পাঠকের চোখে – রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি

Book Review, Reviews

#রবীন্দ্রনাথ_এখানে_কখনও_খেতে_আসেননি
লেখক ~ #মোহাম্মদ_নাজিম_উদ্দিন
প্রকাশক ~ অভিযান (কলকাতা), বাতিঘর (বাংলাদেশ)

সংসারধর্ম পালন আর দেশান্তরের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় বই নিয়ে নাড়াঘাঁটা অল্পবিস্তর হলেও পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার সময় একেবারেই পাইনি কয়েক মাস। তবে বইমেলার হুজুগে প্রচুর বই সম্বন্ধে জেনেছি, লিস্টও বানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু, কিছুদিন আগেই এই বইটা শেষ করে মনে হল এর প্রতিক্রিয়া জানালে হয়তো আমার মতোই বেশ কিছু পাঠক উপকৃত হবেন।

২০১৮ সালের বইমেলা কাঁপানো এই বইয়ের টাইটেল দেখেই যারা উৎসাহিত হয়েছিলেন পড়ার জন্য, তাদের মধ্যে আমিও একজন। তবে সত্যি কথা বলতে লজ্জা নেই যে লেখকের নাম আমি তার আগে জানতাম না। বিদেশী থ্রিলারের অনুবাদ পড়েছিলাম বেশ কয়েকটা, কিন্তু খেয়াল করিনি যে সেই অনুবাদকদের মধ্যে এই লেখকও ছিলেন। বইটার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে অসংখ্য পাঠপ্রতিক্রিয়া পড়েই গল্পের বিষয়বস্তু নিয়ে একটা ধারনা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শুধু জানতে পারছিলাম না কেন এমন একটা নামকরণ করলেন লেখক। তাই মুদ্রিত বই কেনার সুযোগ না থাকায় ইবুক দেখতে পেয়েই আর লোভ সামলাতে পারিনি। জানি না বেআইনি ভাবে ইবুক পড়ে ফেলেছি কিনা এই বইয়ের, তবে কোনও রাখঢাক না করেই আজ আপনাদের বলব কেমন লাগল এই জনপ্রিয় থ্রিলার।

এবারে ২০১৯ এর বইমেলায় বইটার দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। এই ব্যাপারটা সত্যি বলতে কী, আমার মনে একটু প্রভাব ফেলেছিল বইটা পড়া শুরু করার সময়। মনে হচ্ছিল এই গল্পের মীমাংসা হবে না শেষ পর্যন্ত, কারণ লেখক পরের খণ্ডের জন্য প্লট বাঁচিয়ে রাখবেন, ভিলেন বা নায়ক কেউই হয়তো মরবেন না, বা রহস্যের কিনারাও হবে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই বিরক্তিকর ভাবনা থেকে আমাকে মুক্তি দিলেন স্বয়ং লেখক। লেখার গতি আর পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতার জন্য কুর্ণিশ জানাই লেখনী শক্তিকে।

বাংলাদেশের এক ছোট্ট শহর সুন্দরপুর। শহরের নাম না শুনলেও এখানে তৈরি হওয়া একটা রেস্তোরাঁ নিয়ে কিন্তু মানুষের বিশাল কৌতুহল। সুদূর ঢাকা বা দূর দূরান্ত থেকে ভোজনপিপাসু লোকজন ছুটে আসে এই রেস্তোরাঁর বিভিন্ন খাবারের স্বাদগ্রহণ করার জন্য। নুরে ছফা নামের লোকটিও এর ব্যতিক্রম নন। তিনিও আজ এসেছেন, এবং মেনুকার্ডে লেখা অদ্ভুত সব নামের আইটেম থেকে বাছতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে অবশেষে ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার করলেন লাঞ্চ। খাবার আসার পরে মুখে দিয়েই মনে হল এর স্বাদ যেন অমৃতের সমান। আর এই অসাধারণ স্বাদের টানেই এত চাহিদা এখানকার। অথচ নুরে বুঝে উঠতে পারেন না কীভাবে বানানো যায় এত সাধারণ অথচ অমৃত সব রান্না।

নুরে ছফা যখন থেকে বুঝতে শুরু করেন “রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি” নামক এই রেস্তোরাঁর রান্নায় আলাদা মাত্রা এনে দেওয়া স্বাদের আসল কারণ, তখন থেকেই শুরু হয় এই জনপ্রিয় থ্রিলারের আসল প্লট। রেস্তোরাঁর মালকিন মুশকান জুবেরির চরিত্র চিত্রায়ণে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন নিজের স্বতন্ত্রতার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই নারীচরিত্র আপনাকে ভয় দেখাবে, অসহায় করে ফেলবে, আবার সহমর্মিও করে তুলবে। পাঠকের কাছে এমন একখানা চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার জন্য ধন্যবাদ জানাই লেখককে।

লেখক যথেষ্ট নজর দিয়েছেন প্রতিটা চরিত্রকে গল্পের প্রয়োজনে যোগ্য মর্যাদা দিতে। যদিও রমাকান্ত কামারকে লেখক তুরুপের তাস বানিয়ে রেখে দিলেন, কিন্তু গোরখোদক ফালু বা ইনফর্মার বিবিসি-র হাত ধরে গল্প কিন্তু বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেছে।

লেখক বিদেশী গল্পের অনুবাদের সাথেও যুক্ত থাকায় থ্রিলারের প্লট তৈরি বা দৃশ্যবিন্যাসে সহজেই সেই ঘরানার আন্দাজ পাওয়া যায়। একটা দৃশ্যের শেষে টেনশন জিইয়ে রেখে পাঠককে গোগ্রাসে গিলতে বাধ্য করেছেন পরের দৃশ্য, আবার সেইখানেও একই ফর্মুলা। কিন্তু বারবার এই পদ্ধতি নিতে গিয়ে বেশ কিছু দৃশ্যের শেষে মনে হয়েছে যে জোর করে কিছু উপাদান আনতে চেয়েছেন, যেটা গল্পের বুননকে দুর্বল করে দিয়েছে। অতিপ্রাকৃত ঘটনার বিবরণ বা উল্লেখ তাই সব জায়গায় মনোগ্রাহী হল না আমার। হয়ত অনেকেরই ভালো লাগতে পারে।

বিদেশী থ্রিলারের অনুকরণে বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে প্লটনির্মাণ আপাতদৃষ্টিতে বইপোকাদের কাছে সাধারণ লাগলেও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে লেখক সেই ঘটনা নিয়ে বেশ ভালোই গবেষণা করে এই প্লট বেছে নিয়েছেন। ইন্টারনেটে অনেকগুলো আর্টিকেল ঘেঁটে নিজেও অবাক হয়ে গেলাম যে ঘটনার সত্যতা বিকৃত না করেও লেখক বেশ স্বচ্ছন্দেই নিজের রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন দৃশ্যগুলিকে।

আধুনিক গেম অফ থ্রোন্স-এর স্টাইলে যেসব চরিত্রদের সাথে পাঠক একাত্ম হয়ে যাবেন, তাদের হঠাৎ নির্মম পরিণতির স্টাইলটা ভালো লাগলেও মনে হল গল্পের প্রয়োজনে সেটা না করে শুধু চমক হিসেবেই ব্যবহার করেছেন লেখক। নয়তো সেই পরিণতির যথাযোগ্য মর্যাদা না দিয়ে প্লটের প্রয়োজনে অন্য যুক্তি বা দৃশ্যপট খাড়া করার দরকার পড়ত না। এটা সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত মত, এবং এতে কোনও স্পয়লারও নেই সেই আশ্বাস দিচ্ছি। আসলে এই থ্রিলারের সামান্য কোনও ঘটনাও যদি চরিত্রের নামসমেত এখানে বলি, তাহলেই সেটা স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই বিরত রইলাম সেই চেষ্টা থেকে।

একটা থ্রিলারে সব রহস্যের সমাধানই যে টানটান হবে, এমন আশা করা একটু বাড়াবাড়ি। এক্ষেত্রেও বেশ কিছু ব্যাখ্যা বা যুক্তি হাস্যকর লেগেছে। মনে হয় পরের পর্বে লেখক আরও সচেতনভাবে গল্পের জাল বুনবেন।

সব শেষে বলব ছোটবেলার সেই প্রশ্নের উত্তর – “নামকরণের সার্থকতা”। রেস্তোরাঁর নামকরণের কারণ খুঁজতে পাঠককে বেশ ভালোই বেগ পেতে হবে। কিন্তু অবশেষে কারণটা জানতে পেরে আমার প্রতিক্রিয়া যদি জানতে চান, তাহলে বলব ফিক করে হেসে ফেলা ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসেনি। তবে স্ট্র‍্যাটেজিকালি লেখক সফল হয়েছেন নামের জোরে পাঠককে সম্মোহিত করে রাখতে।

বাংলা থ্রিলার শেষ কয়েক মাসে যতগুলো পড়েছি, তার মধ্যে “রবীন্দ্রনাথ” নিঃসন্দেহে “একবার ধরে আর ছাড়তে পারিনি” গোত্রের। এবং পরের খণ্ড পড়ার লোভও আরও বেড়ে গেছে। বইটা পড়ে ভালো লাগার থেকেও বেশি বলব যে উপকৃত হয়েছি বেশ কিছু কারণে। এই বইটা না পড়া পাপ নয় অবশ্যই, কিন্তু এড়িয়ে গেলেও আপনার মন খুঁতখুঁত করবে এই ভেবে যে “আমি এই বই কখনও পড়ে দেখিনি।” 😉

© অরিজিৎ গাঙ্গুলি

Leave a Reply