একেই কি বলে চাকরি ~ স্টেপ ~২ ~ ন-লেজ ট্রান্সফার

History, Satire, আনন্দ আকাশ, বাংলা

” ন-লেজ ট্রান্সফার ” গালভরা নাম দেখে যারা গুগল করছেন আইটির লোকজনের নয় টা লেজ ছিল বা আছে কিনা দেখার জন্য , তাদের বলি , যদিও কিছু পাব্লিকের আছে বলে বাজারে গুজব, এবং তার সত্যতা যাচাই এর জন্য জোর রিসার্চ চলছে , ন – লেজ আই টির লোকজনের এমন এক শক্তিশালী অঙ্গ , যা ইয়েতি , এলিয়েন্স বা ভূতের মতোই সত্য , এবং যার জোরে এক পুরো দেশের “ট্রাম্প” -কার্ড ধরাশায়ী বলে দাবি। আমাদের মতো কিছু মজদুর যদিও হাড়ে হাড়ে পরিচিত, যে সব বন্ধু নন – আইটির তাদের জন্য বলি , ন-লেজ ট্রান্সফার ( ডাকনাম “কেটি” ) হলো এমন এক জটিল প্রক্রিয়া, যার দ্বারা পুঁথিগত ভাবে হলেও একজনের সমস্ত জ্ঞান -অজ্ঞান ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে অন্যের খুলিতে পাঠিয়ে দেয়া হয় । গুলিয়ে যাচ্ছে তো ? দুই পক্ষের ও গুলিয়ে যায় , দুই জন ই ভাবে সব বুঝে গেছি বা বুঝিয়ে দিয়েছি । কন্ট্রাক্ট সাইন অফ , সব খুশি , হ্যাপি এন্ডিং । । কেলো তো তার পর শুরু হয় । আপনি যখন বলেছেন আমি সব বুঝে গেছি , কি বংশগুচ্ছ যে আপনি নিয়েছেন সেটা টের পাবেন যখন আপনার আউট অফ সিলেবাস কোনো প্রব্লেম আসবে । কেটির সময়ে নেয়া আপনার সব চোথা ফেল । তখন আপনার হাতযশ আর ক্লায়েন্টের ভাগ্য-ই ভরসা ।

তো , আমার জীবনে প্রথম ” কেটি ” , অন জব কেটি । এটার মানে হলো , আপনাকে সমুদ্রে হালকা পুশ করে ফেলে বলা হবে , সাঁতার কাটো । দ্বিতীয় বার সেই ভিন রাজ্যে ফেরার পর আমাকে সেরকম এক জায়গায় পাঠানো হলো । ততদিনে কিছু কিছু নতুন শব্দ শিখেছি – “ঝার খেয়েছে , কোড পড়ে গেছে, কোড ফেলে দে , চালিয়ে দে , ইত্যাদি ” । এগুলো ডিসিশনরি মানে খুঁজতে যাবেন না | এক ক্লায়েন্টের কাছে আমাকে পাঠানো হলো আরও কিছু আমার মতো হাতে গরম মার্কেটে নামা ইঞ্জিনিয়ার দের সাথে ।

এখানে বলে নেওয়া দরকার , আমরা সকালে উঠলেই জানতে পারতাম কোন জায়গায় আমাদের যেতে হবে , প্রতিটা রুটের জন্য এক একটা গাড়ি থাকতো , ওই মারুতি ভ্যান আবার কি , সক্কলে সকাল সকাল তাতে চেপে কোলিয়ারির অফিস গুলো তে পৌঁছে যেতাম । আমার ভাগ্যি ভালো , যে মডিউলে কাজ পেয়েছিলাম তার সিনিয়ররা আমার পাশে ছিল । সবার সে ভাগ্যি ছিল না ।

আমাদের সাথেই একই কোলিয়ারির অফিসে যেত রূপক , ওর মডিউলে টা ছিল লোকের মাইনে পত্র নিয়ে। বুঝতেই পারছেন , সেনসিটিভ ব্যাপার। তো একদিন আমাদের কাজ হয়ে গেছে আমরা রূপকের কাজ শেষ হবার অপেক্ষায় আছি , ওর মুখ চোখ দেখে বুঝলাম ভয়ঙ্কর কিছু একটা হয়েছে। আসলে আগের দিন পে প্রসেস হয়েছে , সফটওয়্যার এর কিছু বাগ (আরে পোকা না মশাই , সফটওয়ারের ভুল) এর জন্য কোনো ওয়ার্কার এরই নাইট এলাউন্স আসে নি। বাইরে কোলিয়ারির মজুর রা ঘিরে ধরেছে , যতক্ষন না টাকা পাবে আমাদের ছাড়বে না। রূপকের কেটির চোথা জবাব দিয়েছে, ও বুঝতে পারছে না 2000 লাইন এর প্রোগ্রামের মধ্যে কোথায় ভুল আছে । বাইরে শোরগোল , আমাদের বুকের ভেতর মাদল ,অন জব কেটির ভাঁড় ভেঙে চারপাশ গন্ধে ভরিয়ে দিয়েছে আর কি?

ত্রাহিমাম ,ত্রাহিমাম আর্তনাদে এক সিনিয়রের হৃদয় গলাতে সক্ষম হলো রূপক , সে রাত ৯ টা অব্দি কাজ করে যখন সব ঠিক করলো মোটামুটি বিধ্বস্ত আমরা ।

আর এক দিনের কথা , আবার অন জব কেটির ছোবল , একটি ছেলেকে বলা হয়েছিল কোনো একটি লোকের নামের স্পেলিং ঠিক করতে, সে সেটা করেছে , সঙ্গে আরো বাকি সবার নাম ও একই আপডেট করে দিয়েছে । ওর ভুল টা ছোটো , মাত্র একটা কন্ডিশন লাগিয়ে আপডেট করতে ভুল করেছিল , তার ফল যে কি সুদূর প্রসারী , অত বোঝে নি । তো যত রিপোর্ট বেরোচ্ছে সবার নাম এক , যেন পুরো অফিসে ১ জন বহু বহু রূপে কাজ করছে । সবার মাথায় হাত , অনেক খেটে আগের দিনের ব্যাকআপ ডাটা চালিয়ে আবার সব ঠিক করা হলো । তারপর থেকে আর সিনিয়র রা রিস্ক নিতো না , কাউকে কোনো আপডেট করতে বললে পুরো স্বরে অ স্বরে আ এর মতো করে বুঝিয়ে বলতো , যেন ভুলের কোনো জায়গা না থাকে |

এই লেখার শুরুতেই বলেছিলাম , আমরা ভবঘুরে, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তে একটাই কন্সট্যান্ট – ” চেঞ্জ ” । তো আজ যে আপনার পাশে বসছে হটাৎ দেখবেন সে বসছে না তার জায়গায় নতুন একজন , আবার সে কিছুদিন পর দেখবে আপনি বসছেন না ওর পাশে । নতুন ঘরের বাসিন্দা আপনারা তখন , কেয়ার অফ নতুন কোম্পানি । তো যখন ই কেউ পাতা ফেলে (পড়ুন রেজিগনেশন দেয় ) বা ছুটি তে যায় একটা কেটি প্ল্যান অবশ্যম্ভাবি । মোটিভ সিম্পল, একটা ছোট ক্রাশ কোর্স করিয়ে একটা ব্রেইনের ক্লোন বানানো আর কি ।

তো এই ক্রাশ কোর্স কতটা দাঁড়ায় না ক্রাশ করে ? একটু দেখে নি – এটা আমার পথিক জীবনের আর এক ঘরে- আমি নতুন জয়েন করেছি , শুনলাম একজন বিয়ে করতে যাবে ২০ দিনের ছুটি , আমি যেন ওর কাজ বুঝে নি ৩ দিনের মধ্যে । খুব ভালো কথা , ও ৬ মাসে যা প্রোগ্রাম লিখেছে আমাকে ৩ দিনে বুঝে সব সামলাতে হবে । আমি ও বুঝলাম , ও ও বোঝালো । তখন বিয়ের আগে, স্ক্র্রিনে নিশ্চয় রামধেনু দেখছে ও ,আমাকে বলে গেল “বস ! সব সেট , তুমি শুধু জাস্ট পায়ের পা তুলে আরাম করো ।”

হাঁ আমি আরাম ই করলাম , ৩ দিন টানা , অফিসের সিটে বসে । ওর ছুটির প্রথম দিন ই কোড ফেটে চৌচির ( পড়ুন প্রোগ্রাম এরর দিচ্ছে) । তো তেনাকে ফোন এ ধরার চেষ্টা করা হলো , তিনি তুললেন না । আমাদের ম্যানেজার কে দিয়ে ফোন করানোর পর তাঁর গলা শোনা গেল । সেদিন ই তেনার বিয়ে , ২ দিনে ৬ বার ফোন করার পর একটা সময় প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়েবলে -” দাদা ! আজ বৌভাত আর ফুলশয্যা , আজ রাত্রে ফোন টা হয়তো ব্যস্ত থাকবে , ম্যানেজার দাদা কে দিয়ে ফোন করাবেন না প্লিস ।।”

এভাবেই চলছে , কেটি দেয়া নেওয়া । এটা একটা নেভার এন্ডিং প্রসেস ও । কিছু জন কে দেখেছি কেটি টা বেশ মজা ভাবে নেই , ভাবে প্রব্লেম হলে তো খোদার খাঁসি আছেই, আবার কিছু জন খুব সিরিয়াস, স্কুল কলেজে এতো প্রশ্ন হয়তো করে নি যা কেটি তে জিজ্ঞেস করে ।

তো , এতটা পড়ার পর মনে হতেই পারে কেটি তে মিস করলে প্রব্লেম টা কি ? গুগল করে একটা ভালো বাংলা পেলাম “তীব্রতাবৃদ্ধি “, সোজা ইঞ্জিরি তে বললে “এস্কালেসেন” । এটা আর একটা গল্প , পরের দিন বলবো ।

কলমে ~ আনন্দ

ছবি উৎস ~http://workplaceinsight.net

অলংকরণ ~ আনাড়ি মাইন্ডস

Leave a Reply