হায়রোগ্লিফের দেশে- ১১/ ঈশ্বরের লিপির রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব)

Anirban & Arijit, History, বাংলা, হায়রোগ্লিফের দেশে

– হায়রোগ্লিফ শিখতে তোমাদের বেশি সময় লাগবে না, তোমাদের জেনারেশনটা ওইদিকেই এগোচ্ছে.. না না এগোচ্ছে না, বলা ভাল পিছিয়ে যাচ্ছে।
মেস থেকে ডিনার করে ঘরে ফিরে পিজির টেবিলে রাখা হাজমোলার শিশিটা খুলে দুটো ট্যাবলেট মুখে পুরে ছিল ভবেশদা। পুরেই ডান চোখ কুঁচকে মুখে টাক্ করে একটা শব্দ করল। তারপরে পিজির খাটটায় বসতে বসতে বলল কথাগুলো।
আমি বললাম,
– সুযোগ পেলেই আমাদেরকে খোঁটা দেন। কিন্তু হায়রোগ্লিফিক বোঝার সাথে এই জেনারেশনের মিল নেই কোনো।
– কে বলল মিল নেই! আলবাত আছে! হায়রোগ্লিফের গোটাটাই হল ছবি দিয়ে কথা বলার চেষ্টা। তোমরা তো আজকাল তাই করছ। হোয়াটস্যাপে ফেসবুকে দেখি এখন ইমোজির ছড়াছড়ি। ‘দুঃখ পেলাম’ এই দুটো শব্দ না লিখে এখন স্যাড ফেস পাঠাও। ‘ভাল লাগল’ এইটা বলতে কষ্ট হয়, লাইক করো। দিনকে দিন দেখছি আবেগ গুলো ন্যারো হয়ে যাচ্ছে। তোমরা তো ওই প্রাচীন যুগেই ফিরে যাচ্ছ একটু একটু করে।
অকাট্য যুক্তি। অতএব এই নিয়ে কথা বা বাড়ানোই ভাল। পিজিও মনে হয় বুঝতে পেরেছিল সেটা,
– আপনি কোলবালিশটা টেনে নিয়ে ভাল করে বসুন ভবেশদা। আরেকটা হাজমোলা খাবেন?
– অত অয়েলিং না করলেও চলবে, তোমার মুখে এমন কথা শুনলেই আমার ভয় লাগে। হায়রোগ্লিফ শিখবে তো? একটা কাগজ পেন নিয়ে এসে বসো।
বসলাম সব গুছিয়ে,
– এবারে মোবাইলে একটা ছবি বার করো দেখি, সার্চ দাও – মেরেরিজ স্টেলা।
– এটা আবার কি?
– মেরেরি ছিল মিশরের দানদেরা অঞ্চলের পুরোহিতদের নেতা গোছের। এই স্টেলাটা হল ওর কবরে থাকা হায়রোগ্লিফ খোদাই করা পাথর। এখন স্কটল্যান্ডের একটা মিউজিয়ামে আছে। তবে নেটে পেয়ে যাবে ছবিটা।
– হুমম এই তো, এটার কথা বলছেন কি?


– দেখি, হ্যাঁ এটাই, এবারে এই ছবিটাকে ভাল করে দেখো তো জগাই মাধাই, দেখে বল কি বুঝতে পারছ।
আমরা দুজনে মিলে ছবিটাকে বড় করে বেশ খুঁটিয়ে দেখলাম। কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকল না।
– অনেকগুলো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি তো।
– হুমম, তার মধ্যে কটাকে চিনতে পারছ?
– বেশ কয়েকটাই। একটা মানুষ বাঁ হাতে একটা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা সিংহ, একটা প্যাঁচা, একটা গরু, দুটো বসে থাকা লোক, একটা কোয়েলের মতো পাখি, একটা হাত, একটা চোখ।
– ঠিক বলেছ, বাঁ দিকের লোকটার ছবিটাই সব চেয়ে বড় তাই না? তার মানে এতে নিশ্চয় ওই লোকটাকে নিয়েই কিছু লেখা আছে, তাই তো?
– এই লোকটাই মেরেরি?
– হ্যাঁ, মেরেরিকে নিয়ে কয়েকটা ভাল ভাল কথা লেখা আছে এখানে। এবারে ব্যাপারটা হল সেটা পড়া যাবে কি করে। খেয়াল করে দেখ স্টেলাটাতে চারটে কলাম, প্রথম আর দ্বিতীয় কলামটাকে ভাগ করা আছে মেরারির হাতের লাঠিটা দিয়ে।
– হ্যাঁ এটাও লক্ষ্য করলাম।
– চারটে কলামেই বাকি ছোট ছোট ছবিগুলো সাজানো আছে ওপর থেকে নিচে।
– ওহ, তার মানে হায়রোগ্লিফ ওপর থেকে নিচেতে পড়তে হয়?
– না তা নয়। হায়রোগ্লিফের খুব বেসিক কটা নিয়ম বলে দি শোন আগে,
এক নম্বর, হায়রোগ্লিফে কোন অ্যালফাবেট নেই, মানে এ বি সি ডি বা অ আ ক খ বলে ওদের কিছু ছিল না। এই প্রত্যেকটা চিহ্ন আসলে এক একটা উচ্চারণকে বোঝায়। মানে এগুলো ফোনেটিক সাইনস। যেমন প্যাঁচাটা হল ‘ম’ উচ্চারণের জন্য, যেমন টা হয় আম, মা এই শব্দ গুলোতে।

দুনম্বর, হায়রোগ্লিফে লেখার সময় ভাওয়েলের দিকে কেউ খেয়াল রাখত না। যেমনটা এখন তোমরা মেসেজ করার সময় করো। যেমন ধরো তুমি লিখলে ‘ppl cn rd ths’। মানে people can read this তাই তো?
– হ্যাঁ, টেক্সট করার সময়, চ্যাট করার সময় তো এরকমই করি।
– হায়রোগ্লিফেও তাই হতো। ভাওয়েল গুলো বাদই থাকত। কিছু কিছু ভাওয়েলের উচ্চারণের হায়রোগ্লিফিক চিহ্ন আছে যদিও। যেমন অ, আ,ই, উ। দাঁড়াও এবারে বেসিক হায়রোগ্লিফিক সাইন গুলো লিখে দি।
এই বলে ভবেশদা সামনে রাখা খাতাটাতে পেন দিয়ে লিখতে বসল, একটা জায়গাতে ‘ইস, ভুল হয়ে গেল’ বলে কেটে আবার লিখল। লিখে আমাদেরকে খাতাটা দিয়ে বলল,


– এই হল একদম বেসিক লেভেলের হায়রোগ্লিফের কয়েকটা অক্ষর। এবারে এগুলোর সাথে মেরারির স্টেলার চিহ্নগুলো মিলিয়ে দেখ তো কটা মিলছে,
– বাহ! অনেকগুলোই চিনতে পারছি তো এবারে, ই,ন , র, ম, ড, চ, ট !
– খুব ভাল, এবারে তাহলে তিন নম্বর নিয়মটা বলি,
হায়রোগ্লিফ এমন একটা ভাষা যেটা যেমন ডান দিক থেকে লেখা যায় তেমন বাঁ দিক থেকেও লেখা যায়। আবার ওপর থেকে নিচেও লেখা যায়।
– ওরে বাবা, তাহলে পড়ার সময় বুঝব কি করে কোন দিক থেকে শুরু করব?
ভবেশদা এবারে মুচকি হেসে বলল,
– সেটা বোঝা খুব সোজা, মেরারির স্টেলাতে দেখ কলাম আছে, মানে ওপর থেকে নিচেই যে লেখা সেটা বুঝতে কোন অসুবিধা হবে না। পাশাপাশি লেখা থাকলে খেয়াল করতে হবে কোন জন্তু,পাখির বা শরীরের কোন অংশের ছবি থাকলে তার ফেস বা মুখ কোন দিকে আছে। যেদিক থেকে লেখা শুরু হবে সব কটা চিহ্নের ফেস সেই দিকে থাকবে। যেমন ধরো এই লেখাটা, আমার এঁকে দেওয়া ছবিগুলো মিলিয়ে পড়ার চেষ্টা করতো দেখি,
বলেই ভবেশদা খসখস করে একটা কিছু এঁকে আমাদেরকে দেখালো, দুজনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে আঁকাটার সাথে আগের এঁকে দেওয়া চিহ্নগুলো মেলাতে লাগলাম।


– আরিব্বাস! এই তো পড়তে পাড়ছি! ভ-ব-শ, ভাওয়েল নেই। তার মানে আপনার নাম এটা! ভবেশ!
– বাহ! একদম ঠিক বলেছ, এবারে বল কি করে বুঝলে কোন দিক থেকে পড়তে হবে।
– খুব সোজা, ব এর পা টা বাঁদিকে মুখ করে আছে ,লেখাটাও বাঁদিক থেকে পড়তে হবে।
– ভেরি গুড। এবারে এটা পড়ে দেখো।
আবার একটা কিছু এঁকে আমাদের দিল ভবেশদা, আমরা আবার মেলাতে লাগলাম আগের চিহ্নগুলোর সাথে।

– পাখির মুখ ডানদিকে, তার মানে ডান দিক থেকে পড়তে হবে। তাহলে হল- ক,ট,ট,উ । কুট্টু লিখলেন নাকি! এটা তো আমার ডাকনাম!

নিজের নাম হায়রোগ্লিফে দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।
– একদম ঠিক বলেছ। বেশ ঝটপট বুঝে গেলে তো ব্যাপারটা। এবারে তাহলে চার নম্বর নিয়মটা বলি,
চার নম্বর, কোন কোন হায়রোগ্লিফে লেখা শব্দের সাথে আরো একটা এক্সট্রা চিহ্ন থাকে। একে বলে ডিটারমিনেটিভ, মানে এই চিহ্নগুলোও বুঝতে হেল্প করবে যে কি লেখা আছে শব্দটাতে। যেমন ধরো একটা বসে থাকা ছেলে বা মেয়ে বোঝায় শব্দটা রেস্পেক্টিভলি একটা ছেলে বা মেয়েকে বোঝাচ্ছে। আবার একটা বসে থাকা ছেলের মুখে দাড়ি মানে ভগবানের নাম লেখা আছে। তেমন আর কয়েকটা চিহ্ন এঁকে দি দাঁড়াও।


– আচ্ছা, তাহলে এগুলোকেও লেখার সময়তে ইউজ করা যাবে।
– হ্যাঁ যাবে তো ।
পিজি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল , এবারে বলল,
– কিন্তু ভবেশদা তাহলে আমার নামটা কি করে হায়রোগ্লিফে লেখা যাবে? প্র এর কোন চিহ্ন আছে নাকি?
– এই কথাতেই আমি আসছিলাম, আগের হায়রোগ্লিফিক চিহ্নগুলোতে তোমাদের দেখালাম এক একটা অক্ষরের উচ্চারণের এক একটা চিহ্ন। কিন্তু অনেক সময় আবার একটা হায়রোগ্লিফিক সাইন দিয়েই দুটো বা তিনটে অক্ষরের উচ্চারণ বোঝানো যায়। তেমন অনেক চিহ্ন আছে, সব কটা আমার মনে নেই, কয়েকটা এঁকে দেখাই দাঁড়াও।


– আরিব্বাস !এই তো প্র এর চিহ্ন আছে!
– হ্যাঁ আছে তো। এবারে তাহলে নিজের নামটা লিখে দেখাও দেখি।
পিজি এবারে খাতাটা টেনে নিল।
– হুম, প্র-দি-প-ত
দেখুন তো হয়েছে কিনা?


– এই তো, একদম পারফেক্ট হয়েছে! এবারে মেরারির পায়ের কাছে কি লেখা আছে পড়ার চেষ্টা করতো দেখি।


– এই তো, লেখা আছে ম্র-র-র-ই। মানে মেরারিরই নাম কি?
– বাহ! একদম ঠিক ধরেছ!
– তাহলে কি এবারে গোটা স্টেলাতে লেখা সব হায়রোগ্লিফের মানে পড়তে পারব?
– দেখো চেষ্টা করে।
আমরা এতক্ষণের জ্ঞান সম্বল করে আবার মেরারির স্টেলাটা পড়ার চেষ্টা করলাম।
– না ভবেশদা পারছি না তো এখনো। অনেকগুলো চিহ্নই চিনতে পারছি কিন্তু মানে বেরোচ্ছে না তো তার কোনও।
– সেটা বেরোবার কথাও না ভাই। একটা জিনিস তোমরা ভুলে যাচ্ছ। এইটা লেখা আছে কিন্তু বাংলায় বা ইংরাজীতে নয়, প্রাচীন মিশরীয় ভাষায়। যেমন ধরো দুনম্বর কলামের এই জায়গাটা। বল দেখি কি লেখা আছে,

– এই তো, চ,ন ,ট,ট, তার পরে একটা গরু, মানে ডিটারমিনেটিভ, তার আগে তিনটে দাগ, মানে অনেকগুলো গরু।
– বাহ ! এইটুকুই যে বুঝতে পেরেছ তাতেই তো অনেক। ওই ‘চনটট’ মানে মন্দির। মানে এই শব্দটা বোঝাচ্ছে মন্দিরে যে গবাদি পশুর সম্পত্তি ছিল তাকে।
– তাহলে হায়রোগ্লিফের লিপির মানে উদ্ধার হল কি করে?
– এটা তো আগেরদিনই বললাম, ব্যাক ক্যাল্কুলেশন করে। এই হায়রোগ্লিফ থেকেই জন্ম হয়েছিল আরেকটা ভাষার। তার নাম কোপ্টিক। এর সাথে গ্রীক ল্যাঙ্গুয়েজের অনেক মিল ছিল। মিশরে আরবদের শাসনের আগে সবাই এই ভাষাতেই কথা বলত। তাই প্রাচীন হায়রগ্লিফ জানা মানুষ হারিয়ে গেলেও রিলেটিভলি নতুন এই ভাষাটা হারায় নি। অনেকেই এই ভাষা জানতো। তাই ওই কোপ্টিক ভাষার হেল্পেই এই হায়রোগ্লিফিক ইন্সক্রিপ্সহন গুলোর মানে বার করা গিয়েছিল।
– বাহ! একটা হারিয়ে যাওয়া ভাষা লুকিয়ে ছিল নতুন আরেকটা ভাষার মধ্যে!
– একদম তাই। মেরারির স্টেলাতে যেটা লেখা আছে তা হল, মন্দিরের গভর্নর মেরারি, যে কি না পুরোহিতদের প্রধান এবং মন্দিরের গবাদি পশুর অভিভাবকও বটে, ষে পুজো দিচ্ছে দেবতা ওসাইরিসকে। একদম ডানদিকের কোণের ছবিটা দেখ, ওটা ওসাইরিসের চিহ্ন।
আমি এবারে বললাম,
– বুঝছি ভাষাটা মোটেই সহজ কিছু নয়।
– একদমই সহজ নয়। আমি তোমাদের যেটুকু শেখালাম সেটুকু টিপ অফ দা আইসবার্গ বলতে পারো। বাকিটা আমি নিজেও ভাল ভাবে জানি না। তবে এইটুকু জ্ঞান দিয়ে তোমরা টুকটাক কটা শব্দ হায়রোগ্লিফে লিখে ফেলতেই পারবে। যাই হোক, অনেক খাটালে আজকে তোমরা আমাকে। কটা বাজে দেখতো।
সময় যে কোথা থেকে গড়িয়ে গেল খেয়ালই করিনি। মোবাইলের স্ক্রীনে এবারে দেখলাম ভোর চারটে ! সেদিনের মতো আড্ডাটা ওখানেই বন্ধ রেখে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন অবশ্য হোস্টেলে আমরা বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলাম। হায়রোগ্লিফে সবার নাম লিখে দিচ্ছিলাম যে!


লেখক- অনির্বাণ ঘোষ

কভারের ছবি- সৌমিক পাল


যে বইটা পড়ে লিখলাম-

Egyptian Hieroglyphs for complete beginners, Bill Manley,

2 comments

  • durdanto bolle kom bola hobe….anobodyo……..aamar naam ta (Saswata) boddo kothin…bangla english ei pen venge jai kajei hiero die try korar kotha vabteo parchhina…..

Leave a Reply