লেডি ডায়না এদিকে আয়না

Childhood, Conversation, Friends, Humor, Love Story, Marriage, Nostalgia, Satire, Short Story, Story, আদতে আনাড়ি, বাংলা

লাঙরা ত্যাগী আর চামেলীও তো দিব্যি কাপল্।

ফারা খান আর শিরীষ কাঠ বেশ দৌড়াচ্ছে।

অর্জুনের বাবা আর সারার মা তো রাজজোটক।

প্রেম জমেছে, সেটল করেছে কার কী শুনি?

তবে নিক জোনাস আর প্রিয়াঙ্কা চোপড়া কে দেখে মনে হচ্ছে প্রাইমারি স্কুলে ম্যাডামকে ভালবেসে কেউ অন্যায় করিনি। বয়স ফয়স কিছু না প্রেমটাই আসল রে পাগলা।

সেই শ্যামলা গাঁয়ের ইংরেজি কনভেন্ট প্রাইমারি স্কুলের কাজলা কেরালিয়ান ম্যাডাম্। মা সরস্বতীকে অপ্সরা ৪বি দিয়ে কয়েক পোঁচ ঘষে দিলেই রেডী। ঐ হাঁস খানা আর দুটো এক্সট্রা হাত যা মিসিং। বাকিটা রুলাররঞ্জিত পুস্তকহস্তে। আপাদমস্তক গেরুয়া শাড়ি ব্লাউজ। গলায় যীশুর লকেটওয়ালা রূপার হার। গালে হাল্কা হয়ে মিলিয়ে যাওয়া ব্রণর দাগ, টান করে বাঁধা চুল আর দুচোখে শান্ত তালপুকুর, আর তায় বেড়ি দেওয়া কার্বন ফ্রেমের চশমা। গলা যেন আশালতা। হাসি যেন হ্যালোজেন।

এতেই ক্লাসের বাবুসোনা কাম বাপ মার নয়নমণির কানের কাছে ভায়োলিন, বুকেদূরদর্শনেরলহরী।

এছাড়া রয়েছে পেন্সিল বক্সে মাপ করে কাটা খবরের কাগজ। যেটা তুললেই স্কেচপেন দিয়ে লেখা – A A A A… পাশে আটকানো লাভ সাইন বা নিষিদ্ধ হার্ট স্টিকার। বোধহয় হিম্যান, স্কেলেটর, গাড়ি, বাইক, শচীন, কপিল, মারাদোনার স্টিকারের পাতার সাথেলুকিয়ে স্মাগল্ড হয়েছে। রেডিয়াম চাঁদতারা ও রয়েছে। পেন্সিলবক্সে লুকনো একঅতিক্ষুদ্র সিলাবস্টোরি। অমৃতা উইলিয়ামস্।

প্রথমদিন ম্যাডামের টেবিলে রেখে ছিলাম ঠাকুমার পুজোর জবাফুল। গোলাপের সিজন ছিল না। ক্লাসে ঢুকেই আওয়াজ এল – “হু কেপ্ট দিস?”

তারপর ৫৯ জোড়া চোখ আর  ৫৯ জোড়া আঙুল দেখিয়ে দিল বছর ছয়েকের এক লিলিপুট প্রেমিককে।

ডোন্ট ডু দিস এনিমোর

ওরে হ্যাপিডেজ আর রকফোর্ডের সংকর মন,

তুই কি করে বুঝবি শাসনের ওজন?

পরের দিন এল টগর, তারপরে একে একে এল বেল, জুঁই, গন্ধরাজ লেবু, বাতাবি লেবু, সজনে ডাঁটা।

ম্যাডাম ক্লাসে ঢোকার আগেই ডেস্ক ফুলপট্টী নয় জগুবাবু। ওয়ার্নিং আসছিল। ইংরাজি আর মালায়ালমে মিশ্রিত ওয়ার্নিং। কিন্তু প্রেম কি আর ওসব ওয়ার্নিংয়ের তোয়াক্কা করে রে পাগলা?

প্রেমসাগরে নদের চাঁদ,

তখন নাবিক সিন্দবাদ।

তারপর একদিন পেন্সিল বক্সের পেছনের লুক্কায়িত চিঠিটি বেরোল। স্কেচপেন দিয়ে লেখাআই লাবিউ। হায়রে গুগুলের লোগোর কালার কম্বিনেশন, তখন কেই বা অত অ্যাডভান্সড প্রেম বুঝত?

মাথা নীচু, কান লাল, টোটাল টেনশন চলছে। নেভার বিন দেয়ার, নাইদার ডান দ্যাট্।

আদর করে অমৃতা কি কাছে টানবে আমায়? ডার্ক রোজের পাঁপড়ির মতন ঠোঁট দিয়ে আমার গালে এঁকে দেবে প্রেম প্রতীকী? গরম নিঃশ্বাস নেমে আসবে গাল বেয়ে? মধুর কন্ঠে আমার প্রেমের ডার্ক সরস্বতী বলে উঠবেআই লাবিউ টু মাই লিটিল ব্রহ্মা। ঝকঝকে অথচ একটা লাজুক হাসি নেমে আসবে, দন্তরুচি কৌমুদী

এঁকেছিল সে প্রতীকি, একেবারে জনসমক্ষেই। হাইবেঞ্চে তুলে, আমার পাছার ক্যানভাসে, কাঠের রুলাররূপী তুলি দিয়ে। গরম চোখের জল নেমেছিল আনার গাল বেয়ে। সেই মধুর কন্ঠ কানে চেঁচিয়ে যা বলেছিল তার বাংলায় তর্জমা করলে যা দাঁড়ায় তা হলশোন হে বাচ্চারা, পড়াশুনো আর খেলার বাইরে কোনরকম বাঁদরামো আমার ক্লাসে করলে এরকম ডোজ পড়বে

আর করব না মিস, আই এ্যম সরি মিসবলে রেহাই পেলেও মন বেবাগী হয়ে গেল, মুখে হাসি নেই, টিভিতে কার্টুন নেই, গ্রীষ্মের ছুটিতে গুপী বাঘা নেই, সব যেন ধূসর হয়ে গেল। আর আলফাবেট শুরু হত B দিয়ে।

এরপর এল স্পোর্টস ইভেন্ট। রেসে নাম লিখিয়েছি। বাবা, মা, মাসি, পিসী, কাকা, কাকী সবার সব রিলেটিভ, পূর্বপুরুষ, সবাই জুটেছে মাঠে। কেউ মেয়ের ধুলো ঝাড়ছে, কেউ ছেলেকে ফলের রস গেলাচ্ছে। ইংরেজি স্কুলের স্পোর্টস ইভেন্ট মানেই ইনোভেশন। গুলি চামচ, বিস্কুট রেস, মিউজিক রান, চলছে নানা খেলা। গেম অন্, বিচ্।

কিন্তু লাস্টে এল মালা দৌড়। কার মাথা থেকে এই বিচিত্র আইডিয়া বেরিয়েছিল গুগুলও জানেনা। কিন্তু আমার মনে হয় সে ম্যাডাম বা ফাদার বাইবেলের পাশাপাশি দু এক কলি রামায়ণও

বড় বিচিত্র খেলা। হুইসল বাজলে ছেলেরা দৌড়ে গিয়ে লাইনের অপর প্রান্তের মেয়ের গলায় মালা দেবে। তারপর মেয়ে ছেলেকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে এপারে আনবে। আমার ইচ্ছে নেই এই স্পোর্টস ইভেন্টটায় নামার। কিন্তু শিশুর ইচ্ছা আর যীশুর ইচ্ছার সমাপতন হবে, তা তো গ্রান্টি নেই।

যার গলায় মালা দিতে চেয়েছিলাম সেইতো কেলিয়ে আমার ছবিতে মালা দেবার ব্যবস্হা করেছিল।

যাইহোক্ লাইনের এপারে আমাদের নাম বলা শেষ। এবার মেয়েরা একে একে আসছে। ফুটফুটে পামেলা, তুষারের পার্টনার। তুলোর বাক্স শতাব্দী, কৌস্তভের। এবার আমার পালা। আহা!!! লেগে যা জিনাৎ বা কস্তুরী বসু।

কিন্তু একী!!! লাইনের ওপারে দাঁড়িয়ে ক্লাসের সবচেয়ে দজ্জাল মেয়ে সম্প্রীতি নস্কর। নাম হওয়া উচিৎ ছিল অশান্তি স্টপকর্, তা না সম্প্রীতি নস্কর।

মেরে, খিমচে, কিলিয়ে, দাঁত খিচিয়ে সে মেয়ে একটা বয়কাট চুলওয়ালা লেজকাঁটা বাঁদর। তার অত্যাচারে গোটা ক্লাস তটস্হ। না রেস শেষ করলে আমার স্কুল জীবন শেষ। কিছুতেই দৌড়াবো না আমি। কিন্তু হুইসল বাজল। রেস শাঁসো কি

সবাই দৌড়াচ্ছে, আমি হাঁটছি। স্যার, ম্যাডামেরা রক্ত চক্ষু হয়ে আমায় দেখছে। আর ও ভয়ানক রেগে আছে কম্পিটিটিভ নস্কর।

ভীমের চোখে তখন,

আমি ঢ্যামনা দুঃশাসন।

একজন ম্যাডাম ছুটে এলেন আমার কাছে।

কীরে!!!!!  দৌড়াচ্ছিস না কেন?

পেটে খুব ব্যথা করছে ম্যাডাম। উফফ্, বাবাগো!!

ঢঙ না করে দৌড়াবি, না অমৃতা মিসকে ডাকব?

বয়স কম হলে কী, ব্যঙ্গ আমি ভালই বুঝতাম। অপমানে, ক্ষোভে আমি দৌড় শুরু করলাম।

এদিকে লেট করছি দেখে নস্কর রেগে আগুন, সাথে মনে হচ্ছে একটু কাঁদো কাঁদো ও। আর বেশী ডিলে না করে মালা পড়িয়ে দিলাম। নস্করের রাগী মুখ মিলিয়ে গিয়ে হাসি ফুঁটে উঠল। রাগ হচ্ছিল বটে কিন্তু নস্করের ফোকলা দাঁতের হাসি দেখে আমার ও হাসি পেল।

রেসে লাস্ট হলাম সেটা বড় কথা নয়, সাথে এক ভয়ানক বিপদ হল। শালার মালা পড়ানোর পর নস্কর আমায় করুণা আর ক্রাশ মিশ্রিত এক অদ্ভুত নজরে দেখতে লাগল। বেঞ্চে আমার জন্য জায়গা রাখা, এক্স্ট্রা টিফিন আনা। হা হতোস্মি! যে বেগতিক। অমৃতা মুনমুনের বদলে নস্কর টুনটুন কেস। এদিকে গোটা ক্লাসের ছেলেরা আমায় নস্করের স্বামী বলে খেপাতে শুরু করেছে। রাখবই না শালা জীবন। রিস্ক ছাড়া কেই বা বাজি জেতে?

একদিন বিশাল সাহস সঞ্চয় করে গেলাম সেই অমৃতা মিসের কাছে। বুকটা ছ্যাঁত্ করে উঠতেও কন্ট্রোল করলাম। পারলে ইনিই পারবেন।

সরস্বতী প্রশ্ন করলেন

ইয়েস! কি চাই?

ম্যাম্ আমি গার্লাণ্ড রেসে সম্প্রীতিকে মালা পড়িয়েছি বলে আমায় সবাই টিজ্ করছে, বলছে নস্করের হাজব্যাণ্ড। নস্করও আমায় খুব ইরিটেট করছে।

ওকে, তুমি যাও আমি দেখছি।

পরেরদিন ক্লাসে গেছি। ম্যাম বলছে

এভরিবডি স্ট্যাণ্ডআপ। ইউ সিট্।

দাঁড়িয়েও বসে পড়লাম।

আর যদি কোনদিন শুনেছি, ওকে কেউ বাজে কথা বলে টিজ করেছ, মনে আছে তো, ওকে কিরকম মেরেছিলাম?

হ্যাঁ ম্যাম্।

সবার সমবেত কন্ঠস্বর।

সবাই সরি বল ওকে।

সরি!

তারপর ম্যাম বললেন

এভরিওয়ান সীট্। ইউ স্ট্যাণ্ড।

গোটা ক্লাস বসে নস্কর দাঁড়িয়ে। তারপর কষে কানমলা দিয়ে নস্করের কানে কী একটা ফিসফিস করে বললেন। সে ব্যথা পেয়েও হাসতে লাগল, তারপর নিজের পুরনো সীটে ফিরে গেল।

ম্যাডামের এই আনবায়াস্ড স্টেপ নেওয়া দেখে আমি দিওয়ানা হয়ে গেলাম। ক্লাসের শেষে অমৃতা ম্যাডামের পিছন পিছন স্টাফরুমে ঢুকলাম।  

ম্যাডামকে বললামথ্যাঙ্কিউ ম্যাম্।

তারপর যেটা ঘটল, চোখ বুজলে এখনও অনুভব করি। ম্যাডাম কপালে একটা হামি খেয়ে বলেছিলেন

গুড বয়, এভাবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে

পরের মাসে স্কুল থেকে ম্যাডাম যখন বদলি হয়ে চলে গেলেন বিশ্বাস করুন তখন যদি মাল খেতে জানতাম একা দুটো সাড়ে সাতশ নামিয়ে দিতাম মাইরি। আজও আমিঅ ন্যায়ের প্রতিবাদ করে চলেছি। আমার সেই শাশ্বত প্রেম আমায় ভালো হয়ে থাকার রসদ জোগাচ্ছে।

আর নস্কর!!! আমায় দেখলেই ফোঁকলা দাঁত বের করে হাসত। কি জানি ম্যাডাম কী বলেছিলেন ওর কানে কানে। আমি আজও জানিনা, আপনারা জানলে জানাবেন তো

আজ চলি।

 

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখক ~ দেবপ্রিয় মুখার্জী (গুলগুলভাজা)

প্রচ্ছদচিত্রসৌমিক পাল

#Anariminds

#ThinkRoastEat

Leave a Reply