মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৫ ~ সুর হবে তাল হবে

Anirban & Arijit, Biography, বাংলা, মানিকের পাঁচালী

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

– ফিল্মের দল এয়েচে। বল্লম নিয়ে লাফিয়ে পড়ো সব, বল্লম নিয়ে লাফিয়ে পড়ো!

কনকনে শীতের সকালে সমস্ত ভারী ভারী সরঞ্জাম নিয়ে বোড়ালের রাস্তা দিয়ে মানিকের ইউনিট চলেছে শুটিং স্পটের দিকে। কিন্তু এমন একখান চিৎকার শুনেই থমকে দাঁড়াতে হল। শেষে গ্রামবাসীরা ধরে পেটাবে নাকি! খোঁজ নিয়ে দেখা গেল চিৎকারের উৎস একজনই, এবং তার ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ এগিয়েও আসছে না। মানিকের সাথে বেশ আলাপ জমে গেল ওনার কয়েকদিনের মধ্যেই। সুবোধ দা বলেই ডাকে সবাই ওনাকে। বোড়ালে অনেকদিন ধরেই আছেন, এখানকার নাড়ি নক্ষত্র সব জানেন, কিন্তু ওনার নিজের স্টাইলে।

শুটিং এর অবসর হলেই মানিক গিয়ে বসে সুবোধ দার বাড়ির দাওয়ায়। ফিল্মের দলের প্রতি ওনার আর রাগ নেই তেমন, বরং মানিককে দেখলেই গল্প জমিয়ে দেন। একটা ধুলোমাখা চটের থলি পেতে তাতে তাঁর আদ্যিকালের সব দলিলপত্র সাজিয়ে বসেন।

– এসব কি সুবোধ দা? আপনার সম্পত্তির হিসাব?

– আমার সব জমি। কোথায় কত জমি আছে সব জানতি পারবেন। খুব সাবধান! সবাই কিন্তু ঠকিয়ে নেবে!

– কেন দাদা? এখানে সবাই তো আপনাকে কত ভালোবাসে।

– মনে করুন দশজন লোক অমাবস্যার রাত্তিরে সার বেঁধে গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে চলেছে। বাতি নেই কারও হাতে, সব কঞ্জুস তো! সামনের লোকটি একটি খানায় পড়লেন, পড়ে আবার সামলে নিয়ে উঠে চলতে লাগলেন, কিন্তু পেছনের লোককে সাবধান করলেন না। এইভাবে একে একে দশজনের দশজনই খানায় পড়ল, কিন্তু পাছে পরোপকার হয়ে যায় তাই কেউ টুঁ শব্দটি করলেন না। এই হল আপনার বোড়ালের লোকজন।

– হা হা, আপনি খুব মজার লোক মশাই। আপনার কথা শুনতে বেশ লাগে।

– ওই যে সাইকেলে চড়ে যাচ্ছে, ও কে জানেন?

মানিক দেখল সামনেই একজন মোটা মতন লোক সাইকেল চালাতে চালাতে চলে গেল সুবোধ দার দিকে হাত নেড়ে।

– না তো, আমি ঠিক চিনি না।

– উনি হলেন রুজভেল্ট। ওর হাবভাব ভুলবেন না যেন। ও ভারী শয়তান। চার্চিল, ফজলুল হক, আলিবর্দি খাঁ, হিটলার, এরা সবাই আছেন বোড়ালে, আমার প্রতিবেশী। কাউকে বিশ্বাস করবেন না, সবাইকে এড়িয়ে চলবেন।

– আপনি নাকি বেহালা বাজান, কই শোনাননি তো?

– কি শুনবেন? ইমন না বাগেশ্রী?

– ইমনই হোক।

সুবোধ দা হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বেহালার বাক্স নিয়ে এলেন। গুনগুন করে বেহালায় ছড় টানলেন। আধঘন্টা এক নাগাড়ে বাজিয়ে তারপর থামলেন। খুব ভালো হাতের কাজ না হলেও উনি যে সঙ্গীতরসিক, সে বিষয়ে সন্দেহ রইল না।

– বড্ড ভালো বাজালেন দাদা।

– আপনার তো আমার সবকিছুই ভালো লাগে। কেন বলুন তো?

– কারণ আপনি মানুষটা বড় ভালো যে!

– সবাই যে আমায় পাগল বলে!

– কই আমি তো বলি না।

– আমি কিভাবে পাগল হলুম জানেন? বসে আছি, বসে আছি, হঠাৎ চোখটা কেমন ধাঁধিয়ে গেল। যেন একটা দিব্য জ্যোতি দেখলুম। আর তার পরেই দেখলুম তাঁকে – মা জগদম্বা। ছেকল শুদ্ধ টেনে নিয়ে আকাশের দিকে উড়ে চলেছেন, পরনে ডুরে শাড়ি, কোমর অবধি এলোচুল, পায়ে কেডস জুতো। ব্যস, আমার এদিকেও ভোঁ।

সুবোধ দার সাথে গল্প করলে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায় মানিক টেরও পায় না। সবসময় যে সুস্থ লোকের সাথে কথা বললেই অনেক কিছু জানা যায়, এমনটা মানিকের মনে হয় না। সুবোধ দার মতো মানুষের থেকেও অনেক প্রেরণা পাওয়া যায়।

||

– শোনো করুণা, কাল এই ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শট। এই দৃশ্যে বহুদিন বাদে হরিহর দেশে ফিরে দুর্গার নাম করে আনা শাড়িটা তুলে দেয় সর্বজয়ার হাতে। সে তখনও জানে না যে দুর্গা আর নেই। অন্য কোনও সিনের জন্য স্ক্রিনপ্লে না থাকলেও স্পেশালি এই সিনটার জন্য আমি চিত্রনাট্য লিখেছি যাতে তোমার সুবিধা হয়। বাড়ি থেকে তৈরি হয়ে এসো।

করুণাও কথামতো তৈরি হয়ে শুটিং স্পটে পৌঁছল সকালবেলা। আজ পরিচালক থেকে কলাকুশলী সবাই যেন কেমন শোকস্তব্ধ। বোঝাই যাচ্ছে দুঃখের আবহ তৈরি করার জন্য মানিক কতটাই নিখুঁত পরিশ্রম করে। এমনকি মেঘ করে আকাশটাও আজ থমথমে হয়ে আছে। গোটা পরিবেশটাই যেন সর্বজয়া কে সেই মুহূর্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। হরিহর আসবে, মেয়ে দুর্গার মৃত্যুসংবাদ শুনবে।

এর আগের দিন রান্নাঘরে গনগনে আগুনের সামনে বসে রাঁধতে রাঁধতে হরিহরের সঙ্গে কথা বলার সিনের শুটিং এর সময় করুণা একটু বেশিই রাগ দেখিয়ে ফেলেছিল বংশী আর সুব্রতর ওপর। জ্বলন্ত কাঠের আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে বসে বসে শট দেওয়ার সময় টেকনিকাল কারণে বেশ কয়েকবার শট বন্ধ হয়ে যায়। করুণাও “রিয়েলিজম” কে গাল দিতে দিতে রেগেমেগে শুটিং জোন থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু পরে বুঝতে পারে অবাধ্য হাওয়ার দাপটে সাউন্ড মেশিনে শোঁ শোঁ শব্দের জন্যই এতবার রিটেক নিতে হচ্ছিল। তাই, কালকের মতো সব মিটমাট হয়ে গেছে।

– দূর থেকে হরিহরের ডাক শুনে সর্বজয়ার অভিব্যক্তি কেমন হওয়া উচিৎ সুব্রত?

মানিকের আচমকা প্রশ্নে সুব্রত কিছুক্ষণ ভেবে জবাব দিল,

– বাড়াবাড়ি কিছু হবে না। কারণ কান্নার বাঁধ এত সহজে ভাঙতে পারে না।

– কারেক্ট! তাই এখানে ক্লোজ আপের সাথে একটা ছোট্ট কিছুর মুভমেন্ট চাই।

– হাত?

– বাহ্! হাত টা গালে থাকবে। সামান্য একটু নড়তেই শাঁখাটা আলগা হয়ে কয়েক ইঞ্চি নেমে আসবে। যেহেতু এর আগে সর্বজয়া কে অনেকক্ষণ অনড় অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, তাই এই শাঁখার দোলাই বোঝাবে ওর ভেতরটা চমকে উঠল।

শুরু হল শট। কিন্তু শাঁখা ঠিকমতো নামছে না, বা যতটা নামার তার থেকে বেশি নামছে, এইভাবে ফাইনালি আট নম্বর শটে গিয়ে মানিকের পছন্দ হল।

এবারের শটটা একবারেই দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে, কারণ করুণার মনে হচ্ছে কান্নার সিন বারবার করা টা বেশ শক্ত।

– কাঁদতে গিয়ে তোমার মুখ যতই বিকৃত দেখাক না কেন, তুমি সেদিকে মন দেবে না।

মানিকের এই নির্দেশটা খুবই দরকার ছিল। হরিহর অম্লানবদনে দুর্গার জন্য আনা শাড়িটা সর্বজয়ার দিকে এগিয়ে দিতেই করুণা কান্নায় ভেঙে পড়ল। আসলে দৃশ্যটা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলে কান্না আসতে বাধ্য। এক টেকেই মানিক বলল “পারফেক্ট!”

||

শুটিং এর কাজ মোটামুটি শেষের দিকে। তাই আজকে দুপুরবেলায় সেটের দাওয়ায় জমে উঠেছে আড্ডা। গোল হয়ে বসে মানিক, বিজয়া, সুব্রত, অনিল, বংশী, কানু, চুনিবালা এবং আরও কয়েকজন কলাকুশলী।

বংশী মজা করে শুরু করল,

– মানিকদা প্রথমদিকে জানতই না যে ক্যামেরাম্যান আর অভিনেতাদের কিভাবে নির্দেশ দিতে হবে।

মানিকও যোগ দিল,

– ঠিক। বংশী আমাকে পাশ থেকে ফিসফিস করে বলত, “স্টার্ট সাউন্ড” বলো।

– “অ্যাকশন”ও বলতে পারতে না তুমি তখন। জাঁ রেনোয়া “অ্যাকশন” কে “অকশান” বলতেন।

– আমি ভাবতাম “অ্যাকশন” বললে যদি অভিনেতারা ঘাবড়ে যায়! আমি তো এখনও “কাট” বলতে পারি না ঠিকমতো।

– তবে তুমি এসব ফর্মালিটি না জানলেও কিভাবে একটা ফিল্ম বানাতে হয় সেসব ভালোই জানতে। আর একটা জিনিস দেখেছি, বাচ্চাদেরকে তুমি যা বলো ওরা ঠিক তাই করে।

– হা হা, আমি জানি একটা বাচ্চা কে ঠিক কিভাবে নির্দেশ দিতে হয়। ওদের সাথে আমি আলাদা হয়ে ফিসফিস করে কথা বলি, যাতে অন্যকেউ শুনতে না পারে। ওরাও তাই আমাকে বন্ধু ভেবে আমার জন্যই অভিনয় করে।

এর মধ্যেই অনিল বিকেলের চা যোগাড় করে ফেলেছে সবার জন্য। চুনিবালা ওনার আফিমের বড়ি চায়ে ফেলে চুমুক দিলেন। মানিক ওনার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,

– চুনি দি, আপনি গান জানেন?

– ধর্মমূলক চলবে কি?

– চলবে।

যেই বলা, ওমনি উনি শুরু করে দিলেন।

“মন আমার হরি বল হরি বল।
হরি হরি হরি বলে,
ভবসিন্ধু পার চল।
জলে হরি স্থলে হরি,
চন্দ্রে হরি সূর্যে হরি,
আকাশে বাতাসে হরি,
হরিময় ভূমণ্ডল।”

মানিকের খুব মনে ধরে গেল গানটা। পরের দিন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট কে দিয়ে গানটা রেকর্ড করালো। তারপর স্টুডিওতে রাতের দৃশ্য তোলার আয়োজন হল, যেখানে চাঁদনিরাতে ইন্দির দাওয়ার পশ্চিম দিকটায় পা ছড়িয়ে বসে হাতে তাল রেখে এই গানটা গাইছে। ভাদ্র মাস, আবহে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁর ডাক। শট যখন মোটামুটি রেডি, চুনিবালা বলে উঠলেন,

– আরেকটা গান মনে পড়ছে আমার। এটা আরও ভালো। শুনবেন?

মানিক অগত্যা অনুমতি দিল। চুনিবালা ধরলেন,

“হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল,
পার করো আমারে।
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা,
ডাকি হে তোমারে।
শুনি, কড়ি নাইক যার,
তুমি কর তারে পার।
আমি দীন ভিখারী, নাইক কড়ি,
দেখ ঝুলি ঝেড়ে।
হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল,
পার করো আমারে।”

বেশ কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর মানিক নির্দেশ দিলেন সুব্রত কে, “আগের গানটা ক্যান্সেল, এটাই শুট করো। আর এটা রেকর্ডও করতে হবে, যেখানে ইন্দির মারা গেছেন, সেখানেও ব্যাকগ্রাউন্ডে এটা বাজবে। দিদি, আপনার জবাব নেই!”

– কি যে বলেন!

– আমার একটা প্ল্যান আছে মাথায়। “দ্রবময়ীর কাশীবাস” গল্পটা আমার দারুণ লেগেছে। “পথের পাঁচালী”-র পর হয়তো এটা নিয়ে সিনেমা বানাতে পারি। আর এর জন্য আপনাকেই চাই।

– আমার যা বয়েস, তাতে ইচ্ছে থাকলেও কথা দিতে পারি না যে।

– না না, আপনি থাকছেন।

||

মানিকের বসার ঘরেই এই গ্রামোফোন টা রাখা থাকে। নিজের মুড অনুযায়ী ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকালের রেকর্ড চালিয়ে হেলানো চেয়ারে বসে মানিক শোনে, কখনও খাতায় নোট নেয়, কখনও দুহাত মাথার ওপর রেখে চোখ বন্ধ করে শুনতে থাকে। আজকে বাইরে বেশ মেঘলা বিকেল থেকেই। বিজয়া মানিকের ঘরে ঢুকেই শুনল একটা সুন্দর সুর ভেসে আসছে, তবে সেটা মানিকের গ্রামোফোন থেকে নয়, পাশের বাড়ি থেকে। মানিক সেটাই শুনছে মন দিয়ে।

– মোৎসার্ট না?

– উঁহু!

– তাহলে? এমন তো মোৎসার্টেরই শুনেছি মনে হচ্ছে।

– মনে করে দেখো মঙ্কু, বিয়ের আগে এই পিস টাই তুমি একবার শুনে আমাকে পাঠিয়েছিলে। আমি তোমাকে স্বরলিপি লিখে দিয়েছিলাম। দিস ইজ পিওর বিঠোফেন!

সঙ্গীতপ্রীতিই মানিক আর বিজয়ার মননশীলতার মিলের একটা প্রধান ফ্যাক্টর ছিল। দুজনে মিলেই বিভিন্ন পাশ্চাত্য সঙ্গীত শুনত, আর মানিক শুধু কানে শুনেই বলে দিতে পারত কোন পিস কার বাজানো। সুর তালের এই দক্ষতার পিছনে কোনওরকম তালিম ছিল না, শুধু অজস্র রেকর্ড কিনে শোনাই ছিল মানিকের অভ্যাস, আর শুনতে শুনতে খাতায় লিখে রাখত সেইসবের ডিটেলস। ছোটবেলায় একজন পিয়ানোবাদকের সামনে রাখা স্বরলিপির পাতা উলটে দিত মানিক। সেই থেকেই ওর মনে গেঁথে যায় তার যাবতীয় নোটস।

– মঙ্কু, কাল যাচ্ছি জানো তো জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বাড়ি, রবিশঙ্কর আসছে। অনেকদিন বাদে দেখা হবে ওর সাথে। “পথের পাঁচালী”-র মিউজিক নিয়ে কথা বলব।

– উনি কি পারবেন সময় দিতে?

– আগে একবার জানিয়েছিলাম। যেটুকু সময় ওর থেকে পাওয়া যায়, তার মধ্যেই সেরে ফেলতে হবে কাজ। পরশুদিনই ওর আর এক জায়গায় অনুষ্ঠান আছে। তারপরেই ফিরে যাবে, ব্যস্ত শিডিউল। আমাদের বংশীবাদক অলোক দে কে বলে রেখেছি কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পীর ব্যবস্থা করে রাখতে কালকের মধ্যেই।

||

কলকাতার ডিক্সন লেনের এই বাড়িতেই থাকেন হিন্দুস্তানি ক্লাসিকাল মিউজিকের স্বনামধন্য সাধক শ্রী জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। দুদিনের সফরে এঁর বাড়িতেই এসে উঠেছেন রবিশঙ্কর, আসল নাম রবীন্দ্র শঙ্কর চৌধুরি। মানিকের থেকে মাত্র একবছরের বড়, সমবয়সীই বলা যায়। কিন্তু সঙ্গীতের দুনিয়ায়, বিশেষত সেতারে এর মধ্যেই ওর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। দুটো ছবিতে মিউজিক কম্পোজও করেছে এর মধ্যে। খাজা আহমেদ আব্বাস এর ছবি “ধরতি কে লাল”, আর চেতন আনন্দের “নীচা নগর”।

ঘরের সোফায় বসে ম্যাগাজিন দেখছিল, কিন্তু মানিককে দেখতেই উঠে এসে জড়িয়ে ধরল রবিশঙ্কর। তারপর সোফা তে বসেই আলোচনা শুরু হল। প্রথমেই মানিক জিজ্ঞেস করল,

– পথের পাঁচালী পড়েছ?

– বিভূতিভূষণের এই বইটা নিয়ে আমি শুনেছি অনেক জানো তো, কিন্তু পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে আমি জানি যে এর বিষয়বস্তু আঞ্চলিক। একটি গ্রামে দারিদ্র‍্যের মধ্যে একটি অল্পবয়সী ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী।

– আমি চাই আমার এই ছবির জন্য মিউজিক তুমি করো।

– হা হা, তোমাকে এবার একটা কথা বলি?

– অবশ্যই।

– তোমার ছবির একটা সঙ্গীত-রূপ আমি অলরেডি ভেবে রেখেছি।

– বলো কি!

– দাঁড়াও শোনাই তোমায়।

এই বলেই পাশ থেকে সেতার টা কোলে তুলে নিয়ে রবিশঙ্কর বাজাতে শুরু করলেন। মানিক অভিভূত হয়ে শুনল, মনে হল অপু দুর্গার ছবিই চোখের সামনে ফুটে উঠল সুর টা শুনে। ঠিক এমনটাই তো চাইছিল ও। রবিশঙ্কর কি টেলিপ্যাথি জানে নাকি!
বাজানোর শেষে মানিকের ঠোঁটের কোণে হাসিটা দেখেই উনি বুঝে গেলেন এবার কাজ এগোবে। তবে ধরাবাঁধা মিউজিক কম্পোজারদের মতো তো রবিশঙ্কর কাজ করেন না, ওঁর নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। তাই ওর মন বুঝেই আইডিয়া টা মানিকই দিল।

– দেখো, গোটা ছবি তোমার বসে দেখার মতো সময় নেই আমি বুঝতে পারছি। আজকেই যা করার করতে হবে। আমি বিকেলের দিকে তোমাকে একটা রাফ কাট দেখাবার ব্যবস্থা করছি। তারপর ওখান থেকে স্টুডিও যাব, সেখানে যন্ত্রশিল্পীরা রেডি থাকবে। তুমি তোমার কাজ শুরু করতে পারবে।

– তাই হোক তবে!

ভবানী সিনেমা হলে রবিশঙ্করকে রাফ কাট দেখাবার ব্যবস্থা করে ফেলল অনিল বিকেলের মধ্যেই। ৪ টে নাগাদ মানিকও এসে গেল রবিশঙ্কর কে নিয়ে। শুরু হল সিনেমার কিছু বাছাই করা অংশ ওকে দেখানোর কাজ। মানিকও পাশে বসে ওকে বুঝিয়ে দিতে লাগল সিনেমার সারসংক্ষেপ।

– এই ছয় টা দৃশ্যেই প্রধানত মিউজিক লাগবে। এই জায়গাগুলোই সিনেমার মূল ভিত্তি। আর এছাড়া বাকি অনেক ছোটখাটো সিন আছে অবশ্য, তার জন্য তুমি যেমন বলবে, তেমন হবে।

– ওকে, এই মেন সিনগুলোর জন্য তো আমি সুর বানাবোই। সাথে নানা ধরনের গতি ও মেজাজের কয়েকটা তিন মিনিটের গত্ আমি তৈরি করে দেব যেগুলো তোমাদের বাকি সিনে কাজে লাগবে।

– এক্সেলেন্ট আইডিয়া! চূড়ান্ত এডিটিং এর সময় সেগুলো আমরা জায়গা বুঝে এক-একটাকে বসিয়ে নেব।

– তবে একটা কথা তোমায় বলি। খাসা জিনিস বানিয়েছ, এমন কাজ আগে কোথাও দেখিনি।

মানিক মুচকি হেসে বলল, “চলো, তবে রেকর্ডিং স্টুডিও যাওয়া যাক!”

||

স্টুডিও তে অলোক দে সব ব্যবস্থা অলরেডি করে ফেলেছেন। উনি নিজেই বাঁশী বাজাবেন। রবিশঙ্করের জন্য একখানা সেতারও রাখা আছে। এছাড়াও আছে তার সানাই, ভায়োলিন, সারেঙ্গী, চমং আর কাচারি। ঠিক সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রেকর্ডিং শুরু হল। রবিশঙ্কর এক একটা গত্ বাজাবার আগেই সঙ্গে সঙ্গে তার স্বরলিপি তৈরি করে ধরিয়ে দিচ্ছেন বাদ্যযন্ত্রীদের হাতে। ঘড়ি ধরে কাজ চলছে।

বেশ কয়েকটা পিস রেকর্ড হওয়ার পর হরিহরের বিলাপের সিনের পালা এল। এই সিনটা রাফ কাটে দেখানো হয়নি রবিশঙ্কর কে। তাই মানিক বলতে শুরু করল,

– এই দৃশ্য টা বেশ ইম্পরট্যান্ট। হরিহর বেশ কিছুদিন বাইরে কাটিয়ে তারপর ঘরে ফিরছেন, এসে তার স্ত্রীর কাছে শুনছেন যে মেয়ে দুর্গা আর বেঁচে নেই। এইসময়ে সর্বজয়ার কান্নার বাঁধ ভাঙে আর হরিহরও বিলাপ করতে থাকেন। সিনটা দেখবার দিক দিয়ে চমৎকার এলেও বিলাপের শব্দ টা ঠিক খাপ খাচ্ছে না। তাই এই জায়গার জন্য আমি একটা সুরমূর্ছনা ভেবে রেখেছি। কিন্তু সেটা কিভাবে বাজালে এই সিনের অ্যাম্বিয়েন্স টা তৈরি করা যাবে, সেটা তুমি সাজেস্ট করো।

– দেখো, তুমি যা বললে আমি বুঝতে পেরেছি। তবে ভায়োলিন বা সারেঙ্গী দিয়ে এটা হবে না। এর জন্য চাই তার সানাই। এই যন্ত্রটা এমন কিছু নোট তৈরি করতে পারে যা শুনলে বুক ফেটে যাবে দুঃখে।

– তবে এমনটাই হোক। দুমিনিটের লাগবে এটা। এর রাগ কি হবে?

– পটদীপ। এই সিনের জন্য আদর্শ।

দক্ষিণামোহন ঠাকুর তার সানাই যন্ত্রের সেরা শিল্পী এখন। অলোক দে ওনাকেও তাই আসতে বলেছিলেন আজ। রবিশঙ্করের নির্দেশে প্রাণমন ঢেলে বাজালেন উনি, সেই সুর শুনে স্টুডিও তেই সবার চোখ ছলছল করে উঠল।

রেকর্ডিং যখন সব শেষ হল, তখন বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। ভোর পাঁচটা নাগাদই রবিশঙ্কর মানিককে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন আজকের শো এর প্রস্তুতি করতে। একদিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল “পথের পাঁচালী”-র সঙ্গীত।

||

– একটা গ্যাপ রয়ে গেল বুঝলে সুব্রত।

– কোথায় বলুন তো?

– চিনিবাস কাঁধে বাঁক নিয়ে মিঠাই ফিরি করছে। এখানেও যে একটা মিউজিক থাকার কথা। সেদিন রবির হাতে আর সময় ছিল না, তাই আমিও ভুলে গেছি।

– ওনাকে তো আর পাওয়া যাবে না।

– নাহ্, তার আর চান্স নেই। মিঠাইওয়ালার পদক্ষেপের সঙ্গে ছন্দ রেখে একটা বাজনা হলে জমে যেত।

– যদি কিছু মনে না করেন, আমি একবার চেষ্টা করব?

– বলো কি? ওই দেখো আমার তো মাথাতেই ছিল না তুমিও তো ভালো সেতার বাজাতে পারো! তা বাজাও দেখি।

যেমন বলা তেমনি কাজ। আধঘন্টার চেষ্টায় সুব্রত একটা সুর সেতারে বাজিয়ে শোনালো মানিককে। একবারেই পছন্দ হয়ে গেল মানিকের। সুব্রতর এই অবদানটাই বাকি ছিল শুধু।

এবার সামনে শুধুই এডিটিং!

~~~♦ পর্ব ৬ ♦~~~

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

প্রচ্ছদ ~ সৌমিক পাল

|| তথ্যসূত্র ||

১. আমাদের কথা – বিজয়া রায়
২. বিষয় চলচ্চিত্র – সত্যজিৎ রায়
৩. প্রবন্ধ সংগ্রহ – সত্যজিৎ রায়
৪. একেই বলে শুটিং – সত্যজিৎ রায়
৫. সত্যজিৎ রায়, বিশ্বজয়ী প্রতিভার বর্ণময় জীবন – অরূপ মুখোপাধ্যায়
৬. পরশমানিক – অরুণেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৭. আমি আর ফেলুদা – সন্দীপ রায়
৮. সত্যজিৎ রায়ের চিঠি, অশোককুমার দাস কে লেখা – দেশ শারদীয় ১৪২৩
৯. সত্যজিৎ ভাবনা – উজ্জ্বল চক্রবর্তী
১০. সত্যজিৎকে নিয়ে – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
১১. এখন সত্যজিৎ – গুপী গাইন বাঘা বাইন সংখ্যা – নভেম্বর ২০০২
১২. দেশ – সত্যজিৎ সংখ্যা
১৩. রবিবাসরীয় – সত্যজিৎ স্পেশাল
১৪. সত্যজিতের নারীরা – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৫. আজব ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৬. সত্যজিৎ রায় সংখ্যা – এপ্রিল ২০১৫ – আনন্দলোক
১৭. My years with Apu – Satyajit Ray
১৮. Portrait of a Director : Satyajit Ray – Marie Seton
১৯. Our Films Their Films – Satyajit Ray
২০. Manikda, Memories of Satyajit Ray – Nemai Ghosh
২১. Deep Focus, Reflections on Cinema – Satyajit Ray
২২. Satyajit Ray at Work – Bijoya Ray
২৩. Through The Eyes Of A Cinematographer: A Biography Of Soumendu Roy – Devapriya Sanyal
২৪. The Master And I – Soumitra Chatterjee
২৫. www.satyajitray.org
২৬. Ravi and Ray – Times of India
২৭. Renoir in Calcutta – Satyajit Ray
২৮. Satyajit Ray: The Inner Eye: The Biography of a Master Filmmaker – Andrew Robinson
২৯. My Adventures with Satyajit Ray – The Making of Shatranj Ke Khiladi – Suresh Jindal

One thought on “মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৫ ~ সুর হবে তাল হবে

Leave a Reply