পাঠকের চোখে – ইশক খুদাই

Book Review, Reviews

বই – ইশক_খুদাই
লেখিকা- নিবেদিতা_হালদার_গাঙ্গুলী
পৃষ্ঠা সংখ্যা – ১৯২
প্রকাশক – The Cafe Table
মুদ্রিত মূল্য – ২২৫ টাকা
পাঠক ~ সৈকত_মুখোপাধ্যায়

জীবনে প্রথমবার কোনো একটি গ্রন্থের সমালোচনা করতে বসলাম, তাই গ্রন্থোক্ত স্পয়লার এর থেকে নিজের দাবী গুলোকেই সামনে রাখতে পছন্দ করলাম বেশি। লেখিকার মতে মুঘল এবং রাজপুত ইতিহাসের উপর নির্ভর করেই নির্মিত এই উপন্যাসের আপামর ঘটনা। কিন্তু যতই সময় এগোলো মনে হয়েছে সার্থক ইতিবৃত্ত এর দলিল হয়ে উঠেছে আলোচিত গ্রন্থখানি।

#প্রচ্ছদ: পেলব হলুদ বর্ণের বেসে তৌসিফ দার করা অসম্ভব সুন্দর প্রচ্ছদ প্রথমেই আট থেকে আশি যেকোনো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম। বিশেষত উর্দু বা ফারসি স্ক্রিপ্ট এর অনুকরণে ক্রিমসন লাল রঙে লিখিত ‘ইশক খুদাই’ নামটি চাঁদের গায়ে চাঁদের মতোই ভাস্বর হয়ে উঠেছে। চতুর্দিকে পরিবেষ্টিত ‘মুঘল মিনিয়েচার’ এর লতাপাতার কাজ অসম্ভব দৃষ্টিনন্দক। প্রচ্ছদ চিত্রেও হলুদ এবং লাল এর সমন্বয় বাকায়দা তারিফের হকদার।

#কাহিনী: লেখিকা তার এই উপন্যাস কে একটি ঐতিহাসিক প্রেমকথা হিসেবে উল্লেখ করলেও প্রেমের উর্ধ্বে গিয়ে একই পটভূমিতে একই সময়ে এই গ্রন্থে নিবেশিত হয়েছে প্রেম, অস্তিত্বের সংকট, রাজনীতি এবং সর্বোপরি এক নীরব নিশ্চল ইতিহাস, যা খুব সার্থক ভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে সোহাল আর রুবিয়ার দর্পণে। পরিশেষে সময়ের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে আকবর, অম্বররাজ ভারমল, মান সিংহ, মাহ চুচাক আর হরকাবাঈয়েরা। কাহিনীর বিন্যাসে একটা কথাই বলা যায় এই গ্রন্থ unputdownable।

#লেখনী: গ্রন্থের উপস্থাপনা বা ভূমিকায় লেখিকা স্বীকার করেছেন বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী এবং রাজসিংহ এর আলোছায়ায় বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাই সমগ্র উপন্যাসে এই প্রবাদপ্রতিম পূর্বসূরীর প্রভাব খুঁজে নিতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। কখনও তা হয়ে উঠেছে প্রশংসার পরিবাহী, আবার কখনও এই একই কারণে কাহিনীর ছন্দ ব্যাহত হয়েছে। লেখনীর মুন্সিয়ানার ১৮৮ পাতার সুবিস্তৃত কাহিনীকে বিলম্বিত, মধ্য এবং দ্রুত লয়ে বিভাগ করতে কোনো অসুবিধা হয় না, যা এই গ্রন্থের একটি বিশেষ দিক। কলমের আঁচড়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য এর সার্থক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন নিবেদিতা দি। সর্বমোট ২১ টি অধ্যায়ে বা পরিচ্ছেদে বিভক্ত উপন্যাসে ৯ থেকে ৬৬ পাতায় কাহিনীর প্রারম্ভিক বা বিলম্বিত অংশ, ৬৬ থেকে ১০০ অব্দি মধ্য অংশ এবং ১০১ থেকে ১৮৮ পাতা পর্যন্ত সুনিপুণ রূপে কাহিনীর দ্রুত লয় এবং পরিশেষে উপসংহার রচিত হয়েছে। লেখনীর গুণে মাত্র ৩ টি জায়গা ছাড়া কাহিনীর সর্বত্রই পাঠক হয়ে উঠবেন এই উপন্যাসের এক জীবন্ত চরিত্র।

#গ্রন্থে প্রশংসনীয়: টানটান মেদবিহীন লেখনী যে এই গ্রন্থের একটি বিশেষ দিক এই নিয়ে কোনো দ্বিরুক্তি নেই। চরিত্রের কথোপকথনে উর্দু এবং স্থান বিশেষে ফারসি শব্দের ব্যবহার লা জবাব। প্রতিটি খুন এর দৃশ্য অত্যন্ত নিপুণ ভাবে অঙ্কিত। পটভূমিকায় প্রত্যক্ষ উপস্থিত না থেকেও সোহাল রুবিয়ার উপস্থিতি বিশেষ প্রশংসার দাবীদার। আকবর চরিত্রের চিত্রায়ণ অসাধারণ। কাহিনী যতই পরিণতির দিকে এগিয়েছে অধ্যায়ের বাহুল্য নজরে পড়ার মতো। যথাযথ সময়ে কাহিনীর গতির উপর দক্ষ সংযম ভালো লাগলো। গ্রন্থটি কোথাও কাহিনীভারে ন্যুব্জ নয়, আবার পরিস্থিতির আকস্মিকতায় একটি সিঙ্গেল দৃশ্যের ইন্দ্রপতন চোখে পড়লো না, প্রয়োজন এবং পরিণতির সাপেক্ষে কাহিনীর গতি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। আকবর এর জবানিতে লাইনটা বারবার মাথায় ঘুরেফিরে আসে “ইশক খুদাকা ইবাদত হ্যায়, ঔর খুদাইকা মিটানা গুনাহ হ্যায়”

#গ্রন্থে যা কিছু আরও ভালো হতে পারত: একজন পাঠক হিসেবে নিবেদিতা দির থেকে তার বেস্ট টা চাওয়া আমার ন্যায্য দাবী বলেই মনে করি। যদিও ভালোর কোনো পরিসীমা নেই, তথাপি ১৮৮ পাতায় এমন কিছু কিছু ভ্রান্তি লক্ষ্য করা গেলো যা পরিহার করলে হয়তো ভালো হয়। প্রথমত, গ্রন্থে অঙ্কিত ছবিগুলো আরও আরও ভালো মানের হতে পারতো, ঘটনার বা কাহিনী বিন্যাসের সাথে ক্রুড এবং রাফ লাইন ড্রয়িং গুলি বেমানান মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থে চরিত্রদের কথোপকথনে উর্দু এবং ফারসি শব্দের বাহুল্য থাকলেও, গ্রন্থে উল্লিখিত তারিখ গুলি ইংরাজি গ্রেগরিয়ান পন্থার পরিবর্তে উর্দু হিজরী পন্থায় লেখা যেত বিশেষত যেখানে উপস্থিত রয়েছেন যুগপুরুষ আকবর। তৃতীয়ত, গ্রন্থের তিন টি জায়গায় খুব নির্মম ভাবে লেখিকা পাঠক শব্দের প্রয়োগ করেছেন (বঙ্কিম থেকে তিনি কি মাত্রায় অনুপ্রাণিত তা পরিষ্কার বোঝা যায়)। কিন্তু কাহিনীর অমোঘ টানে ভেসে যেতে যেতে হঠাৎ করে আমাদের পাঠক হিসেবে চিহ্নিত না করলেই বোধহয় ভালো হতো। কাহিনীর একদম শেষাংশে (পাতা ১৬৮) যেখানে ঘটনা অত্যন্ত টানটান সেই স্থানে পুনর্বার পাঠক হিসেবে আমাদের সম্বোধন একটি ক্ষমাহীন অপরাধ। চতুর্থত, আব্বাস বেগের হত্যা গ্রন্থে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু ভুলবশত লেখিকা (পাতা ৮৮) খেয়াল করেননি যে মুখ থুবড়ে পড়লে কোনোদিন শাহনাওয়াজ আব্বাস বেগের পাঁজরে লাথি মারতে পারবেন না। পঞ্চমত, একটি বিস্তারিত চরিত্র পরিচয় সারণী এই গ্রন্থে প্রয়োজন ছিল, যদি চরিত্রের কয়েকটি ছবি পাওয়া যেত তাহলে মনে হয় ভালো হতো

#শেষ কথা: ইতিহাসের সময় পটে মুঘল সালতানেত এক বিচিত্র রঙে রাঙা। বহু ঘটনার ঘনঘটায় দাস, লোদী, খলজি এবং শেষে মুঘল হয়ে ইতিবৃত্ত এর সমাপতন। জনপ্রিয় ইতিহাস বা পপুলার হিস্ট্রি রচনায় এই গ্রন্থের অবদান ঠিক কতোটা জানিনা। কিন্তু এহেন নির্ভার আর সাবলীল গ্রন্থ রচনার পর বলতেই হয় খামা ঘণি নিবিসা…

Leave a Reply