কোড নেম ~ প্রমিথিউস

আদতে আনাড়ি, বাংলা

লেখক ~ স্পন্দন চৌধুরি

এক

আথেন্স এয়ারপোর্টের বাইরে এসে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। মুখ দিয়ে কেবল একটা শব্দই বেরিয়ে আসতে চাইল, “বাহ!“ চারদিকে এত লোকের ছড়াছড়ি দেখে খানিকটা ঘাবড়েই গিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু, সবার আগে সমুদ্রই সামলে নিল। গলা খাঁকরে সে বলল, “যাক, তাহলে এসেই পড়লাম এই নীল সাদার দেশে।” টানা কুড়ি ঘন্টার জেট ল্যাগ, তার ওপর মেঘ কেটে গেছে। সকালের আলোয় ঝলমল করছে চারদিক। চারদিকে লোক ভর্তি, অবশ্য এর একটাই কারন, এটা গ্রীষ্মকাল, আর এসময়ই ভরা সিজন থাকে। পেছন পেছন আমি আর বর্ণালী এগিয়ে এসেছি। সমুদ্রর হাফ জ্যাকেটটা বেশ ভালোই মানিয়েছে সাদা ফ্লানেলের শার্টের উপর। তিনজনের হাতেই ট্রলি ব্যাগ, আর সমুদ্রের কাঁধে একটা বড় ডিএসএলআর ক্যামেরার ব্যাগ ঝোলানো। বর্ণালীর হাতে একটা গাইডবুক ধরা, সেখান থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “হুঁ। কিন্তু, এখানে দাঁড়িয়ে কাব্য করলে তো চলবে না, কোথাও একটা থাকার ব্যবস্থা তো করতেই হবে। স্যার তো বলে দিয়েছিলেন, আমাদের জন্য এয়ারপোর্টে লোক দাঁড়িয়ে থাকবে। সে কই?” আমি বললাম, “আরে দাঁড়া। এত তাড়াহুড়ো করিস না। স্যার যখন ডেকেছেন, নিশ্চয়ই কোনও ব্যবস্থা করে রেখেছেন। দাঁড়া, লাউঞ্জে গিয়ে দেখি কেউ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন কী না।“ সমুদ্র তাড়া লাগাল, “হ্যাঁ, চল চল। আর দেরি পোষাচ্ছে না।” বলতে বলতেই সে হাঁটা লাগিয়ে দিয়েছে লাউঞ্জের দিকে। বাধ্য হয়েই আমাদেরকেও একরকম ছুটতেই হল ওর সঙ্গে। পেছন ফিরে দেখলাম একবার। এখনও এয়ারপোর্টের নামটা দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট অক্ষরে ঐ বড় ডিসপ্লে বোর্ডটায়। আথেন্স ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ইলেফথেরিওস ভেনিজেলোস, সংক্ষেপে এ.আই.এ। সত্যিই তাহলে গ্রিসে পৌঁছেছি আমরা। আমাদের এখানে আসাটা একদমই কাকতালীয়। আমরা তিন মূর্তি, মানে, আমি, সমুদ্র, বর্ণালী একসাথেই কলেজ লাইফটা কাটিয়েছি স্কটিশচার্চে। আড্ডা, ফুর্তি প্রায় সব হরদম চলত। তবে, আমাদের তিনজনের লাইন ছিল আলাদা। আমি আর বর্ণালী কেমিস্ট্রির লোক, সমুদ্র বায়োলজির। তবু, বন্ধুত্বে ছেদ পড়েনি। আমাদের তিনজনের একত্র হওয়ার স্থান ছিল, বায়োলজির ক্লাস। আমার আর বর্ণালীর ইলেকটিভ ছিল, সমুদ্রের মেন। অবশ্য সেই ক্লাসে, রাজা সমুদ্রই থাকত। হেন জিনিস ছিল না, ব্যাটা জানত না। বুধবারের বায়োলজি ক্লাসটা করতে যাবার একটা আলাদা কারন ছিল। সেটা হল, মণিময় সেন, আমাদের এমএমসি স্যার। স্যারের ক্লাস করতে যেতাম বটে, কিন্তু, স্যার সিলেবাসের বাইরেও যে অনেক কিছু আছে, সেটা প্রতিটি মুহূর্তেই পড়ার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতেন আমাদের। স্যারের জ্ঞানের গভীরতার কাছে সমুদ্রও ডোবার বেশি কিছু ছিল না, কিন্তু সেটা ও মাইন্ড করত না কোনওকালেই। ওর কথা অনুযায়ী, “ভাই, জানার জন্য সব করতে রাজি আছি।”  স্যারও ওকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন ঐ জানার আগ্রহের জন্য। স্যারের ক্লাস করতে ঢোকার মিনিট খানেকের মধ্যেই ভুলে যেতাম সময় কত। স্যারের পড়ানোর সময় যেন স্যারের চোখদুটো জ্বলত, আর আমরা হাঁ হয়ে থাকতাম। স্যার বেরিয়ে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পরেও পড়ানোর সেই রেশটা থাকত। এহেন স্যারকে যে কলেজ আগলে আগলে রাখবে, এটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু, আমাদের ফাইনাল ইয়ারে কোনও এক অজানা কারণেই স্যার কলেজ থেকে ভি.আর.এস নিয়ে চলে গেলেন। অফিসিয়ালি জানতে পারলাম, কী একটা পারিবারিক কারনে স্যার ছুটি নিচ্ছেন, তাই আর ওঁর পক্ষে ক্লাস করানো সম্ভব হচ্ছে না। একটা ফেয়ারওয়েল হল বটে, কিন্তু সেটা স্যারের অনুপস্থিতিতেই হল। আমরা মুখ গোমড়া করেই সেই অনুষ্ঠানে গেলাম, গিয়ে দু চারটে বক্তৃতা শুনে চলে এলাম। যথারীতি আমরা গ্র্যাজুয়েট হলাম। সমুদ্র ব্যাচ টপার হল। সবাই প্রেসিডেন্সিতে এসে মাস্টার্স করছি। জীবন রোজকার মতই চলছে। এমন সময়ই হঠাৎ করে এক বিকেল বেলায় সমুদ্র ফোন করল আমাকে। উত্তেজিত কণ্ঠে সে শুরুই করল এভাবে, “ভাই, একটা কাজ করবি?” আমি তখন প্র্যাকটিক্যালের রেজাল্টগুলো লিখছিলাম। ওর করা ফোনটায় চমকেই গিয়েছিলাম। বরাবরই ও অনেকটা আবেগপ্রবণ, কিন্তু আজ যেন একটু মাত্রাছাড়াই লাগছে।  ওর গলায় এই উত্তেজনা দেখে আমি অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে? এত লাফাচ্ছিস আজকে? কী কাজ তো বল আগে।“ “আরে, আমাদের স্যার রে, মণিময় স্যার, একটু আগে আমাকে ফোন করেছিলেন। স্যারের সাথে বরাবরই ইমেলে যোগাযোগ ছিল, ভি.আর.এস. এর পরেও সেই যোগাযোগে ঘাটতি পড়েনি। কাল সকালে মেলবক্সটা চেক করতে গিয়ে দেখি, স্যার আমাকে মেল করেছিলেন। রিটার্ন মেল করার পর আমার ফোন নম্বর চেয়ে আমাকে ফোন করলেন। আমার, তোর, বাকিদের খবর নিলেন।“ সমুদ্র একটানা বলে যাচ্ছে, “উনি বললেন, উনি গ্রিসে আছেন পারিবারিক কারনে। একটা বিপদে পড়েছেন বলে আমাদের সাহায্য চান।“ এতদিন পর, স্যার আমাদের সাহায্য চাইছেন? কিন্তু বিপদ? “কীরকম বিপদ কিছু বললেন কি?” আমি খানিকটা উৎকণ্ঠিত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম। “না, সেটার ব্যাপারে বললেন যে ফোনে বলা যাবে না। দেখা হলে সব বলবেন। আমি তখন তোদের কথা বলতে এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, যে চেনা লোক হলে খুব ভালো হয়, তাতে বিপদের ঝুঁকিটা কমে। উনি আমাদের গ্রিসে আসতে বলছেন।“ আমি খানিক চুপ থেকে ভাবলাম। ব্যাপারটা কীরকম একটা রহস্যময় তো বটেই। গ্রিস? যে স্যারের খোঁজ আমরা গত দুবছরেও হাজার খুঁজে পাইনি, আজ তিনি কিনা গ্রিস থেকে আমাদের ডাকছেন? স্যার সেখানে গেলেনই বা কেন? আর আমাদেরকেই ডাকছেন কেন? মনের কোণে একটা সন্দেহ হঠাৎ করেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আচ্ছা, অনেকেই এরকম ভাবে ফেক কলের শিকার হন। এটা সেরকমই কোনও ট্র্যাপ নয় তো? আমাদের স্যারই আমাদের ডেকেছেন তো? সমুদ্রকে আমার সন্দেহটা বলতেই ও হেসে উড়িয়ে দিল। বলল, “দুর্ পাগলা, ওই কথাটা কি আর আমি ভাবিনি? স্যারের সাথে এরপর ভিডিও কলও হয়েছে। উনি আমাদের স্যারই রে, কোনও ইমপোস্টার নয়।“ যাক একটা ফাঁড়া কাটল। কিন্তু গ্রিস? সে তো এখান থেকে দুটো মহাদেশ পেরিয়ে? কীভাবে সম্ভব? আমার মনের কথাটা পড়ে নিয়েই সমুদ্র বলল, “দূর বলে ভাবছিস তো? স্যার টিকিট কেটে দিয়েছেন আমাদের তিনজনের। এখান থেকে কাতার এয়ারওয়েজের প্লেনে উঠব। একটা স্টপ মাঝখানে। তারপরই নেমে পড়ব আথেন্সে। ভিসার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন স্পেশাল পারমিশন করে। আর দুই সপ্তাহ পরেই ফ্লাইটের ডেট। যাবি তো?“ খানিকটা দোটানাতেই পড়লাম। মানছি, স্যারের প্রতি আমাদেরও কম ক্রেজ ছিল না, কিন্তু তাই বলে সুদূর গ্রিস? খানিকটা মশা মারতে কামান দাগার মত হয়ে যাচ্ছে না? যাব, না যাব না, এর মধ্যেই খানিক দুললাম। শেষে সমুদ্রর জোরাজুরিতেই নিমরাজি হয়ে গেলাম। এখন মনে হচ্ছিল, ভাগ্যিস হয়েছিলাম। গ্রিস যাবার সুযোগ কি আর জীবনে বারবার আসে? “ঠিক আছে। আমি যাব। তার আগে একবার বাড়িতে বলে রাজি করাই।“ আমি ভেবেচিন্তে বললাম। “হুররে… তাহলে আমাদের তিন জনের যাওয়া হচ্ছেই নীল সাদার দেশে…” সমুদ্র নেচেই উঠল প্রায়। “এক মিনিট। বললি তিনজনের টিকিট। তুই একটা, আমি একটা। অন্যজন তবে কি…” বলতে বলতেই বুঝতে পারলাম, কে আমাদের সাথে যাচ্ছে। মিচকি হাসতে হাসতে বললাম, ”ওরে ব্যাটা, ভালই আছিস তাহলে, বেশ মজাতেই যাবি, কী বল।“ বলাই বাহুল্য, তৃতীয় ব্যক্তিটি বর্ণালী, যে সমুদ্রর বান্ধবী গত চার বছর ধরে, এবং সমুদ্র যার জন্য বোধহয় সাত সমুদ্র তেরো নদীও পেরোতে রাজি আছে। এবং অবশ্যই তার কথাই সমুদ্র বলেছে স্যারকে। ওপার থেকে সমুদ্রর অট্টহাসি কানে এল। “ওর বাড়িতে বলে রাজি করাতে হবে। তোর সাথে একা ছাড়বে বলে তো মনে হয় না।“ আমি হাসতে হাসতে বললাম। জানতাম, এই ডেলিভারিটা সামলানো ওর পক্ষে শক্ত হবে। হলও তাই। “ও হ্যাঁ। তাও তো বটে… আরে, সেইজন্য তো তুই আছিস। একটু ম্যানেজ করিয়ে দে না বাবা।“ সমুদ্র কাতর অনুরোধ করা শুরু করল। “কাকু আর ওর বাবা তো এক অফিসে চাকরি করে, দেখনা বলে যদি রাজি করানো যায়।“ আমি মনে মনে মুচকি হাসলাম। পরে এই বাবদ সমুদ্রের ঘাড় ভেঙে বেশ কয়েকটা সিনেমা দেখার সুযোগ মিলবে, বুঝে গেলাম। তারপরের দুই সপ্তাহের বর্ণনা আর দিলাম না, বললে মহাভারত হয়ে যাবে। শেষমেশ কালকে বেরিয়ে তিনজনে ট্যাক্সি ধরে হাজির হলাম দমদমে। কাতার এয়ারওয়েজের সাদার ওপর লালে লেখা প্লেনটা যেন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। বলা বাহুল্য, স্যার আমাদের প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমাদের পাসপোর্ট ছিলই আগে থেকে। তাই ভিসাতেও সেরকম ঝামেলা হল না, স্পেশাল পারমিশনের জন্য। প্লেনটা দাঁড়িয়েছিল মাঝখানে হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। একটাই স্টপ মাঝখানে। তারপর প্লেনটা যখন গ্রিসের কাছাকাছি চলে এসেছে, আকাশ থেকেই দেখছিলাম, গ্রিসের সৌন্দর্যটা। রীতিমত অপূর্ব দ্বীপরাষ্ট্র একটা। তিন হাজারের ওপরে দ্বীপ শুধু। মাঝখানে ইজিয়ান সাগর। অপূর্ব। মুখ থেকে শুধু এই একটা কথাই বেরিয়ে আসে। আলাদা একটা রোমাঞ্চ লাগছিল। প্রথম আধুনিক সভ্যতার জন্ম বোধ করি গ্রিস আর রোম থেকেই। আর সেদেশেই আমরা চলেছি, একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। যাই হোক, লাউঞ্জে ঢুকতেই দেখি, এক সোনালি চুল, অলিভ রঙের এক দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবক আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন হাতে লেখা লাল প্ল্যাকার্ড হাতে, ‘সমুদ্র বিশ্বাস’ বলে। বুঝলাম, উনিই আমাদের রিসিভ করতে এসেছেন। সমুদ্র হাতটা বাড়াল করমর্দনের জন্য। যুবক প্রত্যুত্তরে পাল্টা করমর্দন করল। তারপর স্পষ্ট ইংরাজিতে জিজ্ঞাসা করল, “আপনারাই কি সমুদ্র বিশ্বাস এবং তাদের বন্ধু?” “হ্যাঁ।“ সমুদ্র উত্তর দেয়। “এনারা আমার বন্ধু, অয়ন চৌধুরী, আর বর্ণালী ব্যানার্জি।“ “আসুন। মিঃ সেন আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন। এখান থেকে মোটামুটি চল্লিশ কিলোমিটার দূরে ওঁর বাগান বাড়ি, ওখানেই আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আপনাদের আর কষ্ট করে হোটেলে যেতে হবে না।“ যুবক হেসে বলে, “আমার নাম ক্রিস্টোফার, আপনারা আমাকে ক্রিস বলেও ডাকতে পারেন।“ আমি হেসে জিজ্ঞাসা করি, “আচ্ছা ক্রিস, কিছু মনে কর না, তোমার বয়স কত?” ক্রিস পাল্টা হেসে উত্তর দেয়, “এবছর তেইশে পড়ব।“ বুঝলাম, ক্রিস আমাদেরই সমবয়সী। আমি তখন অন্য প্রসঙ্গে গেলাম, “আচ্ছা ক্রিস, মিঃ সেনের তুমি কী কাজ কর?” ক্রিস উত্তর দেয়, “বলতে পারেন, আমি ওঁর হেল্পিং হ্যান্ড। আসলে, বাবা-ই মিঃ সেনের সেক্রেটারি ছিলেন, কিন্তু গত বছর থেকে পার্কিনসন রোগ ধরা পড়ার পর একদম কাজ করতে পারেন না। ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছি, বাবাই আমার সব বলতে পারেন। তাই আমিই এখন ঐ কাজটা করি। এমনিতে আমি আর্টসে গ্র্যাজুয়েট। পার্টটাইম গাইডের কাজও করি এখানে ওখানে।“ ক্রিসের কথা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, যাক, এই ভিনদেশে অন্তত রাস্তা হারানোর ভয়টা আর থাকল না আমাদের। কিন্তু, স্যারের এখানে বাগানবাড়ি আছে? স্যার তাহলে এখানে কতদিন হল বাস করছেন? বর্ণালীই প্রশ্নটা করল, “আচ্ছা ক্রিস, মিঃ সেন কি বরাবরই এখানে থাকতেন?” ক্রিস খানিক ভেবে বলল, “না। আসলে বাবার মুখে শুনেছি, এখানে মিঃ সেন এককালে একটা বাগানবাড়ি কিনেছিলেন। তখন এখানেই উনি পড়াতেন ইউনিভার্সিটিতে। বাগানবাড়িটা থাকা আর গবেষণার জন্যই কেনা। তারপর উনি বিয়ে করেন। একটি মেয়েও হয়। কিন্তু, তারপরই ওঁর জীবনে একটা বড় ট্র্যাজেডি নেমে আসে।“ ক্রিস থেমে যায়। আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করি, “কী ট্র্যাজেডি, ক্রিস?” ক্রিস খানিকটা দ্বিধায় পড়েছে, সেটা ওর মুখচোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। হয়ত ঘরের কথা বাইরের তিনজনকে বলে ফেলেছে বলেই তার এই অস্বস্তি।  তাই সমুদ্র ক্রিসের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, “খুব গোপন কথা কি? তাহলে বলার দরকার নেই।“ ক্রিস তাড়াতাড়ি বলে , “না না, গোপন করার কিছু নয়। আসলে বাবার মুখে শুনেছি, ওঁর মেয়ের যখন দুইমাস বয়স, তখন কী এক অ্যাকসিডেন্টে মেয়েটা মারা যায়। ওঁর স্ত্রী এই আঘাত সহ্য করতে পারেননি। উনিও মাসখানেকের মধ্যেই মারা যান। তারপর মিঃ সেন একজন মেয়েকে দত্তক নেন। বছর ছয়েক এখানে মেয়ের সাথে ছিলেনও। কিন্তু, এখানকার স্মৃতি বোধহয় ওঁকে খুব কষ্ট দিত। তাই বছরে একবারই আসতেন এখানে। আমার বাবা তখন এই বাড়ি পাহারা দিত, কেয়ারটেকারের কাজ করত। আর যে মেয়েটাকে উনি দত্তক নিয়েছিলেন, সে এখানে বোর্ডিং স্কুলে পড়ত। এখন তার বয়স ২০। কিন্তু…” ক্রিস একবার আমাদের সবার মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে নেয়, “আপনারা কি সেই ব্যাপারেই এসেছেন?” আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। স্যার একটা বিপদে পড়েছেন বলেছিলেন, কিন্তু কী সেই বিপদ, সেটা আর খুলে বলেননি। আমিই তাই শেষমেশ বললাম, “না তো ক্রিস, এব্যাপারে স্যার আমাদের কিছু বলেননি। কেন, কিছু হয়েছে? স্যারের মেয়ে কি এখন ওঁর সাথে থাকে না?” “সেটা নয়, মিঃ চৌধুরী।“ ক্রিস বিষণ্ণ হয়ে জবাব দেয়, “আসলে মিঃ সেনের মেয়ে গত দু সপ্তাহ ধরেই নিখোঁজ। আরও ভাল করে বললে, কিডন্যাপড।“ ধাক্কাটা জোরে লাগে। স্যারের মেয়ে নিখোঁজ? “নিখোঁজ? মানে সিরিয়াসলি খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না?” সমুদ্র জিজ্ঞেস করে। “হ্যাঁ, সত্যিই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।” ক্রিস মাথা নাড়তে নাড়তে বলে। আমরা ততক্ষণে পার্কিং লটে ঢুকছি। সামনেই একটা কালো রঙের সেডান দাঁড়িয়ে। ক্রিস পকেট থেকে চাবিটা বার করে ইলেকট্রনিক কি টিপতেই দুবার আলো জ্বলল ইনডিকেটরের। তারপরই গাড়ির দরজা খুলে গেল। “কতদিন হয়েছে এটা বললে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। ক্রিস গাড়িতে স্টার্ট দিল। গাড়িটা বার করে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বেরোল রাস্তায়। তারপর মুখ খুলল, “পনেরো দিন, সঠিক ভাবে বললে। সেদিন মিস সেন বাড়িতেই ছিলেন, কী একটা কারনে আর্টস কলেজে ক্লাস হয়নি বলে। তারপর বিকেলের দিকে একটা কল আসে বাড়িতে। মিঃ সেন তখন কী একটা কাজে গিয়েছিলেন সি বিচের দিকে। মিস সেন কলটা ধরেন। ওপাশ থেকে ওঁকে কেউ বলেছিল, যে মিঃ সেনের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে উনি বেরিয়ে যান, আর আমাকে লোকাল পুলিশে ইনফর্ম করতে বলেন। আমি লোকাল পুলিশে জানিয়ে গাড়িটা নিয়ে ওঁর খোঁজে বেরব ভাবছি, দেখি মিঃ সেন অক্ষত বাড়ি ঢুকছেন, অথচ মিস সেন নেই। পরে ওঁর ফোনে অনেকবার কল করা হয়েছে, বারবারই সুইচ অফ আসছে। পরে কলটা ট্রেস করতে গিয়ে জানা যায়, লোকাল এসটিডি বুথ থেকে করা কল। ট্রেস করা যায়নি, কে কলটা করেছিল, এমনিও যা ভিড়ের সময় এখন, এত ভিড়ে মানুষের মুখ মনে রাখাও দুষ্কর।“ ক্রিস স্বগতোক্তি করে। গাড়িটা ততক্ষণে শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছাপিয়ে এগোচ্ছে ক্রমশ বিচের দিকে, কারন সমুদ্রের নোনা হাওয়া নাকে আসছিল। চারদিকে মাইলের পর মাইল সবুজ জমি, আর দূরে পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে সময়ের দ্বাররক্ষক হয়ে। সমুদ্র তখন জিজ্ঞেস করে, “ পুলিশ এনকোয়ারি হয়েছিল?” “হ্যাঁ, পুলিশ খানিকটা জোর করেই শুরু করেছিল। আসলে মিঃ সেন প্রথমটা চাইছিলেন না পুলিশ তদন্ত হোক। উনি বলছিলেন, হয়ত মেয়েটা প্র্যাঙ্ক করছে, কোনও বন্ধুর বাড়িতে গিয়েই বসে আছে। এক দুদিন কাটিয়েই বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু, পুলিশ তো ওসব শুনবে না, তাই তারা নিজেরাই তদন্ত শুরু করে। আমরাও অবাক হয়েছিলাম, ওঁর এই প্রথমে না না করা নিয়ে। পরে ভাবলাম, হয়ত, মানসিক সুস্থিতি ছিল না বলেই ওরকম করছিলেন।“ “আর এখন? এখন উনি কেমন আছেন?” “খুব ভাল নেই। সম্প্রতি হাইপারটেনশন ধরেছে ওঁকে, তাই আমরাও খানিকটা চিন্তিত। এই বয়সে এত বেশি চিন্তা, ওঁর শরীরের পক্ষে খারাপই।” ক্রিস ভ্রূ কুঁচকে কথাটা বলে। অ্যাথেন্সের হাইওয়েগুলো চমৎকার, তা বলতেই হয়। গাড়ি আশির ওপর স্পিডে চলছে, তবু কোথাও কোনও অ্যাকসিডেন্ট হবার ভয় নেই। আমাদের দেশে সাইড নেবার বা ওভারটেক করার জন্য ড্রাইভারগুলো যে অকারণে হর্ন বাজিয়ে সময়টা নষ্ট করে, এখানে তার বিন্দুমাত্রও চোখে পড়ল না। সবাই নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়িতে আসতে আসতে ভাবছিলাম যে দেশে এসেছি, তার কথা, গ্রিসের কথা। বর্তমান গ্রিকদের পূর্বপুরুষ হচ্ছে এক সময়ের পৃথিবী বিজয়ী প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা, বাইজানটাইন সাম্রাজ্য এবং প্রায় ৪ শতাব্দীর অটোমান সাম্রাজ্য। গ্রিস সেই দেশ, যা প্রথম বিশ্বের সমস্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের আঁতুড়ঘর এবং প্রথম গণতন্ত্রের সূচনাও এখানে। গ্রিসের কম অবদান নেই, আজকের এই মানবসভ্যতা গড়ে তোলার জন্য।  দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাসচর্চা, নাটক, অলিম্পিক গেমস, গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, রাজনীতি এবং জিওমেট্রি… কী দেয়নি গ্রিস? অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটো, হেরোডোটাসের গ্রিস… সেই গ্রিসের মাটিতে আজ দাঁড়িয়ে আমরা। ভাবতে ভাবতে মশগুলও হয়ে গিয়েছিলাম। মিনিট ত্রিশের বেশি লাগল না, গাড়ি এসে দাঁড়াল স্যারের বাগানবাড়ির সামনে। সুন্দর সুন্দর লাল, হলুদ ফুলের বাগানে ভর্তি চারদিক। মাঝে মধ্যেই বড় বড় সাইপ্রাস আর সিডার গাছ। যেহেতু পার্বত্য এলাকা, তাই মাটিটা অল্প পাথুরে। মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পাতাগুলো সরসর করে নড়ছে। দুপুরের এই মৃদু বাতাস বেশ ভালই লাগত, যদি না এই খারাপ খবরগুলো আগে শুনতাম। সত্যি তো, আমরা স্যার স্যার করে পাগল, অথচ একটিবারের জন্যও স্যার নিজের ব্যক্তিগত জীবনে কী বিশাল ঝড় লুকিয়ে রেখে আমাদের সামনে হাসতেন, সেটা জানার চেষ্টা করিনি। সত্যি, নিজের ওপর তখন খুব রাগ হচ্ছিল। কত কষ্ট, দুঃখ পেলে মানুষ এত সুন্দর, এত মনোরম একটা জায়গাকে ফেলে চলে আসতে পারে, সেটা বুঝতে পারছিলাম। আমরা গাড়ি থেকে নামতে নামতেই দেখলাম, স্যার নিজেই চলে এসেছেন গাড়ির সামনে। আমরা ওনাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলেন। কালের নিয়মে সময় হয়ত অনেক বয়ে গিয়েছে, কিন্তু স্যার একই থেকে গিয়েছেন। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার পেছন থেকে উজ্জ্বল চোখদুটো ওঁর বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয় দিচ্ছিল। চুলে অল্প পাক ধরেছে রগের কাছে, মুখে অল্প বলিরেখা এসেছে, তবু সেই হাসিটা অমলিন এখনও। আমাদেরকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়েলকাম টু গ্রিস। আসতে কোনও কষ্ট হয়নি তো?” আমরা সমস্বরে “না, স্যার।“ বলতেই স্যার হাসলেন। তারপর বললেন, “যেটা দেখছ, সেটা আসলে আমার টেম্পোরারি এমব্যাসি এই দেশে। ক্রিসের বাবা জুলিয়াসই প্রথম এই বাড়িটার খোঁজ দিয়েছিল। আজ থেকে বিশ একুশ বছর আগে তখন বাড়িটা জলের দরে কিনে নিয়েছিলাম। সুন্দর, তাই না? এখান থেকে ঢিল ছুঁড়লেই বোধহয় ইজিয়ান সাগরে গিয়ে পড়বে।“ আমরা চারদিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। চারদিকে পাহাড়ের সারি, সবুজ আর বাদামিতে ঢেকে রয়েছে সেইগুলো। আকাশে মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে পেঁজা তুলো হয়ে। স্যার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, “এই দেখ, আমারই দোষ। তোমরা এত লম্বা একটা ট্রিপ দিয়ে এলে এই দেশে, আর কিনা আমি তোমাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছি গেটে। এস এস, আগে রেস্ট নাও। তারপরের কাজ তারপর। ঝিনুককে পরেও খুঁজে বের করা যাবে। তোমরা আগে রেস্ট নাও।“ সত্যিই তখন পা চলছিল না। ভদ্রতার খাতিরে সমুদ্র না, না করার একটা চেষ্টা করেছিল, কিন্তু স্যার শুনলেনই না। একরকম জোর করেই নিয়ে গেলেন আমাদের। বাগানবাড়ির পাশেই আউটহাউসটাতে আমাদের জায়গা হল। আমি আর সমুদ্র একটা ঘরে, বর্ণালী পাশের ঘরটায়।  আউটহাউসটা আকারে এতটাই বড়, যে ওতে স্বচ্ছন্দে দশ-পনেরোজন মানুষের জায়গা হয়ে যাবে হেসে খেলে। নরম বিছানায় মাথা পড়তেই আর কোনও চিন্তা মাথায় এল না। সারাদিনের প্লেন জার্নির সমস্ত ক্লান্তি একসাথে নেমে এল চোখে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, ঠিক ছিল না, কিন্তু হঠাৎ করেই কানের কাছে একটা খোঁচা খেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। দেখি, সমুদ্র টোকা মেরে মুচকি মুচকি হাসছে। “কী রে, কী হয়েছে? দুম করে ঘুম ভাঙ্গালি কেন?” আমি রেগে গিয়েই জানতে চাইলাম। “ভাঙ্গাব না? কী করতে এদেশে এসেছিস? কটা বাজে, খেয়াল আছে?” “কেন? কটা বাজে?” আমি ঘুমচোখেই জানতে চাইলাম। “প্লেন ধরেছিস দুপুর দুটোয়, এখানে পৌঁছেছিস সকাল সাড়ে আটটায়। এখন ভারতীয় সময় অনুযায়ী বিকেল পাঁচটা পনেরো। গ্রিসের সময় অনুযায়ী কত হিসাব করতে হবে।“ সমুদ্র আঙুল গুনতে গুনতে বলল। “কীরে কুম্ভকর্ণ, ঘর থেকে বেরোবি না নাকি? নাকি ক্রিসকে ডেকে আনতে হবে তোকে তোলার জন্য?” মাথাটা ধরে গিয়েছিল অল্প। উঠে বসলাম একটা হাই তুলে। সত্যি এই জেটল্যাগ একটা বড় সমস্যা। এসব ভাবতে না ভাবতেই সামনে ক্রিসের লম্বা চেহারাটা এসে দাঁড়াল। ক্রিস? ক্রিস এল কোথা থেকে এর মধ্যে? আমার মুখ দেখেই হয়ত সে আমার প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছিল, তাই সে হেসে বলল, “গুড আফটারনুন, মিঃ চৌধুরী। আশা করি জেটল্যাগ কেটে গিয়েছে। আমি আসলে এই করিডর বরাবর গেলে তিন নম্বর ঘর যেটা আছে, ওখানেই থাকি। বাবা আর আমি এই আউটহাউসেই থাকি।“ দেখলাম, ক্রিসের হাতে, দু প্লেট খাবার। আলুভাজার মত দেখতে, সাথে সস। জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, ক্রিস, এটা কি আজকের লাঞ্চ?” ক্রিস মাথা নেড়ে বলল। “গ্রিসের স্পেশাল ডিশ। ফ্রায়েড জুকিনি আর অ্যাভিওলি সস। এইমাত্র বানিয়ে আনলাম। খেয়ে দেখুন, দুর্দান্ত লাগবে। সাথে মুসাকাও আনছি, দাঁড়ান। মিস ব্যানার্জি এলে আমাকে একবার বলবেন, সার্ভ করে দেব। আপাতত আপনারা খান।“ আমি আর সমুদ্র মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। মুসাকা? সেটা কী? যতদূর জানতাম, কলার বিজ্ঞানসম্মত নাম মুসাকা। তবে কি ও কলা আনতে যাচ্ছে? জিজ্ঞেস করতে ক্রিস হেসেই ফেলল। তারপর বলল, “সত্যি, আপনারা পারেনও বটে। না, এটা কলা নয়। মুসাকা আসলে একটা মাটির হাঁড়িতে বেকড করে বানানো একটা ডিশ। ভেতরে কুচো করে মাংস, আলু আর জুকিনি দেওয়া। ওপরে মোটা চিজ দেওয়া। খেয়েই দেখুন না।“ ক্রিসের কথায় খেয়ে দেখলাম। জুকিনিটা খানিকটা ঝিঙের মত লাগল খেতে। আর অ্যাভিওলি সসটা পুরো মেয়োনিজের মত খেতে লাগল। তবে সবথেকে ভাল লাগল মুসাকা। সত্যি, অপূর্ব খেতে। খেতে খেতেই সমুদ্র কী একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ক্রিস, তুমি বলছিলে, তোমার বাবা এখানেই, মানে আউটহাউসে থাকেন। তো, ওঁর সাথে কি এখন দেখা করা যাবে?” ক্রিস উৎফুল্ল হয়ে বলল, “হ্যাঁ, কেন নয়। আসুন না। আচ্ছা, ভাল কথা, মিস ব্যানার্জির পার্সটা নিয়ে এখনও কোন খবর পাইনি। পেলে নিশ্চয়ই জানিয়ে দেব। মিঃ সেনের সাথে পুলিশের ভালই যোগাযোগ আছে, কাজেই আশা করি সেটা পেতে খুব অসুবিধা হবে না।“ আমি চমকে উঠে বসলাম। সমুদ্র দেখলাম, মাথা নাড়ছে। তারপর ক্রিসকে খানিকটা গম্ভীর হয়েই বলল, “পাওয়া গেলেই ভাল। আসলে চোর যে এখানেও থাকে, সেটা বোঝা উচিৎ ছিল।“ আমি দেখলাম, ক্রিস বেশ লজ্জিতই হয়েছে। খানিকটা আমতা আমতা করেই বলল, “কী আর করব বলুন। চোর সব দেশেই থাকে। আমাদের দেশেই বোধহয় তাদের বিড়ম্বনাটা একটু বেশি। ওসব ছাড়ুন, আপনারা আগে ফ্রেশ হয়ে নিন। তারপর চলে আসুন আমাদের ঘরে। আমি ততক্ষণ বাবাকে জাগাই। বেশ বেলা হয়েও গেছে।“ এই বলে সে দরজার দিকে এগোল। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বর্ণালী এসে ঢুকল ঘরে। মুখ চোখ লাল, সদ্য রোদে পুড়ে এসেছে যেন। ঢুকেই একটা চেয়ারে বসে বলল, “এক গ্লাস জল দে রে অয়ন। এই চোরের থেকে যদি না আমি আমার ব্যাগ উদ্ধার করেছি তো দেখ…” আমি বললাম, “কী হয়েছে বলত? তোর কি ব্যাগ চুরি গেছে?” বর্ণালী উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগল, “আর বলিস কেন? আসলে অজানা, অচেনা জায়গা। তাই বেশি ঘুমও হয়নি। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে সমুদ্রকে নিয়ে একটু গিয়েছিলাম কাছাকাছি ঘুরতে। তুই ঘুমোচ্ছিস দেখে আমরা আর তোকে ডিস্টার্ব করিনি। ক্রিস গিয়েছিল সাথে গাইড হিসাবে। এবার বাসের মধ্যেই  পার্সটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোন এক স্টপেজ থেকে চোরটা উঠেছিল খেয়াল করিনি। ভিড় বাসের মধ্যেই হাতে একটা ঝটকা টান। কিছু বোঝার আগেই দেখি পার্সটা নেই। সঙ্গে সঙ্গেই গোলমাল শুরু করে দিই, আর দেখি, ভিড় বাস থেকে একটা লোক নেমে রাস্তা দিয়ে ছুটতে শুরু করে দিয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা হাওয়া।“ “যাই হোক, এই ফিরলাম পুলিশ ষ্টেশন থেকে। আশা করি, স্যারের কথা আর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যাটাকে ধরা যাবে।“ সে বলে। আমি খানিকটা উত্তেজিত হয়েই বললাম, “ব্যাগে কি দামি কিছু ছিল?” বর্ণালী ভেবে বলল, “নাহ, সেরকম কিছু না। দু-চারশ টাকা। আর কিছু কাগজ…সেরকম দামি না। তবে যাই হোক, পার্সটা আমার কাছে খুব দামি।“ বলেই সে তাকাল সমুদ্রের দিকে করুণ দৃষ্টিতে। বুঝলাম, পার্সটা সমুদ্রেরই দেওয়া। দেখলাম, সমুদ্র মাথা নেড়ে বলল, “আমরা এই শহরে নতুন, কিছুই জানি না। ছাড় বাদ দে, পেলে পাব, না পেলে না পাব। মন খারাপ করিস না, কলকাতায় ফিরলে আরেকটা কিনে দেব তোকে।“ বর্ণালীর মুখ থেকে মনমরা ভাবটা তাও গেল না।

দুই

ক্রিসের বাবা, মিঃ জুলিয়াস রস এর অবস্থা বেশ জর্জরিত। পার্কিনসন্স বেশ ভালভাবেই গেড়ে বসেছে ওঁর শরীরে। যাই হোক, ওষুধের প্রভাবে অনেকটাই সুস্থ এখন। বয়স পঞ্চান্ন ছাড়ালেও চেহারাটা খুব ভেঙ্গে পড়েনি। আমাদের দেখে প্রথমটা চিনতে পারেননি। পরে ক্রিস আমাদের সাথে ওঁর আলাপ করিয়ে দিতেই ওঁর মুখে হাসি ফুটল। ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে বললেন, “আচ্ছা, তাহলে তোমরা এখানে এসেছ ম্যাডামকে ফিরিয়ে দিতে, তাই তো?” আমি মাথা চুলকে বললাম, “খানিকটা তো তাই। তবে এই ব্যাপারে স্যারের সাথে খুব একটা কথা বলা হয়নি। সেটা বলা দরকার। তাহলে হয়ত বোঝা যাবে স্যারের মেয়েকে ফিরে পাওয়া যাবে কিনা।“ বর্ণালী এই সময় প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপনার কাছে ঝিনুকের ছবি আছে? না মানে, আসলে আমরা কেউই তার ছবি দেখিনি, কাজেই চিনি না তাকে।“ জুলিয়াস তখন তাকাল ক্রিসের দিকে। ক্রিস সঙ্গে সঙ্গেই আমাদেরকে বলল, “দাঁড়ান। রিসেন্ট ঝিনুকের জন্মদিন গিয়েছে। তাই ছবি তোলা হয়েছিল। আমার ফোনেও সেই ছবি আছে। এই দেখুন।“ ক্রিস পকেট থেকে একটা ফোন বার করে, বারদুয়েক খুটখাট করে তার ফোনসুদ্ধু হাত বাড়িয়ে ধরল আমাদের দিকে। আমরা তাকিয়ে দেখলাম সেই ছবিটা। দেখলাম, স্যারের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি মেয়ে, হাতে কেক কাটার ছুরি। খুব সম্ভবত বার্থডে কেক কেটে উঠে ছবির জন্য পোজ দিয়েছে সে। বর্ণনায় যাব না সেই মেয়ের। শুধু অপূর্ব সুন্দরী বললেও কম বলা হবে ঝিনুককে। লম্বা, ফর্সা, কালো রঙের চুল। চওড়া কপাল, আর উজ্জ্বল বাদামি দুই চোখ। লম্বায় প্রায় স্যারেরই সমান সে। জুলিয়াস বলল, “দেখুন না, যদি ঝিনুক ম্যামকে আপনারা খুঁজে আনতে পারেন।“ আমরা তখনও বোধ হয় তখনও ঘোরে ছিলাম। তবু এর মধ্যেই আমি কোনমতে আমার ভাষা খুঁজে পেলাম। বললাম, “অবশ্যই, মিঃ জুলিয়াস। আমরা ঠিক খুঁজে আনব ঝিনুককে।“ জুলিয়াসের ঘর থেকে বেরিয়ে বর্ণালী প্রশ্ন করল, “বলে তো এলি, পারবি, কিন্তু শুরু করবি কোথা থেকে?” “সবার আগে স্যারের সাথে কথা বলা দরকার। উনিই আমাদের সবথেকে বেশি সাহায্য করতে পারেন।“ আমি বললাম। “কেনই বা এই অপহরণ, আর কীই বা তার লক্ষ্য এটা স্যার ছাড়া আর কেউ বলতে পারবেন না।“ সমুদ্র আর বর্ণালী দুজনেই মাথা নাড়ল। সমুদ্র বলল, “ঠিক বলেছিস। চল স্যার কোথায় খুঁজে বার করা যাক।“ “তার দরকার বোধহয় হবে না।“ গুরুগম্ভীর স্বরে চমকে উঠেছিলাম আমরা তিনজনেই। দেখি, স্যার এসে দাঁড়িয়েছেন করিডরের সামনে, আর মিটিমিটি হাসছেন। কখন এলেন উনি? স্যার যেন আমার মনের কথাটা পড়ে নিয়েই বললেন, “আসলে তোমাদের কথাই ভাবছিলাম। তার ওপর বর্ণালীর পার্স চুরি। তাই খানিকটা টেনশনই হচ্ছিল। ভাবলাম, তোমাদের কাছেই আসি, এই কদিন ধরে যা চলছে, সব বলে হালকা হই। তোমাদের ঘরেই যাচ্ছিলাম, তারপর দেখি, তোমরা জুলিয়াসের ঘর থেকে বেরোচ্ছ। চল, এই ব্যাপারে ডাইনিংরুমে কথা হোক।“ আমি বললাম, “হ্যাঁ চলুন। যাওয়া যাক।“ স্যারের পেছন পেছন এসে ডাইনিং রুমে ঢুকলাম। জায়গাটা বেশ বড়। একটা সেন্টার টেবিলের চারপাশে বারোটা চেয়ার, আর চেয়ারগুলোর গায়ে কাঠের কাজ দেখে পবাক হয়ে যেতে হয় শুধু। ঘরটার দেওয়ালগুলো নিরাভরণ, কিন্তু দামি ওয়ালপেপার লাগানো। শুধু একটা দেওয়ালে একজন ভদ্রমহিলার ছবি লাগানো। দেখলাম, ঘরে ঢোকা থেকেই স্যার একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন ছবিটার দিকে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ওঁর মুখের সঙ্গে ঝিনুকের মুখশ্রীর আশ্চর্য মিল। সেই এক নাক, সেই এক চোখের রং, এক চওড়া কপাল, এবং একই রকম ফর্সা। আমি বললাম, “স্যার, উনি কি..” স্যার খানিকক্ষণ সময় নিলেন উত্তর দেবার জন্য। তারপর যখন উত্তর দিলেন, দেখলাম, ওঁর গলা ধরে গিয়েছে। উনি থেমে থেমে উত্তর দিলেন, “উনি আমার স্ত্রী। বহুদিন আগেই গত হয়েছেন।“ আমি ভীষণ লজ্জিত হয়ে বললাম, “সরি স্যার। না জেনে অনেক আঘাত দিয়ে ফেললাম।“ স্যার আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ না না, ঠিক আছে। আফটার অল, সে তো আর ফিরে আসবে না। আঘাত লাগার প্রশ্ন নেই। বল, তোমাদের কী কী জিজ্ঞাস্য আছে। আমি যতটা সম্ভব উত্তর দেবার চেষ্টা করব।“ তারপর স্যার বসলেন টেবিলের লাগোয়া একটা চেয়ারে। আমরাও খানিক ইতস্তত করে বসলাম পাশের চেয়ারগুলোয়। খানিকক্ষণ কীভাবে শুরু করব বুঝতে বুঝতেই কেটে গেল। আসলে, এই রকম কাজ আমাদের জীবনেও প্রথম, আর আমরা কেউই পুলিশ বা ডিটেকটিভের কাজ করিনি। তাই… অবশ্য প্রথম প্রশ্নটা সমুদ্রই করল, “আচ্ছা স্যার, ঝিনুক কি আপনার দত্তক কন্যা?” স্যার দেখলাম, উত্তর দিতে একটু দেরি করলেন। তারপরই বললেন, “হ্যাঁ এবং না। দত্তক হলেও আমার নিজের মেয়ে সে। তার সমস্ত দায়দায়িত্ব আমার ওপরেই বর্তায়।“ “মাফ করবেন, এর পরের প্রশ্নটা একটু ব্যক্তিগত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, কেন দত্তক নিলেন স্যার?” স্যার খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর উত্তরটা দিলেন শান্তভাবেই, “কারণ আমার মেয়ে একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। আমার স্ত্রীও তার পরপরই চলে যান। তাই দুঃখ ভুলতে ওকে আমি দত্তক নিই।“ আমি তখন প্রশ্ন করলাম। “আচ্ছা স্যার, এই কাজটা কে করেছে, আপনার কি কোনও ধারনা আছে? ভাল করে ভেবে বলুন, আপনার কি এমন কেউ শত্রু আছে, যে আপনার খুব বড় একটা সর্বনাশ করতে চায়?” যেটা এতক্ষণ দেখিনি, সেটা এখন দেখলাম। স্যারের চোখেমুখে একটা ছাইচাপা আগুনের বহ্নি। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, ঠোঁট কাঁপছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন যেন। তারপর বললেন, “আছে একজন। কিন্তু সে জানিনা এখন কোথায় আছে, বা কী অবস্থায় আছে। শেষ জানতাম, সে জার্মানিতে একটা জেলে পচছে, গুপ্তচরবৃত্তি আর খুনের অভিযোগে। শেষ শুনেছিলাম, যে সে জেল ভেঙে বেরিয়েছে। তারপর আর তার কোনও খবর নেই আমার কাছে। যদি আমার কেউ ক্ষতি করতে চায়, তাহলে সে-ই পারে করতে।“ “কে স্যার? কে এই কাজটা করেছে?” আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম। “বলছি, সব বলছি।“ স্যার বললেন, “অনেকদিন এগুলো কাউকে বলা হয়নি। আজ বলে একটু হালকা হই।“ তারপর স্যার বলা শুরু করলেন, আমরা শুনতে থাকলাম সেই দুঃখের কাহিনি। “ছাত্রাবস্থা থেকেই আমার উৎসাহ ছিল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতি। আমাকে যেন চুম্বকের মত টানত, ডি.এন.এর প্রত্যেকটা প্যাঁচ, আর আর.এন.এর প্রত্যেকটা স্ট্র্যান্ড। আমি ঠিক করেছিলাম, গ্র্যাজুয়েশনের পর আমি মাস্টার্স করব জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। কিন্তু অর্থাভাবে আমার আর হয়ে উঠছিল না। কিন্তু, ভগবান সদয় ছিলেন, একটা স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম গ্র্যাজুয়েট হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। চলে এলাম ইংল্যান্ডে। কেমব্রিজে পেয়ে গেলাম গবেষণার কাজ। আর সেখানেই প্রথম লোকটার সাথে আলাপ। লোকটার নাম হাইনরিখ। বড়লোক বাপের ছেলে, জার্মানিতে কোন এক দুর্গের মালিক ওরা বংশানুক্রমে। ঘটনাচক্রে লোকটা আমার ল্যাব পার্টনারের কাজ করত। কেন জানি না, লোকটাকে আমার প্রথম থেকে খুব একটা সুবিধার লাগতো না। কিন্তু কী করে যে আমার আর ওর মধ্যে মিল হল, আমি নিজেও জানি না। ওর সাথে সাথেই আমার প্রথম রিসার্চ পেপারগুলো বেরিয়েছিল। সবই কমবেশি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর। মোটামুটি রেকগনিশনও পেলাম। দু-একটা ইন্টারন্যাশনাল পেপারে নামও বেরোল। কিন্তু সেটাই বোধহয় আমার জীবনের সবথেকে বড় শনি ছিল, আমি বুঝতে পারিনি। হাইনরিখের ন্যাক ছিল সাইবারনেটিক অর্গানিজমের ওপর, তোমরা যাকে সাইবর্গ বল। আমি এদিকে কেমব্রিজে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে তখনও কাজ চালাচ্ছি জেনেটিক এনহ্যান্সমেন্টের ওপর। তো, এরকমই এক বিকেলে আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছিল, কীভাবে মানুষের গড় আয়ু বাড়ানো যায় তাই নিয়ে। হঠাৎই কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে রিজেনারেশনের কথা। আর সেখান থেকেই আমাদের কাজ শুরু হয়।“ স্যার তারপর একটু থামলেন, তারপর বললেন, “আসলে আমাদের দুজনের অ্যাপ্রোচ ছিল আলাদা। আমার ইচ্ছে ছিল যেকোনোরকম ভাবে জিনগতভাবে মানুষের জিনকে উন্নত করে দেওয়া যাতে, মানুষ এই সমস্ত নন কমিউনিকেবল ডিজিজের প্রতি রেজিস্টান্ট হয়, যাতে গড় আয়ুটা আরও বাড়তে পারে। অথবা কোনও ভাবে যে কোষগুলো আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত মরে যাচ্ছে, সেগুলো যদি কোনোভাবে আবার রিজেনারেট করে যায়, তাহলে সে প্র্যাক্টিক্যালি তার বাতিল অঙ্গগুলিকে নিজে নিজেই রিপেয়ার করতে পারবে। অন্যদিকে হাইনরিখের ধারণা ছিল, যে যে অঙ্গগুলো আমাদের শরীরে তার কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে, সেগুলোকে যন্ত্রমানবের মত, রোবোটিক পার্টস দিয়ে পাল্টে দিলে মানুষ অনেক বেশি দিন কর্মক্ষম থাকবে। বুঝতেই পারছ, আমাদের দুজনের চিন্তাভাবনা ছিল উত্তর আর দক্ষিন মেরুর মত। পুরোপুরি বিপরীতমুখী, কিন্তু দুজনের একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ তীব্র। তাই কাজটা করা নিয়ে আমরা একে অন্যের সাথে কাজ করতে মুখিয়ে ছিলাম।“ স্যার তারপরই যেন চিন্তায় হারিয়ে গেলেন। দেখলাম, শূন্যে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। একবার অস্ফুটে যেন বলতে শুনলাম, “কিন্তু প্রমিথিউস…” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, কী প্রমিথিউসের কথা বলছিলেন আপনি?” স্যার যেন হেসেই উড়িয়ে দিলেন ব্যাপারটাকে। বললেন, “নাহ, আসলে একটা গবেষণার কথা ভাবছিলাম। আসলে তো কাজের মোহ ছাড়তে পারিনি। এই বয়সেও ল্যাবে ঘণ্টা চারেক না কাটালে ঠিক রাতে ঘুম হয় না। বাকি সময়টা তো বিভিন্ন জার্নালে লেখালেখি আর পড়াশোনাতেই বেরিয়ে যায়।“ বর্ণালী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার নিজস্ব ল্যাব আছে?” স্যার স্মিত হেসে বললেন, “অবশ্যই। এই বাড়িতেই আছে। অবশ্য তার জন্য কিছু আর. অ্যান্ড. ডি. করতে হয়েছে এই সুন্দর বাগানবাড়িটার ওপর। চল, বাকি কথা ল্যাবেই হবে। এমনিও বিকেল হয়ে এল। সন্ধে হতে বেশি দেরি নেই। অবশ্য ভারতীয় সময় আর গ্রিসের সময় তো মেলে না। কাজেই আমার আর তোমার সন্ধে পুরো আলাদা।“ দেখলাম, স্যারের কথাই ঠিক। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে, আমার হাতঘড়িতে, যেটা আমার বাড়ির পাশে থাকা শিয়ালদা স্টেশনের টাইমের সাথে মেলানো। আর স্যারের বড় দেওয়ালঘড়িতে বাজে বিকেল পাঁচটা। বাক্যব্যয় না করে তিনজন স্যারকে অনুসরণ করলাম। স্যার উঠে গিয়ে দেওয়ালের একপাশে একটা সুইচ টিপলেন। আমরা দেখলাম, লাইব্রেরির বইয়ের র‍্যাক গুলো সরে গিয়ে একটা বড় দরজাকে জায়গা করে দিল। দরজাটা খুলতেই  দেখতে পেলাম, একটা লম্বা প্যাসেজওয়ে। তার শেষ মাথায় থাকা দরজাটার সামনে দাঁড়াতেই সামনে একটা প্যানেল ফুটে উঠল। সেখানে স্যার চোখ রাখতেই একটা লাল আলো এসে পড়ল স্যারের বাম চোখের ওপর। বুঝলাম, এটা একটা রেটিনা স্ক্যান। তারপরই নীল আলোটা সাদা হয়ে যেতেই দরজাটা খুলে গেল। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ঢুকে যা যা দেখলাম, তার বিস্তারিত বর্ণনায় যাব না। একটা আধুনিক গবেষণাগার কীরকম হতে পারে, স্যারের ল্যাব দেখলে বোঝা যায়। কী নেই সেখানে! মাইক্রোস্কোপ, স্লাইড, চার্টস, বুন্সেন বার্নার, আগার জেল, ফ্লাস্ক, টেস্টটিউব, অটোক্লেভ, দুটো থার্মাল সাইক্লার (স্যার বললেন, ওগুলো পি.সি.আর), ব্যুরেট, পিপেট, মিক্সার, ফ্রিজ, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন… কী নেই তাতে? ল্যাবের এক কোণে প্রচুর প্রচুর প্রাণীর ফর্মালিন স্পেসিমেন। কয়েকটাকে চিনতে পারলাম, অনেকগুলোই অজানা ঠেকল। তবে সবথেকে চমকটা বোধহয় অপেক্ষা করছিল। দু তিনটে অ্যাকোরিয়াম। তাতে ঘুরছে কিছু সাদা রঙের জীব। টিকটিকির মত দেখতে, কিন্ত বড়, আর গলার পাশে লাল রঙের ছটা ফুলকা গোছের কিছু বেরিয়ে আছে। সমুদ্রের সাথে কুইজ করার সুবাদে এই প্রাণীগুলোকে আমি চিনতাম। কিন্তু এগুলোর বিশেষত্ব কী সেটা জানতাম না। স্যার দেখলাম লক্ষ্য করছেন, যে আমরা ঐ জীবগুলোকে অনেক মনোযোগ দিয়ে দেখছি। “কী হল, ঐগুলোর কথা আসবে পরে। আগে আগের কথাগুলো বলে নিই।“ স্যার হাত নেড়ে ডাকলেন আমাদের। আমরা এগিয়ে এলাম স্যারের কাছে। দেখি, স্যার দাঁড়িয়ে আছেন একটা ছবির সামনে। ছবিটা ওঁর ল্যাবে ঢুকেই, ল্যাবের দরজার একদম সামনেই টাঙানো। একজন বলিষ্ঠ পুরুষের ছবি যে চেন দিয়ে বাঁধা রয়েছে একটা পাথরের ওপর। একটা ঈগল উড়ে এসে বসছে তার পেটের কাছে, ঠিক যেখানে লিভার থাকে। লিভারটাকে সে ঠুকরে খাবে বোধহয়। আমি চিনতে পারিনি কিন্তু সমুদ্র ক্যারেক্টারটাকে চিনতে পেরেছিল, কারন লক্ষ্য করলাম ওর চোখের দৃষ্টিই পুরো পাল্টে গেছে ছবিটাকে দেখে। “তোমার নিশ্চয়ই সবাই জানো একটা মানুষের গড় আয়ু 70 বছর। এবং এই 70 বছরের মধ্যে কতবার সে রোগে আক্রান্ত হয়, তোমরা নিশ্চয়ই জানো। আর এটাও জানো যে, তার মধ্যে কিছু কিছু রোগ অবশ্যই প্রাণঘাতী। যেমন স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার। এগুলোকে যদি একবার সম্পূর্ণরূপে দূর করা যায়, তাহলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন অনেক, অনেক বেশি ভাল করে দেওয়া সম্ভব। হাইনরিখ আর আমার, আমাদের দুজনেরই চিন্তাভাবনা কনভার্জ করল একটা জায়গায়। একটা  বিশেষ মাইথোলজিকাল ক্যারেক্টারের ওপর।“ স্যার ছবিটার দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বললেন,  “চিনতে পেরেছ তোমরা? এর কথাই বলছিলাম।” আমি আর বর্ণালী মাথা নাড়লাম। বললাম, “না স্যার, ছবির এই মানুষটা কে? হারকিউলিস?” সমুদ্র কিন্তু স্যারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। স্যার স্মিত হেসে বললেন, “ না, হল না। সমুদ্র, তুমি নিশ্চয়ই চিনেছো?” সমুদ্র চাপা স্বরে উত্তরটা দিল,”হ্যাঁ স্যার, এর নাম প্রমিথিউস।“ “ঠিক চিনেছো।“ স্যার একদৃষ্টে ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই প্রমিথিউস। গ্রীক পুরাণের প্রমিথিউস। টাইটান ল্যাপেটাস, আর ক্লিমেনের ছেলে। প্রমিথিউসের ভাইদের মধ্যে তোমরা এপিমেথিউস আর অ্যাটলাসের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী প্রমিথিউসই প্রথম মানুষ গড়েছিল। এছাড়া আরও অনেক গল্প আছে প্রমিথিউসকে নিয়ে। তাতে আর গেলাম না আমি। তোমরা নিশ্চয়ই প্রমিথিউসের আগুন আনার গল্পটা পড়েছ। প্রমিথিউসের একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল। সে ভবিষ্যৎ দেখতে পারত। তো সে একদিন দেখল যে, দেবরাজ জিউস মানুষের সাথে অন্যায় করবে, মানুষকে সে আগুনের ব্যবহার শিখতে দেবে না বলে। এই কাজটা তার একদমই বরদাস্ত হল না। তাই সে কায়দা করে মানুষের জন্য আকাশ থেকে আগুন চুরি করে আনলো। এথেন্সবাসী তার এই সাধু উদ্দেশ্যকে স্বীকৃতি জানানোর জন্য রিলে রেসের প্রচলন করলো, যেখানে জ্বলন্ত মশালটা, যে রিলে কমপ্লিট করে তার হাত থেকে পরের জনের হাতে চলে যায়। বুঝতেই পারছ অলিম্পিকসের একদম প্রথমের ইভেন্টটার কথা বলা হচ্ছে, যেটা আজও চলে আসছে। যাই হোক, জিউস এটা একদমই সহ্য করতে পারলেন না। উনি প্রমিথিউসকে শাস্তি দিলেন এই বলে যে সে রোজ বাঁধা থাকবে ককেশাস পর্বতমালার ওপরে থাকা সবথেকে উঁচু পাথরটায়। রোজ একটা ঈগল আসবে, আর রোজ তার লিভারটা ঠুকরে ঠুকরে খাবে। ঈগল জিউসের প্রতীক। কিন্তু জিউস যেটা ভুলে গিয়েছিলেন, সেটা হল যে, প্রমিথিউস একজন টাইটান। তাই যতবার ঈগলটা প্রমিথিউসের লিভার খেয়ে যেত, রাতারাতি সেই আধখাওয়া লিভারটা আবার আগের মত হয়ে যেত। এভাবেই হয়ত চলত, কিন্তু একদিন হারকিউলিস এসে সেই ঈগলটাকে মারে, আর প্রমিথিউস মুক্ত হয়।“ আমরা তখনও যেন একটা ঘোরের মধ্যে। মনের মধ্যে হাজারো রকম প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সবথেকে বড় প্রশ্ন এটাই যে, পুরাণের সাথে এই গবেষণার সম্পর্ক কী? হঠাৎ করেই স্যারের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। স্যার ফোনটা ধরে ওপাশে কারোর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। দেখলাম, স্যারের চোখে মুখে একটা হাসি আর আনন্দের ভাব ফুটে উঠেছে। ফোনটা শেষ হতেই বর্ণালী জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার স্যার? ঝিনুকের খোঁজ পাওয়া গেছে?” স্যার স্মিত হেসে বললেন, “হেলেনিক জেন্ডারমির ওপর অতটাও ভরসা নেই, তবু এখানকার ডিসিপি যিনি, উনি আমার ভাল বন্ধু। উনি এখন ফোনে জানালেন, যে একটা সলিড লিড পেয়েছেন উনি ঝিনুককে খুঁজে পাওয়ার। তাই কাল, আমাকে একবার ডেকেছেন সকালে। কালকে অপারেশন করে হয়ত উনি কিডন্যাপারদের খুঁজে বের করতে পারবেন। যদি ঝিনুককে পাওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই। তাহলেও তোমাদের ছাড়ছি না। যতদিন আছ, তোমরা আমার অতিথি। পুরো গ্রিস ঘুরিয়ে আনব তোমাদের।“ আমি কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু স্যার, আপনার গবেষণার কথা?” স্যার শান্তভাবে বললেন, “আচ্ছা, কাল ঝিনুককে ফিরিয়ে আনি। তারপর তোমাদের সব বলব। কেমন? কিন্তু একটা শর্ত আছে।“ “কী স্যার?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “আমাকে কথা দাও, যে গবেষণার কথা আমি তোমাদের বলব, সেটাকে তোমরা গল্প হিসেবেই নিও। নিয়ে ভুলে যেও।“ স্যারের গলায় যেন মিনতির সুর। আমরা তিনজনে একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম। এ কীরকম শর্ত? তারপর সমুদ্র গলা খাঁকড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে স্যার, তাই হবে।“ স্যারের গলায় সেই আগের আত্মবিশ্বাস শুনলাম। “হতেই হবে। মা আমার ঠিক ফিরে আসবে আমার কাছে।” সমুদ্র আর বর্ণালী বেশ উৎফুল্ল হয়েই বলল, “বেশ স্যার। তাই যেন হয়।” আমিও সায় দিলাম, কিন্তু মন যেন বলছিল, যে ঘটনাটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হবে না।

তিন

বিকেলে বেরিয়েছিলাম স্যারের বাগানবাড়িটা থেকে। বর্ণালীর পার্স এই কিছুক্ষণ আগে এক স্থানীয় চোরের কাছে থেকে উদ্ধার হয়েছে। দুজন কনস্টেবল এসেছে বর্ণালীর খোঁজে। তার পার্সটা তাকে গিয়ে আইডেন্টিফাই করে আসতে হবে। বর্ণালী তাই বেরিয়েছে। সঙ্গে ক্রিসও গেছে শোফার হিসাবে। আজ সকালে স্যারের সাথে সমুদ্রও গেছে পুলিশের কাছে, কারণ স্যারের প্রেশারের রোগ। হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে, দেখার লোক কম। এর মধ্যে রইলাম পড়ে আমি। যেহেতু আমার হাতে কিছু কাজ ছিল না, আর তাছাড়া, ঝিনুককে পাওয়াই যাবে, তাই আর বেশি চিন্তা করার কিছু ছিল না বলে স্যারের বাড়ি থেকে মিনিট দশেক দূরেই বিচের পাশের ড্রাইভটার রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। ড্রাইভের পাশে দিয়ে যখন হাঁটছিলাম, তখন রাস্তার দুপাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। বিকেল আটটা তখন। বলা হয়নি, যেহেতু গ্রিস, গ্রিনিচের থেকে দুঘন্টা মতন এগিয়ে, তাই এখানে গ্রীষ্মকালে আটটা, সাড়ে আটটাতেও সূর্য অস্ত যায় না। সূর্য তখনও অস্ত যায়নি। গাড়িগুলো বেশ দ্রুতগতিতেই বেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। বিচে অনেক ছেলেমেয়ে ফুটবল নিয়ে বিচ ফুটবল খেলছে। দূরে তাদের বাবা-মায়েরা সেই খেলা দেখছেন। কেউ কেউ ছাতার তলায় সানস্ক্রিন লোশন মেখে শুয়ে আছেন। দূরে দু তিনজন অত্যুৎসাহী যুবককে দেখলাম কোস্টাল গার্ডকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন জলে নামতে দেবার অনুমতি দেবার জন্য। কিন্তু গার্ডের মুখ দেখে মনে হল না, বিনা কাঞ্চনে তিনি ওদের কথায় কর্ণপাত করবেন বলে। ব্যস্ত জীবনের চিহ্ন চারদিকে। কাছেই ইজিয়ান সাগর আছড়ে পড়ছে তীরে। বালির ওপর হেঁটে যাওয়ার জন্য যে পায়ের ছাপগুলো পড়েছিল, সেগুলো মুছে যাচ্ছে নিমেষেই। এত কিছুর মধ্যেও আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল যে মানুষটা, সে হল, মিটার বিশেক দূরে, একটা পাথরের ওপর বসে থাকা বুড়ো এক জিপসি। এই গ্রীষ্মের মধ্যেও সে গায়ে খুব পুরনো একটা আলখাল্লা গোছের জামা, আর পরনে ফাটা জিনস পড়ে বসে আছে। জিপসির বয়স হয়েছে। হাত বলিরেখায় ভর্তি হয়ে গেছে, নীল শিরা-উপশিরাগুলো ফুটে উঠেছে হাতের ওপর করা ট্যাটুগুলোর নীচ থেকেও। বোধহয় বহুদিন রোদে-জঙ্গলে ঘুরেই ওঁর গায়ের রং এত তামাটে বর্ণ ধারন করেছে। জিপসির বয়স বলা মুশকিল, কেননা তার মুখটাকে জরা খুব একটা আক্রমণ করেনি। কিন্তু, সমুদ্রের মত নীল চোখদুটো যেন বহুদূরের কোন ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে সবসময়, অন্তত দেখে তো আমার তাই মনে হল। মাথার চুল অবিন্যস্ত, কাঁধ অবধি নেমে এসেছে সেই চুল। এককালে হয়ত সে খুব শক্তিশালী ছিল, এখন বয়সের ভারে অল্প নুয়ে গিয়েছে। জিপসির পাশে একটা ঝোলা ব্যাগ। হাজার একটা তাপ্পি তাতে, আর তার পাশে একটা খাঁচা, যাতে একটা নাম না জানা, লাল হলুদ পালকের বড় পাখি। খুবই এক্সোটিক দেখতে সেই পাখিটাকে, এরকম পাখি আগে দেখিনি কখনও। ডানা আর লেজের পালকগুলো লাল, ঝুঁটিটাও লাল, কিন্তু গলা আর পেটের পালকগুলো আগুনরাঙা হলদে। হয়ত কোনও প্রজাতির ফেজান্ট (মুরগি জাতীয় পাখি) হবে, ওরকম করে রেখেছে খাঁচার মধ্যে। যেটা আমার সবথেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল, সেটা হল, জিপসিকে ঘিরে বেশ বড় একটা জটলা তৈরি হয়েছে। একটু কৌতূহলীই হলাম। ভিড়ের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করতে তিনি ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে যা বললেন, তার মানে হল, এই জিপসি একজন ভবিষ্যদ্বক্তা। শুধুমাত্র হাত ধরেই উনি বলে দিতে পারেন আগামী তিন দিনে কী কী হতে চলেছে কারোর জীবনে। উনি সবসময় এখানে থাকেন না। মাঝে মাঝেই আসেন, আর চলে যান মাসখানেকের মধ্যেই। এবারে আসতে উনি একটু দেরি করে ফেলেছেন, তাই লোকের এত ভিড়। আমি চিরকালই এসব বুজরুকিতে অবিশ্বাসী। কারন এই ধরনের ভদ্রলোকদের অধিকাংশই সস্তা উপার্জনের জন্য ভণ্ডামি করেন। অন্তত আমি একজনকেও দেখিনি যিনি সঠিকভাবে ভবিষ্যৎবাণী করেছেন। একবার একজন আমার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, যে আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী হব। মনে আছে, সেদিন বাড়ি আসা অবধি সারা রাস্তা ঐ কথাটা মনে পড়লেই প্রাণ খুলে হাসছিলাম। আমি তাই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলাম। আমার চারপাশের লোকজন হয়ত একটু রেগেই গেল হয়ত, কিন্তু আমার ওতে অতটা ভ্রূক্ষেপ নেই। জিপসি তখন সবে একজনকে দেখে আড়মোড়া ভাঙছেন। তারপর আমাকে দেখেই ভাঙা গলায় ইংরাজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, “বিদেশি?” আমি মাথা নাড়লাম। আচমকাই দেখলাম, জিপসির চোখদুটো আমার ওপরেই নিবদ্ধ। পূর্ণ দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে যেন। মিনিটখানেক এভাবেই আমরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর দেখলাম, জিপসির মুখে এক রহস্যময় হাসি। তারপর সে গম্ভীরভাবে সবাইকে বলল, “আজ আর কারোর ভবিষ্যৎ দেখব না। জিউসের নামে, তোমরা এখন আসতে পার।” পুরো ভিড়টার মধ্যে একটা আলোড়ন উঠল, কিন্তু, জিপসির হাতের একটা ইশারাতেই সেটা থেমে গেল। তারপর ভিড়টা আস্তে আস্তে ফাঁকা হতে শুরু করল। আমিও উঠে আসছিলাম, কিন্তু বুড়ো জিপসি আমার ডানহাতটা খপ করে ধরে নিল। বুড়ো হলে কী হবে, যা আন্দাজ করেছিলাম, জিপসির শক্তি একটুকুও কমেনি বয়সের ভারে। তারপর আমাকে ইশারা করল তার সামনে বসার জন্য। আমি জিপসির সামনে রাখা পাতা মাদুরটার ওপর বসলাম। আদতে সেটা কতগুলো ছেঁড়া কাপড়কে জোড়াতালি দিয়ে মাদুর বানাবার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাও তাতে বসলাম আমি। জিপসি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার নীল চোখদুটো যেন আমাকে অতিক্রম করে আমার ভবিষ্যৎ দেখছে বলে মনে হল আমার। এই প্রথম একটা গা ছমছমে ভাব লাগছিল। জিপসিই প্রথম মুখ খুলল। “কী ভাই, মনে হচ্ছে তুমি আমার ব্যাপারে যা যা শুনেছ, সেগুলো বিশ্বাস কর না।“ আমি বললাম, “না করার যথেষ্ট কারন আছে। মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না, কারন ভবিষ্যৎ কখনোই স্থির নয়। অনেক সিদ্ধান্তের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত সেটা। সেখানে একটা সিদ্ধান্ত যথেষ্ট ভবিষ্যৎ পুরো পাল্টে দেবার জন্য।“ জিপসি হাহা করে হেসে উঠল। ড্রাইভের রাস্তায় সেই সময় লোকজনও সেই সময় অনেক কমে গেছে। অন্ধকার হয়ে আসছিল। রাস্তার ধারের লাইটগুলো এক এক করে জ্বলতে শুরু করেছে। একটা গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তারপর জিপসি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল, “বাহ। তোমার ব্যাখাটা চমৎকার। এটা সত্যি, যে একটা সামান্য ঘটনাই বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে আগামীর ওপর। কিন্তু…” একটু ঝুঁকে পড়ল সে আমার ওপর, কথাগুলোও ফিসফিসে হয়ে এল ওর, “আমার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে যে, আমি ভবিষ্যৎ কী কী দিকে যেতে পারে, সব দেখতে পাই। ঠিক যেমন দেখতে পাচ্ছি, ভবিষ্যৎ তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে, অসম্ভবের রূপ নিয়ে। এক দারুন ঝড় বয়ে যাবে তোমার ওপর দিয়ে। যা ঘটবে, তাকে তোমার অসম্ভব মনে হলেও, জেনে রাখো, এই পৃথিবীতে সবকিছুই সম্ভব, কারন মানুষের কাছে অসম্ভব বলে কোনও শব্দ নেই। পারবে তুমি, পারবে এই রহস্য ভেদ করতে?“ জিপসির চোখের দিকে তাকিয়ে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু নিজেকে সামলে নিলাম। মানছি, জিপসির কথার মধ্যে একটা তীব্র সম্মোহনী ভাব রয়েছে, কিন্তু তাই বলে আমার মন এতটাও ঠুনকো নয় যে সম্মোহিত হয়ে পড়ব। তাই আমি হাসলাম জিপসির দিকে তাকিয়ে। “বেশ তো, বলুন না, কী রহস্যের মুখোমুখি হতে চলেছি আমি আগামী তিন দিনের মধ্যে?” আমি চ্যালেঞ্জই করলাম জিপসিকে। জিপসিও হাসল। অস্ফুটে গ্রিক ভাষায় কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু একটা বলল, যেটা বুঝতে পারলাম না। কিন্তু ভাব দেখে মনে হল, সে আমার এই আস্ফালনটায় বেশ মজাই পেয়েছে। জিপসি তারপর আমার দিকে এগিয়ে এসে স্পষ্ট করে বলতে থাকল, “তোমরা এসেছ তিনজন, ফিরবে চারজন। যে হারিয়েছে, সে ফিরবে। যে ডুবোপাহাড়কে এতদিন এড়িয়ে গিয়েছিল, তার ওপর চরম আঘাত আসবে সেই ডুবোপাহাড়ের থেকেই। জ্ঞান সবসময় ভাল হয় না। কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভালো।” আমি খানিকটা চমকেই গিয়েছিলাম। এই জিপসি কী করে জানল, যে আমরা ঝিনুককে খুঁজছি? কে ডুবোপাহাড়কে এড়িয়ে গিয়েছে? কোন জিনিস অজানা থাকাই ভাল? নাহ, হয়ত জিপসি ব্লাফ দিচ্ছে। এই কিডন্যাপিং এর খবর নিশ্চয়ই কাগজে বেরিয়েছে। সেখান থেকে পড়েই এই জিপসি এমন ভাব দেখাল, যে ও সব জানে। বেশ ভালভাবেই আমাকে ঠকাল। জিপসি আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল এতক্ষণ। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার নিজে থেকেই সে হাসল । আমি একটু রেগেই জিজ্ঞাসা করলাম, “কী হল? হাসছেন যে?” “হাসব না? এতদিন পরেও মানুষের স্বভাব পালটালো না একটুও। সত্যিকেও আজকাল পরখ করে বিশ্বাস কর তোমরা।” জিপসি হাসতে হাসতেই বলে। “হতেই তো পারে, আপনি কাগজ দেখে…” আমি বলতে গেলাম, কিন্তু, জিপসি মুখে একটা তীব্র হুইসল দিল। ফেজান্ট জাতীয় পাখিটা, যেটা পাশের খাঁচায় ঘুমোচ্ছিল, সে আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠল। আর তারপরই পাখিটা পরপর দুবার শিস দিল। অত সুন্দর শিস দিতে পারে পাখি, এই প্রথম দেখলাম। জিপসি হয়ত কিছুক্ষণের জন্য নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিল, তারপর নিজে থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “মাফ করবে, আমি আসলে পুরনো কথা ভাবছিলাম। হ্যাঁ, কোথায় যেন ছিলাম? আচ্ছা, আমি যদি কাগজ দেখেই থাকি, মেয়েটার অপহরণের ব্যাপারে জেনে থাকি, তাহলে এটা আমি কি করে জানব যে তোমরা সংখ্যায় তিনজন এসেছ?” আমি সঙ্গে সঙ্গে কিছু উত্তর দিতে পারলাম না। সত্যিই তো, এটা তো জিপসির পক্ষে কিছুতেই জানা সম্ভব নয়। তাহলে? আমি যতক্ষণে, এসব কথা ভাবছিলাম, ততক্ষণে জিপসি খাঁচা থেকে পাখিটাকে বের করে নিজের হাতের ওপর রাখল। পাখিটা জিপসির গায়ের আলখাল্লাটায় ঠোকর দিচ্ছিল আলতো করে। আমি এতক্ষনে পাখিটাকে পুরো দেখলাম। আকারে একটা ঈগলের থেকে বেশ বড় আর লম্বাও। লেজটাই আকারে আমার হাতের সমান। এতক্ষণ খাঁচার মধ্যে ছিল বলে বোঝা যায়নি। আমি মুগ্ধ হয়ে বলেই ফেললাম, “কি সুন্দর পাখি, তাই না?” জিপসি সপ্রশংস দৃষ্টিতে বলল, “ওয়ান অফ এ কাইন্ড। ওর প্রজাতিতে আরও অনেক সদস্য আছে, কিন্তু এই ব্যাটা আমার সাথেই থাকতে ভালবাসে। মিস্টার, এ হল আমার জাইফন। জাইফন, ইনি হলেন মিস্টার… ইয়ে, তোমার নাম?” “অয়ন, অয়ন চৌধুরী।” আমি বললাম। জিপসি পাখিটাকে আদর করতে করতে বলল, “দেখলে তো, তোমাদের মধ্যে পরিচয় হয়েই গেল।” দেখলাম, পাখিটা আমাকে এক দৃষ্টিতে দেখছে। পায়রারঙা টকটকে লাল চোখদুটোতে যেন অসীম কৌতূহল। হঠাৎ দেখলাম, পাখিটা উড়ে এসে আমার কাঁধে বসল। বসতেই, একটা অদ্ভুত রকম অনুভূতি টের পেলাম কাঁধের ওপর। যেন, আমার পাশেই একটা গরম চুল্লি রয়েছে, অথচ সেটা দেখতে পাচ্ছি না। তাপটা তীব্র হলেও তাতে কোনও কষ্ট হচ্ছে না আমার। তবে কি পাখিটা থেকেই তাপটা আসছে? কিন্তু, পাখিদের রক্ত গরম হলেও এতটা তো হয় না। ধুর… ওসব মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলাম। দেখলাম, পাখিটা উড়ে এসে বসায় জিপসির চোখ মুহূর্তের জন্য কুঁচকে উঠেছিল। কিন্তু যখন আমি কোনও রকম কিছু করলাম না, তখন জিপসির মুখটা হাসিতে ভরে গেল। সে বলল, “মিস্টার, জাইফনের আপনাকে পছন্দ হয়েছে। জানেন তো, জীবজন্তুরা সবসময় ভাল মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করে। জাইফনও তাই করছে। আপনি ভয় পাবেন না কিন্তু।” আমার বেশ আনন্দই লাগছিল। আমি পাখিটার মাথায় হাত বোলালাম। বেশ গরম ওর মাথাটা। সেই চুল্লির মত গরম ভাবটা আর নেই। একবার শিসও দিল মাথায় হাত বোলানোর সময়। আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে ইতস্তত করে বললাম, “এবার…” জিপসি হাত নাড়ল। “আমার পয়সা লাগবে না, মিস্টার চৌধুরী। ওসবে আমার প্রয়োজন আর নেই। আর ভাগ্য যদি আপনার সঙ্গ দেয়, তাহলে পাঁচদিন পরেই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে ঠিক এখানেই। সূর্যোদয়ের ঠিক আগে। বয়স তো যথেষ্ট হল, এবার এই ভবিষ্যৎ দেখায় কয়েকদিনের বিশ্রাম দেওয়ার কথা ভাবছি। ঠিক করেছি, ঐদিনই এখান থেকে চলে যাব। তবে, যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে দেখা হবে, এটাই আমার বিশ্বাস।” কেন জানি না, নিজে থেকেই আমি হাতটা করমর্দনের জন্য বাড়িয়ে দিলাম। জিপসি আমার হাতটা ধরল। আমিও বললাম, “আমারও তাই বিশ্বাস। মেকরি না ডুওমে যানা।” জিপসি একটু অবাকই হল। আমি অল্প গ্রিক ভাষা শেখার চেষ্টা করছি, এটা বোধহয় ভাবতে পারেনি। গ্রিক ভাষায় কথাটার মানে, “আবার দেখা হবে।” তারপর হাসতে হাসতে সেও আন্তরিকভাবেই বলল, “মেকরি না ডুওমে যানা।” জাইফন একটা শিস দিয়ে উঠল। দূরের অস্তমিত সূর্যের আলোয় আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। ফেরার সময় জিপসির কথাগুলোই মনে ভাসছিল। কার কথা বলতে চাইছিল জিপসি? যাকে ফিরে পাবার কথা বলছিল, সে না হয় ঝিনুক। কিন্তু কোন মগ্নমৈনাকের কথা জিপসি বলতে চাইছিল, আর কেই বা তার আঘাত এড়াতে চায়? রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে আচমকা দেখি, সামনে একটা বড় টিভির শোরুমের সামনে বিশাল ভিড় জমে গেছে। কী মনে হতে এগোলাম কি হচ্ছে দেখার জন্য। ভিড়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখি এক বীভৎস দৃশ্য। একটা পুরনো বাড়িতে বিশাল বড় আগুন লেগেছে, আর তার মধ্যেই বার বার বিস্ফোরণের শব্দ। লোকজন ছুটে ছুটে পালাচ্ছে, পুলিশ পুরো জায়গাটা কর্ডন করে দিয়েছে, আর দমকলের লোক উঠছে বাড়ির ভেতর। বাড়ির ঠিকানাটা দেখে চমকে উঠলাম, এ তো সেই জায়গা যেখানে আজ স্যার আর সমুদ্র গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই সমুদ্রকে ফোন করলাম। জান যায় যাক, ওকে না ফিরিয়ে আনলে কাকু কাকিমার সামনে মুখ দেখাব কেমন করে? প্রথমবার ফোন ধরল না সমুদ্র। রিং হয়ে হয়েই কেটে গেল। দ্বিতীয়বার রিং ধরল। ওপাশ থেকে “হ্যালো” বলতেই আমি চেঁচিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “সমুদ্র, তোরা সব ঠিক আছিস তো? টিভিতে দেখাচ্ছে, তোরা যেখানে গিয়েছিলিস, সেখানে বম্ব ব্লাষ্ট হয়েছে মনে হয়। সব ঠিকঠাক আছে?” সমুদ্র চেঁচিয়েই বলল, “ঠিকঠাকই আছি সব। ফোন রাখ। বাড়ি গিয়ে কথা বলছি। তুই ইমিডিয়েটলি বাড়ি যা। গিয়ে বর্ণালীকে বোঝা। নয়ত মেয়েটা বিশাল সিন ক্রিয়েট করবে।“ ফোনটা কেটে গেল। বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটা লাগালাম। বলা বাহুল্য, সমুদ্রর আশঙ্কাই ঠিক। এর মধ্যেই ক্রিস আর বর্ণালী ফিরে এসেছিল। আর যেই ওরা টিভি চালিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গেই ওরা দেখে ঐ পুরনো বাড়িতে বিস্ফোরণের খবর। বর্ণালীকে তখন সামলানো যাচ্ছিল না। ওরা প্রায় বেরিয়েই আসছিল গাড়ি ধরে স্পটে আসার জন্য, আমি গিয়ে পৌঁছতে আমাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না তার! অনেক কষ্টে ওকে থামালাম। সমুদ্রের সাথে ফোনে যা কথা হয়েছে, খুলে বললাম। তাও আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না বলে, সমুদ্রকে আবার ফোন করিয়ে কথা বলালাম ওর সাথে। তখন শান্ত হল ও। তিন চার ঘণ্টা পর সমুদ্র আর স্যার ফিরলেন অ্যাম্বুলেন্সে করে। স্যারের মাথায় বড় ব্যান্ডেজ বাঁধা। অ্যাম্বুলেন্সের লোকগুলো এসে শুইয়ে দিয়ে গেল ওঁকে ওঁর ঘরের বিছানায়। কেন ওঁর মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, জিজ্ঞেস করাতে সমুদ্র বলল, “বোমা ফাটার সাথে সাথে স্প্লিনটার ছিটকায়, সেটাই মাথায় লেগেছে।“ আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, “আর ঝিনুক?” সমুদ্র বলল, “জাস্ট নিখোঁজ। স্পটে কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।“ বর্ণালী বলল, “কী হয়েছিল, খুলে বলবি?” সমুদ্র বলল, “বলছি, আগে এক গ্লাস জল দে।“ যেহেতু, ক্রিস আর জুলিয়াস আমাদের সঙ্গেই বসে ছিল, তাই আমাদের কথাবার্তা ইংরাজিতেই হল। জল খেয়ে সমুদ্র বলল, “আসলে পুলিশের স্পাই খবর দিয়েছিল যে আজ সকালেও ঐ মেয়েটাকে দেখা গেছে ঐ বাড়িতে। তাই পুলিশ বিশাল রেইড করেছিল। এবার পুলিশের দেখা পেতেই কিডন্যাপাররা গুলি চালাতে শুরু করে। গুলির আঘাতে পুলিশবাহিনীর পাঁচ-ছয়জন বেশ ভাল রকমই জখম হয়। বেশ ভালই গুলি বিনিময় চলছিল, কিন্তু অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে এবার র‍্যাফ চলে আসে স্পটে। লাস্টে ওদের পাঁচজনকে মেরে দিয়েছিল পুলিশ। শুধু একজন বেঁচে ছিল, কিন্তু তার অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও সময় দিত না। তাই তার ওখানেই মৃত্যুকালীন জবানবন্দী নেওয়া হচ্ছিল। আর স্যার তখন ঢুকেছিলেন বাড়িতে উইটনেস হিসাবে, সাথে ডিসিপি আর কয়েকজন বড় অফিসার ছিলেন। আমিও ছিলাম সাথে।“ আমি জিজ্ঞেস করলাম, “লোকটা কি বলল যে ও কার হয়ে কাজ করছে? বা ওর মোডাস অপারেণ্ডি কী?” “হ্যাঁ।“ সমুদ্র হিমশীতল কণ্ঠে উত্তরটা দিল। “হাইনরিখ হাইন বলে একজন ওদেরকে ভাড়া করেছিল। ওরা আসলে ভাড়াটে মার্সিনারি। বর্ডারে থাকা জঙ্গিগোষ্ঠীদের সাথেও ওদের যোগাযোগ আছে। তাই এত অস্ত্রশস্ত্র ছিল ওদের কাছে। ওদের কাজ ছিল ঝিনুককে কিডন্যাপ করে একটা দ্বীপের কাছে ছেড়ে দিয়ে আসা। দ্বীপটা এখান থেকে বেশ দূরে। অ্যান্টিকাইরারও দক্ষিণ পশ্চিমে। কিন্তু ঠিক লোকেশনটা লোকটা কিছুতেই বলল না। লোকটার কথামত, বাকিটা হাইনরিখই সামলে নিত ওখান থেকে।“ “কিন্তু হাইনরিখ তো জেলে। কী করে ছাড়া পেয়েছে সে?” আমি প্রায় হতভম্ব। ঘরে বাকিদের অবস্থাও আমার থেকে খুব ভালো নয়। শুধু জুলিয়াসই শান্ত হয়ে বসে আছে। ভাবলেশহীন সেই মুখে শুধু ঝড় ওঠার আগের পূর্বাভাস। “ছাড়া পায়নি, তবে জেল ভেঙে বেরিয়েছে।“ জুলিয়াস কাটাকাটা স্বরে উত্তরটা দেয়। আমরা তিনজনেই অবাক হয়ে যাই। এই কথাটা তো জুলিয়াস আমাদেরকে বলেনি। আমি তখন জুলিয়াসকে জিজ্ঞাসা করি অবিশ্বাসের সাথে, “তুমি জানতে?” “জানব না? স্যারের জীবনটা তো ঐ ছারখার করে দিয়েছে। স্যারের যে প্রথম মেয়ে, তাকে তো ঐ রাসকেলটাই খুন করেছে। ঐ জন্যই তো ম্যাডাম আর এই জগতে নেই।“ জুলিয়াস উত্তেজিত হয়ে উঠে বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু শরীর দুর্বল থাকার জন্য সে চেয়ারে থপ করে বসে পড়ে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “স্যার জানতেন?” “হ্যাঁ, উনি জানতেন।“ জুলিয়াস হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দেয়। “উনি খবর রাখতেন ওই জানোয়ারটার। দুবছর আগে যখন জেল ভেঙে পালাল হাইনরিখ, ওনাকে ফোন করে আমিই জানিয়েছিলাম। সেটা জানতে পেরেই সঙ্গে সঙ্গে উনি এখানে চলে এলেন তোমাদের দেশ থেকে। “ ক্রিস, তার বাবাকে শুয়ে থাকতে বলে ওষুধ আনতে চলে যায়। সমুদ্র আর বর্ণালী তখন একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। আমি তখন ভাবছি, তার মানে স্যার জানতেন হাইনরিখের ছাড়া পাওয়ার কথাটা। অথচ উনি আমাদের বলেননি। উনি এখনও বলেননি, ওঁর গবেষণার ফল কী হয়েছিল। কেন? তবে কি উনি আমাদের থেকে কিছু লোকাতে চাইছেন? কিন্তু কী হতে পারে সেটা? এমন কী গুপ্ত রহস্য আছে যা উনি চান না, সবাই জেনে ফেলুক? কী অন্ধ অতীত আছে তাঁর আর হাইনরিখের মধ্যে? হঠাৎ করেই সেই জিপসির কথাগুলোর আর কাল সকালে ক্রিসের কথাগুলোর একটা নতুন মানে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যে মগ্নমৈনাককে স্যার এতদিন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, সে আর কেউ নয়, হাইনরিখ নিজেই। তার মানে… স্যারের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে হাইনরিখ। এত বছর জেলে থাকার জন্য স্বাভাবিকভাবেই ওর মস্তিস্কের বিকৃতি ঘটেছে, তাই এত বছর পর পুরনো প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠেছে। তাই সে ফিরে এসেছে… এই খবরটার ধাক্কা সামলাতে বেশ সময় লাগে। কিছুক্ষন পর নীরবতা ভেঙ্গে সমুদ্রই বলে, “তার থেকেও বড় কথা কী জানিস, যে জন্য গেলাম, ঝিনুককে পাওয়া যাবে কিনা, সে গুড়ে বালি। ঝিনুক পালিয়েছে আজ সকালেই। পুলিশ রেড হবার ঘণ্টা দুই আগে।“ আমি আর বর্ণালী সমস্বরে চিৎকার করে উঠলাম, “কী? কী বলছিস রে?” “ঠিকই বলছি। যতক্ষণ লোকটা মোটামুটি কনফেশন দিচ্ছিল, ততক্ষণ ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু যেই জিজ্ঞেস করা হল, মেয়েটাকে ওরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে, তখন লোকটা পরিষ্কার স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, যে যে জন্য পুলিশ এখানে এসেছে, সেই উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ। কারন ঝিনুক তাদের হাত থেকে পালিয়েছে। এখন সে কোথায় তারা কেউ জানে না।” আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। ঝিনুক পালিয়েছে? অতগুলো আতঙ্কবাদীদের হাত থেকে পালাল কী করে? আমার মুখ থেকে প্রায় প্রশ্নটা কেড়ে নিয়েই বর্ণালী জিজ্ঞেস করল, “কী করে? এ তো গল্পের মত শোনাচ্ছে। অতগুলো লোক, কেউ আটকাতে পারল না?” ওর কথা শুনে তখন সমুদ্রের মুখের হাবভাবটা রীতিমত পাল্টে গেল। সে নিজেও এই ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। তাই খানিকটা কিন্তু কিন্তু করে বলল, “তাই তো, এটা তো খেয়াল করিনি। লোকটা তখন যা বলল, সেটার সারমর্ম এই যে ঝিনুককে যে লোহার বেড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সেটা ভেঙে… হ্যাঁ, ঠিকই শুনছিস, ভেঙে… ও ঘরের জানলা থেকে লাফ দিয়ে পালায়। যে জানালাটা ও দেখায়, সেটা মাটি থেকে কম করে হলেও পঞ্চাশ ফুট উঁচু। ঘরে যতজন ছিল, সবাই অবাক হয়ে যায় লোকটার কথা শুনে। বুঝতেই পারছিস, ওর কনফেশনটা কেউ বিশ্বাস করেনি। ওরা সেটাকে একটা ডেলিরিয়াম হিসাবে ধরছে। কারন আর যাই হোক, কোনও সুস্থ শরীরের মানুষ পঞ্চাশ ফুট উঁচু জানালা থেকে লাফিয়ে বেঁচে যেতে পারে, এটা আমিও শুনিনি, আর ওরাও না।“ যতক্ষণ আমরা লোকটার কথা শুনে হাঁ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, লোকটা ততক্ষণে যে আরেকটা প্ল্যান মনে মনে কষে ফেলেছে, বুঝতে আমাদের দেরি হয়ে গিয়েছিল। স্বীকারোক্তিটা দেবার পরেই লোকটা ঘোলাটে একটা হাসি হাসতে হাসতে বলে, “এই বাড়িটার কোণে কোণে বম্ব ফিট করা। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটবে। আমি তো যাবই, তার সাথে তোমরাও যাবে। আই উইল ওয়েট ফর ইউ ইন হেল।“ ওর কথা শেষ হবার সাথে সাথেই ঘরের মধ্যে একটা টিকটিক করে শব্দ হতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা পকেট সার্চ করে আবিষ্কার করি আমরা, যে সে বম্বগুলো অ্যাক্টিভেট করে দিয়েছে পকেটের মধ্যে থাকা একটা রিমোট টিপে। আর তারপরই আমরা ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে আসি। এমনিও লোকটাকে বাঁচানো যেত না, তাই ওকে ওখানেই ফেলে আসা হয়। বাড়িটা থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই বিস্ফোরণে পুরো এলাকাটা কেঁপে ওঠে। আমরা ছিটকে গিয়ে পড়ি শকওয়েভের ইমপ্যাক্টে। আমরা কেউই খুব একটা অনাহত ছিলাম না, শুধু স্যারের চোটটাই মেজর। যেহেতু উনি আমাদের সবার পিছনে ছিলেন, তাই বম্বের স্প্লিনটার ছিটকে ওঁর কপালে লাগে।” “তবে কি লোকটা তদন্তের মোড় ঘোরানোর জন্য মিথ্যে বলছে?” ক্রিসের কথায় সম্বিৎ ফেরে আমাদের। ও ঢুকেছে ঘরে, জুলিয়াসের জন্য ওষুধ নিয়ে। আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকাই। হতেই পারে, ক্রিমিন্যালটা মিসলিড করার জন্য এইরকম উদ্ভট কথাবার্তা বলছে। অনেকসময়ই হয়, এইরকম কনফেশন দিয়ে তদন্তের গতি ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ওরা, যাতে বাকিদের খুঁজে না পাওয়া যায়। হঠাৎ করেই ঘরের মধ্যে গম্ভীর এক স্বরে শোনা যায়, “না, মিথ্যে বলছে না লোকটা।” আমরা চমকে উঠে দেখি, স্যার এসে দাঁড়িয়েছেন ঘরের দরজায়। মাথার ব্যান্ডেজের একটা কোন রক্তে ভেজা। চোখদুটো যেন জ্বলছে হিংস্র কোনও প্রাণীর মত। বুকটা কেঁপে ওঠে স্যারের এই রূপ দেখে। সমুদ্রই প্রথম প্রশ্ন করে স্যারকে, “স্যার, আপনি উঠে এলেন কেন? আপনার না মাথায় চোট?” স্যার মাথা নাড়েন। তারপর বলেন, “এখনও অতটা চোট পাইনি, যাতে মেয়েকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হয় একদম।” তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “তোমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জমেছে, তাই না? কীভাবে ঝিনুক পঞ্চাশ ফুট উঁচু থেকেও লাফ মেরে অক্ষত থাকতে পারে? কীভাবে একটা কুড়ি বছরের মেয়ে লোহার চেন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে?” আমি মাথা নাড়ি। সমুদ্র, বর্ণালী আর ক্রিস বলে, “হ্যাঁ স্যার, বলুন। আমরা জানতে চাই।” স্যার আমাদের দিকে তাকালেন। দেখলাম স্যারের চোখে জল চিকচিক করছে। কিছু বলতে গিয়েও যেন থেমে গেলেন উনি। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে ঘরের মধ্যে রাখা চেয়ারটার ওপর বসে থুতনিটা রাখলেন দুহাতের ওপর। অনেকক্ষণ ধরে স্যার নিজেকে যেন আত্মস্থ করলেন। তারপর বলা শুরু করলেন ধীরে ধীরে। “অয়ন, সমুদ্র, বর্ণালী, ক্রিস। আজ তোমাদের জানা প্রয়োজন। ঝিনুক আর আমার সম্পর্কটা ঠিক কী সেটা তোমাদের জানা দরকার। এর সাথেই আসলে জড়িয়ে আছে, আমি কী নিয়ে গবেষণা করছিলাম এতদিন। এতদিন ধরে এই গুরুভার আমি বয়ে বেড়িয়েছি। আজ সময় হয়েছে সেই ভার নামিয়ে দেওয়ার। তোমরা বড় হয়েছ, তোমাদের সেন্স অফ রেসপন্সিবিলিটি এসেছে। শুধু কথা দাও, এই মানুষটাকে তার কাজের জন্য রূঢ়ভাবে বিচার করো না। অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট পেলে তবেই একটা মানুষ এই কাজে নামতে পারে।“ আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম। তারপর বর্ণালী আমাদের তিনজনের হয়েই বলল, “ঠিক আছে স্যার, তাই হবে। আপনি যা বলেননি আমাদের, সেটা আজ খুলে বলুন প্লিজ।” স্যার বিষণ্ণভাবে হাসলেন। তারপর বলা শুরু করলেন।

চার

“সেইদিন প্রমিথিউসের ওপর আমাদের শেষ কথা হয়েছিল তো? একমাত্র টাইটান, যে মানবজাতির উপকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছিল এক অসহ্য যন্ত্রণার শাস্তি?” বর্ণালী বলল, “হ্যাঁ স্যার।“ স্যার তখন ক্রিসের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি তো আর্টসের ছাত্র। আশা করি, প্রমিথিউসের ওপর তোমার ভালই জ্ঞান রয়েছে।“ ক্রিস ঘাড় নাড়ে। স্যার তখন বলা শুরু করলেন। “তোমরা সবাই জান, জীবদেহে অনেক রকমের কোষ থাকে। টোটিপোটেণ্ট, প্লুরিপোটেণ্ট, ইউনিপোটেণ্ট… অনেকরকম। এর মধ্যে প্রথমটা সমস্ত রকমের কোষ তৈরি করতে পারে, পরেরটা অনেকগুলো সেল লাইনের কোষ তৈরি করতে পারে, তবে সব নয়। আর শেষেরটা শুধু মাত্র একরকমেরই কোষ তৈরি করতে পারে। যেকোনো রকমের রিজেনারেশনে এই ধরনের কোষগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। তোমরা এখন বলবে যে, প্রমিথিউসের সাথে এই সেলুলার রিজেনারেশনের সম্পর্কটা কী? বুঝতে পারছ না? আজ থেকে প্রায় তিন, চার হাজার বছর আগে লেখা পুরাণে একদম সঠিক ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে লিভারের মতো ইউনিপোটেণ্ট কোষ আর একটাও ছিলনা মানবদেহে। আর সেইজন্যই প্রমিথিউসের লিভার সেই ঈগল খেয়ে যাওয়ার পরেও সেই লিভার আবার রাতারাতি তৈরি হয়ে যেত। তখন তো অ্যানাটমির অত প্রচলন হয়নি, ১৬০০ সালের সময় আন্দ্রে ভেসালিয়াসের সময় অ্যানাটমির জন্ম। তাহলে মানুষ জানলো কী করে, লিভারের এই রিজেনারেশনের কথা? তখন তো অ্যানাটমি, প্যাথলজি, মাইক্রোস্কোপি, হিষ্টোপ্যাথলজিক্যাল স্টাডি, এসব কিছুই ছিল না। তখন তো কোনভাবেই মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, লিভারের কোষগুলো এত তাড়াতাড়ি নিজেই নিজেকে গড়ে নিতে পারে বলে। তাহলে মানুষ জানল কী করে?” বলে স্যার সবার মুখের দিকে তাকালেন। বলা বাহুল্য, সেইদিনের মত আমরাও নিরুত্তর। সত্যিই তো, মানুষের পক্ষে তো এই প্রশ্নের উত্তর তখন জানা অসম্ভব। স্যার বললেন, “শুধু প্রমিথিউস বলেই বলছি না। এই তো, হাইড্রার কথাই ধর না, সাত মাথার সেই বিষাক্ত সাপের কথা, যার মাথা কেটে দিলে কাটা মাথার জায়গায় আরও দুটো মাথা গজিয়ে উঠত। সেলুলার রিজেনারেশন শুধুমাত্র প্রমিথিউসের কাহিনীতেই বর্ণনা করা হয়েছে, তাই নয়। আরও অনেক জায়গাতেই বর্ণনা করেছে মানুষ, জেনে বা না জেনে। আমার একটাই ধারনা এই ব্যাপারে। হয় পুরো ব্যাপারটাই একটা মিথ, আর নয় প্রমিথিউস কোনোভাবে এই সেলুলার রিজেনারেশনের ব্যাপারে জেনেছিল এবং প্রয়োগ করেছিল নিজের শরীরের ওপর। আর তাই সে অমরত্ব লাভ করেছিল। সে পুরাণের নয়, বরং বাস্তবেরই এক মানুষ ছিল, যার অমরতার জন্য বাকিরা তাকে শাস্তি দিয়েছিল। কিন্তু ধারনা থাকলেই তো হল না। প্রমাণ চাই। বিজ্ঞান এমনই এক শাস্ত্র, যা পুরোপুরি প্রমানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কোথায় পাব সেই হাজার হাজার বছর আগেকার প্রামান্য পুঁথি, যা আমার ধারনাকে সমর্থন করবে?” সমুদ্র তখন বলল, “ তাই তখন আপনি কেম্ব্রিজ থেকে আথেন্সে চলে এলেন, তাই তো?” স্যার সটান তাকালেন সমুদ্রের দিকে। তারপর মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ। তার পরেই আমরা ঠিক করি, আমাদের গবেষণাগারটা কেম্ব্রিজ থেকে সরিয়ে এখানে, এই অ্যাথেন্সেই নিয়ে আসা ভালো, যেখানে গ্রীক পুরাণগুলো জন্ম নিয়েছে। আমরা মোটামুটি ডেলফি, মিকোনোস, অ্যাথেন্স সব ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম যাতে বিন্দুমাত্র কোনও চিহ্ন, কোনও নথি পাওয়া যায় এই ব্যাপারের ওপর। কিন্তু, দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, কোনও কিছুই সেরকম আশাব্যঞ্জক পেলাম না। গাইড বুকে নিশ্চয়ই পড়েছো যে এখানে তিন হাজারেরও বেশি দ্বীপ রয়েছে। তখন ঠিক করলাম, মেনল্যান্ডে না পাওয়া গেলে দ্বীপগুলোই খুঁজে আসা যাক। যা বলা, সেই কাজ। বলা বাহুল্য, এগুলোর জন্য কোনও সরকারি সাহায্য পাচ্ছিলাম না, পুরোটাই হাইনরিখের পার্সোনাল ফান্ড থেকে আসছিল। এরকমই খুঁজতে খুঁজতে, একটা অজানা দ্বীপে একদিন আমরা যা খুঁজছিলাম, তা খুঁজে পেলাম। শীতকালে, এক ঝড়ের মধ্যে আমরা গিয়ে পৌঁছেছিলাম দ্বীপটায়। অ্যান্টিকাইরা থেকে আড়াইশ মাইল দক্ষিন পশ্চিমে এই ভলক্যানিক দ্বীপটা। জুলিয়াস, আমি আর হাইনরিখ গিয়েছিলাম বোটে করে। জুলিয়াসকে বোটের পাহারায় রেখে আমরা ঢুকলাম দ্বীপে। পেছনে মাইলের পর মাইল জুড়ে শান্ত ইজিয়ান সাগর ছড়িয়ে রয়েছে তার হাত পা মেলে। দ্বীপটা বেশি বড় না। ব্যাস সর্বসাকুল্যে আট মাইলের মত। চারদিকেই কালো, ভলক্যানিক মাটি। গাছপালা গজিয়েছে, তবে মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে হবার জন্য এখানকার ফনা আর ফ্লোরা অনেকটাই আলাদা। ঘন জঙ্গল কেটে কেটে আমরা যখন এগিয়ে চলেছি, তখনই চোখে পড়ে মন্দিরটা। মন্দির না বলে, একটা বাড়ি বললেই ভালো হত, কারন সেখানে কোনও দেবদেবীর মূর্তি নেই। বাড়িটার সামনে থাকা পিলারগুলো উন্নত গ্রিক স্থাপত্যের পরিচয় দিচ্ছিল। জনমানবহীন একটা দ্বীপে কে এরকম একটা বাড়ি বানাবে? তাও আবার এরকম প্রাচীন? খানিকটা কৌতূহলবশেই ওটার দিকে আমরা হাঁটতে থাকি। বাড়িটার ভেতরে শুধু জংধরা কিছু লোহার জিনিস আর কাঁচের ভাঙা টুকরো পাই। তার মধ্যে থেকে একটা লোহার টুকরো এনে আমি পরে রেডিওকার্বন ডেটিং করাই।  জিনিসটার বয়স দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। প্রায় সাতাশশো বছরের পুরনো। যন্ত্রপাতিগুলো দেখে আমরা একটা ধারনা করতে পারি, যে যে এখানে থাকত, তার গবেষণা করার অভ্যেস ছিল। কিন্তু, আমরা শুধু যন্ত্রপাতিই পাইনি, আমরা আরও একটা জিনিস পেয়েছিলাম। সেটা একটা পাথরের কোডেক্স ট্যাবলেট। চৌকো, গ্র্যানাইটের একটা পাথর, যার ওপর অচেনা ভাষায় কিছু লেখা। আমাদের গ্রিক ভাষার জ্ঞান সীমিত ছিল। তবু যা বুঝতে পারি, ওতে বিভিন্ন নির্দেশাবলী খোদাই করে লেখা ছিল। আমরা পাথরটা নিয়ে আসি। নিয়ে এসে প্রাচীন গ্রিক ভাষায় দক্ষ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পাঠোদ্ধার করাই। তারপর লেখাটার যা অর্থ বেরিয়ে আসে, তা শুনে আমরা নিজেরাই অবাক হয়ে যাই। ট্যাবলেটটা যিনি লিখেছিলেন তাঁর নাম হেসিয়ড। হ্যাঁ, সেই হেসিয়ড যার নাম, মহাকবি হোমারের সাথে একসাথে উচ্চারন করা হয়। হেসিয়ডই সেই ব্যক্তি যিনি প্রথম প্রমিথিউসের ইউলজি লিখেছিলেন। যাই হোক, পরে কোনও একদিন ওঁর সাহিত্য নিয়ে চর্চা করা যাবে। ব্যাপারটা হল, এই লেখাগুলো ওঁর নিজের লেখা নয়। ওঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বয়ং প্রমিথিউস এসেছিলেন ওঁর সঙ্গে দেখা করতে। এবং তিনিই ওঁকে এগুলো লিখে যেতে বলেছিলেন। লেখাগুলোর মানে যখন জানতে চেয়েছিলেন উনি, প্রমিথিউস বলেছিলেন, কালের নিয়মে একদিন এই লেখার পাঠোদ্ধার মানুষ নিজেই করবে। এই যুগের জন্য সেই লেখা নয়। লেখাতে প্রাচীন গ্রিক ভাষায় বর্ণনা করে হয়েছে কীভাবে মানুষ এই রিজেনারেশনকে নিজের জেনেটিক কন্টেন্টের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অন্য এক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। কী নেই তাতে, জিন নিয়ে গবেষণার ব্যাপারে? সাড়ে তিন হাজার বছর আগে কোন মানুষ জিন এডিটিং এর কথা ভাববে এটা আমরা ভাবতে পারিনি। কারোর পক্ষেই ভাবা সম্ভব নয়। অথচ নিজের চোখের সামনে যা দেখেছিলাম, সেটাকে অস্বীকার করি কী করে? ট্যাবলেটে স্পষ্ট করে প্রাচীন গ্রিক ভাষাতে জিন এডিটিং কী বা কীরকম সেটা বোঝানো হয়েছিল, আর কী প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঐ সাফল্য অর্জন করা যেতে পারে, তার কথা বলা হয়েছিল। অথচ মানুষের পক্ষে পুরো ব্যাপারটাই জানা অসম্ভব।“ সমুদ্র ভীষণ অবাক হয়ে যায়। বস্তুত আমরা তিনজনেই অবাক তখন। আমি আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করি, “কিন্তু স্যার, জিন শব্দটারই তো উদ্ভব এই ১৯০০ সাল নাগাদ। জোহানসেন প্রথম শব্দটা কয়েন আউট করেছিলেন। তাহলে আজ থেকে অত বছর আগে কী করে জিন শব্দটার উল্লেখ থাকবে ঐ ট্যাবলেটে?” স্যারের মুখে সেই পুরনো রহস্যময় হাসিটা খেলে যায়। স্যার স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, “সেটা আমি যদি জানতাম, তাহলে তো হয়েই যেত। সেদিন আমি সেটা দেখে যতটা অবাক হয়েছিলাম, আজও ঠিক ততটাই অবাক হই তোমাদেরকে এই ঘটনাটা বলতে গিয়ে।“ শেষদিকে স্যারের কথাগুলো যেন স্বগতোক্তি বলে মনে হয়, “মাঝে মাঝে আমার কেন জানি না মনে হয়, কেউ যেন আমাকে দিয়ে কোনও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করিয়ে নিতে চাইছে। ঐ ট্যাবলেটের মাধ্যমে কেউ যেন হাজার হাজার বছর পেরিয়েও আমার সাথে যোগাযোগ রাখছে…” স্যার নিজেকে দ্রুত সামলে নেন আমাদের বোকা বোকা মুখগুলো দেখে। তারপরই হেসে বলেন, “কোথায় ছিলাম যেন? ও হ্যাঁ, প্রমিথিউসের লেখাগুলো পড়ে আমাদের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। আমি এখনও ভেবে পাই না, ওরা কীভাবে এন্ডোনিউক্লিয়েজ এনজাইম, বা ক্রিস্পার-ক্যাস৯ এর কথা ভেবেছিল? এগুলো তো এই যুগের আবিষ্কার। যখন আমরা ওগুলো পড়ছিলাম, আমাদের নিজেদের কাছে এগুলো দুর্বোধ্য ঠেকছিল, কিন্তু আজ ২০১৯ এ দাঁড়িয়ে আর এই শব্দগুলো অজানা লাগে না। তবে, যে সমস্ত প্রাণীদের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল যাদের জিন ব্যবহার করে মানুষ আরও দীর্ঘায়ু হয়ে উঠতে পারে, বা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, তাদেরকে সে কীভাবে চিনেছিল, সেটার রহস্য আজও আমি ভেদ করতে পারিনি। যেসব প্রাণীর নাম ব্যবহার করা হয়েছে, সব আমাদের যুগের প্রাণী। তার মধ্যে দুটো আমার এই ল্যাবেই রয়েছে, এবং তাদের ওপর বেস করেই আমার এই গবেষণা।” এখানে বর্ণালী একটা প্রশ্ন করল। “আচ্ছা স্যার, সেই ট্যাবলেটটা কি এখনও আপনার কাছে আছে?” “হ্যাঁ, এখনও আছে আমার কাছে। প্রিজার্ভ করে রেখে দিয়েছি। পরবর্তীকালে যদি কোনও বড় গবেষণায় লাগে, তার জন্য।”, স্যার ভ্রূ কুঁচকে বললেন। আমি ল্যাবের চারদিক দেখছিলাম। বারবারই চোখদুটো চলে যাচ্ছিল, অ্যাকোরিয়ামে রাখা সাদা রঙের প্রাণী গুলোর দিকে। আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার ল্যাবেই আছে সেই দুটো প্রাণী? তারা কি সেই যুগের প্রাণী না এই যুগের?” স্যার হেসে ফেললেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন আমার দিকে তাকিয়ে, “না অয়ন, এরা আমাদের যুগেরই প্রাণী। তবে স্পেশাল পারমিশন করে এদের আনতে হয়েছে। এদেরকে এই দেশে পাওয়া যায় না। চল, দেখাচ্ছি।“ আবার স্যারের ল্যাবে ঢুকলাম। সেই ঘর, সেই টেস্ট টিউব, পিপেটের সারি, আর স্পেসিমেনে ঘর ভর্তি। আমার চোখ চলে গিয়েছিল সাদা রঙের প্রাণীগুলোর দিকে। স্যারও সেদিকে তাকালেন। আমার মনের অবাক ভাবটা তখনো কাটতে চাইছিল না। এগুলোই সেই প্রাণী? স্যার তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চৌধুরী, আশা করি চিনতে পার ওগুলো কী?” “হ্যাঁ স্যার, এগুলো অ্যাক্সোলটল।” আমি ধীরে ধীরে বললাম। “আর এদের বিশেষত্বটা কী, মিস বর্ণালী?” স্যার যেন আগেকার মত পড়া ধরছেন, সেরকম ভাবে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন ওর দিকে। বর্ণালী খানিকক্ষণ ভাবল, তারপর কিন্তু কিন্তু করে বলল, “এরা নিজেদের যেকোনো অঙ্গ কাটা গেলে আবার তৈরি করে নিতে পারে?” “ব্রেভো। হ্যাঁ। একদম তাই। আর এইজন্যই এরা রিজেনারেটিভ মেডিসিনের সবথেকে বড় সেনসেশন। হাত, পা, এমনকি এদের কর্নিয়া কেটে নিলেও এরা তৈরি করে নিতে পারে তিন-চার দিনের মধ্যে।“ স্যার থেমে থেমে বললেন। “সমুদ্র, বল তো, কীভাবে এটা সম্ভব?” “সঠিকভাবে কোনও হাইপোথিসিস দেওয়া যায়নি। তবে, মনে করা হয়, ওরা কোনোভাবে ক্ষতস্থানের ম্যাক্রোফাজগুলোকে বেশি অ্যাক্টিভ করে তোলে ইন্টারলিউকিন ছেড়ে দিয়ে। ইন্টারলিউকিনও আসলে একপ্রকার সাইটোকাইন। আর তাই সেখানকার কোষগুলো রূপান্তরিত হয় প্লুরিপোটেণ্ট কোষে, যারা একইসাথে অনেকরকম কোষ তৈরি করতে পারে, যেটা আগেই বলেছি। তাই অত তাড়াতাড়ি রিজেনারেশন সম্ভব হয় ওদের শরীরে। এছাড়াও ওদের শরীরে প্লুরিপোটেণ্ট কোষের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। তাই এই অসম্ভবটা ওরা সম্ভব করতে পারে।“ সমুদ্র আউড়ে যায় কথাগুলো। “এক্সেলেন্ট।“ স্যার সমুদ্রর পিঠ চাপড়ে দেন। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। প্রমিথিউস কি সত্যি বাস্তবে কেউ ছিল? হেসিয়ড লিখে গিয়েছিলেন, বলেই সেটাকে প্রমাণ হিসাবে ধরতে হবে, এমন কোনও মানে নেই। কারণ আজ থেকে ২৭০০ বছর আগে কোনও কিছুর যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেওয়াটাই ছিল দুরূহ কাজ। কিন্তু যদি সত্যি হয়? যদি প্রমিথিউস বেঁচে থাকে? এমনকি, যদি হেসিয়ডের কথা সত্যিই হয়, তাহলে কি আজও বেঁচে আছে গল্পকথার সেই শক্তিমান টাইটান? সমুদ্র আমার মনের কথাটাই তুলে ধরল, “স্যার, একটা জিনিস বুঝতে পারছি, প্রমিথিউসের লিভার খুব তাড়াতাড়ি রিজেনারেট করত। কিন্তু…এমনটা কি হতে পারে, যে সে বেঁচে আছে?” “হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।“ স্যার খানিকটা আত্মমগ্ন হয়েই বললেন, “কারণ এটা তো জানার উপায় নেই, যে তার প্রযুক্তি তাকে রিজেনারেশন ছাড়া ইমমর্টালিটি বা অমরত্বের ক্ষমতাও দিয়েছে কিনা। আপাতত আমাদের কাজটা নিয়েই কথা বলা যাক, কেমন?” সমুদ্র সম্মতির সুরে বলল, “ঠিক আছে, স্যার। আপনি বলুন। আমরা শুনছি।“ স্যার বলা শুরু করলেন, “হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, হাইনরিখ ট্যাবলেটটা পড়ার পর থেকেই তার মাথায় ভূত চেপে বসে। তখন আমাদের বয়স কম, রক্ত ফুটছে। খানিকটা সঙ্গদোষে আমিও কাজটার জন্য জান লড়িয়ে দিতে থাকি। আমরা ঠিক করি, যে করেই হোক, প্রমিথিউস যেরকম যেরকম ভাবে ট্যাবলেটে লিখে গেছে, কীভাবে জিন এডিটিং করতে হয়, কীভাবে রিজেনারেশন ক্যাপাবিলিটি মানুষের বাড়িয়ে দিতে হয়, সেরকমভাবেই মানুষের রিজেনারেশন ক্যাপাবিলিটি বাড়াবো। বলতে গেলে, সেদিন থেকেই আমাদের নতুন প্রোজেক্ট শুরু হল। নামও দিলাম একখানা ভাল। প্রোজেক্ট প্রমিথিউস। তবে বলতে পার, শুরু থেকেই একটা অন্ধগলিতে ছুটছিলাম। ভরসা বলতে শুধু ঐ ট্যাবলেটটাই, যার সত্যি মিথ্যে যাচাই করার মত কেউ নেই তখন। ট্যাবলেটের ওপর লেখা প্রসেসটা তোমাদের সহজ করে বলি। ফাইনম্যান এর একটা কথা তো আছে, যে বিজ্ঞানকে সহজ করে বোঝাতে পারে না, সে বিজ্ঞান নিজেই বোঝে না। যখন কোন একটা শরীরে ক্ষত চিহ্ন সৃষ্টি হয়, তখন দুভাবে সেটা ঠিক হতে পারে। হয় প্রাইমারি ইনটেনশন দিয়ে অথবা সেকেন্ডারি ইনটেনশন দিয়ে। দুটো ক্ষেত্রেই যে রক্তপাত হয় সেখানে ইনফ্লামেশন হয়, ইনফ্লামেশন এর জন্য কিছু সাইটোকাইন তৈরি হয়। সাইটোকাইন হল কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যারা এক কোষ থেকে অন্য কোষে গিয়ে সিগন্যালিং করে। তারপর, ম্যাক্রোফাজ এসে কাটা জায়গাটার জঞ্জাল সাফ করে, রক্তপাত বন্ধ হয়, আর ফাইব্রিন প্লাগ জায়গাটাকে বিষিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচায়। আর বলা বাহুল্য, ম্যাক্রোফাজগুলো ঐ জঞ্জাল খেয়ে আরও সাইটোকাইন ছাড়ে, যেগুলো ওখানকার স্থানীয় ইউনিপোটেন্ট কোষগুলোকে জাগায়, বিভাজিত হবার জন্য। রিজেনারেশন তখন শুরু হয়। আর যখন রিজেনারেশন করেও কাটা জায়গার কোষের ঘাটতি পূর্ণ হয় না, তখন ফাইব্রোব্লাস্টগুলো কোলাজেন ফাইবার তৈরি করতে থাকে জায়গা ভরানোর জন্য।“ স্যার এবার বর্ণালীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার ভেবে বল তো, কেন তোমার আমার শরীরে কোনও কাটা ছেঁড়া হলে, সেই জায়গাটা কখনই তার পুরো কার্যক্ষমতা ফিরে পায় না?” বর্ণালী বিজ্ঞের মত বলতে থাকল, “স্যার যতদূর জানি, আমাদের শরীরের রিজেনারেশন খুব বেশি ভালো হয় না তার কারণ আমাদের শরীরের মধ্যে থাকা প্লুরিপোটেন্ট কোষের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তাই আমাদের রিজেনারেশন ফাইব্রোসিসেই সীমাবদ্ধ। সেই জন্য রিজেনারেশন রেটটা অত্যন্ত কম। রিসেন্ট গবেষণা বলছে যে স্টিমুলাস এর মাধ্যমে নরমাল কোষকে প্লুরিপোটেন্ট বানানো যায়।“ স্যার ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন, ” ঠিক। এটাও সেদিন ঐ পাথরের গায়ে লেখা ছিল। বুঝতে পারছ, কী বলতে চাইছি? প্রমিথিউস জানত, আর কোনোভাবে এই এক প্রযুক্তিই সে ব্যবহার করেছিল নিজের ওপর, যার জন্য তার লিভার রাতারাতি ঠিক হয়ে যেত।“ আমরা স্তম্ভিত তখন। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। গ্রিক পুরাণ, জিন, কিডন্যাপিং, বুড়ো জিপসির কথাগুলো, রিজেনারেশন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। যা ঘটছে, সবই কি বাস্তব তাহলে? কিন্তু তাহলে আধুনিক বিজ্ঞানের জায়গাটা কোথায় হবে? সবই তো শেষে পুরাণে, বা জাদুবিদ্যায় গিয়ে শেষ হবে। তাহলে যেখানে বিজ্ঞানের শেষ, সেখান থেকেই কল্পনার শুরু হয়? যাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে আমরা ব্যাখা করতে পারি না, তাকেই আমরা কল্পনা, অবাস্তব, পুরাণ বলেই চালিয়ে দিই? কিন্তু না, এখানে তো অ্যাডভান্সড জেনেটিক্স নিয়ে কথা হচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে মানুষের প্রজাতিই সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে পারে। কিন্তু এর সাথে ঝিনুকের কিডন্যাপিং এর সম্পর্ক কী? খানিকটা খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম, তাই আমি হাত তুললাম। স্যার বললেন, “বল?” আমি বললাম, “স্যার, নো ডাউট যে প্রযুক্তির কথা উঠছে এখানে, তা বাস্তব জীবনে ব্যবহার হলে, মানুষের লাইফ এক্সপেক্টেনসি তো বাড়বেই, তার সাথে ভার্চুয়ালি তার কোন অঙ্গই বিকল হবে না। কারন সে অঙ্গটার কোষগুলো নষ্ট হচ্ছে, সেগুলোকে সে নিজে নিজেই ঠিক করে নিতে পারবে।“ স্যার সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। “বলে যাও।“ “কিন্তু, আপনি যে প্রযুক্তির কথা বলছেন, সেটা জেনেটিক লেভেলে। জাইগোটের জিনে যদি বদল আনেন, সবকটা কোষেই তার প্রভাব পড়বে। তাহলে, না চাইতেও তার সমস্ত কোষই রিজেনারেট করতে শুরু করবে। তাহলে ব্যাপারটা শিপ অফ থেসাসের মত হয়ে গেল না? কোনওদিনই সে মরবে না, অথচ তার আগের শরীরটা আগের মত থাকবে না, কারন কোষগুলো সমানে পাল্টে যাচ্ছে। এমনকি তার কোনোদিনই মেমরি স্টোরেজ হবে না, কারন তার নিউরনগুলোও রিজেনারেট করছে।“ আমি প্রশ্ন করলাম। স্যার তখন থামলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “খুব ভাইটাল প্রশ্ন। সমুদ্র, বর্ণালী তোমরা এতক্ষণ এই প্রশ্নটা কেন করনি, আমি ভাবছিলাম। খুব ভাল প্রশ্ন, চৌধুরী। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে। আমার ব্যক্তিগত মত, খুব সম্ভবত পাল্টায় না। কারন স্মৃতি আর.এন.এ. হিসাবে স্টোর হয়, কোষ হিসাবে নয়। তবে আমি ভুলও হতে পারি।“ স্যার আবার বলা শুরু করলেন। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ে টান লাগছিল, বসলাম একটা চেয়ারের ওপর। দেখি, আমার দেখাদেখি ওরাও চেয়ারে বসল। স্যার কিন্তু দাঁড়িয়েই বলতে থাকলেন। আসলে এটা স্যারের অভ্যাস, যখন বলা শুরু করেন, তখন বসে থাকতে পারেন না। “আমরা গবেষণা শুরু করেছিলাম দুটো প্রাণীকে নিয়ে। একটা হল প্ল্যানেরিয়া কৃমি, অন্যটা তো দেখতেই পাচ্ছ, এই অ্যাক্সোলটলগুলো। দীর্ঘ দু’বছর গবেষণার পর আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম দুটো জিনকে যে দুটো জিনের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে, কি করে অ্যাক্সোলটল নিজের কাটা হাত-পা অতো তাড়াতাড়ি তৈরি করতে পারে। ঐ জিন বিভিন্ন পোকামাকড়, ছোট লতা এদের জিনে ঢুকিয়ে দেখলাম। রাতারাতি ফল পেলাম। ওদেরও রিজেনারেশন রেট স্বাভাবিকের থেকে বহুগুণে বেড়ে গেল। কিন্তু, প্রাণীদের ওপর কাজটা করতে গিয়েই জোর ধাক্কা খেলাম। আমরা গরম রক্তের প্রাণী। অ্যাক্সোলটল উভচর, তাই ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণী। কোনো উষ্ণ রক্তের প্রাণীর মধ্যে কোনও ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণীর এনজাইম আর হরমোন ঢোকালে অত বেশি টেম্পারেচারে নাও কাজ করতে পারে। কিন্তু, ট্রায়াল আর এরর মেথডে দেখলাম, হাই ইলেকট্রিক ডিপোলারাইজেশন করলে এই এনজাইমগুলো কাজ করে যাচ্ছে উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের মধ্যেও। তো সেই কারণে দুটো রাস্তা ভাবতে হল। কোন একটা অন্য স্পিসিসের প্রাণীর জিন দিয়ে এই ক্ষত নিরাময় করার প্রচেষ্টাকে আরো দ্রুত থেকে দ্রুততর করা যায় কিনা অথবা এমন কোনও প্রজাতির প্রাণী খোঁজা, যার শরীরে হাই ইলেকট্রিক ডিপোলারাইজেশন হয় প্রতিনিয়ত। আলটিমেটলি একটা ব্রিলিয়্যান্ট প্ল্যান হাইনরিখই দিল। প্রতিরক্ষাতন্ত্রের মধ্যে হিলিং আর রিজেনারেশনের জন্য আমাদের দেহে মুখ্য ভূমিকা নেয় ম্যাক্রোফাজ। তো ম্যাক্রোফেজগুলোকে যদি কোনভাবে খুব বেশি উত্তেজিত করে ফেলা যায়, তাহলে অতিরিক্ত সাইটোকাইন তৈরি হবে যেগুলো হিলিং প্রসেসকে ফাস্ট ফরোয়ার্ড করতে পারে। হঠাৎ মাথায় আইডিয়াটা চলে এল। হাতের কাছে এত ভাল একটা প্রজাতি থাকতে কেন যে অন্যত্র হাতড়ে মরছিলাম, কে জানে। বৈদ্যুতিক ইল মাছ, যাদের শরীরে কয়েক হাজার শ্যাক্স অরগ্যান থাকে, যেগুলো খুব দ্রুত পোলারিটি পাল্টে বিশাল পরিমাণে জৈববিদ্যুতের জন্ম দেয়। আলাদা করে সেই মাছের জেনেটিক প্রোফাইল করে খুঁজে বার করলাম, কোন জিনগুলো এই বিদ্যুতের ব্যাটারি কোষগুলো তৈরি করে। তারপর একটা ছোট ইঁদুরের ভ্রূণের মধ্যে সেই জিনগুলো ঢুকিয়ে রিকমবাইন করে একটা মেয়ে সারোগেট ইঁদুরের গর্ভে প্রতিস্থাপন করলাম। প্রথম কয়েকবার ব্যর্থতাই দেখতে হল। হয় গর্ভপাত হয়ে গেল, নয় কম্প্যাটিবল হল না। কিন্তু আট নম্বর বার সফল হল আমাদের পরিশ্রম। যে ইঁদুর জন্মাল, তার হাই রেজোলিউশন সিটিস্ক্যান করে দেখলাম, ব্যাটারি কোষগুলো মেরুদণ্ডের ঠিক পাশাপাশি দুসারি তৈরি হয়েছে। পরে ডিসেকশন করে দেখলাম, যে ব্যাটারি কোষগুলো তৈরি হয়েছে, তার সাথে ইল মাছের ব্যাটারি কোষগুলোর খুব অমিল নেই। আর তার আগে, ইঁদুরটার লেজ কাটার ঠিক এক মিনিটের মধ্যেই লেজটা গজাতে শুরু করল। এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুরো লেজ গজিয়ে গেল। কীভাবে এই রিজেনারেশনটা বেড়ে গেল এত দ্রুত, তার একটাই তত্ত্ব আছে আমার কাছে। যদিও, আমি আমার যুগের প্রযুক্তির জন্য খুব নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না, বলতে পারো, একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করাতে পেরেছি, যাতে বলা সম্ভব কীভাবে এই রিজেনারেশন হচ্ছে। অ্যাক্সোলটল আর মানুষের সাধারণ পূর্বপুরুষ ৩৬ কোটি বছর আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, তাহলেও ওদের আর আমাদের রিজেনারেশনের মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। যে জায়গাটায় তফাত, সেটা হল যে আমাদের আর ওদের ম্যাক্রোফাজের ভূমিকায়। আমাদের ম্যাক্রোফাজ বেশি করে কোলাজেন ফাইবার তৈরি করতে জোর দেয়, তাই আমাদের স্কার টিস্যু বেশি তৈরি হয়ে যায়, যার জন্য আর আমাদের কাটা হাত পা গজায় না। অন্যদিকে, ওদের ক্ষেত্রে ম্যাক্রোফাজগুলো স্কার টিস্যু তৈরি হতে দেয় না, কারন অ্যাক্সোলটলের ক্ষেত্রে কিছু জিন সুইচড অন, যেগুলো আমাদের ক্ষেত্রে অফ।  আর তাছাড়া আমাদের ক্ষেত্রে কোষকলার গঠন অনেক বেশি কমপ্লেক্স। তবু, তবু আমাদের শরীরের পুনর্গঠন সম্ভব যদি কোষগুলোকে বোঝানো যায়, যে তারা কে কোথায় আছে, এবং তাদের কী কী তৈরি করা উচিৎ কতটা পরিমাণে, যাতে একটা কাটা অঙ্গ আবার ঠিকভাবে তৈরি হয়ে যায়। অ্যাক্সোলটলের ক্ষেত্রে কাটা জায়গায় ব্লাষ্টেমা বলে একটা জিনিস তৈরি হয়, যেটা প্রথমে ওর কাটা অঙ্গ থেকে একটা অপরিণত অঙ্গ তৈরি করে, আর তারপর সেটা পরিণত হয়, প্রচুর পরিমাণে পরিণত কোষ তৈরি হবার জন্য। কিন্তু যেকোনো স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে ব্লাষ্টেমা তৈরি করতে গেলে প্রচুর ম্যাক্রোফাজ দরকার। কিন্তু অ্যাক্সোলটলের অনুপাতে আমাদের শরীরে ম্যাক্রোফাজের সংখ্যা অনেক অনেক কম। তাহলে কীভাবে ইঁদুরটার দেহে ওদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে ম্যাক্রোফাজের ক্ষেত্রে? আচমকাই মনে হল, শ্যাক্স সেল দিয়ে সমানে যে জৈববিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে, ওগুলো যদি ডিপোলারাইজ করে ম্যাক্রোফাজগুলোকে, সেজন্যই কি এরকম হচ্ছে? ওরা উত্তেজিত হলেই সাইটোকাইন ছাড়বে, তার পরের বিক্রিয়াগুলো পুরো চেন রিঅ্যাকশনে ঘটবে।“ স্যার একটু থেমে গেলেন। আমরা অধীর আগ্রহে শুনছিলাম। স্যার থামতেই বলে উঠলাম, “তারপর স্যার?” স্যার একটা রহস্যময় হাসি হেসে বলতে শুরু করলেন, “যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই। জৈববিদ্যুতের জন্যই ম্যাক্রোফাজগুলো এতটাই অ্যাক্টিভ হয়ে গিয়েছিল, যে যখনই লেজটা কাটলাম, ইলেকট্রিক্যাল পোলারিটি চেঞ্জের জন্য লেজের ওখানেই প্রচুর প্রচুর ব্লাষ্টেমা তৈরি হতে শুরু করল। তাই এত তাড়াতাড়ি লেজটা তৈরি হয়েও গেল। এতদূর অবধি সব ঠিকই ছিল। আমাদের সাফল্য দেখে আমরা নিজেরাই চমকে উঠেছিলাম। যথারীতি আমি ঠিক করলাম, এই গবেষণার কথা সবাইকে জানাব। সমস্ত পৃথিবী জানুক, যে আমরা শেষ পর্যন্ত টাইটানদের সমগোত্রীয় হতে চলেছি। কিন্তু, তখনও কিছু বাকি ছিল। ততদিনে আমি কাসান্দ্রাকে বিয়ে করেছি। কাসান্দ্রা, এখানকার ইউনিভার্সিটিতে জুলজির মাস্টার্স করছিল। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ঝিনুক হল। আমাদের এই সাফল্যের সময় ঝিনুক তখন মাসখানেকের হবে। আমি ভাবছিলাম, আমি বোধহয় সুখের সপ্তম স্বর্গে আছি। কিন্তু হাইনরিখ যে কত বড় শয়তান, আমি সেটা তখনও জানতাম না। একদিন ল্যাবে, সমুদ্র যে ড্রয়ারটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ড্রয়ারটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে দু তিনটে চিঠি পেলাম, সবকটাই সিল করা হাইনরিখের নামে। একটা চিঠি খোলা ছিল। চিঠিটা খুলতেই কয়েকটা কাগজ নিচে পড়ে যায়। কাগজগুলো কুড়িয়ে পড়া শুরু করি। পড়তে পড়তে আমার হাতপা থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। চিঠির মূল বক্তব্য, হাইনরিখ আমার এই প্রযুক্তিকে তুলে দেবে বিদেশি রাষ্ট্রের হাতে, বিনিময়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ পাবে। সেই প্রযুক্তি সুপার সোলজার তৈরির কাজে ব্যবহার হবে।” এখানে বর্ণালী একটা প্রশ্ন করল, “আচ্ছা স্যার, এরা সুপার সোলজার বানাতে চাইছিল কেন প্রযুক্তিটা ব্যবহার করে? এতে তো শুধুমাত্র সেলুলার রিজেনারেশন বাড়ে। এমন তো না, যে এতে কোনও মানুষ বিশাল শক্তিশালী হয়ে উঠবে বা অন্য কিছু?” স্যার গম্ভীর মুখে বললেন, “ তুমি ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবছ না বলে এই মন্তব্যটা করলে। তোমাকে দোষ দিই না, কারন যে প্রযুক্তি আমরা হঠাৎ করেই আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম, হিউম্যান রিসোর্সের ওপর ব্যবহার করলে তার অ্যাপ্লিকেশনের কোনও সীমা পরিসীমা থাকত না।” “কারণটা বলি। যেহেতু মানুষটার কোনও কোষই একবার নষ্ট হয়ে গেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফিরে আসবে। কোনও ফেটাল ইনজুরিই আর তার কাছে ফেটাল নয়। তাই মানুষটাকে ভার্চুয়ালি ধ্বংস করা অসম্ভব। হাত পা কাটা গেলেও কয়েক মিনিট থেকে কয়েকঘণ্টার মধ্যেই তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। সেই মানুষের সহ্যক্ষমতাও অসীম হয়ে যাবে, দু-তিনশ কিলোমিটার হাঁটতে বললেও একটানা হেঁটে দেবে, কেননা তার পেশিকোষগুলো ল্যাকটিক অ্যাসিডে নষ্ট হয়ে গেলেও আবার আগের মত তৈরি হয়ে যাবে। একই কারনে সেই মানুষটা তার নিজের সমস্ত শক্তি একবারেই ব্যবহার করতে পারবে। আর, সে চাইলে তার শরীরের যেকোনো কোষকেই বেশি বেশি করে  তৈরি করে নিতে পারবে। ধরা যাক, সে বেশি বেশি করে কেরাটিন তৈরির কোষগুলোকে তৈরি করতে থাকল, যার ফলে তার শরীরের বাইরে এমন এক কেরাটিনের স্তর তৈরি হল, যাকে ভেদ করে বুলেট কিংবা পারমানবিক বোমার রেডিয়েশনও যেতে পারে না। জানই তো, পারমানবিক বিস্ফোরণে আরশোলা কেন মরে না? সেই এই কেরাটিনের জন্যই।“ আমরা স্তম্ভিত হয়ে শুনছি তখন। মনে মনে ভাবছি, স্যার কত বড় আবিষ্কার করে ফেলেছেন না চাইতেই। নিজের হাতেই মানবসভ্যতার হয়ত সবথেকে বড় শক্তিশেল তৈরি করে ফেলেছেন উনি। তারপর আমিই জিজ্ঞাসা করলাম, “তারপর কী হল স্যার?” স্যার বিষণ্ণ ভাবে বলতে থাকলেন, “আমি যে ঐ সিল করা চিঠি পড়ছিলাম। ওটা হাইনরিখ দেখে ফেলেছিল। সঙ্গে সঙ্গেই ও ছুটে চলে আসে, আমার হাত থেকে যেনতেনভাবে ঐ চিঠিগুলো কেড়ে নেবার জন্য। তারপরই ওর সাথে আমার বচসা শুরু হয়। গোলমাল শুনে কাসান্দ্রা ল্যাবে ঢোকে। ওর কোলে ঝিনুক ছিল। ঐ গোলমালের মধ্যেই হাইনরিখের হাত লেগে একটা বড় সালফিউরিক অ্যাসিডের বোতল ছিটকে গিয়ে পড়ে ওর ওপর…” স্যার অনেক ক্ষণ ধরেই নিজের কান্নাটা চেপে রাখার চেষ্টা করছিলেন, আর পারলেন না। চোখ বেয়ে জল নামতে থাকল। আমরা স্যারকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষে সমুদ্র আর বর্ণালী স্যারকে ধরে অনেক কষ্টে শান্ত করল। আমরা ঐ ল্যাব থেকে বেরিয়ে এলাম ল্যাবের দরজা বন্ধ করে। ডাইনিং রুমে এসে প্রত্যেকে একটা চেয়ার দখল করে বসলাম। স্যার খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। চোখ লাল, কিছুক্ষণ আগের কান্নার জন্য। আমি আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, তারপর কী হল?” সমুদ্র আমার দিকে একবার ভুরু কুঁচকে তাকাল। ইঙ্গিতটা বুঝলাম, নিজে থেকেই তাই চুপ করে গেলাম। স্যার ৫ মিনিট কেটে যাবার পর নিজে থেকেই কথা বলতে শুরু করলেন, “কিছুতেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না। হাইনরিখ ঐ কাণ্ডের পরপরই পালিয়েছিল। কিন্তু, জুলিয়াসের ঠিক সময়ে করা ফোনকলের জন্যই ওকে এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হলো। যেহেতু ও জার্মানির নাগরিক, তাই দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভাল হবার জন্য ওকে জার্মানিতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। সেখানে ওর ২০ বছরের কারাদণ্ড হল।“ “এদিকে আমার তো যা ক্ষতি আবার হয়ে গেল। আমার স্ত্রী, মেয়ের এই মৃত্যু সহ্য করতে পারল না। কাসান্দ্রাও মাসখানেকের মধ্যেই চলে গেল। আমি পড়ে রইলাম এই বিশাল বাড়ীটা আর তার নিস্তব্ধতা নিয়ে।“ স্যার চুপচাপ বসে রইলেন। ঘরে তখন পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা। বাইরে শুধু ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দ। স্যারের কথাগুলো যদিও শুনছিলাম, একটা কথা বারে বারেই খটকা লাগছিল। স্যারের মেয়ে নেই, স্যার দত্তক নিয়েছিলেন। কিন্তু দত্তক মেয়েরও স্যারের মৃতা স্ত্রীর মত একই মুখের গড়ন? একই চোখমুখের আদল? এটা কীভাবে সম্ভব? এমনকি, কানের আকার, চুলের রং সব মিলে যায়। একটা সম্ভাবনা বিদ্যুতের মত দ্রুত মাথায় খেলে যায়। বুড়ো জিপসির কথা মনে পড়ে আরেকবার। “ভবিষ্যৎ তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে, অসম্ভবের রূপ নিয়ে। পারবে তুমি, পারবে এই রহস্য ভেদ করতে? কারন এই পৃথিবীতে সবকিছুই সম্ভব, কারন মানুষের কাছে অসম্ভব বলে কোনও শব্দ নেই।” তবে কি… তবে কি স্যার শেষ অসম্ভবটাও পার করতে পেরেছিলেন? “স্যার,” আমি গলায় জোর এনে শুরু করি, “স্যার আপনি আমার আগের প্রশ্নটার উত্তর দেননি এখনও। আপনি বলেছিলেন, যে এই রিজেনারেশনের জন্য মানুষের সমস্ত কোষ পালটালেও স্মৃতি পালটায় না। কেন জিজ্ঞেস করাতে আপনি বললেন, যে এর উত্তর আপনার কাছে নেই। কিন্তু, এতটা সিওর হয়ে “স্মৃতি পালটায় না।” এই কথাটা বলার জন্য প্রমাণ লাগে। প্রশ্ন হল, কার বা কীসের ওপর এই পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণ পেয়েছিলেন আপনি?” স্যার অবাক হয়ে গিয়েছেন, আমার কথা শুনে। আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। সমুদ্র আর বর্ণালীও উঠে দাঁড়িয়েছে। তাদের চোখে আমার প্রতি অবিশ্বাস স্পষ্ট, মানে তারা ভাবতেও পারছে না, আমি দুম করে এই প্রশ্নটা করব। কিন্তু, স্যারের মুখে কোনও উত্তর নেই। স্যার একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি তখনও বলে চলেছি, জানিনা কী ভর করেছিল তখন আমার ওপর, তবু পরের প্রশ্নটা করা থেকে নিজেকে আটকাতে পারলাম না। “ তাছাড়া, কয়েকটা জিনিস আমার অবাক লেগেছে। আপনার মেয়েকে আপনি বোর্ডিং স্কুলে রাখলেন, পড়ালেন, অথচ বছরে একবার কি দুবারের বেশি খোঁজ নিতে আসতেন না। অথচ, কিছু একটা ঘটল, যার পর থেকে আপনি এখানেই পাকাপাকি ভাবে থেকে গেলেন, আর দেশে ফিরলেন না। তার মানে, আপনি আপনার মেয়ের প্রতি হঠাৎ করেই এতটা দায়িত্বপরায়ণ হয়ে উঠলেন কেন, ভাবতে কষ্ট হয়। আর শেষ প্রশ্ন, আপনার মেয়ে তো আপনার দত্তক নেওয়া, তাই না?” বলতে বলতেই আমার মাথায় উত্তরটা জলের মত এসে গেল। কেন উনি কাজে রিজাইন দিয়ে গ্রিসে পাকাপাকিভাবে চলে এসেছিলেন ঝিনুকের কাছে। আমি একটু ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলাম, নিজের স্বরটা নিজের কাছেই বড্ড বেমানান শোনাল, “আপনার ফিরে আসাটা কি হাইনরিখের ফিরে আসার সাথে সম্পর্কিত?” দেখলাম, স্যার ঢোঁক গিললেন একবার। কপালে ওঁর ঘাম দেখা দিয়েছে। মাথা নাড়তেও যেন ভুলে গেছেন উনি। অতিকষ্টে মাথা নাড়লেন ওপরে নিচে একবার। তারপরেই প্রশ্নটা ছুঁড়লাম, “আমার শেষ প্রশ্ন, আপনার পালিতা মেয়ের মুখের ছবির সাথে আপনার মৃতা স্ত্রীর মুখের আদল, আর আপনার কানের আকার এত মিলে যায় কী করে? হিসাবমত তো, সে অনাথ। মানে তার মা-বাবা নেই। অথচ তার মুখের সাথে আপনার স্ত্রীর মুখের এতটা মিল? তার ওপর আপনার মতই তার কানের আকার? এতটা মিল বোধহয় কাকতালীয় নয়, তাই না স্যার?” ঘরের মধ্যে বোমা পড়লেও সবাই এত আশ্চর্য হত না। কিছুক্ষণ যেন সময় থমকে থাকে। বর্ণালীর মুখে তখনও অবিশ্বাস, কিন্তু সমুদ্রের মুখে দোটানা ভাবটা এখন স্পষ্ট। সে একবার তাকাচ্ছে স্যারের মুখের দিকে, আর একবার তাকাচ্ছে তার ফোনে সেভ করে নেওয়া ঝিনুকের মুখের ছবির দিকে। ক্রমশ তার মুখের ভাব পাল্টাচ্ছে। আর স্যার? স্যারের মাথা নিচু, একদৃষ্টে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। তারপর যখন কথা বলা শুরু করলেন, তখন আমরা সবাই অবাক হলাম। সেই উত্তেজনাই নেই স্বরে, যেন শান্ত সমুদ্র কথা বলছে বহু যোজন দূর থেকে এক পথভ্রষ্ট নাবিকের সাথে। “কারন ও আমার নিজের মেয়ে। ঝিনুকের কোষ থেকে ওকে ক্লোন করে টেস্টটিউব বেবি হিসাবে জন্ম দিয়ে নিয়ে এসেছি নিজের কাছে।“ স্যার শান্ত গলায় বলেন। সবাই মিনিট খানেকের জন্য পাথরের মূর্তি হয়ে যাই। কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না এখন, এমনই আমাদের অবস্থা। ঝিনুক আসলে স্যারের মেয়ে? নিজের? কিন্তু আসলে একটা রেপ্লিকা, একটা ক্লোন? সমুদ্র এই প্রথম উত্তেজিত হল। তর্জনী উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,“মানে? হিউম্যান ক্লোনিং? আপনি এতদূর নেমে গেলেন শেষ পর্যন্ত?” স্যার তখন তাকালেন আমাদের দিকে। এই প্রথম আমরা ভয় পেলাম। সেই শান্ত স্বরের সাথে সামঞ্জস্য মিলিয়ে সেই দৃষ্টিটা নেই। তার জায়গায় সেই জ্বলন্ত বহ্নিদৃষ্টিটা দেখতে পাচ্ছি আমরা, একটু আগেই যাকে জুলিয়াসের ঘরে দেখতে পেয়েছিলাম। স্যার মন্দ্রস্বরে কথা বলা শুরু করলেন, “ও। বাবা হয়ে মেয়েকে ফেরানোর চেষ্টাটা তাহলে অপরাধমাত্র, কি তাই তো সমুদ্র? তাই কিনা, বল না?” সমুদ্র আমতা আমতা করে কিছু বলতে যায়, স্যার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন। তারপর বলতে থাকেন ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে। “আমি, ঝিনুক চলে যাবার পর দুমাস অবধি পাগলের মত হয়ে গিয়েছিলাম। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে আমি এই বাগান বাড়িতে বসে থাকতাম। কিন্তু মেয়েকে ফিরে পাওয়ার এই পাগলের মতো নেশা আমাকেও একদিন গ্রাস করবে আমি বুঝতে পারিনি। যতদিনে গ্রাস করেছে ততদিনে আমি অনেকটা এগিয়ে গেছি। বলা হয়নি, আমার মেয়ের একটা ব্লাড স্যাম্পেল আমি আমার কাছে রেখে দিয়েছিলাম ওর ডেডবডি থেকে। ব্লাড স্যাম্পেলটা থেকেই আমি শুরু করলাম ঝিনুককে আবার নতুন করে বানানোর কাজ। তবে হ্যাঁ, এবারে আমার সমস্ত জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জ্ঞান প্রয়োগ করলাম ওকে বানাতে। আমার আসল মেয়ে তো ফিরে আসবে না, তবে যে মেয়েই ফিরে আসুক, তার শরীরে তো আমার, ক্যাসান্দ্রার রক্ত বইবে। আমি জানি আমি চূড়ান্ত অনৈতিক একটা কাজ করেছি, হিউম্যান ক্লোনিং আইনত নিষিদ্ধ। ঈশ্বর আমাকে কোনদিন ক্ষমা করবেন না, আমি সে ব্যাপারেও নিশ্চিত। বহু, বহু চেষ্টা চালানোর পর একদিন সফল হলাম আমি। আমি পারলাম আমার মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে। একজন সারোগেট মা’কে ভাড়া করে ওকে প্রতিস্থাপন করালাম ওঁর গর্ভে। স্থানীয় হাসপাতালের গাইনিকোলজির একজন প্রফেসর আমার খুব ভাল বন্ধু। ওঁর নাম করব না। ওঁর সাহায্যেই এই কাজটা সম্পূর্ণ হল। ঝিনুকের জন্ম হলো।… আমি বাবা হয়ে আর চুপ করে বসে থাকতে পারিনি যেখানে জানি যে শুধু আমার নয়, প্রমিথিউসের সমস্ত জ্ঞান আমার মেয়েকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে মৃত্যুর মুখ থেকে। কিন্তু, এবারে আমি আরেকটা কাজ করলাম, যেটা হয়ত ওকে এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে রাখবে। “ আমি কাটা কাটা স্বরে বললাম, “আপনি আপনার আবিষ্কার, অর্থাৎ সেলফ রিজেনারেশনের জেনেটিক এনহ্যান্সমেন্টগুলো ওর জিনোমে জুড়লেন। প্রোজেক্ট প্রমিথিউসের হিউম্যান ট্রায়ালটা করলেন আপনার নিজের মেয়ের ওপর।“ জানিনা কখন নিজের কথার স্বরে এত ঘৃণা চলে এসেছিল। “ছিঃ, স্যার। এতদিন আপনাকে শ্রদ্ধা করতাম, এখনও হয়ত করব। কিন্তু, আপনার এই কাজটা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ছিঃ, বাবা হয়ে মেয়ের ওপর এই অত্যাচারটা করলেন? গিনিপিগ বানালেন শেষে? ও যখন জানতে পারবে, তখন? তখন ও আপনাকে কী চোখে দেখবে, ভেবেছেন?” “ঝিনুক প্রথম থেকেই জানে।“ স্যারের স্বর যেন অনেক দূর থেকে আসছে। “মানে?” আমরা তিনজনেই অবিশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলাম। “মানে? ও কী করে জানে?” “ঝিনুককে বড় করেছি আমি নিজে। জন্ম থেকেই কড়া নজরে রাখতাম আমি। হয় আমি, নয় জুলিয়াস। ওর ছয় বছর বয়স অবধি সব দেখভাল আমি নিজে করেছি। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়ত প্রমিথিউসের কাজ ওর শরীরে ঠিকভাবে কম্প্যাটিবল হয়নি। তাই আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মত বেড়ে উঠছে ও। কিন্তু, আমি যে ভুল ভাবছিলাম, সেটা ভাগ্যই আমাকে একদিন বুঝিয়ে দিল। একদিন ঝিনুক খেলতে গিয়ে পড়ে গেল খেলার মাঠে। তার হাঁটুটা ছড়ে গেল। আমি কাছেই ছিলাম। ওর কান্না শুনে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলাম। কাছে আসতেই অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, অত বড় কাটা দাগটা এক-দুই সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি গিয়ে ওর ব্লাড প্রোফাইল চেক করলাম। যা সন্দেহ করছিলাম তাই। বিটি, সিটি, ইএসার, সব স্বাভাবিকের থেকে দুই-তিন গুন কম, অথচ ওর রক্ত স্বাভাবিক মানুষের মতই জমাট বাঁধছে। অদ্ভুত এক মিরাকল। ঝিনুকের জন্ম থেকে কোনও রকম রোগভোগ নেই, কোনও রকমের গণ্ডগোল নেই। স্বাভাবিক একটা মেয়ের যে গ্রোথ মাইলস্টোনগুলো হয়, সবকটাই ও একে এক পেরিয়েছে কোনও গণ্ডগোল ছাড়াই। নরমাল আর পাঁচটা মেয়ের মতই ওর পিরিয়ড হয়। ক্লাস এইটে একবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে পা ভাঙল, ১৫ মিনিটের মধ্যেই সেই ভাঙ্গা পা জুড়ে গেল। বুঝলাম, আমি সফল। জুলিয়াস অবশ্য আমাকে বলেছিল, একবার ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু এক্সরেতে  পরিষ্কার দেখতে পেলাম, কোনও ফ্র্যাকচার লাইন নেই। ম্যাজিকের মত মিলিয়ে গেছে যেন ঐ ভাঙ্গা হাড়। ওকে ছোট থেকেই চোখে চোখে রাখতাম। ও যখন ছোট, তখন থেকেই ওকে বোঝাতে শুরু করলাম ওর কী কী ক্ষমতা হতে পারে, কী কী হয়েছে, আর ও যেন ওর ক্ষমতাগুলোকে সবার থেকে লুকিয়ে রাখে। ওকে বাংলা বলা শেখালাম। দেখলাম, দু তিন মাসের মধ্যেই বাংলা ভাষা আয়ত্ত করে নিল। প্রথমে অবাকই হয়েছিলাম, কিন্তু পরে বুঝলাম, ওর নিউরনগুলোর কোনও ক্ষয় হচ্ছে না, আর তাছাড়া নিউরনগুলোর মধ্যে ক্রস-কানেকশন আর ফায়ারিং রেট স্বাভাবিক মানুষের থেকে আলাদা হবার জন্য ওর ইন্টেলিজেন্স অনেক, অনেক গুণে বেশি।“ এইখানে সমুদ্র একটা প্রশ্ন করল, “আচ্ছা স্যার, ওর জিনোমে তো ইলের জিন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ইল মাছের যেটা স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, ভয় পেলে বা রেগে গেলে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, সেরকম কিছু কী ওর মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন?” স্যার খানিকক্ষণ ভাবলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “না, এরকম কিছু দেখিনি। যদিও তোমার এই প্রশ্নটা স্বাভাবিক, কিন্তু এখনও অবধি আমি সেরকম কোনও শক খাইনি।। খেতেও চাইনা।“ এই প্রথম দেখলাম, সমুদ্রের মুখে মৃদু হাসি। একটু আগেই যে পরিমাণে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, সেই উত্তেজনার লেশমাত্রও নেই তার মধ্যে। এর মধ্যে ক্রিস গিয়ে কফি নিয়ে আসল কিচেন থেকে পরিবেশটা খানিক হালকা করতে। বাকি কথা কফি খেতে খেতেই হল। “ও মাঝে মাঝে প্রশ্ন করত, কিন্তু আমি উত্তর দিতে পারতাম না, কারন উত্তর দিতে গেলেই সেই রাতের স্মৃতিগুলো মাথায় এসে ভিড় করত, আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিতাম।“ স্যার কফির গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললেন, “ও বুঝদার মেয়ে ছিল, বয়সের কারণেই হোক, কী ওর এই এনহ্যান্সড জেনেটিক মেকআপের জন্যই হোক, ও আমার কষ্টটা বুঝত।” আমি ওকে লুকিয়ে রেখেছিলাম সবার থেকে। ওকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, নিজের কাছে রাখতে চাইনি, যাতে কেউ অতটা সন্দেহ না করে। কারণ, এই কথাগুলো তো কোথাও প্রকাশ করার মত নয়। কেউ যদি জানতে পারে, কোন বিদেশী রাষ্ট্র যদি জানতে পারে, তারা এই ক্ষমতার অপব্যবহার করবে। তারা লুফে নেবে এই প্রযুক্তিকে। আর আমার মেয়েটাকে ওরা কাটাছেঁড়া করবে। বাপ হয়ে তো মেয়ের এই দিন দেখতে পারি না। তাই ওকে সবার থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যই ওকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম।“ “যখন দেখলাম, ভালভাবেই ও অঠেরো বছর অব্দি সফলভাবে পড়াশোনা করেছে, কোনো রকম কোনো অসুবিধা হয়নি, কোনো রকম বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি, বা ওর আসল পরিচয়টা বেরিয়ে আসেনি,  আমি ভাবলাম যে হয়তো আমি ওকে নিয়ে দেশে ফিরে আমার শেষ জীবনটা শান্তিতে কাটিয়ে দিতে পারব। গ্রিসে ফিরে ওকে নিয়ে, এই বাড়িটা বেচে দিয়ে পাকাপাকিভাবে ফিরে যাব। দেশের টান যে বড় টান! কিন্তু, সুখ জিনিসটা বোধহয় কারোর কারোর কপালে লেখাই হয় না। তোমাদের যখন কলেজে পড়াতাম তখনই  মাঝে মাঝে মনে হত, ওকে নিয়ে আসি। তোমাদের যেমন নিজের ছেলেমেয়ের মত করে পড়াই, ওকেও পড়াব। ওকেও কলকাতায় বিভিন্ন অলিগলি ঘুরিয়ে আনব। কিন্তু, একদিন খবর পেলাম, হাইনরিখ জেল ভেঙে বেরিয়েছে। খবরটা জুলিয়াসই প্রথম দেয় আমাকে। বুঝে গেলাম, ও ফিরে আসবে, আমার সাথে ওর সমস্ত কাজের হিসাব মেটানোর জন্য। আর সবার আগে, ওর প্রথম টার্গেটই হবে ঝিনুক। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার কাজে রিজাইন দিয়ে চলে এলাম গ্রিসে। তারপর থেকে এক মুহূর্তের জন্য ঝিনুককে কাছছাড়া করিনি। ওর কিছু ক্ষতি হয়ে গেলে তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। আমার কাছে তো আমার মেয়েই সব। মেয়েকে ছাড়া তো আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন।“ “এবার তোমরাই বল আমার কী শাস্তি হওয়া উচিৎ। আমি তো তোমাদের চোখে নেমে গেছি বুঝতে পারছি। কিন্তু, নিজের মেয়ের চোখে নেমে যেতে আমার বুকে খুব বাজবে, সে ধাক্কা আমি সামলাতে পারব না।“ শেষদিকে স্যারের কণ্ঠস্বর ঝাপসা হয়ে ওঠে। মুখে হাত চাপা দিয়ে শিশুর মত কাঁদতে থাকেন উনি। আমরা চার মূর্তি নীরব মোমের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থাকি। কীই বা বলব, কীইবা বলার আছে আমাদের? জুলিয়াস জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। হয়ত সেও কাঁদছে, কিন্তু আমাদের দেখতে দিতে চায় না। দূরে কোনও এক নাম না জানা চার্চের ঘড়িতে রাত দশটার ঘণ্টা বাজে। রাতচরা পাখিগুলো চড়া কর্কশ শব্দে ডেকে উড়ে যায়।

পাঁচ

একসময় আমিই বললাম, “যা হবার, তা তো হয়ে গেছে স্যার। অতীত ঘেঁটে আর লাভ নেই। সবার আগে ঝিনুককে খুঁজে বার করা প্রয়োজন। ও যখন পালিয়েছে ক্রিমিন্যালগুলোর খপ্পর থেকে, নিশ্চয়ই ও বাড়ি চলে আসবে।“ স্যারের সম্বিৎ ফিরে আসে। ধরা গলায় জিজ্ঞেস করেন, “সেই তো। এতক্ষণে তো ওর চলে আসার কথা। থিবা তো এখান থেকে বেশি দূর নয়। তাহলে?” এই সময় হঠাৎ করেই রেসিডেন্সিয়াল টেলিফোনটা বেজে ওঠে। স্যার ধরতে যাচ্ছিলেন। বর্ণালী স্যারকে থামাল। বলল, “না স্যার। আপনি ক্লান্ত। একটু রেস্ট নিন। আমি ধরছি।“ স্যার বিশেষ প্রতিবাদ করলেন না। চুপচাপ বসে পড়লেন আমার পাশের চেয়ারটায়। বর্ণালী গিয়ে ফোনটা ধরল। দেখলাম, ওপাশ থেকে এমন কিছু কথা হচ্ছে, যার জন্য বর্ণালীর মুখটা ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ বর্ণালী চিৎকারই করে উঠল, “বাস্টার্ড। একবার যদি দেখা পাই…” ততক্ষণে ফোনটা কেটে গেছে। কারণ বারকয়েক হ্যালো হ্যালো করেও বর্ণালী কোনও প্রত্যুত্তর পেল না। আমরা তাকালাম ওর দিকে। দেখলাম ও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ভাষাটা বোধহয় আমরা তিনজনেই পড়ার অভ্যেস করে ফেলেছিলাম, কেন না তিনজনেই প্রায় একসাথেই বলে উঠলাম “হাইনরিখ।” আমি আর সমুদ্র প্রশ্নের সুরে, বর্ণালী হতাশায়। স্যার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। “কী হয়েছে? কী বলছে সে?” বর্ণালী সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর চাপা গলায় বলল, “ঝিনুক বন্দী। হাইনরিখ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে স্যার। বলল, সব ঘটনার সূত্রপাত যেখানে হয়েছিল, সেখানেই চলে আসতে। চার ঘণ্টা সময় দিয়েছে আমাদের। আর সঙ্গে প্রমিথিউসের ট্যাবলেটটাও আনতে বলেছে। বলেছে, দেরি করলে আপনার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আপনার মেয়ের ওপর দিয়েই নেবে সে। পুলিশ আনলে আপনার মেয়ের বডি ও ইজিয়ান সাগরের হাঙরদের খাইয়ে দেবে, বলেছে।“ স্যার বসে পড়লেন মেঝের ওপর। মুখে হাত চাপা দিলেন উনি। ক্রিস উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “খবরদার, মিঃ সেন। ভুলেও যাবেন না। ওটা একটা পাতা ফাঁদ। আমরা এখনও জানি না ঝিনুক ওর হাতে কিনা। হতেই পারে, এটা ওর ব্লাফ। আমাদেরকে বন্দী করে তারপর আমাদেরকে র‍্যানসম হিসাবে দাবি করে ও ঝিনুককে নিজের কাছে টেনে আনবে। তারপর বিদেশে পাচার করে দেবে।“ আমি কথাটা ভেবে দেখলাম। খুব ভুল কিছু বলেনি ক্রিস। এই ভাবে ভেবে দেখলে, সত্যিই এটা একটা পাতা ফাঁদই বটে। কিন্তু উলটোটাও সত্যি হতে পারে। হয়ত সত্যিই হাইনরিখ ঝিনুককে বন্দী করেছে। আমি তাই বর্ণালীকে বললাম, “ফোনের ওপাশে কিছু আলাদা শব্দ শুনতে পেয়েছিস?” বর্ণালী প্রশ্নটা শুনে কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর বলল, “ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ, আর সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। আর বিশেষ কিছু শুনতে পাইনি।“ আমি স্যারের দিকে তাকালাম। স্যার তখনও মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে আছেন। বললাম, “স্যার, দেরি করলে চলবে না। আসুন। যাওয়া যাক। ঝিনুককে বাঁচাতে যেতেই হবে।” “কিন্তু তুমি জানো, ট্যাবলেটটা ও ফিরে পেতে চাইছে। ওটা দিয়ে ও কী কী করতে পারে, তোমার কী কিছুই ধারনা হয়নি?” স্যার উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন। “আমি মরে গেলেও ওটা হাইনরিখের হাতে তুলে দেব না।“ আমি তখন স্যারের পাশে বসলাম, তারপর সহানুভূতির স্বরে বললাম, “স্যার, আপনার কাছে বিজ্ঞান আগে না মানুষের প্রাণ আগে? আপনি কি একবারও ভাববেন না ঝিনুকের কথা? হয়ত আপনার গবেষণার দৌলতে ওর প্রা…” বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। কথাটা ঘুরিয়ে বললাম, “ওর বড় কোনও ক্ষতি ওরা করতে পারবে না। কিন্তু যে মেয়েটার জন্য আপনি মরজগতের এত বড় একটা নিয়ম একা নিজের হাতে ভেঙ্গে দিয়েছেন, তার কথা কি একবারও ভাববেন না?” স্যার তাকালেন আমার দিকে। ওঁর অবস্থা দেখে মায়া হচ্ছিল ওঁর ওপর। অনেকক্ষণ দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা। তার পর, স্যার বললেন, “ঠিক আছে। ট্যাবলেটটা চায় তো ও। তাই পাবে।“ আমি মুচকি হাসলাম। “কিন্তু স্যার, তার আগে একটু আমাদেরকেও কিছু কাজ করে নিতে হবে। চোরের ওপর বাটপাড়িটা না করলে চলছে না।“ স্যার অবাক হয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন, “চোরের ওপর বাটপাড়ি? মানে?” আমি একটা রহস্যময় হাসি হাসলাম। “আমরা আছি কী করতে স্যার? একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে। চলুন বলছি।“ রাত বারোটা। ইজিয়ান সাগরের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে স্পিডবোট। বোটে পাঁচজন বসে। আমি, বর্ণালী, সমুদ্র, ক্রিস আর স্যার। স্পিডবোটের ব্যবস্থা ক্রিস করে দিয়েছিল। স্যারের বাড়ি থেকে দু কিমি দূরে যেখানে মাঝিদের বস্তি, সেখানে তার বন্ধু পলকে বলে তার স্পিডবোটটা চেয়ে নিয়েছে। ক্রিস নৌকা চালাতে জানে, সেই চালাচ্ছে বোটটা। আর ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই “লাইফলাইন”, মানে আমাদের বোটটা পৌঁছে যাবে সেই দ্বীপে। চারিদিক দিয়ে ঝড়ের বেগে সমুদ্রের নোনা বাতাস চলে যাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে ভরসা স্পিডবোটের সার্চলাইটের আলো আর রাডার। সমুদ্র দাঁড়িয়ে আছে ডেকের ওপর। স্যারের কোলে রাখা একটা বড় সুটকেস। পাথরের ট্যাবলেটটা সেই সুটকেসের মধ্যেই কায়দা করে রাখা, যাতে জলে না ভিজে যায়। স্পিডবোটের ওপর বসে থেকে দেখছিলাম, চারদিক। সমুদ্রের ঢেউ আর গর্জনে স্পিডবোটটা পুরো দুলছিল, কিন্তু তার মধ্যেও তিরবেগে এগিয়ে চলেছে সেটা। অন্ধকারের মধ্যে শুধু সামনেটুকু বাদ দিয়ে বাকি চারদিকই কালোয় ঢাকা লাগছিল। এতটাই কালো, যে দেওয়াল বললেও অত্যুক্তি হবে না। সঙ্গে অস্ত্র বলতে শুধু দুটো পিস্তল জোগাড় করা গেছে। ক্রিস আর সমুদ্র সে দুটো নিয়েছে। দুজনেই নবিশ এই গুলি চালানোর ব্যাপারে, আর কেই না জানে, অনভ্যস্ত হাতে বন্দুক চালানো নিজের পক্ষের লোকেদের কাছেও বিপদজনক। তাই বলে দেওয়া হয়েছে, একমাত্র ক্লোজ রেঞ্জ ছাড়া যেন কেউ গুলি না করে। সবার চোখে মুখেই উৎকণ্ঠা। উত্তেজনার পারদ প্রতি মুহূর্তেই চড়ছে। হাইনরিখের ফোনের পর আমরা সবাই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ক্রিসের গাড়িতে বেরিয়ে পড়ি। প্রায় বলার কারন, স্যারের কাছ থেকে পাথরের ট্যাবলেটটা নিয়ে একটা কালো স্যুটকেসে বিশেষভাবে ঢোকানো যাতে জল লেগে নষ্ট না হয়ে যায়। তার সাথে আরও কিছু ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। গাড়িতে উঠে যখন আমরা মাঝিদের বস্তিদের দিকে চলেছি, তখন একবার যেন মনে হয়েছিল, কেউ আমাদের ফলো করছে। একটা এক্সপ্রেসওয়েতে ক্রিস যখন গাড়ি তুলল, দেখলাম, একটা সাদা ট্যাক্সি আমাদের ঠিক পেছন পেছনই আসছে। তবে মিনিট চল্লিশ পরেই ট্যাক্সিটা রাস্তা বদলে আমরা যেদিকে যাচ্ছি, তার উল্টোদিকে চলে যায়। আমি ক্রিসকে ইঙ্গিত করে গাড়িটা স্লো করতে বলেছিলাম, যাতে অনুসরণকারীদের মুখটা দেখা যায়। গাড়িটা আমাদের পাশ দিয়েই দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেল, কিন্তু ডার্ক টিন্টের কাঁচ হবার জন্য ভালো বুঝতে পারলাম না কে ফলো করছিল আমাদের। বর্ণালী চাপা গলায় বলেছিল, “হাইনরিখের লোক কি? তাহলে ওদের পাল্টা ফলো করব।” আমি বললাম, “হতেও পারে। কিন্তু, এখন সময় নেই। দেরি করে লাভ নেই।“ এইসব বসে বসে যখন ভাবছিলাম, তখন খেয়ালও করিনি যে দ্বীপ কাছেই এসে গেছে। হুঁশ ফিরল যখন স্পিডবোটটা একটা হ্যাঁচকা টানে থেমে গেল। আমরা জল ভেঙ্গে ভেঙ্গে নামলাম। হাতে টর্চ প্রত্যেকের। ক্রিস দড়ি দিয়ে বেশ করে বাঁধল স্পিডবোটটার সাথে কাছের একটা বড় পাথরের সাথে। জিজ্ঞেস করাতে বলল, “শুধু নোঙরে ভরসা পাচ্ছি না। যা ঝড় আসছে, শুধু নোঙরে নৌকা থাকবে না।“ চারদিকে ঘন অন্ধকার। ঝোপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে শুধু নিস্তব্ধতাই ভেসে আসছে। শুধু দূরে একটা লাইট হাউসের তীব্র আলো দেখা যাচ্ছে। স্যার বললেন, “চলো। ওরা খুব সম্ভবত দ্বীপের ধারেই যে লাইটহাউসটা রয়েছে, সেখানে রয়েছে।“ সমুদ্র বলল, “ কী করে বুঝলেন স্যার?” স্যার দেখালেন টর্চের আলোয়, “ঐ দেখো। লাইট হাউসের জোরালো আলোর নিচে, মাটিতে কতগুলো আলোর বিন্দু দেখতে পাচ্ছ? ঐগুলো খুব ভুল না হলে টর্চের আলো। ওখানেই ওরা অপেক্ষা করছে আমাদের। ওরা জানে, আমরা এসেছি। কারন স্পিডবোটটার আলো ওরা দূর থেকেই দেখতে পেয়েছে।“ অস্বীকার করব না, স্যারের কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্য হলেও, বুকটা কেঁপে ওঠে। যাদের সামনাসামনি হতে চলেছি, তাদের মানুষ খুন করতে একটুও যে হাত কাঁপে না, তা এই কয়েকদিনে ভালই হৃদয়ঙ্গম করেছি। তবু তাদের মোকাবিলা করতে চলেছি আমরা। নিজের দেশের মাটিতে পা রেখে, নিঃশ্বাসটা ফেলার মত ভাগ্য হবে তো আমাদের সকলের? প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারব তো? নাকি আমাদের অভিযানের এখানেই ইতি হবে? এমনই এক নাম না জানা দ্বীপে পড়ে থাকবে আমাদের বুলেটবিদ্ধ শরীরগুলো, প্রকৃতির নিয়মে যা আবার মিশে যাবে মাটিতে? নাহ, মনটা শক্ত করা দরকার। হাইনরিখের মত একটা পিশাচের হাতে যদি এই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্লু প্রিন্ট চলে যায়, পৃথিবীতে তৃতীয় মহাযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এমনকি লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড সুপারসোলজারগুলোর হাতে। এ হতে দেওয়া যায় না। যেকোনো মূল্যেই হোক, এই বিপদকে রুখতেই হবে। আমি অবশেষে বললাম, “চলুন, যাওয়া যাক।” সবাই আমরা মুখ বুজে এগোতে লাগলাম লাইট হাউসের দিকে। বলা হয়নি, এতক্ষণে বেশ একটা ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। খুব সম্ভবত বৃষ্টিও নামবে এখানে। একটু একটু শীতও যেন লাগছে। পুরো রাস্তাটাই পাথর আর জঙ্গলে ঢাকা। পাথরগুলোর ওপর শ্যাওলা স্তরে স্তরে জমেছে। মাঝে মাঝেই পিছলে যাচ্ছিলামও। জঙ্গল ঘন নয় সেরকম, কিন্তু সাপখোপের ভয় তো আছেই। তাই সাবধানে এগোচ্ছিলাম। সামনে বর্ণালী, সমুদ্র, মাঝখানে স্যার আর পেছনে ক্রিস আর আমি। আমি একটা ভাঙা ডাল কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। হাতের কাছে কিছু না পেলে এটাই আত্মরক্ষার কাজে লাগবে। মাঝে মাঝেই বড় বড় ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ পাচ্ছিলাম। লাইট হাউসের আলো ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। একটা চাপা উত্তেজনায় নিজের বুকের হৃৎস্পন্দনই শুনতে পাচ্ছিলাম, হাপরের মত ওঠানামা করছে যেন। হঠাৎ করেই পেছনে একটা খসখসে শব্দ। কেউ যেন পাতা মাড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়েই। ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে টর্চের আলো ফেললাম। কিন্তু, ঝোপঝাড় ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না। ক্রিস জিজ্ঞেস করল, “কী? কিছু দেখতে পেলে?” আমি মাথা নাড়লাম। এই সময়ে সবাইকে মিথ্যে একটা প্যানিকের মধ্যে ফেলে লাভ নেই, বিশেষত যেখানে কিছুই দেখতে পাইনি আমি। এখন এটা নিয়ে মাথা ঘামালে যে উদ্দেশ্যে এসেছি, সেটাই ব্যর্থ হবে। হাতে সময়ও কম। তাই দ্রুত পা চালালাম। লাইটহাউসের আলোয় ধীরে ধীরে সামনের জায়গাটা স্পষ্ট হল। এমনিতে লাইটহাউসের বড় আলোটা বাদ দিয়েও সামনে দু-তিনটে আলো জ্বলছে, জেনারেটরের ঘটঘট শব্দ হচ্ছে। দশ বারো জন মূর্তিমান সশস্ত্র লোক দাঁড়িয়ে আছে সারি দিয়ে। আর যে ব্যক্তি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে গাঢ় কালো সাফারি স্যুট পড়ে, তাকে একবার দেখলেই খল প্রকৃতির মানুষ বলে মনে হয়। লম্বা, চওড়া মানুষটা কম করে হলেও সাড়ে ছয় ফুট লম্বা। গালের বাঁদিকে একটা কাটা দাগ। চোখগুলো সরু, কিন্তু ক্রূরতায় ভর্তি। হাতে একটা বড় পিস্তল ধরা, আর অন্য হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। স্যার তাকে দেখেই চমকে উঠলেন। কিন্তু সেই ধাক্কাটা সাময়িক, তার পরেই তাঁর চোখগুলো রাগে লাল হয়ে যেতে থাকল। রগের দুটো শিরা ফুলে উঠল কয়েক মুহূর্তেই। “চিনতে পারছ, সেন?” ইংরাজিতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথাগুলো বেরিয়ে এল লোকটার মুখ থেকে।

ছয়

“পারব না?”, স্যার যেন স্থান কাল পাত্র ভুলে গেলেন, উন্মত্তের মত চিৎকার করে উঠলেন, “যার জন্য আমাকে আমার স্ত্রী, কন্যা দুজনকেই হারাতে হয়েছে, যার জন্য আমি এতগুলো বছর মানসিকভাবে শান্তি পাইনি কোনোদিনই, তাকে চিনব না? হাইনরিখ, তোমার সাহস হয় কী করে আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করার?” “আস্তে, বন্ধু, আস্তে। আমি যা শুনেছি, তোমার শরীরটা এখন ভালো যাচ্ছে না।“ হাইনরিখ চোখ টিপল। “বেশি উত্তেজনা কিন্তু তোমার স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ। যাই হোক, ওসব পুরনো কথা ছেড়ে কাজের কথায় আসি। প্রমিথিউসের নিজের হাতে লেখা ট্যাবলেট, সেটা কোথায়?” স্যার বললেন রুদ্ধস্বরে, “আগে আমি আমার মেয়েকে দেখতে চাই। তারপর তোমার ট্যাবলেটের কথা।” হাইনরিখ হাহা করে হেসে উঠল। তারপর হাসতে হাসতেই বলল, “তোমার কি মনে হয়, তুমি এখানে নেগোশিয়েশনের জায়গায় আছ? আটটা বন্দুক তোমার দিকে তাক করা আছে। তুমি একটাও টুঁ শব্দ করবে, প্রত্যেকটা গুলি তোমাদের প্রত্যেকটা স্কাল বোন টুকরো টুকরো করে বেরিয়ে যাবে। কাজেই নিজের ভাল চাও তো পাথরটা দিয়ে যাও।“ স্যার খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। রাগে কোনও কথা বেরোচ্ছিল না ওঁর মুখ থেকে। তারপর মাথা ঠাণ্ডা করে বললেন, “ঠিক আছে, অয়ন, স্যুটকেসটা দিয়ে দাও। আর হাইনরিখ, ঝিনুককে এখানে দিয়ে যাও।“ হাইনরিখ একটা ক্রূর হাসি হাসল। আমি স্যারের হাত থেকে স্যুটকেসটা নিয়ে হাইনরিখের দিকে এগোতে থাকলাম। মাঝপথে গিয়ে আমি কেসটা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হাইনরিখ এগিয়ে এল আমাদের দিকে, তার হাতের লুগারটা তখনও আমাদের দিকে পয়েন্ট করা। আমার একদম সামনে দাঁড়িয়ে এসে সে তাকাল আমার দিকে। তারপর কেসটা হাতে নিয়েই পিছিয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে। আমি চিৎকার করে বললাম, “আমরা তো আমাদের কথা রাখলাম। এবার ঝিনুককে ফিরিয়ে দাও।“ হাইনরিখ হাহা করে হেসে উঠল। তারপর ক্রূর হাসি হেসে বলল, “ঝিনুক? কে ঝিনুক? আমাদের কাছে কোনও ঝিনুকই নেই। আমরা তো শুধু তোমাদের বাজিয়ে দেখছিলাম। তোমাদের নিয়ে তো আমাদের কোনও কাজ নেই। আমার কাজ শুধু এই পাথরটা আর তোমার মেয়েকে নিয়ে।“ কথাটা বলেই হেসে উঠল সে। স্যার চিৎকার করে উঠলেন, “এসবের কী মানে? শেষ বিশ্বাসঘাতকতাটা করেই ফেললে তাহলে, হাইনরিখ?” হাইনরিখ মাটিতে একদলা থুতু ফেলল। তারপর এগিয়ে এসে স্যারের কলার ধরে বলল, “বিশ্বাসঘাতকতা? সেটা তো তুমি করেছিলে, সেন। যখন বললাম, এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা কোটিপতি হতে পারি, শুধু পেটেন্ট নিলেই হবে, তুমি বেঁকে বসলে। বললে, এই প্রযুক্তি শুধু মানুষের কল্যাণের কাজেই ব্যবহার হবে। তাই তো আমাকে যোগাযোগ করতে হল বিদেশি এজেন্টদের সাথে। তারপর তুমি যখন সেই সব কাগজ পড়ে ফেললে, আমার আর কোনও রাস্তা বাকি রাখলে না। বাধ্য করলে তোমাকে বাঁচিয়ে না রাখার জন্য। আর তারপর যা যা ঘটল…তুমি আমাকে পাঠালে জেলে। কী জীবন কাটিয়েছি জেলে, আমিই জানি। একটা চিঠি লিখতে দিত না ওয়ার্ডেন। অন্ধকার একটা দশ বাই দশ সেলে বিশ বছরের জন্য বন্দী। প্রায় প্রত্যেকদিন বন্দিদের সাথে মারপিট, এই করেই দিন গুজরান। শেষে একদিন যখন জেল ভেঙে বেরিয়ে এলাম, তখন দেখি দুনিয়া আর আগের মত নেই। আমি ক্রিমিন্যাল বলে আমার সমস্ত গবেষণার জিনিস ল্যান্ডরোভারের খাদ্য হয়ে গেছে। আমার পরিবার আমাকে ত্যাজ্য করেছে। সব তোমার জন্য সেন! সব তোমার জন্য! কিন্তু দেখ, আমি আবার উঠে দাঁড়িয়েছি সেন। আর তাই তুমি আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসেছ নিজের মেয়েকে, তাই তো সেন?” হাইনরিখ বিষাক্ত একটা হাসি হেসে বলে। স্যার অতিকষ্টে বললেন, “আমি আমার মেয়েকে চাই হাইনরিখ। আর তার জন্য আমি সব রাস্তা বেছে নিতে রাজি আছি, সব। কিন্তু তোমাকে আমি আর কোনও ক্ষতি করতে দেব না। তুমি আর কারোর জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করতে পারবে না।“ হাইনরিখ হাসতে হাসতে বলল, “তাই, সেন? হাসালে বন্ধু, হাসালে। এখনকার আমি আর বিশ বছর আগের আমির মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। আর, তুমি কি ভাবছ, আমি কিছুই জানি না?” তারপরই সে স্যারের কানের কাছে এসে বলল, “আমি কিন্তু জানি, তুমি তোমার গবেষণায় সফল অলরেডি। ঝিনুক তোমারই গবেষণার ফসল, তাই না?“ সবাই চমকে উঠল কথাটা শুনে। আকাশ থেকে পড়লেও এতটা ধাক্কা লাগত না। কী করে জানল হাইনরিখ? তবে কি আমাদের মধ্যেই কোনও গুপ্তচর আছে হাইনরিখের? আমি চিৎকার করে উঠলাম, “শয়তান, তুমি সেটা জানলে কী করে?” হাইনরিখ ছেড়ে দিল স্যারকে। স্যার মাটিতে বসে হাঁপাতে লাগলেন। ক্রিস সঙ্গে সঙ্গে স্যারের কাছে এসে দাঁড়াল ওঁর কিছু হয়েছে কিনা দেখার জন্য। তারপর, আমাদের দিকে ফিরে হাইনরিখ বলল, “শোন মিঃ চৌধুরী, কোনও পরিকল্পনা করতে গেলে সবার আগে প্রপার প্ল্যানিং দরকার হয়। তোমাদের স্যার, মিঃ সেনকে তিলে তিলে শেষ করার জন্য আমাকে সেনের হাঁড়ির খবর বার করতে হত। তাই জেল ভেঙে বেরিয়ে আসার পর এখানে চলে আসি। এই দ্বীপটাতে আমার ঘাঁটি তৈরি করি। এখানে বসেই আমার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিই আমি। জনমানবহীন হবার সুবাদে এখানে কাজ করার কোনও অসুবিধা হত না। লাইটহাউসের লোকগুলোকে টাকা দিয়ে হাত করাটা এমন কিছু কঠিন ছিল না। আমিই পরপর দুজন ভাড়া করা লোককে চাকর সাজিয়ে পাঠাই মিঃ সেনের বাড়িতে কাজ করার জন্য। ওরা দু তিন মাস কাজ করেছিল সেনের বাড়িতে, কিন্তু তার মধ্যেই যা করার করে এসেছিল। সেটা হল, ঐ বাগানবাড়ির বিভিন্ন কোণে গোপন ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন ফিট করে আসা। ওতেই আমি সেনের গতিবিধির ওপর নজর রাখলাম। যদিও মিঃ সেনের গোপন ল্যাবটা কোথায় আমি ঠিক জানতাম, কিন্তু একটা আন্দাজ করতে পারছিলাম যে ওটা এখন ওখানে থাকবে না। এককালে তো আমিও ওখানে কাজ করতাম, ২০ বছর পরেও আমার ভয়ে সেন ঐ ল্যাব সরিয়ে আনবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। তাই আমি অপেক্ষা করছিলাম সুদিনের। তারপর যেদিন সেন বাড়িতে বলাবলি শুরু করল যে ও পাকাপাকিভাবে দেশে বাড়ি ফিরে যাবে, তখনই কাজ এগিয়ে আনতে হল। কারন ও দেশে ফিরে গেলে তো আমার প্রতিশোধ নেওয়া হয় না। এতগুলো বছর অপেক্ষা করেছিলাম, আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। একটা ফলস কল দিয়ে মেয়েটাকে বাইরে আনতেই আমার লোকেরা ওকে কিডন্যাপ করে। কিন্তু, তারপরে মেয়েটা কী করে পালাল, সেটাই আমার কাছে রহস্য ছিল প্রথমে। কিন্তু, তারপরে তোমরা যখন ঘরে আলোচনা শুরু করলে, বুঝলাম, কী ব্যাপার। তুমি অমরত্বের শেষ ধাপটাও পেরিয়ে এসেছিলে জেনে বেশ ভালই লাগছিল। আর এরকম একটা লাইভ হিউম্যান স্যাম্পল… কয়েকশ কোটি ডলারের সমান।“ হাইনরিখের চোখ দুটো জ্বলে উঠল যেন। “তাই তো ফোন করলাম তোমাকে, আর বাকিটা তো জানোই।” আমরা দাঁতে দাঁত চিপলাম। ক্রিস ঠিকই বলেছিল। আমরাই ওর পাতা ফাঁদে পা দিয়েছি। এবার ও আমাদেরকেই টোপ হিসাবে ব্যবহার করবে ঝিনুককে ডেকে আনার জন্য। ইশ, কী বোকা আমরা… একবারও মনে হল না, যে কি করে হাইনরিখ এত ভাল করে জানতে পেরেছিল কখন প্রফেসর বেরোন, কখন ঝিনুক বেরোয়? আবার আমাদের ঝিনুককে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেবার সঙ্গে সঙ্গে ফোন কলের সময়টাও? এতটাও কাকতালীয়? ইস। সমুদ্র একবার আমার মুখের দিকে তাকাল। চোখে চোখে ইশারা হয়ে গেল। তারপরেই সমুদ্র একটা তীব্র হুইসল দিয়ে বলে উঠল, “ক্রিস, রাইট নাউ।“ তারপরেই সমুদ্র পকেটে হাত দিয়ে দ্রুত বার করে আনল পিস্তলটা। ঐ তীব্র চিৎকারে কয়েক মুহূর্তের জন্য হাইনরিখ আর তার দলবলও চমকে গিয়েছিল কিছুক্ষনের জন্য।  আর সেই মুহূর্তের সুযোগে পরপর ফায়ার করতে থাকল ওরা। এই আক্রমণের জন্য ওরা কেউই তৈরি ছিল না। গুণ্ডাগুলোর মধ্যে দেখলাম, দুজন ধরাশায়ী হয়েছে। বাকিরাও কভার নিয়েছে গাছের আড়ালে। কিন্তু, ভাগ্য বিরূপ। আমাদের কাছে বেশি গুলি ছিল না। ওদের সঙ্গত দিতে আমি আর বর্ণালী হাতের কাছে যা নুড়িপাথর ছিল, ছুঁড়ে মারা শুরু করলাম ওদের দিকে। আর ঠিক তখনই ওদের তরফ থেকে যে জিনিসটা আমাদের দিকে ধেয়ে এল, সেটার জন্য আমরা তৈরি ছিলাম না। একটা ছোট লম্বাটে বোমা। আমাদের কাছে এসে সেটা ফাটতেই একটা তীব্র আলোয় চারদিক একাকার হয়ে গেল। কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না চোখে। ওর মধ্যেই শুনতে পেলাম, সমুদ্র চিৎকার করে বলল, “ফ্ল্যাশব্যাং। কেউ নড়িস না, বা ছোটার চেষ্টা করিস না। তাহলে নিচে গিয়ে পড়লে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।“ ওর কথা শেষ হতে না হতেই, চারপাশ থেকে শক্ত হাতের বাঁধনে বাঁধা পড়লাম আমরা। একজন আমার তলপেটে সপাটে একটা ঘুষি চালাল। ব্যাথায় কুঁকড়ে গেলাম আমি। মুখ দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। কিন্তু তখনও চোখে ধাঁধা দেখছিলাম। আলোর রেশ কাটতে দেখলাম, আমরা সবাই বন্দী। হাইনরিখ আমাদের দিকে একবার তাকাল ভাল করে। মুখে তার ক্রূর হাসি। তারপর তার হাতের ইশারায় নিমেশের মধ্যেই হাইনরিখের পোষা গুণ্ডারা এসে আমাদের পিস্তলদুটো কেড়ে নিল। হাইনরিখ মুখে একটা চুকচুক শব্দ করে বলল, “ছিঃ সেন, বাচ্চাদের হাতে পিস্তল ধরিয়ে দিয়েছ? এসব কি তোমাকে মানায়? যাকগে, একটু পরেই তো তোমরা ইজিয়ান সাগরের হাঙরদের খাবার হবে।  এত সব ভেবে কী আর লাভ হবে?“ সমুদ্র চিৎকার করে উঠল, “বাস্টার্ড। সাহস থাকলে খালি হাতে আয় সামনে।“ হাইনরিখ সমুদ্রের চিৎকারটাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনল না। একবার সে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর বলল, “চল, তোমাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। হাঙরগুলো অনেকক্ষণ অভুক্ত আছে। ভগবানকে ডেকে নাও তোমরা, কেমন?” শিউরে উঠল সবাই। গুণ্ডাগুলো সবাইকে ধরে নিয়ে আনল লাইট হাউসের সামনের খোলা মাঠটায়। পেছনে দেড়শ ফুট খাড়া পাহাড়, আর তার নিচেই ইজিয়ান সাগর গর্জে উঠছে রাগে। পাঁচজন বন্দুকধারী বন্দুক তাক করে দাঁড়াল আমাদের দিকে। হয় গুলিতে প্রাণ দিতে হবে, নয় সামনে এই নীল সমুদ্রের বিষাক্ত ঢেউ আর উঁচিয়ে থাকা পাথরগুলোর মধ্যেই প্রাণ দিয়ে আসতে হবে। সমুদ্র অস্ফুটে বলে উঠল, “এই শেষ তাহলে?” ক্রিস দেখলাম, একমনে যীশুকে ডাকছে। বর্ণালী স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে আছে। স্যার একদৃষ্টে চেয়ে আছেন হাইনরিখের দিকে। আমার তখন কী মনে হচ্ছিল, বলে বোঝাতে পারব না। একদিকে উত্তাল সমুদ্র, অন্যদিকে সামনেই রাইফেলের নলগুলো সোজা উঁচিয়ে রয়েছে আমাদের দিকে। ঝোড়ো হাওয়ায় চারদিকে উথালপাথাল চলছে। এই অবস্থাতেই মরতে হবে? নাহ। এখনই কিছু করা দরকার। আমি চিৎকার করে উঠলাম। “হাইনরিখ, স্যুটকেসটা খুলে আদৌ দেখেচ তার মধ্যে কী আছে?” এই প্রথম তার মুখের ভাবটা পরিবর্তিত হল। আত্মবিশ্বাস ক্রমে সংশয়ের রূপ নিল। সঙ্গে সঙ্গেই সে খুলে ফেলল স্যুটকেসটা। আর খুলতেই একটা ছোট পট করে কিছু একটা ফাটার শব্দ হল। তারপরেই একটা আর্তনাদ করে উঠল হাইনরিখ। কারন তাড়াহুড়োয় খুলতে গিয়ে সে আমাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে দিয়েছে। আসলে স্যুটকেসটার মধ্যে কায়দা করে একটা কাঁচের বোতল ফিট করা ছিল, যেটা পুরোটাই ভর্তি ছিল ঘন সালফিউরিক অ্যাসিডে। যেই খুলতে যাবে কেসটা, সঙ্গে সঙ্গেই বোতলটা ফেটে যাবে।  আর কড়া সালফিউরিক অ্যাসিড ছিটকে পড়বে পাথরটার ওপর। আর দেখতে হবে না। যত লেখাই থাকুক না কেন, সব অ্যাসিডের ক্রিয়ায় নষ্ট হয়ে যাবে। দেখলাম, এর মধ্যেই হাইনরিখের হাতের আঙুলগুলো টকটকে লাল হয়ে গেছে। অ্যাসিডের আক্রমণে তার হাতের আঙুলগুলো আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে। সেই অবস্থাতেও অন্ধ রাগে সে চিৎকার করে উঠল, “আর দেরি নয়। কিল দেম।“ তার পরের ঘটনাগুলোর জন্য বোধহয় কেউই তৈরি ছিল না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুটো বড় সাইজের পাথর উড়ে এল বন্দুকবাজদের দিকে। কম করে হলেও পাথরগুলো কুড়ি-তিরিশ কেজি ওজনের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, পাঁচজন ধরাশায়ী। পাথরের আঘাতে কারওরই ওঠার ক্ষমতা নেই। যেখানে পাথর গিয়ে লেগেছে তাদের, সেখানে হাড়গোড় যা ছিল, সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বাকিরা এবার পাথরগুলো যেদিকে উড়ে এসেছিল, সেদিকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে লাগল। তার জবাবে আরও বড় বড় তিন চারটে পাথর উড়ে এল তাদের দিকে। দুজন আরও ধরাশায়ী হল। বাকিরাও কেউ অনাহত ছিল না। আর তারপরেই একজন বেরিয়ে এল জঙ্গলের ভেতর থেকে। লাইটহাউসের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যুবতীর মুখ চোখ। হাওয়ায় উড়ছিল তার কালো চুল। ডিপ ব্লু রঙের টপ আর কালো জিনস পরিহিত মেয়েটি এগিয়ে আসছে খালি হাতে। কিন্তু তার চোখে সেই শান্ত, প্রাণচঞ্চল ভাব আর নেই। তার জায়গায় বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা জায়গা নিয়েছে। ঝিনুক ব্যঙ্গের হাসি হাসল শুধু। তারপর বলল, “মিস মি?”

সাত

এই অলৌকিক ক্ষমতার চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে গিয়েছিলাম চোখের সামনেই। তবু বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। কোনও মানুষ এতটা শক্তি ধারন করতে পারে, বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বলা বাহুল্য, ঝিনুকের এই অসম্ভব ক্ষমতা দেখে বাকি গুন্ডাগুলো ভয়ে কাঁপছিল। এখন তাকে সামনে আসতে দেখে আরও ভয় পেয়ে গুলি চালাতে শুরু করল। কিন্তু ঝিনুক আবার অসাধ্যসাধন করল। ঐ গুলি চালানোর মধ্যেই সে চূড়ান্ত অ্যাক্রোব্যাটিক মুভমেন্টে বুলেটগুলোকে এড়িয়ে গেল কান ঘেঁষে। তারপর লম্বা লম্বা পায়ে মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে গেল ঐ তিনজনের কাছে। বন্দুকবাজগুলোও থমকে গিয়েছিল ওর এই অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায়। আর তারপরই ঝিনুক বিদ্যুতের গতিতে হাত পা চালাতে লাগল। পাঁচ সেকেন্ডও গেল না। তিনজনেই লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপর। তারপর ঝিনুক এগিয়ে এসে আমাদের প্রত্যেকের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিল একটানে। স্যার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝিনুককে জড়িয়ে ধরলেন বাঁধনহারা উচ্ছাসে। ঝিনুকও জড়িয়ে ধরল স্যারকে। আমরা সাক্ষী রইলাম এক মধুর মিলনের। “কোথায় ছিলি মা? এতক্ষণ আসতে সময় নিলি? জানিস না, আমার শরীর খারাপ। এতটা টেনশন দেয় কেউ নিজের বাবাকে?” স্যার ঝিনুকের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন। আমরা বাকরুদ্ধ তখন, যে ইস্পাতকঠিন মানুষটা এত খারাপ সময়ের মধ্যেও ভেঙে পড়েননি, যার মুখে এক রহস্যময় হাসি সারাক্ষণই লেগে থাকতে দেখেছি কলেজে পড়ার সময় থেকে, আজ তাঁর চোখে জল। “বাবা।” ঝিনুক অস্ফুটে বলে উঠল। আমি খানিক পরে গলা ঝেড়ে কাশলাম। তখন ঝিনুক, স্যারকে ছেড়ে দিয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী করে জানলে আমরা এখানে আছি, ঝিনুক?” ঝিনুক পরিষ্কার বাংলায় বলল, “ঐ কিডন্যাপারদের থেকে পালানোর পর আমি এদিক সেদিক ঘুরছিলাম খাবারের আশায়। ওরা খেতেও দেয়নি এই কয়েকদিন ভালো করে। তারপর একটা বেকারি থেকে খাবার চুরি করে পালালাম। পালিয়ে পালিয়ে ঘুরলাম থিবার রাস্তাঘাটে। পরে রাস্তার লোকজনদের জিজ্ঞেস করে জানলাম কিডন্যাপাররা মারা গিয়েছে। তখন থিবা থেকে হেঁটেই বাড়ি ফিরলাম। কিন্তু যখন বাড়ি ঢুকছিলাম, দেখলাম, বাড়ির মধ্যে উত্তেজিতভাবে আলোচনা চলছে। আমি বাড়ির পেছনেই দাঁড়িয়ে শুনছিলাম তোমাদের কথা। তোমাদের আলোচনা কানে আসতেই বুঝলাম কী ব্যাপার। তাই তোমাদের পিছু নিলাম। রাস্তায় ফেরার সময় টাকা লাগতে পারে, এই ভেবে দুই তিনজনের পকেট হাতসাফাই করে নিয়েছিলাম। তাই যথেষ্ট টাকা ছিল। একটা ট্যাক্সি ডেকে তাই তোমাদের পিছু নিলাম। কিন্তু তোমরা জেলে পাড়ার দিকে যাচ্ছ দেখে বুঝে গেলাম, হয় কোনও দ্বীপে যাবে, নয়ত পাথরটা তোমরা ওখানেই এক্সচেঞ্জ করবে। প্রথমটা যখন সত্যি হল, তখন বুঝলাম, আমার সঙ্গে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। কারন ওরা সশস্ত্র, তুলনায় তোমাদের হাতে কিছুই নেই বলতে গেলে। তাই তোমরা যখন কথা বলছিলে, আমি গিয়ে লাইফলাইনের খোলের মধ্যে রাখা অত জিনিসপত্রের পেছনে গিয়ে লুকোলাম। তারপর নৌকা থামতে, সেটা থেকে নেমে তোমাদের ফলো করে করে আসছিলাম। মাঝখানে অয়ন আমার পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে টর্চের আলো ফেলেছিল, বাধ্য হয়ে তখন লোকাতে হয়। নয়ত আরও ঝুঁকি বাড়ত। ওদের বুঝতে দেওয়া চলত না, যে আমিও এসেছি তোমাদের সাথে। তারপর যখন দেখলাম, ও তোমাকে শুট করতে চলেছে, তখন বাধ্য হলাম নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করতে। নয়ত তোমাদের বাঁচানো যেত না।“ বর্ণালী আন্তরিকভাবেই বলল, “সত্যিই তাই। নয়ত, আমাদের আজকে বাঁচার আশা সত্যিই ছিল না।“ ঝিনুক হাসতে হাসতে বলল, “আরে না, এসব কিছুই না।“ তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল, “সালফিউরিক অ্যাসিডের প্ল্যানটা কি তোমার ছিল? ইট ওয়াজ আ বিউটিফুল প্ল্যান। আর যাই হোক, প্রমিথিউসের নির্দেশগুলো ওর হাতে পড়ার থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়াই ভালো।” আমি বললাম, “হ্যাঁ।“ ঝিনুক মুখে একটা দুষ্টু হাসি হেসে বলল, “মানে সত্যি, মাথা থেকে প্ল্যান বেরোয়ও বটে তোমাদের।“ কেন জানি না, হঠাৎ করেই কানটা লাল হয়ে উঠল এই প্রশস্তি শুনে। কিন্তু একইসাথে একটা কথা মনে পড়ে গেল। আরে তাই তো। হাইনরিখ গেল কোথায়? এতক্ষণ আমরা কথা বলছিলাম বলে হাইনরিখের খোঁজ করা হয়নি। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম। কোথাও হাইনরিখের চিহ্ন নেই। লোকটা কি হাওয়ায় উবে গেল নাকি? হঠাৎ করেই সমুদ্র আর্তনাদ করে উঠল একটা দিকে তাকিয়ে। আমরা সেদিকে তাকালাম। আর তাকিয়েই বিদ্যুতের শক খেলাম মনে হল। হাইনরিখ এসে দাঁড়িয়েছে। হাতগুলোতে বিশাল বড় বড় ফোস্কা পড়েছে অ্যাসিডের জন্য, তবু সে তার মধ্যেই বাম হাতে একটা গ্লক পিস্তল ধরে রয়েছে। গ্লকটা পয়েন্ট করা স্যারের দিকে। কেটে কেটে সে বলল, “যখন আমার আর কিছুই পাওয়া হল না, তখন সেন, কেন আবার একা যাব যমের কাছে? চল, তোমাকে নিয়েই যাওয়া যাক।“ বলেই দুম দুম করে পর পর দুবার ফায়ার করল সে। পুরো ব্যাপারটাই যেন ঘটছিল স্লো মোশনে। আমি আর ঝিনুক স্যারের কাছে ছিলাম সবথেকে। আমি স্যারকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে গেলাম। ঝিনুক এসে দাঁড়াল স্যারের ঠিক সামনে। আর তাই পরপর দুটো গুলি আমাদের দুজনকেই খুঁজে নিল টার্গেট হিসেবে। আমার বাঁহাতে একটা ভয়ঙ্কর তীব্র জ্বালা করে উঠল। চিৎকারটা নিজেও ধরে রাখতে পারলাম না। মনে হল, যেন লালরঙা লোহা কেউ চেপে ধরেছে আমার বাম হাতের ওপর। এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল। অসহ্য যন্ত্রণায় হাতটা খসে পড়তে চাইল যেন। এক অমানুষিক মনের জোরে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম। মনে হচ্ছিল চারিদিকে সব কিছু ঘুরছে, তার মধ্যেও দেখতে পেলাম, হাত বেয়ে লাল রক্তের স্রোত নেমে আসছে।  সমুদ্র, ক্রিস আর বর্ণালী চিৎকার দিয়ে আমাদের কাছে এগিয়ে আসছে। আমি ততক্ষণে বসে পড়েছি মাটিতে। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে বাম হাতে। যেন হাতটা কেউ কেটে নিয়েছে। আর তারপরেই আমি জীবনের সবথেকে বড় ধাক্কাটা খেলাম। ঐ দৃশ্যটা জীবনের শেষদিন অবধি মনে থাকবে আমার। ঝিনুক ঘুরে দাঁড়িয়েছে হাইনরিখের দিকে। কিন্তু হাইনরিখ আর তার সেই পৈশাচিক হাসিটা হাসছে না। বরং তার মুখে, ঐ হাসির জায়গায় জমা হয়েছে আতঙ্ক। আর তার যথেষ্ট কারন ছিল। ঝিনুকের ডান হাতের আঙুলগুলোয় এক নীলাভ আভা দেখা দিচ্ছিল। আঙুলগুলোর মধ্যে সাদা সাদা শিখা নেচে বেড়াচ্ছিল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়েই বুঝলাম, ওগুলো বিদ্যুতের শিখা। যেটা দেখে সবথেকে বেশি ভয় লাগছিল, সেটা হল, ঝিনুকের চোখের মণিগুলো আর সেই কালো রঙের নেই, সেগুলো উজ্জ্বল নীলাভ হয়ে গিয়েছে। হাতের আঙুলগুলোর চামড়াটা ধীরে ধীরে পুড়ে যাচ্ছে বিদ্যুতের তাপে। আস্তে আস্তে বিদ্যুতশিখার গতি আর তীব্রতা দুইই বাড়তে শুরু করল। একটা সময় আমরা সবাই দেখতে পেলাম, আক্ষরিক অর্থেই ঝিনুকের ডান হাতে বিদ্যুৎ নাচছে। “ঝিনুক!” বলে বর্ণালী চিৎকার করে উঠল। কিন্তু ঝিনুকের কোনও তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন আমাদের কথা সে শুনতেই পাচ্ছে না। প্রতিশোধস্পৃহা যেন তাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই নাটকের শেষ পরিণতির দিকে। আস্তে আস্তে ঝিনুক শুধু ডানহাতের তর্জনীটা ফেরাল হাইনরিখের দিকে। আর তারপরেই মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল। পরপর অনেকগুলো নীলচে বিদ্যুৎশিখা বিদ্যুতের গতিতেই সোজা আঘাত করল হাইনরিখের বুকে, মাথায়, তার চারপাশের জমিতে, গাছে। হাইনরিখ একটা আর্তনাদ করারও সুযোগ পেল না। প্রবল আক্ষেপে তার দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। মাংস পোড়ার তীব্র কটু গন্ধে জায়গাটা বিষিয়ে উঠল। আর তারপরেই, তার আধপোড়া শরীরটা ছিটকে পড়ে গেল সেই খাড়াই ঢাল বেয়ে, ইজিয়ান সাগরের বুকে। আমি যন্ত্রণা সহ্য করে কোনমতে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে গেলাম সেই ঢালের দিকে। উঁকি মেরে দেখলাম,  কোথাও কোন দেহের চিহ্ন নেই। সমুদ্র পরম মমতায় যেন ঢেকে নিয়েছে সেই আধপোড়া দেহটাকে। সমুদ্র, বর্ণালী আর ক্রিস তখনও হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে ঝিনুকের দিকে। তারা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি, কোথা থেকে কী হয়ে গেল তাদের সামনে। ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে, আর শ্বাস নিচ্ছে হাপরের মত। আর স্যার তাকিয়ে আছেন আমার মতই খাড়া ঢালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিডার গাছটার দিকে, যে গাছটায় ঝিনুকের হাতের একটা বিদ্যুৎশিখা গিয়ে লেগেছিল। গাছটা আগুনে জ্বলছে। দাউদাউ করে জ্বলছে সেই লাল রঙের আগুন, ঝোড়ো হাওয়া আরও বেশি করে রসদ যোগাচ্ছে তাকে। কাঠের পোড়া গন্ধে আর আগুনের হলকায় জায়গাটাতে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। আমি এগিয়ে গিয়ে ঝিনুকের হাতটা ধরলাম। রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে তার টপ। গুলি খুব সম্ভবত লেগেছিল তার ডানদিকে কলারবোনের নিচে, আর এপার–ওপার হয়ে গিয়েছে, কারন পিঠেও রক্তে ভেসে গিয়েছে। আশার কথা, রক্তপড়ার গতি কমে এসেছে এর মধ্যেই। এখন শুধু জায়গাটা সেরে যাওয়ার অপেক্ষা। ঝিনুক আমার দিকে ঘুরে তাকাল। এখনও তার হাতের তালুতে দু-তিনটে ছোটখাটো বিদ্যুৎশিখা খেলা করছে, কিন্তু তার চোখে আর সেই উজ্জ্বল নীল আভা নেই। সেগুলো শান্ত, ঘন কালো হয়ে এসেছে। সে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে এলিয়ে পড়ল আমার ওপর। আমি তার এলিয়ে পড়া শরীরটাকে ডানদিকে নিয়ে, বসে পড়লাম মাটির ওপর। যাক, নিঃশ্বাস পড়ছে তার, শুধু অজ্ঞান হয়ে গেছে সে। অস্ফুটে শুধু মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “তাহলে পৃথিবীতে এভাবেই আগুন এনেছিলে তুমি, তাই তো প্রমিথিউস?“ দুরের কালো আকাশ চিরে সাদা বিদ্যুৎশিখা নেমে এল সমুদ্রের বুকে। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে মুষলধারে।

আট

চার দিন পরের ঘটনা। আথেন্সের সবথেকে বড় সরকারি হাসপাতালে সেরে ওঠার চেষ্টা করছি। গুলিটা ভাগ্যিস হাত ফুঁড়ে এপার-ওপার বেরিয়ে গিয়েছিল, নয়ত আরও অনেকদিন হাসপাতালে থাকতে হত। ঝিনুকের অবশ্য একদিনই লেগেছিল সেরে উঠতে। না, ক্ষতস্থান মেলাতে মোটে দশ মিনিট লেগেছিল। কিন্তু, যে বিদ্যুৎ শিখা সে তৈরি করেছিল, তার জন্য তার প্রচণ্ড ধকল গিয়েছিল। তার শ্যাক্স সেলগুলো রিচার্জ হবার জন্য তাকে একটা গোটা দিন বিছানায় কাটাতে হয়েছিল। ইতিমধ্যেই আমরা বিশাল সম্মান পাচ্ছিলাম। খালি হাতে অতগুলো সন্ত্রাসবাদীর মোকাবিলা করে সবাইকে ঘায়েল করার জন্য রীতিমত পাবলিসিটি পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। ক্রিস বুদ্ধি করে একটা ওয়্যারলেস মেসেজ পাঠিয়েছিল লাইটহাউসের মধ্যে থাকা রেডিও থেকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশ জেটি এসে আমাদের উদ্ধার করে। সেখান থেকেই আমাকে সোজা হাসপাতালে যেতে হয়। বাকিদের চোট খুব বেশি ছিল না। ওরা কমবেশি বিধ্বস্ত ছিল, কিন্তু এমনিতে অক্ষতই ছিল। তবে, মিডিয়ার সামনে কেউই আসল ঘটনার একটা কথাও ঘুণাক্ষরে প্রকাশ করিনি। বলেছিলাম, একটা উড়ো ফোনে ওদের হুমকি শুনে আমরা চলে এসেছিলাম এই দ্বীপে, তারপর গেরিলা পদ্ধতিতে (সমুদ্রের আইডিয়া, যদিও আমার আর বর্ণালীর বক্তব্য ছিল এই গাঁজাখুরিটা ধোপে হয়ত টিকবে না) যুদ্ধ করে, ঝিনুককে উদ্ধার করি। স্যার আমাদেরকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন, তাই সত্য গোপন করতে বাধ্য হয়েছিলাম আমরা। আর তার থেকেও বড় কথা, সব কিছু জেনে ফেলতে নেই। কিছু জিনিস না জানা থাকাই ভালো। ট্যাবলেটটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। হয়ে যাবারই কথা, অত কড়া ডোজের সালফিউরিক অ্যাসিডে লোহা, সিমেন্ট ক্ষয়ে যায়, পাথর তো দূরের কথা। গ্রানাইট পাথরের ট্যাবলেট হবার দরুন ক্ষয়ের হাত থেকে এতদিন বেঁচে ছিল পাথরটা। তবে অ্যাসিড পড়ার দরুন লেখাগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পাথরের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটা স্যার বোটে করে ফেরার সময় ইজিয়ান সাগরেই ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। আনন্দের কথা এটাই, যে স্যার আবার ফিরে আসবেন আমাদের দেশে। ঝিনুকের গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হলেই ফিরে আসবেন উনি। আমাদের উনি তাই জানিয়েছেন। খবরটা শুনে সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম, যদিও সমুদ্র, স্যার আমার বেডের সামনে থেকে সরে যাওয়ার পর, আমার মেজাজটাই বিগড়ে দিয়েছিল আমাকে ভেংচিয়ে, “এখনও এক বছর, কলির কেষ্ট।“ বলাই বাহুল্য, ইঙ্গিতটা কার দিকে ছিল, বলে দিতে হবে না। এই কয়েকঘণ্টা হল ছাড়া পেয়েছি হাসপাতাল থেকে। আপাতত স্যারের বাড়িতে বেড রেস্ট আরও হপ্তা চারেকের। তারপর বাড়ি ফিরব। গ্রিস সরকার আমাদের জন্য আমাদের ভিসা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই থাকতে পারছিলাম। নয়ত আজই ছিল আমাদের চলে যাবার দিন। ভোরবেলা তখন। গাড়িটা ঝিনুকই চালাচ্ছিল। ও যে ভাল ড্রাইভার সেটা জানতাম না। যদিও ক্রিস, গ্রিস থেকে ফেরার দিন আমাকে বলেছিল। কলেজে পড়ার সময়ই মাঝে মাঝে ও ক্রিসের গাড়ি নিয়ে পালাত গাড়ি চালানো শেখার জন্য। সেটা ক্রিস ভয়ে বলত না স্যারকে। পরে স্যার জানতে পেরে খুব রেগে গেলেও ওর লাইসেন্সের জন্য ওকে অ্যাপ্লাই করতে বলেন। আর এখন তাই ফুল লাইসেন্সড হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ও। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই আমি ঝিনুককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে ও সেই বিদ্যুৎশিখা তৈরি করেছিল। কিন্তু, ও হাজার চেষ্টা করেও তখন কী ঘটেছিল মনে করতে পারেনি। ও বলেছিল, সেই অবস্থায় ও কী করে সেই অসম্ভব সম্ভব করেছিল, তা ওর জানা নেই। আমার ব্যক্তিগত মতামত, সেই প্রচণ্ড বিপদের সময় হয়ত প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রিনালিন রাশ হয়েছিল বলেই এই কাজটা করতে পেরেছিল ও। কিন্তু এটা আমার মতামত, সঠিক ব্যাখা জানা নেই আমারও। বিদ্যুৎশক্তিকে একটা কুড়ি বছরের মেয়ে কীভাবে নিজের তালুবন্দি করতে পেরেছিল, জানতে হয়ত এই সভ্যতার আরও হাজার বছর লেগে যাবে… এই কয়েকদিনে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল আমাদের মধ্যে। আমার যত্ন, দেখাশোনা সব ঐ করত। সমুদ্র, বর্ণালী আড়ালে দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসত, কিন্তু আমি গা করতাম না। স্যারও খুব একটা কিছু মনে করতেন না। আমরা ফিরছিলাম সাগরের পাশের সেই ড্রাইভটা ধরেই। হঠাৎ করেই একটা কথা মনে পড়ে গেল আমার। সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুককে বললাম, “একটু গাড়ি থামাবে প্লিজ?” স্বাভাবিকভাবেই সে আপত্তি করে, “পাগল নাকি? এখানে দাঁড়িয়ে তোমার কী করার আছে? হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা না? চল, ঘরে চল। মানে একটু সুস্থ হতেই আবার পাগলামি শুরু।“ “জাস্ট পাঁচ মিনিট। একটু পার্সোনাল কাজ আছে।“ আমি মিনতি করলাম। ঝিনুক দোনোমোনো করে বলল, “আচ্ছা পাঁচ মিনিটই কিন্তু। তারপর কিন্তু আমি নিতে চলে আসব।“ “আচ্ছা, আসিস।“ আমি হাসিমুখে বললাম। ডানহাতে গাড়ির দরজা খুলে নামলাম। বেশিদূর যেতে হল না। দেখলাম, বিচের ওপরেই একটা বালির পাহাড় বানিয়ে তার পাশে বসে আছে সেই জিপসি আর তার পাশেই তার কাঁধের ওপর বসে রয়েছে জাইফন। বিচের এই দিকটা নির্জন। তার ওপর ভোরবেলা। কেউ কোথাও নেই। আমি জিপসির পাশে গিয়ে বসলাম। জিপসি আমার হাতের দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “তাহলে মিঃ সেনের কিছু হয়নি। ফাঁড়াটা তোমার ওপর দিয়েই গেছে।“ “কী করে জানলে?” আমি আরও একবার অবাক হলাম। “এটা জানার জন্য ভবিষ্যৎ দেখতে হয় না। খবরের কাগজে তোমাদের সবার বড় করে ছবি বেরিয়েছে। দুদিন আগেই চোখে এসেছে আমার। ওরা অবশ্য তোমাদের বলা গল্পটাই লিখেছে, বাস্তবে কী হয়েছে, লেখেনি, তাই না?” শেষ কথাটা বলার সময় জিপসি সোজা আমার চোখের ওপর চোখ ফেলে। আজ সন্দেহটা দৃঢ় হয়। কে এই জিপসি? কী করে সে সব জানে? কী করে সে বলে দিচ্ছে, যে আমরা যা বলেছি, সব সত্য নয়? আমরা সত্য গোপন করেছি, সেটা সে কী করে জানল? জিপসির সেই উজ্জ্বল নীল চোখদুটো দেখতে দেখতে হঠাৎই সেই রাতের কথা মনে পড়ে যায় আমার। ঝিনুকের চোখও তো এরকম জ্বলছিল। হঠাৎ ঘটনাগুলো একসূত্রে গাঁথা পড়তে থাকে। এত সঠিক ভবিষ্যৎবাণী, সেই এক নীল চোখ, স্যারের ঘরে থাকা সেই ছবির মুখটা, আর তার সাথে এই অমোঘ আকর্ষণ তার ভবিষ্যতের প্রতি, মানুষের প্রতি। আস্তে আস্তে মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখি, আমার দেখাদেখি জিপসির মুখেও হাসি ফুটেছে। অমলিন, সুন্দর এক হাসি। জিপসি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “যাক, চিনতে পেরেছ তাহলে।“ “কিন্তু, মানে, তুমি আসল? মানে বেঁচে আছ এখনও?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। শ্রদ্ধায় মাথা আপনা হতেই নত হয়ে এল আমার। “হ্যাঁ। আমি এখনও বেঁচে আছি। এবং হয়ত আজীবন বেঁচে থাকব।“ জিপসি হাসতে হাসতে বলে, “এটাই তো এই অমরত্বের সাজা, অয়ন। যাকে জন্ম দিয়েছি, তাকে নিজের চোখের সামনে বড় হতে দেখা, এবং একটা সময় তার মৃত্যুও আমাকে দেখে যেতে হবে। অথচ আমি মরতে পারব না। এই চক্রবাক থেকে আমার কখনোই বেরোনো হয়ে উঠবে না।“ “আচ্ছা, কী করে তুমি মানুষের জন্ম দিলে বল তো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। জিপসি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। আমি রেগে গিয়ে বললাম, “বলবে না তাহলে?” “উঁহু, সব জেনে ফেলতে নেই।“ জিপসি মুচকি হেসে ভোর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল। আকাশের রং ফিকে হচ্ছে আস্তে আস্তে। “আর তাছাড়া, হাতে সময় কমে এসেছে অয়ন। আমাকে ফিরতে হবে। কাজেই আর মাত্র দুটো প্রশ্নের উত্তর দেব।“ “বেশ। আমার প্রথম প্রশ্ন এটাই যে, তুমি এত যুগ আগে কী করে এগুলো আবিষ্কার করলে?” আমি বিস্ময়ে বললাম। “এগুলো তো আমরা আজ জানছি। তোমরা কী করে এতকিছু এত আগে জেনে গেলে? এগুলো ম্যাজিক নাকি?” “ম্যাজিক বলে কিছু হয়না অয়ন। যে বিজ্ঞানকে তুমি ব্যাখায় আনতে পারো না, সেটাই তোমার কাছে ম্যাজিক বলে মনে হয়। বিজ্ঞানের ছাত্র তুমি, বিজ্ঞানমনস্ক হও আগে।“ জিপসি মৃদু তিরস্কার করল, “আসলে আমরা একটা আলাদাই প্রজাতি ছিলাম মানুষের থেকে। উন্নত, বিজ্ঞানচর্চাতে এই যুগের থেকেও হাজার বছর এগিয়ে। আমাদের শহরকে তোমরা স্বর্গ বলতে, আমাদের মহাকাশযানকে তোমরা রথ বলতে। কিন্তু একটা সময় এল, যখন আমাদেরকে বিলুপ্তি গ্রাস করল। কারন কিছুই না, জনঘনত্ব বেড়ে গিয়েছিল আমাদের।“ জিপসি ভাবুক হয়ে বলল, “আমি তখন বেশি বড় নয়। তোমারই বয়সী। এটা সেটা নিয়ে গবেষণা করি। আমি দেখতাম, মানুষদের চাকরের মত খাটাত বাকিরা। এই অন্যায়টা আমার কোনকালেই সহ্য হয়নি। আমি তাই তোমাদের আগুনের ব্যবহার শেখালাম। বাকি গল্পটা তো জানই। আমাকে তো ককেশাসে বেঁধে রেখে এল জিউস, কিন্তু সে যেটা জানত না, সেটা হল, ততদিনে আমি রিজেনারেশনের উপায় বার করে ফেলেছিলাম। আর তাই, আমাকে শাস্তি দিয়েও কোনও লাভ হয়নি। ভবিষ্যৎ দেখাটা তো এই আবিষ্কারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মস্তিস্কের কয়েকটা অংশের রিজেনারেশন বেড়ে যাওয়ায় মনন আর ইচ্ছাশক্তির অপরিসীম ক্ষমতার কিছু ভগ্নাংশমাত্র ব্যবহার করেই ভবিষ্যৎ দেখতে পারতাম আমি। কিন্তু যাক সে কথা। জিউসকে আমি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারিনি, কারণ জিউসের জন্য একটা লোকও আমাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি, একমাত্র হারকিউলিস ছাড়া। তাই আমার আবিষ্কারের কথা ওদের কাউকে জানতে দিইনি। ফল যা হবার হল। আমার চোখের সামনেই আমার পুরো প্রজাতির অপমৃত্যু আমি দেখলাম, অথচ আমি কিছুই করলাম না। যত দিন গেল, তত আমার সেই রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য অনুতাপ করতে লাগলাম। কিন্তু, তখন আর কিছু করার নেই।“ জিপসি অনেকক্ষণ বসে রইল চুপ করে। আমি কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলাম, “শেষ প্রশ্নটা করতে পারি?” “হ্যাঁ, কর।“ জিপসি সোজা হয়ে বসল। দেখলাম, তখনও জিপসির চোখের তলায় জল টলমল করছে। এই প্রশ্নটা করব বলেই এতক্ষণ বসে ছিলাম। কারন এই প্রশ্নটার গুরুত্ব, আমার কাছে অনেক, অনেক বেশি ছিল আমার জীবনের থেকেও। ধীরে ধীরে আমি বললাম, “ঝিনুকও কি তোমার মতই অমর থাকবে? আর ওর স্মৃতি কি লোপ পেয়ে যাবে?” জিপসি হেসে বলল, “এটা কিন্তু একসাথে দুটো প্রশ্ন অয়ন। কিন্তু না, ঝিনুক অমর নয়।“ খানিকক্ষণ আমার মুখে কোনও কথা সরল না। তারপর চিৎকার করে উঠলাম, “সত্যি?” জিপসি হাতের ইশারায় আমাকে থামতে বলল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ”তোমার ভাষাতেই বলি। আমার মত ভবিষ্যৎ যাতে না হয় কারোর, তাই যে ট্যাবলেট আমি লিখিয়েছিলাম হেসিয়ডকে দিয়ে, তাতে কিছু নির্দেশ আমি ইচ্ছে করেই লিখিনি। তার জন্যই মিঃ সেন যে আবিষ্কারটি করেছেন, তাতে কারোর রিজেনারেশন ক্যাপাসিটি স্বাভাবিকের কয়েকশগুন বেড়ে গেলেও সে অমর হবে না। কারন তার টেলোমারেজ এনজাইমটা আর পাঁচটা মানুষের মতই। নিশ্চয়ই জানো, টেলোমারেজ অক্ষত থাকে বলেই ক্যান্সার কোষগুলো অমর। এক্ষেত্রে, আমি টেলোমারেজ এনজাইমটায় এমন কারিগরি করেছিলাম, যাতে একটা কোষের কোষবিভাজনের সংখ্যা, তোমরা যাকে হেইফ্লিক লিমিট বল, সেটা স্বাভাবিকের থেকে কয়েকশগুন বেড়ে গেলেও সীমিত থাকে।“ “আর তাছাড়া, এমন এমন জিনের কম্বিনেশন আমি বানিয়েছিলাম, যার জন্য মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজে নিজেকে তৈরি করতে পারবে না। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ওদের ডিজেনারেশনের রেট কমে গেছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওরা নিজেকে নিজে পাল্টে নেবে। চিন্তার কিছু নেই  অয়ন, ঝিনুক তোমাকে ভুলবে না। তোমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।“ জিপসি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছিল। আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। তারপর আমতা আমতা করে বললাম, “এটা কি ভবিষ্যৎ দেখে বললে?“ জিপসি হেসে উঠল। তারপর সে বলল, “আমাকে একটু উঠে দাঁড় করাবে? পেটের ডানদিকে ব্যাথাটা এখনও রয়ে গেছে। একবার বসে পড়লে দাঁড়াতে তাই কষ্ট হয়।“ আমি তখন জিপসিকে টেনে দাঁড় করালাম। উঠে দাঁড়ানোর সময় আলখাল্লাটা সরে গিয়েছিল। স্পষ্ট দেখলাম, জিপসির পেটের ডানদিকে, চামড়াটা অক্ষত নেই। সেখানে অজস্র ঠোকরানোর ক্ষতচিহ্ন। আমার দৃষ্টি কোথায় গিয়ে পড়েছিল, তা জিপসির অগোচর হয়নি। সে একটা তিক্ত হাসি হেসে বলল, “থাক ওগুলো। প্রথমে ভেবেছিলাম, এই জায়গাটা ঠিক করে নেব। পরে ভাবলাম, কিছু চিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়ানোই ভাল। এগুলোই স্মৃতি।“ জাইফন ততক্ষণে আমার বাম কাঁধে এসে উড়ে বসেছে। প্রথমবারের মতই সে উড়ে এসে কাঁধে বসতেই সেই গরম তাপ লাগছিল।  তারপর হঠাৎ করেই জাইফন আমার ব্যান্ডেজটা খুঁটতে থাকল। আমি সরাতে গিয়েও সরালাম না। মিনিট কয়েকের মধ্যেই পুরো জায়গাটা দৃশ্যমান হল। যেখানে ক্ষতস্থানটা ছিল, সেদিকে জাইফন তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন। দেখলাম, জাইফনের চোখ থেকে দুই ফোঁটা জল এসে পড়ল ক্ষতস্থানের ওপর। মিনিটখানেকও গেল না। শুধু ঐ জায়গাটায় একটা পিন ফোটার মত লাগল। তারপর যে জায়গাটা দিয়ে আগে দগদগে মাংস দেখা যাচ্ছিল, সেখানে পড়ে রইল শুধু একটা গোলাপি গোল দাগ। আর কিছু পড়ে নেই সেখানে। আমি হাঁ হয়ে রইলাম। কিন্তু গত দুই দিনে যেসব ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি, তাতে অসম্ভব শুধুই একটা শব্দে পরিণত হয়েছে মাত্র। তবুও, বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম পাখিটার দিকে। “এটা আমাদের তরফ থেকে একটা বিদায়ী উপহার। আবার কবে দেখা হবে, তা তো ভবিষ্যৎ বলবে। আপাতত, সে অনেক দেরি।“ জিপসি চোখ টিপল। জাইফন আবার শিস দিয়ে ডেকে উঠল। সেই তীব্র, মিষ্টি শিস। আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। জাইফনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলাম। জাইফন মিষ্টি করে ডেকে উড়ে গিয়ে বসল জিপসির কাঁধে। জিপসি আন্তরিকভাবে বলল, “তাহলে আসি অয়ন। মেকরি না ডুওমে যানা।“ আমি কিছু বলার আগেই জাইফন একবার ডেকে উঠল। এবারের ডাকটা অন্য। পুরো শঙ্খধ্বনির মত শোনাচ্ছে এবারের ডাকটা। তারপরেই অবাক বিস্ময়ে  দেখলাম, জাইফনের সারা শরীরে আগুনের শিখা বইতে লাগল। আগুনের তীব্রতা বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছল যে চোখে হাত চাপা দিতে বাধ্য হলাম, এত তীব্র আলো আর তাপ সেই আগুনের।  তার মধ্যে যা ঘটছিল, দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। জিপসি পুড়ছে না, বরং হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে।  এ কীভাবে সম্ভব? আগুনের শিখাটা যেরকম হঠাৎ শুরু হয়েছিল, সেরকমভাবেই জিপসিকে পুরোটা গ্রাস করেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল । প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি ছুটে এগিয়ে গেলাম। যেখানে জিপসি দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে কোনও কিছু অবশিষ্ট পড়ে নেই। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম পাথরের মত। আসলে এত কিছু একসাথে বোধগম্য হচ্ছিল না। ওটা কি আদৌ পাখি ছিল? না, জিপসিরই কোনও নতুন আবিষ্কার? হঠাৎ মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল। ইস, আমার উচিৎ কলেজের ডিগ্রিটা এনে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেওয়া। এত সোজা ধাঁধাটা কীভাবে মিস করে গেলাম? পাখিটা যে ফেজান্ট নয়, সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু পাখিটা যে কী, প্রথম দিনই জিপসি বলে দিয়েছিল। আমিই ধাঁধাটা ধরতে পারিনি। ইংরাজিতে জাইফনকে লেখা যায় XIPHONE হিসাবে। আর অক্ষরগুলো, যদি একটু এদিক ওদিক করি, তাহলেই পাখিটার নাম চলে আসে। PHOENIX. ফিনিক্স, সেই মৃত্যুঞ্জয়ী পাখি, যার আগুনের মধ্যেই মৃত্যু, আগুনের মধ্যেই পুনরুত্থান… জিপসি, সেই পাখির পুনরুত্থানের অগ্নিশিখার মধ্যেই অন্তর্হিত হয়েছে, পৌঁছে গিয়েছে তার গন্তব্যে, কিন্তু, কী সেই প্রযুক্তি, সেটা বোধ হয় আর জানা হয়ে উঠবে না কারোর… পেছন থেকে হঠাৎ একটা নরম হাতের চাপ পড়ল আমার কাঁধে। দেখলাম, ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে। চোখ গুলো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, “তাহলে আমি অমর নই? আর পাঁচটা মানুষের মতনই?” বুঝলাম, সে সব কথাই শুনেছে, দেখেছে। আর তার কাছে লুকিয়ে লাভ নেই। লুকোতেও চাই না আমি। আমি ঘাড় নাড়লাম। ঝিনুক আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আমি ওর উচ্ছ্বাস দেখে হেসে ফেললাম। তারপর ওর মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিতে দিতে বললাম, “শুধু তোমার হাতদুটো থেকে আমাকে সাবধানে থাকতে হবে।“ এই প্রথম ঝিনুক লজ্জা পেল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “পাগল।“ আমি ফিরে তাকালাম সমুদ্রের দিকে। সূর্য উঠে এসেছে সমুদ্রের কোল থেকে। আকাশের রং ঠিক একটু আগে দেখা ফ্লিনিক্সের লাল আগুনরঙা পালকের মতই দেখাচ্ছে। পাখিটা ঠিক তার মালিককে নিয়ে গিয়ে ককেশাসের কোথাও নামিয়ে আসবে, তারপর তার কাঁধে বসে ঠোকর মারবে, আর মিষ্টি শিস দেবে মাঝে মাঝে। তার মালিক, আগের মতই তাকিয়ে থাকবে সুদূর ভবিষ্যতের দিকে, উজ্জ্বল দুই স্বপ্নময় নীল চোখে। আমার মুখ থেকে অস্ফুটেই বেরিয়ে এল, “মেকরি না ডুওমে যানা, প্রমিথিউস।”

~ সমাপ্ত ~

 

লেখক ~ স্পন্দন চৌধুরি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.