মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ১ ~ আর বিলম্ব নয়

Anirban & Arijit, Biography, বাংলা, মানিকের পাঁচালী

 

রাইটার্স বিল্ডিং এর ভেতরে এই ঘরেই অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন একজন কর্মচারী। ডাক পড়লেই ঢুকতে হবে সামনের কেবিনে। মানিকের পাশেই বসে বেলামাসির মেয়ে অর্চনা। আজ ওকে সঙ্গে নিয়ে আসতেই হল, কারণ মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করবার সুযোগ যে বেলা সেন আর তার স্বামী না থাকলে সম্ভবই হত না। তবে মানিক কিন্তু নার্ভাস নয়, বরং আজ ওর মনে পড়ে যাচ্ছে এতদিনকার লড়াইয়ের মুহূর্ত গুলো। স্ক্রিপ্টের কাগজ একটা আছে সঙ্গে, কিন্তু ডঃ বিধানচন্দ্র রায় কে গল্প টা শোনাতে সেটার দরকার পড়বে না।

||

১৪ই এপ্রিল, ১৯৫০। জাহাজ ছাড়তে আর বেশি সময় বাকি নেই। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখা গেল সিগনেট প্রেসের কর্ণধার দিলীপ কুমার গুপ্ত কে। মানিক এগিয়ে এল।

– আরে, খবর কি ডি.কে?

– আজ বেরিয়ে যাচ্ছ শুনে তাড়াতাড়ি এলাম। এটা ধরো।

– এটা কি?

– এই বইটা না পড়লে তোমার শিক্ষা অসম্পূর্ণ। এটার ইলাসট্রেশান তোমাকে করতে হবে। বইটা ভালো করে পড়ে দেখো, আমাদের গ্রামবাংলার সবকিছু জানতে পারবে।

ডি জে কিমার কোম্পানিতে ক্যালিগ্রাফির কাজে মানিকের সুদক্ষ হাত দেখে মিস্টার ব্রুম এর খুব ইচ্ছে ছিল ওকে বিলেত পাঠাবেন কমার্সিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে। তাই ওনারই উদ্যোগে মানিকের ৬ মাসের জন্য এই লন্ডনযাত্রার সঙ্গী মঙ্কু, এই নামেই মানিক ডাকে ওর স্ত্রী কে। দুপুর আড়াইটে নাগাদ বোর্ডিং হয়ে গেল। “মালোয়া” নামের জাহাজ ছাড়ল বিকেলবেলা।

১৬-১৭ দিনের এই জার্নিতে বিনোদনের কোনও অভাব নেই। প্রত্যেকদিন রাতে একটা করে সিনেমা দেখার পাশাপাশি মানিক শুরু করল দিলীপ বাবুর দেওয়া বই পড়ে ইলাসট্রেট করার কাজ।

“অদ্ভুত সুন্দর লেখা তো এই লোকটার, বইটা পড়তে পড়তেই যেন চোখের সামনে সব ছবি জীবন্ত হয়ে উঠছে। এই গল্প টা নিয়ে কিছু একটা করলে হয় না!” নিজের মনেই বলে উঠল মানিক।

লম্বা সফরের শেষে জাহাজ ছুঁল ইংল্যান্ডের মাটি।

||

লন্ডন শহরের প্রেমে পড়তে বেশিদিন লাগল না। মঙ্কুর কাছে তো এই সফর হানিমুনের সমান। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘোরাঘুরিও চলতে লাগল সমান তালে। এরই মধ্যে বিশেষ একদিনের অভিজ্ঞতা মানিকের মনে অনেকটা প্রভাব ফেলল।

ট্রাফালগার স্কোয়ারে আসার কথা অনেকদিন আগে থেকেই, কিন্তু ফাইনালি আজ আসা গেল। বিশাল ন্যাশনাল গ্যালারি দেখে মানিকের ইচ্ছে হল দুবছর আগে রিলিজ হওয়া “বাইসাইকেল থিভ্স” দেখতে গেলে কেমন হয়। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। মঙ্কু কে নিয়ে ঢুকল সিনেমা হলে। শুরু হল ছবি। দেখতে দেখতে কখন যে মঙ্কুর হাত ধরে ফেলেছে খেয়ালই করেনি মানিক। বাকরুদ্ধ হয়ে হল থেকে বেরিয়ে মনে হল যেন একটা ঘোরের মধ্যে দুজনেই।

লন্ডনের বাড়ি তে ফিরেও যেন মানিক চিন্তিত। ডি সিকা-র এই মুভি সত্যিই কি নাড়িয়ে দিল ভেতর টা।

– ভাবতে পারো মঙ্কু, কত সস্তায় ওই ধরনের ছবি করা যায়! পুরোটাই প্রায় লোকেশান। স্টুডিও ভাড়া করার হাঙ্গামা নেই বললেই চলে। আর সবথেকে বড় কথা হল নন-অ্যাকটর্স নিয়ে কাজ করা। তাতেও তো খরচা কত কমে যায়।

– সত্যি এভাবে যদি ছবি করা সম্ভব হত, কি ভালো হত। তবে বিষয় পাওয়া মুশকিল। আমাদের দেশে তো এধরনের ছবি কখনও হয়নি।

– করলেই হয়। বিষয় খুঁজলে নিশ্চয় পাওয়া যাবে। আমাদের বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডারে এরকম গল্প পাওয়া যাবে না বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

||

লন্ডনের ৬ মাস কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝাই গেল না। আসলে ভালো সময় এইভাবেই হুশ্ করে চলে যায়। বিলেতে থাকাকালীন প্রায় শখানেক সিনেমা দেখা হয়ে গেছে। জাহাজে ফেরার সময় মানিক ঠিক করল যে এতদিন যে গল্পের ইলাসট্রেশন করতে গিয়ে ছবি করার ইচ্ছে মাথায় ঘুরছে, সেটার সিনারিয়ো বা কাহিনী বিন্যাস নিয়ে বসবে। মঙ্কু কে জানাতেই ও বলল,

– এটা তো গ্রামের ছবি, অথচ তুমি তো আমাদের গ্রাম কোনওদিন চোখেও দেখনি।

– বইতে গ্রামবাংলার যে বিবরণ তাতে চোখের সামনে যেন সব দেখতে পাই। তবে হ্যাঁ, ফিরে গিয়ে কলকাতার কাছাকাছি গ্রাম নিজের চোখে দেখে আসতে হবে।

জাহাজ পৌঁছল সুয়েজ ক্যানাল। ডেকে আজ সারাদিন মঙ্কুর বেশ ভালো কেটেছে। সিনেমা দেখা, সাথে চেনা অনেকজনের সাথে গল্পগুজব করে কেবিনে ফিরে এসে দেখে মানিক খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছে। বউ কে দেখেই বলে উঠল,

– তরতর করে লেখা এগোচ্ছে। এত সুন্দর ভাষা, এত মনোগ্রাহী ঘটনা এবং গল্প। ঠিকভাবে করতে পারলে খুবই ভালো হবে মনে হচ্ছে।

মঙ্কু বসল ওর পাশে।

– পারবে, একশোবার পারবে, তুমি ছাড়া আর কেউ পারবে না। তোমার মনে কি সন্দেহ হচ্ছে?

– হবে না? কোনরকম অভিজ্ঞতা নেই ছবি করা সম্বন্ধে, কিন্তু তাও মনে হচ্ছে মনের মতো অভিনেতা আর কলাকুশলী পেলে হয়তো উতরে যাবে। অভিনেতা নির্বাচনটাই সব থেকে শক্ত।

– হবে হবে সব হবে, কিছু ভেবো না। আমাকে সিনারিয়ো টা পড়ে শোনাবে না?

– তোমাকেই তো সবচেয়ে আগে পড়াব। খুব মন দিয়ে পড়বে। যদি কোনও ভুল চোখে পড়ে, পাশে একটা চিহ্ন দিয়ে রেখো।

এই নিয়ম চালু থাকবে সারাজীবন। ভবিষ্যতে যে এই মহিলাই এমন অনেক ভুল সংশোধন করে দেবে, তা এখনও মানিকের অজানা।

জাহাজ রেডসি পৌঁছতেই খুব গরম শুরু হল। মানিক তবু অনড়, মাঝে মাঝে ডেকে ঘুরতে আসলেও আবার কেবিনে ফিরে গিয়ে বসে যাচ্ছে লিখতে। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলছে,

– কলকাতায় ফিরে গিয়ে এত সময় পাব না। একেই তো আপিস আছে, তার ওপর লোকজনের যাওয়া আসা। চেষ্টা করছি জাহাজেই যদি লেখাটা শেষ করতে পারি, তাহলে সবদিক দিয়ে সুবিধা হয়।

||

বংশী খুব ভালো বন্ধু মানিকের। বিলেত থেকে ফিরেই তাই মানিক আগে কথা টা পাড়লো ওর কাছে। বংশী তো শুনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বন্ধুদের মধ্যে বংশী চন্দ্রগুপ্তই একমাত্র ফিল্মের কাজে যুক্ত, অ্যাসিস্ট্যান্ট আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজও করেছে জাঁ রেনোয়ার সাথে। জাঁ এসেছিলেন কলকাতায় ওনার “দ্য রিভার” ছবির শুটিং এর জন্য। মানিক ওনাকে লোকেশান দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। গঙ্গার ধারে ব্যারাকপুরের একটা বাড়ি ওনার পছন্দ হয়। মানিকের খুব ইচ্ছে থাকলেও রোজ শুটিং দেখতে যেতে পারত না, কিন্তু বংশী এসে সব গল্প ওকে শোনাতো। একটা ছবিকে কীভাবে সুন্দর করে সাজিয়ে দেখাতে হয়, সেটা খুব সহজ করে মানিককে বুঝিয়েছিলেন রেনোয়া। ইউনিটের প্রধান আর্ট ডিরেক্টর ইউজিন লুরিয়ে তো মানিকের বেশ ভালো বন্ধুও হয়ে গেছিল।

বংশী আর মানিক মিলে মেতে উঠল এই নতুন কাজে। কিন্তু ১লা নভেম্বর ১৯৫০ একটা খারাপ খবর আসতেই মানিক খুব ভেঙে পড়ল। যার গল্পের ইলাস্ট্রেশন করতে গিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছে, যার সাথে দেখা করে ওর প্রথম ছবি করার ইচ্ছে নিয়ে কথা বলবে বলে ভেবেছে, সেই লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা গেছেন। ওনারই লেখা ছোটদের সংস্করণ “আম আঁটির ভেঁপু”-র প্রচ্ছদ আঁকতে গিয়ে সেই গল্পের প্রেমে পড়ে গেছিল মানিক।

এই ঘটনার পর আরও দৃঢ় চিত্তে সেই লক্ষ্য কেই পাখির চোখ বানিয়ে নিল। শুরু হল এক স্বপ্ন কে বাস্তবায়িত করার লড়াই, শুরু হল মানিকের “পথের পাঁচালী”!

||

ছুটির দিন হলেই বংশীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাম দেখতে বেরিয়ে যায় মানিক। ইতিমধ্যে বিভূতি বাবুর স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে অনুমতিও নেওয়া হয়ে গেছে। প্রযোজক খোঁজার মধ্যেই শুরু হল প্রথমে অপু খোঁজার পালা। কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল, আর তার জেরেই শয়ে শয়ে বাচ্চা আসতে লাগল তাদের বাবা মায়ের হাত ধরে। একজন তো নিজের মেয়েকে সেলুন থেকে চুল কাটিয়ে এনেছিলেন অপুর পার্টের লোভে, কিন্তু ঘাড়ে পাউডার লেগে থাকতে দেখেই মানিকের কাছে ধরা পোড়ে গেল। অগুনতি ইন্টারভিউ নেওয়া হল। কিন্তু অপু কিছুতেই পাওয়া গেল না।

মঙ্কু, অর্থাৎ বিজয়া একদিন শাশুড়ির ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে ব্যস্ত। আশেপাশের বাড়িতে মোটামুটি সাউথ ইন্ডিয়ান আর ইউ পি-র লোকজনই থাকে। তাদের বাচ্চারাই নিচের উঠোনে খেলছে। হঠাৎ বিজয়ার চোখ পড়ল পাঁচ-ছয় বছরের একটা ছেলের দিকে। ওকে দেখতেই মনে হল যেন অপুই খেলছে। বাড়ির কাজের লোককে ডেকে পাঠিয়ে ঐ ছেলে টা কে দেখিয়ে বিজয়া বলল, “জিজ্ঞেস করে যদি জানতে পারো যে ও বাঙালি, তাহলে ওকে একটু ওপরে নিয়ে এসো তো।”

কিছুক্ষণ বাদে ওপরে এল দুজন। সেই ছেলেটা আর তার দাদা। ছেলেটাকে দেখেই মনে হয় খুব লাজুক। তবে বাঙালি, তাই চিন্তা নেই। চোখ নাক ঠোঁট সব যেন অপুর যেমন যেমন দরকার, হুবহু তাই।

– কোথায় থাকো তোমরা? তোমার নাম কি?

ছোট ভাই তাকিয়ে মাটির দিকে। বড় ভাই উত্তর দিল, “গায়ে লাগা বাড়ির দোতলায় থাকি। ভাইয়ের নাম সুবীর।”

– ভাই কে নিয়ে সন্ধেবেলা একবার আসতে পারবে?

শুধু মাথা নেড়েই দুজনে চলে গেল, কারণও জিজ্ঞেস করল না। ছোটরা বোধহয় এইরকমই হয়।

মানিকের অফিস থেকে ফিরতে একটু সন্ধে হয়। আজ বাড়ি ঢুকতেই বিজয়ার হাসি হাসি মুখ দেখে মানিকের সন্দেহ হল।

– ব্যাপার কি মঙ্কু?

– একটা দারুণ খবর আছে!

– বলো বলো শুনি।

– অপুকে পাওয়া গেছে!

মানিকের চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চান খাওয়া সেরে এসে গুছিয়ে সোফায় বসার কিছুক্ষণ পরেই দুভাই এল। সুবীরের দিকে চোখ পড়তেই মানিক অবাক হয়ে বিজয়ার দিকে তাকাল, চোখে তৃপ্তির হাসি।

বড় ভাই কে মানিক বোঝাল যে কেন সুবীরকে তাঁর দরকার। বাবা মা আপত্তি করবে কিনা জিজ্ঞেস করায় সে বলল, “মনে হয় না।” এবার সুবীরকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল,

– তোমার অভিনয় করতে আপত্তি নেই তো?

– না।

– বাহ্, তাহলে তো আর কোনও কথাই নেই। আমি তোমাকে যেরকম দেখিয়ে দেব, তুমি ঠিক সেইভাবে করবে। পারবে তো?

– হ্যাঁ।

এতই লাজুক ছেলে যে হ্যাঁ আর না ছাড়া আর কোনও কথাই মুখ দিয়ে বার করা গেল না। ওরা চলে যেতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মানিক বলল, “রাজ্যি সুদ্ধ ঘুরে অপু খুঁজে বেড়াচ্ছি আর আমাদের পাশের বাড়িতেই যে ঠিক যেমনটি খুঁজছিলাম, তেমনটি পেয়ে যাব, তা ভাবতেই পারিনি। একেই বলে কোইন্সিডেন্স!”

||

দুর্গা কে খুঁজতে কিন্তু এতটা হ্যাপা পোহাতে হল না। মানিকের অ্যাসিস্ট্যান্ট আর লেখক আশীষ বর্মন একদিন বেলতলা হাইস্কুলে এক শিক্ষিকার সাথে দেখা করতে গেছে। সেখানে হঠাৎ চোখ পড়ল এগারো বারো বয়সের একটা মেয়ের দিকে। মানিক যে দুর্গাকে খুঁজছে এ খবর আশিষ তো জানেই। তাই মেয়েটার সম্বন্ধে স্কুল থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারল যে ওর নাম উমা দাশগুপ্ত। মানিককে এসে বলতেই ও যোগাযোগ করল উমার বাবা মায়ের সাথে আর উমা কে একদিন আসতে বলল ওদের বাড়ি।

একদিন বেশ সেজেগুজে গলায় মুক্তোর মালা পরে উমা এল। প্রথম দেখায় বিজয়ার ঠিক মনে ধরল না এই দুর্গা কে। তবে মানিক ওর সাথে কথা বলতেই বোঝা গেল বেশ সপ্রতিভ ও চটপটে মেয়ে। এরপর বিজয়ার দিকে তাকিয়ে মানিক বলল,

– ওকে গাছকোমর শাড়ি পরিয়ে টেনে চুল বেঁধে নিয়ে এসো তো আমার কাছে।

বিজয়া উমা কে নিয়ে এলেন পাশের ঘরে। সাজাতে গিয়ে বিজয়া টের পেলেন যে একদম খাঁটি দুর্গা পাওয়া গেছে। বড় সুন্দর চোখ নাক আর ঠোঁট, চেহারা বেশ বুদ্ধিদীপ্ত, রঙ একটু চাপা, তবে মুখ দেখলেই মনে হয় গ্রামের মেয়ে। সাজানোর পর ওকে ঘরে আনতেই মানিক হাততালি দিয়ে বলে উঠল,

– এই তো দুর্গা!

||

অপু দুর্গা ঠিক হওয়ার আগে থেকেই মানিক মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল বন্ধু সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী করুণাকেই সর্বজয়ার রোল অফার করবে। করুণার মুখের শান্তভাব দেখে বোঝাই যায় না যে ও উচ্চশিক্ষিত ও শহরের মেয়ে। একসময় ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কর্মীও ছিল সে। লিটল থিয়েটার গ্রুপে উৎপল দত্তের পরিচালনায় “পুতুলের সংসার” নাটকে নোরার ভূমিকায় অভিনয় করে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

হরিহরের রোলের জন্য রাজি করানো গেল প্রফেশনাল অভিনেতা কানু বন্দ্যোপাধ্যায় কে। একটা ইস্কুল মাস্টারের চরিত্র আছে, যে আবার মুদিখানাও চালায়। কৌতুকাভিনেতা তুলসী চক্রবর্তী কে এই রোল টা অফার করতেই উনি লুফে নিলেন। পাশের বাড়ির পানখেকো মহিলার ভূমিকায় রেবা দেবী কে নেওয়া হল। এই দুজন ছাড়া আর কেউই অভিনয় কি জিনিস জানে না। কিন্তু মানিকের প্রবল আত্মবিশ্বাস যে ও সবাইকে গাইড করে নিতে পারবে। তাই বাকি সব ছোটখাটো চরিত্রে মানিক ঠিক করল গ্রামের লোকজন দিয়েই কাজ করিয়ে নেবে।

তবে এখনও বাকি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, ইন্দির ঠাকরুন। রেবা দেবীর সাথে কথা হচ্ছিল মানিকের,

– মানিক বাবু, আপনাকে সন্ধান দিতে পারি একজনের। ইন্দিরের রোলের জন্য বেশ মানানসই, রাজি হলেও হতে পারে।

– কে বলে ফেলুন।

– তিরিশ বছর আগে থিয়েটার লাইনে কাজ করা একজন নামকরা অভিনেত্রী, যিনি ভাগ্যের ফেরে আজ কলকাতার এক রেড লাইট এরিয়ায় থাকেন, তাকে অ্যাপ্রোচ করতে পারেন।

– আচ্ছা। নাম কি ওনার?

– চুনিবালা দেবী।

যেমন শোনা তেমনি কাজ। প্রোডাকশন কন্ট্রোলার অনিল চৌধুরী কে নিয়ে মানিক ছুটল কলকাতার সেই নিষিদ্ধ পল্লীতে। গাড়ি থেকে নেমে অনিলই প্রথম দরজায় নক করল। ভেতর থেকে একটা বয়স্কা মহিলার আওয়াজ ভেসে এল। কিছুক্ষণ বাদে দরজা খুলল।

প্রথম দর্শনেই মানিকের মনে হল এই বয়স্ক মহিলার জন্ম যেন ইন্দির ঠাকরুনের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্যই হয়েছিল। ওনার মেয়েই ওনার দেখাশুনা করেন, উনি দুজনকেই বললেন ভেতরে এসে বসতে।

চুনিবালা দেবী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

– চা খাবেন?

– না আজ থাক।

– বাড়ির ভেতরের মেয়েদের দেখতে চান?

– আরে না না, আমরা অন্য এক কারণে এসেছি আপনার কাছে। আমি একটা ফিল্ম বানাচ্ছি, তার একটা রোলে আপনাকে খুব দরকার। আপনি কি ইচ্ছুক?

শুনেই চুনিবালা ভেতরের ঘর থেকে নিজে গিয়ে নিয়ে এলেন এক তোড়া কাগজ, তুলে দিলেন মানিকের হাতে।

– এগুলো কি?

– দেখুন। ভালো করে দেখুন। আমার অভিনয় জীবনের সমস্ত কাজের কথা পাবেন ওখানে।

মানিক মুচকি হাসল, ওর পরিশ্রম সার্থক, উত্তর জানা হয়ে গেছে।

– শুধু একটা অনুরোধ আপনাকে।

– বলুন।

– আপনার চুল ঠিক এক ইঞ্চি লম্বা করে কাটতে হবে।

পরের দিন অনিল আবার গিয়ে কথা বলে এল চুনিবালা দেবীর সাথে। ওনার মেয়ে অনুরোধ করলেন যে যদি ওনার মা কে ২০ টাকা রোজ দেওয়া হয়, তাহলে ওনারা খুব খুশি হন। মানিক শুনেই রাজি হয়ে গেল, আর সেই টাকা বাড়িয়েও দিল। পরে মানিক বুঝতে পেরেছিল যে চুনিবালা দেবীকে না পেলে পথের পাঁচালী হত না।

বংশী প্রথম থেকেই শিল্প নির্দেশক হিসেবে মানিকের সাথেই আছে। ক্যামেরাম্যান হিসেবে মানিক ঠিক করল সুব্রত মিত্র কে দিয়েই কাজটা করাবে। এদিকে সুব্রত খুব ভালো স্টীল ফটোগ্রাফার, কিন্তু কোনদিন মুভি ক্যামেরা তে হাতও ছোঁয়াননি। যথারীতি খুব ভয় পেয়ে আপত্তি করে বসল।

– পাগল নাকি! আমি যে একেবারে অজ্ঞ মুভি ক্যামেরায়। প্লিজ আমাকে বোলো না, তোমার কাজ খারাপ হোক আমি চাই না।

– আমার কথা শোনো। স্টীল আর মুভির যা তফাৎ, তা কিছুদিনের মধ্যেই রপ্ত হয়ে যাবে। তুমিই করবে এই কাজ, তোমার ওপরেই আমার ভরসা আছে।

যে মানুষটার এমন অগাধ বিশ্বাস কারুর ওপর, তাকে কিভাবে ফেরানো যায়। রাজি হয়ে গেল সুব্রত।

||

রায় বংশের নাম ঠাকুর বংশের ঠিক পরেই উচ্চারিত হয়, এমনটাই মনে করেন মানিকের মা। কিন্তু এমন বংশের সন্তান হয়েও সামান্য চাকরি আর ইলাসট্রেশানের কাজ করে পুঁজি জমানো খুব কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই সিনেমা করার ইচ্ছে থাকলেও প্রযোজকদের দরজায় দরজায় ঘোরা ছাড়া উপায় নেই।

অনিল আর মানিকের শুরু হল এক নিরলস খোঁজ। প্রযোজকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিত্রনাট্য শোনানোর পর মানিককে শুনতে হল “ভেবে দেখব” বা “গান নেই, নাচ নেই, প্রেমিক প্রেমিকা নেই, এ ছবি চলবে কেমন করে। কে আসবে ঐ বুড়ি কে দেখতে?” মানিকের মুখের ওপর না বলার সাহস কারুর হচ্ছিল না, তবে এর কারণ নামডাক নয় যেহেতু সেটা এখনও হয়নি, কিন্তু মানিকের ব্যক্তিত্ব। ওর সাথে কথা বলতে গেলে বেশ কয়েকবার ভাবতে হয়। তবে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির নাতি বা সুকুমার রায়ের ছেলে হওয়ার জন্য আলাদা কোনও সুবিধা মানিক পায়নি এই কাজে, আর নিজে দাবীও করেনি সেটা।

রানা দত্ত বলে একজন প্রোডিউসারের মনে ধরল প্লট টা। তবে উনি বললেন যে ওনার সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা যদি ঠিকঠাক চলে, তবেই দায়িত্ব নেবেন পথের পাঁচালী-র, প্রথমদিকে কিছু টাকা তিনি দিতে রাজি।

এরই মধ্যে কল্পনা মুভিজ এর প্রযোজক মিস্টার ভট্টাচার্যর সাথেও কথা হয়েছিল মানিকের। উনি চিত্রনাট্য শুনে কোনও মন্তব্য করেননি, কিন্ত পরে ধূর্ততার পরিচয় দিয়ে ফেললেন। সোজা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধবা স্ত্রীর কাছে গিয়ে দাবী করলেন যে “পথের পাঁচালী”-র ফিল্মিং রাইটস ওনাকে দেওয়া হোক, তাহলে দেবকী বোসের নির্দেশনায় উনি সেই মুভি করবেন। বিভূতিবাবুর স্ত্রী পরিস্কার জানিয়ে দিলেন ওনাকে যে সেই অধিকার উনি আগেই মানিক বাবুকে দিয়েছেন, তাই আর কাউকে দেবেন না।

অনেক চেষ্টা হল, কিন্তু এই নতুন ধরনের ছবি করার জন্য ঠিকঠাক অর্থসাহায্য কিছুই জুটল না। মানিক হারবার পাত্র নয়। একদিন সকালে অনিলকে ডেকে বলল,

– আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।

– কি সিদ্ধান্ত? বলো শুনি।

– আমার জীবনবিমার কিছু টাকা আছে। সাথে কয়েকটা ভালো ভালো দামি আর্টবুক আছে আমার, যেগুলো বিক্রি করে মোটামুটি কিছু পয়সা পাওয়া যাবে। নিকটতম বন্ধু ও আত্মীয়দের থেকে দেখছি যদি কিছু ধার করা যায়।

– মানে? করতে কি চাও তুমি?

– গোড়ার দিকের কিছু শুটিং নিজের পয়সাতেই করব। সেই শুটিং এর ফল অন্য প্রযোজকদের দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়া যাবে।

~~~♦ পরের পর্ব পড়ুন! ♦~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদ ~ সাবর্ণ্য চৌধুরি

|| উৎস সন্ধান ||

. আমাদের কথা – বিজয়া রায়
. My years with Apu – Satyajit Ray
. Portrait of a Director : Satyajit Ray – Marie Seton
. www.satyajitray.org
. Ravi and Ray – Times of India
. একেই বলে শুটিং – সত্যজিৎ রায়

. Renoir in Calcutta – Satyajit Ray

ভাবনার আদানপ্রদান যদিও চিরকালই হয়, তবুও বিশেষভাবে আমি কৃতজ্ঞ আমার ভাই অনির্বাণ ঘোষের প্রতি, কারণ এই সিরিজ লিখতে আমাকে উজ্জীবিত করার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ওর। রিভিউ-এর জন্যেও ওর আর শান্তনু দাসের কাছে আমি ঋণী।

www.facebook.com/anariminds
#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply