শেষ চিঠি

Friends, Short Story, Story, Supernatural, Thriller, বাংলা

এত কম ভাড়ায় অঞ্চলে এরকম বাড়ি পাওয়ার আশা মোটেই ছিল না। বাড়িটি পাওয়া মাত্রই মনে হয়েছে, ভগবানের কৃপাদৃষ্টি এতদিনে আমার উপর পড়েছে। তা না হলে, রিষড়ার মতো অঞ্চলে, এমন নিরিবিলি গঙ্গার ধারে বাড়ি পাওয়ার ভাগ্য এই কপালের নয়। রিষড়া হাইইস্কুলে বাংলার শিক্ষক হয়ে আসা মাত্রই সব থেকে বড় সমস্যায় পড়তে হয়েছিল থাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে।এই নব্বই দশকের শেষের দিকেও এই অঞ্চলে বাড়ি খোঁজা নিতান্তই ঝক্কির কাজ তা বুঝতে সময় লাগেনি। শেষমেশ কোনও উপায় না করতে পেরে হেডমাস্টার মশাইয়ের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। তিনিই সদয় হয়ে, তাঁর বাড়ির ছাদের ছোট্ট ঘরটিতে থাকার বন্দোবস্ত করে দেন। তবে এদিক থেকে আমিও অন্য ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। 

সেদিন টিফিনের সময় আমার কাছে এসে একগাল হেসে ইংরেজি শিক্ষক সমরবাবু বললেন

অজয়বাবু, শুনলাম আপনি নাকি বাড়ি খুঁজছেন? কেনবিয়ে টিয়ে করছেন বুঝি???

বাড়ি খোঁজার সাথে বিয়ের কী সম্পর্ক আছে সেটা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না ..
একটুইতস্তত, করে বললাম, না মানেকত দিন আর লাহাবাবুর বাড়িতে থাকব?? মেদিনীপুর থেকে মা বাবাও এসে থাকতে পারেন না তেমন ভাবে। একটা আলাদা বাড়ি হলে তাঁরা এসে আমার কাছে থাকতে পারতেন, এই আর কী।

আমি একটা বাড়ির খবর দিতে পারি তবে ……

তবে কী??

এমনিতে জায়গা ভীষণ ভাল। একদম গঙ্গার ধারে নিরিবিলিতে, কাছেই বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে হেস্টিংস জুটমিল রয়েছে। তাতে দিনে শ্রমিকদের হৈচৈ হলেও, সন্ধ্যের পর বেশ শান্তিপূর্ণ। তবে সেই বড়িটির একটু বদনাম আছে, জানোই তো এসব পাড়া গাঁয়ে কেউ কারোর ভাল চায় না। বাড়ি এখানে ফেলে মালিক কলকাতায় বসে ভাড়াগুনবে, সেটি হতে দিলে চলে ! তাই হিংসেই আশেপাশের লোকে নানান গুজব রটিয়ে বেড়ায়। 

কি গুজব?? 

বছরখানেক আগে অবধি ওই বাড়িটিতে থাকতেন এক বাঙালি পরিবার। বাড়ির মালিক নাকি ওই হেস্টিংস জুটমিলের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। কী জানি, কোনও এক অজ্ঞাত কারনে মাত্র ৪৫ বছর বয়েসে মাথার গণ্ডগোল দেখা দেয়। এই ঘটনার পর তাঁর স্ত্রী সন্তান তাকে ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। আর তিনি থেকে যান এখানেই, সঙ্গে থাকে চাকর রতন। শুনেছি নাকি ভদ্রলোক শেষের দিকে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যান। সন্ধ্যের পর থেকেই চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকতেন। সে বাড়ির আশেপাশে তেমন কোনও বাড়ি নেই তাই রক্ষে। বেশ কিছুদিন এভাবেই চলার পর একদিন নিজের শোয়ার ঘরেই আকস্মিক মৃত্যু ঘটে তাঁর। ডাক্তার জানায় হৃদরোগের কারণে মৃত্যু। 

এরপর প্রায় বছর খানেক সে বাড়িতে আর কেউ থাকেন না। লোকেরা রটিয়ে বেড়ায় সেই পাগলের অতৃপ্ত আত্মা সেই বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। বলাবাহুল্য সেই কারণেই ওই বাড়ি আজ পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। রতন এখন সেই বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে আছে। প্রায়ই লোক ধরে আনে বাড়ি দেখাতে, আর তাদের পছন্দ হয়েও যায়। তবে লোকের মুখে কানাঘুষো শোনার পর কেনার ক্ষেত্রে আর তেমন কেউ আগ্রহ প্রকাশ করে না। এদিকে রতন দমবার পাত্র নয়, সে প্রাণপণে এই বাড়ি বেচার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু সে বাড়ি ভাড়া দেবে কিনা তা ঠিক বলতে পারবো না।
রতন থাকে নতুন বাজারের কাছে বলেন তো ঠিকানা দিতে পারি। 

সত্যি কথা বলতে ভূত প্রেত, দত্যিদানো, গল্পেই বেশ লাগে। তবে বাস্তবে সকল অলৌকিক কল্পনায় আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী নই। এগুলি আমার কাছে মূল্যহীন। 

সমরবাবুর কাছে এই বাড়ির সন্ধান পেয়ে আর সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়লাম তার সাথে দেখা করতে। রতন ভাড়া দিতে এক কোথায় রাজী হয়ে গেল। 

রতন সেখান থেকে নিয়ে গেল বাড়ি দেখাতে
নীচে সারি সারি চারটি ঘর নিয়ে একটি সুবিশাল বারান্দা। বাড়ির চারিধারে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সামনে অনেকখানি জায়গার দুদিকে আগাছা বুনো ফুলের ঝোপঝাড় (খুব সম্ভবত সেটি বাগান ছিল এক সময়ে ) রেখে মাঝবরাবর লম্বা ইটের বাঁধানো রাস্তা মেন গেট পর্যন্ত চলে গেছে। বাড়ির ডান দিক বারান্দার শেষাংশ থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে। ঢালা ছাদের এক ধারে একটি চিলেকোঠাও রয়েছে দেখলাম। এখানে দাঁড়ালে সামনে থেকে আসা গঙ্গার শীতল হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যায় এক্কেবারে। বাড়ি দেখে প্রশান্ত আনন্দে দেহমন ভরে গেল। তৎক্ষণাৎ কথা পাকা করে অগ্রিম বাবদ কিছু টাকাও দিয়ে দিলাম। তবে রতন বলে দিল যে আমি তিনটি ঘর উপরের ছাদের চিলেকোঠা ব্যবহার করতে পারি। একটি ঘরে তালা দেওয়ায় থাকবে সেটা খোলা যাবে না কোনওভাবে। শুনলাম এটাই নাকি তার বাবুর ঘর ছিল, এই ঘরেতেই তিনি মাড়া যান। ঘরে তাঁর কিছু জিনিসপত্র রয়েছে, যা তাঁর অবশিষ্ট স্মৃতি।

তা যাকগে তিনটি ঘর আমার জন্যে যথেষ্ট। 

ভাড়া খুব বেশি নয়, মাসে দুহাজার টাকা। শুনে কিছুটা চমকে উঠলেও, সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ উত্তেজনা সংবরণ করে নিলাম। 

তারপরের দিনই তল্পিতল্পা নিয়ে এসে উঠলাম। এখানে এসে দেখলাম কিছু কিছু আসবাব আগে থেকেই রয়েছে। যেমন নিচের একটি ঘরের খাট, আর একটিতে থাকা চেয়ার, টেবিল, আলমারি সব গুলিই অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করতে শুরু করে দিলাম। অনেক দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পরে থাকার দরুন এগুলি ব্যবহারের উপযুক্ত করার জন্য জমাটবাধা ধুলো ময়লা, পোকামাকড়ের সাথে এক প্রস্থ যুদ্ধ করতে হয়েছে। 

তবে চিলেকোঠার ঘরটি খোলার পর সেখানেও এক পরিত্যক্ত আলমারি পাবো তা ভাবিনি। সেই আলমারিটিও কাজে লাগানো যায় কি না তা পরীক্ষা করছিলাম নিপুণভাবে। হঠাৎঅবিশ্বাস্য ভাবে একটি জিনিস আমার চোখে পড়ল, আলমারির ভিতরের নীচের দিকে একটি হিডেন ড্রয়ার। সেটি টানতেই খুলে বেড়িয়ে এল ড্রয়ারটি। ভেবেছিলাম গুপ্তধন বা তেমন কিছু মূল্যবান জিনিসের সন্ধান পাবো, সে বিশ্বাসে জল ঢেলে দিল, ধুলোজমা কিছু কাগজের তাড়া। সেগুলি ভাল মত ঝেড়ে রোল করে পকেটে পুরে আলমারি বন্ধ করে নীচে চলে এলাম। খাওয়াদাওয়ার পর শোবার ঘরে এসে সেই কাগজগুলির খুলে ভাল করে দেখে বুঝলাম, সেটি তে কিছু লেখা আছে

খুব সম্ভবত চিঠি জাতীয় কিছু

শেষ মুহূর্তে এমন এক স্বীকারোক্তি লিখে যেতে হবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি নি। প্রত্যেকটা দিন যে অকথ্য নরক যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছি, তা যে কোনও জীবিত মানুষের সহ্য সীমার বাইরে। হয়তো মরার পরেও ঠিক এমন ভাবেই শাস্তি দেবে সে আমায়।

আজকাল প্রতি রাতে আসে সে, পায়চারি করে আমার বিছানার চারিপাশে। তারপর শুরু হয় সেই নারকীয় অত্যাচার, এক অদৃশ্য চাবুক দিয়ে মারে আমায়। আমার সারা দেহের কালশিটে দাগ গুলি যন্ত্রণায় দগদগ করে। সাররাত ধরে চলতে থাকে তার পৈশাচিক খেলা। ঘুমোতে দেয় না একটুও। আমায় পাগল করে দেবে এভাবে। কত বলেছি ওকে, আমায় মেরে ফেল, আমি আর পারছিনা, কষ্ট সহ্য করতে। সে শুধু হাসে, উফ! কি পৈশাচিক তৃপ্তি সে হাসিতে। এখন আমার কারোর সঙ্গ ভাল লাগে না আর। সর্বদা মনে হয় সকলে আমার এই নরক যন্ত্রণার মজা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে, সবাই পর, সবাই

আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাওয়ার আগে সব কিছু লিখে যেতে চাই, স্বীকার করে যেতে চাই আমার সকল অপরাধ
হিংসা লোভ রিপুর বশবর্তী হয়ে মানুষ কত নিচে নামতে পারে তার চরম দৃষ্টান্ত আমি। স্বর্গ নরক সবই এই পৃথিবীতে, মানুষ তাঁর জীবদ্দশায় যা পাপ করে তার মূল্য কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে যেতে হয় মৃত্যুর আগে। যেমন আমি আমার গর্হিত কর্মের ফল এভাবে ভোগ করছি

সেই ব্যস্তদুপুরের কথা এখনও ভালোভাবে মনে আছে।

এই নিকশ কালো অভিশপ্ত ছায়া বিন্দুমাত্র পরেনি আমার সাদামাটা সরল জীবনে। 

সেদিন যদি অবিনাশ এসে অবিশ্বাস্য খবরটি না দিত, তাহলে হয়ত আজ সবিই ঠিকঠাক চলত আগের মতই। অবিনাশ ছিল আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু সহকর্মী, আমি আর দুজনেই জুটমিলে স্টককিপারের কাজে নিযুক্ত ছিলাম। আমাদের তেমন কোনও বদঅভ্যাস না থাকলেও, প্রত্যেক শনিবার আমরা কাজের শেষে নতুন বাজারে যেতাম হাতের রেখা বদলানোর নেশায়, সাপ্তাহিক ভাগ্যলক্ষ্মী লটারির টিকিট কাটতে। এই লটারির লোভ দিনের পর দিন পেয়ে বসছিল আমাদের দুজনেরই। ভাগ্যদেবী একদিন না একদিন সুপ্রসন্ন হবেন এই দৃঢ় বিশ্বাসে ভর করে চলত আমাদের অদম্য প্রয়াস।

সেই দিন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কি যেন একটা হিসেব মেলানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছিলাম। এমন সময় কোথা থেকে অবিনাশ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। হাতের পেপার টা আমার টেবিলে রেখে, দ্রুতভাবে পাতা উল্টিয়ে ভাগ্যলক্ষ্মী লটারির বিজ্ঞাপনের নীচের দিকে (সাপ্তাহিক ফলাফল ) আঙুল দেখিয়ে বলল

দেখ, ভাই শান্তনু, আমি কি ঠিক দেখছি এটা কি ১৮৯০৭ লেখা আছে?? আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তুই একবারটি দেখ ভাই

আমি প্রথমে কিছুই ঠাওর করতে পারলাম না, সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞেস করলাম,
কেন কি হয়েছে, হ্যাঁ তাই তো লেখা আছে দেখছি।

বার লক্ষ্য করলাম তাঁর চোখ ভিজে গেছে, চোখে মুখে এক শুভ্র আনন্দের ঝিলিক

কি হয়েছে বলবি তো?? 

ভাই, শান্তনু, আমার জ্যাকপট লেগে গেছে, বলেছিলাম না, আমি একদিন ঠিক পাবো, বলে পকেট থেকে তাঁর টিকিট টা বের করে আমায় দেখাল।।
সে উৎফুল্লের স্বরে বলে গেল
ভগবানের অশেষ কৃপায় এবার আমার সুদিন ফিরে আসবে রে। আমি তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। ঠাকুর তুমি আছ। ঠাকুর তুমি আছ। আমি দশ লাখ টাকার মালিক হয়ে গেলাম। উফ ! আমি আনন্দে পাগল হয়ে যাব। টাকা টা পেয়ে আগে আমি গ্রামের… …

অবিনাশ নিজের মত বকতে লাগল, তাঁর কথাগুলি আমার কান পর্যন্ত যাচ্ছিল না।

টিকিট টা স্বচক্ষে দেখে বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই, কেন জানিনা আমার শরীর ভারি হয়ে এলো ধীরে ধীরে। ইন্দ্রিয়গুলির উপর আর কোনও আধিপত্য নেই, সারা জুটমিল বনবন করে ঘুরতে লাগল আমার চোখের সামনে। যেন কোনও অতিপ্রত্যাশিত কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের টুটি ছিঁড়ে বিকৃত মুখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার ব্যর্থতার পরিহাস করছে অবিনাশ। 

সম্বিত ফিরে পেলাম অবিনাশের ধাক্কায়।
কিরে কী ভাবছিস!! চল এখনই আমার সাথে নতুন বাজারে যেতে হবে।
আমি একা পচে মরবো এই নালায় আর এই প্রবল ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে রাতারাতি ফকির থেকে রাজা হয়ে যাবে এই বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না যেন। তড়িৎপ্রবাহের মত মাথায় খেলে গেল এক আদিম ক্রুর বুদ্ধি। দুপুরের সময় মিলের পিছনের পরিত্যাক্ত  গোডাউনের কাছে কেউ আসেনা।

আমি তাকে বললাম

হ্যাঁ, সেই ভাল, এখনি চল, কিন্তু দুপুর দুটো নাগাদ দোকান বন্ধ হয়ে যায়। এখন বাজে .৩০, আমরা যদি মিলের পিছনের নদীর ধার থেকে শর্ট কাট ধরি তবে দোকান বন্ধ করার আগে পৌঁছে যেতে পারি। 

দেখলাম, আবিনাশ রাজী হয়ে গেলআমরা দুজনে মিলের পিছনের দিকে এলাম। মনে মনে কী ফন্দি এঁটে ফেলেছি তা ঘুণাক্ষরে বুঝতে দিলাম না তাকে, খুব স্বাভাবিক ভাবেই তার সাথে কথা বলে চলেছি

তুইতো রাতারাতি লাখপতি হয়েগেলি ! কিছু ভেবে দেখলি এত গুলো টাকা নিয়ে কি করবি???

গ্রামের বাড়ি চলে যাব এই কাজ ছেড়ে, বাবার সব দেনা মিটিয়ে, ভাল করে বাড়িঘর বেঁধে ওখানেই থেকে যাব। তারপর নিজের একটা ব্যবসা করার ইচ্ছে আছে। 

বাঃ, সব প্ল্যান করেই রেখেছিস দেখছি। কিসের ব্যবসা??

এখনো ভাবিনি, আগে ১০লাখ টাকা টা পাই, তারপর নয় ভেবে দেখব। 

গল্প করতে করতে অবিনাশ একটু এগিয়েই হাঁটছিল, আমি শুধু চারিপাশটা ভাল করে দেখে নিচ্ছিলাম যদি কেউ থেকে থাকে তাহলে আমার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। এমন সময় সুযোগ বুঝে একটা ভাঙা যন্ত্রের উপর পরে থাকা ভারি লোহার দণ্ড তুলে সজোরে বসিয়ে দিলাম অবিনাশের মাথার উপর। আচম্বিতে তীব্র আঘাতে কিছুক্ষণ ছটফট করে নিস্তেজ হয়ে গেল তার রক্তাক্ত শরীর। নিথর দেহখানির মধ্যে প্রাণের অবশিষ্ট কিছু বাকি রয়েছে কিনা দেখে নিলাম ভাল করে। তারপর তার পকেট থেকে টিকিট টা বের করে তার মৃতদেহ ফেলে দিলাম নদীর জলে।

এরপর সব কিছুই কল্পনা মাফিক হিসেব করেই এগিয়েছি। বেশ কিছুদিন অবিনাশের আকস্মিক অন্তর্ধান নিয়ে হুলুস্থুল পড়ে গেলেও, সময়ের সাথে সাথে সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। আর আমিও এদিক থেকে নিজের মত করে সব গুছিয়ে নিলাম। মনে মনে নিজের কাজের প্রশংসা না করে পারলাম না। এমন নিপুণ ভাবে কাজটি করেছি কেউ কোনও সন্দেহ পর্যন্ত করতে পারে নি। থাক না ! এত কম সময়ে একটু বুদ্ধি বল প্রয়োগের মাধ্যমে যদি সৌভাগ্যসূর্যকে মধ্যগগনে আনা যায় তাতে ক্ষতি তো কিছু নেই ! কত দিন আর এই ভাবে নির্লীপ্ত জীবনযাপন চলবে ! এবার চাই আরও সুখ, আরও প্রাচুর্য, আর প্রশান্তি। এমন ব্যবস্থা চাই যাতে লক্ষ্যকেশী অলক্ষীর ছায়াও যেন না পরতে পারে আমার ভবিষ্যতে।

 তবে কখনো ভেবে দেখিনি এই কৃতকর্মের এমন করুণ পরিণতি হতে পারে। 

তারপর এই বাড়িটি তৈরি করলাম, কলকাতা থেকে স্ত্রী সন্তান কে এখানে নিয়ে এসে বেশ হাসিখুশিতে জীবন কাটাতে লাগলাম। কোম্পানির চল্লিশ শতাংশ শেয়ার কিনে খুব শীগ্রই সামান্য স্টক কিপার থেকে ম্যানেজারের পদে নিযুক্ত হলাম। 

তারপর এল সেই অভিশপ্ত রাতবাড়িতে কেউ ছিল না, মায়ের শরীরটা ভালো নেই তাই প্রমীলা টুকাইকে নিয়ে কলকাতায় গেছে। মাঝরাতে এক বিকট আওয়াজে গেল ঘুম ভেঙে। লক্ষ্য করলাম জানলার পাল্লার আওয়াজ। সেটা শোয়ার আগে বন্ধ করা হয়নি। আকাশের অবস্থা ভাল নয়, বাইরে ঝড় উঠেছে, প্রবল বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা আছে। গিয়ে জানলা টা বন্ধ করে আবার এসে শুয়ে পড়লাম। কি যেন এক অদ্ভুত অস্বস্থিতে ঘুম আসতে চাইছে না কিছুতেই। মনে হচ্ছে আমি ছাড়াও ঘরে অন্য কেউ একজন আছে, যে নিঃশব্দে চলাফেরা করছে দরজা থেকে খাট পর্যন্ত আবার খাট থেকে দরজা অবধি। ক্রমে ক্রমে তার অনুভূতি প্রবল হতে লাগল। তার নিঃশ্বাসের শব্দ এবার যেন স্পষ্ট শুনতে পাড়ছি। হঠাৎখাটটা একটু নড়ে উঠল। খাটে কেউ বসলে যেমন ভাবে নড়ে উঠে ঠিক তেমন। পা থেকে মাথা অবধি এক হিমেল স্রোতের প্রবাহ অনুভব করলাম। খুব সন্তর্পণে দম বন্ধ করে ক্ষীণ চোখ খুলে দেখে সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। খাটের উপর পায়ের কাছে বসে অবিনাশ, আমার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে। তার চোখ দুটি জ্বলন্ত ভাটার মত লাল হয়ে জ্বলছে। ক্ষুধিত বাঘের মত ক্ষিপ্র ভাবে সে আমার মাথার কাছে সরে এসে মুখের কাছে ঝুঁকে এলো, বিদ্যুৎ খেলে গেল শিরা উপশিরায়।

এক বিকট ভয়ানক খনখনে গলায় বলল
বাঃ বেশ মজায় আছিস দেখছি। অন্যের টাকায় ফুটুনি মেরে অবলীলায় দিন চলে যাচ্ছে। খুব সুখে শান্তি তে ঘর করছিস। 

অবিনাশ তুতুই!!!

হ্যাঁ, বন্ধু আমি, আমায় তো ভুলেই গেছিস একেবারে। তাই মনে করাতে চলে এলাম।। তাঁর পৈশাচিক হাসিতে ঘর কেঁপে উঠল।

আমায় ক্ষমা করে দে ভাই। আমি ভুল করেছি আমায় প্রাণে মারিস না।

হে হে, তুই মিথ্যে ভয় পাচ্ছিস বন্ধু। আমি তো তোকে প্রাণে মারতে আসি নি। যদি তোকে এভাবে মেরে দি, তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে কি করে ! আমি তোর এমন অবস্থা করব, যা দেখে মৃত্যুও ভয় পাবে তোর কাছে আসতে। তুই জ্যান্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকবি।

আমায় ছেড়ে দে ভাই। আমি তোর সব কিছু ফিরিয়ে দেব। এই টাকা পয়সা, ধনসম্পত্তি সব তোকে দিয়ে দেব।

কাকে দিবি?? আমি এখন এগুলো নিয়ে করবই বা কি??? যদি কিছু ফিরিয়ে দিতে চাস তবে দে ! দে আমার জীবন ফিরিয়ে। কী অপরাধ ছিল আমার বল?? তোকে বন্ধু ভাবাটা কী আমার অপরাধ? না তোকে বিশ্বাস করা টা? আমি তো তোর কোনও ক্ষতি করিনি?? তবেকেন?

আমি এত গুলো টাকার লোভে পাগল হয়ে গেছিলাম। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে এই অপরাধ করেছি। আমায় ক্ষমা কর ভাই।

পাগল তো তুই হবিই বটে। তবে আরও সময় নিয়ে … 

তারপর থেকে শুরু হয় আমার নরকবাস।
সে দিনের পর থেকে সে রোজ আসে। অকথ্য শারীরিক মানসিক অত্যাচার করে। খুব মারে আমায়। উফ। কি যন্ত্রণাআমি আর পারছিনা। 

অনেক বার চেষ্টা করেছি আত্মহত্যা করার। চেষ্টা করেছি মরে বেঁচে যেতে। কিন্তু সে আমায় মরতেও দেয় না। আর বাঁচতেও দেয় না।

টুকাই, প্রমীলা সবাই আমায় দেখে ভয় পায় এখন। যখন তাদের দরকার ছিল তখন কাউকে পাইনি আমার পাশে। একাকীত্ব আর যন্ত্রণার সাথে বন্ধুত্ব করে নিয়েছি। এখন আর কোনও মিথ্যা সহানুভূতির প্রয়োজন নেই, আমি একাই থাকতে চাই। একদম একা।

ঘড়ির তীব্র আওয়াজে বুঝলাম রাত ১২টা বাজে। মাথার উপর সশব্দে ঝড়ের বেগে পাখা ঘুরছে, তবুও আমি ঘেমে চান হয়ে গেছি। কাগজগুলি রেখে খাট থেকে উঠে টেবিলে রাখা গ্লাস ভর্তি জল এক নিঃশ্বাসে শেষ করে, বিছানায় এসে বসলাম।

এমন সময় এক শব্দ কানে এলো পাশের ঘরে কেউ জুতো পায়ে হাঁটছে। শব্দটা একবার জোরালো হচ্ছে পরক্ষণে আবার হালকা হয়ে যাচ্ছে। কেউ একপ্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে চলাফেরা করলে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমন। সর্বাঙ্গে শিহরণ খেলে গেল। হৃদপিণ্ডে একশটা দামামা এক সাথে বাজতে শুরু করেছে। 

হঠাৎ এক তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকারে সারা বাড়ি কেঁপে উঠল। দম বন্ধ হয়ে এলো। এখন আমার কী করনীয় কিছুই বুঝতে পারছিনা। 

সেই চিৎকার এখন হাহাকারের রূপ নিয়েছে, কে যেন মিনতি করছে করুনভাবে,
আমায় ছেড়ে দে। আমি তোর পায়ে পরি, আমায় মুক্তি দে। আমায় ছেড়ে দে। আরও কত কী বলে যাচ্ছে আর্তচিৎকারে সাথে সাথে।

আমার শরীরে কোনও বল নেই। নিজেকে তুলে নিয়ে দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাব সেই শক্তি সঞ্চয় করার ক্ষমতাও নেই আমার। সারা বাড়ি পরিত্রাহি চিৎকারে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে। 

কতক্ষণ একভাবে কান বন্ধ করে, বালিশে মুখ গুঁজে শুয়েছিলাম তা মনে করতে পারি না। .
ঘুম ভাঙল রতন সমরবাবুর মিলিত ডাকে। 

কী মশাই!! কত ঘুমবেন?? এবার উঠে পড়ুন। বেলা ১০ টা বাজে। আপনি তো দেখছি রবিবার টা একদম ঘুমিয়ে কাটানোর প্ল্যানে আছেন। বললেন সমরবাবু। 

সকালের দিকে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পরেছিলাম। চোখ খুলে দেখি ঘরের ভিতর রতন সমর বাবু দাঁড়িয়ে।
সূর্যের আলো গতকালের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতাকে ম্লান করে দিল অনেকটা।

সমরবাবু সেই অতি পরিচিত পাণ্ডুর হাসিটি হেসে বলে গেলেন
বাজারে রতনের সাথে দেখা হয়ে গেল। তাই তাকে নিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে চলে এলাম। ওর কাছে শুনলাম। কাল নাকি সারা দিন একাই বাড়ি গুছিয়েছেন। আমায় একবার খবর দিতে পারতেন মশাই।ইস্কুল ছুটির পড় না হয় চলে এসে, আপনাকে একটু সাহায্য করে দিতাম। 

না না। তার প্রয়োজন ছিল না। এই তো কয়েকটা জিনিসপত্র, তাছাড়া রতন কাল বিকেল পর্যন্ত ছিল আমার সাথে। তারপর সে চলে গেল, আর আমি সন্ধ্যায় একটু ছাদের হাওয়া খেতে গেলাম। তারপর

আর কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। কাল রাতের ঘটনা ছবির মত আমার সামনে ভেসে উঠল, সেই অভিশপ্ত রাতের ঘটনা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মনে থাকবে। 

তারপর কী মশাই??

তারপর আর কী। একরাশ শীতল বাতাস ফুসফুসে ভরে নীচে নেমে এলাম। তারপর খাওয়া দাওয়া করে এক ঘুমে সকাল।

রাতের ঘটনা বেমালুম চেপে গেলাম তাদের কাছে। জানি না এমন ঘটনা কেউ বিশ্বাস করবে কী না! অথবা তা বোঝাতে গিয়ে অন্যের হাসির খোরাক হোয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার থেকে ভাল সেই রাতের অভিজ্ঞতা প্রখরভাবে থেকে থাক মনের বিশেষ অংশে। তবে এটা আমি বেশ বুঝতে পারছি রতন আমায় দেখে সবটুকুই আঁচ করতে পেরেছে। পরে সবটা তাকে জানিয়ে তার সাথে, স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়ে শান্তনুবাবুর ঘর থেকে পাওয়া চিঠিটি জমা করি। এইভাবেই শান্তনুবাবুর শেষ চিঠির সদ্ব্যবহার করলাম।

আজ বুঝতে পারলাম, পৃথিবীতে বিজ্ঞান উন্নয়নের সাথে সাথে কল্পবিজ্ঞান এবং অতিপ্রাকৃতিক বস্তুবিশেষেরও অস্তিত্ব রয়েছে।

সে দিনের পর আর আমি সে বাড়ি তে থাকিনি। সত্যি কথা বলতে সে বাড়িতে থাকার সাহস আর হয়ে ওঠেনি।তারপর মেদিনীপুর চলে যাই কিছুদিন মন হালকা করার জন্য। এবং ঠিক করি ফিরে সেই পুরনো আস্তানায়ই ফিরে যাব আবার। যত দিন না ঠিকঠাক একটা বাড়ির খোঁজ মিলছে।

হয়তো এখনও প্রতি রাতে শান্তনুবাবুর অতৃপ্ত আত্মা মুক্তি ভিক্ষা করে। হয়তো এখনও রাতের পরে সেখানে গেলে শোনা যায় সেই করুণ আর্তচিৎকার।

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ সুদীপ্ত নস্কর

প্রচ্ছদ ~ dreamsonline

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply