মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৬ ~ আহা কি আনন্দ

Anirban & Arijit, Biography, বাংলা, মানিকের পাঁচালী

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

হাতে আর মাত্র তিন সপ্তাহ!

প্যান অ্যাম বিমান কোম্পানির সাথে পাকা কথা বলে নিয়েছে অনিল। ওরাই উদ্বোধনের ঠিক আগেই ছবির প্রিন্ট সযত্নে পৌঁছে দেবে নিউ ইয়র্কে মনরো হুইলারের হাতে। অ্যাড এজেন্সি জে ওয়ালটার টমসনের ম্যানেজার চার্লস মুরহাউসের সাথে সুভাষ ঘোষাল কথা বলে ঠিক করেছেন প্যান অ্যাম কেই এর দায়িত্ব দিলে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। টমসন কোম্পানির বড়কর্তার মেয়ে অ্যান রেজর আবার মনরোর বন্ধু, সেও আশ্বাস দিয়ে রেখেছে যে প্রিন্ট ঠিক সময়ে এসে যাবে। কিন্তু, তার আগে এই তিন সপ্তাহের মধ্যেই তো শেষ করতে হবে ফাইনাল এডিটিং!

দুলাল দত্ত। ফিল্ম এডিটিং এ একেবারে অজ্ঞ না হলেও খুব যে বিশাল এক্সপিরিয়েন্স তাও নয়। অজয় করের পরিচালনায় “গৃহপ্রবেশ” আর হরিদাস ভট্টাচার্যের “দেবত্র” বলে দুটো ছবিতে কাজ করেছে এর আগে। তবে সেখানে স্বাধীনভাবেই কাজ করতে পেরেছে, পরিচালক বিশেষ মাথা ঘামায়নি। এখানে প্রথম দেখাতেই মানিক স্পষ্ট করে বলে দিল দুলাল কে,

– তোমার একার হাতে ফাইনাল এডিট আমি ছেড়ে দিতে পারছি না দুলাল, কিছু মনে কোরো না। হাতে সময় খুব কম। তুমি তোমার মতই কাজ করবে, আমি শুধু সারাক্ষণ তোমার সাথে থাকব, আর হেল্প করব।

দুলালের এখন রাজি হয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। এই ফিল্মে কাজ করাই এখন একটা ভাগ্যের ব্যাপার, বিদেশে প্রদর্শিত হবে বলে কথা। শুরু হল এডিটিং। রাফ কাটগুলো খুঁটিয়ে দেখার সময় মানিকের মনে হল যে গোড়ার দিকে বেশ কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে।

– দেখেছ এই ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল টা? এটা এখানে বসারই কথা না। আর পরের সিনেই ভুল লেন্স ব্যবহার করে ফেললাম। আমারই ভুল এগুলো সব, ইনএক্সপিরিয়েন্স! ফার্স্ট হাফের থেকে সেকেন্ড হাফ বেশ পাকা হাতের কাজ মনে হচ্ছে।

– দাদা, এগুলো তো এখন শোধরানো যাবে না আর।

– নো চান্স নাউ। হাতে সময় থাকলে ভাবতাম। সেদিন আরও দুটো ব্যাপার খেয়াল করলাম। গ্রামের মেয়েরা রাতে ছুঁচসুতো দিয়ে সেলাই করে না। তাই সর্বজয়ার সিনটাতে ভুল হয়ে গেছে। আবার, গ্রামের দিকে কেউ আয়না খোলা অবস্থায় রাখে না, হয় কাপড় বা ক্যালেন্ডার দিয়ে ঢেকে রাখে। যদিও এগুলো সবই কুসংস্কার, তবুও বাস্তবতা থেকেই যায়। যাক গে, এখন আর ভেবে লাভ নেই।

দেড় সপ্তাহের মধ্যেই মোটামুটি ফিল্মের এডিট নামিয়ে আনা গেল। এবার মাত্র ১০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে সাউন্ড ট্র‍্যাক মিক্সিং এর কাজ। একটা ফিল্মের পূর্ণতা আসবে তার সাউন্ড এফেক্টে। আর “পথের পাঁচালী” তে ডায়লগ কম, তাই সুর আর শব্দ দিয়েই বাঁধতে হবে কাঠামো। যে ঘরে এই কাটিং এর কাজ শুরু হল, কয়েকদিনের মধ্যেই তা ভরে উঠল রাশি রাশি ছড়ানো ছিটানো টুকরো টুকরো ফিল্মে। বসবার জায়গাও নেই ঠিকমতো। ঘুম প্রায় উড়েই গেছে সকলের, মানিকের এনার্জির সাথে পাল্লা দিয়ে লড়ে যাচ্ছে দুলাল, আর সাথে বাকিরাও।

– মানিকদা, এবার একটু শোয়া দরকার। আপনিও একটু জিরিয়ে নিন।

– মানুষ যদি রোজ আটঘন্টা ঘুমোয়, তবে তো তার জীবনের এক তৃতীয়াংশ স্রেফ ঘুমিয়েই কেটে যায়।

এই উত্তর শুনে দুলালের মুখের অবস্থা দেখবার মতো হল। মানিকও সেই কাতর মুখ দেখে মুচকি হেসে ফেলল।

– দুর্গার এই রোগশয্যার দৃশ্য নিয়ে তুমি কিছু ভেবেছ দুলাল? বাইরে প্রচন্ড ঝড়। এখানে অনেকরকম সাউন্ড এফেক্ট লাগবে কিন্তু।

– হ্যাঁ, বেশ কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে এই ঝড় দেখানো হয়েছে। সাথে বাজ পড়ার শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, ঝোড়ো বাতাসে দরজা জানালা বারবার নড়ে ওঠার শব্দ – এই সবকটা সাউন্ডই এখানে থাকবে।

– কারেক্ট! আর সাথে থাকবে বিছানায় জ্বর নিয়ে শুয়ে দুর্গার কাতরানির আওয়াজ, সর্বজয়ার মেঝে দিয়ে তোরঙ্গ টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ।

দুলাল সাউন্ডের ফিল্ম কেটে কেটে আবার আঠা দিয়ে লাগিয়ে মানিকের নির্দেশ মতো সাউন্ড জুড়তে লাগল। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা দাঁড়াল বেশ খাপছাড়া। শব্দ ছাড়াই মনে হচ্ছে এই সিন আরও ভালো লাগছিল আগে। একে তাড়াহুড়ো, তার মধ্যে পারফেকশন, তায় বিনিদ্র রাত জাগা, কিন্তু এসবের মধ্যেও মানিকের মাথা কাজ করা বন্ধ করেনি। বেশ খানিকক্ষণ চিন্তা করে মানিক একটা আইডিয়া বের করল।

– বৃষ্টির সাউন্ডের স্ট্রিপ গুলো দাও দেখি।

দুলাল একটা মাঝারি দৈর্ঘ্যের অডিও স্ট্রিপ মানিকের হাতে দিতেই মানিক পাশ থেকে একটা আঠা নিয়ে সেই ফিল্মের দুপ্রান্ত জুড়ে ফেলল।

– এটা একটা লুপ তৈরি হল। এবার এটাকে চালাও তো শুনি। বৃষ্টির সাউন্ড লুপে ঘুরতে থাকবে, মনে হবে একনাগাড়ে বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে। এইভাবে বাকি সাউন্ড এফেক্টগুলোরও লুপ বানিয়ে নি চলো।

দুলাল হাঁ করে তাকিয়ে রইল যার দিকে, সে অলরেডি ফিল্ম নিয়ে লুপ বানাতে শুরু করে দিয়েছে। লুপ গুলোকে জায়গা মতো লাগিয়ে ফাইনাল সিনটা বানানো গেল একদম নিখুঁত ভাবে। যেখানে যতটুকু শব্দ দরকার, ঠিক ততটাই এসেছে। এদিকে রাত এখন তিনটে। ইউনিটের বাকি লোকেরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, জেগে শুধু মানিক আর দুলাল। কেউ মেঝেতে ঘুমোচ্ছে, কেউ টেবিলে, কেউ বা দু তিন খানা হাতল ছাড়া চেয়ার জোড়া লাগিয়ে অচৈতন্য।

তবে এবার আর পারলো না দুলাল। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা অজস্র ফিল্মের ওপরেই এলিয়ে পড়ল ঘুমে। মানিক হালকা করে গোটাকয়েক ঠেলা দিয়ে ডাকল, “আর মাত্র একটা দিন দুলাল।”

দুলাল চোখ না খুলেই জড়ানো গলায় বলল, “আর নয় দাদা, সত্যিই আর পারছি না।”

মানিক আর না ডেকে নিজে উঠে গিয়ে বসল এডিটিং চেয়ারে। কাল সারাদিনের মধ্যে এর প্রথম প্রিন্ট তৈরি করে পরশুদিন সকালেই ডেলিভারি। সবকিছু শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক হলে তবেই মঙ্গল। অসহ্য ঘাড়ে যন্ত্রণা হচ্ছে, বিজয়া কে বললে আর রক্ষে নেই, সব মিটে গেলে বলা যাবে ওকে। শেষ এক সপ্তাহ চোখের পাতা এক হয়নি। দুলালও মোটে আধঘন্টা ঘুমিয়েছে হয়তো এই দশ দিনে।

হঠাৎ, পিছন থেকে কাঁধে একটা হাত রাখল কেউ। চমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েই মানিক দেখে আধবোঁজা চোখে দুলাল দাঁড়িয়ে।

– চলুন…., প্রিন্টের কাজ শুরু করি।

||

প্রথম প্রিন্ট বানানোর কাজ চলল সারাদিন ধরে। শেষ হতে হতে রাত কাবার হয়ে গেল।

– মানিকদা, অল ডান!

– আহ্, ফাইনালি!

– দেখবেন নাকি একবার গোটা টা?

– সময় কই? বাইরে দেখো, ভোর হয়ে গেছে। একটু বাদেই অনিল আসবে গাড়ি নিয়ে। বিশ্বাস রাখো দুলাল, কাজ ভালোই হয়েছে। চলো এবার প্রিন্ট টা ভালো করে গুছিয়ে ট্রাঙ্কে ভরি।

বাইরে গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। অনিলের মতো সময়জ্ঞান ইউনিটের আরও কারুর নেই, ঘড়ির কাঁটা ধরে চলাফেরা করে। বচন সিং এর ট্যাক্সি নিয়েই এসে গেছে। গাড়ি থেকে নেমেই হাঁক ছাড়ল,

– মানিক দা, সব রেডি তো? কাগজপত্রের ঝামেলা আমাদের করতে হবে না আর, টমসনের অফিস থেকেই করে পাঠিয়ে দিয়েছে।

তিন চারজন মিলে ট্রাঙ্ক ধরাধরি করে তোলা হল ট্যাক্সির পিছনে। নিজের সন্তানকে যেন বিদেশে পাঠানোর তোড়জোড়। মানিক আর অনিল বসল পিছনের সিটে। ভোরের আলোতে গাড়ি ছুটে চলল প্যান অ্যামের অফিসের উদ্দেশ্যে।

||

– ও মানিক, শুনতে পাচ্ছেন? ও মানিক!

– কে! আপনি এখানে কি করছেন চুনি দি?

– আমিও যে চললুম আপনার প্রিন্ট নিয়ে, পেলেনে করে।

– কি বলছেন কি?

– সাথে এই দেখুন কাদের নিয়ে যাচ্ছি!

– সুবীর! উমা! তোমরা কোথায় যাচ্ছ সবাই?

– নিউ ইয়র্ক যাচ্ছি তো মানিক দা। তোমার ফিল্ম নিয়ে।

– অনিল কই? তোমাদের টিকিট কে করল?

– হা হা, মনরো নিতে এসেছে তো আমাদের। ওই দেখো দাঁড়িয়ে আছে।

মানিক বিস্ময়ে ঘুরে তাকালো। মনরো হুইলার দাঁড়িয়ে বোড়ালের সুবোধ দার সাথে। দাঁত বের করে একগাল হাসছে সুবোধ দা, আর তার মধ্যেই বলছে, “মানিক, এবার রুজভেল্টের সাথে দেখা হবে আমার। হা হা, কি আনন্দ, আমার জমি গুলো দেখো মানিক। সব তোমার জিম্মায় রেখে গেলুম।”

মানিকের কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। হঠাৎ বাঁদিক থেকে সুব্রত বলে উঠল “কাট বলুন মানিকদা!” সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রকান্ড এরোপ্লেন বিশাল শব্দ করে রানওয়ে থেকে উড়ে গেল আকাশে। কিন্তু রানওয়ের মাঝখানে বাঁশের খাট টা কে রেখেছে! বংশীর কাজ নাকি? কিছু বুঝতে পারছে না মানিক চারিদিকে যা ঘটছে। কে যেন খুব দূর থেকে ডাকছে মানিককে, “মানিক দা, ও মানিক দা…।” আর ঠিক তখনই পিছন থেকে কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি।

– আরে মানিক দা, আপনি রিসেপশনের কাউন্টারে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?

মানিক চমক ভেঙে দেখল অনিল দাঁড়িয়ে পাশে। সামনে প্যান অ্যামের রিসেপশনিস্টের মুখেও মুচকি হাসি। চোখ টানটান করে মানিক জিজ্ঞেস করল,

– প্লেন?

– সে তো উড়ে গেল এক্ষুণি। সব ফর্মালিটিজ ডান। “পথের পাঁচালী” এখন আকাশে, তার যে লম্বা সফর!

||

মনরোর জানানো তারিখ অনুযায়ী নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট (মোমা) -এ “পথের পাঁচালী”-র আন্তর্জাতিক উদ্বোধন হয়ে গেছে তিন সপ্তাহ আগে। কিন্তু এখনও কোনও খবরই পাওয়া গেল না ওদের কাছ থেকে। মানিককে যথারীতি আবার চাকরি জয়েন করতে হয়েছে। নিকলসন সাহেবও খুব খুশি মানিককে পেয়ে। কিন্তু মানিকের মন পড়ে আছে নিউ ইয়র্কে।

বিকেলে বাড়ি ফিরে চা খেতে খেতে বিজয়াকে বলল মানিক,

– আগে এতবার করে খোঁজ নিচ্ছিল। কিন্তু এখন কোনও পাত্তাই নেই! আশ্চর্য! ভালো লেগেছে না খারাপ লেগেছে কিছু তো একটা জানাক।

– অধৈর্য হচ্ছ কেন? ভাবছ কেন ওদের খারাপ লাগবে?

– খারাপ লাগার হাজার কারণ মঙ্কু। কেতাদুরস্ত আমেরিকানরা স্যুটে-বুটে সেজে এন্টারটেনমেন্টের আশায় ছবি দেখতে গেছে, ভারতীয় গ্রামের এক চাষি গেরস্তের ছবি তাদের কেমনই বা লাগতে পারে? তার ওপর আবার সাব টাইটেলও নেই। আমার মন বলছে এই ছবি ওদের ভালো লাগেনি। আর মনরো এই খবরটাই আমাকে দিতে লজ্জা পাচ্ছে।

এমন সময়ে নিচের দরজায় টোকা পড়তেই মঙ্কু উঠে গেল। কিছুক্ষণ বাদে ফিরে এসে মানিকের হাতে একটা সিল করা খাম দিয়ে বলল, “দেখো তো এটা, তোমার নামে এল।”

মানিক তাড়াতাড়ি খামটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে বার করল ছোট একটা চিঠি। ভাঁজ খুলে চিঠিটা দেখেই মানিকের চোখদুটো বড় বড় হয়ে উঠল। বিজয়ার দিকে চিঠিটা এগিয়ে দিয়েই উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে, “চট করে একবার ঘুরে আসি সুব্রতর বাড়ি থেকে। ওকে খবরটা দি গিয়ে।”

বিজয়া চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখল তাতে একটাই লাইন লেখা।

“আ ট্রায়াম্ফ অভ ইমাজিনেটিভ ফটোগ্রাফি!”

নিচে সাইন করা – মনরো হুইলার।

||

দুদিন বাদেই এল অ্যান রেজরের লম্বা চিঠি। তাতে ডিটেলসে লেখা উদ্বোধনের দিন দর্শকরা কতটা অভিভূত হয়েছিল এই ছবি দেখে। অ্যান-এর নিজেরও যে বিশাল ভালো লেগেছে, তা ওর লেখা পড়েই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সাবটাইটেল ছাড়াই নাকি সিনেমার আগাগোড়া সব বুঝতে পেরেছে আমেরিকান দর্শক।

মানিক চিঠি টা তুলে দিল সুব্রত আর বংশীর হাতে, মুখে একটা পরম তৃপ্তি। অনিল সকালে কাগজের অফিসে গিয়েছিল একটা কাজে, সেখান থেকে ফিরেই আগে সবাইকে নিয়ে চলে এসেছে মানিকের বাড়ি।

– মানিক দা, বিদেশে আমাদের এই ছবির সাকসেসের খবর কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। আজও আমাকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করছিল এখানে কবে রিলিজ হবে। আপনার ইন্টারভিউ ও চাইছে সবাই।

– আরে ওসব ইন্টারভিউ তে জড়িয়ে পড়লে এখন হবে না। আমাদের রিলিজ ডেট ফিক্স করতে হবে। এখন মে মাস। মোটামুটি দু-তিন মাসের মধ্যেই ছাড়তে পারলে ভালো হয়। কিন্তু আমার যে ফিল্মের বিজনেস সাইড নিয়ে কোনও নলেজ নেই। পার্সেন্টেজ, মিনিমাম গ্যারান্টি, প্রিন্ট, পাবলিসিটি, এসবের বিন্দুবিসর্গও যে আমি কিছু বুঝি না। অনিল, এই দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।

– নিশ্চিন্তে থাকুন মানিক দা, এইদিক টা আমি দেখে নিচ্ছি। তবে যেহেতু এটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রোডাকশান, তাই অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশনই এই ফিল্মের ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস পাবে। ওদের সাথে আমি যোগাযোগ করছি। তবে আপনি আগে আমাদের বলুন সেদিন আপনার কিমারের বসের কেমন লাগল এই ছবি?

– ওরেবাবা, সে তো ফ্যান্টাসটিক এক্সপিরিয়েন্স! নিকলসন জানতেন যে নিউ ইয়র্কে “পথের পাঁচালী”-র উদ্বোধন হয়েছে। তাই ওনার খুব ইন্টারেস্ট ছিল ফিল্মটা দেখার, সাথে কয়েকজন ক্লায়েন্টও বলে রেখেছিলেন। তা সেদিন ওদের দেখালাম ছবিটা। সাবটাইটেল নেই বলে আমি নিচু গলায় ওদের বলে যাচ্ছিলাম কে কী বলছে। ছবি শেষ হয়ে আলো জ্বলতেই দেখি নিকলসনের চোখ লাল, দৃষ্টি জ্বলজ্বল করছে। খুবই আন্তরিক ভাবে আমার হাত ধরে উনি ঝাঁকিয়ে দিলেন। বিদেশিদেরও যে এ ছবি ভাল লাগতে পারে, এতে যেন নতুন করে তার প্রমাণ পেলাম। সবমিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা।

– বাহ্, উনি খুবই সাপোর্টিভ বলতে হবে। আর গতকালের অ্যাডভার্টাইজিং ক্লাবের অনুরোধ টা নিয়ে কিছু ভেবে দেখলেন?

– হুমম, ওটা নিয়েই ভাবছিলাম। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এই ক্লাবের মেম্বার। “পথের পাঁচালী”-র একটা স্পেশাল স্ক্রিনিং অ্যারেঞ্জ করতে চায় ওরা। তাতে মেম্বার আর ওদের কিছু গেস্ট আসবে। অর্ডন্যান্স ক্লাবের অডিটোরিয়ামে এই স্ক্রিনিং হবে। তারপর ক্লাবের মাঠে ব্যবস্থা থাকবে বুফে ডিনারের। আয়োজন টা মন্দ হবে না মনে হচ্ছে। রিলিজের আগে এখান থেকে একটা ভালো ফিডব্যাক পাওয়া গেলে কিন্তু আমাদেরই লাভ। ওদের জানিয়েই দি যে আমি রাজি।

রিলিজের আগে নিজের শহরে ছবির প্রথম প্রদর্শনী। ছোট করে হলেও বিজয়ার কাছে এর গুরুত্ব অনেক। সাজগোজ আজ একটু ভালোমতই করতে হয়েছে। মানিকের সাথে গাড়ি থেকে নেমে ক্লাবের মেন গেট পেরিয়ে অডিটোরিয়ামে এসেই বিজয়ার চক্ষু ছানাবড়া। মানিকের দিকে তাকিয়ে দেখে সেও বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে চেয়ে সামনের দিকে। কাঠের মেঝের ওপর সারি দিয়ে চেয়ার পাতা। সেই মেঝেতে পা ফেললেই ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ বেরোচ্ছে। চেয়ারের সারির মাঝে বসানো ৩৫ মিলিমিটারের প্রজেক্টর। সামনে ছোট মাপের একটা সাদা পর্দা।

– একি অবস্থা গো মানিক? এইভাবে শো হবে?

মানিক কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই উদ্যোক্তাদের একজন এসে ওদের ডেকে নিয়ে গেল সামনের দিকে। কয়েকজনের সাথে আলাপের পর মানিক আর বিজয়া এসে বসলে সামনের দিকের চেয়ারে। অডিটোরিয়ামও ইতিমধ্যে ভর্তি হয়ে গেছে। বেশ কিছু বিদেশিও এসেছে। সমস্ত আলো বন্ধ হতেই প্রজেক্টর শুরু হল। আশ্চর্যরকম ভাবে কোনও সাউন্ড বক্সও নেই, প্রজেক্টর থেকেই একটা মৃদু শব্দ আসছে, যাতে ডায়লগ বা সাউন্ড এফেক্ট কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। পর্দায় যে ছবি আসছে তাও ক্লিয়ার নয়।

মানিকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে দিয়েছে। ছবির মাঝপথে অডিটোরিয়ামের বাইরের ঘরে এসে রুমাল দিয়ে মুখ মুছল। ছবির দৈর্ঘ্য দু ঘন্টা, সময় যেন কাটতেই চাইছে না। মানিক ভাবছে, “যত তাড়াতাড়ি এই অগ্নিপরীক্ষা এখন শেষ হয়, ততই মঙ্গল।” আজ কপালে কি নাচছে কে জানে!

অবশেষে শেষ হল শো। ঘরের সমস্ত আলো জ্বলে উঠল। ভদ্রতারক্ষার জন্য কিছু হাততালি পড়ল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি দর্শকেরা ছবি নিয়ে একটাও কথা না বলে সোজা ডিনারের টেবিলে গিয়ে লাইন দিলেন। প্লেটে সাজিয়ে খাবার নিচ্ছেন, নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছেন, কিন্তু যে সিনেমাটা এক্ষুণি দেখে উঠেছে সবাই, যাকে কেন্দ্র করেই এই আয়োজন, তা নিয়ে কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই কারুর। শুধু কয়েকজন বিদেশি শো এর পরেই মানিকের সাথে এসে হাত মিলিয়ে গেল, আর বলল যে তাদের বেশ ভালো লেগেছে।

পরের দিন মানিকের বন্ধু জে ওয়াল্টার টমসন কোম্পানির সুভাষ ঘোষালের সাথে মানিকের দেখা হল কফিহাউসে। সুভাষও গতকালের শো তে উপস্থিত ছিল।

– মানিক, কাল তোমরা খেয়েছিলে তো ঠিকঠাক?

– খাবারের কথা রাখো। কি বুঝলে আগে বলো। ওটা একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট ছিল! আগে জানলে আমি রাজিই হতাম না।

– আমিও তো জানতাম না এই ব্যবস্থা।

– সে যা হয়েছে হোক দর্শকদের ফিডব্যাক বলো।

– কয়েকজনের সাথে কথা হল। ওদের মত হচ্ছে ছবিটা খুব লম্বা। একজন জিজ্ঞেস করল ওই জলের পোকা আর ফড়িং, ওগুলো ওখানে কি করছিল। কাহিনীর সাথে ওদের কিসের সম্পর্ক।

– হুমম….

– আরে কি হল?

– ভাবছি, এই যদি হয় শিক্ষিত বাঙালি দর্শকদের প্রতিক্রিয়া, সাধারণ দর্শকদের কাছে তাহলে এ ছবির ভবিষ্যৎ কী?

কফি হাউস থেকে বাড়ি ফিরে মানিক দেখে অনিল অপেক্ষা করে বসে আছে সোফায়।

– আসুন, আপনার জন্যই অপেক্ষা করে আছি।

– বলো, কথা হল অরোরার সাথে?

– হ্যাঁ, ওরা অগস্টের শেষের দিকে রিলিজ করতে চাইছে।

– হাতে তাহলে তিনমাস। ভালো তো। এর মধ্যে আমি কিছু বিলবোর্ড ডিজাইনও ভেবে রেখেছি, সেগুলো করে ফেলতে পারব।

– ওকে, আপনি তাহলে এক্স্যাক্ট ডেট বলুন।

মানিক উঠে পাশের টেবিলে রাখা ছোট ক্যালেন্ডারটা এনে আবার চেয়ারে বসল। পাতা উল্টিয়ে অগস্ট মাসে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে লক্ষ্য করার পর পেন দিয়ে একটা গোল করে অনিলের দিকে ক্যালেন্ডার এগিয়ে দিয়ে বলল,

– এইটাই ফাইনাল করো।

– ওকে, তাহলে আমি কালই ওদের জানিয়ে দিচ্ছি যে “পথের পাঁচালী” রিলিজ হচ্ছে এই ডেটে।

– একদম, ২৬শে অগস্ট।

~~~♦ পর্ব ৭ ♦~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

আগের সব পর্ব পড়ুন এখানে

|| তথ্যসূত্র ||

১. আমাদের কথা – বিজয়া রায়
২. বিষয় চলচ্চিত্র – সত্যজিৎ রায়
৩. প্রবন্ধ সংগ্রহ – সত্যজিৎ রায়
৪. একেই বলে শুটিং – সত্যজিৎ রায়
৫. সত্যজিৎ রায়, বিশ্বজয়ী প্রতিভার বর্ণময় জীবন – অরূপ মুখোপাধ্যায়
৬. পরশমানিক – অরুণেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৭. আমি আর ফেলুদা – সন্দীপ রায়
৮. সত্যজিৎ রায়ের চিঠি, অশোককুমার দাস কে লেখা – দেশ শারদীয় ১৪২৩
৯. সত্যজিৎ ভাবনা – উজ্জ্বল চক্রবর্তী
১০. সত্যজিৎকে নিয়ে – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
১১. এখন সত্যজিৎ – গুপী গাইন বাঘা বাইন সংখ্যা – নভেম্বর ২০০২
১২. দেশ – সত্যজিৎ সংখ্যা
১৩. রবিবাসরীয় – সত্যজিৎ স্পেশাল
১৪. সত্যজিতের নারীরা – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৫. আজব ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন – রবিবারোয়ারি – এই সময়
১৬. সত্যজিৎ রায় সংখ্যা – এপ্রিল ২০১৫ – আনন্দলোক
১৭. My years with Apu – Satyajit Ray
১৮. Portrait of a Director : Satyajit Ray – Marie Seton
১৯. Our Films Their Films – Satyajit Ray
২০. Manikda, Memories of Satyajit Ray – Nemai Ghosh
২১. Deep Focus, Reflections on Cinema – Satyajit Ray
২২. Satyajit Ray at Work – Bijoya Ray
২৩. Through The Eyes Of A Cinematographer: A Biography Of Soumendu Roy – Devapriya Sanyal
২৪. The Master And I – Soumitra Chatterjee
২৫. www.satyajitray.org
২৬. Ravi and Ray – Times of India
২৭. Renoir in Calcutta – Satyajit Ray
২৮. Satyajit Ray: The Inner Eye: The Biography of a Master Filmmaker – Andrew Robinson
২৯. My Adventures with Satyajit Ray – The Making of Shatranj Ke Khiladi – Suresh Jindal

One thought on “মানিকের পাঁচালী ~ পর্ব ৬ ~ আহা কি আনন্দ

Leave a Reply