মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ২ ~ দেখোরে নয়ন মেলে

Anirban & Arijit, Biography, বাংলা, মানিকের পাঁচালী

আত্মবিশ্বাসই যে মানিকের প্রধান মূলধন, তা নিয়ে ইউনিটের কারুরই আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তাই এক নতুন অভিজ্ঞতার হাতছানিতে সকলেই পাশে এসে দাঁড়াল মানিকের।

শুরু হল ছবি!

২৭শে অক্টোবর ১৯৫২। আজ আবার বিজয়ার জন্মদিন। মানিক বেরোবার আগে বলল, “আজ ভালো দিন, কিছু একটা সুরাহা হয়ে যাবে নিশ্চয়।”

প্রথমেই অপু দুর্গার কাশফুলের ক্ষেতে শুটিং। কলকাতা থেকে সত্তর কিলোমিটার দূরে পালসিট বলে একটা জায়গায় শুটিং স্পট। গ্রামের শান্ত স্থির পরিবেশ, কাশফুলের ওপর দিয়ে হাওয়া বয়ে চলার শব্দ, টেলিগ্রাফ পোস্টের হালকা আওয়াজ। আর এই দৃশ্যপট কেই চিরে একটা ট্রেন ঢুকছে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। সেই দৃশ্য অপু দুর্গার চোখে জন্ম দিচ্ছে এক প্রবল বিস্ময় আর আনন্দের। এমনটাই ভাবনা মানিকের। চিত্রনাট্য বলে আলাদা কিছু নেই, মানিক নিজের হাতে এঁকেই রেডি করে ফেলেছে সিনগুলো, সবাইকে বুঝিয়েও দিয়েছে।

অপু, মানে সুবীরের আবার বমির ধাত, তাই ব্যাগ আর তোয়ালে সাথে করে নিয়ে আসতে হয়েছে। তবে বমি এখনও হয়নি এটাই রক্ষে। কিন্তু ওকে দিয়ে অ্যাক্টিং করাতে যে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ক্যামেরার সামনে ভয় বা লজ্জা ওর নেই, কিন্তু কাঠের পুতুলের মতো হেঁটে গেলে সিনেমায় যে খুব মেকি দেখাবে এই দৃশ্য। ওর বয়স কম, তাই ওর বোঝার ক্ষমতাও নেই। মানিকই আঁটলো একটা ফন্দি।

– বংশী, আশীষ, এইদিকে শুনে যাও।

– বলো।

– কাশবনের যেখান দিয়ে সুবীরের হেঁটে যাওয়ার কথা, সেই রাস্তার বিশেষ বিশেষ জায়গায় দুদিকে লুকিয়ে বসে থাকবে তোমরা। আর….

ক্যামেরা স্টার্ট হতেই সুবীর হাঁটা শুরু করল। যেই ওই বিশেষ জায়গা গুলোর কাছে ও এল তখনই আশীষ আর বংশী ওকে “সুবীর, ও সুবীর” বলে লুকিয়ে ডাকতে লাগল। এতে সুবীরও সেদিকে ঘুরে তাকাতে লাগল। এরপর মানিক চিৎকার করে বলল, “বাঁ পা টা তুলে একটু চুলকে নাও”। বাধ্য ছেলের মতো ও তাই করল।

পর্দায় এর ফল দাঁড়াল ম্যাজিকের মতো। অপু পা চুলকোচ্ছে আর একবার বাঁদিকে আর একবার ডানদিকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ঠিক মনে হল যেন দিদিকে খুঁজছে। কিন্তু ক্যামেরার একটা ফল্টে প্রথমদিনের এই শুটিং রাখা গেল না। পরে আবার একদিন একইভাবে ডিরেকশান দিয়ে করিয়ে নেওয়া হল। কিন্তু তার জন্য অপেক্ষাও করতে হল গোটা একটা বছর, কারণ প্রথমদিনের শুটিং এর পর কাশফুলের খেতে তাণ্ডব চালিয়ে গেল গরুর পাল।

তবে পরের বছরের সেই শুটিং-এ ট্রেনের শটও নেওয়া হল। ট্রেন নিয়ে অনেকগুলো শট, তাই একটা ট্রেনে হবে না।

– অনিল, টাইম টেবিল দেখলে?

– হ্যাঁ, সকাল থেকে বিকালের মধ্যে তিনটে ট্রেন যাবে দেখছি।

– উল্টোদিকের ট্রেন নয়তো, শিওর হয়ে নাও।

– না না, সব একইদিকে।

– ওকে, তুমি তাহলে স্টেশনে চলে যাও। ট্রেন এলে উঠে পড়বে। স্টেশন মাস্টারের সাথে কথা বলাই আছে। উনি হেল্প করে দেবেন। তবে তুমি উঠবে এঞ্জিনে, ড্রাইভারের সাথে।

– ওকে! কিন্তু, এঞ্জিন কেন?

– সেইজন্যই তোমার ট্রেনে থাকা। শুটিং স্পটের কাছে যেই না ট্রেন আসবে, তখনই বয়লারে কয়লা দিতে হবে, নয়তো কালো ধোঁয়া বেরোবে না। সাদা কাশফুলের পাশে কালো ধোঁয়ার কম্বিনেশন দারুণ দেখাবে।

হলও তাই। এক অবর্ণনীয় দৃশ্যপট তৈরি হল ক্যামেরার লেন্সে। অপুর চোখে ধরা রইল সাদা কাশফুলের খেতের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা এক রেলগাড়ি, যার কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল আকাশ।

||

বোড়ালে প্রথমদিনের শুটিং। আজ যেখানে গড়িয়া, তার খুব কাছাকাছিই এই বোড়াল গ্রাম। প্ল্যান আছে ইন্দির ঠাকরুন আর দুর্গার একটা সিন হবে আজকে। চুনিবালা দেবী তো ফুল এনার্জি নিয়ে রেডি। তিরিশ বছর বাদে আবার অভিনয়ে ফিরে আসতে পেরে কি খুশি ওনার চোখেমুখে।

সেটের দাওয়ায় বসে মানিক ডাকল অনিল আর বংশীকে।

– অনিল, যেটা আনতে বলেছিলাম সেটা মনে করে রেখেছ তো সাথে? বিকেল হলেই কিন্তু চুনিবালা দির জন্য লাগবে, ওটা না দিলেই বিপদ!

– সে আর বলতে। যেদিন শুনেছিলাম প্রথম ওনার থেকে, সেদিন থেকেই আমি খোঁজ নিয়ে রেখেছি। এ জিনিস যোগাড় করা কি সহজ কাজ নাকি! তবে রেডি আছে।

– যাক, ওনার একমাত্র শর্ত ছিল যে বিকেলে চায়ের সাথে একটা করে আফিমের বড়ি চাই। আচ্ছা, এবার শোনো সিনের কথা। এই দাওয়ায় বসে ইন্দির দুধে ভেজানো মুড়ি খাবে, আর পাশে বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে দুর্গা লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকবে সেই মুড়ির একটু ভাগ পাওয়ার আশায়।

– বুঝে নিয়েছি, শট রেডি করছি।

ক্যামেরা পজিশন নেওয়ার পরেই মানিক বলে উঠল, “অ্যাকশন!”

চুনিবালা দেবী যথারীতি সাবলীল। মুড়ি সব খেয়ে নিয়ে দুর্গার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই যাহ্! তোর জন্যি একটু রেখে দিলুম না যে! দাঁড়া।”

– কাট! দাঁড়াও, কোথাও একটা জিনিস মিস হয়ে যাচ্ছে এই সিনে?

– কেন বলো তো? ডায়লগ ওকে?

– হ্যাঁ পারফেক্ট। কিন্তু দুর্গা কে বড্ড নিষ্প্রাণ লাগছে।

মানিক আশেপাশে তাকিয়ে দেখল একটা রুপালি রঙের ফিতে পড়ে আছে। ওটা তুলে এনে দুর্গার হাতে দিল।

– রুনকি মা, এই ফিতে টা বাঁহাতের তর্জনীতে জড়িয়ে নে তো। যখন তোর পিসি বসে বসে মুড়ি খাবে, তখন ওইদিকে তাকিয়ে থাকবি, আর সাথে ডানহাত দিয়ে বাঁহাতের ফিতেটা আস্তে আস্তে জড়াবি আর খুলবি। কি সুব্রত, ঠিক আছে তো? এতে মনে হবে দুর্গার অর্ধেক মন আছে এদিকে, আর বাকিটা খাবারের দিকে।

– রিটেক নি?

– একদম। চলো যাওয়া যাক। রোল সাউন্ড!

– রোলিং।

– রোল ক্যামেরা!

– রোলিং।

– অ্যাকশন!

শটটা এমন অদ্ভুত সুন্দর হল, যে মানিক “কাট” বলতেই ভুলে গেল। বংশী চেঁচিয়ে উঠল, “কি হল মানিক? কাট বলো!”

||

আজ বোড়ালে হরিহরের প্রথম শট। ইউনিট যথারীতি সময়ে হাজির। মানিকও বুঝে নিচ্ছে সেটিং। অবশেষে ঘড়ি ধরে কলটাইমে হাজির হলেন প্রফেশনাল অভিনেতা কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। এসেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে মৃদু হাসলেন মানিককে দেখে। মানিক বিনিময় হাসি না হেসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওনার দিকে।

– আপনি এটা করেছেন কি?

– কি করলাম আমি? এই রে, কিছু আনতে ভুলে গেলাম না কি?

– আপনাকে কেউ নির্দেশ দিয়েছিল আমাদের ইউনিট থেকে? অনিল, তুমি বলেছিলে ওনাকে এইভাবে চুল কেটে আসতে?

– আজ্ঞে না না, আমাকে কেউ বলেননি। অনেকদিন এই লাইনে আছি তো, তাই প্রথমদিন শুটিং এ আসার আগে আমি সবসময় নাপিতের কাছে গিয়ে ভালো করে চুল কেটে নি। কিন্তু কিছু অসুবিধা আছে কি? হরিহরের কি চুল বেশি থাকবে?

– আলবাত! আপনাকে এর আগে যেমন মাথা ভর্তি চুল নিয়ে দেখেছিলাম, ঠিক সেইরকম চুল আবার গজিয়ে নিয়ে আসুন।

– কিন্তু! সে তো সময় লাগবে বেশ কিছুদিন!

– লাগুক না। আজকের শুটিং ক্যান্সেল। অনিল, বলে দাও সবাইকে ইকুইপমেন্ট সব গুছিয়ে নিতে।

অনিল থতমত খেয়ে এগিয়ে এসে বলে, “কিন্তু দাদা, আজকের শুটিং অ্যারেঞ্জ করতে তো অনেকটাই খরচা হয়ে গেছে।”

– আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাট অল! আমি আমার ছবি তে কম্প্রোমাইজ করতে পারব না। কানু বাবু, আপনাকে এর পরের ডেট জানিয়ে দেবে অনিল সময়মত।

কানু বন্দ্যোপাধ্যায় বেরিয়ে আসেন সেট থেকে। বংশী এগিয়ে যায় ওর দিকে।

– কিছু মনে করবেন না কানু বাবু, আসলে উনি নিখুঁত কাজ করতে পছন্দ করেন তো।

– আরে না না, আপনাকে আমার অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলছি দাদা।

– হ্যাঁ বলুন না।

– এইপ্রথম আমি একজন সত্যিকারের পরিচালক পেলাম!

||

কিন্তু এইভাবে শুটিং চলতে চলতেই বাস্তব সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল। টাকায় টান। প্রোডিউসার রানা দত্তর সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি মুখ থুবড়ে পড়েছে, তাই উনিও জানিয়ে দিয়েছেন যে আর টাকা দিতে পারবেন না। শুটিং চলাকালীন অনিল এসে বলল মানিক কে,

– টাকা তো ফুরিয়ে এল, এবার কি হবে?

মানিক কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,

– মঙ্কু কে গিয়ে বলো। ওর গয়নার বাক্স বন্ধক দিয়ে দু একদিনের শুটিং চলতে পারে। এই সিকোয়েন্স টা আমি শেষ করতে চাই।

প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনেই একজন নারী থাকেন। এই কথার এমন জ্বলন্ত উদাহরণ যেন বিজয়া কে দেখলেই বোঝা যায়। বিনা দ্বিধায় সে গয়নার বাক্স তুলে দিল অনিলের হাতে। তবে শাশুড়ি দেখলে রাগ করবে বলে ধার করে কিছু গয়না পরা শুরু করল।

কয়েকদিনের শুটিং চলার পর সত্যিই টাকা সব শেষ হয়ে গেল। পুরো সিনেমার এক তৃতীয়াংশ মত শুট করা গেছে, ক্যামেরা রোলের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৪০০০ ফুট হবে। আর এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল প্রোডাকশান কন্ট্রোলার অনিল চৌধুরি। শুটিং হল মুলতুবি। মানিক অবাক হয়ে গেল অনিলের এই আকস্মিক অন্তর্ধানে।

ছুটি বাতিল করে কিমার কোম্পানির অফিস জয়েন করল মানিক আবার। কিন্তু কাজে তো মন নেই আর। যে সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে, তার তো শেষ দেখে ছাড়তেই হবে। টাকার যোগান হয়তো আজ নয় কাল হয়েই যাবে।

কিন্তু চিন্তা এখন অন্য।

||

কাজ থেমে আছে ঠিকই, কিন্তু মানিক যে থেমে থাকার পাত্র নয়। মাঝে মাঝেই বোড়ালে গিয়ে বসে থাকে। বংশী জিজ্ঞেস করলে বলে,

– ওখানে গিয়ে কান খোলা রাখি, শুনি চারপাশের শব্দ। কি কি সাউন্ড এফেক্ট লাগবে লিখে রাখি। বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, লম্বা লম্বা বাঁশ তখন এ ওর ওপরে নুয়ে পড়ে। তাতে একধরনের ককানির মতো শব্দ হয়। পদ্মদীঘির ওপর দিয়ে বাতাস বইলে পদ্মপাতাগুলো পতপত শব্দ করে উড়তে থাকে। সকাল হচ্ছে, এটা পাখির ডাকের ভেতর দিয়ে ধরা যায়, যেমন কাকের ডাক। সন্ধ্যা হলে শাঁখ বাজে, ঝিঁঝিঁ ডাকে। রাত যে গভীর, এটা বোঝা যায় প্যাঁচা আর শিয়ালের ডাকের মধ্যে দিয়ে।

– বাপরে, তুমি তো পুরো খুঁটিনাটি শব্দ নোট করে ফেলেছ দেখছি।

– তবে আর বলছি কি। তুমিও চলো একদিন, সুব্রতকেও বলো। লোকেশনের ওপর নজর রাখতে হবে, যেন কিছু বদলে না যায়।

– চলো যাওয়া যাক তবে এই সপ্তাহে।

প্ল্যান করে তিনজনে গিয়ে পৌঁছল বোড়ালে। লোকেশনে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে ওরা এসে বসল একটা পানাপুকুরের ধারে। মানিক একটা করে ঢিল কুড়িয়ে পুকুরে ছুঁড়তে ছুঁড়তে গল্প করতে লাগল।

– বুঝলে সুব্রত, এই গ্রামীন পরিবেশের একটা রহস্য আছে। প্রত্যুষ আর প্রদোষকালের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখতে পাবে। বর্ষার প্রথম বর্ষণের আগে একটা ধূসর গুমোটভাব দেখা দেয়, চারিদিক জুড়ে ছড়িয়ে থাকে শব্দহীন এক স্থিরতা, সেটা ধরতে হবে আমাদের। বসন্ত আর শীতের রোদ কিন্তু আলাদা। পারবে তো এগুলো ক্যাপচার করতে?

– তুমি এইভাবে বিস্তারিত ভাবে ধরিয়ে দিলে আর না পারার কি আছে?

মানিক হঠাৎ একটা ঢিল ছুঁড়ে অন্যমনস্ক হয়ে বলল,

– দেখলে সুব্রত কি হল? বংশী খেয়াল করলে?

– কি বলো তো?

– এই দেখো আবার ভালো করে। আমি এই ঢিল ছুঁড়লাম পানাপুকুরে। বলো কি দেখলে।

– ঢিল টা পড়তেই পানাটা কেঁপে উঠে একটা বড় ফাটল দেখা দিল। তারপর ঢিল টা ডুবে যেতেই পানার ফাটল আস্তে আস্তে বুঁজে গেল।

– পারফেক্ট। ঠিক এই জিনিসটাই আমরা ইউজ করব আমাদের ছবির শেষের দিকের একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে। অপু হঠাৎই খুঁজে পায় দিদি দুর্গার অনেকদিন আগে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে চুরি করা একটা গলার হার। কিন্তু এই খোঁজ পাওয়ার কথা সে কাউকে জানায় না। সেই হার টাকেই অপু এসে এই পুকুরে ফেলবে, আর সেটা ডুবে যেতেই পানার ফাটল টা বুঁজে যাবে, আর চিরকালের মতো তা গোপন রয়ে যাবে।

||

অনিল চলে যাওয়ার পর ৮ মাস মতো কেটে গেছে। এর মধ্যেই ১৯৫৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর জন্ম হয়েছে মানিক আর বিজয়ার একমাত্র ছেলে সন্দীপের। অনেকেই বলছে বাবার মতোই দেখতে, মানিকেরও যে একইরকম মনে হয় সেটা আর বিজয়াকে বলেনি, কারণ ওর নাকি মনে হচ্ছে দাদুর মুখ বসানো।

সিগারেট টা অ্যাশট্রের মধ্যে অনেকক্ষণ চেপে ধরে বসে মানিক। হাতে স্কেচবুক, অথচ পেনসিলকে সেইভাবে ঠিক খেলানো যাচ্ছে না। “পথের পাঁচালী” কি সত্যিই আর হবে না! বংশীর ডাকে চমক ভাঙলো।

– কি ভাবছ এতো? চিন্তা কোরো না, একটা কিছুর হদিশ আমরা ঠিক পেয়ে যাব।

– চিন্তা সেটা নিয়ে নয় বংশী। আমি ভাবছি গ্যাপ টা অনেক হয়ে যাচ্ছে। চুনিবালা দেবীর বয়স কিন্তু ভাবিয়ে তুলছে। আবার সুবীরের গলা ভেঙে গেলে চাপ। উমাও আরও লম্বা হয়ে গেলে সমস্যা। কন্টিনিউটি জার্ক হলে তো সব নষ্ট হয়ে যাবে।

– সেটা ঠিক। আমাদের কি আরও কিছু প্রোডিউসারের কাছে যাওয়া উচিৎ?

– গিয়ে তো লাভ হবে না কোনও। সেই তো আবার……

কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল অনিল। মানিক চেয়ারে সোজা হয়ে বসল।

– আরে! খবর কি তোমার? ছিলে কোথায় এতদিন? কোনও খবর না দিয়ে চলে গেলে?

– দাঁড়াও দাঁড়াও বসি আগে। খবর আছে তোমার জন্য।

– কি খবর বলো শুনি।

– আমার কথা বাদ দাও। তবে এই সময়ের মধ্যে আমি ভেতর ভেতর একটু দেখাশুনা করছিলাম যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায় আমাদের জন্য। তো পরশুদিন একটা কাজে রাইটার্স বিল্ডিং গিয়েছিলাম। সেখানে একজন কর্মচারীর সাথে আলাপ হল। আর উনি আমাকে একটা দারুণ উপদেশ দিলেন।

চেয়ার নিয়ে এগিয়ে এল মানিক, মুখেচোখে কৌতুহল।

– কি বললেন উনি?

– উনি বললেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কে অ্যাপ্রোচ করতে।

– কি যা তা বলছ তুমি?

– আরে শোনো আগে। মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় হচ্ছেন একজন ব্রাহ্ম। ওনার ব্রাহ্মদের প্রতি দুর্বলতার কথা অনেকেরই জানা। তাই আশা করি বাকিটা এবার তোমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে না!

– হুমম্…. বুঝলাম। কিন্তু ওনাকে অ্যাপ্রোচ করা তো মুখের কথা নয়।

মানিক আবার চেয়ারে হেলান দিয়ে ডানহাত কপালে রেখে ভাবতে বসল।

||

– আরে, বেলা কে তো আমি খুব চিনি। আমি যদি গিয়ে বলি, ও কখনো আমার কথা ফেলতে পারবে না।

মায়ের মুখে এই কথা শুনে মানিকের আনন্দ দেখে কে। বিজয়ার সাথে আলোচনা করার সময়েই হঠাৎ ওর মাথাতেই এই বুদ্ধি আসে। বেলামাসি, অর্থাৎ বেলা সেন আর তার স্বামীর সঙ্গে বিধানবাবুর বেশ আলাপ আছে। আর মানিকের মা বেলামাসির বন্ধু। তাই ছেলের চিন্তার কারণ দূর করতে সুপ্রভা বেরিয়ে পড়লেন বেলা সেনের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

ফিরলেন সন্ধে করে। মানিক আজ বেরোয়নি বাড়ি থেকে। চাপা টেনশন যে আছে, তা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। তবে তা অনেকটা কমল মায়ের কথা শুনে।

– বেলা তো এক্ষুণি রাজি। ও বিধান রায় কে এই সম্বন্ধে বলবে বলে কথা দিয়েছে।

||

মানিকের ঘুম ভাঙে সকাল সকাল। জানলা দিয়ে আসা মিঠে রোদে সারাদিনের এনার্জি যেন শরীরে ঢুকে যায়। তবে আজকে জানলায় এই অতিথি তো অচেনা!

বিজয়া কে ডাকল মানিক।

– তাড়াতাড়ি ওঠো, দেখ জানলায় কি বসে। আমি ক্যামেরা টা বার করি দাঁড়াও চট করে।

– ও মা!! এ তো লক্ষ্মীপেঁচা! ধবধবে সাদা। খুব পয়মন্ত শুনেছি। এ কি করে এখানে এল গো!

– আমিও জানিনা কোথা থেকে এল।

– নিচে আর পাশের বাড়ি থেকে সবাই ডাকাডাকি করছে ওকে, কিন্তু ও দেখো খালি তোমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

– হুমম্, পোজ দিচ্ছে আমাকে। দাঁড়াও ছবি তুলি।

এই ঘটনাকে অলৌকিক বলা চলে কিনা মানিক জানে না। এই লক্ষ্মীপেঁচা মানিকের ঘরের ওই জানলায় ঠায় বসে রইল ঠিক তিনদিন, আর তারপরের দিন সকালে উঠে দেখা গেল আর নেই। কিন্তু চিঠি টা এল এর কয়েকদিনের মাথাতেই। সিলমোহর দেখেই সন্দেহ জেগেছিল, খুলতেই মানিকের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল।

– মঙ্কু। মা। এদিকে এসো। ডাক এসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে। আমাকে দেখা করতে বলেছে।

||

সামনের দরজা টা খুলতেই চমক ভাঙল মানিকের। সেই কর্মচারী সামনে এসে বললেন, “আসুন আপনারা, স্যার ডাকছেন আপনাদের ভেতরে।”

অপেক্ষার এই সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেল পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে, বোঝাই গেল না। জামা ঠিক করে নিয়ে মানিক কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার নেমপ্লেটে খোদাই করা “ডঃ বিধানচন্দ্র রায়, চিফ মিনিস্টার, ওয়েস্ট বেঙ্গল।”

– মে আই কাম ইন স্যার?

~~~♦ পর্ব ৩ পড়ুন! ♦~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি
প্রচ্ছদ ~ সৌমিক পাল

|| #তথ্যসূত্র ||

১. আমাদের কথা – বিজয়া রায়
২. বিষয় চলচ্চিত্র – সত্যজিৎ রায়
৩. প্রবন্ধ সংগ্রহ – সত্যজিৎ রায়
৪. একেই বলে শুটিং – সত্যজিৎ রায়
৫. সত্যজিৎ রায়, বিশ্বজয়ী প্রতিভার বর্ণময় জীবন – অরূপ মুখোপাধ্যায়
৬. পরশমানিক – অরুণেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৭. My years with Apu – Satyajit Ray
৮. Portrait of a Director : Satyajit Ray – Marie Seton
৯. Our Films Their Films – Satyajit Ray
১০. Manikda, Memories of Satyajit Ray – Nemai Ghosh
১১. Deep Focus, Reflections on Cinema – Satyajit Ray
১২. Satyajit Ray at Work – Bijoya Ray
১৩. www.satyajitray.org
১৪. Ravi and Ray – Times of India
১৫. Renoir in Calcutta – Satyajit Ray

One thought on “মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ২ ~ দেখোরে নয়ন মেলে

Leave a Reply