ইগের অভিশাপ

Friends, Short Story, Story, Supernatural, Thriller, বাংলা

জগত বিখ্যাত সাহিত্যিক এইচ পি লভক্রাফটের জন্ম মাসে, তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তারই একটি ডার্ক ফ্যান্টাসি গল্পের অবলম্বনে একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাইগের অভিশাপ

গল্পটি ভাল লাগলে তার সমস্ত কৃতিত্ব বিশ্ব সাহিত্যিক এইচ পি লভক্রাফটের। আর খারাপ লাগলে তার সমস্ত ভুল ত্রুটির দায় আমার।

এইচ পি লভক্রফটেরদা কার্স অফ ইগএর ছায়া অবলম্বনে,

***********************************************************************************************

প্রথম পর্ব  ঃ

গাড়ি থেকে নেমে চারপাশটা একবার ভাল করে দেখে নিলেন মিঃ রোজার। জঙ্গলের ভিতর থেকে মাদলের অওয়াজ হাওয়ায় ভেসে আসছে। আদিবাসীদের কোনও উৎসব চলছে মনে হয়।

দুদিকের গগনচুম্বী গাছের মধ্যে দিয়ে সরু আলের মতো যে রাস্তাটা সড়ক থেকে চলে এসেছে, তা এখানেই শেষ হয়েছে। সামনে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সরকারি ফরেস্ট অফিস। এই নিবিড় অরণ্যানীর মধ্যে এমন দ্বিতল কাঠের বাড়ি যেন বড়ই বেমানান।

তবে অরণ্যের প্রবল আধিপত্যে থেকে বাড়িটি যেন নিজেকেও তার মতো করে গড়ে নিতে বদ্ধ পরিকর।

বাড়ির গায়ে সবুজ ঘন শ্যাওলার আস্তরন পড়েছে। এবং লতা ফার্ণের ঝোপঝাড় বাংলোর বিভিন্ন অংশে নিজেদের থাকার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছে। ফলে বাড়ির অধিকাংশই সবুজে ঢাকা পড়ে গেছে।

প্রায় বারো লক্ষ্য বর্গমাইলে বিস্তৃত আমাজনের অভেদ্য অরণ্যের বাইরের দিকে এমন বেশকিছু সরকারি ফরেস্ট অফিস নির্মাণ করা হয়েছিল সেই নব্বই দশকের প্রথম দিকে। এই ফরেস্ট অফিসগুলি নির্মাণ করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজাতির বন্য প্রাণীদের নমুনা সংগ্রহ এবং ঘন অরণ্যের ভিতরে বসবাসকারী আদিবাসীদের সময়ে সময়ে সাহায্য করা। এাছাড়া শহর থেকে যেসকল প্রাণীবিদরা সরকারি উদ্যোগে রিসার্চের জন্য জঙ্গলে আসতো, তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল এসব ফরেস্ট অফিসগুলি।

কিন্তু ব্রাজিলের রেনফরেস্টে কাঠের তৈরি ফরেস্ট বাংলোর স্থায়িত্ব প্রত্যাশা করাই বোকামী, তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি সরকারের।

এখন এগুলির মধ্যে বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেকটা রয়েছে সেগুলোর এমনই জরাজীর্ণ অবস্থা।

আসলে বছরের প্রায় এগারো মাস বৃষ্টি হয়ে থাকে এই অমাজন অববাহিকা সংলগ্ন বিশাল রেনফরেস্টে

এই প্রতিকুল আবহাওয়ায় বিজ্ঞান অধুনিকতার একেবারেই বিপক্ষে। তবে এই জঙ্গল জীবজন্তু, পাখপাখালী, কীটপতঙ্গ সরীসৃপদের সর্গরাজ্য।

লক্ষাধিক বর্গকিলোমিটারে বিস্তৃত আমাজন রেইনফরেস্টের এই বিশেষ অঞ্চলে সাপের উপদ্রব প্রবল। তবে কেবলমাত্র এই জঙ্গলেই সাপের উপদ্রব হওয়ার একটি প্রধান কারণ রয়েছে।

এখানকার স্থানীয় জঙ্গলের অদিবাসী গ্রামের লোকেরা সাপকে দেবতা মানে। যদিও পৃথিবীর অনেক এমন জায়গা রয়েছে যেখানে সাপকে দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। তবে এখানকার জঙ্গলের আধিবাসীরা সাপেদের শুধুমাত্র পূজা করেই ক্ষান্ত হয় নি, এরা নাকি প্রত্যেক দিন নিজেদের একত্রিত খাবারের প্রায় তিরিশ শতাংশ সাপেদের উৎসর্গ করে। এহেন জায়গায় বিষাক্ত সাপেদের উৎপাত উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে সে কথা বলাই বাহুল্য।

আমাজনের বারসেলোস এর কাছে অবস্থিতজাও ন্যাশানাল পার্ক“-এর বিশিষ্ট প্রাণীবিদ হলেন মিঃ ফিলিপ রোজার। এক নতুন প্রজাতির প্রাণীর খবর পেয়ে তিনি এইতেফেঅভায় অরণ্যেতে ছুটে এসেছেন।

মিঃ রোজার কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে পর পর তিনটি ঘরের প্রথমটির কাছে এসে দাঁড়ালেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেনতেফেএর বনকর্তা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার স্টুয়ার্ট অর্টিন।

সহাস্যে অভিবাদন জানিয়ে তিনি রোজারকে ঘরে নিয়ে গেলেন।

আসুন আসুন, আপনারই অপেক্ষায় ছিলাম। আসতে অসুবিধা হয়নি তো??

না, ম্যাপ তো ছিলই। তাছাড়া ফোনে আপনি যে ভাবে ডিরেকশন দিয়ে দিলেন, তারপর আর কোনও অসুবিধে হওয়ার কারণ থাকতে পারে না।

স্টুয়ার্ট সাহেব তার কাজের টেবিলের অপরদিকে মিঃ রোজারকে বসতে বললেন।

– কি নেবেন বলুন? চা না কফি?

কফিই ঠিক আছে।

তিনি হাঁক দিয়ে বেয়ারা কে বলে দিলেন দুটি কফির জন্য।

মিঃ রোজার এবার গলা খাকড়িয়ে বললেন,

ব্যাপারটা শোনার পর থেকেই উদগ্রীব হয়ে আছি একবার সচক্ষে দেখার জন্য।

দেখবেন বই কি! সে জন্যই তো আপনাকে ডেকে পাঠানো। তবে একটা কথা আগে থেকে বলে রাখা ভাল; এই অদ্ভুত প্রাণীটিকে এই জঙ্গলের বাইরে নিয়ে যাওয়া চলবে না কোনোভাবেই।

আমিই চাই না, এখানকার আধিবাসীদের ধর্মের বিরুদ্ধে যেতে।

ধর্ম! কী ধর্ম??

স্টুয়ার্ট সাহেব এবার একটু মৃদু হেসে বললেন,

– এমন সব জঙ্গলের আধিবাসীরা নানান ধর্মীয় কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে তা জানেন নিশ্চিই।

হ্যাঁ, এসকল জঙ্গলে আধিবাসী গ্রামে ধর্মীয় কুসংস্কার থাকবে, তা আর নতুন কী।

তবে, এই অঞ্চলে ব্যপারটা একটু অন্য৷

তা কীরকম!

এরা সাপেদের পূজা করে শ্রদ্ধায় নয় ভয়ে।

মানে???

হ্যাঁ, সর্পদেবতা ইগের মারণ কোপ থেকে নিজেদের দূরে রাখার জন্যই এরা সাপেদের এমন ভাবে তোষণ করে চলে। এদের বিশ্বাস সাপেরা সর্পদেবী ইগের সন্তান স্বরূপ। কোনও সাপের কষ্ট বা অনিষ্ট হলে সর্পদেবীর অভিশাপ নেমে আসবে এদের গ্রামের উপর। এবং সেই অনিষ্টকারীর পাপের শাস্তি দেবেন স্বয়ং সর্পদেবী নিজেই পৃথিবীর এমন কোনও শক্তি নেই, যে তাকে এই পাপের শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে।

বোগাস। আপনিও এসব বিশ্বাস করেন নাকি!

বছর খানেক আগে হলে বলতাম, ‘না’। বিশ্বাস করি না। তবে এখন আর তা বলতে পারি না। সেই ঘটনার পর থেকে…

কী ঘটনা?

– তার আগে আপনি জানোয়ারটা একবার দেখে আসবেন চলুন। পরে অন্ধকার হয়ে গেল কিছুই স্পষ্ট দেখতে পারবেন না। এমনিতেই নীচের সেল গুলির মধ্যে সূর্যের আলো খুব অল্পই পৌঁছায়। আসুন আপনি আমার সাথে।

ঘরটির দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটি ছোট্ট বন্ধ দরজা ছিল, তা এতক্ষণ লক্ষ করেননি মিঃ রোজার। এখন স্টুয়ার্ট সাহেবের সাথে তিনি সেই দরজা দিয়েই ভিতরের একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকলেন৷ এই ঘরটির মাঝে একটি কাঠের ছোট্ট সিঁড়ি নীচের দিকের আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। তারা সেই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন।

এই অংশটা যেন একটু বেশিই অন্ধকার। কেমন একটা স্যাতসাঁতে ভাব চারিদিকে। ইটের দেওয়াল নোনা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। ভাঙা পাইপগুলি থেকে ইতিউতি জল টপে পড়ছে। উপরের দেওয়ালের বিভিন্ন কোণে চামচিকি বাদুড়ের বাঁসা। কেমন যেন একটা আশঁটে গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে।

স্টুয়ার্ট সাহেব হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

বাড়ির এই নীচের অংশটাই কেবল ইটসিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল একসময় ছোট ছোট সেলগুলিতে লোহার দরজা বসিয়ে খুপরি মতো বানানো হয় জানোয়ারদের নমুনা রাখার জন্য। এখন এগুলির অবস্থা দেখতেই পাচ্ছেন দেওয়াল ছাদ ফুড়ে বৃষ্টির জল ঢুকে সব নষ্ট করে দিয়েছে তবে এখনও কিছু সেল বেশ মজবুত আছে।

দৈর্ঘ্যে প্রায় ফুট এবং প্রস্থে চার ফুট লোহার দরজা লাগানো খুপরিগুলি সারি সারি ভাবে পর পর রয়েছে নীচের সরু প্যাসেজ এর দু ধারে তবে বাইরে থেকে ভিতরের কিছু দেখার উপায় নেই। কারণ লোহার দরজা দিয়ে সেগুলো বন্ধ করা। প্রত্যেকটি দরজার মাঝখানে তিন চার ইঞ্চির মতো ছোট কোটর রয়েছে। সম্ভবত এই কোটর দিয়েই ভিতরের প্রানীর গতিবিধির উপর নজর রাখা হত।

স্টুয়ার্ট সাহেব একটি সেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই অংশে আঁশটে গন্ধটা প্রকট ভাবে বোঝা যায়। মিঃ রোজারের গা টা একবার গুলিয়ে উঠলো।

মিঃ রোজার নাকে রুমাল চেপে প্রশ্ন করলেন,

– এমন গন্ধ কিসের??

স্টুয়ার্ট সাহেব কোনও উত্তর দিলেন না।এক মৃদু রহস্যের হাসি তার চোখে মুখে খেলে গেল। তিনি পকেট থেকে একটি ছোট্ট চাবি বের করে সেলের মাঝের ছোট্ট লোহার কোটরটা খুলে দিলেন।

এর মধ্যে দিয়ে দেখুন, কিছু দেখতে পারেন কী না! সাবধান! খুব কাছে চোখ নিয়ে যাবেন না।

মিঃ রোজার, অতি সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে সেই ছোট ফাঁকটিতে চোখ রাখলেন।

সেই আঁশটে গন্ধটা এই সেলের মধ্যে থেকেই আসছে, তা আর বুঝতে বাকি রইলো না রোজারের। এখন চরম ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সেই গন্ধ।

একটা মৃদু শিসের শব্দ আসছে ভিতর থেকে। অনেকটা সাপের শিসের মতো।

কোনও ক্রমে নাক চেপে তিনি ভিতরের প্রাণীটিকে দেখার চেষ্টা করলেন। সেলের ভিতরে জায়গা খুব বেশি নয়। প্রায় হাঁটু সমান জলে ভরে রয়েছে সেলের মধ্যে। তারই এক কোণে উঁচু একটি পাথরের বেদি করা রয়েছে।

অন্ধকারের মধ্যে একটু ভাল করে দেখতে হয়, একটা মানুষের অবয়বের মতো কিছু যেন পড়ে রয়েছে সেই বেদির উপর। অবয়বটা একবার নড়ে চড়ে উঠলো যেন। মৃদু শিসের শব্দটা এবার একটু জোড়ালো হয়েছে। মিঃ রোজারের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেছে তা তিনি আঁচ করতে পারছেন। এবার তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন জানোয়ারটাকে। দূর থেকে দেখলে প্রথমে মানুষ ভেবে ভুল করতে হয়। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, কোমরের উপরিভাগ মানুষের মতো হলেও কোমরের নীচে পা নেই। তার জায়গায় এক মস্ত বড় আঁশযুক্ত লেজ রয়েছে। যা হিলহিলিয়ে জলের উপর মৃদু তরঙ্গ সৃষ্টি করছে জানোয়ারটা।

আপাদমস্তক বড় বড় সবুজ চকচকে আঁশে ডাকা। দেহের দুপাশ থেকে সরু লিকলিকে দুটি নখবিশিষ্ট হাত বেরিয়ে এসেছে। গলার উপরের অংশে মানুষের মতো মুখ থাকলেও, সেই মুখের গড়নের অদ্ভুত বিশেষত্য রয়েছে। কান দুটিও অস্বাভাবিকরকম বড়। কেশবিহীন মাথা পুরু মোটা আঁশে ঢাকা। মুখের গড়ন অনেকটা মানুষের মতো তবে সামনের দিকটায় নাক ঠোঁট ছুঁচালো হয়ে এসেছে। সেই ছুঁচালো ঠোঁটের ভিতর থেকে ঘন ঘন বেরিয়ে আসছে সাপের মতো লাল চেরা জিভটা। সবুজ মার্বেলের মতো দুটি চোখ দপ দপ করে জ্বলছে। সেই চোখ দুটি যেন অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মিঃ রোজারেরই দিকে।

ভয়ে বিস্ময়ে একটা অস্ফুট আওয়াজ তাঁর মুখ থেকে বেড়িয়ে এলো।

বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারলেন না মিঃ রোজার। তার বুকের ভিতর যেন একশোটা দামামা এক সাথে বাজতে লেগেছে। সারা শরীরের রক্ত জমে স্থির হয়ে গেছে একেবারে।

– এ,,,এটা!! কী!!!!!!!!!!

এক অদ্ভুত স্বরে কথাটা বেরিয়ে এলো মিঃ রোজারের মুখ থেকে।

ইগের অভিশাপ!!!

___________________________________

স্টুয়ার্ট সাহেব হাতের ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে বললেন,

শুনতে চান… আপনার ফিরতে দেরি হয়ে যাবে না তো! আবার অন্ধকার হলে তো..

না না! আমার কোনও অসুবিধা নেই। আপনি বলুন। আমি শুনতে চাই সবটুকু। ব্যস্ত ভাবে বললেন রোজার।

সদ্য আনা গরম কফিতে চুমুক দিয়ে স্টুয়ার্ট শুরু করলেন

বছর খানেক আগে কিছু জীব বিদ্যার ছাত্ররা এসেছিল এই তেফের জঙ্গলে একটি অভিযানে। আমাজনের জঙ্গল এসব ছাত্রছাত্রীদের কাছে স্বর্গ রাজ্যের সমান তা আর বলে দিতে হয় না। এই দূর্গম অরণ্যে তাদের অভিযানের সঙ্গী ছিল স্থানীয় ব্রাজিল অধিবাসী কুনু।

কোনও কারণে কুনুর সাথে স্টার্লিং আর জনের পরিচয় হয়। কুনুর মুখে আমাজন অববাহিকার অরন্যের বর্ণনা শুনে, এক অদম্য কৌতুহল পেয়ে বসে তাদের মনে। জন লিসা সদ্য পড়া শেষ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে৷ সেক্ষেত্রে এহেন অভিযান তাদের কাছে একটা বাড়তি পাওনা ছিল। তারা ঠিক করে চারজনে মিলে একটি অভিজান করবে আমাজন রেনফরেস্টের গহীন অরণ্যে।

পরিকল্পনা মতোই মানোউখ পর্যন্ত সিপ্লেনে এসে, সেখান থেকেই আদিম কানুউ বেয়ে ওরা এসে ওঠে কালেম্বেতে।এবং ঠিক করে এখানের থেকেই গভীর জঙ্গলের পথে যাত্রা শুরু করবে।

দিনে ঘুরে জঙ্গলে নানান কীট পতঙ্গ, নতুন প্রজাতীর উদ্ভিদ সংগ্রহ করে এবং জঙ্গলের আদিবাসী গ্রামের লোকেদের ছবি তুলে বেড়ায় তারা। আর সুর্য অস্ত গেলে নদীর ধারের সমতল জায়গা দেখে ক্যাম্প ফেলে। এই ভাবেই ঘুরে ঘুরে তারা এসে পড়ে তেফের জঙ্গলের উত্তরপূর্বের একটি গ্রামে।

প্রতি বছরের মতো সেই দিনটিতে ইগদেবীর উৎসবে মত্ত হয়ে ছিল গ্রামবাসীরা। এখানে এসে তারা দেখে এক অদ্ভুত অর্ধ মানুষ অর্ধ সরীসৃপ বিশিষ্ট মূর্তি কে ঘিরে নানান ভাবে নাচ গান করছে গ্রামের মেয়েরা। ছেলেরা এক বিশেষ জায়গায় ছাগল, বন মুরগী, কুমিরের মাংস একত্রিত করছে ইগদেবীকে ভেট দেওয়ার জন্য। দেহে অসংখ্য উল্কি আঁকা এক বৃদ্ধ কীসব গাছ গাছড়া নিয়ে মূর্তির সামনে অদ্ভুত এক বিচিত্র মুদ্রায় কী যেন করছে।

ব্যাপারটা ভারী অদ্ভুত লাগে তাদের। তাঁদের মধ্যে কুনু স্থানীয় ভাষা জানত। সেই দোভাষী হয়ে গ্রামবাসিদের সাথে তাদের কথা বলায়। এবং ইগ দেবীকে ঘিরে গ্রামবাসীদের সমস্ত ব্যাপারটা জানায় তাদের। জন স্টার্লিংএর মনে সকল গ্রামের উপকথাগুলি নিয়ে যথেষ্ট সংকোচ থাকলেও, লিসা ছিল ডাকাবুকো আধুনিক মেয়ে। যার জন্ম লন্ডনের মতো অত্যাধুনিক শহরে। যেখান থেকে এই আমাজনের এমন জঙ্গলের আদিবাসী গ্রামের ধর্মীয় সংস্কারের কথা কল্পনা করতে গেলে বেশ কয়েক প্রজন্ম পিছিয়ে আসতে হয়। সে কী করে এমন কুসংস্কার বিশ্বাস করবে! তার ধারণা এই রেন ফরেস্টে সরীসৃপের উপদ্রব হবে তাতে আর নতুন কী। তার জন্য কষ্টে করে নিজেদের একত্রিত খাবার এভাবে নষ্ট করার কোনও মানেই হয় না।

সে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে গ্রামের বয়ঃজ্যেষ্ঠদের কিন্তু তাতে কোনও ফল হয় না। গ্রামবাসীদের মতে এই জঙ্গলের একএকটি সাপ দেবতা স্বরূপ। এই জঙ্গলের সাপেরা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তাদের মৃত্যু নেই। এখানকার বিষাক্ত সাপেরা সর্পদেবী ইগের সন্তান; তার আশীর্বাদে এই জঙ্গলের সব সাপ অমরত্ব লাভ করেছে।

সাপ সম্পর্কে এমন হাস্যকর ব্যাখ্যা শুনে ভারী আশ্চর্য হয় লিসা। সে তাদের বলে,

আমি আমার এই বন্দুক দিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারি তোমাদের কথা শুধুমাত্র গুজব ছাড়া আর কিছু নয়।

এই কথাটা কোনও ভাবে যায় সেই অদ্ভুত উল্কি আঁকা দেহবিশিষ্ট বৃদ্ধর কানে।

সে এসে তাদের বলে

এক বার চেষ্টা করে দেখতে পারো। তোমাদের মতো তুচ্ছ শহুরে ছোকরাদের ক্ষমতা নেই এই জঙ্গল থেকে একটিও সাপের ক্ষতি করার। একটি সাপ গেলে দেবীর কৃপায় আরও চারটি সাপ ফিরে আসবে।

এমনিতেই সাপেদের উপর এক আলাদা বিদ্বেষ ছিল লিসার। ছেলে বেলায় মাঠে খেলতে গিয়ে ছোট্ট একটি সাপের কামড়ে প্রায় বেশ কিছুদিন হাসপাতালে ভুগতে হয়েছিল তাকে। সেই ছেলেবেলা থেকেই সাপের প্রতি একটা আলাদা মনোভাব গড়ে উঠেছিল তার মনে। ফলে সে কিছুতেই এই প্রাণীটিকে সহ্য করতে পারতো না। সাপ দেখলেই রাগ ঘৃণায় তার সারা শরীর জ্বলে উঠতো। তার উপর এই সরীসৃপ নিয়েই এমন গুজব কুসংস্কার দেখেশুনে রাগে ফুসতে ফুসতে গ্রাম থেকে বেরিয়ে এলো সে। স্টার্লিং, জন কুনুও নিলো তার পিছু।

জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা পথ গিয়েই তাদের কানে এলো এক মৃদু রিনরিনে শব্দ। শব্দটা জঙ্গলের পোকামাকড়ের আওয়াজ ছাপিয়ে স্পষ্ট তাদের কানে আসছে।

এমন আকস্মিক শব্দে তারা তিনজন সাময়িক বিচলিত হয়ে পড়লেও অভিজ্ঞ কুনুর বুঝতে বাকি রইলো না, শব্দের কারণ।

শব্দ বিষাক্ত ব্রাজিলিয়ান র‍্যাটেল স্নেকের সে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে সাবধান করে দিচ্ছে আমাদের।, বলল কুনু।

তারা অতি সন্তর্পণে খুঁজতে লাগলো শব্দের উৎস। জনের ইচ্ছে ছিল কাছ থেকে র‍্যাটেল স্নেকের একটি ছবি তোলার। কিন্তু এদিকে লিসা গোপনে এক গভীর পৈশাচিক মতলব এঁটে ফেলেছে তা, তারা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারে নি।

কিছুক্ষণ খোঁজার পর এক পাইন গাছের নীচের বিশাল গর্তের সামনে বসে থাকা সাপটাকে তারা দেখতে পায় গর্তের মধ্যে সদ্য পাড়া নরম ডিম গুলোর মৃদু স্পন্দন বোঝা যাচ্ছিল তখনও। জন একটু কাছে গিয়ে ক্যামেরা তাগ করার সাথে সাথেই এক বিকট শব্দে সারা অরণ্য কেঁপে উঠে।

লিসা তার বন্দুকের একটা গুলিতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয় সাপের মাথাটা। এবং এক পৈশাচিক হিংস্রতায় ডিম গুলির উপর শক্ত পাথর ফেলে সেগুলিও থেঁতলে মিশিয়ে দেয় মাটির সাথে।

তার এহেন আচরণে যুগপৎ ভয়ে বিস্ময়ে কঠিন হয়ে পড়ে তারা তিনজনই।

কুনু কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠে,

কী করলেন আপনি??

লিসা নিরুদ্বিগ্ন ভাবে উত্তর দেয়,

– যা করা উচিত ছিল তাই করেছি।

এটা আপনি ঠিক করেননি ম্যাডাম। পাপের শাস্তি আমাদের সকলকেই পেতে হবে।

স্টারলিং কুনুর কথায় সায় দিয়ে বলে,

না লিসা, এটা করা তোমার উচিত হয় নি।

জনও, একই মত প্রকাশ করে,

এটা একেবারে বোকার মতো কাজ করলে তুমি। সাপ টা তোমার কী কোনও ক্ষতি করেছিল?

হ্যাঁ ক্ষতি করছিল। এই সাপ গুলোর জন্যেই আদিবাসী গ্রামের লোকেরা আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছে। এদের জন্যই তারা এভাবে ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে – উগ্রভাবে জবাব দেয় লিসা।

স্টার্লিং বলে,

গ্রামবাসীরা যদি এই মরা সাপ টা দেখে??

আমিও চাই তারা দেখুক। এই মৃত সাপ দেখেই তাদের অন্ধবিশ্বাস দূর হবে। তারা বলেছিল না, এই জঙ্গলের সাপের মৃত্যু নেই। এবার এসে দেখে যাক তাদের দেবতার সন্তানের কী অবস্থা।কৌতুকের সুরে বলল লিসা।

তখনও কুনু সাপটির দিকে চেয়ে ভয়ে কাঁপছে, আর বিড়বিড় করে স্থানীয় ভাষায় কীসব বলে যাচ্ছে।

স্টার্লিং তাকে স্বাভাবিক করার জন্য বলে,

কুনু ভয় পেয়ো না। কিচ্ছু হবে না আমরা তো আছি।

কুনু একইভাবেই বিড় বিড় করে বলে,

ইগের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাবো না। ইগের অভিশাপ নেমে আসবে আমাদের উপর।

জনও কুনুকে আশস্ত করে বলে,

কিচ্ছু হবে না কুনু। তুমি মিথ্যা এতো দুঃশ্চিন্তা করছো। দেখ! গ্রামবাসীরা বলেছিল এই জঙ্গলের সাপের মৃত্যু নেই। তুমিই দেখ! গ্রামবাসীদের কথা ভুল প্রমানিত হল তো। এসবই আদিবাসীদের কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই না।

লিসা এবার শান্ত ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো

কুসংস্কার বড়ই সংক্রামিত রোগ কুনু। নরম মস্তিষ্ক পেলেই ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তুমি যত বেশি এসব নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করবে, তত দৃঢ় ভাবে চেপে বশবে এই কুসংস্কার তোমার মনের মধ্যে। এসব বর্বর আদিবাসীদের গুজব ছাড়া আর কিছুই না।

তারপর তারা সেখান থেকে ক্যাম্পে ফিরে আসে। দুটি তাঁবুর মধ্যে একটি স্টার্লিং আর কুনুর আর অপরটি লিসা জনের থাকার ব্যবস্থা হয়।

সেই দিন ক্যাম্পে ফিরে তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়ে যে যার তাঁবুতে গিয়ে।

সকালে উঠে তারা দেখে, তাঁবুতে কুনু নেই।

স্টার্লিং জানায়,গভীর রাত পর্যন্ত কুনু জেগে ছিল। কী সব ভুলভাল বকছিল মাঝে মাঝে বার বার বলছিল,

আমাদের তাঁবুর চারিদিকে ইগদেবী ঘোরা ফেরা করছে। সে এসেছে তার সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। সে নাকি তার শিসের আওয়াজ শুনতে পারছিল।

আমাকেও বার কয়েক জিজ্ঞাসা করলো, সে শব্দ আমিও শুনতে পারছি কি না!  শেষে ধমক দেওয়ার পর সে একপ্রকার শান্ত হয়।

এরপর সে প্রায় কান চেপে বিছানায় কোনও প্রকার শুয়ে থাকে; তারপর স্টার্লিংও ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়।  ভোরে উঠে সে দেখে কুনু তার বিছানায় নেই।

আশে পাশে অনেক খুঁজে তারা কুনুর কোনও সন্ধান পায় না।

তারা অনুমান করে, কুনু ভয়ে তাদের ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারা তাদের যাত্রা আবার শুরু করে। এবার তারা জঙ্গলের দক্ষিণ পশ্চিম দিকের পথ ধরে। যে পথ থেকে গেলে জঙ্গলের শেষে আমাদের এই ফরেস্ট অফিস পড়ে।

পথ ধরে এলে আদিবাসী গ্রামটি তাদের ফেলে আসতে হয়।

গ্রামের শেষ প্রান্তে এক বিশাল বেদী তৈরি করে সেখানেই ইগ দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছে গ্রাম বাসীরা। দিনের উজ্জ্বল আলোতে দেবীর ভয়ংকর মূর্তির রূপ দেখে তাদের বুক কেঁপে ওঠে। গত দিনে যে মলিন কঠিন মুখ তারা দেখেছিল, আজ যেন অদ্ভুত মন্ত্রবলে সে মুখে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

এক ক্রুর হাসি লেগে আছে ছুঁচালো ঠোটের ফাঁকে। হিংস্র পাশবিক দানবের মতো দেখচ্ছে সে মূর্তিটিকে এখন।

মূর্তির পায়ের কাছে বেদির উপর একটা সরীসৃপ জাতীয় কিছু প্রথম চোখে পড়ে জনের।  তবে অনেকটা সাপের মতো দেখতে হলেও সাপের চেহারার সাথে এই সরীসৃপের চেহারার বিস্তর তফাৎ রয়েছে।

দেহের দুদিকের বিশেষ অংশ থেকে দুটি হাতের মতো বেরিয়ে এসেছে যেন। মুখেও একটা বিশেষত্য লক্ষ্য করা যায় মুখ যেন সাপের থেকে ভিন্ন। এই জঙ্গলে কয়েকশো নতুন প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে তা তারা আগেই জানতো, এটিও তেমন কোনও অজানা নতুন প্রজাতির সরীসৃপ। তাই প্রাণীটি কে নিয়ে বিশেষ বিচলিত না হয়ে তারা সে জায়গা ছেড়ে চলে আসে।

সেদিন জন তার ক্যামেরায় সেই অদ্ভুত সরীসৃপটির কিছু ছবি তুলে রেখেছিল।

দাঁড়ান দেখাচ্ছি,

বলে স্টুয়ার্ট সাহেব উঠে পিছনে রাখা আলমারি থেকে একটি ফাইল বের করে আনলেন। এবং সেটি খুলে কিছু ফোটোগ্রাফ রোজারের সামনে এগিয়ে দিলেন।

ছবি গুলো ভালো করে দেখে নিলেন একবার মিঃ রোজার। ছবির সাথে নীচের সেলে রাখা প্রাণীটির একটা বিশেষ মিল রয়েছে। তবে চেহারায় এই প্রাণীটি সেলের জানোয়ারের তুলনায় অনেক ছোট।

সেলের দেখা অদ্ভুত প্রাণীটির ক্ষুদ্র সংস্করণ বললে ভুল হবে না।

এই ছবি গুলো আপনি পেলেন কোথায়??

ছবিগুলো উলটে পালটে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলো রোজার।

লিসার কাছ থেকে। আর এই কথা গুলো জানতে পারি লিজার শেষ স্টেটমেন্ট শুনে। যা সে মানোউখ হসপিটালে থাকাকালীন বলেছিল।

***

দ্বিতীয় শেষ পর্ব

সারা দিন জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে সেই দিন রাতেই তারা এসে ওঠে আমাদের এই অফিসে। তেফের জঙ্গলের দক্ষিনপশ্চিমে একটি সরকারি ফরেস্ট অফিস আছে তা তারা আগে থেকেই জানতো। খুব সম্ভবত সেই জন্যই তারা তেফের জঙ্গলের পথ ধরেছিল।

আমি তখন শহরে গিয়েছিলাম একটি বিশেষ কাজে। অফিসের দ্বায়িত্বে ছিল মেম্বে। সে তাদের দুটি ঘর খুলে দেয় থাকার জন্য। একটিতে থাকে স্টার্লিং এবং অপরটিতে লিসা জন।

মেম্বে স্থানীয় জঙ্গলের গ্রামের আদিবাসী। প্রত্যেকদিন বিকেলের দিকে সে তার গ্রামে ফিরে যায়, আবার রাত হলে অফিসে চলে আসে। ছেলেটি বেজায় সাহসী। যম কেও ভয় পায় না। তার একটি হাউন্ট ছিল, রেক্স নামে। আমিই এনে দি শহর থেকে। এমন জায়গায় একটা বিশ্বস্ত পোষা হাউন্ট থাকলে ভীষণ উপকার হয়। আগে সে শুধুমাত্র রেক্সকে নিয়েই গ্রামে যেত। আমিই তাকে সাথে করে একটা বন্দুকও নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিই। আসলে এই বিশাল জঙ্গলে অজস্র নানাবিধ হিংস্র প্রাণী রয়েছে। কখন কী জঙ্গলে থেকে বেরিয়ে পথের সামনে এসে দাঁড়াবে তার কোনও ঠিক নেই। একা রেক্সের পক্ষে সেই জানোয়ারকে কাবু করা নাও যেতে পারে। তখন বন্দুক কাজে লাগবে।

মেম্বে এখানকার আদিবাসী গ্রামের একজন হলে কী হবে; গ্রামের গুজবে মন ভাসিয়ে দেওয়ার মতো ছেলে সে নয়। গ্রামের ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে সে দূরেই থাকে।

সেদিন প্রতিদিনের মতোই বিকেলবেলায় গ্রামে চলে যায় মেম্বে, অফিসে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায় তার।

ফরেস্ট অফিসের কাছে আসতেই চাঁদের আলোয় সিঁড়ির উপর একটি আবছা অবয়ব তার চোখে পড়ে। ভাল করে দেখার উপক্রম করার আগেই, রেক্স গর্জাতে গর্জাতে ছুটে যায় সেই জানোয়ারটির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে জানোয়ারটি বিদ্যুৎ বেগে জঙ্গলে ঢুকে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

পরদিন সকালে উঠে মেম্বে খবর পায় স্টার্লিং তার ঘরে নেই। এমন আকস্মিক জলজ্যান্ত একটা মানুষের অন্তর্ধান হওয়া বড়ই আশ্চর্যের বিষয় তারে আশে পাশে জঙ্গলে অনেক খোঁজা খুঁজি করে।

শেষে মেম্বে জন জঙ্গলের শেষের সরু নদী পর্যন্ত গিয়েও কোনও খোঁজ পায় না তার।

এবার সত্যি লিসা জনের মনে হতে থাকে এই সব কিছুর কারণ আর কেউ নয়, এই আদিবাসী গ্রামের সর্পদেবী ছাড়া। গভীর অপরাধবোধে একেবারেই ভেঙে পড়ে লিসা। তার সাথে সাথেই এক অজানা ভয় আতঙ্ক ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে তাকে। তাই জন ঠিক করে তাদের অভিযান এখানেই শেষ করবে এবং পরের দিন ভোর থাকতে থাকতেই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।

গভীর রাতে একবিকট আর্তচিৎকারে শুনে ঘুম ভেঙে যায় মেম্বের। চিৎকারটা এসেছে পাশের ঘর থেকে; যে ঘরে জন লিসা রয়েছে। কোনও বিপদের আশঙ্কা করে লন্ঠন হাতে তাড়াতাড়ি সেই ঘরের দিকে ছুটে যায় সে। এই জঙ্গল সাপেদের অবাধ চারণভূমি। জানালা বা দরজার কোনও ফাঁক থেকে ছোট বড় কোনও সরীসৃপ ঢুকে আসা বিচিত্র নয়।

কিন্তু বাইরে বেরিয়ে এসে একটু অদ্ভুত লাগে তার।

– রেক্সে কোনও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না কেন! সে তো রাত্রে বারান্দাতেই ছাড়া থাকে।

মেম্বে বার কয়েক রেক্সের নাম ধরে হাঁক দেয়।৷ কিন্তু তাতে কোনও ফল হয় না। পাশের ঘর থেকে তখনও পরিত্রাহি চিৎকার ভেসে আসছে।

প্যাসাজে এসে, যা দেখে তাতে মেম্বের মতো ছেলেও পাথর হয়ে যায়। সে দেখে প্যাসেজের এক ধারে রেক্সের নিথর রক্তাক্ত দেহ খানা পড়ে রয়েছে। গলার কাছের বেশ কিছুটা মাংস যেন কেউ ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেছে। তার একটু তফাতে দুটি অদ্ভুত জানোয়ার লিসা জনের ঘরের বন্ধ থাকা দরজার উপর নখ দিয়ে পাশবিক ক্ষিপ্রতায় আঁচড় কেটে চলেছে।

জানোয়ারটি দেখতে ছিল এই ছবির প্রাণীটিরই মতো। তবে চেহারায় নাকি ছবির জানোয়ারের থেকে অনেক বড়।

– ছবিটির দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন স্টুয়ার্ট।

তারপর আবার শুরু করলেন,

মেম্বে আর সময় নষ্ট না করে হাতের লণ্ঠন রেখে ছোটে বন্দুকটা আনতে। বন্দুক নিয়ে এসে দেখে জানোয়ার দুটি পলাতক। সেখানে আর কিছুই নেই। তবে বন্ধ থাকা কাঠের দরজার উপর ধারালো নখের ক্ষতের দাগ তখনও তাজা। ভিতর থেকে আর্তচিৎকারের আওয়াজ তখন আর শোনা যাচ্ছে না। দরজা খোলার চেষ্টা করে কোনও ফল হয় না, দরজা ভিতর থেকেই বন্ধ করা ছিল৷

শেষে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সে দেখে লিসা ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রয়েছে।

তার চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে জ্ঞান ফেরায় সে।

তারপর জানতে চায় সমস্ত ঘটনাটা। অস্পষ্ট অগোছালো ভাবে যা বলেছিল, তার সংক্ষিপ্তসার হল এই,

গভীর রাতে কিছু অদ্ভুত শব্দ শুনে তার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখে পাশে জন নেই। ঘরের দরজা হাট করে খোলা রয়েছে। এক অদ্ভুত গর গর শব্দ এবং তার সাথে সাপের মতো হিস হিসে শব্দ প্যাসেজের দিক থেকে ভেসে আসছে।

ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সে, তারপর দেহের সকল শক্তি একত্রিত করে, একটু সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে যায় খোলা দরজার দিকে। সেখানে গিয়ে দেখে জন মাটির উপর উবু হয়ে বসে মুখ থেকে কেমন গর গর শব্দ করছে তার সারা শরীরে কোনও কাপর নেই। দেহের চামড়া যেন কেমন সবুজ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হাত গুলো সরু নখ বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে, যেন ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে তার দেহ।

আর তার সামনেই রেক্সের নিথর দেহের উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে শুঁকছে এক অর্ধ মানব অর্ধ সরীসৃপ জানোয়ার। গ্রামের উৎসবে দেখা সেই ইগদেবীর মূর্তির সাথে সেই জানোয়ারটির নাকি এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।

হঠাৎ জানোয়ারটি লিসার উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ তুলে দেখে লিসার দিকে। তার সেই হিংস্র পৈশাচিক মুখ দেখে ভয়ে আর্তনাদ করে সে ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়।

তারপরের ঘটনা তো আগেই বলেছি, বলে, দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে আরেকবার দেখে নিলেন স্টুয়ার্ট

পাশে রাখা জলের বোতলের বেশ খানিকটা জল মুখে ঢেলে, রোজার প্রশ্ন করলেন,

তারপর? তারপর লিসার কী হল??

আবার শুরু করলেন স্টুয়ার্ট,

আমি পরের দিন ভোরেই পৌঁছাই ফরেস্ট অফিসে। এখানে এসে সমস্ত ঘটনার বিবরণ শুনি মেম্বের কাছ থেকে। আমার বিশ্বাস মেম্বের বিবরণের এক বিন্দুও অতিরঞ্জিত নয়।

তারপর আমি লিসার সাথে গিয়ে দেখা করি। তাকে দেখে বেশ বোঝা যায় গত দিনের দূর্ঘটনার প্রভাব তার উপর থেকে তখনও যায় নি। লিসা তখনও ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে।  মাঝে মাঝে মুখ থেকে অদ্ভুত আওয়াজ বের করছে, চিৎকার করে কেঁদে উঠছে।

বির বির করে কী সব অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে চলেছে,

সব কিছুর জন্য আমি দায়ী। এ সব কিছুর জন্য আমি দায়ী।

কুনুর মৃত্যু, স্টার্লিং এর মৃত্যু, জনের মৃত্যু, সব, সব মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী। আমি পাপী, আমারও উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে।।

একটা গেছে চারটে ফিরে আসবেইগের সন্তানদের মৃত্যু নেই।

বেগতিক বুঝে, আর বেশি সময় নষ্ট না করে আমি তাকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করি মানোউখের একটি সরকারি হাসপাতালে।

সেখানে থাকার সময় কিছু স্টেটমেন্ট নেওয়া হয় তার কাছ থেকে। সে সব শুনে জানা যায় ঠিক কী ঘটেছিল তাদের সাথে।

পরে অবশ্য লিসাকে সাধারণ অবস্থাতে ফিরিয়ে আনা যায় নি। মাস খানেক পর তাকে প্রায় চেনাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। অসম্ভব পরিবর্তন চলে এসেছিল তার শরীরে। যেন এক মাসেই প্রায় কুড়ি বছর বয়স বেড়ে গেছিল তার। দেহের চামড়া কুঁকড়ে গিয়ে, কেমন ফ্যাকাশে রক্তহীন হয়ে পড়েছিল। তারপর আসতে আসতে, শরীর সবুজ হতে থাকে। চোখ দুটিও সবুজ মার্বেলের মতো হয়ে ওঠে। পরে চোখের সব পাতা খসে পড়ে। সমস্ত দাঁত ভেঙে গিয়ে তার জায়গায় বেরিয়ে আসে দুটি সাপের মতো ধারালো লম্বা দাঁত।

এভাবেই সময়ের সাথে সাথে তার শরীরের এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে যে,

তাকে দেখলে আর যাই বলা যাক, মানুষ বলা চলে না।

এই পর্যন্ত বলে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যায় ফরেস্ট অফিসার স্টুয়ার্ট অর্টিন।

মিঃ রোজার বেশ বুঝতে পারছেন, তার ভয়ে, বিস্ময়ে সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। তিনি রুমাল দিয়ে কপালের লবণাক্ত তরল বিন্দুগুলি ভালো করে মুছে নিলেন। তার পর প্রশ্ন করলেন,

তার মানে নীচের সেলে যেই জানোয়ারটি রয়েছে, সেটা কী লিসারই পরিবর্তিত রূপ???

না, মিঃ রোজার।গম্ভীর ভাবে উত্তর দিলেন স্টুয়ার্ট।

তবে!!

লিসা বেশি দিন বাঁচেনি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাস পর তাঁর মৃত্যু হয়।

তবে নীচের জানোয়ারটা???

নীচের জানোয়ারটি লিসার গর্ভে থাকা সন্তান। যাকে প্রসব করার পর সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।

জানোয়ারটি হল ইগের অভিশাপ গুলির মধ্যে একটা।

আদিবাসী গ্রামের সেই বৃদ্বের শেষ কথাটা মনে আছে?

রোজার একটু ভেবে বলে,

– “একটি গেলে চারটি আসবে।।। তার মানে, আর বেশি ভাবার দরকার হল না। জলের মতো পরিস্কার হয়ে গেল সব কিছু।

চার জনের মধ্যে…

এক, স্থানীয় আধিবাসী কুনু,

দুই, স্টার্লিং,

তিন, জন, আর চার হল লিসার সন্তান।

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ সুদীপ্ত নস্কর

প্রচ্ছদ ~ stockphotography

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply