কালপুরুষ

Fan fiction, Freedom, Friends, Ideas, Short Story, Story, বাংলা

শুকনো পাতার মত শরীরটাকে মাটি থেকে কোনরকমে টেনে হিঁচড়ে তুললেন বৃদ্ধ। সারা শরীরে প্রচন্ড যন্ত্রণা।

কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তটা ডান হাতের তালুর পিঠ দিয়ে মুছে নিলেন। মাথাটা এখনও ভোঁভোঁ করছে। বাঁ ভুরুর ওপরটায় চিনচিনে একটা ব্যথা – হাত দিয়ে বুঝলেন ফেটেছে। একটা চোখ ফুলে বন্ধ হওয়ার জোগাড়। পাশের দরজার কড়াটা ধরে উঠতে গেলেন – পারলেন না, বসে পড়লেন ধপ করে। কত যেন বয়স হলো তার? মনে পড়ে না এখন আর। কতকিছু যে ভুলে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। মাঝে মাঝে নিজের নামটাও মনে পড়ে না। তার ওপর মাথায় আবার রড না লাঠি কি দিয়ে যেন মারল…..

আরো কিছুক্ষণ ভূতগ্রস্তের মত বসে থেকে আস্তে আস্তে দরজাটা ধরেই উঠে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ। ডান পাটা টেনে টেনে কোনোমতে দেওয়াল ধরে ধরে পাশের ঘরে ঢুকলেন। সারা বাড়ি অন্ধকার। ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিয়ে গেছে অনেকদিন। মোমবাতিও নেই যে জ্বালবেন। খাওয়ার পয়সাই জোটে অনেক কষ্টে। সকালবেলা বাগানের সামনে একটা টেবিল নিয়ে বসেন। হাতঘড়ি থেকে টিভি, কম্পিউটার থেকে মোবাইল – যখন যা পান সারান। তাতেই চলে কোনোক্রমে।

পাশের ঘরে গিয়ে হাতড়ে হাতড়ে দেরাজটা খুললেন। সেলোটেপ আটকে চশমাটা চলছিলো। আজ সেটারও পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। প্রচন্ড একটা ঘুঁষিতে তিনি যখন মাটি নিলেন চশমাটা যে কোথায় ছিটকে পড়ল….!

দেরাজ হাতড়ে একটা কৌটো পেলেন। আঙুল দিয়ে একদম তলানিতে লেগে থাকা একটু মলম নিয়ে কপালের আর ঠোঁটের ক্ষতগুলোতে লাগালেন। ম্যাজিকের মত কাজ হল – মূহুর্তের মধ্যে কাটাগুলো জুড়িয়ে গেলো।

কৌটোটা রেখে একটা চাবির গোছা হাতে তুলে নিলেন।

এসে থামলেন বন্ধ থাকা একটা দরজার সামনে। চাবি ঘুরিয়ে মর্চে পড়া বড় তালাটা খুলতেই বহুকালের বন্ধ থাকা ঘরের মধ্যে থেকে কেমিক্যালের পাঁচমেশালি একটা গন্ধ এসে নাকে লাগল। বুক ভরে শ্বাস নিলেন।

গন্ধটা যেন তার মাথার মধ্যে ঢুকে ঝিমিয়ে পড়া স্নায়ুগুলোকে আবার উদ্দীপ্ত করে তুলল – ঘোলাটে চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো।

শতচ্ছিন্ন একটা খয়েরি কোট আর বাদামি প্যান্ট পরা শীতের ঝরা পাতার মত দেহটাকে নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে দাঁড়ালেন বন্ধ একটা জানলার সামনে। জানলা খুলতেই ফ্যাকাশে চাঁদের আলো ঢুকে ঘরের কিছুটা অংশ দৃষ্টিগোচর হল।

ছোটোবড়ো অসংখ্য যন্ত্রপাতি, ফ্লাস্ক, টেস্ট টিউব, বীকার – শতাব্দীর ধুলো জমে রয়েছে গায়ে। দেশের অবস্থাটাও তো সেরকমই। যবে থেকে মানুষ ধর্মকে সবার থেকে বড় করে দেখতে শুরু করল, মানুষের থেকেও মূল্যবান হয়ে উঠল সংস্কার, অন্ধবিশ্বাস যেদিন শ্বাসরোধ করল বাকস্বাধীনতার, বিজ্ঞান যেদিন ঘুমোতে গেল কবরের তলায় সেদিন থেকেই দেশটাও ধ্বংসের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।

চারিদিকে অনাহার, অশিক্ষা আর ‘গণতন্ত্রে’র বোঝা মাথায় নিয়ে ধুঁকতে থাকা মানুষের দল। অন্যান্য দেশ যেখানে আজ বিভিন্ন গ্রহে কলোনি স্থাপন করেছে, তখন এই দেশের প্রধাণ ব্যবসা দেশে দেশে হিউম্যান রিসোর্স সাপ্লাই দেওয়া – মানুষ বিক্রি। এত সস্তাদরে শ্রমিক আর কোথায় পাওয়া যাবে?

সঠিক সময়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি তিনি। করলেও বা কে শুনতো? সবাই তো তখন মেতেছিলো ধ্বংসের খেলায়। বিধর্মীর রক্তের স্বাদ পেয়ে টগবগিয়ে ফুটছিলো গোটা দেশ।

চাইলে তিনি চলে যেতেই পারতেন অন্য কোনো দেশে। পাড়ি দিতে পারতেন গ্রহান্তরের কোনো কলোনিতে। যাননি। এক অদ্ভুত মায়া যেন তাকে বেঁধে রেখেছিলো।

জানলার বাইরের গাছটায় একটা পেঁচা ডেকে উঠল – ভাবনায় ছেদ পড়ল। দেরি করলে চলবে না। সদলবলে এল বলে সব।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশের আলমারি থেকে একটা লম্বাটে কাঠের বাক্স বার করলেন বৃদ্ধ। খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে দাঁড়ালেন বাড়ির বাইরে। সামনে ধুধু মাঠ।

চাঁদের আলোয় সুবৃহৎ ভগ্নপ্রায় বাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনো প্রাগৈতিহাসিক জীবের কঙ্কালের মত।

সামনের মাঠটা জ্যোৎস্নার আলোতে ধুয়ে যাচ্ছে। কত বয়স হল যেন তার? মনে করতে পারেন না কিছুতেই।

ছেঁড়াখোঁড়া কোট আর প্যান্টটা পরে মাঠে ঘাটে বাজারে ঘুরে বেড়ান। সাদা ধবধবে দাড়িটা নেমে এসেছে বুকের কাছে।

নিজের মনেই কতকিছু বকেন – কখনও ল্যাটিন, কখনও সংস্কৃত, স্প্যানিশ, সুইডিশ, গ্রীক, আইসল্যান্ডিক।

লোকে ডাকে দাড়ি পাগলা বলে।

কখনো ঢিল টিল ছোঁড়ে। তিনি এখন এসব আর গায়ে মাখেন না।

কেউ জানে না তিনি কে। তিনি নিজেও মাঝেমধ্যে মনে করতে পারেন না। ভুরুদুটো কুঁচকে মাঝেমাঝে মনে করার চেষ্টা করেন – শুধু হিজিবিজি কিছু ফর্মুলা ছাড়া কিচ্ছু মাথায় আসে না।

আজকে সকালে যখন গাড়িটা এসে বাগানের সামনে ব্রেক কষল তিনি একদমই খেয়াল করেননি। মশগুল হয়ে ছিলেন নিজের কাজে – নিষিদ্ধ কাজ। পড়ানো। বিজ্ঞান, ইংরেজি ইত্যাদি পড়ানো।

নদীর ধারের বিশাল শ্রমিকবস্তির কিছু বাচ্ছা ছেলেমেয়ে রোজ সকালেই আসে তার কাছে। যতটা পারেন শেখানোর চেষ্টা করেন। পড়াশোনার প্রিভিলেজটা এখন সমাজের ওপরতলার মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আর এদের ভবিষ্যৎ? শ্রমিক বা সৈনিক।

পড়াশোনা করা বা করানোর চেষ্টা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে মৃত্যুদণ্ড অবধি হতে পারে।

সোজা ঘরে ঢুকে এলো তিনটে লোক। পুলিশের ইউনিফর্ম বলে আর কিছু নেই। এদের কপালের মাঝখানে শুধু থাকে উল্কি – এক বিশেষ ধর্মের চিহ্নস্বরূপ।

পড়ানোর ঘরটা যখন ভাঙচুর করতে শুরু করে তখন তিনি জানতেন বাধা দেওয়ার কোনো মানে হয় না – পেরে উঠবেন না।

ঘরের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়ানো বাচ্ছাগুলোর গায়ে হাত পড়তে আর ঠিক থাকতে পারেননি। শোলার মত দেহটা নিয়েও বাধা দিতে গিয়েছিলেন।

চড়, ঘুঁষি, লাথি। তাও দাঁতে দাঁত চেপে একবার ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। কপালে কি একটা এসে লাগল….. অন্ধকার….

একটু জ্ঞান ফিরতে দেখলেন সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে। নাকি রাত্তির? কে জানে!

তবে একটা ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। এরা ফিরে আসবে। আজ রাতেই আসবে। এরা কিছু ভোলে না। ক্ষমা এদের অভিধানে নেই। এরা শত্রুর শেষ রাখে না। তিনি নিজের চোখে পাশের দুটো বাড়ি পুড়ে ছাই হতে দেখেছেন – ভেতরের লোক সমেত।

অপরাধ ছিলো গুরুতর। একজন চেষ্টা করেছিলো একটা পত্রিকা ছাপানোর, আর একজন ছিলো নাস্তিক।

আকাশের দিকে তাকালেন। কালপুরুষ – জ্বলজ্বল করছে লুব্ধক। একটা আশ্চর্য উত্তেজনা কাজ করছে সারা দেহে। স্নায়ুগুলো দিয়ে যেন আগুন ছুটছে – ঠান্ডা, স্নিগ্ধ আগুন।

দূরে মাঠের প্রান্তে একটা আলোর বিন্দু দেখা গেলো – মশাল।

কত যেন বয়স হলো তার?

মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ চমকালো – একশো আটান্ন বছর তিন মাস সতেরো দিন।

আরো দু’তিনটে আলোর ফুটকি – পাঁচটা, ছটা। এগিয়ে আসছে।

নিচু হয়ে বসে কাঠের বাক্সটা খুললেন। চাঁদের আলোয় ধাতব যন্ত্রটা চকচক করে উঠলো – তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সাংঘাতিক আবিষ্কার।

ভেবেছিলেন এটা আর কখনো ব্যবহার করতে হবে না। হিংসায় তিনি বিশ্বাসী নন। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় আর নেই।

মশালের আলোগুলো আর বিন্দু হয়ে নেই। স্পষ্ট মানুষের চেহারা বোঝা যাচ্ছে। কত লোক হবে? পঞ্চাশ, ষাট, একশো?

শোনা যাচ্ছে তাদের উন্মত্ত আদিম রণহুঙ্কার – ঈশ্বরের নামে জয়ধ্বনি।

মনে মনে হাসলেন তিনি। ইভোলিউশন এদের কাছে হার মেনেছে।

কাঠের বাক্সটা থেকে জিনিসটা বার করে উঠে দাঁড়ালেন।

তোলপাড় হচ্ছে যেন মাথার মধ্যে। সব কিছু ফ্ল্যাশব্যাকের মত মনে পড়ে যাচ্ছে – নিউটন, প্রহ্লাদ, সেই গোলঞ্চ গাছ, ঈজিপ্ট, নরওয়ে, জার্মানি, সন্ডার্স, ক্রোল, মনরো দ্বীপ, কর্ভাস, বিধুশেখর।

তার যে অপঘাতে ছাড়া মৃত্যু নেই – বহুবছর ধরে মিরাকিউল সেবনের ফল।

লোকগুলো আর বেশী দূরে নেই। মশালের আলোয় দক্ষিণদিকের আকাশ লাল। হিংস্র চিৎকারে কান পাতা দায়।

শীর্ণ শরীরটাকে ধনুকের ছিলার মত টান করে তাদের দিকে ফিরে পা ফাঁক করে দাঁড়ালেন তিনি।

রক্তলোলুপ মানুষরূপী অসুরের দল আর মাত্র একশো গজ দূরে – মশালের লেলিহান শিখা লকলকিয়ে উঠছে।

ডান হাতের মুঠোয় অস্ত্রটা শক্ত করে ধরলেন বৃদ্ধ। শিরা ওঠা শীর্ণ হাত আজ আর কাঁপছে না।

চোয়াল শক্ত করে অ্যানাইহিলিন পিস্তলের ট্রিগারে হাত রাখলেন বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক – “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি – নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। আমি, প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শংকু।”

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ নির্বাণ রায়

প্রচ্ছদ ~ ওঙ্কার নাথ

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply