স্কুলের পোশাকে ছবি

Childhood, Friends, বাংলা

ফেসবুক একটা গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। আমরা যে শহরেই থাকি না কেন, ফেসবুকের মাধ্যমে আমরা আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখি, বন্ধুদের খুঁজে পাই। নিত্যনতুন বন্ধুদের সাথেও আলাপ পরিচয় হয়। ধরুন, আমি আপনাকে চিনি না, কিন্তু আমার ননদের বন্ধুটি আপনার পিসতুতো বোন। ননদের বন্ধুর বাড়ি আসার সুবাদে, আপনি আমার বাচ্চার কিছু ছবি আর ভিডিও দেখলেন। আপনার ভালো লাগল, আপনি আমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠালেন, আমি এক্সেপ্ট করে নিলাম, কিন্তু কখনোই আপনার সাথে আমার পরিচিতি নেই।

আবার শুধুমাত্র ফেসবুকের দৌলতেই বিভিন্ন গ্রুপের মিটে আমার আপনার আলাপ হল। শুধুই আলাপ। বাড়ি ফিরে আপনি একটা রিকুয়েস্ট পাঠালেন, আমি এক্সেপ্ট করে নিলাম।

সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা আমাদের প্রায় সমস্ত পাওয়া, সমস্ত ঘটনা শেয়ার করি। অনেকে আছেন যাঁরা না পাওয়াগুলোও শেয়ার করেন। কাজেই আপনার আমার অজান্তে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছে করলেই আপনাকে ফলো করতে পারেন। আপনি কবে, কোথায় গেছেন, কী কী করেছেন, আপনার বায়ো, আপনি কী চাকরি করেন, সমস্ত তথ্যই তার কাছে সুলভ। এবার আপনার সন্তানটি প্রথমবার স্কুলে যাচ্ছে। মা বাবা হিসাবে খুব গর্বের মুহূর্ত। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমার বাবাও একটি ছবি তুলে রেখেছিলেন, আমার স্কুলের প্রথম দিবসের। তেমনই স্কুলড্রেস পরিয়ে আপনিও একটা ছবি তুললেন। শুধু তাই নয়, সেই ছবিটা ফেসবুকে দিয়ে দিলেন। সাথে লিখে দিলেন “পান্নার স্কুলে প্রথম দিন।” সঙ্গে এটাও মনে হল, এত ভালো একটা স্কুলে পড়ছে, স্কুলের নামটা সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দিই। তাহলে, সবাই জানবে, সন্তানকে আমরা কত ভালো স্কুলেই না পড়াচ্ছি।

আপনার পোস্টে নানারকম কমেন্ট পড়ল। আপনি খুশি হয়ে গেলেন। এবার কথা হচ্ছে, যারা লাইক কমেন্ট দিলো, তাঁদের সকলকে আপনি চেনেন তো? ভালোভাবে?
স্কুলের নাম লিখে দিলে, স্কুল কত ঘন্টার হয়, সেটা বার করা কোনো কঠিন ব্যাপার না। দুদিন নজর রাখলেই আপনার বাড়ির ঠিকানা, বাচ্চাকে স্কুলে কে দিতে আসে, কে নিতে আসে সমস্ত ব্যাপারটাই খুব পরিষ্কার হয়ে যায়।

তারপরদিন কেউ স্কুলে গিয়ে বলল, আপনার বাচ্চার মা বাবার এক্সিডেন্ট হয়েছে, বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। ল্যান্ডলাইনের যুগ হলে হয়তো বাড়িতে ফোন করে কনফার্ম করা যেত, কিন্তু এই মোবাইলের যুগে স্কুল কতৃপক্ষ তো মোবাইলে ফোন করতে পারবেন না, তাঁরা জানলেন যে মোবাইল ধরবেন যাঁরা তারা হসপিটালে, ক্রিটিক্যাল। তাঁদের প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো, আপনারা গত মাসে দার্জিলিং বেড়াতে গেছিলেন, আপনার স্ত্রী/স্বামী ওমুক জায়গায় কাজ করেন, আপনি তমুক জায়গায় কাজ করেন। আরও কিছু ইনফরমেশন দিলো। এমনকি বাচ্চা এবং ফ্যামিলির ছবিও দেখিয়ে দিলো মোবাইলে।
স্কুল কতৃপক্ষ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলেন, ইনি আপনার বাড়ির লোক। তাই তো? বাচ্চাকে হয়তো তাঁরা ছেড়ে দেবেন বিশ্বাস করে।

আমি বলছি না, এমনটা হবে। আমি শুধু বলছি, এমনটা হতেই পারে। আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে এত ইনফরমেশন শেয়ার করি, যে কেউ কেবল একটু লক্ষ রাখলে আপনার হাঁড়ির খবর জেনে নেবে। আমি আপনার পিসতুতো বোনের বন্ধুর বৌদি। কিন্তু আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অন্য যে সব লোকেরা আছেন, তাঁরা কী আপনার পরিচিত? আপনার সন্তানের ছবি, পরিচয়, কোন স্কুলে কোন ক্লাসে পড়ে, এই সব ইনফরমেশন কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে আপনি ভাবতেও পারবেন না।

অনেক আদর, ভালোবাসা অনেক প্রার্থনার ফলে আমাদের জীবনে সন্তান আসে। তার ভালো আমরা সবাই চাই। কিন্তু সামান্য আনন্দের লোভে এই তথ্যগুলো ইন্টারনেটে শেয়ার করবেন না প্লিজ। দয়া করে মনে রাখুন ইন্টারনেটে একবার বেরিয়ে যাওয়া মানে সেগুলো প্রায় চিরতরে থেকে যাওয়া। একটু সাবধানী হলে যদি দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, তাহলে ক্ষতি কী?

বাচ্চাকে যত ভালো স্কুলেই পড়ান না কেন, সে কোন স্কুলে যাচ্ছে, সেই তথ্য দেবেন না ফেসবুকে। স্কুলড্রেস পরা ছবি থেকেও খুব সহজেই কোন স্কুল জানা যায়। সেইরকম ছবি দেবেন না ফেসবুকে বা ইন্সটাগ্রামে।
খুব ইচ্ছে হলে পিছনদিক ফেরা ছবি দিন, যে বাচ্চা পিঠে ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে। মা বাবা, দাদু ঠাকুমা, মাসি পিসি যেই হোক, ছবি শেয়ার করতে বিরত করুন। আমাদের বাচ্চাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তো আমাদেরই।

✍ ঋতুপর্ণা চক্রবর্তী

Leave a Reply