রেহেম

Conversation, Facts, Freedom, Friends, Love Story, Marriage, Protest, Rebel, Short Story, Story, বাংলা

করাচি থেকে ‘জিয়ারত’ যাবার দুটো পথ আছে। একটা হায়দেরাবাদ হয়ে শিকারপুরের ওপর দিয়ে। সেটায় যোগাযোগের সুবিধে বেশি, তাছাড়া রাস্তাও ভালো। আরেকটা হল খুজ্দার, মাসতুং পেরিয়ে। রাস্তা এখানেও খুব খারাপ নয়, কিন্তু পুরোটাই পাহাড় কেটে বানানো আর আবহাওয়া বেশ খানিকটা শুকনো। গনি অবশ্যি সেটাই বেছে নিয়েছিল। প্রথম কারন, বাখ্তাজা শীত ভালোবাসে, আর ডিসেম্বরের করাচিতে এখনো এমন ঠান্ডা পড়েনি যে আরবসাগর থেকে বয়ে আসা লোনা বাতাসকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায়। দ্বিতীয় কারনটা হচ্ছে এই রাস্তায় বসতি কম, ফলে চেনা লোকের সংখ্যা আরো কম। এই রাস্তায় এমন কোনো বড় শহর নেই যেখানে গনি অথবা বাখ্তাজা আগে কোনদিন এসেছে। তবুও ‘কোয়েটা’ পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত মোবাইলটা অফ করে রেখেছিল গনি। বাসরাস্তার দুদিকে আদিগন্ত লালচে মাটি আর কাঁটাগাছ দেখতে দেখতে বাখ্তাজা বলেছিল তাকে, ‘ধরো যদি আমরা পথে কোথাও নেমে যাই? এইখানেই?’

– ‘এখানে কেন? জিয়ারত যাবনা?’, ভারী অবাক হয়েছিল গনি। 

– না, গেলেই বা কী! এখানে একটা ছোট্ট বাড়ি বানিয়ে থাকতে পারিনা? 

– এখানে? কী করব আমি? একটা শহর নেই এখানে!

– শহর লাগবে না, ছোট্ট গ্রাম হলেও চলবে। তুমি একটা দোকান দেবে, আর আমি জল আনতে যাব দূরে কোথাও। কেমন হবে বলো?

মুখ ব্যাজার করেছিল গনি, ‘কিচ্ছু ভালো হবেনা। আমি দোকানে থাকব, আর তুই জল আনতে জাবি দূরে!’

খিলখিলিয়ে হেসে গনির সীটের দিকে হেলে এসেছিল বাখ্তাজা। তার সোনালী চুল লুটিয়েছিল গনির কপাল ছুঁয়ে। সে কেঁপে উঠেছিল অল্প। 

কোয়েটা’তে যখন ওরা নেমেছিল, তখন সন্ধ্যে হবে প্রায়। বাস থেকে নামতেই ওরা বুঝতে পেরেছিল ঠান্ডা কাকে বলে! বাখ্তাজা অবাক হয়ে দেখেছিল চারদিকে, ছোট ছোট ইঁটের বাড়ি, একতলা খুব বেশি হলে দুই। বাড়িগুলোর পিছনে বাগান খানিকটা করে, দূরে কালো পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তার ওপরটা এই আবছা আলোতেও স্পষ্ট, বরফে ঢাকা। গনি ভালই জানত ওর কতটা ভালো লাগছে কিন্তু আরেকটু ধৈর্য ধরতেই হতো। তাই ইশারায় বোরখাটা নামিয়ে মুখটা ঢেকে নিতে বলেছিল সে। নিজেও একটা টুপি বের করেছিল ব্যাগ থেকে যেটা দিয়ে মুখের প্রায় অর্ধেকটাই ঢাকা পড়ে।

*****************

আব্বু খাবার খেতে ডাকছিল, গনি গেলনা। কী হবে গিয়ে? আগে তো কোনদিন এভাবে ডাকেনি! খাবারে তার রুচি নেই আর, প্রয়োজন আছে বলেও বোধ হয়না। পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো সে, ছাদের দরজাটা হাট করে খোলা রয়েছে কেন? দরজার বাইরে খোলা আকাশের নীচে পা রাখতেই কারনটা বোঝা গেল। হায়দরচাচা এসেছে ওপরে, পানিট্যাঙ্কির পাশে দাঁড়ানো আবছা ছায়াটা তারই। চাচা নিশ্চয় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার দিকেই কিন্তু গনিকে ছাদের কিনারে যেতে দেখেও কিছু বলছেনা কেন? ওকে আটকানোর কথা না হায়দরচাচার? ভেবে কী লাভ! তার চেয়ে উল্টোদিকের কোনাতে গিয়ে দাঁড়ানো যাক একটু। দুদিন আগে গোল থালার মত চাঁদ ছিল, সেদিন কোয়েটাতে আকাশও ছিল ঝলমলে। আজ চাঁদ কমে এসেছে, তার সাথে আকাশের আলো। এই কোনাটা থেকে বাখ্তাজাদের দোতলার একটা ব্যালকনি দেখা যায়, আর দেখা যায় তার নীচে, বাড়ির পিছনদিকে লওম্বা জমিটার কিছুটা, যেখানে বাচ্চাবয়সে ওরা ‘ল্যাংড়ি পালা’ মানে কিত্কিত্ খেলতো একসাথে। তখন ওরা প্রাইমারী স্কুলে, গনি ক্লাস ফাইভ আর বাখ্তাজা সবে টু’তে। স্কুল থেকে একসঙ্গেই ফিরত দুজনে। কিছুদিন পর হটাৎ করেই গনিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল মেহরাবপুর, হায়দরচাচার কাছে গিয়ে পড়াশোনা করতে। ফাইনাল দিয়ে গনি যতদিনে ফিরে আসে তখন বাখ্তাজার আব্বু তিনতলা তুলে ফেলেছে। কী করে জানি সে এই স্বল্পবিত্ত মহল্লায় বেশ রইস হয়ে বসেছিল! দুপুরের দিকে একদিন সে বাড়িতে লাইন ফল্ট। ইদানীং আর তেমন বাতচিত না থাকলেও, পাশের বাড়ির গনি যে বোহরি বাজারে একটা ইলেকট্রিক দোকানে কাজ শিখছিল সেটা ওবাড়িতে অজানা ছিলনা নিশ্চয়। মেইন ফিউজটা জুড়ে দিয়ে সবকটা কামরায় ঢুকে লাইন চেক করতে গিয়ে, বাখ্তাজার সাথে দেখা হয়ে গেছিল গনির। পাক্কা তিন’বছর পর! আশ্চর্য, আগে কোনদিন খেয়ালই করেনি সে, বাখ্তাজার চোখদুটো অপূর্ব বাদামী! অদ্ভুত, যে মেয়েটার সাথে গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকত সে, তার ত্বকটা এমন আপেল রং সে জানতই না! গনি অবাক হচ্ছিল কারণ সে ভেবে পাচ্ছিল না যে মেয়েটার সাথে তার চিমটি কাটা আর চুল টানাটানি হত রোজদিন তার চুলটা এরম সোনালী কী ভাবে হয়ে গেল! মিষ্টি একটা আতরের গন্ধও আসছিল যেন কোত্থেকে নাকি সেটা মনেরই ভুল?

*****************

ভাগ্যিস কোয়েটা জায়গাটা পাহাড়ী এলাকায় তার ওপর শীতকাল তাই বোধহয় বাখ্তাজা আর গনি একটা আস্তানা পেয়ে গেছিল। নাহলে আঠারোর সদ্যযুবকের সাথে একটা পনের-ষোলোর মেয়ে রাত কাটানোর মত ঘর খুঁজছে এই উপমহাদেশে এর চেয়ে বড় অপরাধ আর হয়না যেন এমন তোলপাড় পড়ে যেতে পারত। ঘর যেটা পাওয়া গেছিল সেটা আসলে চিলেকোঠা, পাশেই তিনতলার ছাত, সেখান থেকে উত্তুরে হাওয়া নিয়মিত ঢুকছে দরজা জানালার ফাঁক দিয়ে। তবু, জিয়ারত যাবার সরাসরি বাসটা মিস করার পর গনি আর কোনো চান্স নিতে চায়নি। সে জানত তখন কোয়েটা ছেড়ে জিয়ারত এর দিকে আরো এগোনো মানে ‘বস্তান’ এ রাত কাটানো। জায়গাটা আর্মির কন্ট্রোলে, তার চেয়ে শান্তিপুর্ন মাঝারি শহর কোয়েটা’ই ভাল।

ঘরের দরজাটা ঠিক করে লাগানো আছে কিনা চেক করে নিয়ে চারপাইটা টেনে তার সাথে সেঁটে দিয়ে দরজাতে হেলান দিয়ে বসেছিল গনি। আরেকপ্রান্তে রাখা চৌকি আর বিছানাটা বাখ্তাজার জন্যে থাক, সে এখানেই রাত কাটিয়ে নেবে। চোখেমুখে পানি দিয়ে এসে তার দিকে তাকিয়েছিলো বাখ্তাজা, “তুম কেয়া সোচ রাহে হো?”

‘কিছু না’, ব্যাগ থেকে মোবাইলের চার্জারটা বের করতে করতে জবাব দেয় গনি। বাখ্তাজা তাও কাছে আসে, গনির খসখসে হাত স্পর্শ করে ওর লিলির মত নরম আঙুল। 

‘ফোন এসেছিল রে…’, বলে আবার চুপ করে গেছিল গনি। বাখ্তাজা কথা বলে না, চোখে প্রশ্ন ঘনায় খালি। গনি বলে আবার, ‘তোর আব্বা আমার আব্বুকে রাজি করিয়েছে বলল। আমাদের নিকাহ দিয়ে দেবে, ফিরে গেলে।’

– ‘আমি বিশ্বাস করিনা’, বাখ্তাজা তার জবাব দিয়েছিল যথেষ্ট কঠিনস্বরে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি ভাইজানকে বলার পর আব্বা কিভাবে অপমান করেছিল ভুলে গেছো?’

– সেটা ভুলে গেলে খোয়াবেও তোকে নিয়ে এতদূর আসতে পারতাম না। কিন্তু ফিরে আসার কথাটা আব্বু বলেনি আমায়, তোর ঘরের কেও না, বলেছে হায়দরচাচা। 

এই চাচার সাথে গনির কতটা ভালবাসার সম্পর্ক সেটা বাখ্তাজা জানত ভালো করেই। তাছাড়া হয়তো মহল্লাওয়ালাদের চাপে পড়ে এতদিন পয়সার গুমর দেখানো তার আব্বাও মেনে নিয়েছে সত্যিই। হতেই তো পারে, গনি তো খারাপ ছেলে নয়, নিকাহ হলে মেয়ে ভালোই থাকবে, এটা তো আব্বা জানেই। তবু সে নিশ্চিত হতে পারেনা। ‘এক কাজ কর’, গনি বলেছিল আবার, ‘আবার ফোন আসতে পারে, তুমি নিজেই কথা বলে নাও না।’

*****************

ছাদের পশ্চিমদিকে দাঁড়িয়ে এখনো অবাক হচ্ছে গনি! এইভাবে তার আব্বু, বাখ্তাজার আব্বা তাদের ধোঁকা দেবে সেটা বিশ্বাস করতে এখনো কষ্ট হচ্ছে তার। বাখ্তাজা ঠিকই বলেছিল তাহলে। এর চেয়ে একটা নতুন জায়গাতে নিজেদের মত সংসার বাঁধলে কেমন হত ভেবে মনখারাপ করে আর কী হবে! আগের রাত্রে ঘুমোতে পারেনি সে ঠিক করে, বাখ্তাজার গলার চাপা আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিল সে রাতভর। আজ সকাল থেকে অবশ্যি আর কোনো আওয়াজ নেই, কোথায় বন্ধ করে রেখেছে কে জানে। মহল্লায় ফেরার পর ভাইজান যখন বাখ্তাজাকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে চলে যাচ্ছিল শেষবারের মত গনির দিকে সে তাকিয়েছিল একবার। বাখ্তাজার চোখে কী ছিল গনি জানে না, ভয়, রাগ, ঘৃনা, দুঃখ? নাকি ওটাই প্রেম? সে বুঝতে পারেনি। শুধু নিজের ভবিতব্যটা অনুমান করেছিল, যখন ওখানে দাঁড়িয়েই তার আব্বু, বাখ্তাজার আব্বাকে বলেছিল, ‘তুম আপনা দেখলো, কাল কে বাদ ইস মহল্লা মে মেরা ইস বেটেকা টুকড়া ভি নাহি জিয়েগা।’

আজ বিকেলে হায়দরচাচা আব্বুকে বলার চেষ্টা করেছিল, তাকে নিয়ে মেহরাবপুর চলে যাবার কথা, আব্বু কথা বাড়ায়নি। বলেছিল, ‘ইতনা সমঝ লো উসকি মউত অভি উসকি জিন্দেগী সে জ্যাদা কিমতি হ্যায়।’ 

গনির ঘোর কাটলে সে দেখল হায়দরচাচা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো কথা না বলে তার কাঁধে একটা হাত রেখে, হাতে গুঁজে দিল কয়েকটা প্লাস্টিকের মোড়ক। মুঠো খুলে গনি দেখল, কয়েকটা মিন্ট টফি। ফাইনাল টেস্টের আগে চাচা রোজ একটা করে টফি দিত তাকে, তার খুব প্রিয় ছিল এগুলো। গনি কিছু বলতে চেষ্টা করেছিল, তার কন্ঠ অন্ধকারে ফুঁপিয়ে উঠল একবার। একবারই। 

নীচে নেমে বেহেনদের কামরায় গেল সে। এক এক করে, সবার কাছে। সবচেয়ে ছোটটা, আটবছর বয়েস যার, তাকে টফিগুলো দেবার সময় সে ভাইজানের হাতটা আঁকড়ে ধরল হটাৎ। হায়দরচাচা কিছু না বলে দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল। গনি নিজের ঘরে বসে রইল, অপেক্ষায়। একটু পরে আব্বু এল, সঙ্গে আরো কয়েকজন। গনি জানালায় দাঁড়িয়েছিল, পিছন থেকে ওর চোখ বেঁধে দেওয়া হল প্রথমেই, তারপর হাত আর মুখ। খালিপায়ে হাঁটিয়ে আনা হল বাড়ির বাইরে, বেশ খানিকটা। কে একটা গায়ে অনেকগুলো সরু তার জড়িয়ে বেঁধে দিল ওকে। তারপর ধাক্কা মেরে ফেলে দিল মাটিতে।

প্রথমবার যেদিন বোহরি বাজারে ইলেকট্রিকের দোকানে কাজে ঢুকেছিল, চারবার শক খেয়েছিল গনি। কিন্তু সেটা হাতের আঙ্গুলে। আজ প্রথম শকটা তার পুরো শরীর দিয়ে অনুভব করল সে। মিনিটখানেক কেঁপেছিল নিশ্চয় সে। তারপর আরেকটা। এসি কারেন্ট, কাঁপুনি থামলে, আরেকবার। চার পাঁচ বারের পর সে বুঝতে পারল কাঁপুনির চোটে তার চোখের বাঁধা কাপড়টা খুলে গেছে, চোখটা অন্ধকারে সইয়ে নেবার আগেই আরেকবার ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল তার সারা দেহ। তবু পাশ ফিরে তাকানোর চেষ্টা করল গনি। ওপরের দিকে একটা ব্যালকনি দেখা যাচ্ছে না? বাখ্তাজার ব্যালকনি! তার মানে সে এখন ওদের বাড়ির পিছনের লম্বা জমিটায়! এখানে শর্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে তার ৩২ টা বাউন্ডারী ছিল। আরেকবার বিদ্যুত খেয়ে তার শরীরটা পুরো থরথর করে কেঁপে প্রায় উপুড় হয়ে গেল। এবার মুখ তুলে জমিটার শেষ মাথায়, বাউন্ডারী লাইনের কাছে সে মাটির ঢিপি দেখতে পেল একটা। সেটার পাশেও অনেক তার রাখা, পাকিয়ে পাকিয়ে। আর মাটির ওপর একটা সাদা ফিনফিনে কাপড়, যেন কেউ শুয়ে আছে তার নীচেই। হটাৎ গনির শীত লাগতে শুরু করল খুব। একবার গলা ছেড়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়! ওই সাদা কাপড়টার নীচে… বাখ্তাজা কে কাল রাত্রেই… আরেকবার গনির দেহজুড়ে প্যাঁচানো তারগুলো দিয়ে বয়ে গেল ইলেকট্রনের স্রোত। তাও বেঁচে আছে সে… একবার মাথা তোলার চেষ্টা করল, পারলনা। কেউ একটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। চেনা মিন্টের সুবাস বয়ে আসছে, জিয়ারত থেকে বরফঠান্ডা বাতাস এসে জুড়িয়ে দিচ্ছে তার আনত শির। খুব কাছে এসে তার প্রিয় একটা কন্ঠ কানে কানে কিছু বলছে আর তার বুকে একটা গরম ধাতব স্পর্শ ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে আরো অতলে… ‘রেহেম গনি বেটা.. রেহেম’। 

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ সপ্তর্ষি বোস

প্রচ্ছদ ~ dailypak.com

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

তথ্য সূত্র 

Leave a Reply