লাফিং বুদ্ধ

Childhood, Conversation, Friends, Short Story, Story, Supernatural, Thriller, বাংলা

নির্জন নিরালা এই ঘাটটা আমার বরাবরই পছন্দ। গঙ্গার এই ঘাটে সন্ধ্যেটা আমি প্রায়দিনই কাটাই। আজকেও পুরনো শ্যাওলাধরা এই রকের ওপর বসেই সন্ধ্যেটা উপভোগ করছিলাম। কিন্তু বাধ সাধল আজকের আবহাওয়াটা। বিকেল থেকেই কালো করে আসছিল আকাশ, গুম গুম দু চারটে গর্জনও শুনতে পেয়েছিলাম বলেই মনে হয়, কিন্তু হঠাৎ করেই উঠে যাওয়া এই ঝড়টা আমি এক্সপেক্ট করিনি। যাই হোক, মন্দের ভাল। বিকেলের গুমোট ভাবটা কেটে গেল ঝড়ের সাথে সাথেই।
জোয়ার অনেক ক্ষণ চলে গিয়েছিল, দেখলাম জল ধীরে ধীরে পিছু হাঁটতে শুরু করেছে। বুঝলাম, ভাটার টান। দূরে দুটো ভটভটির লাল টিমটিমে আলো জ্বলতেও দেখলাম। কিন্তু, ভাটার জলের টানে এতক্ষণ যে জিনিসটা দেখতে পাইনি, সেটা দেখতে পেলাম। একটা লাল ওলটানো লাফিং বুদ্ধের মূর্তি। ঘাটের পাশে যেখানে ঠাকুরের কাঠামো, ঘাটকাজ আর বিভিন্ন ইটের ছাই আর গঙ্গার পলিমাটি জমে একটা আধখাপছাড়া ঢালু জমি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে মূর্তিটা উল্টে বসানো। বহুদিন ধরেই বসানো ওটা, কারন যখন থেকে এই ঘাটে বসে থাকছি, ততদিনই ঐ মূর্তিটাকে আমি দেখেছি জোয়ার-ভাটার সময়। কেউ হয়ত ওটাকে বসিয়ে রেখে গেছে অমঙ্গল এর প্রতীক বলে, বা হয়ত মূর্তিটা ভাঙ্গাচোরা। তাই ওটাকে ভাসিয়ে দিয়েছিল কেউ, শেষে জলের স্রোতে এখানেই ওর ঠাই হয়েছে।

অনেকদিন ধরেই তো মূর্তিটা দেখছিলাম ঘাটে পড়ে, আজকে কেন জানি না, বেশ কৌতূহল হল। পা টিপে টিপে নামলাম ঐ ঘাটের পাশের মাটিতে। হাঁটতে হাঁটতে পা বসে যাচ্ছিল না যে, তা নয়। তবে মূর্তিটা তুলতে গিয়ে বুঝলাম অনেক দিন ধরে থেকে যাওয়ার জন্য মাটিতে শক্ত হয়ে বসে গেছে। গায়ের জোরে যখন তুললাম, তখন রীতিমত ঘাম দিচ্ছে। কোন সাধারন মাটির মূর্তি এত ভারি হতে পারে, জানতাম না। যাই হোক, গঙ্গার জলেই ভাল করে ওটার গায়ে লেগে থাকা কাদা পরিষ্কার করে ওটাকে হাতে তুললাম। এতক্ষণে ওটা বেশ চকচকে দেখাচ্ছে, আর বেশ সুন্দরও লাগছে। শুধু একটা হাতের কনুইয়ের জায়গাটা ভাঙ্গা।

“বেশ ভালই লাগছে। তাই না?” ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক ঘাটে বসে আমার হাতের মূর্তির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছেন।

ভদ্রলোকের গায়ে সাদা শার্ট, পরনে ছাই রঙের অফিস প্যান্ট, মুখে এক সৌম্য হাসি। হাতে একটি ব্রিফকেস। আমি যখন মূর্তিটা তুলছিলাম, তখনই বোধ হয় ইনি আমার কাণ্ডকারখানা দেখছিলেন। লজ্জা পেল। কেন জানি না, এই শিশুর মত কাজটা করেও বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম। তাই বলেও ফেললাম, “হ্যাঁ, এখান থেকে তো কুড়িয়ে পেলাম। বাড়ি গিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে দেব ভাবছি।”

ভদ্রলোক যেন মজা পেলেন কথাগুলোতে। মৃদু হেসে বললেন, “বাড়ি নিয়ে যাবে? তুমি তো ছোট। এইটা বয়ে নিয়ে যাবার মত ক্ষমতা আছে তোমার দাদুভাই?”
“কেন পারব না? ষোলয় পড়েছি, নিশ্চয়ই নিয়ে যেতে পারব।”, আমি একটু অবাক হয়েই জবাবটা দিলাম।

ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। “না দাদুভাই, ওটা নিয়ে যাওয়া তোমার বোধহয় উচিত হবে না। ওটার সাথে খুব বেদনাদায়ক একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই আমি বলি কি, ওটা যেখানেই আছে, থাক না। ক্ষতি কি?”

আমার রাগ হল। আমি বললাম, “আমি তো এটা অনেকদিন হল এখানে দেখছি। কেউই এই মূর্তিটাকে তোলে না। আমি তাই তুলে নিয়েছি। অসুবিধা কোথায়? আমি তো আর কারোর জিনিস চুরি করছি না।”

ভদ্রলোক খুব বিষণ্ণ ভাবে বললেন, “না গো, ওটা একদিন একজনেরই জিনিস ছিল। আজ… ঠিক আছে, তুমি নিতে চাইছ যখন নিয়ে যাও,” ভদ্রলোকের মুখে একটা রহস্যময় হাসি দেখা দিল, “কিন্তু আমার ধারনা তুমি ওটা বাড়ি নিয়ে যাবার আগেই এখানে আবার এসে ফেরত দিয়ে যেতে হবে। নিয়ে যেতে বোধহয় বিতান দেবে না।”

“বিতান? সে কে?”, আমি জিজ্ঞেস করলাম কৌতূহলী হয়ে।

“আমার নাতি। তারই অনেক ভালবাসার মূর্তি ওটা। আমিই কিনে দিয়েছিলাম ওকে এটা।”, অনেক দূর থেকে ভদ্রলোকের গলার স্বর ভেসে আসছে বলে মনে হল আমার।

“তাহলে এটা এখানে কেন? আর আপনি এটা তুলেও নিয়ে যাননি কেন যখন এটা আপনাদেরই জিনিস?”
আমার চোখেমুখে অবিশ্বাসের চিহ্নটা বোধহয় খুব বেশিই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, কারন ভদ্রলোক হেসে উঠলেন। বললেন, “ঐ তো বললাম, কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। জানি বিশ্বাস করছ না, কিন্তু এটাই সত্যি। আচ্ছা নিজেই আজকে দেখে নিও। আমি কিছু বলব না।”

আমি আর বাক্যব্যয় না করে হেঁটে বাড়ি ফেরা মনস্থির করলাম। আর বেশিক্ষণ থাকলে এই মূর্তিটাও আমি বোধহয় ভদ্রতার খাতিরে দিয়ে বসব, যেখানে ভদ্রলোকের কথা সত্যি কি মিথ্যে কিছুই জানি না। তাই এক এক পা করে বাড়ি ফিরতে লাগলাম। দেখলাম, ভদ্রলোক আমার দিকে আর চেয়ে রইলেন না, বরং দৃষ্টি তাঁর গঙ্গার দিকে।

ঘাটটা পেরিয়ে ডান পাশে মা কালীর মন্দির। তারপর ডানদিকে একটা লোহালক্কড়ের কারখানা, আর বাম দিকে একটা ইটখোলা। তার মাঝখান দিয়েই রাস্তা চলে যাচ্ছে জি টি রোডের দিকে। বড় রাস্তা টপকেই দশ মিনিটের হাঁটা রাস্তা আমার বাড়ি। জি টি রোডটা পেরিয়ে গেলাম বিনা ঝঞ্ঝাটেই, কিন্তু তারপরেই গোলমাল হতে শুরু করল। থেকে থেকেই মনে হতে লাগল, কেউ যেন আমার হাত ধরে পেছনে টান দিচ্ছে। যতবারই পেছনে তাকাই, কেউ নেই। অথচ পরিষ্কার মনে হতে লাগল, কারোর অদৃশ্য দুটো চোখের নজরেই আমি রয়েছি। অস্বস্তি হতে লাগল।
গ্লোবাল সাইবারনেট ক্যাফেটা পেরিয়ে যেতেই মনে হতে লাগল, মূর্তিটা আবার আগের মত ভারি হতে শুরু করেছে। প্রথমে এক হাতেই তুলে আনছিলাম, কিন্তু তারপর দুহাত লাগাতে লাগল। তারপর মিশ্রবাড়ীটা পেরোতে পেরোতে তো সত্যি সত্যিই মনে হতে লাগল, সকালে যে পাঁচ লিটারের জলের জারগুলো বই, সেরকম আট-দশটা জার যেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

মনে জেদ চেপে গিয়েছিল। যেভাবেই হোক, নিয়ে যাব এই মূর্তিটাকেই। কিন্তু রাস্তার তেমাথাটা পেরোনোর সময়, পাশে গ্রিন পেপার রেস্তোরাঁর কাচের দরজাটায় যেটা দেখলাম, সেটা দেখে আপনা থেকেই একটা আর্তনাদ গলা দিয়ে বেরিয়ে এল।

দেখলাম, আমার প্রতিচ্ছবিই আমার দিকে তাকিয়ে আছে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে। আর কারন? সে তো খুবই পরিষ্কার ভাবেই দেখতে পাচ্ছি। আমার হাতে আমার লাফিং বুদ্ধ, আর ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা দশ বারো বছরের ছোট ছেলে। পরনে হাফ প্যান্ট আর ব্রাউন শার্ট। কিন্তু এ কি অবস্থা তার! সারা গা দিয়ে জল ঝরছে, গায়ে, মাথায়, চুলে পাঁক লেগে রয়েছে, আর তারই দুই হাতে মূর্তিটা ধরা। ছেলেটা এতক্ষণ মাথা নিচু করে তাকিয়ে ছিল, এবার আমার দিকে তাকাতেই আমার গলা দিয়ে আর্তনাদটা বেরিয়ে এসেছিল। কারন ছেলেটার চোখ নেই, তার জায়গায় দুটো কালো গর্ত। পুরো মুখটা ফোলাফোলা, সাদা, রক্তহীন আর মুখোশের মত, যেমন অনেকদিন ধরে জলের তলায় থাকলে মানুষের চামড়াটা হয়ে যায়। মাছে ঠুকরে ঠুকরে খেয়েছে তার মুখের অনেক জায়গায়। দু চার জায়গায় গালের চামড়া সরে গিয়ে গর্ত হয়ে গেছে।
হঠাৎ করেই মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার কি করনীয় বুঝতে পারলাম।

মূর্তিটা হাতে নিয়েই ছুটতে শুরু করলাম। ঝড় পুরোদমে চলছে, চারদিক থেকে শুকনো পাতা, ধুলো উড়ে এসে পড়ছে চোখে মুখে। জি টি রোডের ওপর ছুটতে ছুটতে খেয়ালও করিনি পাশ দিয়ে দুখানা গাড়ি বিদ্যুতগতিতে বেরিয়ে গেল, ড্রাইভার দুটো জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে মুণ্ডুপাত করল। কিন্তু কোনও পরোয়া নেই। কারন এতক্ষণে আমার চেতনা ফিরেছে। এই ভয়ঙ্কর বিপদের হাত থেকে যত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাওয়া যায়, ততই ভাল।

ঘাটে পৌঁছতেই দেখলাম ভদ্রলোক যেন আমার অপেক্ষা করেই দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই বিষণ্ণ হাসি। ওনার দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে দৌড়ে সিঁড়িগুলো বেয়ে নেমেই শেষ চাতালটা থেকে সর্বশক্তিতে মূর্তিটা ছুঁড়ে দিলাম গঙ্গার জলে। ঝপাস করে একটা শব্দ করে লাফিং বুদ্ধমূর্তিটা ডুবে গেল।

হাঁপাচ্ছিলাম তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, “বিতানকে দেখতে পেয়েছ?”

আমি হাঁপাতে হাঁপাতেই বললাম, “ওটা বিতান? ও তো একটা… ভূত।”

আমার নিজেরই বলতে কেমন একটা লাগছিল, কিন্তু নিজের চোখকেই বা অস্বীকার করি কি করে? ছুটতে ছুটতেই যতবার ঐ কাচের দরজায় দেখা দৃশ্যটা মনে পড়ছে, ততবার শিউরে উঠেছি ভেতর থেকে।

ভদ্রলোক বিষণ্ণভাবে হেসে বললেন,“ সেটা ঠিক। বিতান আর বেঁচে নেই। এই ঘাটেই ওকে নিয়ে একদিন এসে বসেছিলাম, ওর সাথেই মূর্তিটা ছিল। কোনও ভাবে মূর্তিটা গড়িয়ে জলে পড়ে যায়, আর ও সেটা ধরতে গিয়ে পা স্লিপ করে পড়ে যায়। আর সেদিন দুর্ভাগ্যবশত বানও এসে গিয়েছিল বলে জলের টানে অনেক দূর চলে গিয়েছিল, তাই আমিও জলে ঝাঁপ দিয়ে ওকে তুলতে পারিনি।”, শেষদিকে ওনার গলার স্বর ধরে যায়।

কিছুক্ষণ ধরে আমরা দুজনেই চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঝড় তখনও থামেনি, সাঁই সাঁই করে হাওয়া বইছে। ঘাটের পাশে জঙ্গলটা আর বাদাম গাছটা দুলে উঠছে ঝড়েতে। তারপর এই নীরবতা ভেঙ্গে আমিই প্রথম বললাম, “ওর বডি পাওয়া গিয়েছিল?”

বলতেই ভদ্রলোক আমার দিকে তাকালেন সোজা দৃষ্টিতে। সে কি তীব্র দৃষ্টি! ঝোড়ো হাওয়ায় ওনার শার্টটা সরে সরে যাচ্ছিল। একটা রহস্যময় হাসি হেসে উঠলেন উনি। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম এক অজানা ভয়ে। কেন জানিনা মনে হচ্ছিল, এখান থেকে পালিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।

“বডি? নাহ, ওরটা পাওয়া যায়নি। তবে অন্যটা এখান থেকে মাইলখানেক দূরেই, বালি ব্রিজের তলা থেকেই পাওয়া গিয়েছিল।”, ভদ্রলোকের কথা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।

“ক…কার বডি ছিল ওটা?”, আমার অবচেতন মন এতক্ষণে যেটা বুঝতে পেরে গিয়েছিল, সেটাই যে বাস্তব হতে চলেছে, সেটা বুঝতে পেরেই কথার স্বর আটকে যাচ্ছিল।

“আমারই, দাদুভাই।”, একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভেসে এল।

আকাশে ঠিক তখনই একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। বিদ্যুতের স্পষ্ট সাদা আলোয় দেখলাম, আমি একাই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি। আর কেউ নেই। কোথাও নেই ত্রিসীমানায়। শুধু যেখানে উনি বসে ছিলেন, সেখানেই, ঠিক সেখানেই লাল রঙের লাফিং বুদ্ধটা বসে আছে, যার একটা কনুই অল্প ভাঙ্গা। যেটাকে জলে ছুঁড়ে দেওয়া সত্ত্বেও অলৌকিক কোন শক্তিতে উঠে এসেছে ঘাটে। আর আমার চোখের সামনেই যে ঢালু জমিটা থেকে একটু আগেই আমি ওটাকে তুলে এনেছিলাম, সেদিকেই ওটা নিজে থেকে এগিয়ে যাচ্ছে …

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ স্পন্দন চৌধুরী

প্রচ্ছদ ~ mercurytreasures.com & others

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply