পাঠকের চোখে – একটি পেরেকের কাহিনী

Anirban & Arijit, Book Review, Reviews

বই ~ ♦#একটি_পেরেকের_কাহিনী♦
লেখক ~ #সাগরময়_ঘোষ
প্রচ্ছদ ~ #পূর্ণেন্দ_পত্রী
প্রকাশক ~ #আনন্দ_পাবলিশার্স
প্রথম প্রকাশ ~ #জানুয়ারি_১৯৭১

– বিশ্রাম, বিশ্রাম, বিশ্রাম। কানের কাছে সবসময় শুনছি বিশ্রাম নিন, বিশ্রাম নিন। বিশ্রাম তো আমি একদিন নেবই, অনন্তকালের জন্য বিশ্রাম। বোধহয় সে দিনের আর বেশি দেরি নেই। তবে কী জানো, কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে পারলেই আমার মন ভালো থাকে।

– কিন্তু শরীর তা মানবে কেন?

– (হেসে বললেন) সারাজীবন ধরে বহু রুগী নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি। শুনেছি লোকে নাকি বলে আমি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী। আসলে ব্যাপারটা কী জানো? ওসব কিছু নয়। মানুষের রোগ থাকে মনে, শরীরে নয়। মনটাকে যদি রোগমুক্ত করা যায়, শরীরও সুস্থ হয়ে ওঠে। আমার চিকিৎসাবিদ্যার চাবিকাঠি ছিল সেটিই।

বিস্মিত হয়ে ডাঃ রায়ের কথা শুনছিল সে। এমন অন্তরঙ্গভাবে কথা বলতে তাঁকে এর আগে কোনোদিন সে দেখেনি। ওঁর পক্ষে এত কথা বলাটাও যে এখন উচিৎ নয় সেটাও সে জানে। বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

– আজ আসি স্যার। আগামী রবিবার আপনার জন্মদিন। সেদিন দুপুরে আবার আসব।

||

১৯৬২ সালের ২৪শে জুন। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে নিজের বাড়ির শোবার ঘরে পিঠের তলায় দুটো বালিশ দিয়ে শুয়ে কথাগুলো বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। যাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, সেই ব্যক্তিকে আমরা কেউ চিনি না, জানি না। অথচ দেশ পত্রিকার লেখক ও সম্পাদক হিসেবে যে সাগরময় ঘোষকে আমরা এক ডাকে চিনি, তার কলমেই ডাক্তারবাবুর সামনে বসা সেই লোকটির কথা আমরা জানতে পারলাম। নাম তার বৈদ্যনাথ। অতি দরিদ্র নগণ্য এক সাধারণ মানুষ, বিধান রায় যার কাছে একজন ভগবানের সমান। বৈদ্যনাথ জানেও না এক সপ্তাহ পর ডাক্তারবাবুর জন্মদিনের দিন কী সংবাদ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। জানতে চায়নি সে সেই খবর, শুনতেও চায়নি। কিন্তু ভাগ্যের লেখা কে খণ্ডায়।

এই বৈদ্যনাথকে পাঠকের সাথে পরিচয় করালেন লেখক এক অদ্ভুত ভঙ্গীতে। যদিও মাঝখানে মাধ্যম হিসেবে রইলেন বিশুদা। কিন্তু বিশুদার স্মৃতিচারণে আর বৈদ্যনাথের জীবনকথা শুনতে শুনতে আমরা জেনে গেলাম বিরাট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক অসাধারণ পুরুষকে।

জানলাম ডঃ বিধানচন্দ্র রায়কে!

সত্যজিৎ রায়-কে নিয়ে একটা গবেষণামূলক কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হল তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সাথে সামনাসামনি কীভাবে কথা বলতেন, সেটা জানা দরকার। ওঁর ম্যানারিজম, চালচলন নিয়ে সম্যক ধারনা পাওয়ার আশায় খোঁজ করতে শুরু করলাম বইয়ের, আর ফেসবুকেই দেখলাম ঋজুদা (মানে আমাদের সবার পরিচিত লেখক ও বইপাগল শ্রী ঋজু গাঙ্গুলি) সাজেস্ট করেছেন একটা পোস্টের কমেন্টে এই বইটি পড়ে দেখার। “একটি পেরেকের কাহিনী”। নাম শুনে বোঝার উপায় নেই যে এর বিষয়বস্তু কী। কিন্তু শুরু করেই বুঝতে পারলাম যে ঠিক যেমনটা চাইছিলাম, তাই আছে এই বইতে।

বাষট্টি সালের পয়লা জুলাই রবিবার সকালে শুরু হচ্ছে গল্প। নতুন বাংলার রূপকার ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা কলকাতা জুড়ে। লেখকের খুব ইচ্ছা যে তিনিও সবার সাথে পথে নেমে সেই শেষ শোভাযাত্রায় পা মেলান, কিন্তু ভিড়কে বড় ভয় তাঁর। কোলাহল থেকে যতটা পারেন দূরে থাকেন। তাই বিষন্ন ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তিনি উল্টেপাল্টে দেখছেন নানান সংবাদপত্র, যার পাতায় পাতায় আজ শুধু একটাই লোকের নাম, তাঁর ছবি, তাঁর কর্মজীবনের ঘটনাবলী। কাগজের হেডলাইনে লেখা,

“জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে,
দুই আলো মুখোমুখি মিলেছে জীবন-প্রান্তে।”

লেখকের মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯২৩ সালের পয়লা ডিসেম্বরে আনন্দবাজার পত্রিকার সেই হেডলাইন।

“নির্বাচনের ফলাফল,
মন্ত্রীদের কেল্লাফতে,
সুরেন্দ্রনাথ কুপোকাত…”

সেইদিন থেকে বাংলার রাজনীতিতে পদার্পণ বিলেতফেরত “এম আর সি পি” আর “এফ আর সি এস” ডিগ্রীধারী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের। যদিও তার অনেক আগে থেকেই চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অবদান আর বিভিন্ন ঘটনা লোকমুখে ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে।

মানুষটাকে শেষবার দেখার জন্য পুরো কলকাতা যেন নেমে এসেছে রাস্তায়। অফিসে বেরনোর পথে লেখক আটকে গেলেন রসা রোডে এসেই। “জনস্রোত বন্যার মতো ছুটে চলেছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর দিকে।” সাদার্ন অ্যাভেনিউতে একটা মেহগনি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে গেলেন লেখক। আর এগোনো যাচ্ছে না। কাটফাটা রোদে গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকজন আশেপাশের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছেন, “জল ঢালুন, জল ঢালুন।” বালতি বালতি জল এসে পড়ছে ভিড়ের মধ্যে। গরম থেকে মিলছে ক্ষণিকের শান্তি। কিন্তু অপেক্ষা শববাহী গাড়ির।

হঠাৎ লেখককে ডাকলেন ওঁর পত্রিকা অফিসেরই কলিগ, একজন “না-লিখে-সাহিত্যিক”, বিশুদা। তার জোরাজোরিতেই অফিস কামাই করে দুজনে ফিরে এলেন লেখকের বাড়ি। দুগ্লাস জল খেয়ে বিশুদা বলতে শুরু করলেন একটা অতি সাধারণ ছেলে বৈদ্যনাথের গল্প। যা আসলে এই “একটি পেরেকের কাহিনী”। যথার্থভাবেই, রাস্তায় পড়ে থাকা একটা মরচে ধরা পেরেক কীভাবে বৈদ্যনাথের জীবন বদলে দিয়েছিল, তার গল্প। আর সেই গল্পের ছলেই আমরা পরিচিত হলাম আপামর বাঙালির গর্বের মানুষ বিধানচন্দ্র রায়ের
বাহ্যিক সত্ত্বার পিছনেও লুকিয়ে থাকা অপর এক সত্ত্বার সাথে। সাগরময় ঘোষের এই বই মানুষ বিধানচন্দ্রকে অনেকটা কাছে এনে দিল পাঠকের।
মন ছুঁয়ে গেল প্রতিটা পাতা। একবার ধরেই পুরো বইটা শেষ করে দশ মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এই রত্নটি খুঁজে পেতে এতদিন দেরি করে কী ভুলটাই না করে ফেলেছি।

এতদূর পড়ে যাঁদের মনে হতে পারে যে বইয়ের আদ্ধেক গল্প তো এখানেই বলে দিলাম, স্পয়লারে ভর্তি, তাঁদের নিশ্চিন্ত করতে বলি যে এটা শতকরা এক ভাগও নয়। অনুরোধ করব সবাইকে এই বইটা মিস না করার জন্য।

সাগরময় ঘোষকে প্রধানত সম্পাদক হিসেবে আমরা চিনলেও ওঁর লেখা বই প্রথমবার পড়েই চমকে গেলাম। হয়তো আমার সিনিয়রদের মনে হতে পারে যে এ ছোকরা কী আর জানে সাগরময় নিয়ে, তাকে তো আমরা বেশি চিনি। সত্যি বলছি তেমন কিছুই জানতাম না। কিন্তু অনেক কিছু এবার জানতে ইচ্ছে করছে। রবিবাসরীয়তে একটা দারুণ আর্টিকেল পড়লাম “আমি তো স্টেজের মালিক” নামে। স্মৃতিচারণা করেছেন দেবাশিষ ভট্টাচার্য। সেই লেখা থেকেই একটা ছোট জায়গা তুলে দিলাম নীচে।

?

তখন শংকর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এক নামী সংস্থায় বড় পদে চাকরি করেন। দেশ-এ একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। তাতে কোনও এক বিশেষ ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সম্পর্কে ‘পেটমোটা’ বিশেষণ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। একদিন সকাল ন’টায় অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখেন লিফ্‌টের কাছে সাগরময় ঘোষ দাঁড়িয়ে। তাঁকে ওই ভাবে দেখে ঘোর বিস্ময় শংকরের। সাগরবাবু বললেন, ‘‘তোমাকে ধরব বলেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার লেখায় দু’ জায়গায় ‘পেটমোটা’ শব্দটা আছে। ওটা না থাকাই ভাল। বদলে দাও।’’ কুণ্ঠিত শংকর বলেন, ‘‘সাগরদা, এটুকুর জন্য আপনি এভাবে এলেন! অন্য কোনও শব্দ নিজে বসিয়ে দিলেই পারতেন।’’ সাগরময় তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, কী লিখবেন, সেটা লেখকের স্বাধীনতা। তাঁকে না জানিয়ে একটি শব্দও পরিবর্তন করা ঠিক নয়।

?

এই আর্টিকেলের পুরোটা পড়তে হলে নিচে লিঙ্ক দিয়ে রাখলাম।

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/some-unknown-facts-about-sagarmoy-ghosh-1.724467

এই দেখুন, একটা বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কত কথা বলে ফেললাম। আসলে কোনও লেখা মন থেকে ভালো লাগলে নিজের অজান্তেই সেটা নিয়ে আরও ঘাঁটতে ইচ্ছে করে, আর সেই সুযোগে অনেক মণিমানিক্য আপনা হতেই বেরিয়ে আসে।

লেখকের ভাষাতেই শেষ করি।

“বৈদ্যনাথ ও তার পরিবার আমার কাছে বিরাট রহস্য হয়ে দেখা দিল। কৌতূহল আর চেপে রাখতে না পেরে বৈদ্যনাথের পরিচয় জানবার জন্য উৎসুক হয়ে বিশুদাকে প্রশ্ন করতে যে কাহিনী সেদিন বিশুদা আমাকে শুনিয়েছিলেন, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনই মর্মস্পর্শী!”

?

✍ #অরিজিৎ_গাঙ্গুলি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.