শুধুই নয় টিউশনি

Anirban & Arijit, Childhood, Humor, Love Story, Nostalgia, Short Story, Tuition, আদতে আনাড়ি, বাংলা

স্কুল ছুটি হতে চারটে বেজে গেল। হাতে আর মাত্র দেড়ঘন্টা সময়। পোঁ পোঁ করে সাইকেল চালিয়ে আমি আর অনির্বাণ চললুম বাড়ির দিকে। একই পাড়ায় বাড়ি আমাদের, তাই ঠিক হল ৫ টা নাগাদ ও আমায় ডাকতে আসলে একসাথে রওনা দেব।

গন্তব্য চিন্ময়বাবুর কোচিং, বায়োলজির সেলিব্রিটি টিচার। চন্ডীতলায় দোতলা বাড়ি, তার একতলার বিশাল হলঘরে বসে ওনার টোল। হাই ডিমান্ডের কাছে মাথানত করেন না চিন্ময়বাবু, কিন্তু পড়ুয়াদের মায়েরাও নাছোড়বান্দা।

– স্যার, প্লিজ একটু যেভাবে হোক ম্যানেজ করে দিন। ছেলেকে বায়ো অ্যাডিশনাল নিতে বলেছিলাম শুধু আপনার কথা ভেবেই।

– দেখুন, আমার ঘরে আর বসার জায়গা হবে না। আপনি বোঝার চেষ্টা করুন।

– আপনি ঘরের জানলা টা খোলা রেখে দেবেন স্যার। আমার ছেলে বাইরের এই সিঁড়ি তে বসে সব শুনে নেবে।

একলব্য স্টাইলে পড়াশুনা আর কি। তবে অত্যন্ত ভদ্র হওয়ায় আর টাকার খাঁই না থাকায় চিন্ময়বাবু সবসময় ফিরিয়ে দিতে পারেন না ছাত্রদের। তাই ঘরের সোফা সরিয়ে, শোকেস ছাদে পাঠিয়ে বসার জায়গার ব্যবস্থা একটা করেই ফেলেন।

মিতালী দি আমাদের থেকে বয়সে অনেক বড়। বায়োটেকনোলজি নিয়ে পড়ছে। চারিদিকে প্রাইভেট টিউশন নিয়ে ধরপাকড় শুরু হওয়ায় চিন্ময়বাবু ওনার নিজের ছাত্রী মিতালি কেই তাই বলেছেন রোজ পড়ানোর সময় এসে বসতে আর ওনাকে সাহায্য করতে। ছাত্রছাত্রীদেরও বলে দিয়েছেন যে কেউ জিজ্ঞেস করলে যেন স্যারের নাম না নিয়ে বলে মিতালীদির টিউশনে পড়তে যাচ্ছি। আসলে স্যর যুক্ত আছেন স্কুলের সাথে, তাই এই কোচিং ক্লাস আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের মুখ চেয়ে আর গার্জেনদের পায়ে পড়ে যাওয়া এড়াতে তিনি এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। এদিকে মিতালীদির উপস্থিতি আমাদের, মানে ছাত্রসমাজে স্পেশালি, একটা আলাদা অ্যাট্রাকশান এনে দিয়েছে। বয়ঃসন্ধিতে সদ্য এনট্রি মেরেছি, এইটুকু তো মাফ করা যেতেই পারে। তার ওপর আবার কোয়েড ব্যাচ। মানে পিঠের দুসাইড দিয়ে ডানাদুটো জাস্ট বেরবো বেরবো করছে।

যাই হোক, আজকের এই আলাদা রকমের উত্তেজনার একমাত্র কারণ হচ্ছে আগের সপ্তাহে চিন্ময়বাবু কথা দিয়েছেন যে আজকে পড়াবেন সেই হট টপিক। আজ আমরা একলাফে হয়ে উঠব নাবালক থেকে সাবালক, শিশু থেকে যীশু। সৃষ্টির পরম সত্য উন্মোচিত হবে আমাদের চোখের সামনে, ওপেনলি। আজকের চ্যাপ্টার,

“জনন!”

||

হাঁসুলির মাঠ টা পেরিয়ে চন্ডীতলার রাস্তা দিয়ে যদি বিকেলের দিকে যাতায়াত করেন, তাহলে নির্ঘাত আপনার চোখে পড়বে হলুদ দোতলা বাড়ির সামনে একদল স্কুলপড়ুয়াদের জটলা আর তাদের তারস্বর চিৎকার। এ আমাদের কাছে এক অলিখিত নিয়ম। স্যারের ক্লাস শুরুর আধঘন্টা আগেই পৌঁছে গিয়ে বাইরে আড্ডা জমানো। কেউ বসে সাইকেলের সিটে, কেউ পাঁচিলে, দু একজন স্যরের রকে। আর ছাত্রীদের দল স্যারের বাড়ির দরজার সামনে।

লেডিবার্ডের টিং টিং বেলের আওয়াজ কিন্তু আমাদের ক্র‍্যাং ক্র‍্যাং আওয়াজের থেকে বেশ আলাদা। তাই, পাশের গলির বাঁক থেকে ওই আওয়াজ এলেই আমরা বুঝতে পারি দেবলীনা আসছে। চোখে মোটা করে পরা কাজল, অনেকটা সুরমার মতো লাগে দেখতে। তবে বেশ মিশুকে। দেবলীনা এসে এক পা নামিয়ে দাঁড়াতেই আমাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন টা উড়ে গেল।

– রূপম কাল তোকে দেখেছে একজনের বাইকের পিছনে বসে যাচ্ছিলিস। কে ছিল রে?

– ও আমার কেউ নয়, পিসতুতো ভাই হয়।

– অ! তোর দূর সম্পর্কের পিসি?

– থাম বলে দিচ্ছি!

দেবলীনা সাইকেল টা দেওয়ালে হেলান দিয়ে কাঁধের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গেল শুচিস্মিতার দিকে।

– জানিস শুচি, কাল জয়তী কষিয়ে একটা থাপ্পড় মেরেছে শুভব্রত কে! প্রোপোজ করতে গেছিল নাকি।

আমাদের মুখ হাঁ হয়ে গেল এই শুনে। শুভব্রত তো আমাদেরই স্কুলের মাল। অনেকদিন ধরে জয়তী জয়তী করছিল। চড় টা যেন আমাদেরই গালে এসে পড়ল। এইসব কেসে বেশ রিস্ক। তবে, নো রিস্ক নো গেন। তাই কয়েক মাস আগেই আমার আর অনির্বাণের টারগেট ছিল এই টিউশনেরই মধুরিমা।

আরে টারগেট মানে যা ভাবছেন তা নয়, আমরা সমাজ সেবক। মধুরিমা বেশ ব্রাইট স্টুডেন্ট। দেখতেও একদম প্রীতি জিন্টা। একা চলাফেরা করে না, সাথে ওর মা এসে ছেড়ে যায়, আবার ছুটির সময় পিক আপ। এদিকে আমাদের রূপম হচ্ছে চকোলেট হিরো। তাই লাগাও আগ দোনো তারাফ। ইচ্ছে থাকলেই ১০০ রকমের উপায় আসে, আর সাথে আসে ৫০ জন পার্টনার ইন ক্রাইম। দুজনকেই আমরা আলাদা আলাদা ভাবে বললাম যে, “জানিস তো, তোকে না ওর বেশ মনে ধরেছে, বলতে পারছে না, তাই আমাদের দিয়ে বলাচ্ছে।” দুজনের এক্সপ্রেশন দেখেই গর্বে আমাদের বুক ফুলে উঠল, বীজ পোঁতা শেষ, এবার চারাগাছ বেরনোর অপেক্ষা।

অন্যন্য কোচিং ক্লাস থেকেও আমরা খবর পেতে শুরু করলাম এই “রূপম-মধুরিমা” কাহিনীর। সবাই যেন মন থেকে চায় ওদের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠুক। আমরাও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলাম সলতে তে আগুন দিয়ে। কিন্তু বোম টা ফাটল কিছুদিন পর।

চন্ডীতলার রাস্তায় মানুষজন সাইকেল, রিক্সা, বাইক দাঁড় করিয়ে শুনল মধুরিমার মায়ের তেজস্ক্রিয় গালিবর্ষণ। টার্গেট? সে কি আর বলে দিতে হবে! ভিড়ের মাঝে মাথা নিচু করে সব শুনে গেলাম আমি আর অনির্বাণ, আর ভাবছিলাম এই মাস্টার প্ল্যান ফাঁস হয়ে গেল কিভাবে!

তবে বিশ্বাস করুন, এই কদিন আগে যা শুনলাম, তাতে বুঝলাম ভালোবাসার কিছু নিজস্ব চয়েস আছে, যা কিনা উঠতি ম্যাচমেকারদের প্রচেষ্টা কে সাধুবাদ জানাতে চায় না। সত্যিই যদি কে কার সঙ্গী হবে তা আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে শাদি ডট কম বা ভারত ম্যাট্রিমনির কি দরকার? প্রকৃতি সেদিন দুজন বালকের ভবিষ্যৎ স্টার্ট-আপের স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল যখন খবর এল যে মধুরিমা নাকি রূপম কে প্রোপোজ করেছে আর তাদের এখন বিভিন্ন স্থানে একত্রে দেখা যাচ্ছে!

||

চিন্ময়বাবু মধ্যমণি হয়ে বসে বই খুললেন। পাশ থেকে নিলেন একটা সাদা খাতা আর ফাউন্টেন পেন। চৌধুরি-সাঁতরার বইয়ের পাতা উলটে পালটে ১৭৭ নম্বর পাতা খুলে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে সামনে রাখলেন।

– দেখতে অসুবিধা হলে সামনে এগিয়ে আসতে পারো। স্ত্রী জননতন্তের ছবি আঁকব আগে, তারপর বোঝাবো।

টাইটানিকের ছবি আঁকার সিনটা চট করে মাথায় খেলে গেল একবার। ওর বেশি অ্যাকসেস এখনও পাইনি। ছেলে মেয়েরা লজ্জায় মুখ নিচু করে তাকিয়ে, সবার মুখেই দুষ্টু হাসি। কপোত কপোতীরা একবার করে সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে নিল আড়চোখে, ভাবখানা এমন যেন, “ভালো করে বুঝে নাও আজ, কিছু প্রশ্ন থাকলে করে নিও, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”

মিতালী দিও বসে সামনেই। ভাই বোনেদের হাবভাব দেখে সেও খুব কষ্ট করে হাসি চেপে। আঁকা শেষ করে স্যার মিতালী দির দিকে চাইলেন।

– মিতালী, তুই বরং আজকে আয়।

মিতালী দিও যেন স্বস্তি পেয়ে ঝটপট ব্যাগ গুছিয়ে ধাঁ। আমরা তখন হাসব না কাঁদব সেটাই বুঝতে পারছি না। বোঝাতে শুরু করলেন স্যার। চোখের সামনে একটার পর একটা পর্দা সরে যেতে লাগল। নিজেদের শরীর নিয়ে বেশ গর্ব অনুভব করলাম। মানুষ না রোবট আমরা, ভেতরে কতরকম কলকব্জা, কতরকম হরমোন। স্ত্রী পুরুষের হরমোনের আবার আলাদা আলাদা নাম। মাথায় একটাই গান আসছে এখন বারবার। “মিলন হবে কতদিনে….”

– শুক্রানু দ্বারা ডিম্বানু নিষিক্ত হওয়ার আনুমানিক নয় মাস নয় দিন পরে অপত্যের জন্ম হয়। ক্ষুদিরামের গানটায় ভুল ছিল, মনে রেখো।

জয় চিন্ময় স্যারের জয়!

||

– টোকাটাও একটা আর্ট জানো তো? টুকতে গেলেও বইটা একবার ওলটাতে হয়।

এই বলে চিন্ময় স্যার বইটা এগিয়ে দিলেন কৌশিকের দিকে। কৌশিকও হাসিমুখে বই নিয়ে এক কোণে গিয়ে বসল। আজকের পরীক্ষা আগের দিনের চ্যাপ্টার থেকে। কিন্তু শুরুতেই ফচকে কৌশিক হাতেনাতে ধরা পড়েছে চোথা সমেত। টিউশনের পরীক্ষাতেও যে কেউ চোথা করতে পারে, তা আজ প্রথম চাক্ষুষ করলাম। তবে স্যারও ওকে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিলেন বই থেকে টুকেই ৫০ নম্বরের পরীক্ষায় ২০ পেয়ে দেখাতে।

খাতা দেখা শেষ হল। কৌশিক পেল ২। স্যার হাসছেন, আমরা হাসছি, আর শোলের কালিয়ার মত কৌশিকও হাসছে।

||

কোচিং শেষে বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতাও আমাদের মন্দ নয়। মৌপিয়া সাইকেল নিয়ে আসে, কিন্তু যাওয়ার সময় আমাকে আর অনির্বাণ কে রিকোয়েস্ট করে ওর সাথে ফিরতে, কারণ ওর পাড়া বেশ অন্ধকার, আর কুকুরের খুব উপদ্রব। তবে এটাই যে একমাত্র কারণ নয়, তা বুঝতে আমার এই মোটা মাথায় একটু সময় লাগল, যখন দেখলাম এই ছুতোতেই অনির্বাণ বেশ সহজেই মৌপিয়ার বাড়ি ট্র‍্যাক করে ফেলল, সাইকেল পাশে নিয়ে একসাথে হাঁটবার সময় অনির্বাণ আর মৌপিয়ার থেকে আমার ডিসটেন্স ৫ হাত মত বেড়ে গেল, আর স্যারের নোট আদানপ্রদানের অজুহাতে ওদের মন দেওয়া নেওয়াও হয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই হাড্ডি, মানে আমি আর কি, একা একা প্যাডেল করে বাড়ি ফেরা শুরু করলাম!

তবে পুজোর পর বিজয়া দশমীতে কোন স্যার ভালো পড়ান, বা কোন স্যার ঘুমোন – এইসব মাথাতেই থাকে না। সোজা হামলা! প্রায় ৩০ জোড়া হাত একসাথে স্যারের পায়ের দিকে এগিয়ে গেল “বিজয়ার প্রণাম নেবেন স্যার” বলে। এই আকস্মিক আক্রমণে স্যার দুপা পিছোতে গিয়ে ধপ করে সোফায় বসে খিলখিল করে হেসে উঠলেন, “আরে আরে থাক থাক, হাতজোড় করে প্রণাম কর রে হতভাগা গুলো, আমার হেব্বি সুড়সুড়ির ধাত। দুজন কেউ একটু যা রতনের দোকান থেকে সবার জন্য শিঙাড়া আর জিলিপি নিয়ে আয় দিকিনি, আমি টাকা দিচ্ছি।”

তবে সব টিচার আবার চিন্ময় স্যারের মত ছিলেন না, তাই তাদের জন্য থাকে আলাদা ডোজ।

– স্যার, কাল আমাদের চিন্ময় বাবু না শিঙাড়া জিলিপি সব খাওয়ালেন, খুব ভালো স্যার উনি। আবার খাওয়াবেন বলেছেন কালীপূজোয়।

এই ট্রিক টা ৭০% কেসে খেটে যায়, যতই হোক কম্পিটিশনের বাজার। তবে এতেও চিঁড়ে না ভিজলে আমরা লজ্জার মাথা খেয়ে হাত পাতি, “স্যার, পয়সা দিন, বাদাম আর বাতাসা খাব।”

|| ♦ ||

সেই সময় আর ফিরে আসবে না। অনেক বন্ধুদের সাথে আর যোগাযোগই নেই। আজ যখন মনে পড়ে সেইসব টিউশনির দিনগুলো, বুঝতে পারি কত অপরিণত ছিলাম আমরা তখন। কিন্তু সেইসব দিনের সিদ্ধান্ত, ভুলভ্রান্তি, শিক্ষা, প্রেমে পড়া, ঘটকালি, ব্রেক আপ – এই সবই আমাদের কৈশরকে এমন এক রঙে রাঙিয়েছিল, যা এখন আমরা বসে বসে ভাবলে মন ভালো করে দেয়।

ও হ্যাঁ, ওপরের চরিত্রগুলোর সবাই কিন্তু বাস্তব। জীবন যে কখন কোনদিকে বাঁক নেয়, তার ছক আমরা ধরতেই পারি না। আমার বন্ধু অনির্বাণ আজ জয়তীর স্বামী। আমি পিকলু বিয়ে করেছি পাশের বাড়ির মেয়েকে, যে আমার সাথে কোনও কোচিং-এ পড়ত না। মধুরিমা আর রূপম আজ আলাদা আলাদা সংসারে সুখী। শুভব্রত বিয়ে করেছে ওর ৩৭ তম প্রেমিকা কে। দেবলীনা আজও সেই লেডিবার্ডেই যাতায়াত করে। মৌপিয়া ওর ছেলের নাম রেখেছে অনিকেতের নামে। আর..

..মিতালী দি আজ আমাদের চিনতে পারে না।

||♣||

আমি জানি যে এইরকম অনেক গল্প জমে আছে আপনাদের কাছেও। হোক না সেই গল্প, জমে উঠুক আড্ডা।

আসলে আমরা তো বুঝি যে শুধুই নয় টিউশনি, সঙ্গে থাকে হাজার কাহিনী! 🙂

~~~♠~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

Leave a Reply