মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৩ ~ ও মন্ত্রীমশাই

Anirban & Arijit, Biography, বাংলা, মানিকের পাঁচালী

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

সামনের দরজা টা খুলে যেতেই চমক ভাঙল মানিকের। যিনি অপেক্ষা করতে বলেছিলেন, সেই কর্মচারী সামনে এসে বললেন, “আসুন আপনারা, স্যার ডাকছেন আপনাদের ভেতরে।”

অপেক্ষার এই সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেল পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে, বোঝাই গেল না। জামাটা ঠিক করে নিয়ে মানিক কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার নেমপ্লেটে খোদাই করা “ডঃ বিধানচন্দ্র রায়, চিফ মিনিস্টার, ওয়েস্ট বেঙ্গল।”

– মে আই কাম ইন স্যার?

– অফকোর্স! এসো এসো, বসো। প্লিজ মেক ইয়োরসেল্ফ কমফোর্টেবল।

– থ্যাঙ্ক ইউ।

– আরে অর্চনা মা, আয় আয়। বাবা মা কেমন আছেন?

– ভালো আছে কাকু। আপনি কেমন আছেন?

– এই তো দেখতেই পাচ্ছিস! হা হা।

টেবিলের ওপারের মানুষটার সাথে এই প্রথম মুখোমুখি দেখা মানিকের। এতদিন নামই শুনে এসেছে শুধু, আর খবরের কাগজে ছবি। তবে দেখে মনে হচ্ছে মানুষটা খুব দিলখোলা।

– তা বলো, তোমার ছবি “পথের পাঁচালী”-র গল্প টা কি নিয়ে?

প্রযোজকদের দরজায় দরজায় ঘোরার সময়ের থেকে আজকের দিনটা অনেক আলাদা। আশা তখনও ছিল আজও আছে, কিন্তু সাথে এখন যোগ হয়েছে আত্মবিশ্বাস। মানিক হাত নেড়ে নেড়ে বলতে শুরু করল গল্প, বিধান রায় শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। মাঝে কর্মচারী এসে টেবিলে তিন কাপ চা দিয়ে আবার চলে গেল।

গল্পের নিজস্ব এক ক্ষমতা আছে পাঠককে ধরে রাখার, সাথে মানিকের বলার ভঙ্গি তে তা হয়ে উঠছে আরও শ্রুতিমধুর। ১৫ মিনিট মোটামুটি লাগল গল্প শোনাতে। মানিকের বলা শেষ হতেই বিধান বাবু চশমা টা টেবিল থেকে তুলে চোখে পড়ে নিয়ে সামনের কাগজের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা তুললেন।

– হুমম্, খুব সুন্দর গল্প। বেশ লাগল শুনতে। কিন্তু গল্পের শেষটা তো দেখছি দুঃখের। পরিবারটি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে কাশী চলে যাচ্ছে। এটা কেন হবে? গাঁয়ের অন্যসব লোক কি তাদের ওখানেই থেকে যেতে বলতে পারে না? নতুন করে আবার ঘরবাড়ি তুলতে তাদের সাহায্য করতে পারে না? আমরা তো সমষ্টি উন্নয়নের কাজ চালাচ্ছি। তার স্বপক্ষে ভালো কিছু কথা তোমার এই ছবির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারো না তুমি?

মানিক বিন্দুমাত্র আশা করেনি যে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে আজ। স্রষ্টার সৃষ্টিতে হস্তক্ষেপ! তার ওপর মানিকের নিজের প্ল্যান করা কাজ চেঞ্জ করে দিতে বলছেন ইনি! নাহ্, আজকেও খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে। মানিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিছু বলবার আগেই পাশ থেকে অর্চনা বলে উঠল,

– কাকু, কাহিনীর উপসংহার কী, তা তো সবাই জানে। বেশ নাড়া দেওয়ার মতো উপসংহার। ওটা যদি পালটে দেওয়া হয় তো যেমন পাঠকদের তরফ থেকে তেমন লেখকের আত্মীয়স্বজনের তরফ থেকেও আপত্তি উঠবে।

– আচ্ছা, এই ব্যাপার। ঠিক আছে তা তো হল। তবে কিনা এই ছবির পিছনে যদি টাকা ঢালতে হয়, তবে এক ওই কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্টের খাতেই সেটা ঢালতে হবে। ফিচার ফিল্মের পিছনে অর্থব্যয়ের অন্য কোনও ব্যবস্থাই আমাদের নেই যে।

মানিক এবার বলল,

– শেষটা যদি পালটাই তো ফিল্মের ক্ষেত্রে সেটা হবে একটা কালাপাহাড়ি কাণ্ড। ওটা করতে পারব না। তবে টাকাটা পাওয়া নিয়ে কথা, কোন্ খাতে ওটা দেবেন সেটা আপনার ব্যাপার, তা নিয়ে আমার কিছু বলবার নেই।

– ঠিক আছে। তবে যেটুকু ফিল্ম তুলেছ, আমাদের হোম পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টের মাথুরকে সেটা একবার দেখাতে হবে।

||

আজ অর্চনা না থাকলে পুরো পরিশ্রমটাই মাঠে মারা যেত। মানিকের চোখেমুখে আনন্দ। বাড়ি ফিরেই আগে মা আর মঙ্কু কে জানিয়ে বংশী আর অনিলের সাথে দেখা করতে হবে। সবকিছু আবার যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করতে হবে। এতদিনকার পরিশ্রম বিফলে যায়নি। শুধু কন্টিনিউটি মেন্টেইন করতে পারলেই কেল্লাফতে। মানিকের কাছে এখন আশার কথা তিনটে।

এক, অপু লম্বা হয়ে যায়নি, আর ওর ভয়েসও একদম একই আছে।

দুই, দুর্গাও আর বাড়েনি।

তিন, সবচেয়ে বড় কথা চুনিবালা দেবী বহাল তবিয়তে আছেন।

বোড়ালে গিয়ে শুধু দেখে নিতে হবে সেটের ভেতর গাছপালা বেড়েছে কিনা, তাহলে আবার কেটে আগের মতন করতে হবে।

বেশ কয়েকদিন পর মানিককে আবার একবার যেতে হল রাইটার্স বিল্ডিং এ। সেখানে গিয়েই একজনের থেকে জানা গেল যে প্রচার দপ্তরের মিস্টার মাথুর নাকি রিজেক্ট করে দিয়েছিলেন এই আবেদন। মানিকের ঠিকই সন্দেহ হয়েছিল যেদিন কলকাতার একটা মিনিয়েচার সিনেমা হলে ফুটেজ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। মাথুর বাবু দেখতে আসেন, এবং সঙ্গে আসেন বিশিষ্ট নাট্যকার মন্মথ রায়। ফিল্ম চলাকালীন মাথুর কোনও মন্তব্য করেননি। তাই উনি যে খারাপ রিপোর্ট দেবেন সেটা প্রত্যাশিতই ছিল।

কিন্তু সৌভাগ্যের কথা যে বিধান রায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মন্মথ রায়ের কথায়। এর আগে উদয়শঙ্করের ছবি “কল্পনা”-র জন্যও সরকার সাহায্য করেছিল, কিন্তু তাতেও কি এত কাঠখড় পোড়াত্র হয়েছিল ওনাকে! সরকারের আইন বিভাগের মিস্টার মিত্র আর মাথুরের সাথে দেখা করার জন্যই মানিকের আসা আজ।

– হ্যালো মিস্টার রে।

– হাই মিস্টার মাথুর। কেমন আছেন?

– বসুন। আপনার আবেদন মঞ্জুর হয়ে গেছে। আমি ফাইনাল ফাইল বানাচ্ছি। আপনাকে বলে রাখি যে সত্তরহাজার টাকা কিন্তু একবারেই সব পাবেন না, মাসিক কিস্তি তে দেওয়া হবে। আর মাসের শেষে সমস্ত খরচের হিসাব আমাদের দপ্তরকে পাঠাতে হবে আপনাকে।

– ওকে। একটা কথা ছিল। ইউনিটের সকলের পারিশ্রমিক তো ধরাই আছে লিস্টে। আমার নিজের কিছু দরকার নেই। শুধু যদি এই ছবি বিদেশে বাণিজ্য করে, তখন সামান্য কিছু লভ্যাংশ আমি পেলে বাধিত থাকব।

– এটা একটা সামান্য ব্যাপার, ফিল্ম টা তো আগে তৈরি হোক, তখন এটার ব্যবস্থা করা যাবে। আর হ্যাঁ, সরকার এই লোনকে “রোড ইমপ্রুভমেন্ট” এর আওতাভুক্ত করেছে।

মানিকের মনে হল “পথের পাঁচালী” নামকরণের এমন সার্থকতা বোধহয় বিভূতি বাবুও কল্পনা করেননি। যাই হোক, এবার নিশ্চিন্তে কাজ শুরু করা যাবে। যদিও মানিক জানে যে ওর লভ্যাংশের অনুরোধ মাথুর রাখবে না, তবে সেটা বড় কথা নয়। বংশী আর সুব্রতও মানিকের দেখাদেখি পারিশ্রমিক নিত না এর আগে, শুধু দিনে এক প্যাকেট করে সিগারেট রেডি রাখতে বলত। এখন আশার কথা ওদের কিছু দেওয়া যাবে।

১৯৫৪ সালের গোড়ার দিক। দীর্ঘ বিরতির পর আবার শুরু হল কাজ। এবার নতুন উৎসাহ নিয়ে, নতুন উদ্যমে!

||

আবার শুটিং শুরুর খবরে ইউনিটের সকলেই খুব খুশি। শুধু দুর্গা, মানে উমার বাড়িতে খবর পাঠাতেই ওর বাবা পল্টু দাশগুপ্ত, যিনি আবার মোহনবাগানের প্রাক্তন তারকা ফুটবলার, একটা বেশ বাঁকা মন্তব্য করে বসলেন।

– লেবু কচলে আপনারা একেবারে তেঁতো করে ফেলেছেন, আর কতো তেঁতো করবেন মশাই।

তবে আশার কথা যে উমা বিশাল খুশি আবার সবার সাথে দেখা হবে শুনে।

এদিকে যখন আবার নতুন করে সবকিছু শুরু হওয়ার তোড়জোড় চলছে, ঠিক তখনই মানিকের অফিস কিমারে আগের ম্যানেজার কেনেথ ডে বদলি হয়ে গেলেন। কেনেথই এর আগে মঞ্জুর করেছিলেন মানিকের সবেতন ছুটি, উনি মাঝে মাঝে খোঁজও নিতেন কাজ কেমন এগোচ্ছে, আবার কবে শুরু হবে, এইসব। ওনার জায়গায় এসেছেন নিকলসন। রোগা, লম্বা, নাকের নিচে হ্যান্ডেল বার গোঁফ, আর্মি ফেরতা মানুষ বলে কথা! এই ম্যানেজার কি মেনে নেবেন মানিকের এই ঘন ঘন ছুটির আবেদন? এরই উত্তর পাওয়ার আশায় মানিক প্রবেশ করল নিকলসনের কেবিনে।

– এসো এসো, তোমার নাম তো আমি অনেক শুনেছি। কেনেথ যাওয়ার আগে তোমার সম্বন্ধে অনেক কিছু বলেছে।

– শুনে খুশি হলাম মিস্টার নিকলসন। কেনেথ আমাকে বিশাল সাপোর্ট করেছেন।

– তোমার প্যাশন, মানে তোমার ফিল্মের ব্যাপারেও শুনেছি। বসো এখানে, বলো তোমার ফিল্ম নিয়ে, আমি জানতে আগ্রহী।

মানিক শোনালো ওর এতদিনকার সমস্ত সংগ্রাম আর অবশেষে রাজ্য সরকারের সাহায্য দিতে রাজি হওয়ার কথা। টাকা যেহেতু একবারে পুরোটা দেবে না সরকার, তাই যখন যখন টাকা আসবে, তখন তখনই শুটিং প্ল্যান করতে হবে। সবেতন একমাসের ছুটিতে আর চলবে না। মানিক বুঝতেই পারল যে কিমারের সাথে এতদিনকার সম্পর্কে ইতি টানার সময় এসে উপস্থিত।

নিকলসন মন দিয়ে সব শুনে মুখ খুললেন,

– আমি বুঝতে পারছি মিস্টার রে। তোমাকে “না” বলে কোনও লাভ নেই। এইরকম একটা অনিশ্চিত ব্যাপার মাথার মধ্যে নিয়ে কি আর ডেস্কে বসে কাজ করা যায়! তা তুমি পারবে না।

– আমি খুবই দুঃখিত। কিমার আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, আমি তাই চাই না আমার প্যাশনের জন্য কিমারের কাজের ক্ষতি হোক। আপনি আমাকে অব্যাহতি দিতে পারেন, আমি কিছু মনে করব না।

– তোমাকে অব্যাহতি আমি দিচ্ছি মিস্টার রে। তবে একটু অন্যভাবে। তুমি ভাবলে কি করে কিমার তোমাকে ছেড়ে দেবে! যখনই দরকার হবে, নির্দ্বিধায় ছুটি নিও। আমি তোমার বেতন ঠিকই দিয়ে যাব!

বাইরে বেরিয়ে মানিক উপলব্ধি করল যে আর কোনও ফ্যাক্টরই এই কাজের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। এতগুলো মানুষ আজ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মানিকের, তাদের বিশ্বাসের প্রতিদান দেওয়াই এখন একমাত্র লক্ষ্য! সামনের সপ্তাহ থেকেই আবার শুরু শুটিং।

||

৮ মাস। ব্যবধান টা সত্যিই বেশ অনেকদিনের। কিন্তু আজ সকাল থেকেই ইউনিটের সবার উৎসাহ দেখে মনেই হচ্ছে না যে মাঝে এতো বড় ছেদ পড়েছিল। সবচেয়ে বেশি এনার্জি তো সদা তারুণ্যে ভরপুর চুনিবালা দেবীর। বয়সটা কে স্রেফ একটা সংখ্যা বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন, কে বলবে ওনাকে দেখে পঁচাত্তর!

বোড়ালে শুট লোকেশানে কন্টিনিউটি দেখছেন শান্তি চ্যাটার্জী। চুনিবালা দেবী ঢুকতেই শান্তির শ্যেনদৃষ্টি প্রথমেই গিয়ে পড়ল ওনার ওপর।

– দিদি, আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনার কি পরিবর্তন হয়েছে?

– তা আর বুঝবুনি! কিন্তু নাপিত পেলুম না যে এত সকালে, তর ওই রেজারের ব্লেড দিয়েই কেটে আবার ছোট করে দে না বাপু চুলটা।

শান্তি যে চুলও কাটতে পারে, তাও আবার ব্লেড দিয়ে, সেটা মানিকের জানা ছিল না। সেটের দাওয়ায় বসে সম্পন্ন হল সেই ক্ষৌরকর্ম। মানিক এসে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে একবার পরীক্ষা করে নিয়ে বলল, “পারফেক্ট!!”

এদিকে আর দুখানা বাজে ব্যাপার হয়ে গেছে এই আট মাসের গ্যাপে। চিনিবাস ময়রার একটা রোল আছে, যে মিষ্টি নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে। ওর থেকে মিষ্টি কেনার সাধ্য নেই বলে অপু দুর্গা চিনিবাসের পিছন ধাওয়া করে মুখুজ্যে দের বাড়ি অবধি যায়, ভুলো বলে একটা কুকুরও ওদের পিছু পিছু যায়, সেখানে বাকি সবাইকে মিষ্টি খেতে দেখে ওদেরও আনন্দ হয়।

তো বোড়ালেরই একজন বেশ নাদুস নুদুস চেহারার ভদ্রলোককে দিয়ে এর আগে গ্রামের পথে মিষ্টি বেচার সিন শুট করা হয়েছিল। কিন্তু বাকি ছিল মুখুজ্যেদের বাড়ি তে গিয়ে ওদেরকে মিষ্টি দেওয়ার দৃশ্য। তবে, অনিলই নিয়ে এল খারাপ খবরটা।

– মানিক দা, আজই খবর পেলাম যে সেই ভদ্রলোক হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন কয়েক মাস আগে।

– এবাবা! এখন উপায়?

– জানতাম আপনি চিন্তায় পড়ে যাবেন, তাই আমি গোটা গ্রাম তন্ন তন্ন করে খুঁজে ঠিক একই চেহারার একজনকে পেয়েছি, ওই যে দেখুন উনি এসেছেন।

– আরিব্বাস, ইনি দেখতে আলাদা হলেও গঠন তো হুবহু আগের চিনিবাসের মতো! সুব্রত কে বলো চিনিবাসের দ্বিতীয় সিন, মানে মুখুজ্যেদের বাড়ি তে ওকে শুধু পিছন থেকে দেখানো হবে, মুখ দেখানো যাবে না ভুলেও। তাহলেই কেউ বুঝতে পারবে না যে মাঝখানে অভিনেতা বদলে গেছে।

– বলে দিচ্ছি, তবে ভাগ্য সাথে থাকলে কি না হয়! ভুলো বলে যে কুকুরটা অপুর পেছন পেছন গিয়েছিল মুখুজ্যেদের বাড়ি, ওটাকে মনে আছে?

– আলবাত আছে। ওকে তো অপুর পেছন পেছন নিয়ে যাওয়ার জন্য অপুর হাতে পিছনদিক করে সন্দেশের টুকরো দিয়ে দিয়েছিলাম। তা এই সিনেও তো কুকুরটাকে লাগবে, মালিক কে জানিয়েছিলে?

– সেটাই তো বলছি। মালিকের বাড়ি গিয়ে শুনি সেই কুকুরও মারা গেছে।

– মাই গড!

– তবে বললাম না দাদা, ভাগ্য এবার আমাদের সাথে। অবিকল একই গায়ের রঙ আর ছোপওয়ালা একটা কুকুর এই বোড়ালেই পেয়ে গেছি। আপনি দেখলে অবাক হয়ে যাবেন।

– ফ্যান্টাসটিক! তোমরা আছ বলেই এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

||

– অ অনিল, অ শান্তি, তদের কদ্দিন ধরে বলছি আমার এই শাড়িটা বদলে দে। এ কাপড়ের যা দশা, এতে লজ্জা ঢাকা যায় না।

চুনিবালার দাবি অমূলক নয়। ইন্দিরের পরবার জন্য অনেকদিন আগেই ওনাকে একটা ছেঁড়া থান দিয়ে মানিক বলে দিয়েছিল, “আপনি ইচ্ছেমতো গেরো বেঁধে ছিদ্রগুলোর একটা ব্যবস্থা করে নেবেন, যেমন ইন্দিরের অভ্যেস ছিল।”

কিন্তু সত্যিই সেই থান এখন পরবার অনুপযোগী। ওনার অনুরোধ মতো পরেরদিন একটা নতুন থানে ছেঁড়ার মাত্রা বেশ কিছুটা কমিয়ে ওনাকে দেওয়া হল। উনি বেশ কিছুক্ষণ হাতে নিয়ে দেখলেন, তারপর নিজের জায়গায় চলে গেলেন ওটা নিয়ে। এরপর যখন শুটিং শুরু হল ওনার, দেখা গেল উনি আবার সেই পুরনো থান পরেই সেটে এসেছেন।

– আপনারা যখন তরুণীকে মেক-আপ করে বুড়ি না সাজিয়ে আমাকে বেছে নিয়েছেন, তখনই বুঝেছি কোনদিকে আপনাদের ঝোঁক।

এই বাস্তবের দিক টা বজায় রাখতে চুনিবালার চেষ্টার জুড়ি মেলা ভার। মানিক নিজে ডিটেলিং নিয়ে খুব খুঁতখুঁতে। ফরাসি পরিচালক রেনোয়া ওকে বলেছিলেন যে, “একটা ফিল্মে অনেককিছু দেখাতে হবে তার কোনও মানে নেই, কিন্তু যেটা দেখাবে সেটা যেন নিখুঁত হয়।” তবে চুনিবালার ক্ষেত্রে মানিকের পরিশ্রম অনেকটাই কমে গেছে, কারণ এই বয়সেও উনি কন্টিনিউটির খুঁটিনাটি সবকিছু হুবহু মনে রাখছেন। কবে ওনার ডানহাত ভিজে ছিল, বা মুখে আজকে ঘাম দেওয়া হচ্ছে না কেন, বা এই শটে আমার গায়ে তো চাদর থাকার কথা নয়, আবার পুঁটলি ডানহাতে ছিল না বাঁহাতে, ঘটি ডানহাতে ছিল – এইসব প্রশ্নবাণের মুখে পড়ে কন্টিনিউটি ম্যানেজার শান্তি চ্যাটার্জী নিজেই লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে।

তবে এবারে পালা ছিল বংশীর, যেদিন স্টুডিও তে ওর বানানো একদম অবিকল বোড়ালের বাড়ির সেটে চুনিবালা দেবী প্রথম হাজির হলেন শুটিং এর জন্য। সরকারের সাহায্য পাওয়ার পরেই এই ইন্ডোর শুটের ব্যবস্থা করা গেছে। রাতের দৃশ্যগুলোও এখানে তুলে নেওয়া যাবে। কিন্তু চুনিবালার কড়া দৃষ্টি এড়ানো গেল না এবারেও।

– বংশী রে, এইদিকে আয় দিকিনি একবার।

– বলো দিদি। কিছু খুঁত পেলে নাকি আবার?

– বলি, আমার চোখ তো গেছেই, তা তোদেরও এই হাল কেন রে? এইখানে গুনে দেখ, এই দেওয়ালে বেশ কয়েকটা ইঁট কম আছে বোড়ালের বাড়ির থেকে।

– সেকি বলছ গো? তুমি নিশ্চিত?

– বিশ্বাস না হয় খোঁজ নিয়ে দেখ গা।

অব্যর্থ দৃষ্টিশক্তি চুনিবালার। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল ওনার কথাই ঠিক, সত্যিই কয়েকটা ইঁট কম আছে।

||

অনিল চৌধুরির এনার্জি লেভেলেরও তারিফ না করে থাকা যায় না। বচন সিং এর ট্যাক্সির সাথে ইউনিটের কনট্র‍্যাক্ট। ভোরবেলা এই ট্যাক্সি নিয়ে অভিনেতাদের বাড়ি থেকে এনে লোকেশানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অনিলের। তবে ভোরে ওঠার জন্য অ্যালার্ম ক্লকের ওপর ভরসা করতে না পেরে একটা মারাত্মক উপায় বার করেছে সে।

বচন সিং এর বাড়ির কাছাকাছি রাস্তায় মাঝরাতে ট্রাম চলে না। ভোরের প্রথম ট্রাম আসে পাঁচটায়। তাই অনিল সিংজী কে বলে রেখেছে রোজ রাতে ট্রামলাইনের ওপর ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে। অনিল সেই ট্যাক্সিতেই শোয়। সকালে ট্রাম এসে গেলে জোরে জোরে ঘন্টি বাজায়, আর সেই শব্দ শুনে অনিলের ঘুম ভাঙে। ডেডিকেশানের এর থেকে ভালো আর কোনও উদাহরণ হয় কিনা মানিকের জানা নেই।

||

অপু দুর্গার আচার খাওয়ার সিন। একটা স্বতঃস্ফূর্ত শট নেওয়ার জন্য মানিক একটা ফন্দি আঁটলো। অপু, মানে সুবীর কে ডেকে বলল,

– দুর্গা যখন তোমাকে আচার দেবে, তখন জিভে ওটা নিয়ে নাড়তে নাড়তে “টক” করে একটা আওয়াজ করবে।

এরপর আলাদা করে উমা কে ডেকে বলল,

– অপু যেই মুখে আওয়াজ করবে, তখন আচার লাগা হাতেই ওকে হালকা করে গালে একটা চড় মারবে। এই চড়ের ব্যাপারটা কিন্তু সুবীর জানে না, তাই একবারেই ঠিক করে করবে, কেমন?

ক্যামেরা শুরু হতেই অপু মুখে আচার দিয়ে “টক” করে আওয়াজ করতেই দুর্গার চড়ে গালে আচার লেগে গেল। অপুও চমকে উঠে অভিমানে নিজের কাঁধ দিয়ে গালটা মুছে নিল। মানিক হাততালি দিয়ে উঠল পাশ থেকে, “বাহ্, ঠিক এমনটাই চাইছিলাম।”

বর্ষার প্রথম বৃষ্টির শুরুটা ছবিতে তুলে ধরার জন্য একটা মজার সিন মাথায় এল মানিকের।

– একটা টেকো বুড়ো ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে ধরতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথায় টপ করে একটা বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই ওর ঘুম ভেঙে যাবে।

– বাহ্, কাকে নেবেন এই বুড়োর রোলে?

– আছে একজন আমার মাথায়। এখানে প্রথম কয়েকদিন শুটিং দেখতে এসেছিল একটা লোক, মাথায় বড় টাক আছে, চেহারাও মানানসই, দাঁড়াও ওই ভিড়ের সবাইকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখি।

মানিক উৎসুক গ্রামবাসী দর্শকদের কাছে এগিয়ে গিয়ে অনেকরকম বর্ণনা দিল সেই লোকটার। কিন্তু কেউই চিনতে পারল না।

– মানিক দা, এখন কিভাবে খুঁজে পাবেন সেই লোককে। তার চেয়ে বরং এখন যারা শুটিং দেখতে এসেছে, তার মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নিন না।

– না, আমার ওই লোকটাকেই চাই। ওকে ছাড়া এই সিনই আমি রাখব না।

– কিন্তু…

– দাঁড়াও, আমার অস্ত্র কাজে লাগাই। একটা কাগজ আর পেনসিল দাও তো।

অনিল এগিয়ে দিল কাগজ পেনসিল। মানিক খসখস করে আঁকতে শুরু করল সেই লোকটার অবয়ব, শুধু স্মৃতির ওপর ভরসা করে। আঁকা হয়ে গেলে চেয়ার থেকে উঠে মানিক ভিড়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে মেলে ধরল সেই কাগজ।

– এবার দেখুন তো, একে চেনেন কেউ?

গোটা দশ বারো জন একসাথে চেঁচিয়ে উঠল, “আরে, এ যে আমাদের হরিবাবু!”

বোড়ালের লোকেদের চোখে মানিকের সম্মান এতদিন এইসব শুটিং এর জন্য খুব একটা না বাড়লেও, আজকের এই ঘটনার পর থেকে আশ্চর্যরকমভাবে বেশ অনেকটা বেড়ে গেল!

এদিকে হরিহরের মুখে একটা ডায়লগে “লুচি-মোহনভোগ” বলতে গিয়ে কানুবাবু আটখানা শট নষ্ট করে ফেললেন। যতবার ডায়লগের ওই জায়গাটা আসছে, উনি বলে ফেলছেন “লুচি মোহনবাগান”। এদিকে মানিকও নাছোড়বান্দা। ফিল্মরোল খরচা হয় হোক, কিন্তু বিভূতিভূষণের লেখা সংলাপ বদলানো যাবে না।

||

যদিও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য এখনও শুট করা বাকি, তবে মানিক অলরেডি ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিয়েছে আবহসঙ্গীত নিয়ে। সিনেমার একটা প্রধান স্তম্ভ হবে এই সঙ্গীত। আর সুরকার হিসেবেও মানিক মনে মনে একজনকেই ভেবে রেখেছে। যদিও সেই সেতারবাদকের সময় পাওয়া এখন দুঃসাধ্য, তবু মানিক নিজে জানে ওর কি ধরনের মিউজিক চাই সিনেমার জন্য, আর ওর বিশ্বাস যে এই রকম একটা সিনেমার জন্য সঠিক আবহসঙ্গীত বানাতে পারবে একমাত্র এই ব্যক্তি, রবিশঙ্কর।

~~~♦ পর্ব ৪ ♦~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদ স্কেচ ~ সৌমিক পাল

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

|| তথ্যসূত্র ||

১. আমাদের কথা – বিজয়া রায়
২. বিষয় চলচ্চিত্র – সত্যজিৎ রায়
৩. প্রবন্ধ সংগ্রহ – সত্যজিৎ রায়
৪. একেই বলে শুটিং – সত্যজিৎ রায়
৫. সত্যজিৎ রায়, বিশ্বজয়ী প্রতিভার বর্ণময় জীবন – অরূপ মুখোপাধ্যায়
৬. পরশমানিক – অরুণেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৭. আমি আর ফেলুদা – সন্দীপ রায়
৮. সত্যজিৎ রায়ের চিঠি, অশোককুমার দাস কে লেখা – দেশ শারদীয় ১৪২৩
৯. সত্যজিৎ ভাবনা – উজ্জ্বল চক্রবর্তী
১০. সত্যজিৎকে নিয়ে – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
১১. এখন সত্যজিৎ – গুপী গাইন বাঘা বাইন সংখ্যা – নভেম্বর ২০০২
১২. দেশ – সত্যজিৎ সংখ্যা
১৩. রবিবাসরীয় – সত্যজিৎ স্পেশাল
১৪. সত্যজিতের নারীরা – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৫. আজব ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৬. সত্যজিৎ রায় সংখ্যা – এপ্রিল ২০১৫ – আনন্দলোক
১৭. My years with Apu – Satyajit Ray
১৮. Portrait of a Director : Satyajit Ray – Marie Seton
১৯. Our Films Their Films – Satyajit Ray
২০. Manikda, Memories of Satyajit Ray – Nemai Ghosh
২১. Deep Focus, Reflections on Cinema – Satyajit Ray
২২. Satyajit Ray at Work – Bijoya Ray
২৩. Through The Eyes Of A Cinematographer: A Biography Of Soumendu Roy – Devapriya Sanyal
২৪. The Master And I – Soumitra Chatterjee
২৫. www.satyajitray.org
২৬. Ravi and Ray – Times of India
২৭. Renoir in Calcutta – Satyajit Ray
২৮. Satyajit Ray: The Inner Eye: The Biography of a Master Filmmaker – Andrew Robinson
২৯. My Adventures with Satyajit Ray – The Making of Shatranj Ke Khiladi – Suresh Jindal

One thought on “মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৩ ~ ও মন্ত্রীমশাই

Leave a Reply