ভোকাট্টা

Anirban & Arijit, Childhood, Nostalgia, আদতে আনাড়ি, বাংলা

ছোটবেলাতেও আমাদের হাতে থাকত রিমোট, আর আকাশে উড়ত ড্রোন। তফাৎ শুধু একটাই ছিল। আকাশের সেই ড্রোন আর হাতের রিমোটের মধ্যে সংযোগসূত্রটা অদৃশ্য ছিল না। বেশ ভালোই চোখে পড়ত লাল বা নীল রঙের মাঞ্জা সুতো। বাঁদিক দিয়ে দুলকি চালে ঢুকত ময়ূরপঙ্খী, ডানদিক দিয়ে তীরবেগে এগিয়ে আসত মুখপোড়া। মুখপোড়ার লক্ষ্য হাত থেকে টানবার, এদিকে ময়ূরপঙ্খী বুঝে গেছে ট্যাকটিক, দূরত্ব কমিয়ে এনে হাওয়ার টানে আত্মসমর্পণ করিয়ে দিয়েছে লাটাইকে। মারাত্মক ট্র‍্যাপ, ময়ূরপঙ্খী আহ্বান জানাচ্ছে মুখপোড়াকে। ঢিল যাচ্ছে সুতোতে। ডানদিক দিয়ে ফত ফত আওয়াজ করতে করতে মুখপোড়া ঢুকছে, পেটের কাছাকাছি চলছে দুই সুতোর টানাপোড়েন। পাঁচিলের ওপরে দাঁড়িয়ে হারু ছকে নিচ্ছে কোনদিকে ছুটতে হবে, মুখপোড়ার ওপর লোভ বেশি, মোটামুটি বালিগোলার পর পুকুরের পাড়ে পড়বে মনে হচ্ছে। মুহূর্তেই হবে ফয়সালা। মুক্ত আকাশ থাকবে কার দখলে?

ভোওওওওওওওকাট্টাআআআ!!

||

ছোটকা বলত অ্যারারুট নিয়ে আসবে ফেরার সময়। রাত থেকে ভিজিয়ে রাখতে হবে৷ ভাঙা টিউবলাইটের কাঁচ হামান দিস্তায় গুঁড়ো করা আছে আগে থেকেই। ইলেকট্রিকের দোকান ছিল ছোটকার, তাই টিউব আর আলাদা করে ভাঙতে হত না। ছাদের দুকোনায় দুটো চেয়ার পেতে সুতো জড়িয়ে শুরু হত আমাদের মাঞ্জা দেওয়া। ন্যাকড়ায় কাঁচ আঠা আর রঙের মিশ্রন নিয়ে সুতোর ওপর তিনবার করে বোলাতে হত। আমার হাত পড়লেই কেলো হত। আমি আরও ভালো মাঞ্জা দিতে গিয়ে দু কোট এক্সট্রা বুলিয়ে দিতাম। ছোটকা দেখে বলত এ আর মাঞ্জা রইল না, মশারির দড়ি হয়ে গেছে। মাঞ্জা হবে স্মুথ, একটু কোথাও ঘাঁট থাকলেই মরণ ফাঁদ। টেনে খেলা আর ছেড়ে খেলার আবার আলাদা মাঞ্জা৷ ছেড়ে খেলার মাঞ্জা হবে একটু রাফ।

কাকার দোকানে বিশ্বকর্মা পুজো হত। আমার নজর থাকত শুকনো বোঁদের ওপর, আর ঠাকুরের হাতে ঝোলানো এক তে ঘুড়িটার ওপর। কাকা বলত ওটা বিসর্জনের আগে খোলা যাবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা, আমার ওটাই চাই।

ছোটকাই আমাকে শিখিয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো৷ বলত নিজের জমানো পয়সা দিয়ে ঘুড়ি কিনতে। তাহলে নাকি তাড়াতাড়ি শেখা যায়। কাজে দিয়েছিল এই ফান্ডা। নয়তো কত ঘুড়ি যে টেক অফ করার আগেই কার্নিশে, বা পাশের বাড়ির জানলায়, পা অ্যান্টেনায় লেগে ফেঁসে গেছে, তার হিসাব ছিল না। আস্ত থাকলে মাঝে মাঝে ওড়াতে না পারার ফ্রাস্টেশনেই ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলতাম তাদের৷ ছেঁড়া ধ্বংসাবশেষ দেখে পরেরদিন ছোটকা সান্ত্বনা দিত, আর দেখিয়ে দিত কিভাবে ছোট ছোট টানে ঘুড়িতে হাওয়া লাগাতে হয়। ওকে নিজের মতো ছাড়তে হয়। হাতের রাশ আলগা না করলে ঘুড়ি নিজেকে হাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। কথাগুলোর অর্থ তখন বুঝতাম না। এখন বুঝতে পারি ছোটকা আমায় ঘুড়ি ওড়াতে শেখানোর সাথেই অন্য শিক্ষা দিয়ে দিত।

বাড়ির ছাদে ঘুড়ি কেটে পড়ার ভাগ্য আমার খুব কমই ছিল। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গাছের ডাল দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও বাগে আসত না। ঠিক গিয়ে পড়ত সামনে জেম্মার বাড়িতে। তারা কেউ ছাদেই উঠত না। জমা হত একগাদা ঘুড়ি৷ যেদিন বৃষ্টি হত খুব, সেদিন জানলা দিয়ে একমনে দেখতাম রঙবেরঙের কত ঘুড়িকে একসাথে ছিঁড়ে যেতে৷ সেই মনখারাপের ভাষা ছিল না। ছিল না কোনও অপ্রাপ্তির হতাশা। বোঝার মতো ক্ষমতাও ছিল না যে একদিন এই ঘুড়িগুলোর মতোই হয়ে উঠবে আমাদের জীবন। প্রাণপণে উড়ব যত উঁচু মন চায়, প্যাঁচের পর প্যাঁচ আসবে৷ যতক্ষণ জিতব ততক্ষণ উড়তে পারব। কিন্তু যখন কাটা পড়ব, তখন কোথায় গিয়ে যে পড়ব, তার ঠিকানা থাকবে না। আমাকে কুড়িয়ে নেওয়ার আর মালিক থাকবে না। সকলের অজান্তেই অপেক্ষা করব একটা বৃষ্টির জন্য।

মেজকা খুব একটা ঘুড়ির ভক্ত ছিল না। কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বিকেলে একবার ছাদে উঠেই ছোটকার হাত থেকে সুতো কেড়ে নিয়ে পাগলের মতো টেনে খেলতে যেত সামনের ঘুড়ির সাথে। যথারীতি কেটে গিয়ে ছোটকার মাঞ্জাকে খিস্তি খেউড় করে নিচে নেমে যেত। ঘুড়ির ডিপার্টমেন্টে আমার প্রবেশ হয়েছিল লাটাইধারক হিসেবেই। কিন্তু যেদিন বুঝলাম লাটাইটাকে ইঁট দিয়ে সাইডে চেপে রাখলেও একই কাজ হয়, সেদিন থেকে ওড়ানোয় মনোনিবেশ করতে থাকলাম। প্রথম প্যাঁচ খেলার সুযোগ এল দ্বিতীয় বছরে। ছোটকা ডেকে বলল দূরে যে গোলাপী ঘুড়িটা উড়ছে, সেটা ওই একতলা বাড়ির ছাদ থেকে বেড়েছে ঘনা, আমার মতই শিক্ষানবিস। তাই আমার প্রথম প্রতিযোগী হিসেবে আদর্শ। ঘনার বাড়ি ছিল আমার বাড়ি থেকে অনেকটা সামনে। তাই আমার কাছে সুযোগ ছিল ওকে হাত থেকে টেনে ওড়াবার। কিন্তু কাকার কিছু নিয়ম ছিল। কাউকে পিছন থেকে অ্যাটাক করে তার হাত থেকে কেটে দেওয়ার মানে তার অনেকটাই মাঞ্জার ক্ষতি, তাই এটা নীতিবিরুদ্ধ। অতএব, আমাকেও সুতো ছেড়ে বেড়ে যেতে হল ঘনার ঘুড়ির সমান উচ্চতায়। শুরু হল প্যাঁচ৷ একবার ঘনা ঢুকছে ভেতরে, আমি কাটিয়ে নিচ্ছি। একবার আমি ঢুকছি ভেতরে, ঘনা ঢিল ছেড়ে দিচ্ছে৷ পাশ থেকে আমার কোচ চেঁচাচ্ছে ঢিল ছেড়ে খেলতে৷ প্রথম প্যাঁচেই টেনে খেলার অনেক রিস্ক। আর প্রথম প্যাঁচে জয় ছিনিয়ে আনাটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট৷ ছোটকার কাছে আদর্শ জিত ছিল বিপক্ষের ঘুড়ি কেটে সেটাকে নিজের ঘুড়ি দিয়ে কায়দা করে লুটে নিজের কাছে নিয়ে আসা। আমার অত টার্গেট নেই৷ শুধু ঘনার আধ তে ঘুড়িটার গলা কাটব। চুক্কি দিতে দিতে একবার লেগেই গেল প্যাঁচ। শুরু করলাম ঢিল দিতে। ঘনাও একই পন্থা নিল। দুটো ঘুড়ি নিজেদের মধ্যে সোহাগ করতে করতে আরও এগিয়ে যেতে লাগল দূরে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো তালগাছ ক্রস করে গেল। পোস্টের তার ক্রস করে গেল। ছোটকাকে বললাম এবার একটু টানব নাকি। হুঙ্কার দিয়ে “না” বলে কাকা বলল একটু টানলেই শেষ। প্যাঁচ লেগে গেলে সুতো ছেড়েই যাবি, নো রিট্রিট। ছাড়তে ছাড়তে ঘুড়িদ্বয় নেমে এল একতলা বাড়ির লেভেলে। বুঝতে পারছি আজ যার কাটবে, তার পক্ষে লাটাই রিফিল করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না। মাঞ্জা তো অলরেডি হাতের বাইরে, মোমসুতোও শেষের দিকে। একটু বাদে লাটাই হাতে নিয়ে ছুটতে হবে। ঠিক এইসময় আমার সুতো চলে এল ঘনার ছাদের কাছাকাছি। যে ছেলেটার সাথে প্যাঁচ খেলতে গিয়ে আমার কাকা নীতির বুলি আওড়াচ্ছিল, সেই ঘনা আমার সুতোটা একটা লাঠি দিয়ে ধরে নামিয়ে টুক করে ছিঁড়ে দিল। ছোটকার মুখ গম্ভীর। আমার মনে হল লাটাই ছুঁড়ে এখান থেকেই ঘনার মাথা ফাটিয়ে দিতে পারব আজ। ছোটকা শুধু বলল, “উন্নতি করতে পারবে না এই ছেলেটা, মিলিয়ে নিস।” ঘনা উন্নতি করতে পেরেছিল কিনা জানি না, কিন্তু একদিন নিজের ঘুড়িটাকে খোলা আকাশে উড়িয়ে দিয়ে সবাইকে ধোকা দিয়ে চলে যেতে পেরেছিল ঘনা। সেদিন দাঁড়াতে পারিনি ঘনার পাশে গিয়ে, খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

ছোটকা ঘুড়ির জাত চিনত। একবার হাতে নিয়েই পেট টিপে, কাঠি বেঁকিয়ে, মাথায় দুবার ঘষে বলে দিত বাঁদিকে একটা হালকা কার্নিক দে, নয়তো চেত খাবে। কখনও বলত মায়ের কাছ থেকে আগের রাতের ভাত থাকলে কয়েকটা নিয়ে আসতে। লেজের দিকে একটা ছোট্ট ছেঁড়া আছে৷ সেটা জুড়তে হবে। তারপর দেশলাই কাঠির ডগা দিয়ে চারটে ছোট ছোট ফুটো করে তাতে সুতো ভরে কল খাটাত। বিশ্বকর্মা পুজোর আগের রাতে চলত প্রায় চল্লিশটা ঘুড়িতে কল খাটানো। যাতে পরের দিন একটা ঘুড়ি কেটে যাওয়ার পরের ঘুড়িটা ওড়াতে কোনও গ্যাপ না থাকে।

ছাদে আমার টেপ রেকর্ডারটা ফিট করে গান চালিয়ে দিতাম তেড়ে। আকাশে গিজগিজ করছে ঘুড়ি, চারিদিকে বাড়ির ছাদ থেকে ভেসে আসছে ভোকাট্টা চিৎকার, আর তার মধ্যে বাজছে আমার গান। সোনু নিগমের দিওয়ানা, মিলিন্দ ইঙ্গলের চুইমুই সি তুম লাগতি হো, শানের তনহা দিল, বা ডালের মেহেন্দির তুনক তুনক তুন। অপেক্ষা করতাম কখন পাশের ছাদে ব্যাটেলিয়ন নিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে উঠবে সেই মেয়েটা। বিকেল বাড়লে আস্তে আস্তে সেই ছাদে উঠত মেয়েটার কাকা, মেয়েটার বাবা, মেয়েটার কাকিমা, মেয়েটার মা, কিন্তু মেয়েটার নো পাত্তা। ছোটকার পিছনে লাটাই ধরেই নজর রাখতাম আড়চোখে। অনেকক্ষণ পরেও যখন উঠল না সে ছাদে, তখন ছোটকাকে বললাম, “আমায় দে, একটা প্যাঁচ খেলব।” ছোটকা চায়ের কাপ নিয়ে পাশে বসে আমাকে সুতো ছাড়তেই আমি বাঁদিক চাপতে লাগলাম ঘুড়িটাকে। উদ্দেশ্য পাশের বাড়ির সাথে প্যাঁচ। এই প্যাঁচে মিশে আছে রাগ, মিশে আছে অভিমান। আজ ঘুড়ির ওপর দিয়েই বদলা নেব। ছ্যাড় ছ্যাড় করে ঢুকলাম ওদের ওড়ানো কুচকুচে কালো ঘুড়িটার পেটের দিকে। পাশের বাড়ির কাকা আমার ওপর চাপিয়ে দিল সেই কালো ঘুড়ি। শুরু হল ঢিল ছাড়া। চেঁচিয়ে ছোটকাকে বললাম লাটাই ধরতে। ছোটকাও লাফিয়ে এসে লাটাই ধরে বলল কাদের সাথে প্যাঁচ লাগিয়েছিস রে! আর কাদের সাথে! মান সম্মান নিয়ে টানাটানি চলছে এদিকে, আর ওদিকে আমি সুতো ছাড়াছাড়ি করছি। হঠাৎ আমার সুতো আলগা হয়ে গেল, আর পাশের ছাদ থেকে চিৎকার ভেসে এল “ভোওওওকাট্টাআআ”। কিন্তু, গলাটা চেনা লাগল না! তাকিয়ে ভেবলে গেলাম। কাকা কাকিমা বাবা মায়ের সাথে আনন্দ উৎসব চলছে তখন সেই ছাদে। আর মধ্যমণি?

সেই মেয়েটা!

এনিওয়ে, ফাইনাল প্যাঁচটা আমিই জিতেছিলাম। পাশের বাড়ির টীম থেকে সেই মহিলা প্লেয়ারকে নিজের টীমে এনেছিলাম বেশ কয়েকটা সিজনের পর। আর হ্যাঁ, অষ্টমঙ্গলায় সেই পাশের বাড়ির ছাদ থেকেও ঘুড়ি উড়িয়েছিলাম সবাই মিলে। আনন্দের ঘুড়ি, শান্তির ঘুড়ি!

তবে, আকাশটা আজ বড়ই নীল। বিশ্বকর্মা পুজোয় আকাশ দেখতে পাওয়ারই তো কথা নয়। কোথায় সেই ছাদের মাথায় ঘুড়িওয়ালাদের ভিড়? কোথায় সেই প্লাস্টিক ঘুড়ির বিকট আওয়াজ? অফিসেও আজ ছুটি নেই। রাস্তায় টোটো চলছে না। ভাগ্যের জোড়ে একটা রিক্সা দেখতে পেয়ে হাত দেখালাম। গলির মোড়ে এসে থামল ছেলেটা। উঠে বসে বললাম, ” মন্দিরতলা।”

ছেলেটা প্যাডেলে পা দিল। চলতে শুরু করল রিক্সা। ফত ফত শব্দে নজর কেড়ে নিল দোতলা বাড়ির ছাদের কাছে চাঁদিয়ালের সাথে আরেকটা ঘুড়ির প্যাঁচ। চাঁদিয়ালের নাগালের মধ্যে এসে গেছে শত্রু। আমি রিক্সার শেড ফেলে দিয়ে তাকালাম আকাশে। এদিকে,

“ছেলেটার মন নেই প্যাডেলে বা চাক্কায়।।
ঐ তো লেগেছে প্যাঁচ চাঁদিয়াল বগ্গায়।
শান্ দেওয়া মাঞ্জায়, বগ্গা ভো কাট্টা।
ছেলেটা চেঁচিয়ে ওঠে “এই নিয়ে আটটা”!”

~~~♠~~~

© অরিজিৎ গাঙ্গুলি

Leave a Reply