বইপড়া – শারদীয়া_দেশ_১৪২৫- পূজাবার্ষিকী_গল্প

Book Review, Durgapuja, Nostalgia, Reviews, পাঠকের চোখে, বাংলা

রমণী ও ব্যায়ামবীরশীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

প্রথম গল্প শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এবং একে যদি শারদীয়া দেশের গল্প বিভাগের টোনসেটার হিসেবে দেখা হয় তাহলে নির্দ্বিধায় বলা চলে উপন্যাস থেকে গল্পে ফিরে এসে প্রথিতযশা লেখক হতাশ করেননি। একটা চেনা গল্পকে মুড়েছেন অন্যরকম ন্যারেশনে। তার ফলে যেটা হয়েছে গল্প চেনা হলেও গতিময়তার চাদর শেষ পর্যন্ত নিভাঁজ, নিটোল থেকে যায়। এমন একটা কাহিনী যা থেকে মাঝারি একটা উপন্যাস পর্যন্ত লিখে ফেলা চলে, সেটা পরিমিত পরিসরে তাড়াহুড়ো না করেই লিখে ফেলার মুন্সিয়ানা এই লেখার প্রতি লাইনে। শেষের কয়েকটি অনুচ্ছেদ বড় জলদি পড়া হয়ে গেল, যাকে বলে Fast read, এইটুকু অনুযোগ রেখেও, বহু ব্যবহারে পুরনো প্লটলাইন ছাড়া এই গল্পের খামতি খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

সুব্রত চৌধুরীর অঙ্কন যথাযথ এবং লেখার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

বিধ্বস্ত ডাকবাক্সে স্বপ্নহর্ষ দত্ত

প্রতি বছরই হর্ষ দত্তের গল্প শারদীয়ার ভাল গল্পগুলোর মধ্যে থাকে। হয়ত তার অধিকাংশেই লেখক অতি সাধারণবিত্ত পরিবারের সমস্যা থেকে মন ভাল করে দেবার মতো প্লট তুলে আনেন বলেই। এবারে তিনি গল্প বুনেছেন আশাবাদ আর হতাশাবাদের দ্বন্দ্ব নিয়ে। বেকার যুবকের চাকরি না পাওয়া হতাশার বিপ্রতীপে এসে ভিড় করে দাঁড়ায় তারই প্রয়াত বাবার চূড়ান্ত আশাবাদী স্বপ্নের দল। দ্বন্দ্বের সেই চরিত্র গল্পের শেষ অবধি ধরা পড়ে বারবার। ভাষার কাঠিন্য তাল না কাটলেও, চরিত্রচিত্রনে অসামঞ্জস্য চোখে লাগে। সহকারী চরিত্রের ভিড়ে এবং স্মৃতির ভারে এই গল্পের প্রধান চরিত্রদিলীপপরিস্ফুট হবার যথেষ্ট পরিসর পায়নি বলেই মনে হয়েছে। আর সেই কারণেই গল্পের পরিণতিতে এসে দ্বন্দ্বের পরিণাম অতিনাটকীয় এবং অস্বাভাবিক লাগে।

আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে সৌমেন দাসের স্কেচটি। অপূর্ব ডিটেলিং।

বাঘটাস্মরনজিৎ চক্রবর্তী

নামের সাথে সাযুজ্য রেখে এই গল্পের সব চরিত্রই আসলে এক একজন বাঘ।

কারও ভয়ে গ্রামবাসী তটস্থ, কখন বুঝি শিকারে নামে। কারও আবার ভেতরের বাঘ খাঁচায় বন্দী হয়ে আছে পরিস্থিতির চাপে। গল্পের বাঁধুনি আঁটোসাঁটো, গতি মাঝারি। লেখকের অতীতের কিছু উপন্যাসের মতো প্রতিটি মোড়ে নাটকীয়তা নেই, ফলে পড়তে গিয়ে বারবার অকারণে চমকে উঠতে হয় না। তবেপয়েন্ট অফ ভিউবা চরিত্রমুখ দিয়ে ন্যারেশনের যা যা সুবিধে হয় এই গল্পে তার সদ্ব্যবহার করেছেন লেখক বলা যায়। সমস্যা একটাই, তা হলো ক্লাইম্যাক্সে ড্রামার খাতিরে ড্রামা না আনলেও চলত, কারণ চমকটা প্রেডিক্টেবল দোষে দুষ্ট।

গল্পের সাথে শুভম দে সরকারের আঁকা ছবি বড্ড সাদামাটা।

বেড নম্বর ৩৬ এ  মণিরত্ন মুখোপাধ্যায়

একজন মাঝবয়সী অকৃতদার অধ্যাপকের আত্মকথন এই গল্পটি। নিজের জীবন থেকে দুচার পাতা ঘটমান বর্তমানকে স্বগতোক্তির ঢঙে বলে যান গল্পের মুখ্য চরিত্র। গল্পে চরিত্রের অভাব নেই, প্রেমিকা বর্ণা, অসুস্থ মা, তরুণী আয়া মালা এবং আরও কিছু। কথনের শৈলীতে সেইসব চরিত্ররাও যথেষ্ট জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু গল্পের অভিমুখ? নেই। যেটুকু গোল গল্প বলা হয়েছে তার পক্ষে এই গল্প আড়েবহরে বেশি, আবার যে যে দিকগুলি বিন্দুমাত্র এক্সপ্লোর করা হয়নি সেগুলিই হতে পারত অধিকতর সম্ভাবনাময়। পড়ে শেষ করবার পরমুহূর্তেই পাঠক যদি এই গল্প থেকে মন সরিয়ে নেন তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না।

তুলনায় মহেশ্বর মন্ডলের স্কেচ নিজগুনে উজ্জ্বল এবং বিশিষ্ট।

ভাষাসিজার বাগচী

বন্ধুর অনুরোধ রাখতে খানিক বাধ্য হয়েই লেখক এবং স্কুলশিক্ষক সুদীপ্ত রতনপুর গ্রামের লাইব্রেরির বার্ষিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু কথা রাখতে গিয়ে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন তাকে হতে হলো, সেটা তার কাছে আশাতীত এবং বিস্ময়কর। সিজার বাগচীর লেখা ঝরঝরে, নাতিদীর্ঘ। সাধারণ প্লটও লেখার গুণে অন্যতম হয়ে উঠেছে। যদিও শেষের দিকে অনুমান করে নেওয়া যায় গল্পের গতি।

অঙ্কনে পিয়ালী বালা যথাযথভাবে সঙ্গত করেছেন।

বক্তা বলাই নিরুদ্দেশউল্লাস মল্লিক

এই গল্পের মুখ্যচরিত্র বলাই বিখ্যাত বক্তা। চেনা বা অচেনা মৃত মানুষের স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে তাঁর জুড়ি নেই! এহেন বলাইবাবু বাল্যবন্ধু কানাইয়ের স্মরণসভায় কেন অনুপস্থিত তাই নিয়েই রহস্য। রম্যরচনা লেখার জগতে লেখক বিশিষ্ট এবং প্রিয় নাম। সাধারণ প্রেক্ষাপটে অসাধারণ চরিত্র বা ঘটনার জাল বুনে হাস্যরসের উদ্রেক ঘটাতে তাঁর জুড়ি নেই। এই গল্প সেই ধারার থেকে ব্যতিক্রম তো নয়ই বরং উল্লেখযোগ্য বলা যেতে পারে।

লেখনীর সাথে তাল রেখে প্রসেনজিৎ নাথের আঁকা ছবিও ব্যঙ্গচিত্রের ইঙ্গিত বহন করে।

রূপকৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়

কলকাতার শ্বশুরবাড়িতে ষোল বছর পরে এলেও তার রূপের কথা হয় দেখে খুশিই হয়েছিল রুচি, হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা আপাততুচ্ছ লোকাচারবিধি তাকে সামনে এনে দিল এমন একজনের, যার কাছেরূপশব্দটাই অভিশাপ। গল্পের গতি স্বচ্ছতোয়া ঝর্ণার মতো। লেখক শব্দের কারিকুরি নয়, একটা কাহিনী বলতে বেশি ইচ্ছুক তার প্রমান আলাদা করে দিতে হয় না। কৃষ্ণেন্দুবাবু জীবনের সমান্তরাল গল্প বলতে ভালোবাসেন, কিন্তু পড়ে শেষ করার পর প্রায়ই মনে হয় এ যেন সমান্তরাল না হলেই ভাল হতো, ভাল হতো অন্য কিছু হলেই, আর সেখানেই বারবার লেখক জিতে যান। গল্পে সৌমাভর চরিত্র প্রায় অনুপস্থিত থেকেও পরিস্ফুট যেন, যা ভাল ছোটগল্পের বিশিষ্টতা।

ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য সম্ভবত জলরংয়ে এঁকেছেন প্রচ্ছদটি। তুলির সূক্ষ কাজ না থাকাই এই গল্পের সঠিক চিত্রায়ন, তাই তাঁকে কুর্ণিশ। গল্প পড়বার পরে, ছবিটি দেখে চোখের জলে ভেজা বলেও মনে হতে পারে হয়তো।

দহনকালশীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়

দহনকাল অর্থাৎ দহনের কাল মানে পুড়ে যাওয়ার সময়। দুনিয়ার সমস্ত পদার্থ পুড়ে ছাই হয়, কেবল মন ছাড়া। মন পুড়লে তবে কী হয়? মন ব্যথার আঁচে পুড়ে গেলে আসলে ছাই হয়ে যায় অতীতের সুখ, ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো। মানুষের মনটা পড়ে থেকে যায় কালো কাঠের মতো, না আবার তাকে ব্যবহার করা যায় না যায় পোড়ানো। শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় এই গল্পে বাস্তব আর পরাবাস্তবতার সীমানা মুছে দিয়েছেন এক অনন্য জাদুতে। কোথাও কোথাও পরাবাস্তবতার গায়ে সত্যির রঙীন নকশা যেমন প্রকট হয়েছে, কোথাওআবারবাস্তবেররুক্ষতাএতপ্রখরনাহলেইভালহতোবলেমনেহয়েছেপাঠকের।এআসলেলেখকেরইমুন্সিয়ানা।

ছবিতে দীপঙ্কর ভৌমিক যে বিবিধতার হদিশ দিয়েছেন তার জন্যেও শিল্পীর ধন্যবাদ প্রাপ্য হয়।

সব মিলিয়ে এই গল্পটি শুধু এবছরের শারদীয়া দেশ পত্রিকায় নয়, একটি গল্প হিসেবেই অনন্যসাধারণ হয়ে উঠেছে তাতে সন্দেহ নেই।

 

 

~~~☀️ সমাপ্ত ☀️~~~

লেখকসপ্তর্ষি বোস

প্রচ্ছদ ~ সপ্তর্ষি বোস

www.facebook.com/anariminds

#AnariMinds #ThinkRoastEat

Leave a Reply