লাভ ইউ রোহিতা

Friends, Humor, Nostalgia, Story, আদতে আনাড়ি, বাংলা

মাছের রাজা ইলিশ হতে পারে। কিন্ত মাছেদের বাজারে উদিত নারায়ণ কিন্তু সেই লেবিও রোহিতা। মানে ঝালে ঝোলে অম্বলে যাকে লাগে সেই প্রিয় রুই মাছ কিন্তু অজান্তেই নিজের জায়গা বানিয়ে নিয়েছে নানা নামে। সব মাছই কাটা হয়; কাটা মাছ কিন্তু রুই। মাথামোটা কাতলা যদিও মাঝে মাঝে বাজার ছিনিয়ে নিতে চায় কিন্তু বাবা রোহিতার রুপালি বর্ণ শেষমেশ কালো মাছটাকে নামিয়েই রাখে। বলে না অতি বড় সুন্দরীর না জোটে বর, অতি বড় ঘরণীর না জোটে ঘর। পিসিকালচারে পড়া শয়ে শয়ে মাছের মধ্যে প্রবাসে গিয়ে বাঙালির মাছ বলতে কি বোঝায়, “রোহু ” . “ভাই আজ বংগালি মছলি খায়া। রোহু। কেয়া টেস্ট, বড়িয়াহ। … ” তাহলে পপুলার ভোটে কে জিতলো। বাঙালি আর রুই যেন ওতপ্রোত ভাবে জড়িত আছে। এমনকি আধুনিককাঁটাছাড়াতেকষ্টমামনি আরমিটইসহিটপাগলু রাও কিন্তু মাছের মধ্যে এটাকেই বেছে নেয় খাওয়ার জন্য। হবে নাই বা কেন। পয়সা উসুল মাছ তো। হীরের নাকছাবি বন্ধক রেখে একটা গোটা ইলিশ কিনে এনে, হয় সর্ষে দিয়ে ঝাল নয়, বেগুন দিয়ে ঝোল, একটু কেতা মারলে ভাপা। ভেটকি আনলে ডালনা, পাতুরি আর ফিশ ফ্রাই। কিন্তু একটা গোটা আড়াই কিলোর রুই আনলে, প্রথমে ভাজা দিয়ে শুরু, তারপর ঝাল, তারপর ঝোল, তারপর মুড়িঘন্ট, তারপর কালিয়া, তারপর সর্ষে, তারপর পোস্ত। ফিউশনের যুগে এখন তো মাছের চপ বা বড়াও দেখি রুই মাছ দিয়ে করে দিয়েছে। তবে যাই বলো ভাই, দি ফেমাস মাছের ঝোল করতে কিন্তু ওই আড়াই কিলোর রুইই লাগবে।

বাঙালির মাছের ঝোল আর মিষ্টি দই জানেনা এরকম বাঙালিচেনাঅবাঙালি আমি প্রবাসের বারো বছরে দেখিনি। তা, সেই ঝোল যে অন্য কোনো মাছে হবে না সেটা আমার মানতে প্রথম প্রথম কষ্ট হয়েছিল। তাই যে মাছই পেতাম সেই মাছেরই ঝোল বানানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু পরে বুঝলাম কলাগাছকে শাড়ি পড়ালেও সে বৌ হয় না। ম্যাকরেলে আঁশটে গন্ধ হচ্ছে, ভেটকিতে ভোটকা গন্ধ হচ্ছে, ইলিশের ঝোল বানালে পয়সা খাচ্ছি মনে হচ্ছে। তাই গো ব্যাক টুগুড ফর মাই টামি এন্ড গুড ফর মাই সোল্, রুই মাছের ঝোল। হ্যাঁ, বিধিবদ্ধ সতর্কিকরন, তোমরা যদি সমস্ত কার্পকেই রুই মাছের সাথে সম গোত্রে রাখো তাহলে আর এক লাইন পোড়ো না। তোমাদের দ্বারা হবে না। কার্প মানে কি ? যে মাছের আঁশ আছে আর সিঁড়দাঁড়া আছে তাদেরই কার্প বলে। ভাষ্যে বলে সব রুইই কার্প কিন্তু সব কার্প রুই না। যে মনিষ্যি বলে তেলাপিয়া রুই এর মতো খেতে, তাদের থেকে দূরে থাকা অভ্যেস করুন। না, আমি ফিশরেসিস্ট নই, কাঁটা সবারই চেৰাই তবে রুই মাছের মাথা সাজিয়ে দেওয়া হয় যখন পাতে, তখন তার সৌন্দর্য্য থেকে মুখ ফেরানো অসম্ভব। ইলিশের মাথা খেয়ে দেখো, একটা ঢ্যাঁড়স। একটুও ঘিলু ফিলু নেই। সেদিন সিবাস আর ক্যাটফিস মানে মাগুরের মাথা পাশাপাশি রেখে ভাবছিলাম কোনটা সুন্দর। শেষে দুটোই ডাস্টবিনে চলে গেলো। রুই এর মাথা ভাজতে ভাজতে যখন ভেঙে ফেলে মুড়ি ঘন্টটা বানানো হয়। তখন ওই বেরিয়ে আসা ঘিলু করা ভাতের গন্ধে মিশে চার পাশে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির তৈরী করে। ফিশ বিরিয়ানি কে যাঁরা আহা আহা করে খান, তারা এইটুকু তো সিওর যে মুড়ি ঘন্ট খাননি।

বাঙালি খাদ্যে আর ব্যাবাক ভারতবর্ষের মাছ রান্নার মূল তফাৎ হলো তেঁতুল। দিল্লি থেকে সিংহলে মাছ তেঁতুল ছাড়া রান্না হয় না। আর শুধু ভাজা মাছ খেলেও পাশে থাকে তেঁতুল আর খেজুরের চাটনি। বাঙালির শাটল (সাবটল আর কি) টেস্ট এর টোম্যাটো, পট্যাটো এন্ড চিলি, মানে টমেটো কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাছের ঝাল যা মাছের আসল স্বাদ সংরক্ষণ করে, তার স্বাদ তারা কখনো পায়না। এর মুল কারণ হলো, টাটকা মাছের যে স্বাদ সেটা তারা বোঝে না। ছোট রুই, মানে এক বিঘৎ থেকে এক আঙ্গুল লম্বা যে রুই মাছ হয়। যেটা দোকানে কম জলে কেলি করে। সেই মাছ কাটলেই গল গল করে বেরিয়ে আসে, মিউকাস। আহা, নাকের পোঁটা নয়। মাছের গায়ের ওই হড়হড়ে বস্তুটি। আর ওতেই আসে স্বাদ। ওমেগা টোমেগা সব বলে না, ওই সব। আর তাতেই ক্ষরণ হয় ডোপামাইন।

নামকরা সেলিব্রিটি মাছরা কিন্ত টাটকা আসেনা প্লেটে। এলেও চিনতে পারবে না কারণ সারাজীবন পাতা খেলে কি রসগোল্লার স্বাদ বোঝা যায়। রুই মাছ কিন্তু টাটকা পাওয়া সম্ভব। মানে চৌবাচ্চাতেও বানানো যায়। বিন্দাস বেড়ে উঠবে। আবার ফ্রোজেন করে দিলে পাঁচ বছর টিকে যাবে। পদ্মায় ধরা দশ পাউন্ডের পেল্লাই রুইটি যখন বাড়িতে নিয়ে এলাম। ডেট কট দেখেই গা ঘুলিয়ে উঠলো। আগের বছর যখন দেশ থেকে ফিরছিলাম তখন মাছটিও আমার সাথে প্লেনে উঠেছিল। কিন্তু এতদিন লাগলো আমার প্লেটে আসতে। কিন্তু যেহেতু পয়সা দিয়ে কেনা, তাই ফেলা তো যায়না। ডেট কট কাগজটাই ফেলে দিলাম। কিন্তু যখন সেই পাকা রুই প্লেটে এলো কালিয়া হয়ে, তখন দুধ জমে আইস ক্রীম। এই কালিয়া, কর দেখি অন্য মাছের কালিয়া। অনুপম কে দিয়ে টাইগার শ্রফের গান গাওয়ানোর মতো মনে হয়। ঘটির মরণের সব কিছুতে পোস্ত দেওয়া বাঙালকে বোঝাতে গেলে আলুপোস্ত খাওয়ালে চলবে না। টাটকা রুই এনে মাছ পোস্ত করে খাওয়াতে হবে। তবে বুঝবে।

সে যাই হোক, আমার রোহিতারও লিমিটেশন আছে। থাকবেই। সেও তো মাছ। এখন চালিয়ে নিলেও মাছের চপ কিন্ত রুই মাছের হয় না, কাঁটার জন্য ফিলে বেরোয় না, তাই ফিশফ্রাই হয় না, আমার রুই না ভাজিলে গন্ধ সেথায় নাহি ঢালে, তাই ভাপাও লাগেনা ভালো, মালাইকারি করা যায়না, নারকেলের সাথে আড়ি, উদিত নারায়ণ কীর্তন গাইতে পারে না। কিন্তু সবথেকে যা পারে, তা হলো নাকে নথ লাগিয়ে সিঁদুর পরে সম্বন্ধ করতে। যা চিংড়ি পারেনা পোকা বলে। তাত্ত্বিকের তত্ব কিন্তু বিয়ের আয়োজনের তত্বে চুপ করে থাকে। ডালায় সে সেজে ওঠে সুন্দরী হয়ে। আর রাজ্ করে লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে। সবাইকে স্পেশালিস্ট হতে হয় না জীবনে। কিছু থাকে যাদের রোজকার ডালভাতে দরকার লাগে। তাই আজও রোজ বলিআই লাভ ইউ রোহিতা।

~~~^^^~~~

©️অর্ক ভট্টাচার্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.