড়ি দেব।

দিনক্ষণ ঠিক করে পৌঁছে গেলাম। রাত তখন ১ টা। ২৩ তলা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে মনে হল গোটা শহর আমাকে হাত বাড়িয়ে নিষেধ করছে। কিন্তু তখন আমি মনস্থির করে ফেলেছি, আর ফিরব না। শীতে কাঁপতে কাঁপতে এগোলাম ছাদের পাঁচিলের দিকে ধীরে ধীরে। পাঁচিলের নিচেই জলের মোটা পাইপ। সেই পাইপের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। ঝুঁকে নিচের দিকে তাকাতেই মাথা ঘুরে গেল। কিন্তু সাহস করে উঠে পড়লাম পাঁচিলের ওপর। আশেপাশে জনমানবহীন, নিচে সরু সুতোর মতো রাস্তা দেখা যাচ্ছে। লাফিয়ে যে পড়ব সেই সাহসই পাচ্ছি না, অথচ মনে হচ্ছে খুব সোজা, চেষ্টা করে পা বাড়িয়ে দিলেই আর চিন্তা নেই।

– কি হল ভয় পাচ্ছেন?

হৃৎপিণ্ড খুলে হাতে চলে আসার মতো চমকে উঠলাম। কোনরকমে পাঁচিলের ওপরেই অর্ধেক বসে পিছনে তাকালাম। আমারই মতো বয়সের এক ভদ্রলোক, উস্কোখুস্কো চুল, পাগল কিনা বুঝতে পারলাম না। বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

– কে আপনি? এখানে কি করছেন?

– ওসব ছাড়ুন, ভয় লাগছে কিনা বলুন ঝাঁপ দিতে।

– না না মানে, আমি তো….

– খুব সোজা। আমাকে খেয়াল করুন।

এই বলেই লোকটা আমার থেকে ৫ ফুট মতো দূরে পাঁচিলের ওপর উঠে দাঁড়াল। দুহাত দুদিকে করে বুকভরে শ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকাল।

– সাহস করে জাস্ট পা বাড়িয়ে দিন, এত ভাববার কিছু নেই।

– মানে? আপনি কি বলছেন কিছু বুঝতে পারছি না।

– ওহ্, দেখুন আমাকে।

ভদ্রলোক ঝুঁকে একবার দেখলেন নিচে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে লাফিয়ে পড়লেন!!

আমি আতঙ্কে কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে দেখতে পারলাম যে ওনার দেহ নিচের দিকে দ্রুত গতিতে পড়ছে। কিন্তু শেষ অবধি দেখবার আগেই চোখে হাত চেপে পাঁচিল থেকে নেমে এলাম। এ আমি কি দেখলাম! কি বীভৎস এই দৃশ্য! কে ছিলেন ওই ভদ্রলোক। দম আটকে আসছে আমার, হার্টবিট যেন দৌড়চ্ছে। আজ কি করতে এসেছিলাম, আর কি সব হয়ে গেল। কিছু মাথায় ঢোকার আগেই পেছন থেকে শব্দটা এল।

– নিন, বুঝে গেছেন তো কিভাবে লাফাতে হবে, এবার আপনার পালা।

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সেই একই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। আমার চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এল।

~

সেদিনের ওই ঘটনা নিয়ে অনেকবার ভাবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনও ব্যাখ্যা পাইনি। আমি সেদিন মদ্যপও ছিলাম না যে অতটাও ভুল দেখব। তবে সেই ঘটনার কারণ আমি বুঝতে পারলাম তার এক সপ্তাহ পর।

সন্ধেবেলা স্টেশনের বেঞ্চে বসে কাগজ পড়ছি। আমার পাশে আরও তিনজন বসে। দুজন ভদ্রলোক ও একজন ভদ্রমহিলা। এইসময়ে স্টেশন একটু ফাঁকাই থাকে। তবে আজকে সব বেঞ্চই ভর্তি। অদ্ভুতভাবে কেউই দাঁড়িয়ে নেই প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন আসতে বেশ দেরি। খুবই শান্ত পরিবেশ, বলা যায় একটু বেশিই শান্ত, কেউ কারুর সাথে কথা বলছে না, সবাই নিজের মতো বসে।

ট্রেন আসবার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আরও আধঘন্টা হয়ে গেল, কিন্তু ট্রেনের দেখা নেই। আমি কি নিজেই এটা খেয়াল করছি শুধু, বাকিদের তো কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই! হঠাৎ দেখি স্টেশন মাস্টার এগিয়ে আসছে আমার দিকে। ওনাকে দেখে একটু চিন্তিত মনে হল। তবে আমার সামনে এসে উনি যা বললেন, তা শুনব বলে বিন্দুমাত্র আশা করিনি।

– আপনি যাবেন কোথায়? ট্রেন তো আজ ক্যান্সেল। একা একা এই স্টেশনে বসে করছেন কি?

আমি ভদ্রলোকের দিকে একমিনিট হতবাকের মতো তাকিয়ে রইলাম। মনে হল আমার সাথে হচ্ছেটা কি! আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? উনি বলার পর আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম পুরো স্টেশনে আমি একাই বসে এই বেঞ্চিতে। হঠাৎ কেমন কাঁপুনি খেলে গেল সারা শরীর জুড়ে। কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলাম স্টেশন মাস্টারকে,

– ট্রেন কখন ক্যান্সেল হল? কারণ কি?

– আরে সকাল থেকেই তো বোর্ড লাগানো। খেয়াল করেননি? আগের স্টেশনের কাছে বিশাল ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে লাইনচ্যুত হয়ে। অনেক লোক মারা গেছেন। আপনাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখেই ভাবলাম আপনি নিশ্চয় জানেন না।

আমি স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। মনে ঘুরপাক খেতে লাগল অজস্র প্রশ্নের ভিড়। আমি আজ যাঁদের দেখলাম স্টেশনে, তারা কি…? সেদিন রাতে আমি যাকে দেখেছিলাম, তিনিও কি…? তার মানে আমি এখন ওদের…..

~

এই অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী আমি কেন বা কিভাবে হয়ে উঠলাম আমি নিজেও জানি না। দুই দুনিয়ার মাঝে যে সূক্ষ্ম পর্দা থাকে, তা আমার চোখের সামনে থেকে উঠে গেছে। আমি এখন ওদের সবাইকে দেখতে পাই। এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হলাম যেদিন বাড়ি ফিরে আমার দোতলার ঘরে ঢুকে দেখি দেওয়ালে টাঙানো পেন্টিং গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে….. এমিলি!

বিশ্বাস করো গ্রাহাম, ওই দুনিয়ার কোন অস্তিত্ব দেখলেই আমি ভয় পেয়ে যাই, কিন্তু এমিলি কে দেখে একটুও আশ্চর্য হলাম না। মনে হল ও তো আমার সাথেই আছে। কিন্তু ওর কাছে যেতেই দেখলাম আর নেই। মন খারাপ হয়ে গেল। তারপর থেকে মাঝেমাঝেই ওকে দেখি, খুব চাই যে আমার সাথে ও কথা বলুক, কিন্তু শুধু মুচকি হাসে, আর তারপর খুঁজে পাই না আর। আমি তো এখন লোকজন দেখে বুঝতেই পারি না যে কে জীবন্ত আর কে অশরীরী। ভেবেছিলাম একজন সাইকোলজিস্ট কে দেখাই, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল এমিলিকে দেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলব। এ যদি আমার মানসিক অসুস্থতাই হয়, তাহলে তাই সই।

সব এইভাবেই চলছিল, কিন্তু বাধ সাধলো আজ সকালবেলা। কোনওদিন ভাবিনি যে এইভাবে আমার এই অদ্ভুত ক্ষমতার নিষ্পত্তি হতে পারে!

ঘুম ভাঙলো সকাল ১০ টা নাগাদ। চোখ খুলেই সামনে পিয়েতার ছবি দেখে আমার দিন শুরু হয়। এমিলির পছন্দ বলে এখনও একই জায়গায় রেখে দিয়েছি একে। পাশের ভ্যান গঘের পেন্টিং টা আমার ফেভারিট। তন্দ্রা ভেঙে উঠে বসলাম। খাট থেকে নেমে ঘরের দরজা খুলে করিডর দিয়ে বাথরুমে গেলাম। মুখ ধুয়ে রোজকার মতো এসে বসলাম রান্নাঘরে রাখা ছোট ডাইনিং টেবিলে। আপেল আর কলা দিয়ে প্রাতরাশ সারলাম। তারপর উঠে বড় ঘরে যাওয়ার আগে কি মনে হল শোওয়ার ঘরে একবার ঢুকব বলে দরজা ফাঁক করতেই দেখি……

ঘরের মধ্যে খাটের ওপর আমার দেহ টা শুয়ে আছে, ঘুমে আচ্ছন্ন!!

|| ♣ ||

টমাসের গল্পটা শেষ হতেই আমার আর গ্রাহামের মাঝে রাখা মোমবাতি দমকা হাওয়ায় নিভে গেল, আর সাথে ঘরের আলোও। প্রচণ্ড ভয়ে আমার হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটাও গেল মাটি তে পড়ে।

নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যেও গ্রাহামের গলা শুনতে পাচ্ছি। গ্রাহাম বলে চলেছে, “সেদিনও ঠিক এইভাবেই আলো নিভে গেছিল জানো তো! কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যখন আলো এল, তখন দেখলাম আমার সামনের আসনে কেউ নেই। আমি কিছু একটা আন্দাজ করেই পড়িমরি করে ছুটলাম দোতলায়। গিয়ে দেখলাম ঘরের মধ্যে বিছানায় পড়ে আছে টমাসের নিথর দেহ, ঠিক যেন ঘুমে আচ্ছন্ন।”

||

সকালের প্রথম রোদ চোখে পড়তেই ঘুম ভাঙল। লন্ডনের রোদে একটা মিষ্টতা আছে, যেন স্পর্শ করে যায়। সোফাতেই যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি, অবশ্য কাল রাতে ওই অন্ধকারের মধ্যে আর ওপরে ওঠবার মতো সাহস আমার ছিল না। গ্রাহামকে দেখলাম ব্যাকইয়ার্ডে বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত। ওকে হাত নেড়ে বিদায় বলে আমি ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

কাল অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি, কিন্তু কয়েকটা জিনিস মেলানো বাকি। জীবন মাঝে মাঝেই নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তা কোনদিকে বাঁক নেবে আমরা কেউ বুঝতে পারি না। টমাসের জীবনও ছিল ঠিক সেইরকম। সে আর তার ভালোবাসার মানুষ মিলে বানাতে চেয়েছিল একটুকরো স্বপ্নের আস্তানা। কিন্তু বারেবারে অদৃষ্টের নির্মম আঘাতে তা শুধু ইঁট কাঠ পাথরের একটা বাড়ি হয়েই রয়ে গেল।

হ্যাঁ, এটাই ছিল টমাসের বাড়ি। এই বাড়িতেই সে ফিরে পেয়েছিল তার এমিলি কে। এই বাড়িতেই শেষদিন কাটিয়েছিল সে। টমাসের সেই ঘরে ঢুকে পিয়েতার ছবির সামনে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। যীশুর মূর্তিটা মনে হয় গ্রাহামের রাখা, হয়তো অশুভ শক্তিকে বাধা দিতে। দিনের আলোতে অতটা ভয় লাগছিল না আর।

গ্রাহামকে অনুরোধ করায় উনি আর এক বন্ধুর বাড়িতে আমার থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার সিদ্ধান্ত কে সম্মান করেছিলেন বলে আমি কৃতজ্ঞ ওনার কাছে। আসবার দিন সিঁড়ির দেওয়ালে আটকানো এমিলি আর টমাস স্পুনার-এর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রার্থনা করলাম যেন ওরা এই স্বপ্নের সংসারে একে অপরকে ভালোবেসে খুব শান্তিতে থাকতে পারে। গ্রাহামকেও রিকুয়েস্ট করে এলাম উনি যেন দোতলার এই ঘর আর ভাড়া না দেন, মনে হল উনি তাতে সহমত হলেন।

গাড়ির পেছনে লাগেজ ওঠাবার পর দরজা খুলে গাড়িতে ঢোকার আগে একবার তাকালাম আমার দোতলার ঘরের সেই বিশাল জানলার দিকে, এখন সেটা বন্ধ। হয়তো তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আমাকে হাত নাড়ছে টমাস, হয়তো তার পাশেই দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে এমিলি!

~||♦সমাপ্ত♦||~

ভূত_আমার_পূত সিরিজের বাকি সবকটা গল্প পড়তে হলে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে।

http://anariminds.com/category/bhoot_amar_poot/

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

Leave a Reply