মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৪ ~ ঐ যে দেখো দিনের আলো

Anirban & Arijit, Biography, বাংলা, মানিকের পাঁচালী

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

১৯৫৪ সালের শরৎকাল এখন। পেঁজা তুলোর মতো মেঘেরা ঘিরে ফেলেছে আকাশ। বাতাসে পুজো পুজো গন্ধও এসে গেছে। তবে আজকে মানিক শুটিং বন্ধ রেখেছে। তার কারণ অবশ্য একটু আলাদা। কিমারের অফিসে যেতে হবে একবার। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট (MoMA) এর অন্যতম ডিরেক্টর মনরো হুইলার এসেছেন কলকাতায়। উনি তাঁর সংগ্রহশালায় একটা প্রদর্শনী আয়োজন করতে চান ভারতীয় জীবনধারার কিছু নিদর্শন নিয়ে। তো অনেক কিছু খুঁজতে খুঁজতে উনি হঠাৎ জানতে পেরেছেন যে মানিক একটা সিনেমা বানাচ্ছে এমনই একটা বিষয় নিয়েই। তাই সোজা কিমারের অফিসে চলে এসেছেন মানিকের সাথে দেখা করবেন বলে।

মানিক অফিসে ঢুকতেই মিস্টার হুইলার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন।

– হ্যালো হ্যালো মিস্টার রে, আপনার সাথে দেখা করার জন্য আমি খুব উৎসাহী ছিলাম। অনেক ধন্যবাদ এতো ব্যস্ততার মাঝেও আমার জন্য এই সময়টুকু বার করার জন্য।

– আমিও আপনার কথা অনেক শুনেছি। কেমন আছেন বলুন?

– খুবই ভালো। আপনি একটা ফিল্ম বানাচ্ছেন শুনলাম। আমার খুব কৌতুহল হচ্ছে সেটা নিয়ে জানবার। কতটা শুট হয়েছে আপনার?

– রাফ কাটের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে নয় হাজার ফুটের মতন।

– আমাকে কিছু স্টিল ছবি দেখাতে পারবেন সেটার?

– আলবাত পারব। আমার সাথেই আছে। দাঁড়ান।

মানিক ওর ব্যাগ থেকে সুব্রতর তোলা বেশ কয়েকটা স্থিরচিত্র বের করে হুইলারের হাতে দিতেই উনি বেশ মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন, আর মাঝে মাঝে প্রশ্নও করলেন চরিত্রদের নিয়ে। সবকটা ছবি দেখার পর হুইলার বললেন,

– আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল এই ছবিগুলো দেখে মিস্টার রে! আমার মনে হচ্ছে এমন ছবি শুধু ভারতে কেন, পৃথিবীর কোনওখানেই কেউ বানায়নি আজ অবধি। আমার একটা প্রস্তাব আছে আপনার জন্য।

– বলুন না।

– পরের বছর মে মাসে আমার এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে নিউ ইয়র্কে। তাতে আপনার এই ফিল্মটি আমি দেখাতে চাই।

– আরে, কি বলছেন আপনি? পরের বছর মে, মানে হাতে মোটামুটি ৮ মাস। ঠিক আছে, আমাদের ফিল্ম তার মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে।

– বাহ্, তাহলে তো কথাই নেই। এ ছবির বিশ্ব উদ্বোধন তাহলে নিউ ইয়র্কের মোমা-তেই হবে। আমি আপনার সাথে যোগাযোগ রাখব।

কাগজ কলম ছাড়াই মনরো হুইলার কথা পাকা করে দেশ ছাড়লেন। ওনার কথা যেন দৈব আশীর্বাদ মনে হল মানিকের। পরিকল্পনা মতো সব ঠিকঠাক চললে বিশ্ব বাজারের দরজা খুলে যাবে ভারতীয় সিনেমার কাছে। মানিক ইউনিটের সবাইকে এই খবর দিয়েই সবচেয়ে আগে দেখা করতে গেল সরকারের প্রচার দপ্তরের মিস্টার মাথুরের সাথে। ওনাকে হুইলারের প্রস্তাব জানিয়ে মানিক বলল,

– টাকাটা এবার প্লিজ তাড়াতাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। কেননা, ওনাকে কথা যখন দিয়েছি, তখন সময়মত কাজটা আমি শেষ করতে চাই।

মাথুর শুধু মাথা নাড়লেন সম্মতি জানিয়ে।

||

বংশী চন্দ্রগুপ্তর তৈরি সেট আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বার করে কার সাধ্যি। জাঁ রেনোয়ার সাথে কাজ করার সময় থেকেই বিভিন্ন মেটেরিয়াল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে বংশী ভালোবাসে। ভিটে টা কে পুরনো দেখানোর জন্য ও প্লাস্টার আর ইঁট ব্যবহার করেছে। এই প্লাস্টারের ব্যবহার এর আগে আর কোনও ভারতীয় সিনেমায় হয়নি বলেই শোনা যাচ্ছে, এতে সেট বেশ ফ্লেক্সিবলও থাকে। ডিটেলিং এর একটু খামতি থাকলেই বংশী তাকে নিখুঁত করার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা লাগিয়ে দিতে পারে অনায়াসেই। এতে অনেকসময়েই ডায়লগ মুখস্থ করে বসে থেকেও শটের সময়ে তা ভুলে যায় অভিনেতারা। করুণা তো রাগ করে কথা কাটাকাটিই জুড়ে দিল বংশী আর সুব্রতর সাথে একদিন। রিফ্লেক্টার নাড়িয়ে আলোটাকে বাউন্স করিয়ে সুব্রত আলো মাপছিল, হঠাৎ করুণার চেঁচানি তে চমকে উঠল বংশী আর সুব্রত দুজনেই।

– আপনারা এত সময় নেন কেন বলুন তো? সেই কখন থেকে রেডি হয়ে বসেই আছি, আর আপনারা আলো আর সেট ঠিক করেই যাচ্ছেন।

– কি করব বলুন, আপনার দাদা কে তো চেনেন, সামান্য ভুল ত্রুটিও যদি ওনার নজরে পড়ে যায় একবার, তাহলে আর রক্ষে নেই। তাই সুযোগ দিতে চাই না ওকে।

চেঁচামেচির কারণ আন্দাজ করতে পেরেই মানিক হাসতে হাসতে এগিয়ে এল।

– করুণা, তুমি বংশীর আজকের কাজ টা খেয়াল করলে?

– আলাদা করে কি খেয়াল করব বলুন তো! বংশীবাবুর কৃত্রিম কাজ, না আসল জিনিস, সেটাই তো ছাই বুঝতে পারি না এমনভাবে সব সাজান উনি।

– হা হা, সেদিন রানুর নাকছাবি নাকি অ্যারালডাইট দিয়ে পরিয়েছিল। আজকে আবার উঠোনের কাপড় মেলার দড়িতে যেমন ছেঁড়া সুতো বা ন্যাকড়ার টুকরো ঝোলে, এখানেও ও সেইসব লাগিয়েছে। তবে বংশী আর একটা যা কাজ করেছে সেটা শুনলে তো অবাক হয়ে যাবে।

– কি করেছে আবার?

– ওই যে ঘরের দাওয়ার পাশে মাকড়সার জাল টা দেখছ বড় মাপের, ওটা কিন্তু আসল জাল।

– তাই নাকি! কিন্তু ওটার পেছনে বংশী বাবুর হাত কোথায় তাহলে?

– এখানেই তো ওর কেরামতি। শেষ দু সপ্তাহ ধরে বংশী বেশ কিছু মাকড়সা পুষছে। তাদের কে কাজে লাগিয়েই ওর এই শিল্প সৃষ্টি।

– বলেন কি!

– আজকের শটেও তোমার হাতে একটা বাক্স দেওয়া হবে। তুমি বিষম খেলে ওই বাক্সটা তোমার হাত থেকে পড়ে যাবে, আর একঝাঁক আরশোলা বেরিয়ে পড়বে বাক্স থেকে।

– তা এই আরশোলাও কি পুষেছেন নাকি?

– অনিল যোগাড় করে এনেছে। কই অনিল, বাক্স রেডি তো? অমন মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে কেন হে?

অনিল হাতে বাক্স নিয়ে এগিয়ে এল।

– মানিক দা, একটা ভুল হয়ে গেছে।

– কি হয়েছে? আরশোলা আনতে ভুলে গেছ নাকি?

– না দাদা, এনেছিলাম। কিন্তু এই দেখুন, বাক্স বন্ধ করে রেখেছিলাম বলে হাওয়া না পেয়ে সব মরে কাঠ হয়ে গেছে।

– এহে! এবাবা, পুরো শটটাই ভেস্তে গেল আজ।

কিছু আরশোলার মৃত্যুও যে কারুর দুঃখের কারণ হতে পারে, তা মানিকের ইউনিটে থাকলেই শুধু জানা যায়।

কোনও নির্ধারিত শট ভেস্তে গেলে মানিকের মুখ দেখেই বোঝা যায় যে বেশ বিরক্ত, তবে সেই ভাব বেশিক্ষণ থাকে না। হাতের খাতায় খসখস করে কিছু লিখে মানিক ডেকে নিল উমা আর করুণাকে।

– উমা, এখন যে দৃশ্যটা আমরা শুট করব, তাতে তোমাকে যে মার খেতে হবে করুণার থেকে বেশ খানিকটা। ক্যামেরার কৌশল দিয়েও এটা করা যেত, কিন্তু আমি চাই এটা আসল হোক।

– বলো মানিক দা কি করতে হবে আমাদের।

– করুণা, তোমাকে দুর্গার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে হবে। তারপর ওকে যখন মারবে, সেটা আমরা অপুর মুখের অভিব্যক্তি থেকে ধরব। তবে তার আগে শুটিং এর এই দৃশ্যে তুমি একটুও মায়াদয়া করবে না, তোমার সর্বশক্তি দিয়ে ওর চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাবে।

করুণা তাকালো উমার দিকে। উমাও হেসে উঠল, “করুণা দি, তুমি কিছু চিন্তা করো না, চলো একটা রিহার্সাল করে নি।”

একটা রিহার্সাল হল। এতে অবশ্য করুণা অতটা শক্তিপ্রয়োগ করল না। বলল, আসল শটে করবে। মানিক পাশের ঘরের সাউন্ড রেকর্ডিং, ক্যামেরা সব দেখে নিয়ে নির্দেশ দিল “অ্যাকশন!”

সর্বজয়ার বেশে করুণা একটুও মায়া না দেখিয়ে অক্ষরে অক্ষরে মানিকের নির্দেশ পালন করল। কিন্তু শট শেষ হতেই করুণা উমাকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করতে শুরু করল। উমার ঘাড়ের শিরা ফুলে উঠেছে দেখে ওষুধও লাগানো হল। মানিক বলল,

– আজ শুটিং এর পর তুমি আমার বাড়ি যাবে উমা। মঙ্কু অনেক রান্না করেছে তোমার জন্য। খুব ভালো হয়েছে শট টা।

সব ব্যথাই যেন গায়েব হয়ে যায় মানিকের প্রশংসা শুনলে।

– সুবীর, এদিকে এস তো, এবার তোমার শট।

ছোট্ট অপু ইতিমধ্যেই আগের শট দেখে ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু এবার ওর সিন হচ্ছে দিদি দুর্গা কে মা মারছে দেখে ও সিঁটিয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে তা দেখছে, আর চমকে চমকে উঠছে।

মানিক একটা ছোট কাঠের টুল নিয়ে এল উঠোনের ধার থেকে। সেটা এনে একটা থামের সামনে রেখে সুবীরকে ডাকল ওটার ওপর উঠে দাঁড়ানোর জন্য। সুবীরও তাই করল। এদিকে সুব্রতও ক্যামেরা নিয়ে রেডি। কিন্তু অপু চমকাবে কিভাবে? মানিক উঠোনের পাশে পড়ে থাকা একটা সরু বাঁশের কঞ্চি নিয়ে এসে একজন সহকারীকে দিয়ে বলল, “আমি যেই বলব, তুমি সপাং করে অপুর ওই টুলের ওপর ছপটি মারবে, কেমন?”

শট শুরু হল। মানিক পাশ থেকে বলল, “এইবার মারো।” বলতেই সজোরে টুলের ওপর কঞ্চির শব্দে চমকে উঠল অপু। সুব্রত তালি দিয়ে উঠল, “সাব্বাশ!”

||

মানিকের একটা পছন্দের জিনিস হল আয়না। ছোটবেলা থেকে এই বস্তুটার প্রতি আলাদা টান ওর। কতরকম ভিজুয়াল প্যাটার্ন তৈরি করা যায় এই আয়না দিয়েই। তাই প্রথম ফিল্মে আয়না নিয়ে একটা শট রাখার প্ল্যান আগেই করে রেখছিল মানিক।

অপু একটা বানানো গোঁফ লাগিয়ে নিজেকে দেখছে কেমন লাগে দেখতে। এই ঘটনার মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পাবে অপুর বড় হওয়ার ইচ্ছে। তাই এই শটকে শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখালে তার গুরুত্ব থাকবে না। এখানেই মানিক ঠিক করল আয়নাতে দেখাবে অপু কে। যেন ও নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করছে এক নতুন রূপে। সুবীরের অভিব্যক্তিও বেশ সুন্দর এল আয়নাতে। শট শেষ হতেই সবাই বাইরের দিকে এসে দাঁড়ানো একটা গাড়ির দিকে ঘুরে তাকালো।

গাড়ি থেকে নামলো দুজন। শুটিং দেখতে এসেছেন ওরা আজ বিজয়ার কথায়, কিশোর কুমার আর তাঁর স্ত্রী রুমা দেবী।

||

বৃষ্টির সিনের জন্য তো অপেক্ষার শেষ নেই, অথচ বৃষ্টি যে আর আসেই না। তাই বৃষ্টির ঠিক আগেই দুর্গার “পুণ্যিপুকুর ব্রত”-র শট নেবে ঠিক করল মানিক।

– একদিন দুপুরে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসবে, দুর্গা মেঘ আর বৃষ্টি দেখতে যাবে ভাই কে নিয়ে। কিন্তু দুপুর শেষে কালবৈশাখীর মেঘ যতই ঘন হয়ে আসুক, দুর্গার এই ব্রত ফেলে চট করে বেরোবার জো নেই। উঠোনের মাটিতে ছোট্ট চারকোণা গর্ত কেটেছে দুর্গা, সেটাই পুকুর, “পুণ্যিপুকুর”। বেলগাছের পাতাশুদ্ধ সরু একটা ডাল পোঁতা আছে সেই পুকুরের মাঝখানে। মন্ত্র আউড়ে সেই গর্তে তিনবার জল ঢালতে হবে ঘটি থেকে। তবে দুর্গার ছুটি। ওদিকে মেঘ আরও ঘনিয়ে আসছে।

এই বলে মানিক থামল। কিছুক্ষণ আঙুল দিয়ে গালে চুলকে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল,

– দুর্গা তো জানে না যে এই বৃষ্টিতে ভিজতে বেরনোই হবে ওর শেষ বেরনো। তাই এর কনট্রাস্টে ব্রতর গোটা মন্ত্র ওকে পড়তে দেব না। এই ব্রত বাঙালি মেয়েদের কাছে ভবিষ্যতের প্রার্থনা, যাতে তাদের ভালো স্বামী হয়, গোছানো সংসার হয়, পুত্র হয়। দুর্গার মনেও সেইসব ইচ্ছে আছে। কিন্তু ওর ভবিতব্য যে অন্য।

সুব্রত এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল। এবার জিজ্ঞেস করল,

– কিন্তু এই ব্রতর মন্ত্র তো মোটামুটি সব বাঙালি মেয়েরাই জানে।

– সেই জন্যই তো মাঝপথে উঠে চলে যাবে। বাকি মন্ত্রটা দর্শকের মনে বাজতে থাকবে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝবে এর আসল কারণ।

মানিক ওর ভরাট গলায় মন্ত্র বলতে লাগল।

“পুণ্যি পুকুর পুষ্পমালা,
কে পুজে রে দুপুরবেলা?
আমি সতী লীলাবতী,
ভাইয়ের বোন পুত্রবতী।”

– ব্যস, এইটুকু বলেই ঘটি থেকে গর্তে জল ঢেলে গড় হয়ে প্রণাম করে দুর্গা দেবে এক ছুট।

বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে করে অবশেষে একদিন তুমুল বৃষ্টি নামল। সকাল থেকে বোঝাই যায়নি যে আজ এমন বৃষ্টি হতে পারে। আসলে মাঝে টাকার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেছে। তাই এই জুলাই অগস্টে কখন বৃষ্টি নামবে, তার অপেক্ষায় মানিক দুটো বাচ্চা আর ইউনিট কে নিয়ে চলে আসত বোড়ালে, কিন্তু বৃষ্টি না পেয়ে আশেপাশে পুকুর খাল পরিবেশে বৃষ্টির আমেজের কিছু ফুটেজ তুলে নিয়ে ফিরে যেত। কিন্তু আজ সেই অপেক্ষার অবসান। এমন জোর বৃষ্টি বোধহয় এতদিনের জমানো প্রতীক্ষারই ফল।

বৃষ্টিতে অপুকে গাছতলায় জড়িয়ে ধরে দুর্গার ভিজতে ভিজতে ঠান্ডা লেগে হাঁচি শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু নভেম্বরের এই ঠান্ডায় সুবীর তো কাঁপছে রীতিমতন, কিন্তু উমার হাঁচি কিছুতেই আসছে না। অগত্যা মানিকের বুদ্ধি আবার কাজে এল।

– বংশী, ডিবে এনেছ আজ?

– কিসের?

– আরে নস্যির! তোমার কাছে আর কিসের ডিবে থাকবে? দাও দেখি অল্প করে উমার নাকে গুঁজে।

ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে এসে গেল “হ্যাঁচ্চো!”

||

ইন্দিরের মৃত্যু বিভূতিভূষণের লেখায় অন্যভাবে বর্ণনা করা থাকলেও মানিকের মনে হল একটু বদলানো দরকার। অবশ্য ওর যুক্তিও ফেলা গেল না।

– বই প্রাথমিকভাবে কখনোই সিনেমা বানানোর জন্য লেখা হয় না। যদি তাই হত, তাহলে বইও চিত্রনাট্যের মতই লাগত পড়ার সময়, আর যদি সেটা সত্যিই ঠিকঠাক কোনও চিত্রনাট্য হত, তাহলে সাহিত্যের দিক থেকে তা একদমই বাজে লেখা মনে হত। তাই সিনেমায় গল্প কে সোজাসাপ্টা বলে গেলে তার মজা থাকে না।

কিন্তু চুনিবালা দেবী একটা সিনে ওনার আপত্তি জানালেন।

– বইতে আছে বুড়ি চণ্ডীমণ্ডপে মরছে। আপনি দেখাচ্ছেন বাঁশবনে। ধার্মিক বুড়ি, তার কি বাঁশবনে মরাটা ভালো দেখায়?

– দেখুন দিদি, বাঁশবনে আচমকা মৃতদেহের আবিষ্কার অপু দুর্গার শিশুমনে যে ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে, ছবি ও নাটকের দিক দিয়ে তার মূল্য অনেক।

চুনিবালা আর কিছু বললেন না। বোঝা গেল ওনার মনঃপুত হয়নি ঠিক এই ব্যাখ্যা। কিন্তু পরিচালকের নির্দেশ মেনে অভিনয় করাতে ওনার জুড়ি মেলা ভার। মানিক বসল দৃশ্য বোঝাতে। দুর্গা ওর বুড়ি পিসি কে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে থাকতে দেখে তাকে ঘুমন্ত মনে করে তার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দেবে। কিছুক্ষণ বসা অবস্থায় থেকে হঠাৎ টাল হারিয়ে বুড়ির মৃতদেহ ধপ করে পড়বে মাটিতে। একজন এত বয়স্ক বুড়ির নিষ্প্রাণ দেহ খুব জোরেই মাটিতে পড়া উচিৎ। কিন্তু চুনিবালা দেবীর যা বয়স, তাতে এই শট খুব রিস্কি, গুরুতর আঘাতের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু শট আর অভিনয়ের সার্থকতা নির্ভর করছে এর ওপরেই। মানিক আলাদা করে কিছু না বললেও চুনিবালা বুঝে গেলেন ওনাকে ঠিক কি করতে হবে।

ক্যামেরা রোল করতে শুরু করল। মানিক “অ্যাকশন” বলার সাথে সাথেই দুর্গা গিয়ে বসে থাকা পিসি ইন্দিরকে ডেকে নাড়াতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদেই কোনও সাড়া না দিয়ে ইন্দিরের দেহ টা ওর ডানদিকের মাটিতে আছড়ে পড়ল, শব্দও হল একটা।

মানিক “কাট” বলেই ছুটে গেল ওনার দিকে। চুনিবালা মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই প্রসন্নের হাসি হাসলেন, বেশ বোঝা যাচ্ছে ওনার ভালোই ব্যথা লেগেছে এইভাবে পড়ে গিয়ে, তবে উনি খুশি এটা বুঝতে পেরে যে মানিকের শটটা পছন্দ হয়েছে। সবাই মিলে ওনাকে তুলে বসানো হল, মুখেচোখে জল দেওয়া হল।

মানিক এবার ডাকল উমা কে।

– এদিকে এসো উমা। আগের সিন টা থেকে বুঝেই গেছ অনেকটা?

– হ্যাঁ মানিকদা।

– পিসি মারা গেছে দেখে তুমি খুব অবাক হয়ে গেলে, তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালে। সেইসময় তোমায় মুখে একটা অভিব্যক্তি আনতে হবে।

– কেমন হবে সেটা?

– দাঁড়াও, আমি দেখাচ্ছি। আমাকে লক্ষ্য করো।

এই বলেই মানিক মাটিতে পায়ে ভর দিয়ে বসল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াতেই মানিকের মুখের এক্সপ্রেশন বদলে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে পেছনে সরে গিয়ে আবার নর্মাল অবস্থায় ফিরে এসে মানিক জিজ্ঞেস করল,

– বুঝতে পারলে?

উমা আর ইউনিটের সকলেই ততক্ষণে অবাক। মানিকের এমন অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা যে অভিনেতাদের সরিয়ে নিজেই অনায়াসে ফিল্মে ঢুকে যেতে পারে। ওর ঝুলিতে যে এখনও কোনও রিলিজ হওয়া ফিল্ম নেই, সেটা ওর পরিচালনা দেখলে বোঝাই যায় না।

ঠিক যেভাবে মানিক দেখিয়ে দিয়েছিল, উমা একদম একইরকম এক্সপ্রেশন এনে শট দিল। হাততালি দিয়ে উঠল মানিক, “ব্রিলিয়ান্ট!”

পাশ থেকে সুব্রত ঠাট্টা করল, “উমা রিহার্সালে যতটা ভালো করে, তার চেয়ে ফাইনাল টেক-এ অনেক বেশি ভালো করে।”

– এইজন্য আমি বেশি রিহার্সালের পক্ষপাতী নই সুব্রত, এতে স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়। এছাড়া, মাঝে মাঝে অনেক অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে সেটাও উপরি পাওনা হয়ে যায়। সেদিন ঘুমন্ত সর্বজয়ার ওপর যখন মাছি উড়ছিল, আমার তো দারুণ লেগেছিল।

– সে আর বলতে, তারপর যেদিন তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ওই কুকুরটা যখন হঠাৎ উঠোন পেরিয়ে এসে দাওয়ায় এসে দাঁড়ালো, তখন?

– আরে ওটা তো আমি একদমই এক্সপেক্ট করিনি। ভাগ্যিস ক্যামেরা চালু ছিল ওইসময়।

এর পরের সিন, মানে পিসির মৃত্যুতে দুর্গা দাওয়ায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছে যেখানে, সেটা বেশ কয়েকবার শট নেওয়ার পরেও মানিকের পছন্দ হল না। তবে মানিকও সহজে কাউকে নিরুৎসাহ করে না। শট শেষ হতেই বলে, “দারুণ হয়েছে উমা। তবে এই সিনটা আরেকবার তুলব, কেমন?” কখনও বা ক্যামেরার দোহাই দিয়ে দেয়, যেমন, “খুব ভালো লেগেছে, কিন্তু কি জানো তো, আমার অ্যাকশন বলাটা সুব্রত খেয়াল করেনি, ক্যামেরা চালাতে ভুলে গেছে, তাই আর একবার টেক নেব।” এমন ঠান্ডা মাথার মানুষের সাথে বাচ্চারা খুব সহজেই মিশে যেতে পারে, আর হলও তাই। অবাধ্য মেয়ে রুনকি, দুরন্ত ছেলে সুবীর, প্রাণচঞ্চল উমা, সকলেই যেন মানিকের কথায় হয়ে উঠেছে বাধ্য, ধীর, স্থির। আসলে মানিক বড়দের ও ছোটদের যখন সিন বোঝায়, তখন তার মধ্যে কোনও তফাৎ রাখে না। তাই বাচ্চারাও নিজেদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভেবে মানিকের কথা মন দিয়ে শোনে, ও যেমন বলে, তেমন করে দেখায়।

তবে, এই কান্নার সিনটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না দেখে মানিক বলল, “দুর্গার কান্নাভেজা মুখটা আলো আঁধারি তে রেখে দেওয়া যাবে একটু অন্যভাবে, আর শট লাগবে না।”

||

এবার পালা ইন্দিরের শেষযাত্রার শটের। এর ভাবনা একান্তই মানিকের, গল্পে এর কোনও উল্লেখ নেই। সেটের উঠোনের দাওয়ায় মানিককে ঘিরে বসে সুব্রত, বংশী, শান্তি আর অনিল। মানিক একটা ইঁটের ওপর বসে হাতে একটা কঞ্চি নিয়ে মাটিতে আঁকিবুকি কাটছে আর একমনে কিছু চিন্তা করছে। বংশী জিজ্ঞেস করল,

– কিভাবে ভাবছ তুমি ইন্দিরের শেষ যাত্রার শট দেখাবে?

– দেখো, ইন্দিরের মৃত্যু খুব মর্মস্পর্শী হওয়া উচিৎ। তবে হরিধ্বনি রাখব না এই সিনে। কারণ আমি নিজে দেখেছি অনেক লোক আছেন যারা “বলহরি” শুনেই হরিবোল বলার লোভ সামলাতে পারেন না। তাই তাদের এই সুযোগ টা আমি দেব না। বরং সেই জায়গায় অন্য কিছু শব্দ বা সঙ্গীত রাখা যাবে। হরিহররা খুব গরীব। তাই মরার খাট কেনার পয়সা ওদের নেই। গ্রামে সাধারণত বাঁশে করে শবদেহ বহন করা হয় দড়ি দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে, যাতে দেহ ছিটকে না পড়ে।

– কিন্তু চুনিবালা দি রাজি হবেন? ওনার বয়স টা মাথায় রেখে ডামি নিলে হয় না।

– না, এই শটে ডামি চলবে না, তাছাড়া পাওয়াও যাবে না ওনার মতো দেখতে।

– তাহলে উপায়?

– শোনো অনিল, তুমি যখন চুনিদিকে কাল আনতে যাবে, তখন বলবে না কিসের শুটিং করব আমরা। শুধু বলবে খুব সহজ কাজ, ঘন্টাখানেকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

অনিল যখন চুনিবালা দেবী কে নিয়ে এসে গাড়ি থেকে নামলো, তখন বংশী অলরেডি সেট রেডি করে ফেলেছে। উঠোনের মাঝখানেই রাখা একটা বাঁশের খাটিয়া, আর পাশে পড়ে আছে একতাল দড়ি। চুনিবালা এগিয়ে এলেন উঠোনের কাছে, দেখলেন সব। তারপরেই ওনার মুখে কৌতুকের হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

– তোমরা আমাকে দাহ করতে নিয়ে যাবে, কি তাই তো?

– দিদি, আসুন আমি বুঝিয়ে বলি।

– আমি ছাড়া আর কোন জ্যান্ত মানুষের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে? এসো বাঁধো আমাকে।

চুনিবালা প্রত্যেকবার প্রমাণ করে দেন যে উনি না থাকলে মানিকের এই সিনেমা বানানোর ইচ্ছেটা স্বপ্নই থেকে যেত। ইউনিটের চারজন মিলে বাঁশের খাটিয়া টা একটু উঁচু করে ধরতেই চুনিবালা গিয়ে সটান শুয়ে পড়লেন তার ওপর। ওপরে বিছিয়ে দেওয়া হল গল্পে রাজুর থেকে পাওয়া চাদরখানা। শান্তি চ্যাটার্জী দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল ওনার শরীরটাকে। শীতকালের ভোরবেলায় শুধু একবার রিহার্সালের পরেই শট নেওয়া হল। ইন্দিরের নিথর দেহ খাটিয়ায় নিয়ে শববাহীরা কুয়াশায় মিলিয়ে গেল।

শটের শেষে চুনিবালা সমেত খাটিয়া এনে আবার রাখা হল উঠোনে। দড়ি আলগা করে দেওয়া হল। মানিক খুব খুশি সফলভাবে এই শটটা নেওয়া গেছে বলে। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল পড়ল খাটিয়ার দিকে। ওটা তো এনে রাখা হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হল। কিন্তু চুনিবালা দেবী এখনও সেইভাবেই শুয়ে, শরীরে একটুও নড়নচড়ন নেই।

সকলে এর ওর দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

– চুনি দি, ও চুনি দি!

মানিকের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। শান্তি বংশী সুব্রত মানিক সবাই মিলে দৌড়ে এগিয়ে গেল খাটিয়ার কাছে। ওনাকে নাড়িয়ে আবার ডাকল মানিক।

কিছুক্ষণ পর চুনিবালা দেবী চোখ খুললেন।

– শট হয়ে গেছে? কই আমাকে তো কেউ বলেনি! আমি তাই মড়া হয়ে পড়ে আছি।

||

– আচ্ছা মানিকবাবু, আপনার কি কখনও রাগ হয় না? এতকিছুর মধ্যেও এমন মাথা ঠান্ডা রাখেন কি করে?

কানু বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকদিন থেকে মনে করছে এই প্রশ্ন টা মানিককে করবে বলে, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিল না।

“আমার মধ্যে প্রশান্তি আছে,” বলেই হেসে উঠল মানিক। “মাঝেমাঝে আমার মনে হয় কাউকে খুনই করে ফেলব, কিন্তু তারপরই নিজেকে কন্ট্রোল করে নি।”

– কিন্তু কোনওদিন আপনার কারুর ওপর রাগ হয়নি? এটা কিন্তু মানতে পারলাম না।

– হয়েছিল, একবারই, যখন লন্ডনে ছিলাম। আমার অফিসেরই একটা লোক আমার আঁকা একটা পোস্টার কে নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছিল। কিমারের অফিসে আমার পাশের ঘরেই বসত সে। টাইপোগ্রাফি তে আমার স্পেশালাইজেশন ছিল, তা সেইভাবেই বানানো একটা পোস্টার ওখানকার সংবাদপত্র “দ্য অবজার্ভার” নিয়েছিল, আর আমাকে তার কমিশনও দিয়েছিল কিমারের মাধ্যমে। আন্ডারগ্রাউন্ড টিউব আর আরও অনেক জায়গায় সেটা ডিসপ্লে করা হচ্ছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ আমি পাশের ঘরের সেই লোকটাকে একজনকে ফোন করে বলতে শুনলাম “আমার আঁকা পোস্টার তো অবজার্ভারে বেরিয়েছে….”। আমি সটান ওনার ঘরে গিয়ে ওনাকে বেশ কড়া করে কথা শোনালাম। আমার আগে মনে হত যে ইংল্যন্ডের ব্রিটিশরা ভারতে আসা ব্রিটিশদের থেকে ভালো মানুষ। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে আমার বিশ্বাস ভাঙল। আর, এই একদিনই আমি বেশ রেগে গেছিলাম।

এই বলেই মানিক হেসে উঠল জোরে, “দেখুন, আড্ডা মারতে শুরু করলেই আমি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”

||

কাজ মোটামুটি শেষের দিকে। তবে আজকে মানিককে একবার যেতে হচ্ছে কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে। এর আগে জাঁ রেনোয়ার সাথে দেখা করতেও মানিক এই হোটেলেই গিয়েছিল। আজকে যার সাথে দেখা হবে, তিনি হলেন বিখ্যাত ডিরেক্টর জন হিউস্টন। ওঁর পরিচালিত “দ্য মালটিজ ফ্যাকন” আর “দ্য ট্রেজার অফ দ্য সিয়েরা মাদ্রে” ছবিদুটো দেখে মানিক বেশ মুগ্ধ। তবে হিউস্টন এবারে ভারতে এসেছেন রুডইয়ার্ড কিপলিং এর গল্প “দ্য ম্যান হু উড বি কিং” গল্পের ওপর ভিত্তি করে হামফ্রে বোগার্ট কে নিয়ে একটা ফিল্ম বানাবেন বলে। কাঠমান্ডুতে লোকেশন দেখতে যাওয়ার আগে কলকাতায় এসেছেন মানিকের সাথে দেখা করার জন্যই। উনি শুনেছেন “পথের পাঁচালী” তৈরির কথা মানিকের বন্ধু রাধাপ্রসাদ গুপ্তের কাছ থেকে।

– আপনি তাহলে ছবি করছেন মিস্টার রে? গুপ্ত আমাকে আপনার ছবির কথা সংক্ষেপে বলেছেন। শুনে তো আমার বেশ ভালোই লাগল। তা ছবির খানিকটা অংশ আমাকে দেখাতে পারেন?

– রাফ কাটের অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়, প্রিন্টিংও সব জায়গা একরকম হয়নি, তা ছাড়া সাউন্ডের ব্যাপারটাকেও খুব একটা ভালো বলা যাচ্ছে না।

– তাতে কিছু যায় আসে না। ওর থেকেই যা বুঝবার আমি বুঝে নেব। আমি নিজেও তো ছবি করি।

মানিক হিউস্টনের জন্য আধ ঘন্টার মতো দৈর্ঘ্যের রাফ কাট দেখানোর ব্যবস্থা করল। খুব বুদ্ধি করে মানিক সেই দৃশ্যগুলো বাছাই করল যাতে সংলাপ প্রায় নেই বললেই চলে। কাশবনের ধার দিয়ে রেলগাড়ি যাওয়ার দৃশ্যটাও এর মধ্যে আছে। এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি দেখেই হিউস্টনের যে বেশ ভালো লাগল সেটা মানিক বুঝতে পেরেছে।

– কঠোর বাস্তবের গ্রিম সিরিয়াস ছবি। পশ্চিমে এর কদর হওয়া উচিৎ।

– ধন্যবাদ মিস্টার হিউস্টন। চেষ্টা করছি কাজটা এখন ভালোভাবে শেষ করতে।

– করুন। তবে এবার আপনাকে বলি আমি কেন আপনার সাথে দেখা করলাম, আর কেনই বা আপনার ফিল্ম দেখতে চাইলাম।

– কেন বলুন তো?

– মনরো হুইলার কে চেনেন তো আপনি?

– হ্যাঁ হ্যাঁ, উনি তো দেখা করেছিলেন আমার সাথে।

– হুমম, মনরো আমার বন্ধু হয়। ওই আমাকে বলেছিল যে আমি যেন কলকাতায় এসে আপনার সাথে যোগাযোগ করি, আর খোঁজ নি আপনার ছবির কাজ কতদূর এগোল সেই নিয়ে। আমাকে এও বলেছিল যে কিছুটা ফুটেজও যেন দেখে যেতে পারি।

– ওরেবাবা! মনরো মনে রেখেছেন আমাকে?

– অফকোর্স। আমি অভিভূত আপনার কাজ দেখে মিস্টার রে। মনরো কে আমি সব ডিটেলে জানাবো। আপনি কাজ চালিয়ে যান।

কয়েকদিন বাদেই মানিকের কাছে একটা চিঠি এল মনরো হুইলারের কাছ থেকে। হিউস্টনের প্রশংসা শুনে উনি খুব খুশি হয়েছেন, আর জানতে চেয়েছেন কাজ করতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে কিনা। মানিক চিঠির উত্তরে ওকে জানালো যে কাজের মধ্যে এমন কিছু অসুবিধা হচ্ছে যেগুলো কন্ট্রোল করার কোনও উপায় নেই, তবুও ছবির প্রিন্ট ঠিক সময়মতো পৌঁছে যাবে ওনার কাছে। তবে সাবটাইটেল করার মতো সময় পাওয়া যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। মনরো উত্তরে জানালো যে সাবটাইটেলের দরকার নেই, এই ছবি দেখলেই দর্শক বুঝতে পারবে কোথায় কি হচ্ছে।

~~~♦ পর্ব ৫ ♦~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি
প্রচ্ছদ ~ আলোর আলপিন

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

|| তথ্যসূত্র ||

১. আমাদের কথা – বিজয়া রায়
২. বিষয় চলচ্চিত্র – সত্যজিৎ রায়
৩. প্রবন্ধ সংগ্রহ – সত্যজিৎ রায়
৪. একেই বলে শুটিং – সত্যজিৎ রায়
৫. সত্যজিৎ রায়, বিশ্বজয়ী প্রতিভার বর্ণময় জীবন – অরূপ মুখোপাধ্যায়
৬. পরশমানিক – অরুণেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৭. আমি আর ফেলুদা – সন্দীপ রায়
৮. সত্যজিৎ রায়ের চিঠি, অশোককুমার দাস কে লেখা – দেশ শারদীয় ১৪২৩
৯. সত্যজিৎ ভাবনা – উজ্জ্বল চক্রবর্তী
১০. সত্যজিৎকে নিয়ে – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
১১. এখন সত্যজিৎ – গুপী গাইন বাঘা বাইন সংখ্যা – নভেম্বর ২০০২
১২. দেশ – সত্যজিৎ সংখ্যা
১৩. রবিবাসরীয় – সত্যজিৎ স্পেশাল
১৪. সত্যজিতের নারীরা – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৫. আজব ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৬. সত্যজিৎ রায় সংখ্যা – এপ্রিল ২০১৫ – আনন্দলোক
১৭. My years with Apu – Satyajit Ray
১৮. Portrait of a Director : Satyajit Ray – Marie Seton
১৯. Our Films Their Films – Satyajit Ray
২০. Manikda, Memories of Satyajit Ray – Nemai Ghosh
২১. Deep Focus, Reflections on Cinema – Satyajit Ray
২২. Satyajit Ray at Work – Bijoya Ray
২৩. Through The Eyes Of A Cinematographer: A Biography Of Soumendu Roy – Devapriya Sanyal
২৪. The Master And I – Soumitra Chatterjee
২৫. www.satyajitray.org
২৬. Ravi and Ray – Times of India
২৭. Renoir in Calcutta – Satyajit Ray
২৮. Satyajit Ray: The Inner Eye: The Biography of a Master Filmmaker – Andrew Robinson
২৯. My Adventures with Satyajit Ray – The Making of Shatranj Ke Khiladi – Suresh Jindal

One thought on “মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৪ ~ ঐ যে দেখো দিনের আলো

Leave a Reply