একেই কি বলে চাকরি ? ~ স্টেপ-১- অনবোর্ডিং

Humor, Journey, Satire, আনন্দ আকাশ, বাংলা

রাত্রি ১১ টা , ট্রেন টা স্টেশনে যেন ঢুকতে আর চাইছেই না । শেষ ১ ঘন্টা পুরো গড়িয়ে গড়িয়ে এলো মনে হল  । ট্রেনের দরজার সামনে অনেক ক্ষণ আগেই দাঁড়িয়ে আছি আমরা – আমরা মানে , আমি আর অমিত । জীবনের প্রথম চাকরি, তাও আবার ভিন রাজ্যে । নিজেকে আকবরের তলোয়ারের খাপ বলে ফিল হচ্ছে ।

 

১০ টা ইন্টারভিউ ফেল করার পর যখন মোটামুটি ধরেই নিয়েছিলাম লাইফে কিস্সু হবে না , এই কোম্পানি টা  থেকে কল এলো  । ৪০ জনের মধ্যে আমাকে আর অমিত কে সিলেক্ট করলো টেকনিক্যাল ইন্টারভিউ এ |

এইচ আর রাউন্ড ইন্টারভিউ শেষ , এক তন্বী এসে বলে গেল আমাদের এম ডি আপনাদের সাথে কথা বলবেন । বুকে ছাতি টা  ২ ইঞ্চি ফুলে গেল , মাইরি বলছি , মনে হল এই রকম ঝাঁ চকচকে কোম্পানির এম ডি আমাদের সাথে কথা বলবে , চাকরি টা হয়েই গেছে তাহলে । অমিত টা বরাবরই নেগেটিভ – ” হয়তো হয় নি , এইটা হয়তো ডিসাইডিং রাউন্ড ।” এতো রাগ হলো, ওরে একটু পজিটিভ ভাব না বাবা ।

 

তো এমডি যা কাজের চিত্র তুলে ধরলেন , এক কথায় সে এক স্বপ্ন নগরী । আমরা দুটি দেবশিশুর জন্য নন্দনকাননে পারিজাতের নিচে ৬০ জন সখা – সখি (পড়ুন আই টি  ইঞ্জিনিয়ার ) অপেক্ষা করছে  । আমরা কাল-ই রওনা হয়ে যায় যেন , একজন সখা মর্ত্য লোকে এসেছিলো কিছু সাংসারিক কর্তব্য পালনে ( পড়ুন বাবা-মার সাথে দেখা করতে)। আমরা যেন তার সাথেই কাল পুষ্পক রথে রওনা দি । আরে মশাই , ট্রেনের জেনারেল কম্পার্টমেন্ট আবার কি ? উঃ এতো সুন্দর ছন্দ টা কেটে দিলেন তো পার্থিব আলোচনা এনে । চলতে থাকুন  ( পড়তে থাকুন) ।

 

তো , আমাদের মনে হাজারো প্রশ্ন , উৎকণ্ঠা , মিন মিন করে বললাম – ” না মানে কাল ই ? একটু কেনা কাটা করতে হত । আবার ফাইনাল সেমেস্টার এক্সাম ও আছে । ”

 

প্রশ্ন করার সাথে সাথে বুঝলাম কি মারাত্মক ভুল করেছি , – ১ মিন হো হো করে গব্বর মার্কা হাসলো এম ডি । আমি আর অমিত একে অপরের মুখের দিকে তাকিযে একটা কেষ্ট মুখার্জি মার্কা হাসি দিয়ে বসে আছি, হাসি থামলে যা বুঝলাম, ওখানে সব কিছুর ব্যবস্থা আছে, খাওয়া -দাওয়া , আর আমরা যখন খুশি আসতে পারি । সো , নো চিন্তা- ডু ফুর্তি ।

 

১৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের জীবনের প্রথম অফার লেটার হাতে চলে এলো । ডেসিগন্যাশন “ট্রেইনি ইঞ্জিনিয়ার” , স্যালারি ৬০০০ । মনে হলো ” আই এম কিং অফ দি  ওয়ার্ল্ড ” । এই টাকায় মোটামুটি একটা প্ল্যানেট তো কিনেই ফেলবো ।

 

তারপরের ২৪ ঘন্টা যেন কাটতেই চাই না , ঘড়িটাকে ২৪ বার দেখছি , ঠিক চলছে তো ? বন্ধ হয়ে যায় নি তো ? বিকেল ৫:১৫ টা তে ট্রেন , আমি মোটামুটি ৩ টের মধ্যে হাওড়া তে গিয়ে হাজির ,  পিঠের ব্যাগের শুধু কিছু জামা কাপড় নিয়ে  । অমিত দেখলাম ৪:৩০ টা নাগাদ ২ টা ব্যাগ টানতে টানতে পৌছালো । ও সব এনেছে -মশারি , বেডশিট, বিস্কুট মোটামুটি ছোটোখাটো সংসার নিয়ে  ।

 

যাইহোক , শেষ মেশ ট্রেন একটা ধাতব আর্তনাদ করে দাঁড়ালো  । নেমে একটু আড়মোড়া ভেঙে নিলাম , জেনারেল কম্পার্টমেন্টে কাউন্টার সিটে এতক্ষন আসতে আসতে পশ্চাৎদেশ আর নিজের জায়গায় নেই বলে মনে হচ্ছে । ঘামে টি-শার্ট জবজবে ভেজা , শান্ত প্লাটফর্মের শীতল হওয়াতে বেশ ভালো লাগলো । অমিত ,আমি আর সেই সখা তিনজনে প্লাটফর্মের বাইরে এলাম , ভাবছিলাম আমাদের জন্য একটা ক্যাব নিশ্চই থাকবে , ওই সিনিয়র বললো অটো তেই যেতে হবে , সে কি আর করা যাবে , অন্তত থাকার জায়গা তা নিশ্চই এলাহী হবে । ওই সিনিয়র টা কিন্তু দেখলাম বেশি কথা বলছে না , যতটুকু প্রশ্ন করছি তার থেকে একটু ও কম বা বেশি না । হয়তো একেই বলে “প্রফেশনাল বিহেভিয়ার” । এখানে একটা কথা বলে নেয়া দরকার , ট্রেন থেকে নেমে অমিত ওর অভ্যেস বসত কিছু “ছোলে ভাটুরে ” কিনেছে, নেগেটিভ চিন্তাভাবনা সবসময় আর কি !! বলে যদি খাবার শেষ হয়ে যায় ! এতো বড়ো ব্যাপার , এদের কি খাবার শেষ হয় ? কে বোঝাবে একে ।

 

এদের দেশের অটোটা আমাদের কলকাতার মতো না , একটু বড় , আর কি ওঠে না তাতে ?  নোয়ার নৌকোর মতো সব কিছু উঠেই যাচ্ছে – ১০ জনের সিটে ১৫ জন উঠলো , ছাদে উঠলো আরো ৩ – ৪ জন, কাঠ, ছাগল  নিয়ে উঠলো ১ জন । এতো রাতে এরা কোথায় থেকে এলো কে জানে ।। শেষ মেশ যখন আমাদের স্বপ্ন নগরী তে পৌছালাম তখন রাত ১২ টা বেজে গেছে ।

 

চারপাশ  অন্ধকার , রাস্তা ঠাওর করা মুশকিল ,সিনিয়র টা এতক্ষনে মুখ খুললো- ৩ -৪ মাত্রা যোগের কিছু শ্রুতি অমধুর শব্দ  বলার পর বললো – ” এই এক লোডশেডিং  শুরু হয়েছে এখানে কিছুদিন হল “,  হাঁক পারলো – ” রাজীব,নয়ন দরজা টা খোল ??”

ভুতের সিনেমার  চরিত্রের মতো একজন হাতে একটা মোম বাতি নিয়ে এগিয়ে আসছে , সিনিয়র টা  ওকে সব বুঝিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো – ” কাল ৯ টায় এদের সাথে অফিস চলে এসো , নয়ন তোমাদের অফিসে ঢোকার পাস তৈরি করে দেবে । ”

বাধ্য ছেলের মতো দুজনে মাথা নত করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না ।

পরিচয় হলো আমাদের  মতো আরো কিছু দেবশিশুর সাথে । ” আচ্ছা বাথরুম টা কোথায় ? ” নয়ন কে জিজ্ঞেস করলাম ।  আবার সেই গব্বর মার্কা হাসি নয়নের মুখে , ” বাথরুমে যেতে পারো , কিন্তু এখানে জলের খুব টানাটানি, এখানে ওই টাইম কল আছে ওটাতে সবার জন্য হাফ বালতি জল বরাদ্দ , কাল সকালের আগে সে জল পাবে না  ।”

 

আমার নন্দনকানন হটাৎ যেন পাতালে প্রবেশ করলো , ভাগ্য ভালো , প্রকৃতির কাজ টা ট্রেন থেকে নামার আগেই সেরেছি , এখন একটু খাবার খেয়ে বিছানায় শুলেই হবে । খাবারের বেপারে  বললো – ” এখনো নিউ জয়েন যারা করেছে তাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা হয় নি , সকলে বাইরেই খাচ্ছি “। আর শোওয়া? ” মেঝেতে যে যে চাদর পাতা আছে সেখানেই সবাই শুচ্ছি।  তোমরাও শুয়ে পড়ো । আর হ্যা , সবাই মস্কিইটো কয়েল লাগিয়ে শুচ্ছে, আজ তোমাদের একটা কয়েল  দিচ্ছি , কাল নিজেরা কিনে নিও ।”

 

রাত্রে অমিতের কেনা খাবার টা অমৃত বলে  মনে হলো । অসুবিধাটা  হলো  ঠিক পরে , কয়েল টা দু নম্বরি বোধহয়, না হলে মশারা ইমিউন হয়ে গেছে , বেটারা পুরো আমাদের দুজনের রক্ত চুষে মনের আনন্দে  পার্টি করছে  । আবার অমিতের অন্নপূর্ণার ভান্ডারের শরনাপন্ন হতে হলো , বেরিয়ে এলো মশারি , কিন্তু টানাবো কি করে ? অন্ধকার দেয়ালে কোনো পেরেক তো দেখতে পেলাম না । যাইহোক কোনো ভাবে টাঙ্গানো গেল ।

 

শেষ রাত্রে একটু চোখ লেগেছিলো বোধহয় , রাজীব ডেকে দিলো – ” বস , জল এসেছে , জলদি যা করার করে নাও ।” জল মানে হাফ বালতি । ব্রেকফাস্ট বলতে অমিতের অন্নপূর্ণার ভান্ডার ।

 

অফিসে পৌঁছালাম ফিটফাট হয়ে একদম ফুলবাবু টি হয়ে । সাদা শার্ট আর ব্ল্যাক প্যান্ট , একদম অফিস বাবু। কিছুক্ষনের মধ্যে কয়লার ধুলোতে সাদা জামা পুরো কালো চিটচিটে হয়ে গেল । বলা হয় নি , যেখানে গেছিলাম, সেটা একটা কোলিয়ারি এলাকা , তাদেরই সফটওয়্যার এর কাজে ।

 

লাঞ্চ টাইম , সবাই নিজের মতো খেতে গেছে ,আমরাও ভাতের দোকান খুঁজছি । একটা দোকান কাছে পেলাম যারা ভাত করে, কিন্তু আগে থেকে অর্ডার দিলে তবেই । কি আর করা , ততক্ষনে পেটের ছুঁচোরা আর ডন দেবার মতো অবস্থায় নেই , লিট্টি আর আলুচোখা, তাই খেয়ে সেদিন কাটানো গেল ।

 

এভাবেই এক হপ্তা কাটলো , আমাদের রাজপ্রাসাদে আরও এক দুজন এসেছে । আমাদের ও একবার কলকাতায় যেতে হবে , ফাইনাল সেমেস্টার এক্সাম । অমিত আর কলকাতা থেকে  ফিরলো না , বললো – ” ভাই, আমার্ জন্য এই লাইন নয়, বেস্ট অফ লাক ফর ইউ ।।”

অমিত একটা বেসরকারি স্কুলে কেমিস্ট্রি টিচার হয়ে জয়েন করলো । আর আমি ? বাক্স পেঁটরা গুছিয়ে আবার যুদ্ধ করতে নেমে পড়লাম , তবে এবার আর একটা ব্যাগ নিয়ে না , ২ টো বড় ব্যাগ ভর্তি ছোটোখাটো সংসার নিয়ে । তারপর ? সে আর এক গল্প  , আর একদিন না হয় শোনাবো ।

 

কলমে ~ আনন্দ

ছবি ~careerbuilder.com

অলংকরণ ~ আনাড়ি মাইন্ডস

 

 

Leave a Reply