এবার মঞ্চে আসছেন

Anirban & Arijit, Humor, Nostalgia, আদতে আনাড়ি, বাংলা

বৌ পনেরোটা ডিম আর দুশো আদা আনতে দিয়েছে, তাই রাস্তায় বেরিয়েছি রাত আটটা নাগাদ। টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ছাতা আমি সাথেই রাখি, কিন্তু বৃষ্টি বাড়লেও খুলি না। শেডের তলায় আশ্রয় নি। শত তাড়া থাকলেও খুলি না। কারণ ভেজা ছাতা রাখার খুব ঝামেলা। কোথাও মেলে শুকোত দিলে ভুলে যাই তুলতে৷ ব্যাগে প্লাস্টিকে করে রাখলে বোঁটকা গন্ধ হয়ে যায়। তবে ছাতাটা সাথে থাকলে ভরসা পাই। জোরে হাওয়া দিলে একদিন ছাতাটা খুলে উড়ে যাব। জাস্ট উড়ে যাব। কোথাও ল্যান্ড না করলেই হলো। একদিন ট্রাইও নিয়েছিলাম। আমি উড়লাম না, ছাতাটা উড়ে গেল। তারপর বাড়ি ফিরে আমিও উড়ে গেলাম।

লক্ষণদার মুদির দোকান আমার বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। তা বড় বড় পা ফেলে হাঁটছি, হঠাৎ কানে এল ঢিকচিক ঢিকচিক ট্যাঁওও ঠুসস। সামনে দেখি ল্যাম্পপোস্টের মাথায় বাঁধা দুটো হ্যালোজেন দুই কোণ থেকে রাস্তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে, টুনি ঝিকমিক করছে প্যান্ডেলে। যাহ্ শালা, আজ আবার কী? রক্ষাকালী বা শেতলা পুজোও তো নেই সামনে। রবিন্দো নজ্জুল সন্ধাও অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে, হেব্বি নাচ হয়েছিল পাড়ার ক্লাবে। “রুমঝুম ঝুমঝুম” গানের সাথে পাড়ার রুমাবৌদি আর ঝুমাবৌদির হাত ধরাধরি করে সে কী তাণ্ডব নেত্য! কিন্তু আজ ছুতোটা কিসের! আর এ তো মাঠও নয়, দশফুট চওড়া রাস্তা।

আর একটু এগোতেই বুইতে পারলাম কেসটা। সাউন্ড চেকের মধ্যেই মাইকে ঢুপ ঢুপ করে দুবার হাতের তালু ঠুকে খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা অ্যাঙ্কর অ্যানাউন্স করলেন, “ধইয্যো ধরুন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরু হতে চলেছে বহু পোতিক্ষিতো কিসোর রোফি নাইট!” স্টেজের সামনে থেকে একটা ষন্ডামার্কা লোক হাত তুলে বলে উঠল, “মুকেসও আছে রে পাঁঠা, জুড়ে দে।” অ্যাঙ্কর চমকে গিয়ে শুধরে নিলেন, “কিসোর রোফি মুকেস নাইট হবে ওটা। চেয়ার পাতা আছে সামনেই, বসে পড়ুন। ভোলেন্টিয়ারদের সাথে কুপারেট করুন। নোমোস্কার!”

লক্ষণদার দোকান আর একটু এগোলেই। আমি সেই ভিড় টপকে “কুপারেট” করতে করতে এগোতে লাগলাম। রাস্তার একদিকে বাড়ির রোয়াকে তৈরি হয়েছে লম্বা স্টেজ। স্টেজের গায়ে লাগানো ছবিতে কিশোর আর রফি গলায় মালা নিয়ে হাসছেন, কিন্তু মুকেশের মুখ ভার। একটা টেবিলে ফুল মালার মাঝখানে রাখা আধ খাওয়া বার্থডে কেক। সেটা ভেঙে ভেঙে মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভলেন্টিয়ারদের প্রসাদ বিতরণ করছেন পৌরপিতা, জনসংযোগ বলে কথা। প্রসাদ দিতে দিতেই শুনলাম বলছেন, “দুপুরে পুজো হয়েছে কিশোর রফি মুকেশের৷ এটা তারই প্রসাদ।”

অনেকগুলো চেয়ার পাতা স্টেজে। তাতে হোতা টাইপের কয়েকজন এসে বসেছেন। আর অন্য কোণে পাঁচ ছটা চেয়ারে বসেছেন মিউজিশিয়ানরা। রাস্তার উল্টোদিকে, বলা ভালো রাস্তার মধ্যেই দু সারি চেয়ার পাতা, যেগুলো সবই ভর্তি ইতিমধ্যে। যেটুকু রাস্তা বাকি আছে, তার মধ্যেই দিয়েই কোনরকমে টোটো বাইক সাইকেল যাতায়াত করছে। তাদের কন্ট্রোল করছে ন্যাপলা দা, পাড়ার দাদা।

সুরের হাতছানি আমাকে চিরকালই টানে, সান্ধ্যজলসা বলে কথা আবার। তাই তাড়াতাড়ি লক্ষণদার দোকানে এসে অর্ডার পেশ করলাম। লোকটা খুব স্লো। প্রায় দু মিনিট পরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ডিম কিসের নেবে, হাঁস না মুরগীর?” জিভের ডগায় “ঘোড়ার” চলে এসেছিল প্রায়, চেপে গিয়ে বললাম, “হাঁস দেবে এই গরমে? তারপর রাতে হাঁসফাঁশ করে দমবন্ধ হয়ে মরুক বাকি লোকগুলো?” আদা আর ডিম নিয়ে পা বাড়ালাম মঞ্চের দিকে।

সাউন্ড চেক এখনও চলছে। অক্টোপ্যাডে “ঢিক ঢিক ঠিস” এর সাথে ঢোলকের “টাক টাক” আওয়াজ, ইলেকট্রিক গিটারে একটা বাচ্চা ছেলে কেত মারছে “ইটস মাই লাইফ”-এর ইন্ট্রো বাজিয়ে। সিন্থেসাইজারে বেশ বয়স্ক একজন হাত দিয়ে বসে আছেন, চোখ তার বন্ধ, যেন নিজের হাতের তালুর মতন চেনেন যন্ত্রটাকে। বেস গিটারে স্যান্ডো গেঞ্জি চোখে চশমা আর হাফপ্যান্ট পরে বসে একটা কুল ডুড, মাঝে মাঝেই সে মাথা ঝাঁকিয়ে মুখচোখ খিঁচিয়ে উঠছে। উল্টোদিকের চেয়ারে পাড়ার বয়স্ক মানুষেরা অবাক চোখে তাকিয়ে এই কর্মকান্ডের দিকে। ওঁরা ভাবছেন, এবার শুরু হলে হয়, একটা গান দেখেই পালাতে হবে। নয়তো ওই তাগড়াই তাগড়াই স্পীকার বক্সের গুম গুম আওয়াজে হৃৎপিন্ডও ড্যান্স করতে শুরু করে দেবে।

ন্যাপলা দা অনেকক্ষণ টোটো পাস করিয়েছেন ভিড়ের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু আর পারছেন না। হাত তুলে এবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা টোটোকে তিনি আটকে দিয়েছেন। হাত নাড়িয়ে বলছেন অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে৷ এদিকে টোটোতে বসে থাকা বৌদি চেঁচাচ্ছেন, “আরে ও দাদা, আমার বাড়ি তো প্যান্ডেলের পেছনেই। ঘুরে কোথা দিয়ে আসব? যেতে দিন, ওদিকে গিয়েই নেমে পড়ব।”

ন্যাপলা দা আর কাউকে চেনেন না এখন। উনি হাত নেড়ে আবার বুঝিয়ে দিলেন যে রাস্তা বন্ধ৷ চেয়ারে যারা বসেছিলেন রাস্তার ধারে, তাদের ডাকলেন চেয়ার নিয়ে রাস্তার মধ্যিখানে এগিয়ে আসতে, যাতে আর কেউ যেতে না পারে। এদিকে টোটোওয়ালা আর বৌদির লেগে গেছে। চালক অনুরোধ করছেন, “বৌদি আপনি এখানেই নেমে যান প্লিজ। প্যান্ডেল ক্রস করলেই তো আপনার বাড়ি।” বৌদিও নাছোড়বান্দা, চেঁচিয়ে বলছেন, “না, আমাকে বাড়ির সামনেই নামাতে হবে, কিচ্ছু শুনব না, তুমি টোটো ঘোরাও, মল্লিকপাড়া দিয়ে চলো, উল্টোদিক দিয়ে ঢুকব, নয়তো এক পয়সাও দেব না।”

এদিকে স্টেজের ওপর বেস গিটারিস্ট দাঁড়িয়ে পড়েছে হাফপ্যান্ট পরে৷ হাত দেখিয়ে কাকে একটা চেঁচিয়ে বলছে, “মনিটরে সাউন্ড পাচ্ছি না। একটু আউটপুট বাড়াও”। ওকে উত্তর দেওয়ার কেউ নেই, কারণ মনিটর তো দূরের কথা, সাউন্ড কন্ট্রোলারই নেই কোনও। বেশ কিছুক্ষণ ওর হম্বিতম্বি শুনে রাস্তার মাঝখান থেকে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেলেন ন্যাপলা দা।

– কী ভাই? কী সমস্যা তোর?

– আমার গিটারের সাউন্ড পাচ্ছি না ঠিকমতো।

– বাজা ভালো করে, তবে তো সাউন্ড পাবি।

শুনেই ছেলেটা বসে বাজিয়ে ডেমো দিতে লাগল।

– দেখুন, কিছু শোনা যাচ্ছে না। প্লাগ ইন ঠিকমতো হয়নি, একটু দেখুন না।

– দাঁড়া। ওই কে আছিস, পাঁজা ইলেকট্রিকের রতন পাঁজা কই রে?

ভিড়ের মধ্যে থেকে রোগাসোগা চেহারার একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়ে গেল ন্যাপলা দার সামনে। ওর কাঁধে হাত রেখে ন্যাপলা দা বললেন,

– একটা এক্সট্রা মাইক হবে?

– হয়ে যাবে দাদা।

– গুড, ওটা এনে এই গিটারের সামনে ফিক্স কর। সামনে মাইকই নেই, আর এ ব্যাটা সাউন্ড আসছে না বলে লাফাচ্ছে। কোথায় শিখিস রে বাপ তোরা?

গিটারিস্টের হাঁ করা মুখ দিয়ে মাছি কেন, আস্ত মাছ গলে যেতে পারে। সে এবার দাঁড়িয়ে বলে উঠল, “ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি? ইলেকট্রিক গিটারের সামনে মাইক? প্লাগ ইন ছাড়া বাজবেই না!”

ন্যাপলা দা ওর দিকে একটা কড়া করে দৃষ্টি দিয়ে বললেন, “বাজাতে চাস কি আজকে?”

এতেই কাজ হল। পাঁজার মাইকের সামনেই সে বসে গিটারের আঙুল চালাতে লাগল মুখ ব্যাজার করে। ন্যাপলা দা আবার টোটো সামলাতে নেমে পড়লেন।

সেই অ্যাঙ্কর আবার উঠলেন স্টেজে। এর মধ্যেই মুখ টুখ ধুয়ে চুলে জল মেরে এসেছেন বোঝা যাচ্ছে। মাইক তুলে নিলেন হাতে।

“বোন্দুগন, সুরু হোচ্চে আজকের ওনুস্টান। পোথমেই ফুঁ দেওয়া পিয়ানো বাজিয়ে শোনাবেন আমাদের সোবার প্রিয় নকাই দা।”

সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন নকাই দা, উনি হাতে মেলোডিকা নিয়ে স্টেজে উঠলেন। এরপর মিউজিশিয়ানদের দিকে তাকিয়ে দুবার তালে তালে মাথা নেড়ে ইনস্ট্রুমেন্টাল বাজাতে শুরু করলেন “আশা ছিল, ভালোবাসা ছিল, আর আশা নেই, ভালোবাসাও আর নেই।” মেলোডিকা বেশ সুন্দর যন্ত্র৷ দম আর আঙুলের মেলবন্ধনে চমৎকার সুর তৈরি হয়। নকাই দা বাজাচ্ছেন ভালো, সঙ্গতও মন্দ নয়৷ বেস গিটারিস্ট মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে উঠে হাতের তিন আঙুল মাথায় তুলে ছুঁড়ছে, তারপর কোমর বেঁকিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বসে পড়ছে। ওর পার্ফর্মেন্সটাই আজ সেরা, কারণ হাতের যন্ত্রটা বাজছে না। ন্যাপলা দা তাল দিতে দিতেই হাত নেড়ে টোটো খেঁদাচ্ছেন। গান এগোচ্ছে, “এই সেই কৃষ্ণচূড়া…” তে, কিন্তু একি! নকাই দা মেলোডিকা যন্ত্রে দুবার বাঁশির মতো ফুঁ দিয়ে রাস্তার দিকে দেখালেন। আবার গানে চলে গেলেন।

ন্যাপলা দা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলছেন নকাই দা?”

নকাই দা মেলোডিকা দিয়ে আবার দিলেন সেই তাল কাটা ফুঁ, দুবার, পুরো ট্রাফিক পুলিশের মতো। দর্শকরাও তাকাচ্ছেন ডানদিকে। ন্যাপলা দা বুঝতে পারছে না দেখে নকাই দা গানের মাঝেই মাইকে বলে উঠলেন, “বৌ এসেছে আমার, ওকে বসাও হতভাগা।” বলেই আবার মাথা নাড়িয়ে ঢুকে গেলেন বাজনায়, “চোখে চোখ, হাতে হাত, কথা যেত হারিয়ে…।” দেখলাম ভিড়ের মধ্যে একজন ভদ্রমহিলা মুখটা লজ্জায় আঁচল দিয়ে ঢেকে পালিয়ে গেলেন। আমরা যতদূর জানি নকাই দা এখনও বিয়ে করেননি!

উদ্বোধনী সঙ্গীত শেষ হতেই করতালি শুরু হল। চেয়ারের সামনে রাস্তায় বাচ্চাগুলো নেচে নেচে হাততালি দিচ্ছে। সেই দেখে এক বৌদি ওদের ধরে আনতে উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু পাশে রাখা পাঁজা ইলেকট্রিকের বিশাল পেডেস্টাল ফ্যানে ওনার ওড়না খুলে জড়িয়ে গেল। ফট ফট আওয়াজ করে পাখা বন্ধ হয়ে গেল। পৌরপিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল। তবে ওনার বা দর্শকদের কারুর চোখই পাখার দিকে ছিল না। জানি আপনার মনে এই প্রশ্নটা আসতই। লেখকের চোখ চারিদিকে ঘুরে না বেরালে লিখতাম কী করে এতকিছু? তাই আমার সব দোষ মাফ করবেন আপাতত।

অ্যাঙ্কর ফিরে এলেন স্টেজে। তবে উনি কিছু বলার আগেই মাইক কেড়ে নিলেন পৌরপিতা। দাঁড়িয়ে উঠে বললেন,

– এখানে উপস্থিত সকল পল্লীবাসীকে জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আজ এখানে আমন্ত্রিত হয়ে আমি গর্ববোধ করছি। কিশোর রফি মুকেশ হলেন আমাদের আত্মীয়ের মতো। ছোট থেকেই ওদের গান শুনে বেড়ে ওঠা। তাই আজ সন্ধ্যায় দুটো গানের অনুরোধ নিয়ে এসেছি। কেউ একজন গাইলেই খুশি হবো। গান দুটো হল “বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে” আর “মনে পড়ে রুবি রায়”। আহা, কী অপূর্ব গান! কিশোর আর রফির গলায় যেন যাদু ছিল।

দর্শকরা নিস্তব্ধ। আয়োজকরা বাকরুদ্ধ। আমি ভাবছি লোকটা যদি পাঁচটা গান বলত, তাহলে হয়তো অন্তত একটা কিশোর রফির হওয়ার চান্স ছিল। তবে উনি থামেননি এখনও!

– এইরকম জলসা চলতেই থাকবে। আমিও আসব বছর বছর আপনাদের আশীর্বাদে। দেখবেন একটু, হেঁ হেঁ। আর বসার আগে অনুরোধ করছি আয়োজকদের যে, ওই স্টেজের ধারের পাখাটা আবার চালু করে দিন কেউ, দর্শকদের গরম লাগছে।

লোকটার মতলব শুধু আমিই বুঝলাম কি না কে জানে। আরও দু একজনকে অবশ্য মুখ টিপে হাসতে দেখলাম।

মাইকে অ্যাঙ্কর ঘোষণা করলেন, “এবার মঞ্চে আসছেন আমাদের সোবার চেনা কিসোর কণ্ঠী বুবুল দা।”

দেখি স্টেজের নিচেই কালো চকচকে কোট আর পরচুলা পরে রেডি বুবুল দা। আজ কাঁপাবে মনে হচ্ছে স্টেজে।

“সাথে আছেন হাওড়ার জনোপ্পিও সিল্পি, ইন্ডিয়ান আইডল ফেরত, সারেগামাপা ফেরত, মিসসসসস পামেলা!”

কান ঝালাপালা হয়ে গেল হাততালির চোটে। পাশে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “নাম তো শুনিনি। টিভিতেও দেখিনি। তাহলে যে বলছে….”

সে স্টেজের দিকেই তাকিয়ে আমাকে বলল, “আরে অডিশন ফেরত। গান শুনুন ওসব না জেনে…”

এই লজিকে আমিও যে কত জায়গা থেকে “ফেরত” তার হিসেব করে নিলাম মনে মনে। গুগল ফেরত, মাইক্রোসফট ফেরত…… যাকগে! পাশের ছেলেটা আরও বলল,

– আশালতা কণ্ঠী ইনি… রাতের দিকে স্টেজে ওঠেন… সবাইকে ক্লান্ত করে দিয়ে বাড়ি যান।”

স্টেজে উঠে পড়েছেন সর্বাঙ্গ ঝকমকে পোশাকে ঢাকা সেই মিস পামেলা। পাশেই কিশোর কণ্ঠী বুবুল দা। নিচে থেকে ন্যাপলা দার হুঙ্কার, “লাচ হোবে লাচ, বুবুল, ধর সেইসব গান, মামণিকেও বল গাইতে।” এই বলে ন্যাপলা দর্শকদের দিকেও হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন যে কেউ যেন বসে না থাকে নাচের সময়। পৌরপিতাও বুঝে গেছেন যে এবার মোচ্ছব শুরু হবে। তাই উনি উঠে হাতজোড় করে বিদায় নিলেন। উনি চলে যেতেই স্টেজের চেয়ার সব সরিয়ে দেওয়া হল। মিউজিশিয়ানদের বলা হল এবার দাঁড়িয়ে বাজাও। বেস গিটারিস্ট আর এইসব নিতে না পেরে গিটার ফেলে “ইয়ে মারাও” বলে স্টেজ থেকে লাফ দিয়ে নেমে চলে গেল।

হঠাৎ শুনি দূরে কোথা থেকে “মেরে সামনেওয়ালি খিড়কি মে” গান ভেসে আসছে। অন্য কোথাও ফাংশান হচ্ছে নাকি! প্যান্টের কাছে কে একজন আঙুল দিয়ে খোঁচা মারছে৷ তাকিয়ে দেখি এক বয়স্ক লোক আমার প্যান্টের পকেটের দিকে দেখাচ্ছে। এইবার বুঝলুম যে আমারই ফোনের রিংটোন। ছ বছর আগে যে আমার সামনেওয়ালি খিড়কিতে থাকত, সেই এখন আমার বাড়ির খিড়কি থেকে ফোন করছে। আর এই অবস্থাতেই আমার মাথায় এল যে আদা আর ডিম দিয়ে আজ রাতেরই রান্না হবে বলেছিল বৌ। এখন বাজে সাড়ে নটা। তার মানে বাড়ি ফিরে আজ আবার উড়তে পারব। চেয়ারের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে ছুটতে লাগলুম বাড়ির দিকে। পিছন থেকে কানে ভেসে এল,

“পিয়া তুউউউউউ, আব তো আজা,
হা আ হা হা হা, হা আ হা হা হা……”

~~~♦~~~

© অরিজিৎ গাঙ্গুলি

Leave a Reply