ছোট্ট একটা শহর মাত্র

Friends, Nostalgia, Short Story, বাংলা

আমার শহর কোথায় থাকে? শহর কেমন হয়!
মনের ভেতর ডাক দিলে, সেই শহর দুঃখ পায়?

সে শহরে ছিল না কিছুই। ছিল অনেক স্মৃতি। ছিল একটা ছোট্ট ছেলের দিদা আর তাঁর গল্প পেতে বসবার কোল।
ছোট ছেলের ইস্কুল শেষ হলে পর, মা চলে যেত স্কুলে। সারা দুপুর কেটে যেত, মামার কাঁধে চড়ে।
দিদা বলত, ‘খিদে পেয়েছে, একবাটি ডাল খেয়ে নে…’।
ছেলে বলত, ‘ডাল ভাল না, জলটা দিও শুধু’।
তখন সে হাফপ্যান্টে আর সে জুতোর ফিতে বাঁধতে শেখেনি তখনও।
সে শহরে ইতিহাস ছিল জেলার মধ্যে পাহাড়প্রমান, মল্লরাজাদের সৈনাবাস নগরী থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে সৈনিক যোগান দেওয়া, সেই শহরের নাম জানত আশেপাশের জেলার দশ’জনা।
বাবা আসত শনিবার করে, তাই সোমবার সকালে স্কুলের রিকশাকাকু ছেলেটিকে না পেয়ে ফিরে যেত বেল বাজিয়ে টুং টাং টুং। সে শহরে তখনও ভেঁপুর মত বেজে ওঠা প্যাঁ পোঁ হর্ন আসেনি।
সোমবার নার্সারি ছুটির পর সে ভাবতে বুঝি বাবার স্কুটার চড়ে বাড়ি ফিরব, কিন্তু বেরিয়ে এসে মা দাঁড়িয়ে রিকশায় তুলে দেবার জন্য।

সে শহরে দুর্গা হত পঞ্চাশখানা!

সেই অনেক দুর্গার ভিড়ে একটা ছিল তাদের দুর্গা। রথের দিন থেকে বিকেলখানা বন্ধক রাখত ছেলেটা বাড়ির দুর্গামন্দিরের লম্বা দাওয়ায়। শিবুমামা আসত খড়ের ওপর মাটি লেপতে। একমেটে… দু’মেটে… একরঙ… আসল রঙ। তারপর ছাঁচের মুখ এনে জুড়বে শিবুমামা। সেটা অবশ্যি রাত্রিবেলা। ছোটদের থাকা মানা। পরের দিন সকালে পেপারে মোড়া দুগ্গার মুখ। উঁকিঝুঁকি এদিক ওদিক, যদি একঝলক দেখা যায়! মহালয়ার দিন সুধাংশুদাদু আসতেন, চণ্ডীপাঠ গমগম করত সারা সকাল জুড়ে।
শহরের হুই প্রান্ত থেকে শিবুমামার বাবা আসছেন, ষষ্ঠীর দিন। টুলের ওপর দাঁড়িয়ে, কাঁপা কাঁপা হাতে দেবীর চক্ষুদান। ভেতরে বেজে উঠত শাঁখ, বাইরে তখন গ্রাম থেকে আসা তপনমামার দলবল, ঢাকে কাঠি দিয়ে কুড়ুর কুড়ুর বোল তুলেছেন।
বাবা এসে গেছে… নতুন নতুন জামা এসে গেছে…
পুজো শেষ হলেই ছোট্টটিকে ডেকে প্রসাদ খেতে দিতেন সুধাংশুদাদু! তারপর আবার তাকেই অঞ্জলিও দেওয়াতেন পাশে বসিয়ে। সে শহরে বোধহয় মা দুর্গা দোষ ধরতেন না বড়ো।
তখন সে বাড়িতে অবাক ভিড়, বাড়িতে হেঁইয়ো বড় কড়াইতে হচ্ছে নিরামিষ ছোলার ডাল, ভিয়েনে পাকছে দরবেশের চিনির রস।
হুট করে যেমন ঘুম ভেঙে ঠাহর হয় না সকাল নাকি বিকেল, তেমনি করে একদিন দশমী এসে যায়।
একতাড়া বেলপাতা নিয়ে ছেলেটা উৎসাহে সিন্দুরতেল দিয়ে লিখে চলেছে, জয় মা দুর্গা! সে শহর এক ভাবী নাস্তিকের বড় হয়ে ওঠার সাক্ষী তখন।

সেই শহরে দুগ্গা গেলে কালী, ‘মাইতো’ কালীর তিনশো বলি!
কার্তিকঠাকুর দোতলা সমান আর রাতভর মামার কাঁধে চড়ে দেখা ভাসান।

চৈত্রের গাজন নয় সে শহরের উৎসব ছিল ‘মোচ্ছব’। শহরমাঝে স্বর্ণময়ী মন্দির আর শহরজুড়ে বিভিন্ন আখড়ায় তিনদিন ধরে কীর্তন। এসে জুটত রকমারি সাধুর দল। নাঙ্গা সাধু, জটা সাধু, দাড়ি সাধু, ছাই সাধু, একতারা সাধু, মৌনী সাধু, ব্যোম ভোলে সাধুর ভিড়ে গমগম করত কটা দিন।

সে শহরে গরমকালের দুপুরে দিব্য হত লোডশেডিং। আর হাতপাখাতে ঘাম শুকিয়ে নিয়ে মা বসে যেত বেল ছাড়াতে। নিত্যিপুজোর বামুনঠাকুর ইন্দ্রদা আসত রঘুনাথকে সেই শরবত খাওয়াতে। আর ভোগের বাকিটা ছোট্ট ছেলের ইয়াব্বড়ো স্টিলের ঘটিতে।

সে শহরে রথের দিন সকালে মামার হাত ধরে দড়ি টানতে যাওয়া শিশুর বিকেলবেলা বাসের টিকিট কাটা ছিল। দিদার কোল থেকে মায়ের হাত ধরে বাসে উঠে পড়া ছিল আরেক জায়গায় যাবার জন্যে। যে শহরে বাবা মাথায় বৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষায় স্কুটারে হেলান দিয়ে।

তিনমাস পরেই ছেলেটা আবার এসেছিল সেই শহরে। বাবার হাত ধরে পাড়ার মধ্যে দিয়ে বাড়িতে ঢুকবার সময় তাঁতীদের বাড়ির ঝর্ণামাসি, পালেদের লিপিদিদি, সামনের লালদিদা চকাম করে একশখানা চুমু খেয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন, স্কুল আর বিছানা পাল্টে গেলেও, এই শহরটা এখনো তারই আছে।

হুটোপাটি করে এক দৌড়ে দুর্গামন্দিরে ঢুকেই, ‘যাঃ! চক্ষুদান হয়ে গেছে! আমি তো ছিলাম না, তবে কালির ডিবেটা কে ধরে দাঁড়াল?’

সেই শহরে সন্ধিপুজোয় কামান দাগার রীতি রেখে দিতে থানার দারোগবাবু করতেন ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার। সেইবার তো মাঝরাতে সন্ধিপুজো। পুজো পেরোলেই বিজয়া… নবমী দশমী একদিনে পড়েছে কিনা!
তা দো’নলার হুঙ্কার শুনে, চালকুমড়ো কেটে ফ্যালা হল ঘচাঘচ করে আর তারপরেই বেজে উঠল ঢাক, রুদ্রগম্ভীর লঘু ত্রিপদ চলন তখন তার। দুর্গামন্দিরের চাতাল থেকে একটা দল বেরিয়ে গেল, ‘খ্যান’ বলত যাকে। এমনি প্রতিটা দুর্গামন্দির, বারোয়ারীর উঠোন থেকে বেরিয়ে থানায় জড়ো হবে একটা একটা করে দল।
তারা বেরিয়ে যেতেই মন্ডপভর্তি ধুনোর ধোঁয়া, আরতি শুরু হয়েছে যে! আর তাই মাঝরাত অব্দি জেগে থাকা শ্রান্ত চোখ জ্বালা করা শুরু! ভিড় সরিয়ে যেই না বাইরে বেরিয়ে আসা, অমনি জেনারেটর বক্সের পিছনে আধশোয়া হয়ে লক্ষ্মণদা। দু’কড়ি শরৎ দেখে ফেলা লক্ষ্মণ সবার দাদা। মামা, বাবা, মা সব্বাই দাদা বলে তাকে! লক্ষ্মণদাদা বিজয়ার দিন ভাসানের লোক আনবে। নিজে কাঁধ দেবে সবচেয়ে সামনের বৈঠায়।
আর সেই নবমীনিশিতে নেশার ঘোরে কাকে যেন বলেছিল, ‘মা, আর এই চাতালে আসবি না, মা? এ পুজো বন্ধ হয়ে যাবে! কেন রে, এই পুজোতেই যে আমার বাপ থেকে আমার জেবন কেটে গেল।’

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার চোখ থেকে ঘুম উড়ে গিয়েছিল হঠাৎ! মনে হয়েছিল শহরটা দুলে উঠল ওপর নীচে। দিদা তো বলে, ‘লক্ষ্মণটা বড্ড মদ খায়’! তবে নিশ্চয় তাই হবে।

তবু দশমী পার করে বাসে ওঠার সময় কেন যেন সেই ছেলেটার মনে হচ্ছিল, পরের বছর এই শহরে আসা হবে তো আবার? খড়ের ওপর মাটি… একমেটে, দু’মেটে… রঙ, চক্ষুদান… চণ্ডীপাঠ, খ্যান…

যে শহরে ভালোবাসার চিরস্থায়ী ঘর,
শিউলিভেজা পথের বাঁকে, আমার সে শহর।

~~~♠~~~

© সপ্তর্ষি বোস

Leave a Reply