কড়া নাড়ি স্বর্গের দরজায়

Anirban & Arijit, Conversation, Humor, Short Story, আদতে আনাড়ি, বাংলা

প্রায় দশ বারো বার কড়া নাড়ার পর বিশাল দরজা একটু ফাঁক হল। ভেতর থেকে মুখ বাড়ালেন একজন বছর চল্লিশের ভদ্রমহিলা।

– কাকে চাই?

আমি কিছু বলার আগেই দেখি এতক্ষণ আমাকে ফলো করে আসা কুকুরটা দরজার ওই ফাঁক দিয়েই সুড়ুত করে ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম,

– আজ্ঞে, চিত্রবাবু আছেন?

– না, উনি তো বাজার করতে বেরোলেন একটু আগেই। আপনার কিছু দরকার ছিল?

– হ্যাঁ, ইয়ে মানে, আমি তো আজ….

– ওহো, তা বলবেন তো সেটা আগে। কেউ আনতে যায়নি?

– না কাউকে তো দেখিনি।

– এমন তো হওয়ার কথা নয়। আসুন ভেতরে আসুন। অফিসঘরে চলুন, আমি দেখে দিচ্ছি।

– আপনাকে তো ঠিক চিনতে…..?

– আমি নন্দিনী।

– ওহো, সরি বৌদি, আপনাকে চিনতে পারিনি একেবারেই।

– আরে তাতে কি আছে? আসুন ভেতরে। কি নাম আপনার?

– আজ্ঞে, অরিজিৎ গাঙ্গুলি, সাবর্ণ্য গোত্র।

– আর কি লাভ গোত্র জেনে। কিন্তু আপনার নামে আজ তো কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেখছি না। দাঁড়ান, আর একবার খুঁজে নি।…. নাহ্, নেই যে।

– অকালমৃত্যু বলে নেই মনে হচ্ছে।

– না না, সবরকম ক্যাটেগরিতেই নাম আগাম নথিভুক্ত করা থাকে। আপনাকে কেউ আনতে যায়নি দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল।

– এরকম বলবেন না প্লিজ।

– আমি আর বলার কে?

বাইরে মেনগেট খোলার শব্দে তাকিয়ে দেখি চিত্রগুপ্ত বাবু ঢুকছেন দুহাতে বড় বড় দুটো বাজারের থলি ঝুলিয়ে, একটা থেকে মোষের শিং এর মতো সবুজ চিচিঙ্গে বাইরে উঁকি মারছে।

“ওই এলেন,” বলেই বৌদি বেরিয়ে গিয়ে বাজারের ব্যাগ ওনার হাত থেকে নিয়ে অফিসঘরের দিকে দেখিয়ে দিলেন। চিত্রবাবু চটি ছেড়ে পা মুছে ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকাতেই আমি দাঁড়িয়ে উঠে হাতজোড় করে নমস্কার করলাম।

– আরে, বসুন বসুন। গিন্নি বললেন আপনার নাকি আজ আসার কথা নয়। দাঁড়ান, আমি একবার দেখে নিই আপনার প্রোফাইলটা।

দেখে অবাক হলাম যে এই ফেসবুক টুইটারের যুগেও ওনার ভরসা কিন্তু সেই বিশাল খাতাতেই। সেটাতেই সটাসট পাতা উলটে উনি আমার প্রোফাইল বার করে ফেললেন। চশমা তুলে চোখে দিয়ে দেখতে শুরু করলেন খুঁটিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর চশমা খুলে রেখে আমার দিকে তাকালেন।

– না মশাই, আমি ড্যাম শিওর, আপনার আজকে আসার কথা নয়। এখনও আপনার তিনটে পরকীয়া, দুটো বই প্রকাশ, আর একটা আইরিশ মেয়ের সাথে কেচ্ছা করার কথা স্পষ্ট লেখা আছে।

ঠিক তিনবার ঢোঁক গিললাম আমি এই শুনে। জিজ্ঞেস করলাম,

– আইরিশ মেয়ে? ঠিক দেখছেন তো?

চিত্রবাবু কপালে হাত চাপড়ালেন।

– মরবেন মরুন, ছড়ালেন কেন? হঠাৎ সাধ কেন উথলে উঠল আপনার?

– না মানে, ফেসবুকে একটা সাহিত্য গ্রুপে “মরণের পরে” ইভেন্ট চলছিল। তা আমার লেখায় ডিটেলিং বরাবরই একটু বেশি থাকে। তাই মরণের পরে কি হয়, সেটা না জেনে লিখতাম কি করে! তাই আর কি।

– ও হরি! তা কেমন মৃত্যু বেছে নিলেন?

– ইচ্ছামৃত্যু স্যার!

– আপনি আজব লোক অরিজিৎ বাবু। এবার বলুন তো দেখি আপনাকে কোথায় পাঠাই!

– যেখানে হোক পাঠিয়ে দিন। তবে তার আগে একটা ইচ্ছে ছিল আমার।

– এখনও সাধ মেটে নি? বলে ফেলুন।

– আজ্ঞে, মানিকবাবু, মানে সত্যজিৎ বাবুর সাথে একটু দেখা করা যাবে? আসলে ওনাকে নিয়েও একটা সিরিজ লিখছি তো। কয়েকটা জিনিস জানার ছিল।

– উনি তো স্বর্গে থাকেন।

– মানে? তাহলে এটা কোন জায়গা?

– নিজেকে ভাবেন কি মশাই? দেখুন মেনগেট দিয়ে আবার একটা কুকুর ঢুকল। আপনার কি মনে হয় এরা স্বর্গে আসছে? আজব!

– বলেন কি? ওই একটা গরুও তো আসছে পিছনে।

– গরু এখানে ঢুকবে না। ও স্বর্গের দিকে যাচ্ছে।

– যাহ্! নরক এত পরিস্কার, এত সবুজ স্নিগ্ধ চারিদিকে! কি সুন্দর বাঁধানো রাস্তাঘাট। এ যে উন্নয়নের জোয়ার দাদা!

– তা আর হবে না? উন্নয়নের সব কাণ্ডারিরা তো এখানেই এসে জোটেন।

– ওহ্, তার মানে খুনি, অপরাধী, রেপিস্ট, এরা সবাই এখানে থাকেন?

– হ্যাঁ থাকে তো। ওই যে দূরে দেখতে পাচ্ছেন বিশাল স্টেডিয়ামের মতো ঘেরা জায়গা?

জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই আমাদের সল্টলেক স্টেডিয়ামের সাইজের একটা পেল্লাই জায়গা, যার আবার মাথা ঢাকা।

– ওটা হল গিয়ে রেপিস্ট ভিলেজ। সব রেপিস্টরা ওখানে থাকে।

– মানে কি? ওরা ওখানে বহাল তবিয়তে থাকে? শাস্তি হয় না ওদের?

– গরম তেলে চোবানোর কথা ভাবছেন বুঝি? হা হা হা হা।

হাসিটা দেখে গা পিত্তি জ্বলে গেল আমার। তাকিয়ে রইলাম একইভাবে। হাসি থামলে উনি বললেন,

– আমাদের শাস্তি আলাদা রকমের দাদা। মস্তির মধ্যেই শাস্তি। সারাদিন ওরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে, খেলাধুলা করে। কিন্তু রাতে ওদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় অডিটোরিয়ামের ভেতর অপ্সরাদের নাচ দেখতে।

– আপনি মজা করছেন তো এবার? এ তো গ্র‍্যান্ড মস্তি হয়ে গেল।

– শুনুন পুরোটা। প্রত্যেক রেপিস্ট কে নগ্ন করে বসিয়ে দেওয়া আলাদা আলাদা চেয়ারে। আর সামনে এরপর শুরু হয় স্বল্পবসনা অপ্সরাদের বেলিড্যান্স।

– বলে যান। এরপরেও বলবেন এটা শাস্তি!

– এবারেই তো টুইস্ট। কিছুক্ষণ এইভাবে নাচ চলার পর অপ্সরারা তাদের বসন খুলতে শুরু করে। আর এইসময় রেপিস্টদের হাত পা বেঁধে ফেলা হয় চেয়ারে। এবার চেয়ারের দুদিকের হ্যান্ডেলের সাথে ফিট করে দেওয়া হয় একটা ধারালো ছুড়ি, যেটা ওদের যৌনাঙ্গের ঠিক হাফ ইঞ্চি ওপরে থাকে। অপ্সরাদের নাচ আরও বাড়তে থাকে, উদ্দাম নৃত্য আর শরীরী বিভঙ্গের সাথে এবার যোগ হয় চেয়ারে বসে থাকা দর্শনার্থীদের চিল চিৎকার।

আমার নিজেরই কেমন একটা যন্ত্রণা অনুভূত হল এই দৃশ্য কল্পনা করে। নরকের এই আইডিয়া মর্ত্যে একবার পৌঁছে দিতে পারলে কেমন হত সেটা ভেবেই দু এক মিনিট আনমনা হয়ে গেলাম। মনে হল খুব ভুল করে ফেলেছি এসে। কিন্তু আর তো উপায় নেই।

– কেমন লাগল শুনে অরিজিৎ বাবু?

– আপনারা ওয়াই ফাই বা ইন্টারনেট পান না এখানে? না মানে তাহলে একটা যোগসূত্র তৈরি করা যেত মর্ত্যের সাথে। অনেক উপকার হত দাদা।

– ওই ফেসিলিটি শুধু স্বর্গে। তবে মর্ত্যের সাথে কানেকশন ব্লক্ড। ওরা কেউ চায়ও না যোগাযোগ রাখতে আর। তবে এবার আপনি কাটুন তো দেখি। যেখান থেকে এসেছিলেন, চুপচাপ ফিরে যান। অনেক কাজ বাকি আমার। বাইরে লাইন পড়তে শুরু করেছে।

– কোথায় ফিরে যাব আমি? আমার বডি তো তন্দুরি হয়ে গেছে এতক্ষণে।

– কেলো করেছে! আপনার এই সাহিত্য গ্রুপকে আমি দেখে নেবো, এই বলে রাখলুম। দাঁড়ান সদানন্দ কে হাঁক দি। ওর কাছে কয়েকটা ওয়াইল্ড কার্ড আছে।

বজ্রগম্ভীর হাঁক শুনে আমার হৃৎপিন্ডটা দ্বিতীয়বারের জন্য বন্ধ হতে গিয়েও পারল না। দেখলুম মালকোঁচা মারা ধুতি পরে একজন ছুটে এসে হাঁপাতে লাগল, ভুঁড়িখানাও তার জব্বর।

– সদা শোন। লাস্ট যেবার স্বর্গ তে ইনস্পেকশনে গিয়েছিলিস, সেবার কয়েকটা প্রিভিলেজ কার্ড পেয়েছিলিস না?

– হ্যাঁ বাপি, কিন্তু কিসের জন্য চাই? পুনর্জন্ম স্কিম বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধু “আবার ঘষটাও রে” অফার চলছে। সেইরকম দুখানা আছে আমার কাছে।

– আহ্, এই তো। দে না একটা এনাকে। দিয়ে বিদেয় কর দেখি।

সদানন্দ বাবু আমার দিকে তাকিয়ে একবার আপাদমস্তক জরিপ করে নিলেন।

– অ! এই ব্যাপার। দুটো কার্ড আছে আমার কাছে। “মৃতের মর্ত্যে আগমন” ওয়াইল্ড কার্ড। ভ্যালিডিটি ৫০ বছর। সব আবার যে কে সেই হয়ে যাবে। দেবো?

আমি দেখলাম চয়েস যখন দিচ্ছে, তখন বাজিয়ে দেখতে ক্ষতি কি!

– আর একটা আছে বললেন। তাতে কি অফার পাওয়া যাবে?

– শখ কম নয় আপনার! আর একটা হচ্ছে “ঝুক গ্যায়া আসমান” সুপার ওয়াইল্ড কার্ড।

– অ্যা এই তো! সিনেমাটার মতই হবে তো সব? সায়রা বানু কে দেখতে পাব আবার?

– বাপি, এই লোকটাকে রেপিস্ট ভিলেজে পাঠাও বলে দিচ্ছি। ডেঞ্জারাস মাল।

– আরে আরে, চটছেন কেন? গুলিয়ে ফেলছেন যার তার সাথে। ওই “ঝুক গ্যায়া” তেই রাজি।

– ডেথ সার্টিফিকেটের সাথে আধার লিঙ্ক করিয়েছেন?

– সেটাও কি শালা আমি করাবো নাকি!

– ওকে, তাহলে হল না। প্রথমটা অ্যাক্টিভেট করে দিচ্ছি।

– আচ্ছা, এর পরে যখন আসব, তখনও কি এখানেই আসতে হবে? যদি স্বর্গে যাওয়ার কিছু টিপস দিয়ে দেন।

– বাইরে চলুন। বাপি এলাম, ওনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।

বাইরে এসে দাঁড়াতেই সদানন্দ বাবু আমার কানের কাছে এগিয়ে এলেন।

– এইসব প্রশ্ন অমন দুম করে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলে হয়? শুনে রাখুন। পরের বার কেউ দরজা খুললে আমার নাম বলবেন। তারপর আমরা রফা করে নেব। চিন্তা করবেন না। ওদিকেই পাঠিয়ে দেব।

– বিনিময়ে আপনি কি নেবেন?

– লজ্জা করল না আপনার এই প্রশ্নটা করতে? সারাদিন শুয়ে বসে কাটাচ্ছো, রাতে বই, সকালে ফেসবুক, রাজার ব্যাটা এয়েছেন আমার।

– এ কি! আপনার গলার আওয়াজ বদলে যাচ্ছে কেন?

– কী? ভাট বকছে আবার! এবার থেকে লাঠিপেটা করতে হবে সকাল সকাল, বাজারটা কি তোমার বাবা যাবে?

– কি বলছেন কি? ওয়াইল্ড কার্ডটা……

শরীর টা গরম হতে শুরু করল। কি প্রচণ্ড এই উত্তাপ! দরদর করে ঘামছি। চোখ খুলতেই দেখি সিলিঙের পাখাটা বন্ধ করে দিয়েছে কেউ। পাশ থেকে আওয়াজটা এল,

– পাখা বন্ধ না করা অবধি লাটসাহেবের ঘুম ভাঙে না।

তাকিয়ে দেখি সেই মহিলা, যাকে আমি গিন্নি বলে ডাকতাম। আধখোলা চোখে বললাম,

– তোমাকে না ঠিক সায়রা বানুর মতো দেখতে।

গিন্নি মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠল,

– মরণ!

~~~♣~~~

লেখক ~ অরিজিৎ গাঙ্গুলি

www.facebook.com/anariminds

Leave a Reply