তরল রহস্য

Friends, Short Story, Story, Supernatural, Thriller, আদতে আনাড়ি, বাংলা

— ডঃ সেন আপনি কীঅ্যাম্বিগুয়েশনএর আক্ষরিক অর্থ জানেন? একটু অন্যমনস্ক ভাবেই বললেন মিঃ লাহা।
আমি এখন এরকম প্রশ্নের জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। আর থাকতে যাবই বা কেন? আমি তো আর কোন স্কুল বা কলেজের অধ্যাপক নই! তাছাড়া আমি কী সর্বদা, সাথে ডিকশেনারি নিয়ে ঘুরি! যেকোন সময়ে খুলে প্রতিটি শব্দের মানে সহজে বলে দেবো! এমনিতেই আমার ভাষাতত্ত্বের উপর জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আমি হলাম গিয়ে ডাক্তার মানুষ, দিন রাত রোগ নিয়ে আমার সংসার, এমন প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে প্রত্যাশা করা নিতান্তই ছেলেমানুষী।

আমি একটু কাচুমাচু করে বললাম,
হয়তজানাছিল, তবে এই মুহূর্তে মাথায় আসছে না, আপনি বলুন না কী?

মিঃ লাহা খাটে শুয়ে ছিলেন। এবার একটু নড়েচড়ে বসে বললেন,
— 
তবে একটা গল্প বলি শুনুন, আপনার তেমন তাড়া নেই,তো? যদিও এই বৃষ্টিতে আপনি বেরোতে পারবেন বলে মনে হয় না। তার থেকে বরং আপনি বসে গল্প শুনুন। আমি মদনকে একটু কফি করতে বলি।
বলে, তাঁর চাকর মদনকে দুকাপ কফি করতে বললেন।

রুদ্রশেখর লাহা হলেন আমার পেসেন্ট। স্কটল্যান্ড কমিউনিটি কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং একজন সফল জৈবরসায়ন বিজ্ঞানী। রিটায়ার্ড করার পর দক্ষিন কলকাতায় এসে বাসা বেঁধেছেন প্রায় বছর পাঁচেক আগে। এখন বয়স হয়েছে যথেষ্ট। মস্তিষ্ক চাইলেও শরীর ঠিকঠাক চলে না। শুনেছি মানুষটি তাঁর জীবনে অনেক রহস্যময় অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন। কাজেই ওনার কাছে গল্প শোনার লোভ, আমার মত গল্পপ্রেমিক খুব সহজে সংবরণ করতে পারবে না সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

তাছাড়া, এখন বাইরে যেভাবে আকাশভাঙা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তা ঘণ্টা খানেকের আগে থামবে বলে মনে হয়না। প্রবল মেঘের ঘনঘটার সাথে মুহুর্মুহু বিদ্যুৎবিভ্রাট বারে বারে মনে করিয়ে দিচ্ছে আজ বাড়ি ফিরতে বেশ বেগ পেতে হবে। আমি সব কাজ সেরেই মিঃ লাহার বাড়ি আসি। তাঁদের ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান হওয়ার দরুন তাঁর সাথে আমার সখ্যতা খুবই গভীর হয়েছে এই কয়েক মাসে। ক্লিনিক থেকে ফেরার পথে প্রায়ই একটু গল্পগুজব করে যাই।
আজ অবশ্য আড্ডা মারতে আসিনি, মিঃ লাহা আমায় কল করে ডেকেছিলেন রুটিন চেকাপের জন্য।

— তা বেশ তো বলুন না, আমার তেমন তাড়া নেই বাড়ি ফেরার

লাহাবাবু সদ্য আনা কফিতে সশব্দে চুমুক দিয়ে বললেন,
অ্যাম্বিগুয়েশনশব্দের অর্থ হল সহজ ভাষায় আবছা বা অস্পষ্ট

মিঃ গ্যারিক এর শেষ কথা এখনও আমার কানে বাজে জানো!

তিনি বলেছিলেন
“—————–Rudra, I appreciate your views and agree with many of your observations. but There are a number of specific issues left somewhat ambiguous in your documents and photographs…, “

আমি সে দিনই প্রমাণ করে দিতে পারতাম, আমার তোলা ছবি আবছা হলেও আমার অনুভূতি আবছা নয় আমার অভিজ্ঞতা আবছা নয়। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমি সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বচক্ষে সেই দৃশ্যটি দেখেছিলাম। আমি যা দেখেছিলাম, তা আমার মস্তিষ্কে মনিকোঠায় এমনভাবে নিবদ্ধ হয়েছিল, এখনও চোখ বন্ধ করলে ছায়াছবির মত প্রত্যকটি মুহূর্ত ভেসে ওঠে।

তখন আমিস্কটল্যান্ড হাইল্যান্ড পার্ক প্রেট্রোলিংঅফিসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার। সদ্য স্কটল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে চাকরি জয়েন্ট করেছি। বয়স তখন প্রায় ২৬২৭ হবে।
আমি আর ডাস্টিন, হাইল্যান্ডের লেক পেট্রোলিং অফিসের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিলাম। ডাস্টিন ব্রুক্স ছিল সেই স্কটল্যান্ডে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু, কলিগ শুভাকাঙ্খী। ডাস্টিনের পিতৃভূমি ডেনমার্ক, আমি ভারতীয়। সেসময় স্কটল্যান্ড ভারতীয়দের দেখা, মরুভূমিতে জল পাওয়ার মত অবস্থা। কালেভদ্রে একটা দুটো ভারতীয় আসতেন বটে, তবে তা কেবলই ঋতুকালীন হাওয়াবদলের উদ্দেশ্যে মাত্র।

আমরা হাইল্যন্ডের যে লেক পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলাম তার নামলকনেস তার স্বচ্ছতা সৌন্দর্য দেখে ওনেকের স্বর্গাভাব দূর হয়। অদ্ভুত রূপের লাবণ্যময় সৌন্দর্যে আত্মহারা হয়ে বয়ে গেছে স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি নিয়ে। দুকূলে বিস্তৃত সুউচ্চ পাহাড় শ্রেণী তার সৌন্দর্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই লেক ঘিরেই বেঁচে আছে এখানকার মানুষ। তাদের জীবিকা জীবনযাপনের মুল উৎস এই লকনেস লেক। লকনেসকে লেক বলাটা হয়তো ভুল হবে। উত্তরেরডোচগ্যারোচথেকে দক্ষিনের পোর্ট অগাস্টাস পর্যন্ত বিস্তৃতক্যালেডোনিয়ান ক্যানেলএর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৩৭ কিমি, প্রায় একটি নদীর সমান।ক্যালেডোনিয়ান ক্যানেলবলা হয় লকনেস লেককে। আমাদের কর্মক্ষেত্র ছিল পোর্ট অগাস্টাসে। এই অঞ্চল অনেকটাই জনবহুল ছিল অনান্য লকনেস তীরবর্তী এলাকার অপেক্ষায়।

এমনই এক বৃষ্টি ভেজা বিকেলে কথা,
গরম কফি উপভোগ করতে করতে ইভিনিং টাইম্সটা ঘাটছিলাম অফিসের ব্যালকনিতে বসে। এমন সময় ডস্টিন এসে পাশের চেয়ারে বসলো। তার চোখে মুখে ক্লান্তি বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। তাঁর এই শারীরিক বৈচিত্রের অবশ্য বিশেষ কারণ ছিল। বেশ কিছুদিন ধরে ডস্টিন মানসিকভাবে ভীষণ উদ্বিগ্ন আছে নানান কাল্পনিক চিন্তাধারায় জর্জরিত হয়ে।

আমি একটু হেসে বললাম,
— 
এবার তুমি কিছুদিন ছুটি নাও বন্ধু। শরীরের কী হাল করেছ একবার দেখেছ??
আমার কথাটা যেন তাঁর কান পর্যন্ত গেল না। অন্যমনস্কভাবে দূরের লকনেসের দিকে তাকিয়ে থাকার পর, মৃদুস্বরে বলে গেল
— 
কোন দিন ভেবে দেখেছ রুদ্র, ওটা যদি সত্যি হয়। ওটা কেবল একটা অলীক ধারনা না হয়ে থাকে। তবে আমাদের এই লকনেসের তীরে বসবাসকারি মানুষের জীবনে কেমন বিভীষিকা ক্রমাগত এগিয়ে আসছে তার আঁচ করতে পারছ?

আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম তাকে,
— 
বন্ধু তুমি নিছকই একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভিত্তি করে ভুলভাল মন্তব্য করছ।

ডাস্টিন আমার দিকে তাকিয়ে বিকৃত মুখে বলল, — আচ্ছা!! তুমি তাহলে গতকালের ঘটনা টা এখন বিশ্বাস করতে পারোনি! এখন কি আমি প্রমাদ বকছি তোমার কাছে? রুদ্র তুমি ভুল করছ। আমার ধারণা, এই ঘটনা ঝড় ঝঞ্ঝার কারণে নয়। আমি বেশ বুঝতে পারছি সেই বহু কথিত আদিদানব লকনেসে সত্যি রয়েছে। তাছাড়া, আমি কাল নিজেই গেছিলাম ঘটনাস্থলে, “অ্যালতিসগএর স্থানীয় ডাচ বাসিন্দাদের কথা শুনেছি। তারা দেখেছে মাঝ রাতের আকস্মিক জলোচ্ছ্বাস। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস এই কাজ লকনেসের অপদেবতার। যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জীবিত রয়েছে ওই ক্যালেডোনিয়ান ক্যানেলের অতল গভীরে। আমি বিজ্ঞান বিশ্বাস করি, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বাইরেও অনেক কিছু ঘটে, যা আমাদের চোখে পরেনা।

আমি কিছুক্ষন চুপ থেকে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম,
— 
দেখ ডাস্টিন, কালঅ্যালতিসগএর কাছে দুটি ফিশ ট্রলার এর জলমগ্ন হওয়া একটা নিছকই দুর্ঘটনা। আমার মনে হয় ট্রলারের কোন যান্ত্রিক গোলযোগ ছিল।
— “
যান্ত্রিক গোলযোগ!!!!“ যান্ত্রিক গোলযোগ দুটি ট্রলারের একইসাথে, একই সময়ে হওয়া, কখনও সম্ভব??“

লেকের মধ্যে কোন ঘূর্ণাবর্তের সঙ্গম স্থল থেকে থাকতে পারে, যার মুখে পড়ে যাওয়ার দরুন এই দুর্ঘটনা। তাছাড়া, আবহাওয়া দপ্তরের রিপোর্ট আমি পেয়েছি। তাদের ভাষায়, “ আকস্মিক ঝড়ের ফলে ট্রলার দুটি দিকভ্রষ্ট হয়ে একটি ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পড়ে যায়। তাতে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
আজকের পেপারে সেই কথা স্পষ্ট। গতকালের সন্ধ্যার আবহাওয়া ঠিক ছিলনা তা তোমার নিশ্চয় জানা আছে। যে ভাবে হঠাৎ করে ঝড় বৃষ্টির দাপট শুরু হয়েছিল সে কারণেই হয়ত ট্রলার দুটি ঝড়ের তোড়ে নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

— হঠাৎ করে জলোচ্ছ্বাস কখনও ঘূর্ণাবর্তের এর জন্য হয়না। সেই উত্তাল জলরাশির উদ্বেল দেখেছিল অ্যালতিসগের তীরবর্তী এলাকায় বসবাস কারি ডাচ বাসিন্দারা। তারপরেই হঠাৎদুটি ট্রলার এক সাথে জলমগ্ন হয়।
তাদের মধ্যে অনেকেই শুনেছে সেই অপদেবতার চাপা হাড়হিম করা গোঙ্গানির শব্দ।

তার এই কথা শুনে বুঝলাম যে, আমার প্রিয় বন্ধু টি নিতান্তই ভাবাকাশে বিচরণ করছে এখনও। নয়তো একটা দুর্ঘটনাকে ঘিরে অবান্তর চিন্তাধারাদের সাথে সখ্যতা করে এমন প্রলাপ বকছে।
আমি বললাম,
— 
দেখো ডাস্টিন অকাট্য প্রমাণ ছাড়া এরকম মতপ্রকাশ করা তোমায় শোভা পায় না। ভুলে যেওনা তুমি একজন বিজ্ঞানী। বৈজ্ঞানিক জগতের বাইরে গিয়ে অতিরঞ্জিত উপকথায় বিশ্বাস করা আমাদের নৈতিকতার বিরুদ্ধে।

— বড় আশ্চর্য লাগছে এই ভেবে যে, তোমরা এখনও এই বিষয়টিকে কোনও গুরুত্ব দিচ্ছো না।

এই বলে সে তার কম্পমান হাতে একটা সিগারেট ধরালো।
তারপর যেন, নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করতে করতে বলল
— 
আমি একাই এই লকনেসের তরল রহস্য উদঘাটন করবো। আমিই এই আদিম জানোয়ার টিকে সর্বসমক্ষে নিয়ে আনবো। তার জন্য আমার কারোর সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

শেষের কথাটা যেন, আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা। আসলে ডস্টিনের যুক্তিহীন কাল্পনিক চিন্তাধারার সাথে আমার যুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণার বিস্তর ফারাক। তাই এক্ষেত্রে আমি নিরাসক্ত, এই অতিরঞ্জিত ভাবনাদের সাথে মনভাসিয়ে দেওয়া সমীচীন বলে আমার মনে হয় না। যদিও গত দুমাসে বেশ কয়েক বার এই একই ঘটনা ঘটেছে। তবুও আমি বিজ্ঞানের রাস্তা ছেড়ে অদ্ভুত চিন্তাধারাকে একদমই প্রশ্রয় দেবনা। দুর্ঘটনার পরিপেক্ষিতে আবহাওয়া দপ্তরের দেওয়া যুক্তি সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ। এর আর অন্য কোনও কারণ হতে পারে না।

আমি ডাস্টিন কে বললাম,
— 
বাদ দাও সে সব কথা। এগুলি নিয়ে অবান্তর চিন্তা করে তুমি রীতি মতো অসুস্থ হয়ে পড়ছো। ডাস্টিন সত্যি এবার তোমার রেস্টের প্রয়োজন। তুমি রেস্ট নাও কিছুদিন। দেখবে সব মানসিক অবসাদ কেটে যাবে।
ডাস্টিন এবার শ্লেষের সুরে বলল
হ্যাঁ নিশ্চয়, আমি সত্যি এভাবে মানসিক অবসাদে ভুগতে পারছি না আর তোমাদের মতো, তাই এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।

তার এমন উক্তির শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও কারণ বুঝতে বিলম্ব হলনা। ডাস্টিন তার বুক পকেট থেকে একটি খামে মোড়া চিঠি বের করল, চিঠি টি আমায় দেখিয়ে বলল,
— 
আমার রেজিগনেশন লেটার, আমি সত্যি আর এই চাকরি করতে চাই না। আমি বাস্তবকে কিছুতেই ভুলে থাকতে পারবোনা। সত্যকে বিদ্রুপ করে মিথ্যা যুক্তিতথ্যের গোলামী আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি আজই আমার চাকরি থেকে ইস্তফা দিচ্ছি। যে উদ্দেশ্যে আমাদের রাখা। সেই কাজ স্বাধীন ভাবে যদি না করতে পারি। উপরে বসে থাকা পরভোজীদের তালে তাল মিলিয়ে চলাই যদি আমাদের কর্তব্য হয়। তবে আমি তেমন কর্তব্যপরায়ণ সৎকর্মী নই। আমি কাল রাতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আজই আমিলিউস্টনএর অফিসে এই রেজিগ্নেশন লেটার জমা দিয়েঅ্যালতিসগফিরে আসবো। তারপর নিজেই নিজের মত করে এই রহস্যজনক জলদানবের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আনবো।

আমি জানি, গত কয়েকদিনের ঘটনা নিয়ে বহুবার ডাস্টিন, উপরস্থ অফিসারদের দ্বারস্থ হয়েছে নিজের মতামত নিয়ে। তবে তাতে কোন ফল হয়নি। তখন সকল কিছু পক্ষপাতিত্ব করাও আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা সে সময়। কারণ তাঁদের মতোই আমারও মত, ডাস্টিনের কাল্পনিক চিন্তাধারার বিপক্ষে।

আমি ডাস্টিন কে পৌঁছে দিতে পোর্ট পর্যন্ত গেলাম। ডাস্টিন ওখান থেকে প্রাইভেট বোর্ডে করে লিউস্টন যাবে। বিদেশবিভুঁইয়ে কাছের বন্ধু বলতে এই এক ডাস্টিনই ছিল। তার এরকম ভাবে চলে যাওয়া,সত্যি ভীষণ হৃদয়বিদারক ব্যাপার। তাঁকে পোর্ট পৌঁছে দিয়ে শেষ পেট্রোলিং সেরে অফিস ফিরি সন্ধ্যা টা নাগাদ।

অফিসে আসার সাথে সাথেই একটা টেলিফোন আসে। ফোনটা করেছিলেন আমার আর এক সহকর্মী ডঃ ফ্র্যাঙ্কলিন এডওয়ার্ড।রিজনাল অফিস ওফ ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্টএর খ্যাতনামা বিজ্ঞানী স্টিফেন ফ্র্যাঙ্কলিন জানান, তিনিলেনিয়ারকাছে লেকের জলে কিছু নতুন প্রানী সেলের নমুনা পেয়েছেন। এর আগে এমন অদ্ভুত কোনও জীবের অস্তিত্ব প্রাণীতত্ত্বে পাওয়া গেছে কী না সে বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তিনি নিয়ে আমার সাথে কিছু আলোচনা করতে চান। এবং পরে আমার সাথে ইনভেস্টিগেট করে এই সেলগুলির প্রকৃত পরিচয় বের করতে চান। তার বিশ্বাস বিষয়ে আমরা একটু পরিশ্রম করলে অদূরেই এক নতুন জীবের আবিষ্কার করা সম্ভব হলেও হতে পারে।

সেই দিন সারা রাত আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার মাথায় ফ্র্যাঙ্কলিন ডাস্টিনের কথাগুলো এক সাথে তালগোল পাকাতে লাগছিল।

সকালের কাগজটা উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে হঠাৎএকটি খবর চোখে পড়তেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। পায়ের তলার মাটি যেন কাঁপতে লাগলো। সেই গতদিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি।এবার তার শিকার আমার একমাত্র বন্ধু ডাস্টিন ব্রুক্স। কাগজের তিন নম্বর পাতার উপরের দিকে বেশ অনেকটা অংশ জুড়ে খবরটি বেরিয়েছে। লকনেস লেকের ঝড় ঝঞ্জার শিকার আর এক প্যসেঞ্জার বোট।বুনলয়েটকাছে লকনেসের লেকে এই ঘটনা টি ঘটেছে এবার। বোটের চার জন কর্মচারী সহ দশটি প্যাসেঞ্জারের জলসমাধি। তাদের মধ্যেই ছিল ডাস্টিন। মৃত তালিকার নামগুলির মধ্যে তার নাম স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে।
যে রহস্যের উদঘাটন করার জন্য সে তার চাকরী পর্যন্ত ছেড়ে দিল, ভাগ্যের এমনই পরিহাস সেই রহস্যঘন আঁধারেই সে হারিয়ে গেল।

*****

পরের দিন ফ্র্যাঙ্কলিনের কাছে গিয়ে বুঝলাম, ফ্র‍্যাঙ্কিলিনও বিশ্বাস করে এই সংখ্যাহীন বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের পিছনে প্রকৃতির হাত নেই। ডাস্টিনের কল্পনা নিছকই কল্পনা নয়।

তার মতে,
— 
এমন অনেক প্রাগৈতিহাসিক মিথ রয়েছে। যারা কেবলমাত্র ইতিহাসের পাতায় বেঁচে নেই। এই ঊনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কখনও সখনও তাদের উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

পৃথিবীতে এখনও অনেক আদিম ক্রিয়েচার রয়েছে, যুক্তিতর্কের কষ্টিপাথর দিয়ে যাদের বিশ্বাস করাও কঠিন।
অস্ট্রেলিয়ান ড্রপ বিয়ার, স্ট্রেনজেস্ট ক্রেপ্টাইডস, হক্সবেরী রিভার মনস্টার, আফ্রিকার বুনিপ, ভারতের ইয়েতি, একশৃঙ্গএগুলি শুধুই কল্পকথা নয়।
পৃথিবীর যে সমস্ত জায়গায় মানুষের পা পড়েনি তেমন জায়গায়ও অনেক উদ্ভট প্রাণী রয়েছে যাদের কোনও রকম ইনফরমেশন আমাদের প্রাণিতত্ত্বে নেই।

প্রাগৈতিহাসিক ক্রিয়েচারদের বিষয়ে এমন আশ্চর্যজনক কথাবার্তা এর আগে কখনও শুনিনি। ফ্র‍্যাঙ্কলিনের মতো বিজ্ঞানী বিষয়ে এমন মত পোষণ করেন, এটা জানার পর যেমন অবাক হলাম তেমন বিস্মিত হলামও বটে।

তবে কি ডাস্টিন ঠিক পথেই এগোচ্ছিল!

আশ্চর্যজনকভাবে এবার মনে হতে লাগল, এই ধ্বংসলীলার কারন একাটাই। ডাস্টিনের লকনেস মনস্টার। তার শেষ কথাটা আমি বিশ্বাস করিনি। যখন তার আমার প্রয়োজন ছিল আমি তার পাশে থাকতে পারিনি।
ডাস্টিনের মৃত্যুতে এমনিতেই আমি ভীষণ আঘাত পেয়েছিল। ফ্র‍্যাঙ্কলিনের মন্তব্য শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।

ডাস্টিনের কথা ভেবে ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো এবার।
আমার একমাত্র সঙ্গীকেই কেড়ে নিল লকনেসের কল্পনাহীন গভীরে বসবাসকারী রহস্যজনক আদিম হিংস্রদানো।

আমরা ঠিক করলাম প্রথমে ফ্রাঙ্কলিনের পাওয়া নমুনাটির পরিচয় খুঁজে বের করবো এবং তার সাথে সাথেই ডাস্টিনের একত্রিত করা তথ্যাদি বিশ্লেষণ করবো, যা ইতি মধ্যেই আমরা সংগ্রহ করে ফেলেছি তাঁর বাড়ি অফিসের আলমারিগুলি থেকে। বলা যায় না ভাগ্য দেবতা প্রসন্ন হলে, আমাদের দুটি গবেষণার গন্তব্য একই হওয়া আশ্চর্যের নয়।

ডাস্টিনের এতদিনের পরিশ্রমে একত্রিত করা তথ্যাদি ঘেঁটে দেখলে সত্যি আশ্চর্য হতে হয়। ডাস্টিনের ডায়েরি প্রত্যেকটি পাতায় বিশেষভাবে বিভিন্ন সাল তারিখের সাথে সাথে এই বিধ্বংসী ধংসলীলার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া আছে। যেগুলি পড়ে এবং দেখে এই লকনেস মনস্টারের অস্তিত্ব আরও প্রবল হয়ে উঠল আমার কাছে।
আমরা মনস্থির করলাম, আমাদের আরও কিছু তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হবে। তার আগে আমাদের রিসার্চের সম্পর্কেগভরমেন্ট জুওলজিকাল ডিপার্টমেন্ট অফ স্কটল্যান্ডকে একটা লিখিত বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন। তারপর বিষয়ে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করার পরব্যাথমেট্রিকাল সার্ভে ওফ স্কটল্যান্ডএর বিজ্ঞানীদের দ্বারস্থ হব।
সবথেকে জরুরী হল সেই আদীদানবের একটি ফোটোগ্রাফ। সেটা যদি আমরা কোনও ভাবে সংগ্রহ করতে পারি। তবে আমাদের কাজ অনেকটা সহজ হয়ে পড়বে।

ইতিমধ্যে বিদেশী বিজ্ঞানী সংস্থা রিসার্চ সেন্টার গুলিও উঠে পড়ে লেগেছে এই দুর্ঘটনার কারন অনুসন্ধানে। সরকার আরও বেশি তৎপর হয়েছে লকনেস বাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে। এমন কী লকনেস ভ্যালির অধিকাংশ মানুষ প্রাণের ভয়ে বাসভূমি পরিত্যাগ করা শুরু করে দিয়েছে। লকনেস ভ্যালির কে ঘিরে মৎস্য শিল্প পর্যটন শিল্প গুলিও বিস্তর ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ছে দিনের দিন। ট্রলার নিয়ে লকনেসে মাছ ধরা বন্ধ হয়েছে। প্যাসেঞ্জার বোটগুলিও আর দেখা যায় না।
লকনেস তীরবর্তী এলাকায় যেমন লেনি, বুনলয়েট, ডরেস প্রভৃতি অঞ্চলে দেশি বিদেশি বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে ক্যাম্প বসাচ্ছেন।

হঠাৎ কেন জানিনা অদ্ভুতভাবে লোক মুখে চাওর হয়ে যায় এই দুর্ঘটনা গুলিক্যালোডনিয়াল ক্যানেলএর গভীরতায় বসবাসকারী অতিকায় হিংস্র মাছের কীর্তি।

বেশ কিছুদিন এমনইভাবে চলতে থাকলো। তবে সেই দিনের পরে আর তেমন কিছু চোখে পড়ার মত ঘটনা ঘটল না। এদিকে ল্যাবে সেই সেলনমুনা গুলি পর্যবেক্ষণে প্রমানিত হল যে সেই সেল গুলি আর তেমন কিছু নয়, এক বিশেষ প্রজাতির স্যালমন মাছ ছাড়া। যাও বা আশার আলোর মৃদু স্ফুলিঙ্গ দেখা দিয়েছিল, এটি প্রমাণিত হওয়ার পর সেটুকুও বুদবুদের মতো উবে গেল।

মাস খানেক আর তেমন কোন আশ্চর্যজনক ঘটনার দৃষ্টান্ত প্রকাশ্যে না আসায় একে একে সকলে হাল ছেড়ে দিয়েছে। বিদেশী রিসার্চ সেন্টার গুলিও হতাশ হয়ে একে একে তল্পিতল্পা গুটানো শুরু করে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা যারা বাড়ি ছেড়ে প্রানের দায়ে অন্যত্র চলে গেছিল তারাও মনে সাহস জুগিয়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে।

একদিন সকালে ল্যাবে বসে কাজ করছি, আমার ড্রাইভার ফিনুয়েল এসে বলল যে তার চেনা এমন একজন মানুষ রয়েছে ফওয়েরেসে যে নাকি গতকাল রাতে এক অদ্ভুত জীব দেখেছে লকনেসের জলে।

আমরা আর দেরী না করে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়লাম সেই লোকের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শোনার উদ্দেশ্যে। বৃদ্ধ কৃষক, বয়স প্রায় ৬০এর কাছাকাছি। লোকটির নাম অ্যান্টুন ব্যাঙ্কেন। সে তার তিন পুরুষ ধরে রয়েছে ফওয়েরেসে।
লোকটির মাছ ধরার সখ সেই ছেলেবেলা থেকেই। তাই গতকাল রাতে হুইল নিয়ে মাছ ধরতে গেছিলো ফরোয়েসের পাইন চেস্ট নাটের জঙ্গলের দিকে। সেখানে নাকি সচরাচর তেমন কেউ যায় না। তাই সে ওই বিশেষ অংশটিতে গেছিলো নিরিবিলিতে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে। সেইখানেই তার চোখে পরে ওই অর্বাচীন জীবটি।
বিকেলের আলোআঁধারি পরিবেশে স্পষ্ট দেখেছে, সেই অতিকায় জীব লকনেসের জলে তার জিরাফের ন্যায় সুবিশাল গলা উঁচিয়ে সুতীক্ষ্ণ দাঁতালো মুখ দিয়ে আদিম যান্ত্রব গর্জন করছে।
এর আগে এখানে সে এমন কোন প্রাণী দেখেনি, যা গত কাল রাতে দেখেছে।
তার মতে সেই অদ্ভুত জীবটি লকনেসের অপদেবতা। এমনই অপদেবতার কথা ছেলেবেলায় শুনেছিল সে তার পিতামহের কাছে। তিনি তাকে বলেছিলেন লকনেসের জলে অপদেবতার বাস আছে। সেই অপদেবতা যাকে দেখা দেয় সে আর বেশিদিন বাঁচে না।
তার সাথে কথা বলে মনে হল লোকটি ভীষণ ভয় পেয়েছে। সেই অপদেবতা এখন সে চাক্ষুষ দেখেছে। তার ধারণা সে আর বেশিদিন বাঁচবে না।

ফ্র‍্যাঙ্কলিনের মধ্যে কখনও কোনও সংশয় ছিল না, প্রাণের ভয় সে কখনওই করে নি। আর আমিও এমন একটি ক্ষণের অপেক্ষায় ছিলাম এই দিন যাবৎ।

তাই, আমি আর ফ্র্যাঙ্কলিন ঠিক করলাম ফওয়েরেসে ওই বিশেষ অংশের অরণ্যের মধ্যে লেকের পার ঘেঁষে নির্জন জায়গা দেখে ক্যাম্প বসাবো। ফিরে সব কিছু বন্দোবস্ত করে সেই দিনই প্রয়োজনীয় সামগ্রি গাড়িতে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আবার ফওয়েরেসে দিকে।
সামগ্রী বলতে আমি নিয়েছি একটি টেন্ট, দুটি ক্যাম্প বেড, দুটি চেয়ার, আমার ক্যামেরা, একটা বাইনোকুলার, কিছু খাবার, কফি ওয়াইন। স্কটল্যান্ডে আবহাওয়ায় খাবার ছাড়া থাকা গেলেও কফি বা ওয়াইন ছাড়া রাত কাটানো আত্মহত্যা করার মতো। তার উপর টেন্টের ব্যবস্থা। গাড়িতে বসার সময় লক্ষ্য করলাম ফ্র্যাঙ্কলিন ব্যাগে করে আর একটি জিনিস নিয়ে এসেছে যার কথা সে আগে বলে নি। একটি আমেরিকান এনফিল্ড রাইফেল। হাতে নিয়ে দেখলাম বেশ ওজন রয়েছে, চকচকে বাদামি কাঠের ডাঁপের উপর লেখা “M1979 Enfield” এর আগে কোনোদিন বন্দুক হাতে নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে ওঠেনি তবে এখন এর প্রয়োজন হলেও হতে পারে। যদিও সেই আদি দানো এই বন্দুকে কাবু হবে কি না সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

*****

আমরা যখন ফরয়েসের সেই অরন্যে পৌঁছালাম তখনও বিকেল হতে অনেক দেরি। সেই অরন্যেক্যালেডোনিয়ান ক্যানেলএর তীরে এক ছোট টিলার নীচে পাথুরে সমতল ভুমির অনেকটা জায়গা নিয়ে আমাদের ক্যাম্প বসানো হল। আশেপাশে মাইলখানেকের মধ্যে কোনও জনবসতি নেই। সামনে সুবিশাল স্বচ্ছক্যালেডোনিয়ান ক্যানেলআর পিছনে কিছু টিলা জাতীয় পাহাড় নিবিড় পাইনবার্চ এবং চেস্টনাটের জঙ্গল।

সারাদিন তীর বরাবর এদিক সেদিক ঘুরে তেমন কোন আকর্ষণীয় জিনিস আমাদের চোখে পড়লো না।

ফ্র‍্যাঙ্কলিন টেন্টে ফিরে গেলেও, আমি আরো কিছুক্ষণ এই নিবিড় বনানীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য থেকে গেলাম। এই অংশটায় আগে কখনও আসা হয়নি। মাটির উপর মোটা স্নিগ্ধ সবুজ ঘাসের পরতে ঢাকা। বেখেয়ালি হাওয়ার টানে লেকের জল স্রোতের মতো করে এসে তীরের গায়ে বিছিয়ে থাকা ঘাসগুলির একাকীত্ব দূর করছে। এক অপার্থিব অর্বাচীন রূপে মত্ত হয়ে আছে সবুজ বনানী। এদিক ওদিক ইতস্তত ঝোপগুলিতে ফুটে রয়েছে অসংখ্য নাম না জানা ফুল। সহস্র পাখিদের কাকলীতে মুখরিত হয়ে আছে পাইনচেস্টনাট বার্চের জঙ্গল।
বেশ কিছু নাম না জানা ফুল ক্যামেরা বন্দী করে ফেললাম। সবুজ ঘাসের উপরে নির্ভয়ে খেলে বেড়াচ্ছে লাল কাঠবিড়ালি গুলি। একটু দূরেই একটা বনমুরগির মতো কিছু চোখে পড়লো। আয়তনে মুরগির মতো হলেও, মুখের অংশটিতে বিশেষত্ব রয়েছে। ঘন মোটা কালো পালকের উপর বেগুনী হলুদ রঙের ছোপ। কাছে যেতেই স্পষ্ট হল, এটি একটি ক্যাপারকালি।
এদের পুচ্ছের পালক অনেকটা বড় হয়। এরা সেই পুচ্ছ মেলতে পারে। দেখতে লাগে অনেকটা ময়ূরের পেখমের মতো। তবে এরা পেখম মেলে অনন্দের বহিঃপ্রাকশে নয়। রেগে গেলে অথবা বিপদের সম্ভাবনায় পড়লে সেই পেখমটি মেলে ধরে। সেই অদ্ভুত পালক বিশিষ্ট পাখিরও একটি ছবি তুলে নিলাম।

জঙ্গলের একটু ভিতরের দিকে যেতেই দেখলাম বার্চের সারিসারি গাছগুলির নীচে নানান প্রজাতির গ্রাউসের মেলা। বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছের ডালে তারা তাদের কলতান জুড়েছে। ভারি চমৎকার দেখতে হয় গ্রাউস প্রজাতির পাখিগুলি। পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাউসের প্রজাতি এই অঞ্চলেই বসবাস করে। এই গ্রাউস পাখিটির উপর প্রবল দুর্বলতা জন্মেছে স্কটল্যান্ডে আসা থেকেই। এটা ভেবেই আবাক লাগে এত সুন্দর পাখিগুলির অধিকাংশই থাকে শুধুমাত্র এই স্কটল্যান্ডে। পৃথিবীর আর অন্য কোথাও সহজে এদের দেখা মেলে না। আগেও অনেক বার এই গ্রাউসের ছবি তোলার লোভে লকনেসের তীরবর্তী এলাকায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেরিয়েছে। একবার কলেজে পড়ার সময় এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি গ্রাউসের ছানা নিয়ে বাড়িতে পুষেছিলাম। ব্যালকনির ঝুলন্ত টবের কাছেই একটি তারের খাঁচা ঝুলিয়ে সেটি রাখি। তবে আমার যত্নের ঠেলা ভালবাসার তীব্রতা খুব বেশি দিন সহ্য করতে পারেনি সেই নিরীহ প্রাণীটি।

আমার জানা ছিল লকনেসের তীরবর্তী পাহাড়ি উপত্যকায় রেড ডিয়ার, পাইন মার্টিন, ব্যাজেরের মতো নিরীহ প্রজাতির জীব থাকলেও বাঘ বা সিংহ নেই। তবে উপত্যকার নিবিড় অরণ্যের মধ্যে ভাল্লুক রয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
আর একটি বন্য প্রাণী এখানে খুব দেখা যায়। পাহাড়ি উপত্যকার পাদদেশে লেকের একদম ধারে ভঙ্গুর পাথুরে জমিতে প্রচুর ধূসর শীলমাছ ঘোরাফেরা করে থাকে।

কিছুক্ষণ জঙ্গলের এদিক সেদিক ঘোরার পর, যখন দেখলাম সূর্য পশ্চিমের সবুজ পাহাড়ে লুকিয়ে পড়েছে তখন ক্যাম্পের পথে হাঁটা দিলাম।

ক্যাম্পে ফিরে দেখি আমার বন্ধুটি কিছু শুকনো কাঠ কুঁড়িয়ে এনে একত্রিত করেছে আগুন জ্বালাবার জন্য, কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে সেই ইচ্ছায় বেমালুম জল ঢেলে দিলেন পবনদেব। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে কালো করে দিল নির্জন বনানী। কিছুক্ষন পরেই তুমুল বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির সাথে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় রক্ত জমে যাওয়ার জোগাড়। কোনপ্রকার গাছের ডাল কেটে পাতা দিয়ে ক্যাম্প টাকে আস্ত রেখে তার ভিতরে বসে রইলাম আমরা। রাত যত বাড়তে লাগলো, বৃষ্টির উদ্দমতা ঝড়ের বেগ বাড়তে লাগলো সমানভাবে।

বৃষ্টির দাপটে রাতে তেমন আর বেরনো হলনা ক্যাম্প থেকে। স্যান্ডুইচ কফি সহযোগে রাতের খাওয়া শেষ করে আমি আমার ক্যাম্প বেটে শুয়ে ডাস্টিনের ডায়েরি পড়ছি।
ফ্র্যাঙ্কলিন চেয়ারে বসে সযত্নে একটি শুকনো কাপড় দিয়ে তার এনফিল্ড পরিষ্কার করছে আর অন্য একটি চেয়ারে রাখা ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে মাঝে মাঝে।

চকচকে বন্দুকটির কি এত পরিষ্কার করার আছে তা আমার মাথায় ঢুকল না। বন্দুকের টোটা ভরতে ভরতে ফ্র্যাঙ্কলিন আমায় বলল,
— 
জানো রুদ্র, এটা আমার ভীষণ প্রিয় জিনিস।

আমি হেসে বললাম,
— 
তা তো বুঝতেই পারছি তোমার যত্নের বাহার দেখে।

— এটা আমার দাদুর রাইফেল। বাবার কাছে শোনা ওনার শিকারের সখ ছিল খুব। তিনি নাকি এই রাইফেল দিয়ে প্রচুর শিকার করেছেন। পরে বাবাও সেই একইভাবে এই যন্ত্রের সদ্ব্যবহার করেছেন। তাই সেই ছেলেবেলা থেকেই এর সাথে একটা পরিচিতি জন্মেছে নিজের থেকেই। ছেলেবেলায় বাবার সাথে এবং পরে নিজেই অনেক জায়গায় অনেক পশু শিকার করে বেরিয়েছি। হরিণ, উইল্ডারবিস্ট থেকে শুরু করে বাঘ,ভাল্লুক,চিতা কিছুই বাদ যায় নি সে তালিকায়। পরে সরকারীভাবে বন্যজীব সংরক্ষণের হিড়িকে সে সখ একরকম বাধ্য হয়েই ভুলতে হয়েছে।

এবার আমি একটা কথা না বলে পাড়লাম না।
— 
ফ্র্যাঙ্ক, তুমি কি ভাবছ এই রাইফেল দিয়ে লকনেস মনস্টার শিকার করবে??
— 
তুমি ক্ষেপেছো! এই রাইফেল দিয়ে মনস্টার নেসি (লকনেস মনস্টারকে স্থানিয় ডার্চেরা নেসি বলে) শিকার করার কথা স্বয়ং জিম কর্বেটও ভাববেন না।আসলে আমি এটা সঙ্গে নিয়েছি জঙ্গলের বুনো জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পেতে। শুনেছি এই অঞ্চলে বন্যবিড়ালের উপদ্রব আছে। তাছাড়া বনের মধ্যে থেকে কখন কে অনিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আমাদের টেন্টের বাইরে এসে দাঁড়ায় তার কোন ঠিক আছে! তখন না হয় এটা কাজে দেবে।
তবে হ্যাঁ, একটা কথা বলতে পারি। এই যন্ত্রে নেসি নিহত হবে না ঠিকই। তবে জানোয়ারটির মাথার দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে পারলে, সে গুরুতর জখম হতে বাধ্য।

— তুমি পারবে শরীরের সেই বিশেষ অংশে এই মারণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে??

— রুদ্র! তুমি জানো না আমার টার্গেট। এক সময় আমার অব্যর্থ লক্ষ্য ছিল। আমার বন্দুকের ছোঁরা গুলি খুব কম বারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তবে বহুদিন হল সেভাবে আর শিকার করা হয়নি। তাই একটু সংকোচ তো থেকেই থাকে।

ডায়েরির শেষের দিকে একটি পেন্সিল স্কেচ দেখে আমার খটকা লাগলো। এবার আমি প্রসঙ্গ বদলে বললাম

— তুমি লক্ষ্য করেছো ফ্র‍্যাঙ্ক, ডাস্টিন তার ডায়েরিতে নেসির যে স্কেচ করেছে। তার সাথে সেই বহুচর্চিত ডাইনোসর যুগের প্লেসিয়াসোরাসের অদ্ভুত মিল রয়েছে না!

ফ্র‍্যাঙ্কলিন তার বন্দুকটা এবার হাতে নিয়ে বাইরের দিকে তাক করার ভঙ্গি করতে করতে বলল,

— হ্যাঁ, অনেক আগেই। আর আমি এও জানি যে এই লকনেস মনস্টার আর কিছুই না সেই ডাইনোসরগোষ্ঠীর প্লেসিয়াসোরাস ছাড়া।

এবার আমার অবাক হওয়ার মাত্রা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছতে সময় লাগলো না।

— কী বলছ!!!

— ঠিকই বলছি রুদ্র। তোমার বন্ধু ডাস্টিন অনেক রিসার্চ করেই এগোচ্ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়,,,,,,,,,,,

থাক সে কথা। তুমি জানো, ১৭১৯ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক উইলিয়াম স্টাকলে প্রথম আবিষ্কার করেন এই প্রজাতির ডাইনোসরের জীবাশ্ম। নোটিংহামশায়ারের এলস্টনের একটি সরবরের ঢাল জলীয়গর্তের লিকেজ থেকে রক্ষা করতে পাথরের প্লেট লাগাবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন লিংশায়ারের ফুলবেকের একটি পাহাড়ের খাত থেকে এই পাথুরেপ্লেট গুলি আনা হচ্ছিল। সেই প্লেটগুলির কাটার সময় একটি পাথরের মধ্যে প্লেসিয়াসোরাসের জিবাশ্ম প্রথম পাওয়া যায়। সেই খবর পেয়েই সেখানে উপস্থিত হন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। পরে সেটি নোটিংহামশায়ারে আনা হয় স্যার চার্লস ডারউইনের তত্ত্বাবধানে। এবং আরো পরে সেই জীবাশ্মের নমুনাটিন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম সংরক্ষিত করা হয়।

ফ্র‍্যাঙ্কের কথাগুলি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম এতক্ষণ।

— বৃষ্টি মনে হয় আজ আর থামবে না। আজ বরং শুয়ে পড়া যাক। কাল ভোরে পশ্চিমের পাহারের দিকটায় যাওয়া যাবে। চলো গুড নাইট। বলে, ফ্র‍্যাঙ্ক টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো।

প্রায় ঘন্টা দুয়েকের মতো বেডে মটকা মেরে পড়ে আছি।
বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে।
রাত্রির তমসায় সারা বনানী সজাগ হয়ে উঠেছে। সমস্ত স্নায়ু দিয়ে অনুভব করছি বন্য জন্তুদের উপস্থিতি। ব্যাঙ ঝিঁঝিঁর সমবেত কোরাস অরণ্য মুখর করে রেখেছে। কাছে পিঠে কোথাও একটা হায়নার বিকটভাবে হেসে উঠলো। দূরে অরণ্যের মধ্য দিয়ে ভেসে আসছে শিয়াল দলের নিশি উল্লাস। শোনা যাচ্ছে বন্য পাখিদের পাখা ঝাপটাবার শব্দ। রাত্রি পেঁচারা শুরু করেছে তাদের নৈশভোজের আয়োজন। অবিশ্রান্ত বাতাস বয়ে চলেছে হু হু শব্দ করে। পাইনের পাতায় উঠেছে এক একটা মৃদু মর্মর। আর তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে বেজে চলেছে ফ্র‍্যাঙ্কলিনের নাসিকা যন্ত্রে নৈশভৈরবী রাগ।

*****

ঘুম যখন ভাঙল তখন প্রথম ভোরের আলোয় অরণ্য নতুন দিনের শুরুর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। অসংখ্য পাখিদের কলরবে ভরে উঠেছে চারিদিক।

বিছানা ছেড়ে টেন্টের বাইরে এলাম স্নিগ্ধ শীতল বাতাস গায়ে মেখে মন সতেজ করার আশায়। বাইরে এসে দেখি ফ্র‍্যাঙ্ক অনেক আগেই উঠে এসে একটি চেয়ারে বসে মোহগ্রস্তের মতো পুবের নীলাভ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

ভোরের এমন রূপ এর আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। সারা লকনেস অরণ্য, উপত্যকা প্রথম ভোরের মৃদু আলোর অলংকারে নব সাজে সেজে অধীর অপেক্ষায় চঞ্চল হয়ে আছে সূর্যদেবকে স্বাগত করবে বলে।

হয়তো আমার পায়ের শব্দ শুনেই নীলাভ পাহাড় শ্রেণির দিকে একইভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নির্বিকারভাবে জিজ্ঞেস করলো,
— 
প্রকৃতির এমন পবিত্র রূপ এর আগে কখনও দেখেছো রুদ্র?

আমিইও উন্মত্তের মতো তাকিয়ে রয়েছি পূব আকাশেরই দিকে। উদয়ীমান লাল সূর্যের রক্তিম ছটায় আকাশ অপার্থিব রঙের খেলায় মেতে উঠেছে।
অস্ফুটে আমি উত্তর দিলাম

— না। এমন স্বর্গীয় রূপ দেখার সৌভাগ্য এর আগে কখনও হয় নি।
________

সূর্য উদয় হয়ে মধ্য গগনের দিকে পাড়ি দিয়েছে অনেক্ষণ আগে। আমরা আমাদের ব্রেকফাস্ট খেয়ে কথা মতো পশ্চিমের উপকূলবর্তী পাহাড়ি উপত্যকার দিকে রওনা দিলাম।

বার্চ চেস্টনাটের জঙ্গল পেরিয়ে পাহাড়ের ঢালু জমির পাদদেশ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলাম। উপকূলবর্তী পাথুরে উপত্যকার উচ্চতা সমতল ভুমি থেকে খুব বেশি নয়। পাহাড়ের ঢাল খাড়া নয় তবে পথ অতি দুর্গম। বুনো ঘাস ঝোপ ঝাড় গুলি সামলে পথ হাঁটা মোটেই সহজ কাজ নয়। অনেক দেখে শুনে অতি সন্তর্পণে পথ চলতে হয়, নইলে নরম আলগা পাথরে পা পড়ে বা কাঁটা ঝোপে খোঁচা খেয়ে আঘাত লাগার সম্ভবনা প্রবল। এই দুর্গম অরণ্যানীর অবিন্যস্ত পাথুরে পথ অতিক্রম করতে আমার অবস্থা চোখে পড়ার মতো হলেও ফ্র্যাঙ্কলিনের ক্ষেত্রে তার লেশ মাত্র নেই। সে অবলীলায়, অসংকোচে এই দুর্বহ, দূরহ পথে খুব স্বাভাবিক ভাবেই হেঁটে চলেছে। হিংস্র জানোয়ার যদিও নেই, তবুও সাবধানের মার নেই। তাই ফ্র‍্যাঙ্ক আসার সময় বন্দুকটাও সাথে করে এনেছে। কোনও বন্য পশুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এর ব্যতিক্রম খুব কমই আছে।

প্রায় ঘন্টা খানেক হেঁটে একটি পাহাড়ের নীচে এসে দাঁড়ালাম। এই পাহাড়টি কে নেড়া পাহাড় বলা চলে। কারণ,সমগ্র পাহাড়ের গায়ে এক ফোঁটা সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। উচ্চতা খুব বেশি না হলেও, তবু প্রায় পাঁচশ ফুট হবে। সমস্ত পাহাড়টি অমসৃণ নগ্ন কালো পাথরে বেষ্টিত হয়ে খিলানের ন্যায় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজ স্বর্গ দেশে। গাঢ় সবুজে ঘেরা লকনেস উপকূলে এমন নগ্ন পাহাড় যেমনই অদ্ভুত তেমনই অপ্রত্যাশিত।

হঠাৎ কোনও এক সংগত কারণেই ফ্র্যাঙ্কের মুখ বিবর্ণ হয়ে পড়ল, থমকে দাঁড়িয়ে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,
— 
শুনতে পারছ, রুদ্র??
— 
কী??? একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম।
— 
অদ্ভুত কোনও শব্দ শুনতে পারছ না? ভাল করে শোনার চেষ্টা করো।

কিছুক্ষণ, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে শোনার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ সত্যি! একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পারছি বৈ কি! তবে অবিশ্রান্ত হাওয়ার ধমকে বুঝে উঠতে পারছি না সেটি আসছে কোথা থেকে।

হুঁকোর মধ্যে সজোরে টান দিলে যেমন গড়গড় শব্দ হয় ঠিক তেমনই শব্দ। তবে আরও গম্ভীর এবং আরও তীক্ষ্ণ। এই শব্দের সাথে আমার আগে পরিচয় ছিল। এটি কীসের শব্দ বুঝতে সময় লাগলো না। ফ্র্যাঙ্কের দিকে চেয়ে দেখি সেও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখেমুখে লেগে আছে এক প্রসন্নতার হাসি।


কি বুঝলে!!

— এলিফ্যান্ট সিল????

— একদম, ঠিক ধরেছ।

দুজনেই দ্রুত পায়ে সামনের ছোট্ট পাথরের উঁচু টিলাটির উপর গিয়ে দাঁড়ালাম। নগ্ন পাহারটির নিচে, একদম জলের ধারে পাথর বালির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় খানেক এলিফ্যান্ট সিল।

কিছু শুয়ে আর মোড়া ভাঙছে, কিছু নিজেদের বাচ্চার সাথে নানান খেলায় মত্ত। বলিষ্ট বৃহৎ মাংসল দেহ বিশিষ্ট পুরুষ সিলগুলি মেতে আছে নৃশংস জায়গা দখলের লড়াইএ। কিছু সিল ঝুপ করে জলে নামছে এবং উঠে আসছে মাছ মুখে নিয়ে। তারাই সুখ, দুঃখ, রাগ, বিদ্বেষের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে গড়গড়, খিক খিক, গঁত গঁত শব্দ করে।পাহাড়ের পাদদেশের অসমতল অঞ্চল তিক তিক করছে ছোট বড় এলিফ্যান্ট সিলেদের ভিড়ে।লকনেস তীরবর্তী অঞ্চলে এলিফ্যান্ট সিল রয়েছে তা জানা ছিল। তবে এক সাথে এতগুলি সিলের দেখা মিলবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে মনপ্রাণ ভরে গেল। হয়তো কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিছিলাম, আমরা ভয়ানক নেসির রহস্য উদ্ঘাটনের পথ অনুসরণ করছি।

সেই টিলার উপর কিছুক্ষণ থেকে, তীর ববরাবর এদিক ওদিক ইতস্ততভাবে ঘুরে তেমন কিছু চমকপ্রদ জিনিস চোখে না পড়ায় টেন্টে ফিরে এলাম। তবে তখনও হতাশার কালো মেঘের ছোঁয়া একফোঁটাও লাগেনি আমাদের মনে। কারণ আমাদের প্রাপ্তির ঝুলি সত্যি এই দু দিনে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যথেষ্ট। আমি কখনও ভাবতে পারিনি নিয়মিত কর্মব্যস্ত জীবনের ঘেরাটোপ টোপকে এমন প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসতে পারবো। তার জন্য আমি সত্যি কৃতজ্ঞ লকনেসের প্রাগৈতিহাসিক নেসির কাছে।

টেন্টে ফিরে দুপুরের খাওয়া শেষ করে ঠিক করলাম একটু বিশ্রাম নিয়ে টেন্টের আশেপাশেই ঘুরে দেখবো। এবং রাত্রে আগুন জ্বালাবার জন্য আরোও কিছু শুকনো কাঠপাতা সংগ্রহ করে জমা করবো টেন্টের সামনে।
জঙ্গলে খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নামে। দুপুরের পর বেশি দূরে গেলে টেন্টে ফিরতে অসুবিধে হবে তাই আর বেরোনো হল না।
দুপুরের পর থেকে কেন জানি না মনে হতে লাগল সাড়া জঙ্গল অদ্ভুত ভাবে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে আজ। এক অস্বস্তিকর থমথমে পরিবেশ গ্রাস করে রেখেছে এই অরণ্য।

এই আশ্চর্য ব্যপারটির কথা ফ্র‍্যাঙ্ককেও জানালাম। তবে, ব্যপারটি ফ্র‍্যাঙ্কের মনেও বিশেষ কৌতূহল উদ্রেক করেছে বলে তো, মনে হল না।

দুপুরের পর আর তেমন কোনও চাঞ্চল্যকর ব্যাপার ঘটেনি। শুকনো কাঠ কুড়াতে গিয়ে কিছু বুনো হাইলান্ড কাউয়ের দলের সামনে পরে যাওয়ায় একটু ভয়ের আশঙ্কা হলেও, পরে আমাদের সম্বন্ধে তাদের উদাসীন মনোভাব দেখে সেই ভয় টুকুও কেটে গেল।

সন্ধ্যা নামার আগেই নিবিড় বনানী অন্ধকারের কালো চাদর গায়ে জড়াবার উপক্রমে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। ঝুপ করে আধাঁর ঘনিয়ে এল সাড়া উপকূল অরণ্যে। আমরা লেকের ধারে টেন্টের সামনে কাঠ স্তূপাকৃত করে আগুন জ্বালালাম।
ফ্র‍্যাঙ্ক ইতিমধ্যে কথা থেকে একটি লম্বা শক্ত ডাল ভেঙে এনে টেন্ট থেকে দড়ি, ছুরি এনে কী যেন একটা বানাবার চেষ্টা করছে।
তাকে জিজ্ঞেস করতে বলল,
মাছ ধরার প্রাচীন পন্থা। ছুড়িটা এই ডালের মাথায় শক্ত করে বেঁধে বল্লমের মতো বানাবো। প্রাচীন কালে মানুষে এভাবেই মাছ ধরতো লম্বা লাঠির ডোগায় ধারালো জিনিস বেঁধে। তারপর খুব সহজ কাজ, জলের ধারে এটা নিয়ে একদম প্রস্তুত থাকতে হবে, আর মাছ দেখলেই তাক করে সজোরে ছুঁড়ে দিতে হবে তাকে লক্ষ্য করে। বুঝলে!!

আমি, মজার সুরে বললাম,

—  মাছগুলি তোমার নির্মিত বল্লমে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করবে বলে, লেকের তীরের কম জলে অপেক্ষা করবে বুঝি???
ফ্র‍্যাঙ্ক মৃদু হেসে রহস্যের সুরে বলল,
— 
আছে আছে, তারও ব্যবস্থা আছে। তবে তা ক্রমশ প্রকাশ্য।

যখন ফ্র‍্যাঙ্কের এই প্রাচীন মৎস শিকারের পন্থাটি স্বচক্ষে দেখলাম, তখন তার বুদ্ধির প্রশংসা করতে বাধ্য হলামই বটে।
টেন্টের দক্ষিণ পশ্চিমে দশ গজের মধ্যে একটি বার্চ গাছ ছিল। ডালটি প্রাকৃতিক নিয়মে একটু বেশিই ঝুঁকে পড়েছে লেকের জলের উপর। আর গাছটিও এতই ছোট যে, যেকেউ অনায়াসে তাতে চড়ে লেকের জলে ঝুঁকে পড়া মোটা ডালটিতে যেতে পারে।
দেখলাম, ফ্র‍্যাঙ্ক একটা অর্ধেক জ্বলন্ত কাঠের টুকরোর শেষ অংশে একটা দড়ি বাঁধে সেটি ঝুলিয়ে দিল ওই ঝুঁকে পড়া ডালটির ডগায়। লেকের জল থেকে এক ফুট উপরে সেটি ঝুলতে থাকলো। আর একইভাবে বল্লমের ধারালো অংশের বিপরীত দিকে একটি আরও লম্বা দড়ি বেঁধে হাতের সাথে পেঁচিয়ে নিল। তারপর তড়তড় করে উঠে গেল সেই ঝুলন্ত ডালের ডগার কাছে। জ্বলন্ত কাঠের ঠিক নীচে বিস্কুটের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে বল্লম তাক করে অধীর আগ্রহে বসে রইলো মাছের আশায়। বেশিক্ষণ বসে থাকতে হলো না। দু একবার ব্যর্থ হওয়ার পর, প্রায় মিনিট কুড়ির মধ্যে একটা মোক্ষম সাইজের সালমন বল্লমের ডগায় গেঁথে নিয়ে এলো।
ফ্র‍্যাঙ্কের এহেন কীর্তিকলাপ দেখে আর কোনও সন্দেহের অবকাশ রইলো না যে সে একসময় বনে জঙ্গলে ঘুরে শিকার করে বেড়িয়েছে। সত্যি ফ্র‍্যাঙ্ক এমন একটি মানুষ যার গুণের তালিকা বেশ বড়।

রাতে খাবার জন্য যথেষ্ট স্যান্ডুইচ বিস্কুটের মতো উপযুক্ত শুকনো খাবার থাকলেও ফ্র‍্যাঙ্কের সাফল্যের সদ্ব্যবহার করাটাই শ্রেয় মনে করলাম। মাছটি আগুনে ঝলসে খেলাম দুই বন্ধু মিলে। পোড়া মাছ এই প্রথম খেলাম। স্বাদ বিশেষ মনে রাখার মতো না হলেও খুব একটা খারাপও নয়।
________

রাতের খাবার শেষ করে, দুজনেই শুয়ে পড়লাম যে যার বিছানায়। ইচ্ছে ছিল রাতেও একটু আশেপাশে ঘুরে দেখার। যদি কিছু সন্দেহজনক জিনিস চোখে পড়ে। কিন্তু ফ্র‍্যাঙ্ক আপত্তি করায় আর বেরোনো হল না।
কতক্ষণ চুপ করে ঘুমাবার চেষ্টা করার পর মনে হল কোনও এক মন্ত্রবলে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে জঙ্গল। সভয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে সমস্ত উদ্ভিদ। কোনও এক সম্মোহনে ক্লান্ত হয়ে জানোয়ার গুলি ঘুমিয়ে পড়েছে পাহাড়ের খাদে, ঝোপের আড়ালে। কোনও এক আশঙ্কার পূর্বাভাষ পেয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার দলও তাদের দম বন্ধ করে সময় গুনছে। পাখি গুলি সন্ত্রস্ত হয়ে ডানার আড়ালে মুখ লুকিয়েছে সেই আগত বিপদের তীব্রতা আন্দাজ করতে পেরে। রিস্ট ওয়াচের টিক টিক শব্দে কেটে চলছে মন্থর সময়। ঘড়ির কাটায় চোখ বুলিয়ে দেখে নিলাম রাত টা বাজে। তবু যেন মনে হচ্ছে এরই মধ্যে প্রগাঢ় জমাট বাঁধা চাপ চাপ অন্ধকার নিয়ে রাত গভীরতর হয়ে উঠেছে। নক্ষত্রখচিত আকাশের তারাগুলি তাদের আলোর ছোঁয়ায় অরন্যের পুঞ্জিভূত অন্ধকার দূর করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় রত। কৃষ্ণ পক্ষের গোল থালার মতো চাঁদ কোনও এক অভিশাপে উজ্জ্বলতা হারিয়ে মৃয়মান হয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে আছে পৃথিবীর দিকে।

এমনইভাবে কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকার পর হয়তো তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। ঘুমের ঘোর কাটলো ফ্র‍্যাঙ্কের ধাক্কায়। চোখ খুলে দেখি সে আমার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে, চাপা অথচ গম্ভীর স্বরে বলল,
— 
উঠে পড় রুদ্র। আমরা যে বিভীষিকাময় মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলাম, তা এসে উপস্থিত হয়েছে।

প্রথমে ফ্র‍্যাঙ্কের কথা বুঝতে অসুবিধা হলেও, পরে সব টুকু আন্দাজ করতে পাড়লাম। অতি সন্তর্পণে ধীর পায়ে টেন্টের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। দেখলাম ফ্র‍্যঙ্কের হাতের বন্ধুক তৈরি। আমরা দুজনেই চাপা উত্তেজনার সাথে জলের অবারিত উচ্ছ্বাসের শব্দের উৎস লক্ষ্য করে দেখার চেষ্টা করলাম। অন্ধকারে স্পষ্ট ভাবে বোঝা না গেলেও যতটুকু দেখা গেল তা মনের সংশয় কাটার জন্য যথেষ্ট।

দেখলাম, লেকের মাঝ বরাবর এক প্রবল ঢেউয়ের আলোড়ন এগিয়ে চলেছে পশ্চিমের উপত্যকার দিকে। আর মাঝে মাঝে একটি অস্পষ্ট কালো মুখ উপরে উঠছে আবার জলের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

সেই জলের আলোড়ন অনুসরণ করে আমরা উন্মাদের মতো ছুটতে লাগলাম।
দূরে জলের মধ্যে সেই অতিকায় প্রানীটির যতটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে, ততটুকুই ক্যামেরা বন্ধী করার চেষ্টা করলাম।
এদিকে আমার প্রায় ২০ হাত আগে আগে উদভ্রান্তের মতো ঝোপঝাড় টোপকে এগিয়ে চলেছে ফ্র‍্যাঙ্ক। প্রায় আধ ঘন্টা একই ভাবে প্রাণপণে দৌড়ে দুজনে সেই উঁচু নেড়া পাহাড়টির সামনে এসে দাঁড়ালাম।
এবার সেই অতিকায় প্রাণীটি ধীরেধীরে তীরের দিকে আসতে লাগলো।

দ্রুতু পায়ে সেই টিলার উপরে গিয়ে দাঁড়ালাম যেখান থেকে দিনেরবেলায় এলিফ্যান্ট সিলের মেলা দেখতে পেয়েছিলাম।
এখনও আছে, তবে সংখ্যায় আরও বেশি, প্রায় দ্বিগুণ।
ভয়ানক বিপদের আঁচ পেয়ে এখন তারা পরিত্রাহি ভাবে দ্বিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পালাবার চেষ্টা করছে। এখন তাদের গর্জনের শব্দ আরও জোরে শোনা যাচ্ছে।

কোনও সন্দেহ নেই, নেসি এলিফ্যান্ট সিল শিকার করার উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছে।

এরপর যেই অপ্রত্যাশিত অতর্কিত ঘটনাটি ঘটলো তার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। এই ঘটনার আকস্মিকতা হয়তো ঠিক করে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

*****

(শেষ পর্ব)

অতিকায় জন্তুটি ধীরে ধীরে তীরের কাছে আসছে, এখনও তার সমগ্র শরীর দেখার উপায় নেই। আমরা প্রবল উত্তেজনায় শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম প্রাগৈতিহাসিক, বহুচর্চিত, জলদানব নেসির তীরে আসার অপেক্ষায়।

এরপর যা দেখলাম তাতে আমার এতোদিনের বৈজ্ঞানিক যুক্তিগত চিন্তাভাবনা একনিমেষে বিলীন হয়ে গেল লকনেসের কালো জলে।

জানোয়ারটি এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যেন এক মুহূর্তে হাজার বছর পিছনে চলে গেছি কোনও এক সময়যানে ভর করে।
আমি আমার দুচোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না তখনও। বহুকথিত লকনেস নেসি আর কিছুই নয়,,,

সেই কোটি কোটি বছর আগেকার ডাইনোসর যুগের প্লেসিয়াসোরাস।

১৭১৯ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক উইলিয়াম স্টাকলের প্রথম আবিষ্কৃত জীবাশ্মের প্লেসিয়াসোরাস।

উপকথা রূপকথার গল্পে পড়া আদি হিংস্র রেপ্টাইল প্লেসিয়াসোরাস।

সুবিশাল মসৃণ দেহ হতে জিরাফের ন্যায় গলা প্রায় ১০১২ ফুট লম্বা হয়ে উঠে গেছে মুখ পর্যন্ত। আকার রূপে ব্রোন্টোসোরাসের সাথে সাদৃশ্য থাকলেও পায়ের পরিবর্তে সামনে দুটি এবং পিছনে দুটি ডানা রয়েছে। তবে সেই ডানা এতই ছোট যে এই দৈত্যকার দানবের শরীরে তা বড়ই বেমানান। খুব সম্ভবত সেটি সুইমিং প্যাড হিসেবে ব্যবহার করে জলের মধ্যে অবাধে চলাফেরা করার জন্য।
সবুজ মার্বেলের মতো বড় বড় চোখদুটি থেকে যেন আগুনের লাভা নির্গত হচ্ছে।
কুণ্ঠিত সিলগুলিকে দেখে সুতীক্ষ্ণ ধারালো দাঁতের মধ্যে দিয়ে লাল লকলকে জিভটি বেরিয়ে এসেছে।

মন্থরগতির মাংসল দেহবিশিষ্ট সিলগুলি তখনও মরিয়া হয়ে ছুটছে, এই মৃত্যু দানবের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায়।
বিদ্যুৎ বেগে ডাঙায় উঠে গলাটিকে আরো হাত কয়েক প্রসারিত করে একটি আস্ত সিলকে দাঁত দিয়ে ধরে বারকয়েক দুদিকে ঝাঁকুনি দিয়ে মুখে পুরে নিলো। একটা সিলে তার পর্বতপ্রমাণ শরীরের ক্ষুধা নিভৃত হওয়ার নয়। তাই সে তেড়ে গেল অন্যগুলির দিকে।

এই আদিম পৈশাচিক খেলা স্বচক্ষে দেখে আমার সারা শরীর পাথর হয়ে গেল। উৎকণ্ঠায় শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম। হতভম্বের মতো চেয়ে আছি, শরীরের কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমার দখলে নেই। সেগুলি ঠান্ডা বরফ হয়েগেছে উত্তেজনা ভয়ে।
ফ্র‍্যাঙ্কেরও অবস্থা বুঝি আমারই মতো।

ফ্র‍্যাঙ্ক কিছুটা জড়িয়ে জড়িয়ে অস্পষ্ট ভাবে বলল,

— রুদ্র ছবি!!! ররররররুরু,,!!!!! ,,,,,,,বি।

আমি প্রায় ভুলেই গেছিলাম আমার গলায় ক্যামেরা ঝোলানো। ভুলে গেছিলাম এই অতিকায় জানোয়ারটিকে অনুসরণ করার প্রকৃত কারণ।

ফ্র‍্যাঙ্কের কথায় সম্বিৎ ফিরলো।
ক্ষিপ্রহস্তে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলার জন্য উদ্যত হলাম। কিন্তু, সামনের পাথরের ঢিবিটা জানোয়ারটির শরীরের অর্ধেকের বেশি অংশ আড়াল করে দিচ্ছে। তাই দুজনেই উঁচু টিলা থেকে নেমে, অতি সাবধানে পাথরের ঢিবির পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জানোয়ারটি তখনও দিকবিদিক ভুলে শিকারে মত্ত।

অতিকায় নেসি এখন আমাদের ২০২২ গজের মধ্যে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি সব কিছুই।

এমনসময় আকস্মিকভাবে যে ঘটনাটি ঘটল, তার বর্ণনা দেওয়া যেমন কঠিন তেমনই বেদনাদায়ক।

ঢিবির একপ্রান্তে আমি আর একপ্রান্তে ফ্র‍্যাঙ্ক। আমি ক্যামেরাটা তাক করে সুইচটা টিপে দিলাম হয়তো ছবিটা ঠিক উঠলো না, কারণ উত্তেজনায় আমার হাতটা তখনও ঠক ঠক করে কাঁপছে। এই অবস্থায় প্রথম শর্টে স্পষ্ট ছবি উঠবে সে কথা কল্পনা করাই বোকামি। সঙ্গে সঙ্গে এক চোখ ঝলসানো ফ্ল্যাশের আলোয় কয়েক সিকি সেকেন্ডের জন্য প্রগাঢ় অন্ধকারের নিকষ ঘনত্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। আকস্মিক উজ্জ্বল আলোর ঝলকে সাময়িক বিচলিত হওয়ার পরই জানোয়ারটি আমাদের দিকে ক্ষিপ্রদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল।

এবং পর মুহূর্তেই বিদ্যুৎ বেগে আমাদের দিকে তেড়ে আসতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ডে আমাদের হাত দশেক দূরের মধ্যে চলে এলো। তারপরই এক প্রলয়ঙ্কর শব্দে চারিদিক খান খান হয়ে গেল।
একবার তারপর, পর পর দুবার। অব্যর্থ লক্ষ ফ্র‍্যাঙ্কের। প্রথম গুলিটা গলায়, তার পরের দুটো ডান চোয়ালে গিয়ে লাগলো।

এক বিকট আর্তনাদে সারা উপকূল তীরবর্তী জঙ্গল কেঁপে উঠল। কিন্তু তিনটি গুলিতে সে দমবার পাত্র নয়। ফ্র‍্যাঙ্ককে লক্ষ্য করে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ালো। তার চোখে মুখে তীব্র প্রতিহিংসার ছাপ স্পষ্ট। রাগে, বিদ্বেষে গর্জে শরীরটা সাপের মতো দুলিয়ে এক মুহূর্তে ফ্র‍্যাঙ্ককে আবদ্ধ করে ফেলল শক্তিশালী ক্ষুরধার দাঁতের মধ্যে। তাকে গালে করে নিয়ে আবার সেই আদিম ভঙ্গিতে দুদিকে নাড়াতে লাগলো। 

ঝাঁকুনিতেই ফ্র‍্যাঙ্কের হাতের বন্দুকটা আমার পায়ের কাছে এসে পড়লো। এই বিভীষিকাময় ক্ষণে আমার মস্তিষ্ক কী ভাবে চলল সে বিষয়ে আজও যথেষ্ট কৌতূহল আছে। সঙ্গে সঙ্গে সেই মারণাস্ত্র তুলে বিক্ষুব্ধ জানোয়ারটির মুখের দিকে তাক করে গুলি চালালাম। এত কাছ থেকে লক্ষভ্রষ্ট হওয়া সম্ভব নয়, এর জন্য কোনও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। পর পর দুটি গুলি প্রথমটা ডান চোয়ালে আর দ্বিতীয়টা থুতনির কাছে। এবার আরও তীব্র আর্তনাদ করে জানোয়ারটি ফ্র‍্যাঙ্ককে মুখের মধ্যে নিয়েই তড়িদগতিতে জলে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সেই নিকশকালো জলের দিকে চেয়ে রইলাম অপ্রকৃতিস্থের মতো। আমি ছাড়াও সারা বনানী ফ্র‍্যাঙ্কের মৃত্যুতে বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। ঘন কালো মেঘ ঘনিয়ে এসে অঝোর ধারায় বর্ষা নামলো। আকাশবাতাশ, গাছপালা, পাহাড়লেক আমি সাক্ষী হয়ে রইলাম এক মর্মান্তিক ঘটনার। কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম জানি না। বৃষ্টির জল আমার দুঃখকষ্টের মাত্রা লাঘবের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। নিস্পৃহের মতো অপলক দৃষ্টিতে সেই জলের দিকে তাকিয়েই বসে রইলাম। যেখানে সেই প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ার আমার খুব কাছের একজন মানুষকে নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে। আমার ভাবনা, চিন্তা, চেতনা, আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেল ফ্র‍্যাঙ্কের বিদায় পথে।
ফ্র‍্যাঙ্কের সাথে কাটানো, সুখ দুঃখের মুহূর্তগুলি একের পর এক চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। পৃথিবীতে খুব কম মানুষই জন্মায় ফ্র‍্যাঙ্কের মতো বুদ্ধি, সাহস গুণাবলী নিয়ে। ফ্র‍্যাঙ্কের এই প্রলয়ঙ্কর পরিণতিতে আমার মনের অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করা আমার মতো বিজ্ঞানীর পক্ষে অসম্ভব।

ইতস্তত বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা সিলের দলকে দেখে মনে হল এখনও তাদের ভয়ের আশঙ্কা কাটেনি। তাদের পরিস্থিতি আমার পরিস্থিতির মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। তারাও আমার মতোই বন্ধু হারানোর বেদনায় বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছে। তারাও আমারই মতো মর্মাহত শোকাহত।

বৃষ্টিতে একভাবে বসে থাকতে থাকতে কখন পাথরের ঢিবির গায়ে ঠেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি তা মনে নেই। ঘুম যখন ভাঙল। তখন সূর্য পুব আকাশের অনেকখানি উপরে উঠে এসে নিরবিচ্ছিন্ন টুকরো টুকরো মেঘেদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। রোদের উষ্ণতা অনুভব করা কঠিন। লেক হতে শীতল বাতাস এসে সারা শরীরে হিমেল স্রোত বইয়ে দিচ্ছে।

সিলেদের নানান রকম শব্দ কানে আসছে। তাদের দেখলে অনুমান করা কঠিন যে তারা গত কালই অমন এক চরম বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল। এবং অমন এক বিভীষিকাময় ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।
আজ কত নির্বিঘ্নে অবাধে খেলে চড়ে বেড়াচ্ছে। অথচ গতকালই এরা এদের আত্মীয় পরিজনদের হারিয়েছে। আজ তাদের মধ্যে গতরাতের প্রলয়ের কোনও ছাপ নেই। গতরাতে নৃশংসতা ভুলে অসংকোচে, অক্লেশে নির্ভয়ে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। খুব সহজেই নতুন করে ফিরে গেছে সাধারণ জীবনযাপনে।

কিন্তু মানুষ এমনটা পারে কই!
এবার মনে হল টেন্টে ফিরে যাওয়া দরকার।

টেন্টে ফিরে একাগ্র মনে ভাবতে লাগলাম এখন আমার কী করণীয়। সেই অভিশপ্ত স্থান থেকে ফেরার সময় ফ্র‍্যাঙ্কের বন্দুকটাও নিয়ে এলাম সাথে করে। তখনও আমার গলায় ক্যামেরাটি ঝুলছিল। কেবল মাত্র এই যন্ত্রই পারে পৈশাচিক নেসির স্বরূপ সকলের সামনে আনতে। এই যন্ত্রই পারে লকনেসের তরল রহস্য উন্মোচন করতে।
_____________

পোস্ট অগাস্টাসে ফিরে এলাম সেই দিনই। ফ্র‍্যাঙ্কের আত্মীয় পরিজন বলতে তিনকুলে কেউ ছিল না। তাই স্বভাবতই সরকারিস্কটল্যান্ড জুওলজিকাল ডিপার্টমেন্টছাড়া এমন কেউ পোর্ট অগাস্টাসে নেই যাকে ফ্র‍্যাঙ্কের মৃত্যু সংবাদ জানানোর প্রয়োজন। সেই জন্যই সে হয়তো এতটা বেপরোয়া নির্ভীক ছিল।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, ফ্র‍্যাঙ্ক সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবেই এই রহস্যের সন্ধান করছিল এবং সম্পূর্ণ এককভাবেই সে তার গবেষণা চলিয়ে যাচ্ছিল ডাস্টিনের মতোই। এদিকে আমিও ডাস্টিনের আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুতে বিমর্ষ হয়ে পরেছিলাম। তাই ডাস্টিনের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে অত্যুৎসাহী হয়েই তাকে এবিষয়ে সাহায্য করেছি। যদিও আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম যে এই গবেষণার বিষয়েগভর্নমেন্ট জুওলজিকাল ডিপার্টমেন্ট অফ স্কটল্যান্ডকে একটি লিখিত বিবরণ দেওয়ার। কিন্তু আমার ড্রাইভার ফিনুয়েলের মুখে হঠাৎ সেই খবরটি শুনে আর সেভাবে সময় হয়ে ওঠেনি সমস্ত লিখিত প্রক্রিয়া অবলম্বন করার।

তবে ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলি ধোয়ার পর বুঝলাম আমরা আমদের প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ সফল হয়নি। কারণ কাছে থেকে যে ছবি তোলা হয়েছিল সেটি অত্যধিক উৎকণ্ঠার ফলে ঠিকঠাকভাবে আসেনি। উত্তেজনায় হাত কেঁপে গিয়ে এমন ছবি এসেছে তাতে কিছুই স্পষ্ট করে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু জানোয়ারটি জলে থাকা অবস্থায় যে কয়েকটা ছবি তোলা হয়েছিল তাতে অনেকটা বোঝা গেলেও যেতে পারে। তবে জানোয়ারটি একটু বেশি দূরে থাকার জন্য সেটা খুব ভাল করে দেখতে হয়।
আমি আর সময় নষ্ট না করে আমাদের একত্রিত করা সকল তথ্যাদি ছবি নিয়েগভরমেন্ট জুওলজিকাল ডিপার্টমেন্ট অফ স্কটল্যান্ডএর প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ডঃ রিকার্ডো স্ট্যানলির কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তাঁকে সকল কিছু বিস্তারিতভাবে জানাবার পর, কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে তিনি যে কথাগুলি বললেন তাতে আমার মন বিষিয়ে উঠলো। তারপর এই গবেষণার বিষয়ে যেসব বিস্ময়কর মন্তব্য করলেন যা আমি কখনওই কল্পনা করতে পারিনি।

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনও সরকারি অনুমতিপত্র না নিয়ে এমন একটা গবেষণা চালানো সম্পূর্ণ সরকারী নিয়মের বিপক্ষে। তাছাড়া নেসির অস্তিত্ব অনুসন্ধানে ফোরিয়াসের বিপদসংকুল নিবিড় অরন্যে যাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। এর পরিপেক্ষিতে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে তার সম্পূর্ণ দায় আমাদের নিজেদের। এর জন্যগভরমেন্ট জুওলজিকাল ডিপার্টমেন্ট অফ স্কটল্যান্ডকর্তৃপক্ষ কোনও রকম ভাবে আমাদের পাশে থাকতে পারবে না। তাছাড়া ফ্র‍্যাঙ্কের মৃত্যুর জন্য লকনেস নেসিই দায়ী কি না সে বিষয়েও তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তিনি নির্দেশ দেন, যে এবিষয়ে আর কোনও পদক্ষেপ যেন আমি না নি। এবং গবষেণা এখানেই বন্ধ করি।
তিনি ফ্র‍্যাঙ্কের মৃত্যুর ঘটনাটি নতুনভাবে সাজিয়ে সকলের সামনে আনবেন। তাতে সকলেরই মঙ্গল। কারণ নেসির অস্তিত্ব প্রকাশ পেলে, সারা লকনেস ভ্যালিতে এক প্রবল অরাজকতা দেখে দিতে পারে। তাতে লকনেস তথা স্কটল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভিত নড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই স্কটল্যান্ডের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সমস্ত ঘটনাটা চেপে যাওয়াই ভাল।
শেষের কথাটি রীতিমত হুমকির সুরেই বলা হল, এই ঘটনা কোনও কারণে প্রকাশ্যে আসলে আমার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে তারা বাধ্য হবে।

আমি যুগপৎ রাগ বিস্ময়ে কিচ্ছুই বলতে পারলাম না।
—————-
দিন কয়েক নিজের বাড়ি থেকে আর কোথাও বেরোনো হল না। মিঃ স্ট্যানলির কথায় ভীষণভেবে ভেঙে পড়লাম। আমি কখনই কল্পনা করতে পারিনি তিনি এভাবে আমাকে আশ্বস্ত করবেন।

এই ঘটনার দিন দুয়েক পর পেপারে ফোলাও করে বেরোলো, বিজ্ঞানী ফ্র‍্যাঙ্কলিন এডওয়ার্ডের আকস্মিক মৃত্যুর রম্য কাহিনী।

কাহিনীটা হল এই, আর সকল সরকারি বেসরকারি বৈজ্ঞানিকদের মতোই এডওয়ার্ড ফ্র‍্যাঙ্কলিনও এস,, এল, এন (সিক্রেট অফ লকনেস ) অনুসন্ধানে তার একটি দল নিয়ে ফয়েরেসের জঙ্গলে যায়। কিন্তু তাদের কাজ চলাকালীন দুর্ভাগ্যবশত স্কটল্যান্ডের সবথেকে বিষাক্ত সাপ এডারের কামড়ে তার মৃত্যু ঘটে। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে সারা বৈজ্ঞানিকমহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এবং সকলেই তার এই পরিণতিতে মর্মাহত।

তার নীচের দিকে আর একটি বিস্ময়কর খবর চোখে পড়ল,
আগামী ২৩ মার্চ, “ব্যাথমেট্রিকাল সার্ভে ওফ স্কটল্যান্ডপক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। যেখানে সারা বিশ্বের খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা উপস্থিত থাকবেন। এতদিন যেসব বিজ্ঞানীরা লকনেসের এই সংখ্যাহীন দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে বেরিয়েছেন, তারাও উপস্থিত থাকবেন এবংএস,, এল, এনসপক্ষে তাদের মতামত প্রকাশ করবেন।

এই খবরটা পড়ার পর সুপ্ত ইচ্ছেটা আরেকবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। এই সুযোগ। আরেকবার শেষ চেষ্টা করা যেতে পারে। এই বৈজ্ঞানিক বৈঠকে আন্তর্জাতিক মহলের অনেক বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিকরা উপস্থিত থাকবেন। তাদের মধ্যে একজন কে যদি তার অভিজ্ঞতার কথা বলা যায় এবং ডকুমেন্ট ফোটোগ্রাফসগুলি দেখানো যায়। তাহলে তারা তাকে নিশ্চই সমর্থন করবেন।

যে উদ্দেশ্যসাধনের আশায় ডাস্টিন ফ্র‍্যাঙ্ক নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছে। তাদের এই দান আর বিফলে যাবে না।
তাই আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম প্রকৃত সত্যটা সকলের সামনে আনার শেষ প্রচেষ্টায়।

১৯৫৭, ২৩ মার্চ,
পরিকল্পনা মতোই এই দিনটিতে বেশ আড়ম্বরের সাথেই আয়োজন করা হল এক বিশাল বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের। তাদের উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নামকরা বিজ্ঞানীরা। সভার প্রধান বক্তাদের সারিতে ছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম গ্র‍্যারিক, ফ্রান্সের রবার্ট বেঞ্জামিন, জাপানের ডেভিড ওয়াং যুক্তরাষ্ট্রের স্যার জোনাথন হকিংস প্রমুখ বিজ্ঞানীবিশেষ।

সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই আমি সুযোগ বুঝে রবার্ট গ্যারিকের সাথে দেখা করলাম। এই মানুষটির সাথে আমার আগে পরিচয় হয়েছিল। বছরখানেক আগে তিনি স্কটল্যান্ডে এসেছিলেন অন্য কোনও ব্যক্তিগত গবেষণার কাজে। তবে যাওয়ার আগে পোর্ট অগাস্টাসের এসে জুওলজিকাল ডিপার্টমেন্টের সকল বিজ্ঞানীদের সাথে সাক্ষাৎ করে যান। তাঁকে স্বাগত করার জন্যই আমাদের প্রচেষ্টায় এখানে কর্মরত বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি ঘরোয়া বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানেই জোনাথন ডালটনের অ্যাটোমিক থিওরির উপর আমার লেখা একটি প্রবন্ধ পড়ি। যা শুনে অনেকে আমার কাজের যথেষ্ট প্রশংসা করেন। তবে গ্যারিক তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। সেই সূত্রেই তখন আলাপটা বেশ গাঢ় হয়েছিল।

তিনি আমায় দেখে যারপরনাই আনন্দিতই হলেন। বেশি সময় নষ্ট না করে আমি আমার অভিজ্ঞতা এবং আমাদের একত্রিত করা ছবি তথ্যাদি তাঁকে দেখাই।
তিনি সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে শুনে,
শেষে বলেন,
“—————–Rudra, I appreciate your views and agree with many of your observations. but There are a number of specific issues left somewhat ambiguous in your documents and photographs…,

তাঁর এই শেষ কথাটা এখনও আমার কানে বাজে। আজও প্রলয়ঙ্কর ঝড়বৃষ্টির দাপট শুরু হলে আমার সেই বিভীষিকাময় রাতের কথাই মনে পরে যে রাতে ফ্র‍্যাঙ্কের সেই নৃশংস পরিণতি আমি সচক্ষে দেখেছিলাম।

তারপর আমি আর বেশিক্ষণ সে সভায় থাকতে পারিনি। কারণ গ্যারিক মারফৎ কথাটি ডঃ স্ট্যানলির কাছে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগেনি।

স্ট্যানলির করুণায় আমার প্রাণ ভিক্ষা দেওয়া হলেও আমাদের একত্রিতকরা নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা। আর আমায় চাকরী থেকে বরখাস্ত করা হয়।

সেই বৈজ্ঞানিক সম্মেলনিতে নানান তথ্য পর্যালোচনার পর এবং বিভিন্ন মতামত গবেষণা একত্রিকরণের পর বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা এই সিদ্বান্তে পৌঁছন।
প্রায় ৩৭কিমি বিস্তৃত সুগভীর ক্যালেডোনিয়াল ক্যানেলের নীচে অসংখ্য ছোট ছোট শুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক কারণেই সেই আগ্নেয়গিরির মুখ হতে উষ্ণ গরম বায়ু প্রবল বেগে উপরে উঠে আসে। যার কারণেই আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়।


এরপর আমি আর বেশিদিন পোর্ট অগাস্টাসে থাকতে পারিনি। মানসিক শারীরীকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে মুষড়ে পড়েছিল এক্কেবারে।

পরে এক সহকর্মীর সাহায্যে বুনলয়েটেরস্কটল্যান্ড কমিউনিটি কলেজ“- অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হই।

আমার এখন মনে হয়, সেদিন আমাদের গবেষণা অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আসলে হয়তো তার পরিণাম খুব খারাপই হত। আখেরে দেশের ক্ষতিতে তো মানুষেরই ক্ষতি। তাছাড়া পৃথিবীতে কিছু কিছু রহস্য অসমাধান অবস্থায় থাকাই ভাল। এই প্রাচীন জীব গুলি তো প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ যখন প্রকৃতির প্রাধান্য উপেক্ষা করে নিজেই সর্বেশ্বর হতে চাই। তখনই হয়তো প্রকৃতি তার স্বরূপ দেখানোর উদ্দেশ্যেই এমন ধ্বংসলীলা করে থাকে।

হয়তো আজও গভীর রাতে সেই লকনেস তীরের নিবিড় অরণ্যানীতে কান পাতলে, প্রবল বায়ুর উদ্দামতায় গাছেদের উন্মত্ততার শব্দ, রাত জাগা পাখিদের শব্দ, শিয়ালহায়নাবনবিড়াল এবং এলিফ্যান্ট সিলেদের নৈশব্দ ছাপিয়ে আরেকটি শব্দ শোনা যায়। যে শব্দ আসে ক্যালেডোনিয়াল ক্যানেলের কল্পনাহীন গভীরতা থেকে। হয়তো আজও কখনও কখনও লেকের জল আকস্মিকভাবে আলোড়িত হয়ে ওঠে। হয়তো আজও ফোয়েরেসের সেই নগ্ন পাহাড়ের নীচে বসবাসকারী সিলেরদল কোনও এক অর্বাচীন নৃশংস প্রাণীর নৈশভোজে পরিনত হয়।

 

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ সুদীপ্ত নস্কর

প্রচ্ছদ ~ enciclopediadelmisterio

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply