কপাল

Childhood, Conversation, Friends, Saddest Stories Are The Best Stories, Short Story, Story, বাংলা

সেবছর কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো ঠিক টকটকে লাল হয়ে ফোটেনি।

ঋতুচক্রের হিসেব ধরলে সময়টা বসন্তকাল। আবহাওয়া বিচার করলে প্রচণ্ড গরমকাল ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

যদিও মাঝে মাঝে কোকিলের ডাক শোনা যাচ্ছিল যেন ক্যালেন্ডারের মান রেখে, আর পাড়ার মোড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছটা ফ্যাকাশে লাল হয়ে উঠেছিল মনের আনন্দে।
এর মধ্যে হঠাৎ করে বুঁচির ভীষণ জ্বর এসেছিল।
হঠাৎ করেই বলতে হবে, দু’দিন ধরে একটু সর্দিজ্বর মত হয়েছিল বটে। কিন্তু তেমন কিছু নয়।

সেদিনও সকালের দিকে দিব্যি ছিল ফিট। শান্তিদিদের বাড়ির সকালের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে দেখেছিল রান্নার তেল নেই। মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল।

তেল আনতে যেতে হয়েছিল পাড়ার মুদির দোকানে। ফেরার পথে দাঁড়িয়েছিল একটু বোসেদের বাড়ির রোয়াকের মেয়েলি জটলায় দুটো কথা বলার জন্য।

দু’দিন ধরে ওপাড়ার সীমার সেজমেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না! গল্প চলছিল তাই নিয়ে।

—কোথাকার লোকেরা বাচ্চা ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে খায়।

—কোথায় মেয়ে পাচার হয়ে যায় দেশের বাইরে। “বেবুশ্যে বানায় গো তাদের।” –জোরালো ফিসফিসানিতে সবাইকে জানিয়েছিল মেজাইয়ের বৌ।

—কোন এক গ্রামের কোন এক তান্ত্রিক ছোট ছোট মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে কি পাশব সাধনা করত নাকি, তারপর হাঁড়িকাঠে বলি দিত! তার উপাসনায় নাকি লাগত তুলতুলে নরম মাংস আর অঢেল রক্ত!

গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎই শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করেছিল বুঁচির। ছোট মেয়ে সিয়া ছিল সঙ্গে। মায়ের হাঁটুতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখ করে খুব মনোযোগের সাথে গল্প শুনছিল। বুঁচি হঠাৎ হেঁচকা টান দিয়েছিল ওর হাতের গোছ ধরে। বলেছিল, “চল চল, বেলা হয়ে গেল।” বলেছিল, “আর গল্প গিলতে হবে না অত!”

বাড়িতে ফিরে শরীর খারাপলাগা কমেনি।

বেশি চিন্তা-ভাবনা করা বুঁচির ধাতে ছিল না, আজ সবার কথাগুলো মাথা থেকে আর ঝেড়ে ফেলে দিতে পারছিল না ও, তেতে উঠেছিল মাথাটা।

সীমাকে চেনে ও। ওর সেজ মেয়েটা বুঁচির মেজমেয়ে বিয়াসের বয়সী।

মেরে মেরে বাচ্চা খায় লোকে! বিশ্বাস হতে চায় না। কিন্তু সবাই বলছে যখন—

জ্বরটা তেড়ে এসেছিল তারপরই।

বুঁচির বর গ্রিলের মিস্ত্রী। কুঁড়ে! দিনের পর দিন কাজে যায় না নিতাই। বাকি দিনে যা রোজগার করে তার বেশিরভাগটাই জুয়া খেলে আর মাল গিলে উড়িয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়।

তিন মেয়ে নিয়ে বুঁচির জ্বালা!

কয়েক বাড়ি ঠিকে-ঝি এর কাজ করত ও। কিন্তু তিন-তিনটে মেয়ের খাওয়া-পরা, ট্যুশুনি পাঠানোর খরচ তো কম নয়। চলে কি করে? আজকাল আবার মেয়েদের একটু লেখাপড়া না শেখালে বিয়ে দেওয়াও যায় না!

বুঁচি নিজে পড়াশোনা শেখেনি। বুঁচিকে দেখতে ভাল নয়। বুঁচির জীবনের কিছুই ওর মনমত নয়। মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া ইস্তক কপাল পুড়েছে ওর। ওর দিদি ছিল মা-বাপের প্রথম সন্তান। বাবা নাকি বড় আদর করেই বড়মেয়ের নাম দিয়েছিল শেফালি। কিন্তু তারপরে দ্বিতীয়টাও মেয়ে হতে মেজাজ বিগড়ে গেল। বুঁচির নামে তাই সেই মেজাজের প্রতিফলন। ওর জীবনেও।

বুঁচির তিনমেয়ের নাম–তিয়াস, বিয়াস আর সিয়া! পাশের দোতলা বাড়িতে থাকে পালেরা, ওদের একমাত্র মেয়ে তানিয়া কলেজে পড়ে, বুঁচিকে ডাকে বুঁচিদি; ও বুঁচির মেয়েদের ফেন্সী নাম বেছে দিয়েছিল; ওদের নামের মানে বলে, ইংরেজি-বাংলা বানান শিখিয়ে দিয়েছিল!

আজকালকার মেয়েরা কত পড়াশুনো করে, কলেজে যায়, চাকরি করে–বুঁচি ভাবে মনে, নিদেন যদি বিয়েই হয় পছন্দমত ভাল ছেলের সাথে একটা তবু তো–

দিদির বড় মেয়েটা ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিল–তার বিয়ে হয়ে গেল চট করে প্লাম্বিং-এর কাজ জানা এক ছোকরার সাথে! ছেলেটার বয়স একটু বেশি বটে রুবীর চেয়ে, কিন্তু ছাদওলা বাড়ি আছে।

বুঁচিরও সাধ ছিল তিয়াসটা ক্লাস এইট-নাইনে উঠলে ভাল ছেলে দেখে একটা বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার। তিয়াসের বারো বছর বয়স হ’ল এই!

এই তো নস্করবাড়ির নতুন বৌ মেনকার পেটে বাচ্চা আসার পর ওর শাশুড়ি ধরে পড়েছিল বুঁচিকে, বলেছিল, “এই বাসন কটা মাজা রোজের, বৌটা পারে না আর! তিয়াসকে একটু পাঠিয়ে দিলেও তো পারিস! ৫০০ টাকা করে দেবে মাসে বলেছে খোকা! এমন কিছু তো কাজ না, তাতেই–”

বুঁচি রাজি হয়নি।

নিজেকে ঠ্যালায় পড়ে করতে হয়, তাবলে মেয়েদের লোকের বাড়ি কাজ করতে পাঠানোর ইচ্ছা ওর নেই মোটেও!
মেজটার—বিয়াসটার আবার ভাল মাথাও আছে পড়াশোনাতে! মাঝে মাঝে অনাগত সুখের দিনের স্বপ্ন দেখে বুঁচি, ভাবে, চাইলে বিয়াস হয়তো এমএ-বিএ-পাসও করে যেতে পারে! ও পড়তে চাইলে ওকে পড়াবে বুঁচি, সে যে করেই হোক!

রঙিন খুশি প্রজাপতির মত সুন্দর সুন্দর মেয়েরা সুন্দর সুন্দর জামা পরে কলেজে যায়! বেশ লাগে দেখতে বুঁচির!

নিতাই বাড়ি ছিল না, জ্বরের চোটে মাকে জ্ঞান হারাতে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে তিয়াস গিয়েছিল তানিয়াদের বাড়িতে। তানিয়া আর তানিয়ার মা–দোলাকাকিমা ছুটে এসেছিলেন সাথে সাথে! মাথায় জলপট্টি দিতে বলেছিলেন তিয়াসকে! জিজ্ঞাসা করেছিলেন ওর বাবা কোথায়।

তিয়াস বলতে পারেনি। গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন তারপরে ওঁরা।

পাশের বাড়িতে এমন কাণ্ড কার ভাল লাগে!

শরীরের এই অবস্থা, তিনটে ছোট ছোট মেয়ে নিয়ে মেয়েটা একা। ওর বর যে কখন বাড়ি আসবে, কোন চুলোয় গেছে তারও খবর কেউ রাখে না!

(তানিয়ার বাবার আক্কেল-বুদ্ধির কি বাহার ভেবে পান না দোলাদেবী! বাড়ি বানানোর আগে লোকে একটু খবর নেয় না পাড়া-প্রতিবেশী কেমন? কোন শ্রেণীর? বুড়ো হতে না হতেই ভীমরতি ধরেছে লোকটার! সাতবছর হয়ে গেছে এই পাড়ায় এসেছেন, এখনও ভাবলেই মাথা গরম হয়ে যায় দোলার!)

জলপট্টিতে কমেনি বুঁচির জ্বর। হু-হু করে বেড়েই চলেছিল!
নিতাই বাড়ি ফিরেছিল অনেক রাতে। মাতাল হয়েই ফিরেছিল। বৌ-এর শরীরের হাল দেখে সে নেশা অবিশ্যি কেটে এসেছিল তাড়াতাড়ি।

বুঁচির জ্বরজাড়ি শরীর খারাপ প্রায় হয়ই না। ওর শরীর অসুস্থ হলে কি করা উচিত নিতাইয়ের কোন ধারণা নেই।

রাতটা কেটে গিয়েছিল কোনরকমে! বেশিরভাগ সময়টা বুঁচি অজ্ঞান হয়েই ছিল! মাঝে মাঝে অল্প একটু জ্ঞান মত এলে ঘোলা চোখ মেলে তাকিয়ে তাকিয়ে খুঁজেছিল কাদের যেন!

পরের দিনেও জ্বর কমার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। তার পরের দিনেও না!

দোলাদেবী এমনিতে কথা বলেন না পারতপক্ষে নিতাইএর সাথে। আজ আর থাকতে না পেরে বারান্দায় বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, “হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো অন্ততপক্ষে! এভাবে বাড়িতে ফেলে রেখে কি মারবে নাকি বৌটাকে?”

নিতাই মাথা চুলকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

দোলাদেবী আবার ঘরে ঢুকে স্বামীর আক্কেল-বুদ্ধির অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর সন্দেহের কথাটা উচ্চস্বরে ঘোষণা করেছিলেন।

হাসপাতালে নিয়ে যেতে খরচ আছে। নিতাইএর হাতে টাকা পয়সা কিছুই ছিল না। আজকাল আর কেউ ধার দিতেও চায় না ওকে ।

একবার ভেবেছিল, পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের কাছেই চেয়ে দেখবে টাকা কটা। ওনার বৌয়ের সাথে ভালই কথাবার্তা, দহরম-মহরম বুঁচির। বৌটা বলছিলও বুঁচিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে।

দিতেও পারে টাকা কটা, ভেবেছিল নিতাই।

কিন্তু শেষপর্যন্ত আর হাত পেতে, মুখ ফুটে চাইতে পারেনি।
নিতাই জানে, টাকাওলা লোকেদের কাছ থেকে গরীব-দুঃখীদের জন্য টাকা বের করা বেশি কঠিন!

বেদরকারে, ফূর্তি করতে ওদের টাকা বেরোয়। একে-ওকে এটা-ওটা কিনে দেবে। তোমাকেও! কিন্তু কাজে চাও! হুঁ! একটি পয়সা বের করতে জান কয়লা হয়ে যাবে!

কাকতালীয়ভাবেই হয়তো, ঠিক সেইসময়ই দোলাদেবী তাঁর স্বামীকে বলছিলেন, “একটি পয়সাও দেবে না তুমি যদি চায়! নিজে সারাক্ষণ মাল গিলে, জুয়া খেলে ফুর্তি করে বেরানোর সময় পয়সা আসে! আর বৌকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়ার বেলায়ই পয়সার যত অভাব! যত বদমাইশি এইসব!”

টাকা পয়সা জোগাড় করতে করতে দেরী হয়েছিল দিন তিনেক। এই তিনদিনে বুঁচির চেহারা হয়েছিল মরার মত। বেশিরভাগটা সময় অজ্ঞান হয়েই পড়েছিল বেচারি।
হাসপাতালে নিয়ে যেতে ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন “মেনিঞ্জাইটিস”।

“অবস্থা ভাল না!” গম্ভীর মুখে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন নিতাইকে! হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল নিতাই!
শরীরটা যে বেশ ভালমতই খারাপ করেছে বৌয়ের তা বুঝতে পেরেছিল বটে, কিন্তু ডাক্তারবাবুরা যে একেবারে মাথা নাড়িয়ে “অবস্থা ভাল নয়!” বলবেন তা ও কল্পনা করেনি সত্যি সত্যি!

গম্ভীরমুখে বাড়ি ফিরে এসেছিল ও। তারপর গিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি।

বুঁচির মা আছে বেঁচে, আর ভাই আছে এক। ভাইবৌয়ের সাথে বনে না বুঁচির। মায়ের সাথেও সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায়!

তবু, শ্বশুরবাড়িতেই গিয়েছিল শাশুড়িকে কয়েকদিনের জন্য অন্তত নিয়ে আসতে নিতাই।

মেয়েগুলোকে দেখবার তো চাই কাউকে বাড়িতে।

ওর যে কয়েকদিন অন্ততপক্ষে অনেক দৌড়োদৌড়ি যাবে সে তো বোঝাই যাচ্ছে! কি আছে কে জানে কপালে?

“কপালে যে কি আছে কে জানে মেয়েটার!” দোলাদেবী বলেছিলেন দু-তিনদিন পরে মেয়েকে, “ওর মা বলছিল, বাঁচার আশা নাকি নেই। ওই ছোট ছোট তিনটে বাচ্চা! আহা রে!”

তানিয়ার বয়স অল্প। মনে রঙিন স্বপ্নের ছোঁয়া এখনও উধাও হয়ে যায়নি, অনুভূতিগুলো ভোঁতা নয়। ভাল লাগা, খারাপ লাগা, সুখ-দুঃখ সবকিছুই তীক্ষ্ণ, ধারালো ওর।
মুখটা ছোট হয়ে গিয়েছিল, “ইস্!” বলেছিল ও, “কি হবে মা?”

ওর মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছিলেন একটা। কি হবে ভগবানই জানেন! বাচ্চাগুলোর জন্যই খারাপ লাগে! বরটা তো মানুষ না! আর, ছেলেমানুষ মেয়েটা!

সেদিনকে হাসপাতাল থেকে মেয়েকে দেখে এসে মরাকান্না জুড়েছিল বুঁচির মা। ঘ্যানঘ্যান করে একঘেয়ে নাকিসুরে চ্যাঁচানি।

তানিয়ার মুখ শুকিয়েছিল, দোলাদেবী দুরুদুরু বুকে উঁকি মেরে শুনেছিলেন ব্যাপারটা কী।

“সোনার মেয়ে আমার এ কী হল গো, এবার আমি কোথায় যাব গো!” গলা ছেড়ে কাঁদছিল বুড়ি, তিয়াস পাশেই দাঁড়িয়েছিল লাল মুখ করে, ফোঁপাচ্ছিল অল্প অল্প। “তোদের কী হবে রে? তোর মা ম’লে তোরা কোথায় যাবি রে!”

এখনও মরেনি তবে! জানলার পাশ থেকে সরে এসেছিলেন দোলা!

ভাল লাগে না। মনমেজাজ খারাপ হয়ে থাকে সারাক্ষণ! “কাকিমা কাকিমা” করে সারাক্ষণ একথা-ওকথা বলত মেয়েটা! আশে-পাশে থাকত। পাড়ার গুজবের খবর সব পাওয়া যেত ওর কাছ থেকে।

তানিয়ার বন্ধু-বান্ধব আছে, কম্পিউটার, পড়াশোনা, নিজের জগৎ। ওর সাথে কটাই বা কথা হয় দিনে। বুঁচি কাছে এসে বসে থাকত সকাল-সন্ধ্যা। ওর মেয়েরা ইস্কুলে যাওয়ার পরে; পড়তে গেলে। সময়টা দিব্যি কেটে যেত ওর সান্নিধ্যে।

রবিবার সকালে বাড়ির পেছনের বাগানে গাছের গোড়ায় জল দিতে দিতে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন দোলা–অনেক দোপাটিগাছ, ছোট ছোট গোলাপচারা এখানে। অনেকটা জায়গা, অনেকেই বলে সব্জি চাষ করতে; দোলা কিন্তু ফুল ভালবাসেন।

তানিয়ার গলার আওয়াজ ভেসে আসছিল দোতলায় ওর ঘরের খোলা জানলাটা দিয়ে। বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বলছে হয়তো, বা কম্পিউটারে বসেছে, স্কাইপ করছে। ওর বাবা বসে আছে বাইরের ঘরে। পেপার পড়ছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই ‘চা’ ‘চা’ করে চ্যাঁচামেচি শুরু করে দেবে।

হঠাৎ বাইরে থেকে একটা গোলমালের, হৈ-চৈ এর আওয়াজ ভেসে এসেছিল।

হাতের কাজ থামিয়ে কৌতূহলী শোনার চেষ্টা করেছিলেন দোলাদেবী কয়েকমুহূর্ত। মনে হয়েছিল নিতাই আর ওর শাশুড়ির গলার আওয়াজ যেন। বাচ্চাদের কান্নার, ফোঁপানির আওয়াজ ভেসে এসেছিল তারপর।
হাত ধুয়ে তড়িঘড়ি বাইরের ঘরে বেরিয়েছিলেন। স্বামী বসেছিলেন পেপারটা মুখের সামনে ধরে।

দোলাকে বেরোতে দেখে মুখের সামনে থেকে পেপার সরিয়ে বলেছিলেন, “বেরিও না তুমি এখন।” বাইরের হট্টগোল কমেনি।

শোনা গিয়েছিল, নিতাই তার কোন এক বন্ধুর পরিচিত কাকে ধরে এনেছে। মেজ মেয়েটা, বিয়াসকে নাকি–কাদের বাচ্চা নেই, তারা দত্তক নিতে চায়।

দোলা চুপ করে শুনেছিলেন একটা নতুন কেনা দামী প্লাস্টিকের চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে তার হাতল চেপে ধরে, তাঁর বয়সের ছাপধরা, কড়াপড়া, নখ ক্ষয়ে যাওয়া আঙুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল চাপে।

স্বামী চশমার ফাঁক দিয়ে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “ওর মা যদি সত্যিই ফিরে না আসে, মারাই যায়! বাচ্চাগুলোর দায়িত্ব কি তবে তুমি নেবে?”

নিতাইএর যে খুব ভাল লাগছিল বিয়াসকে দত্তক দেওয়ার কথাটা তুলতে তা তো নয়! কিন্তু টাকাটা সত্যিই খুব দরকার ছিল ওর। অল্প টাকা কটা, মনের মধ্যে সুড়সুড় করে উঠছিল, কিন্তু ওই অল্প কটা টাকাই কে দেয় বিপদকালে? স্বপন যাদের সঙ্গে করে এনেছিল খুব খারাপ লাগছিল না তাদের। বউটা হেসে বলেছিল, “একটা বাচ্চা-বাচ্চা করে আমাদের এই কষ্ট! কিছুতেই দিলেন না ভগবান। কম মানত করেছি!”

আর নিতাই ভাবছিল, গরীব মানুষকেই দয়া করেন ভগবান। নিতাইয়ের ঘরে তিন মেয়ে। আর এঁরা দিব্য চুটকি না বাজাতে টাকা ফেলে দেয়, এদেরই দয়া করেন না ভগবান! লীলা! লীলা!

শাশুড়ি মড়াকান্না জুড়তে তাই খেপে গিয়েছিল ও। কান্নার বেলায় সবাই আছে! ওর মেয়েদের কি বুড়ি দেখবে? না ওর সাধের ছেলে দেখবে? আঃ! পুজো-আচ্চার দিনে একটা জামা কিনে দিতে পারে না ভাগনিদের! খাওয়ানো পরানোর বেলায় এই এক শর্মা, আর আদিখ্যেতা দেখানোর বেলায় আছেন সবাই।

বউটাও পড়ে আছে হাসপাতালে। বাঁচবে বলে মনে হয় না। তিন তিনটে মেয়েকে তখন সামলাবেই বা কে?

জলে তো আর ফেলে দিচ্ছে না মেয়েকে ও! তার পরে ভগবানের হাত। ভাগ্যে যা আছে তা তো আর কেউ খণ্ডাতে পারবে না!

ভাগ্যে যা আছে, তা কেউ খণ্ডাতে পারবে না–দোলাও দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরে তা-ই বোঝাচ্ছিলেন নিজেকে।

দোলা শুনেছিলেন ঘরের মধ্যে থেকে নিতাইয়ের তড়পানি; আর, ওর শাশুড়ির কাঁদো-কাঁদো গলার বাপ-বাপান্ত। আর শুনেছিলেন বিয়াসের ভয় পাওয়া হেঁচকি তোলা কান্না! সিয়ার অবুঝ কান্না।

স্বামীর কঠিন মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে আস্তে আস্তে ঘরে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

~~~~~~~~~~~

আজব কাণ্ড, আজব ব্যাপার! গরীবেরা যে যমের অরুচি সে-কথাটাকেই সপ্রমাণ করে মাসখানেক পরে বুঁচি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি এসেছিল। কেউ ভাবেনি, সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল।

অথচ কারও প্রার্থনা, যত্ন, ভাল ওষুধপথ্যি ছাড়াই বুঁচি ড্যাংড্যাং করে ফিরে এসেছিল সদ্য সদ্য যমের মুখ থেকে।
গরীবের জান বড় কড়া।

নিতাই বড় মনমরা হয়ে পড়েছিল মেজ মেয়েটাকে মনে করে। বউ বাড়ি ফিরে আসবে জানলে কোনদিনই মেয়েটাকে ছাড়ত না ও মাত্র ওইকটা টাকার জন্য।
সবচেয়ে সুন্দর দেখতে ছিল ওই মেয়েটাই। এখন কোথায় কীভাবে আছে কে জানে।

বউকে জানানোও এক ঝামেলা। শরীরটা বড় দুর্বল হয়ে গেছে, এখন দেহ এই চাপ নিতে পারবে কিনা–মেয়েগুলো আবার ওর জান।

দোলাদেবী মেয়ের সাথে গল্প করছিলেন, “কী চেহারা হয়েছে মেয়েটার! হাড়-পাঁজর বেরিয়ে পড়েছে সব! বেঁচে যে ফিরেছে এই–!”

“বিয়াসটাও যে কোথায় গেল।” ছোট, চাপা সুরে বলেছিল তানিয়া! বাচ্চাগুলোর সাথে ভাব ছিল ওর খুব, কান্নার মত কী একটা দলা পাকিয়ে উঠতে চায় গলার কাছটায় বিয়াসের কথা মনে হলেই!

দোলা অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন, চোখের জল, গলা ধরে আসা–সহ্য হয় না ওঁর, ভেবেছিলেন, বড় নরম তানিয়ার মন, কষ্ট পাবে।

বুঁচিকে জানানো হয়নি বিয়াসের ব্যাপারটা।

বলা হয়েছিল ও মামার বাড়ি গেছে।

“ভালই!” ভেবেছিলেন দোলা, শুধু যে চেহারাটাই খারাপ হয়েছে বুঁচির তাই তো নয়। কুঁচকে যাওয়া চামড়ায়, গর্ত হয়ে বসে যাওয়া চোখে, অব্যবহারে বসে যাওয়া কন্ঠস্বরে ওর মধ্যে কেমন একটা অসুস্থতার ছাপ যেন। সন্ধ্যার সময় একা একা দেখলে চমক লাগে, ভয় হয়।

মনে মনে ভেবেছিলেন, তানিয়ার বাবাকে ভাল ফলমূল কিছু কিনে আনতে বলবেন বুঁচির জন্য। ভালমন্দ খাবার কিছু তো জোটে না মেয়েটার কপালে।

বারান্দায় টিনের ছাউনি, নতুন নয়, বেশ পুরোনো টিন। নিতাইএর কোন এক বন্ধুর ভাই নিজের বাড়িতে ছাদ দিয়েছিল, বাড়ির পুরোনো টিনগুলো অল্প পয়সায় বিক্রী করেছিল নিতাইকে।

“পুরোনো জিনিষ, এখনকার জিনিষের মত ভেজাল নয়। দেখবে, টেকসই হবে কেমন।” বুঁচিকে বলেছিল নিতাই।
টেকসই হতে পারে, কিন্তু টিনগুলোর সারা গায়ে যে ফুটোভরা তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ছোট ছোট ফুটোগুলোর মধ্যে দিয়ে সরু সরু লম্বা হয়ে সূর্যের আলো ঢোকে এমনিতে অন্ধকার ঘুপচি বারান্দাটায়। ঘরে ঢোকার দরজাটা বারান্দার ঠিক মাঝখানে। দরজার একপাশের বারান্দা তিনদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, সেখানেই রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। ঝুলকালি পড়ে বোঝাই জায়গাটা। জল পড়ে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে কোণের দিকটা।

বুঁচি বসেছিল সেইখানে, হাঁটুদুটোকে বুকের কাছে জড়ো করে, টিনের চালের দিকে তাকিয়ে, অন্ধকারের মধ্যে ওর মুখের উপর পড়েছিল চালের ফুটো দিয়ে ঢোকা সূর্যের আলো বিন্দু বিন্দু।

“কাকিমা!” দোলাকে দেখে ফ্যাসফ্যাসে বসে যাওয়া গলায় বলেছিল, হেসেছিল অন্ধকারের মধ্যে অদ্ভুত সাদা দাঁত বের করে।

দোলা দুটো আপেল নিয়ে এসেছিলেন দেখা করতে ওর সাথে।

গা ছমছম করে ওঠার মত বুঁচির হাসিটা। মৃত্যু স্পষ্ট হস্তাক্ষর রেখে গেছে স্বাস্থ্যবতী মেয়েটার শরীরে; সবদিক থেকে অকালে শুকিয়ে যাওয়া ওর শরীরে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল দেখিয়েছিল কোটরের মধ্যে বসে যাওয়া ওর জ্বলজ্বলে চোখদুটো। কোনমতে আপেলদুটো এগিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন দোলা। ভেবেচিন্তে সুস্থ আলাপ করার মত মানসিক অবস্থায় নেই বুঁচি, বুঝে নিতে দেরী হয়নি। শিরশিরিয়ে খারাপ করে উঠেছিল মনটা।
কয়েকদিনের মধ্যেই গুজবটা ছড়িয়ে পড়েছিল–বুঁচির মাথায় একটু গোলমাল দেখা গেছে।

অনেকেই বলেছিল, আগে থেকেই সন্দেহ ছিল তাদের। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে থেকেই বুঁচি নড়ে চড়ে আস্তে আস্তে, হাঁটে যেন একটু ঝুঁকে। কথা বলে কেমন যেন! আগের মত সেই ছটফটে প্রাণবন্ত ভাব, কিছুই নেই।
বোসেদের বাড়ির আড্ডায় কথাটা রীতিমত যুক্তিতর্ক সহকারে প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল। বুঁচির পাড়ার বন্ধু-বান্ধব, কাকিমা-মাসিমা, যার সাথে ওর আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক, যে ওকে দিব্যি ভালবাসে–সবাই বেশ উত্তেজনা সহকারে স্বীকার করে নিয়েছিল এই সিদ্ধান্তের অকাট্যতা।
“আঃ!” একটু দুঃখী দুঃখী, একটু নরম হাসির সাথে বলেছিলেন দোলাদের দু’বাড়ি পরের ঘোষেদের বাড়ির গিন্নী মিনতি, “সেদিনকেই তো। ওপাড়ার রাজু আছে না? গণেশের ভাই?”

বেশিরভাগ আড্ডাধারিনী জানিয়েছিলেন যে গণেশের ভাই রাজুকে তাঁরা ভালই চেনেন।

“ওই রাজু!” মিনতি বলেছিলেন, সেদিনকে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা দিয়ে যাচ্ছে সাইকেলে করে, তা, বুঁচি বসেছিল রোদের মধ্যে একটা ছেঁড়ামত নাইটি পরে!”
এখানে নস্করদের বাড়ির নতুন বউ ঝুম্পা গল্পে বাধা দিয়ে বলেছিল, “কে জানে বাবা! কেমন মা ওর! এই অবস্থায় মেয়েটাকে, নাতনিদুটোকে ফেলে রেখে দিব্যি ড্যাং ড্যাং করতে করতে চলে গেল। কে রান্না-বান্না করে বাড়িতে। কেই বা একটু জামা সেলাই করে দেয় বলো দেখি বুঁচিটার!”
উপস্থিত সকলেই সমস্বরে স্বীকার করে নিয়েছিল বুঁচির মায়ের হৃদয়হীনতা।

“হ্যাঁ! তা–” গল্পের রেশ টেনে আনার চেষ্টায় বলেছিলেন মিনতি, “তা, বুঁচি তো বসেছিল–বুঝলি তো–” ঠোঁটের কোণে একটা হাসি উঁকি মেরেছিল, “–পাগলীদের মতই দেখাচ্ছিল ওকে। জামার ঘাড়ের কাছটা ছেঁড়া, চুলগুলো উস্কো-খুস্কো।”

একমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেছিলেন, “তো রাজু করেছে কি, এই একটু মজা করেই বলেছে, ‘কি রে বুঁচকি পাগলী, শুনলাম নাকি মরিসনি? বেড়ে দেখাচ্ছে কিন্তু তোকে!’ ছেলেবেলার বন্ধু ছিল, একসাথে খেলাধূলা করেছে এককালে, বুঝতেই পারছিস, ইয়ার্কি মেরেছে একটু।–বাস্! আর যায় কোথায়! গালাগালি!? কাঁচা-কাঁচা খিস্তি দিয়ে তার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে দিল বুঁচি! গলা দিয়ে তো ভাল করে স্বর বেরোয় না। চিঁ-চিঁ করতে করতেই–” এখানে হাসি থামাতে পারেননি আর মিনতি। উপস্থিত সকলের মুখেও কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেছিল। মিনতি বলেছিলেন, “আমি তো হেসেই ফেলেছিলাম, রাজু তো হাসছেই। আর যতই সে হাসে ততই বুঁচির রাগ বেড়ে যায়! শেষটায় হাসি থামাতে না পেরে আমি ঘরে ঢুকে এলাম। বাপ্ রে! আমায় গালাগালি দেয়নি ভাগ্য ভাল। এটুকু জ্ঞান আছে এখনও!”

দোলা তানিয়াকে জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “সবাই বলছে–”

তানিয়া শুনেছিল চোখ বড়বড় করে। তখন কিছু বলেনি। খানিক পরে কিচেনস্পেসে এসে দাঁড়িয়েছিল আস্তে আস্তে, বলেছিল, “শরীরটা দুর্বল হয়েছে, ওরকম মনে করছে সবাই; একটু সুস্থ হলেই আর ওরকম লাগবে না।”

“তাই হবে।” মুখে বলেছিলেন দোলা। মনে ভেবেছিলেন, কে জানে? তাই যেন হয়, হে ভগবান! মনে ভরসা পাননি কিছুই।

“হারামজাদা! গু-খোরের দল!” বুঁচির খিনখিনে গলার স্বর ভেসে এসেছিল। গলায় জোর নেই; হাঁপাচ্ছে। তবু বিড়বিড় করে চলেছিল বুঁচি। নোংরা নোংরা গালাগালিতে জায়গাটাকে আর ভদ্রলোকের কানগুলোকে অপবিত্র করে তুলেছিল। “হতচ্ছাড়া! বাঁদরের বাচ্চার দল! আমায় পাগল পেয়েছিস?”

দোলা বাড়ির সামনের দিকের বারান্দায় বেরিয়ে দেখেছিলেন বুঁচিকে। নোংরা একটা নাইটি পরে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে কোমরে হাত দিয়ে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে হেসে চলেছে অল্পবয়সী কয়েকজন ছেলে, ষোলো-সতেরো বছর বয়স হবে ওদের। পাড়ার উঠতি তরুণ। সবকিছুতেই মজা ওদের, দুনিয়াটা খেলার জায়গা! আর নিষ্ঠুর কৌতুক সমস্তকিছু ঘিরে।

দোলাকে ঘর থেকে বেরোতে দেখে ছেলেগুলো থমকে গিয়েছিল একটু।

বুঁচি পিছন ফিরে তাকিয়েছিল। দোলাকে দেখে হাসির মত আভাস ফুটেছিল ওর মুখে যেন। বলেছিল, “কাকিমা!”
তারপর খসখসে গলায় বলেছিল, “আমায় পাগল পেয়েছে সব! বজ্জাতের দল!”

গলাটা কেঁপে গিয়েছিল একটু; শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া ওর মুখটা আরো কুঁচকে গিয়েছিল, ঝুলে পড়া নিচের ঠোঁটটা যেন কেঁপে উঠেছিল।

মনটা সহানুভূতিতে ভরে উঠেছিল দোলার। ওকে দেখে অস্বস্তি হয়; ওর উপর থেকে টানটা তো যায়নি।
চোখ পিটপিট করতে করতে অন্যমনস্ক ভাবে গালে একবার হাত বুলিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে হঠাৎ বুঁচি বলেছিল তখন–বসে যাওয়া খিনখিনে, খসখসে গলাতেই বলেছিল আবার, “মেয়েটাকে মামারবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে! ওর মামীর যা ছিরি! কেমন আছে কে জানে? যত বলি নিয়ে এসো, কিছুতেই আনতে চাইছে না!”

কাউকে জানাতে পারে না মনের কষ্ট। সবাই আজকাল কেমন এড়িয়ে চলে বুঁচিকে। অনেকদিন পর দোলাকাকিমাকে সামনে পেয়ে তাই যে কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল সেটাই বলেছিল বুঁচি। মেয়েটা–বিয়াস–
হাঁপিয়ে গিয়েছিল এটুকু বলেই ও, বিড়বিড় করে চাপা নিশ্বাসের সাথে বলেছিল, “আর, এরা সব আমায় পাগল পেয়েছে!”

দোলা চুপ করেছিলেন একমুহূর্ত। তারপর বলেছিলেন, যতটা সম্ভব নরম সুরে বলেছিলেন, “ও কত লোকে কত রকম কথা বলবে। তুই ও নিয়ে ভাবিস না আর–শরীরটা একটু সুস্থ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। যা এখন ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক একটু। এই রোদে ঘুরে আরো শরীর খারাপ করবে।”

কথাটা ঠিক সুরে বাজেনি কানে। বুঁচি কেমন অবাক চোখ তুলে তাকিয়েছিল ওঁর দিকে, অস্পষ্ট আওয়াজ করেছিল “ওঃ!” তারপর মাথা নাড়িয়ে আস্তে আস্তে চলেছিল ওর ঘরে, আর কোন কথা বলেনি।

দোলা স্পষ্ট বোঝেননি–মনে হয়েছিল, না বুঝে, না ভেবে, কোনভাবে যেন হতাশ করেছেন বুঁচিকে।

সেদিন তাই যখন কুচো চিংড়ি দিয়ে পালং শাকের তরকারি রান্না করে তিয়াসকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন দোলা, বাটি ভরে তরকারি ওর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “বাড়ির সবাই একটু একটু করে খাস, বেশি তো করিনি।” পরে, যেন দরকারি কথা মনে পড়েছে একটা, এইভাবে বলেছিলেন, “আর, শোন, মায়ের উপর বেশি চাপ দিস না এখন। শরীরটা দুর্বল তো! মাথায় বেশি চাপ নিতে পারবে না।” একটু থেমে থেকে বলেছিলেন, “বিয়াসের কথা জানে না তো তোর মা?”

“না-আ-আ!” খোলা দরজার কোণে পিঠ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সুর টেনে বলেছিল তিয়াস, “তাই বলি কখনো? বাবা বারণ করেছে। মায়ের মাথার তো ঠিক নেই। কদিন যাক, বলতে তো হবেই।” একটু থেমে থেকে বলেছিল, “সিয়াকেও—”

দোলা মাথা নিচু করে রান্নাঘরের স্ল্যাব মুছতে মুছতে মাথা নাড়িয়েছিলেন।

খানিক বাদে যখন ছোট ছেলেমানুষি গলায় তিয়াস বলেছিল আবার, বিড়বিড় করে নিজেকে শুনিয়েই যেন, “দিদা বলে, বাবা নাকি বিক্কীরি করে দিয়েছে বিয়াসকে। দিদা যেন কিই!” দোলা বুঝেছিলেন, উত্তর চাইছে না ও। বারো বছরের মেয়েটার সাথে একাত্মিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি—যদিও, সেই বোধটাকেও এড়িয়ে গিয়েছিলেন সযত্নে। তিনিও উত্তর চান না।
মাথা নিচু করেই স্ল্যাব মুছে চলেছিলেন। তিনিও উত্তর করেননি তাই কোনো।

~~~~~~~~~~~

বুঁচি ছোটবেলা থেকেই কান্নাকাটি অপছন্দ করত, ওর মা বলত ও খুব কম কেঁদেছে ছেলেবেলায়। ওর মেয়েদের বেশি কান্নাও ওর সহ্য হত না। ক্রন্দনরত মেয়েদের পিঠে দুমদাম চাপড় বসাত ও ওদের চুপ করাতে না পেরে।

আজকাল মাঝে মাঝে খুব কান্না পায় বুঁচির। দুর্বল শরীর যখন মনের সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারে না সে সময় যে কেমন অসহায় লাগে তা বুঁচি বোঝে আজকাল হাড়ে হাড়ে।

তিয়াস আর সিয়াও ওকে এড়িয়ে চলে, ওর মেয়েরা!
আয়নায় দেখেছে বুঁচি কি চেহারা হয়েছে ওর।
সবাই ওর শুকিয়ে যাওয়া চেহারা দেখে আর বসে যাওয়া গলার স্বর শুনে কুন্ঠিত হয়, চোখের উপর অদৃশ্য পর্দা নেমে আসে সকলের।

ওর মেয়েদেরও!

একদিক থেকে ভালই হয়েছে যে এখানে নেই বিয়াস, স্বার্থপরের মত ভাবে বসে বসে বুঁচি। ও জানে মামারবাড়ি যেতে একেবারেই পছন্দ করে না ওর মেয়েরা। মামারবাড়ির আদর! হুঁ! ওর মেয়েদের কপালে নেই তা। তবু—
দিনে-রাতে চোখের সামনে অসুস্থ মাকে অপদস্থ হতে দেখার চেয়ে ভাল নিশ্চয়ই।

সবাই আজকাল পাগল ভাবছে ওকে, প্রথমদিকে বুঝতে পারেনি বুঁচি সবার অদ্ভুত আচরণের কারণ, এখন পারে।
অদ্ভুত, অদ্ভুত সব মানুষজন! সবাই সত্যিই পাগল ভাবে বুঁচিকে আজকাল! নিতাইও ভাবে মনে হয়! শরীরটা ঠান্ডা হয়ে আসে বুঁচির। ভেবেচিন্তে মেপে মেপে কথা বলার চেষ্টা করে ও সবার সাথে তাই। কি জ্বালা! জ্বলজ্যান্ত সুস্থ মানুষটাকে পাগল ভাবছে সকলে!

ভেবে গুছিয়ে তাই সবকথার উত্তর দিতে চায় বুঁচি আজকাল। তাতে ফল হয় উল্টো। সবাই হাসে শুধু তাতে। কেউ কেউ দুঃখী চোখে তাকায়।

উন্মত্ততা আপেক্ষিক। যে ছেলেটা ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার নিয়ে চিন্তিত থাকে সর্বক্ষণ তাকে লোকেরা পাগল বলে সাধারণত, যে ছেলেটা ভাল চাকরি পাওয়ার সুবাদে হবু স্ত্রীর পরিবারের কাছে পণের দাবি দ্বিগুণ করে দেয় তাকে সকলেই সেয়ানা বলে স্বীকার করে নেয়।

যে সোনার গয়না বানায় টাকা হাতে এলেই, আর, ব্যাঙ্কের ভল্টে তুলে রেখে দেয় সেই গয়না, মাঝে মাঝে পালিশ করাতে নিয়ে যায় তাদের সযত্নে, তার বিষয়জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে কারো কোন সন্দেহ থাকে না, আর যে মাসের মাইনে হাতে এলেই বস্তির শিশুদের হাসি দেখার জন্য চকোলেট কিনে দেয় তাদের, তাকে সাধারণত সুস্থ মানুষেরা উন্মাদ ঠাওরায়।

মুশকিলের ব্যপারও। কেউ তোমায় পাগল ঠাউরালে যুক্তির কথা বলে তার সিদ্ধান্ত পালটানো অসম্ভব। যুক্তিপূর্ণ কথা বলার ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষ পাগলামোর আরেকটা লক্ষণ বলেই মনে জানে। জিনিষটা বেশ হাস্যকর, এই যুক্তি। হাসি চেপে রাখা যায় না পাগলের যুক্তির কথা বলার প্রয়াস দেখে।

দুপুরবেলা নিতাই কাজ থেকে বাড়িতে খেতে এলে বুঁচি নিতাইকে বলে, “আমি ঠিক আছি তো এখন। নিয়ে এসো বিয়াসকে। অনেকদিন তো হ’ল!”

নিতাই ঘামে ভেজা জামাটা খুলে দরজার পিছনে আটকানো হুকে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে আওয়াজ করে “হুঁ!” “হাঁ!” করে।

বুঁচি আধো আঁধারি ঘরে পাশ থেকে নিতাইএর মুখের একদিকের ফালি অংশ দেখতে পায়, গোটা মুখ দেখা যায় না। কিছু বোঝা যায় না।

হুঁ! ভাবে বুঁচি, নিজেরা পাগলের দল সব! আর ওকে ভাবে পাগল!

ওর মেয়েদুটোও কি তাই ভাবে? তাই কি ওরা ভয়ে ভয়ে এড়িয়ে চলে ওকে?

আর, মাঝে মাঝে একা একা বসে দমবন্ধ করা প্রবল আতঙ্কের সাথে বুঁচি ভাবে, সত্যিই পাগল হয়ে যায়নি তো ও?

রাতে বিছানায় শুয়ে না ঘুমিয়ে বুঁচি ভাবে, ফাঁকা ঘরে একা একা বসে ভাবে, বাটনা বাটতে গিয়ে কুকুরের মত হাঁপিয়ে গিয়ে ভাবে—আজকাল বিনাকারণেই প্রায় কান্না পায় মাঝে মাঝে; ওর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে আলোচনা করে যখন কেউ, বা গোপন মুচকি হাসি হাসে, বা, দোলাকাকিমা কিংবা তানিয়া যখন করুণ মায়ার চোখে তাকায় ওর দিকে, চেঁচাতে ইচ্ছে করে বুঁচির, কিছু ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করে। সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো ও?
আর, বুঁচি আশা করে—

নিশ্চয়ই লোকেরা, যারা সম্পূর্ণ সুস্থ, তাদের পাগল ভাবে না। নিশ্চয়ই কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারে নিজেদের ভুল, তারপরে হাসে নিশ্চয়ই নিজেদের বোকামো ভেবে।
বুঁচি বেশি শব্দ করে ভাবতে শেখেনি, যদি পারত তাহলে হয়তো ভাবত— ঘষা কাচের মধ্যে দিয়ে দু’দিক যেমন পরস্পরকে দেখে— অস্পর্শনীয়, অবোধগম্য, শুধু আলোর হালকা আভাসে বোঝা যায় অপরপক্ষের উপস্থিতির সত্যতা, পৃথিবীর সাথে বুঁচির সম্পর্কটা যেন তেমন হয়েছে! বুঁচি ছুঁতে পারে না মানুষের মন, মানুষের বোধ! কিছু ছুঁতে পারে না ওকে!

তিয়াস স্কুল থেকে ফিরে এসে আজকাল বুঁচির সাথে ওর ক্লাসের বন্ধুদের কথা গল্প করে না। ওদের স্কুলের ফার্স্ট গার্ল আর সেকেন্ড গার্লের মধ্যে খুব অশান্তি, তিয়াস সেকেন্ড গার্লকে পছন্দ করে, ফার্স্ট মেয়েটার নাকি অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না, তাই ওকে দুচোখে দেখতে পারে না। সন্ধ্যাবেলা মুড়ি-চানাচুর বা তেলেভাজা খেতে খেতে বুঁচির কাছে বসে গুনগুন করে গল্প করত ও।
আজকাল আর করে না।

ওর চোখে আধা ভয় আধা সংকোচ দেখতে পায় যেন বুঁচি, কোন ভয়ের, লজ্জার একটা কথা যেন ওর কাছে লুকিয়ে যেতে চায় তিয়াস। অদৃশ্য দূরত্ব একটা যেন তৈরি করতে শিখেছে বারো বছরের মেয়েটা।

সিয়া চুপ করে থাকে।

সিয়ার বয়স মোটে ছয়। একটু ন্যালাখ্যাপা, বোকা মত মেয়েটা। যত হাঁটে, পড়ে তার চেয়ে বেশি, এখনও। মা-ন্যাওটা ভীষণ ও। সবাই বলে, বেশি করে আগলে রেখে রেখে স্বভাবটা খারাপ করে দিয়েছে ওর বুঁচিই।

সিয়া চুপ করে থাকে আজকাল। কথা বলে না বুঁচির সাথে। পড়ে গেলে কাঁদে না। মুখ-নাক কুঁচকে, লাল মুখ করে বসে থাকে কান্না চেপে, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে, তবু কাঁদে না।

ছয় বছরের মেয়ে!

কী বুঝেছে ও কে জানে?

বুঁচি রান্না করে। তারপর সত্যিই পাগলের মত, ভূতের মত বসে থাকে বারান্দায় চুপ করে।

দোলাকাকিমারা, বা আর কেউ, যখন সামনে দিয়ে চলে যায় চুপচাপ মাথা নিচু করে, ভাণ করতে করতে যেন বুঁচিকে দেখতে পায়নি ওরা, বুঁচি যেতে দেয় ওদের। বুঁচি ডাকে না কাউকে আলাপ করার জন্য, গল্প করতে। বুঁচিকে নিয়েই আজকাল গল্প চলে পাড়ায়।

তাই, বুঁচি একা বসে থাকে।

আর, একা একা বসে বসে ভাবে।

আর, ভাবতে ভাবতে ঘুমে ঢুলে পড়ে।

মাথা ভাল কাজ করে না।

দিন যায়।

এমনই একদিন বিকেলবেলা। সিয়া চারটাকার চানাচুরভাজা কিনে এনেছিল পাড়ার দোকান থেকে। রাত্রে ওর বাবার কাছে বায়না করে টাকাটা আদায় করেছিল ও। ওর বাবা আজকাল টাকা দেয় ওদের। আগের চেয়ে অনেক হাত খুলে টাকা দেয় মেয়েদের, চাইলেই।

সেই টাকা দিয়ে চানাচুরভাজা কিনে এনেছিল সিয়া। তারপর ঠিক বাড়িতে ঢোকার মুখে রাস্তায় সমস্তটা ফেলে দিয়েছিল উলটে, হোঁচট খেয়ে।

তিয়াস বসে ছিল বারান্দায়। বলেছিল, “যাঃ! দিলি তো ফেলে! তুই না!”

অল্প অল্প হাওয়ায় রাস্তার পাশের পুরু হয়ে জমে থাকা ধুলো হালকা হালকা ধূসর পরতে উড়ছিল মাটি ঘেঁষে। তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল সিয়ার অনেক সাধের মশলাদার ঝাল চানাচুরের ডাল, কটকটিগুলো।

বুঁচি মাথা ঘুরিয়ে অলস চোখে চেয়ে দেখেছিল একবার পড়ে থাকা চানাচুর। তারপর চোখ তুলে সিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল।

সিয়া শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ছড়িয়ে পড়ে থাকা চানাচুর আর চানাচুরের ঠোঙাটার দিকে। যেমন দৃষ্টি ছয়বছরের মেয়ের মুখে মানায় না।

তারপর চোখ তুলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠেছিল থরথর করে। মুখটা বিকৃত হয়েছিল মুহূর্তের জন্য। তারপর ফুঁপিয়ে উঠেছিল ও। আর, একটা বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল যেন। অল্প অল্প ফোঁপানি তীব্র হতে হতে চোখের জলে, তিক্ত কান্নায় রূপান্তরিত হতে বেশি সময় নেয়নি।

অনেকদিন কাঁদতে দেখেনি সিয়া কে। হতভম্ব, অবাক হয়ে বসেছিল বুঁচি আর তিয়াস।

সিয়া কেঁদে চলেছিল, ফুঁপিয়ে, হেঁচকি তুলে, ছয়বছর বয়সীর অর্ধেক বোঝা, অর্ধেক না বোঝা, অভিমানী আবেগী কান্না। ওর বহু সাধের ধুলোয় ছড়িয়ে পড়া চানাচুর ওকে কিসের কথা মনে করিয়েছিল, কে জানে?
তারপর বুঁচির বাড়িয়ে দেওয়া দু’হাতের বেড়ে এসে, মায়ের বুকে মাথা গুঁজেছিল ও। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল ওর সমস্ত শরীর।

আর, ওকে বুকে চেপে ধরে, ওর মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, ফিসফিস করে ওকে শান্ত করতে করতে অনেক দিন পরে বুঁচি পৃথিবীর সাথে যোগসূত্রতা খুঁজে পেয়েছিল একটা।

লোকে যা ভাবে ভাবুক, সিয়ার মায়ের মস্তিস্ক বিকৃতি হয়নি। সিয়ার কান্না স্পষ্ট অনুভূতি নিয়ে এসেছিল বুঁচির কাছে।

মুখ তুলে দেখেছিল, তিয়াস তাকিয়ে আছে আলিঙ্গনরত মা আর বোনের দিকে। হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ওর দিকে বুঁচি।

দুই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ফিসফিস করে সান্ত্বনার সুরে বলেছিল, “তোদের কুড়ি টাকা দেব খনে। দুই বোনে ফুচকা কিনে খাস। কাঁদিস না মা। কাঁদে?!”

হঠাৎ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল বুঁচি শরীরে একটু তাকত পেলেই, গলাটা একটু সেরে উঠলেই আবার সম্পূর্ণ সুস্থ লাগবে ওকে। আর কেউ পাগল বলে সন্দেহ করবে না।
আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে সিয়ার কান্না শান্ত হয়েছিল আর ও মায়ের কাঁধ খামচে বসেছিল যখন, ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওর শরীরে মাঝে মাঝে প্রবল কান্নার পরের ফোঁপানির শিহরণ অনুভব করছিল বুঁচি। আর তিয়াস কাছে বসে মৃদু স্বরে গুনগুন করে গল্প করছিল, “—আর দোলন দিদিমণি তারপরে তো দেবর্ণিকে—!”

ভালো করে সন্ধ্যা নামতে নামতে সাতটা বেজে যায় আজকাল; সেদিন তিনতলার ঠাকুরঘর থেকে নিচে নামার সময় দোতলার ঝুল বারান্দা থেকে উঁকি মেরে দোলা দেখেছিলেন, বুঁচি ওর বারান্দার একচিলতে রান্নাঘরে পাম্প দেওয়া স্টোভ জ্বেলেছে। আর, তিয়াস আর সিয়া বসে আছে বই নিয়ে মায়ের কাছে।

অনেকদিন পরে দুই মেয়ে বসেছে মায়ের পাশে। আলাদা করে দেখে কিছু বোঝার জো নেই। কিন্তু, ওই ছবিটার মধ্যে পুরোনো একটা স্বাভাবিকতা দেখেছিলেন দোলা। আঃ! বিয়াসটা এখানে থাকলে—

~~~~~~~~~~~~

বীণাবউদির অনেকরকম বদনাম আছে, কিন্তু চা-টা বীণাবউদি খারাপ বানায় এমনকথা কেউ বলতে পারবে না! নিতাই মাটির খুরিভরা গরম চায়ে চুমুক দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে, মুখটা অল্প বিকৃত করে, অন্যমনস্কভাবে ভাবছিল। শালা শুয়োরের বাচ্চা স্বপনটা এখন বলছে বিয়াসকে যারা দত্তক নিয়েছে তাদের ও ভাল চেনে না! কোথায় তারা গেছে, তাদের আর কোনও পাত্তাই নেই! পুলিশের কাছে গেলেও নাকি এখন পুলিশ নিতাইকেই আগে পাচার করবে! এর’মভাবে নাকি দত্তক দেওয়ার নিয়মই নাই। শালা বাঞ্চোৎ!

চোখের আড়ে টেরিয়ে দেখেছিল, বীণাবউদি নিচু হয়ে কেটলি থেকে মাটির ভাঁড়ে চা ঢালছে, খসে পড়ো পড়ো বুকের আঁচলটা! প্লাস্টিকের চা ছাঁকনিটার উপর, আশে পাশে তিন-চারটে মাছি ভনভন করছে। অল্প ছাপধরা সাদা ঝিনুকের মত বীণাবউদির দাঁতের সারি, নিচের ঠোঁটটাকে কামড়ে ধরে নিচু চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে পাতলা হাসি হেসেছিল!
গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল নিতাইএর! শুকনো হাসি হেসে বলেছিল, “আর এক ভাঁড় চা দিয়ে দাও বউদি!”
বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না আদপেই। বউটা হয়েছে আধপাগলী। আর, শুধু “বিয়াস”, “বিয়াস” করে যায় কানের কাছে একনাগাড়ে।

ভরসন্ধ্যাবেলায় নিতাই যখন বাড়ি ফিরেছিল, বুঁচি বসেছিল বারান্দায়। ভূতের মত আবছা অস্তিত্ব একটা–নিরেট শরীরী মনে হয় না ওর উপস্থিতিকে! এই আধা শহর আধা মফস্বল এলাকায় সন্ধ্যাবেলায় কাছে দূরে শাঁখের আওয়াজ বেজে ওঠে এখনও! খুব কাছেই কোনও বাড়িতে শাঁখ বেজে উঠেছিল, সেই আওয়াজের মধ্যে বুঁচি খ্যাসখ্যাসে গলায় বলেছিল, “বিয়াস কোথায়?”
আধো আলো আধো আবছায়ায় আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়েছিল ও, নিতাই শব্দ করে ঢোঁক গিলেছিল একটা। পাশে তাকিয়ে দেখেছিল সিয়াকে কোলে নিয়ে তিয়াস দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় চোখ করে; অন্ধকারের ভিতর দিয়ে ফ্যাকাশে আর ছোট্ট দেখাচ্ছে ওর মুখটা। ছোট নিশ্বাসের সাথে চাপা গালি দিয়েছিল একটা নিতাই; মায়ের কাছে বেশিদিন বিয়াসের কথা চেপে রাখতে পারবে না মেয়েরা জানত ও, তবু—মুখে বলেছিল, “চলো, ঘরে চলো, বলছি সব—”

রান্নাঘরে উবু হয়ে বসেছিলেন দোলা, তানিয়ার বাবার রাতের খাওয়ার জন্য রুটি বেলছিলেন, যখন বাইরে ধস্তাধস্তির শব্দ ভেসে এসেছিল, উত্তেজিত গলার আওয়াজ, আর্ত চিৎকার, গোঙানির শব্দ, কান্না!
পরে, পুলিশকে দোলা বলেছিলেন, স্পষ্ট কিছু মনে ছিল না তার। ভেবে দেখেছিলেন, এলোমেলো শব্দের আর রঙের; আর থম্ মেরে যাওয়া ভাবনার এলোপাথাড়ি তুলিতে রাঙানো ক্যানভাসের মত ছিল সেই দুটো ঘণ্টা!
মিথ্যা বলেননি।

ঘেঁটে যাওয়া ছবির মত, অনেক দূর থেকে ভেসে আসা তালগোল পাকানো অর্থহীন আওয়াজের মধ্যে দোলার মনে আছে রক্তাক্ত দেহ একটা, বাচ্চাদের তিক্ত কান্না, কাটারি, আর ভোঁতা অনুভূতির সাথে চিন্তা করা, “সত্যি! ভীমরতি ধরেছিল তানিয়ার বাবার! আগে থেকে লোকেরা খবর নেয় না, পাড়া-প্রতিবেশী কেমন, কোন শ্রেণীর?”

আর বুঁচি! বুঁচি কাঁদছিল! রক্তে আর চোখের জলে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল ওর চিমসেধরা পাকানো শরীর আর শুকিয়ে যাওয়া মুখ! আর, বুঁচি বুকফাটানো বসে যাওয়া গলায় বলেছিল, “—আমার মেয়েটা! কাকিমা— আমার মেয়েটাকে এই রাক্ষস বিক্কিরি করে দিয়েছে!” হাতের কাটারি ফেলে দিয়ে বারান্দায় পরস্পরকে আঁকড়ে বসে থাকা ওর দুই মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, “চল রে, দেখি তোদের বোনকে কোথায় খুঁজে পাই! আর থাকব না এখানে আমরা মা! ভয় পাস না! আয় আমার কাছে আয়! আমরা—”

আর, ওর মেয়েদের কান্নাভেজা গাল আর ভয়ার্ত আঁতকে ওঠা দেখে থমকে গিয়েছিল ও মুহূর্তের জন্য!

পরে, কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে গিয়ে, হেঁচকি তুলে তিয়াস বলেছিল, “মা-মা ঠিক হয়ে গিয়েছিল তো! মা পাগল হয়নি তো! আমি ভেবেছিলাম—” কেঁদে বলেছিল, “তা-তাই আমি বলে দিয়েছিলাম বিয়াসের কথা!” বলেছিল, “বাবা যে বলল, স্বপনকাকু নাকি তিন হাজার টাকা দিয়েছিল বাবাকে! —বাবা যে বলল, বিয়াসকে নাকি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!” কেঁদে ককিয়ে পড়ে বলেছিল, “বিয়াসকে কি ওরা মেরে ফেলেছে দোলাদিদা?”

~~~~~

‘জীবিত ও মৃতে’র কাদম্বরী মরে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিল যে সে মরেনি। কাদম্বরী আর যাই হোক জমিদারবাড়ির বিধবা বউ ছিল। বুঁচি নেহাৎই বুঁচি, সত্যি সত্যি পাগল হয়ে প্রমাণ করতে পারল না যে আগে ও সত্যিকারের পাগল হয়নি!

সে যাক! নিতাই মরেনি। বুঁচির রোগা হাড়ে অত জোর আর ওর কাটারিতে অত ধার ছিল না। কিন্তু মেয়ে বিক্রী করা বাপ, আর পাগল মায়ের হাত থেকে তিয়াস আর সিয়াকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়ে হোমে রেখেছিল পুলিশ!
আমাদের দেশের হোমে মেয়েরা কেমন উদ্ধার হয় সে সম্পর্কে রক্ত জল করা খবর ‘খবরে প্রকাশ’ হয় মাঝে মাঝে।

মেয়েদের সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে পাগল হওয়ার জন্য অবশ্য বুঁচি সুস্থ ছিল না। তাই কেউ আর ও নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

নিতাই বিয়ে করেছিল আবার। এপক্ষেও ওর তিনটে মেয়ে!

~~~~~~~~~~~

দোলা শুধু বছর তিন-চারেক পরেও ভাবতেন মাঝে মাঝে একা বসে, বুঁচি কি সত্যি সত্যি পাগল হয়েছিল শেষটায়—নাকি…

আর নিশ্বাস ফেলে ভাবতেন,—কপাল!

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখিকা~ পিউ দাশ

প্রচ্ছদ ~ trueactivist.com

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply