আলোর উৎসে – ২ – অনির্বাণ ঘোষ

Anirban & Arijit, আদতে আনাড়ি, বাংলা

প্রথম পর্ব 👇

আলোর উৎসে – ১ – অনির্বাণ ঘোষ

শেষ পর্ব

থীবস শহরের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে নীলনদ। দুভাগে ভাগ করেছে শহরকে। পূর্বের অংশটিকে যথার্থই শহর বলা চলে। রানীর প্রাসাদ, ধনীর অট্টালিকা, গরীবের কুটির, চলার রাস্তা, ব্যস্ত বাজার, সবুজ শস্য ক্ষেত্র সবই আছে এখানে। কিন্তু পশ্চিমের অংশের চেহারা এর একেবারে বিপরীত। শহরের সবাই ওই জায়গাটিকে ডাকে মৃতের উপত্যকা নামে।

এখানে যতদূর চোখ যায় দেখা যায় কবর খানা। শহরের সাধারণ মানুষদের মৃত্যুর পরে এখানেই আনা হয়, স্বয়ং ফারাও ও তার পরিবারের কেউ মারা গেলেও তাদের গন্তব্য হয় এই উপত্যকাই। এখানে গোটা পাঁচেক মমি তৈরির কর্মশালা আছে। সারা বছর তা ব্যস্ত থাকে মৃতের অন্য জগতে গমনের পথকে প্রস্তুত করতে। কর্মশালাগুলি ছাড়া আর একটি মাত্র বড় বাড়ি আছে এখানে। নদের পূর্ব পাড় থেকেও দেখা যায় একে। দেশের সবচেয়ে বড় এবং দুর্ভেদ্য কয়েদখানা। শুধুমাত্র মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের রাখা হয় এখানে।

অগস্ত্য আজ প্রায় কতদিন হল এই ছোট্ট কুঠুরিতে বন্দি তার খেয়াল নেই। কুটুরির চার দেওয়ালে কোন জানলা নেই। একটি মাত্র দরজা, তাও তা আজ অবধি একটি বারের জন্যও খোলেনি। দরজার নিচের অংশ দিয়ে দিনে দুবার খাবার আসে। সামান্য ডাল আর শুকনো রুটি। তাই খেয়ে কাটাতে হয় দিন গুলো। একটা কোণে সারতে হয় বাহ্যিক কর্ম। কুঠুরির আলো এবং বাতাসের একমাত্র উৎস পাঁচ আঙুল চওড়া একটি ঘুলঘুলি। তা অগস্ত্যের মতো দীর্ঘদেহী পুরুষেরও নাগালের বাইরে। সেই ঘুলঘুলি দিয়ে আসা ক্ষীণ আলোর রেখাতেই দিন রাতের চলাচল বোঝে অগস্ত্য। মাঝে মাঝে মনে হয় ও বুঝি অন্ধ হয়ে গেছে। কিছুই তো দেখা যায় না। চোখের কোনই কাজই নেই এখানে। আবার এই অন্ধকারেই যেন চোখ আরো বেশি করে দেখতে পায়। কালো পর্দায় যেন ভেসে ওঠে ফেলে আসা দিনগুলো। স্মৃতিরা চলতে শুরু করে। অগস্ত্যের সাথেও এই ঘটে। মাঝে মাঝে মনে হয় ও বুঝি পাগলই হয়ে যাবে। বার বার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই অভিশপ্ত দিনটি।

সেদিন অগস্ত্য হাজির হয়েছিল রানী হাতসেপসুতের সভায়। নিজের পরিচয় দিয়েছিল লোথাল থেকে আসা বৈজ্ঞানিক হিসাবে। অগস্ত্যের মুখে স্থানীয় মিশরীয় ভাষা শুনে অবাক হয়েছিলেন স্বয়ং রানী। ওর জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কেটেছে দেশে দেশে ঘুরে। তাই বেশ কিছু ভাষায় সে রপ্ত। এই তিরিশ বছরের জীবনে কখনও ও থিতু হতে পারেনি এক জায়গায়। উত্তরের পাহাড় পেরিয়ে যখন ও সিন্ধুর উপত্যকায় এসে পৌঁছায় তখন ওর বয়স আঠারো। তারপর থেকে সেই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেরিয়েছে সে। কোথাও কয়েক সপ্তাহ, কোথাও কয়েক চান্দ্রমাস কাটিয়েছে। প্রতিটি জায়গা থেকে এমন কিছু পেয়েছে যা ওর জ্ঞানের পরিধিকে আরো বিস্তৃত করেছে। স্থানীয় এক রাজার আনুকূল্যে এসে তার রাজ্যেই কাটিয়েছে একটি বছর। সেখানে অগস্ত্যের বিজ্ঞান চর্চা আরো উন্নত হয়েছে৷ ওর আবিস্কৃত যন্ত্রগুলি তাক লাগিয়েছে রাজার মনে। কিন্তু তারপরে একদিন সেই রাজ্য ছেড়েও অগস্ত্য বেরিয়ে পড়েছে অজানার উদ্দ্যেশ্যে। সমূদ্রের তীরে অবস্থিত বন্দর শহর লোথালের সাথে থীবসের নিয়মিত বানিজ্য চলে। সারাবছরই দুই দেশের মধ্যে বনিকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। তাদেরই একদলের সাথে অগস্ত্য এসে পৌঁছয় মিশরে। বিজ্ঞানচর্চায় মিশর অনেকট এগিয়ে থাকা এক দেশ। অগস্ত্যের উদ্দেশ্য ছিল সেই জ্ঞান আহরণ। বিজ্ঞানের গূঢ় তথ্য লোকানো থাকে দেশের কিছু হাতে গোনা বিজ্ঞানীর মধ্যেই। তাদের সবাই ফারাওয়ের অধীনে। অগস্ত্য তাই হাজির হয়েছিল রানী হাতসেপসুতের কাছে, তার অনুমতি নিতে। যাতে সেই গুপ্ত বলয়ে স্থান পাওয়া যায়। এখানেই ভুলটা করে বসে সে।

সদা প্রাণভয়ে ভীত ছোট পাখি গাছের পাতার সামান্য নড়াচড়াকেও শিকারী বাজের আক্রমণ বলে ভ্রম করে। ফারাওহীন মিশরের অবস্থা তেমনই ছিল। রানী নিজে যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও জানতেন তিনি ফারাও নন। তাই প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্রেরা তাকে ভয় পায় না। তাদের বিষাক্ত ছোবল যে কোন মুহূর্তে আসতে পারে। তাই সেদিন রাজসভায় রানীর অনুচরেরা অগস্ত্যকে গুপ্তচর ভেবে বসে। দেশের বৈজ্ঞানিকদের কষ্টলব্ধ জ্ঞান সে চুরি করার চেষ্টা করছে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টায় অগস্ত্য বলে এই জ্ঞানের বিনিময়ে সেও এই দেশকে কিছু দিয়ে যাবে। তার নিজের কিছু আবিষ্কার। সন্দেহের গলায় সেদিন সেনেনমুত বলেন,

-“তুমি যে একজন বৈজ্ঞানিক তার প্রমাণ দিতে পারবে?”

-“অবশ্যই পারব।”
এই বলে অগস্ত্য তার ঝোলা থেকে বার করে আনে একটি ডিম্বাকৃতি বস্তু। বলতে থাকে,
-” এই হল আমার নবতম আবিষ্কার। যা চোখে দেখা যায় না অথচ তার উপস্থিতি বুঝতে পারা যায় এমন কিছু বানাতে আমি সক্ষম হয়েছি।”

-” এটা কী?” অনুসন্ধিৎসু রানী জিজ্ঞাসা করেন। অগস্ত্য বলে,
-“মিথ্যা বলব না, এটার কোন নাম এখনও আমি রাখিনি। এর বাস্তব কার্যকারিতার সম্পর্কেও আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু এর অপরিসীম ক্ষমতার ব্যাপারে আমার আস্থা আছে।”

-“কী এটা, দেখি!” বলে রানী নিজেই সামনে এগিয়ে এসে অগস্ত্যের হাত থেকে কেড়ে নেন সেই বস্তুটিকে। অগস্ত্য চেঁচিয়ে ওঠে,

-“সাবধান! ওই নিচের অংশে..”

অগস্ত্যের মুখের কথা ফুরোবার আগেই রানী আঙুল দিয়ে ফেলেন সেই যন্ত্রের গায়ের একটি ছোট ধাতব অংশে। সাথে সাথে এক অদৃশ্য জাদু যেন তার হাত বেয়ে বুকের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে! ঝনঝনিয়ে ওঠে হাত! কেঁপে ওঠে হাতসেপসুতের শরীর! ওঁর হাত থেকে ছিটকে পড়ে মাটিতে গড়িয়ে যায় সেই আশ্চর্য বস্তুটি। অগস্ত্য সেটিকে কুড়িয়ে নেওয়ার আগেই রানীর দেহরক্ষীরা ঘিরে ধরে তাকে। ভীনদেশি গুপ্তচর খুন করতে চেয়েছিল রানীকে, এই দায়ে সেই থেকে সে এই কয়েদখানায় বন্দি। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ, তারপরেই নাকি একদিন তার মৃত্যদন্ড কার্যকারী হবে, জীবন্ত অবস্থায় তার শরীরের ছাল ছাড়িয়ে নাকি পুঁতে দেওয়া হবে মরুভূমির বালিতে, ওর মৃত্যুর পরের জীবনটা নাকি কাটবে প্রেতাত্মা হয়ে, এমনই শুনেছে কয়েদখানার রক্ষীদের কাছে। ও ভয় পায়নি, বরং অবাক হয়েছে এই ভেবে যে সেই জীবনের কী আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে? আর যদি থাকেই তাহলে এই জীবনে ওর আহরিত জ্ঞান সব বৃথা হয়ে যাবে?

কুঠুরির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বাররক্ষীর কন্ঠে অগস্ত্যর চিন্তাসূত্রে ছেদ পড়ল। দরজাটা খুলছে কেউ! তাহলে কী আজই ওর জীবনের শেষ দিন!!

রক্ষী যখন ওর কনুই ধরে কয়েদখানার বাইরে বার করে নিয়ে আসল তখন সূর্যের আলোয় চোখে ধাঁধা লেগে গেল। দীর্ঘ কয়েক মাস অন্ধকারে থাকার পরে এই আলোতে অভ্যস্ত হতে সময় তো লাগবেই। ভ্রু কুঁচকে অগস্ত্য নিজের চোখের সামনে হাত এনে রাখল। শুনতে পেল এক নারী কন্ঠ।

-” আপনার আবিষ্কারটিকে আমি চিনতে পেরেছি। তড়িৎপ্রবাহের ফলেই সেদিন রানীর ওইরকম অবস্থা হয়েছিল, তাই না?”

কে এ? কে এই নারী! অবশেষে একজন চিনতে পারল অগস্ত্যর আবিষ্কারকে! ওর পরিশ্রম তাহলে বৃথা যায়নি! এই বিদুষীরও নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিজ্ঞানলব্ধ চেতনা আছে! আনন্দের আতিশহ্যে ওর ইচ্ছা হল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু শরীর সায় দিল না, এত মাস অপুষ্টিতে কাটানোর পরে এই আকষ্মিক উত্তেজনাকে সামলাতে পারল না সে।

অগস্ত্য জ্ঞান হারাল।

||

চৈতন্য ফেরত আসার পর অগস্ত্য দেখল সে একটি খড়ের বিছানায় শুয়ে আছে। চারপাশের দেওয়াল হালকা সবুজ বর্ণের। কিছু আসবাবপত্রও রয়েছে ঘরে। ঘরের একপাশে রাখা একটি চারপায়ার ধারে বসে আছেন এক যুবতী। অগস্ত্য তার দিকে চোখ মেলে তাকাতে মৃদু হেসে সে বলল,

-” আমি ভেবেছিলাম আজকের গোটা দিনটাই আপনি ঘুমিয়ে কাটাবেন।”

এই গলার স্বর তো অগস্ত্যর চেনা! জ্ঞান লোপ পাওয়ার আগের মুহূর্তে এই নারীই তবে..! অগস্ত্য ধরফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল।
-“আপনি..আপনি চেনেন আমাকে! আমার আবিষ্কারের কথা জানেন! আমি কিন্তু রানীকে খুন করতে চাইনি! বিশ্বাস করুন আমি..”

-“থাক এখনই এত চঞ্চল হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। আপনার শরীর এখনও ক্লান্ত। আগে স্নান করে আসুন, স্নানঘরে একটি ক্ষুরও আনিয়ে রেখেছি আমি, চাইলে এই শ্রশুগুম্ফের জঙ্গল কামিয়ে নিতে পারেন। স্নান করার পরে আহার করতে করতে আপনার কথা শুনব৷ আমারও কিছু কথা বলার আছে আপনাকে।”

অবসিডিয়ান পাথরের তৈরি আয়নাতে নিজের মুখটা দেখেই চমকে উঠল অগস্ত্য। নিজেকে সে চিনতেই পারছে না। গত কয়েকমাসে শরীর জলের স্পর্শ পায়নি। কারাগারের বদ্ধ কুঠুরির বাতাসে ওড়া ময়লা জমা হয়েছে মুখের ওপরে, বুনো ঝোপের মতো বেড়ে উঠেছে দাড়ি গোঁফ। তার ওপরে জল বুলিয়ে নিল অগস্ত্য। ঝিনুক দিয়ে তৈরি ক্ষুর স্পর্শ করল গাল।

অগস্ত্য যখন স্নানঘর থেকে বেরোল তখন ইরতেনসেনু খাওয়ার আয়োজন করছিল। অগস্ত্যের কানের কুন্ডলির শব্দ শুনে মুখ তুলে চাইল। সাথে সাথেই একটি হৃদস্পন্দন যেন হারিয়ে গেল কোথায়। আর্যদের কথা সে আগে অনেক শুনেছে। কিন্তু এই প্রথম কোন আর্যকে এত কাছ থেকে দেখছে। অগস্ত্যর উচ্চতা দীর্ঘাঙ্গী ইরতেনসেনুর থেকেও বেশি, চওড়া কাঁধ। শরীর পেশিবহুল না হলেও মেদ নেই তেমন। কোমল মুখটি শিশু সুলভ। দুই চোখের মণি নীলবর্ণ, তাতে এক আশ্চর্য দীপ্তি। এমন পুরুষের সান্নিধ্যে ইরতেনসেনু এই প্রথম বার। নিজের খেয়ালেই হারিয়ে গিয়েছিল সে, চমক কাটতে দেখলেন অগস্ত্য তাঁর উল্টোদিকেই বসে আছেন। চেয়ে আছে ওঁর দিকে। ইস, ও কি বুঝতে পেরে গেল ইরতেনসেনুর মনের কথা? চট করে নিজের মধ্যের বিহবলতাকে কাটিয়ে বলল,

-“আসুন, অগস্ত্য। ভোজনে বসা যাক।”

মধু মেশানো মিষ্টি রুটি ছাগলের মাংসের সুরুয়াতে ডুবিয়ে মুখে পুরলেন অগস্ত্য। আহা, এমন স্বাদু খাবার সে কতদিন পায়নি। এ জীবনে আর হয়ত পেতই না। কিন্তু এই নারী তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করল কেন? কী চায় এ?

-“আপনি আমাকে চিনলেন কী ভাবে?”

-“রানীর দরবারে আপনি যেদিন আসেন সেদিন সভাসদদের ভীড়ে আমিও ছিলাম। খানিকটা দূরে ছিলাম যদিও। তবে আপনাদের কথোপকথন শুনেছিলাম স্পষ্ট।”

-“আপনাকে রানীই বললেন আমাকে মুক্তি দিতে?”

-“প্রথমত আপনি মুক্তি পাননি, বিশেষ কারণে আপনাকে কারাগার থেকে বার করে আনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রানী না, আমারই কথায় আপনি আজ এখানে।”

তার মানে মৃত্যুদন্ডের খাঁড়া এখনও ওর ওপরে ঝুলে আছে! এমন কী আছে ওর কাছে যা এই যুবতীর প্রয়োজন? কাজ ফুরলেই কী ওকে আবার প্রক্ষেপ করা হবে সেই অন্ধকার কুঠুরিতেই? মেয়েটি যেন ওর চোখের ভাষা পড়তে পারল। বলল,

-“আমার পরিচয় দেওয়া হয়নি আপনাকে, আমি ইরতেনসেনু। রানী হাতসেপসুতের সভার প্রধান বৈজ্ঞানিক এবং কারীগরীবিদ। ”

-“আপনিই তাহলে দেশের উত্তরে বাঁধ তৈরি করেছেন! আপনিই রানীর মন্দির তৈরি করছেন? সেই মন্দির আমি দেখেছি, অদ্ভুত তার গঠন শৈলী!”

অগস্ত্যের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রুটির একটি টুকরো মুখে পুরল ইরতেনসেনু, স্বপ্রসংসাতে তার অস্বস্তি হয়। অগস্ত্যের মুখের কথা ফুরচ্ছেই না,

-“আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না!”

-“কী?”

-” বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আপনিই সেই! নাম আমি আগে শুনিনি, কিন্তু আপনার আবিষ্কারের খবর সিন্ধুর উপত্যকাতেও ছড়িয়েছে। আপনার সাথেই দেখা করার জন্য আমার এতটা পথা আসা। কিন্তু ভাবতে পারিনি যে একজন নারীর সাথে আলাপ হবে আমার?”

-” মানে? আমার জায়গায় কোন পুরুষকে আশা করেছিলেন?”
ইরিতেনসেনু সোজা হয়ে বসলেন। চোখে মুখে তার বিরক্তি। অগস্ত্য তৎক্ষনাৎ বুঝতে পারল ওর ভুলটা। যে দেশ থেকে ও আসছে সেখানে নারীকে তার যোগ্য সম্মান দিলেও জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে এখনও তাদেরকে পিছনেই রাখা হয়েছে। বিদর্ভের যে রাজার সভায় সে ছিল বিগত একবছর সেখানেও পুরুষের আধিক্য লক্ষণীয়।

-“মাফ মরবেন, এভাবে কথাটা বলা আমার উচিৎ হয়নি। আমার দেশে মাতৃরূপে শক্তির উপাসনা করা হয়। কিন্তু সমাজ পুরুষতান্ত্রিক।”

-” এই সমাজও পুরুষতান্ত্রিক অগস্ত্য। কিন্তু বিদ্যালাভের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের কোন তফাত করা হয় না। বুদ্ধিই একমাত্র মাপকাঠি এখানে।”

নিজের স্থুল চিন্তার প্রকাশে নিজেই লজ্জিত এখন অগস্ত্য। সে চুপ করে রইল।

-“থাক, এই নিয়ে আর আলোচনাতে গেলে আমাদের সম্পর্কে তিক্ততা বাড়বে বই কমবে না। সেটা এখন কাম্য নয়। কাজের কথায় আসি বরং।”

হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচল অগস্ত্য। এই সুন্দরী বিদুষীর হাতে অপদস্ত হওয়ার সামনে মৃত্যুদন্ডকেও আরামের মনে হচ্ছিল ওর। ইরতেনসেনু বলল,
-” সেইদিন আপনি রানীকে আপনার একটি আবিষ্কার দেখিয়ে ছিলেন মনে আছে?”

সেইদিনের কথা ভুলবে কী করে ও? ভোলা যায়?
-” মনে থাকাটাই স্বাভাবিক, আমি চেয়েছিলাম আমার দিক থেকে যদি কিছু দেওয়া যায় আপনাদের শহরকে। কিন্তু বিশ্বাস করুন রানীকে হত্যা করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না! আমি বুঝতে পারিনি উনি আমার হাত থেকে যন্ত্রটি কেড়ে নেবেন!”

-“আমি জানি সেটা, দেখুন তো এটাকে চিনতে পারেন কিনা?”
একটি ছোট বাক্স ইরতেনসেনু এগিয়ে দিলেন অগস্ত্যের দিকে। তার মধ্যে ছিল একটি ধাতব শলাকা, একটি চোঙা, আর শুকনো মাটির টুকরো। এদের চিনতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না অগস্ত্যর। ওর যন্ত্রের অংশগুলো!

-” দুঃখিত আমি, রানীর হাত থেকে ছিটকে গিয়ে আপনার যন্ত্রটি ভেঙে যায়। পরে আমি এই টুকরোগুলিকে নিয়ে আসি।”

-“কিন্তু এগুলো তো কোন কাজেই আসবে না আর ইরতেনসেনু।”

-” হুম, সেটা ঠিক। কিন্তু আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম যন্ত্রটি কি ভাবে কাজ করে। এ দিয়ে যে আপনি একধরণের শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হয়েছিলেন তা আমি বুঝতে পেরেছি। সেই শক্তিই রানীর শরীরে প্রবাহিত হয়। পরে রানী আমাকে বলেছিলেন, ওর মনে হয়েছিল অদ্ভুত ধরণের অনুভূতি হাত বেয়ে উঠছে। ঠিক যেমনটা হয় দেওয়ালের কোণে কনুই লেগে গেলে।”

-” একদম ঠিক ধরেছেন! এই যন্ত্রটি আমার পাঁচ বছরের গবেষণার ফল! আমি চাইছিলাম এমন শক্তি উৎপাদন করতে যাকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা যাবে, প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। লোহা এই শক্তি পরবহন করতে পারে। যন্ত্রের গায়ে একটি মাত্র ছোট অংশে তাই লোহা লাগানো ছিল, ভিতরে থাকা শক্তিকে বাইরে আনার একমাত্র দরজা। রানী অসাবধানতায় যন্ত্রের সেই ধাতব অংশে হাত দিয়ে ফেলেন। তাই তার মধ্যে দিয়েই শক্তি প্রবাহিত হয়। আমি যদিও জানতাম ওই সামান্য আঘাত কোন মানুষের প্রাণ নিতে পারে না। আমি নিজেই গবেষণার সময়ে কতবার আহত হয়েছি ওই ভাবে।”

-” এই যন্ত্রের কোন নকশা কী আপনি এঁকে রেখেছেন কোথাও?”

এবারে অগস্ত্য হেসে ফেলল। বলল,
-“আপনাদের গবেষণলব্ধ ফল আপনারা প্যাপিরাসের পাতায় লিখে রাখেন জানি। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা তেমন কিছু করি না। ”

-“লিখে না রাখলে যে হারিয়ে যাবে সব তথ্য! আপনারা তাহলে কী করেন?”

-” আমরা লিখি আমাদের মস্তিষ্কে। মস্তিষ্ক বড় আশ্চর্য অঙ্গ। সে কিছুই ভোলে না। সব তথ্য জমা হয়ে থাকে তাতে। প্রয়োজন মতো শুধু তাকে বাইরে বার করে আনতে হয়। আমাদের দেশে সব জ্ঞানই জমা হয় মস্তিষ্কে। স্মৃতি তাকে ধারণ করে, শ্রুতি তাকে ছড়িয়ে দেয় একজনের থেকে অন্য জনের মধ্যে।”

অগস্ত্যের সব কথা ইরতেনসেনু বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু এখন মানব মস্তিষ্কের রহস্য নিয়ে ভাবার সময়ও নয়। আর মাত্র কয়েকটি মাস হাতে।

-” তার মানে আপনার যন্ত্রের নকশা নিশ্চয়ই আপনার নখদর্পণে?”

-“অবশ্যই।”

-” আমার ওই প্রকারের একটি যন্ত্রের প্রয়োজন। কিন্তু আকারে ওর চেয়ে বড় হতে হবে। তা না হলে প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে না।”

-” কিন্তু আপনি সেই যন্ত্র দিয়ে করবেন কী? সাবধান ইরতেনসেনু, ওই শক্তির অপব্যবহারে কিন্তু প্রাণহানির আশঙ্কা আছে!”

-” না, প্রাণ নেওয়ার জন্য নয়, বাঁচানোর জন্য চাই আমার এই যন্ত্রকে। আমার দেশের প্রাণ বাঁচাতে হবে।”

||

তারপরে কয়েকটি সপ্তাহ কেটে গেছে। ইরতেনসেনুর কাছে আগত বিপদের কথা শুনে অগস্ত্য আর কালক্ষেপ করেননি। যন্ত্রটি বানাতে সময় লাগছে বেশ, তার প্রধান কারণ উপকরণ সংগ্রহ। অগস্ত্যের বানিয়ে দেওয়া মাপ মতো স্থানীয় কুমোরকে দিয়ে একটি মাটির ছোট কলসী বানানো হয়েছে। তারপর তার মধ্যে রাখতে হবে তামা আর দস্তার পাত। তামা মিশরে সহজলভ্য, কিন্তু দস্তা নয়। তার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে কয়েক সপ্তাহ। এই অবসরের সময়ে অগস্ত্য ইরতেনসেনুর কাছে শিখতে লাগলেন মিশরের পদার্থ আর রসায়ন বিদ্যা, আর ইরতেনসেনু শিখতে লাগলেন অগস্ত্যের ভাষা। এই ভাষা না জানলে যে সে দেশের জ্ঞানের উপলব্ধি যথার্থ হবে না তা বুঝেছিলেন ইরতেনসেনু। অরণ্যের গভীরে যেমন দুটি গুল্ম একে অপরের সাহচর্যে বেড়ে উঠে জন্ম দেয় অতুলনীয় পুষ্পের তেমনই এই দুই প্রাণও একে অপরের সংস্পর্শে এসে আরো বিকশিত হতে লাগল। দস্তা এল নুবিয়া থেকে। নুবিয়ার রাজা রানী হাতসেপসুতের মিত্র এখন, তাই খুব একটা অসুবিধা হল না। সেনেনমুত নিজে এসে দস্তা পৌঁছে দিলেন ইরতেনসেনুর কাছে।

-” কী মনে হচ্ছে আপনার? আর কতদিন লাগবে? হাতে সময় কিন্তু আর মাত্র কয়েকদিন।”

-” দস্তারই অপেক্ষা করছিলাম, যন্ত্রটি এবারে তৈরি হয়েই যাবে, ধন্যবাদ আপনাকে। রানীকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে বলুন।”
সেনেনমুতের প্রশ্ন ইরতেনসেনুর জন্য থাকলেও উত্তর দিলেন অগস্ত্য। এই ভীনদেশীকে এখনও বিশ্বাস হয় না সেনেনমুতের।

মাটির কলসীর মধ্যে রাখা হল তামা ও দস্তার পাত দুটিকে। তাদের মধ্যে দেওয়া হল কাঠের গুঁড়ো, যাতে দুই ধাতব পাত নিজেদের সংস্পর্শে না আসতে পারে। এরপরে অগস্ত্য হালকা নীল বর্ণের এক তরল রাসায়নিক যোগ করলেন সেই কলসীতে। ইরতেনসেনু জিজ্ঞাসা করলেন,

-” এটি কী দিলে?”

-” এটি তামা, বায়ু আর গন্ধক দিয়ে তৈরি যৌগিক পদার্থ। এর নীল রঙটিকে খেয়াল করেছ?”

-“হ্যাঁ।”

-” এই রঙের জন্য এর নাম আমরা দিয়েছি ময়ুরের গ্রীবা। মানব শরীরের চিকিৎসাতেও এর ব্যবহার আছে। তোমায় বলব একসময় সেই কথা।”
মাটির কলসীর মুখটি শুকনো খড় দিয়ে বন্ধ করতে করতে বলল অগস্ত্য। তামা আর দস্তার পাতের সামান্য অংশ শুধু বেরিয়ে রইল কলসীর বাইরে।
-“এখন এর পরীক্ষার সময়।”

বাইরে তখন সূর্য অস্ত গেছে। দেবতা আমুন-রা গমন করেছেন মাটির নিচে। গবেষনাগারের জানলা দরজা বন্ধ করল ইরতেনসেনু। জানলার সামান্য ফাঁক গুলিকেও খুব সাবধানে বন্ধ করে দেওয়া হল মোটা কাপড় দিয়ে। নিজের তৈরি গোলকটি এবারে বার করলেন তিনি। গোলকের ধাতব অংশের সাথে লাগানো হল দুটি তামার তার, তাদের অন্য প্রান্তটি এনে একটিকে জোড়া লাগানো হল অগস্ত্যের বানানো যন্ত্রের তামার পাতের সাথে। আরেকটি তারকে দস্তার পাতের সাথে লাগানোর আগে ইরতেনসেনুর মুখের দিকে তাকালো অগস্ত্য। দুজনের চোখেই তখন আবিষ্কারের আনন্দের সাথে মিশে আছে বিফল হওয়ার আশঙ্কা। একটি, এই একটিই সুযোগ ইরতেনসেনুর কাছে নিজের দেশকে বাঁচাবার, আর একটিই সুযোগ অগস্ত্যের নিজের প্রাণ বাঁচাবার।

দ্বিতীয় তারটি স্পর্শ করল দস্তার পাতকে।

||

ওপেতের উৎসবের দিনে,

আকষ্মিক সূর্যগ্রহণের সাথে সাথেই কার্নাকের মন্দিরে রাস্তায় যে শোভাযাত্র চলেছিল তা দাঁড়িয়ে গেল। রাস্তার দুই পাশের জনস্রোত তখন দিশাহারা! এমন পবিত্র দিনেই আমুন-রা তাদের ত্যাগ করলেন! কিন্তু কেন? দেবতার পুজো তো মহা সমারোহে হচ্ছে, বছরের প্রথম শস্য তাকে সমর্পণ করা হয়, গৃহস্থ তাকে স্মরণ না করে মুখে অন্ন তোলে না। তাহলে কেন আমুন-রা মুখ ফিরিয়ে নিলেন? তবে কী তিনি চান না এক মেয়ে দেশের ফারাও হোক! তিনি চান না তার শক্তি প্রবাহিত হোক নারী শরীরের মধ্যে দিয়ে!

ভীড়ের মধ্যে থেকে হটাৎ একজন চিৎকার করে বলে উঠল,
-” রানী অপয়া!”

এমন রব হতাশা আর ভয়ে বিহবল জনতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সংক্রামক ব্যধির মতো। এক থেকে দশ, দশ থেকে একশো জনের কন্ঠে শোনা গেল একই আওয়াজ!

-“রানী অপয়া!”

-“রানী অপয়া!”

অতর্কিতে ধেয়ে আসা বন্যার ঢেউয়ের মতো এই দুটি শব্দ এগিয়ে যেতে থাকল ভীড়ের মধ্যে দিয়ে । তীব্র গতিতে আছড়ে পড়তে চাইল আমুন-রা শোভাযাত্রার ওপরে।

তারপরে আচমকাই তা মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। চরম বিশৃঙ্খলার হটাৎই এক জাদু বলে পরিণত হল অপার স্তব্ধতায়। জাদুই তো। বিষ্ফারিত চোখে সবাই দেখল থেমে থাকা শোভা যাত্রার মধ্যে থেকে ফেটে বেরিয়ে আসছে এক উজ্জ্বল আলোর কিরণ! তার দিকে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়! কী এটা!

আলোর উৎসটি মাটিতে নামিয়ে রাখা আমুন-রার বিগ্রহের সামনেই। স্বয়ং রানী হাতসেপসুত দুই হাতে মাথার ওপরে ধরে রয়েছেন তাকে! রানীর হাতে যেন জ্বলন্ত সূর্যই ধরা পড়েছে! এ কী করে সম্ভব! একী স্বপ্ন!

এই সূচী পতনের স্তব্ধতার মধ্যে ভরাট গলায় সেনেনমুত বলে উঠলেন,

-” দেবতা আমুন-রা স্বয়ং রানী হাতসেপসুতের স্বপ্নে এসেছিলেন। তিনি আমুন-রা এর নিজের সন্তান! তার শক্তি তাই রানীর মধ্যে দিয়ে বিকশিত হচ্ছে! রানী দুই হাতে ধরে আছেন মাটিতে নেমে আসা সূর্যের একটি টুকরোকে!! থীবসের নগরবাসী, সাক্ষী থাকো এই আলৌকিক স্বর্গীয় ঘটনার! রানী নন, আজ থেকে উনি..”

সেনেনমুতের মুখের কথা কেড়ে নিল সাধারণ মানুষ। আবার বন্যা বইল। এবারে সেই বন্যার অভিমুখ বিপরীত দিকে। গতি আরো তীব্র। জনসমুদ্রের গর্জনে ভেসে যেতে লাগল থীবস শহর। সেই কম্পনে যেন আলোড়ন উঠল শান্ত নীলনদের জলেও!

-” ফারাও হাতসেপসুত!”

-“ফারাও হাতসেপসুত!”

এতক্ষণ ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল এক জোড়া যুবক যুবতী। শ্বাস চেপে অপেক্ষা করছিল সূর্যগ্রহণের। রানী পারবেন তো সঠিক সময়ে তার দুটিকে কলসীর দুটি পাতে লাগাতে! পারবেন নিজের বর্নাঢ্য বস্ত্রের তলায় যন্ত্রটিকে লুকিয়ে রাখতে! রানী পেরেছেন! জিতে গেছেন হাতসেপসুত! জিতে গেছেন সেনেনমুত! জিতে গেছে এই যুবক যুবতী। এখন ওরা আলিঙ্গণবদ্ধ। এই চরম আনন্দের প্রতিটা মুহূর্তকে শুষে নিতে চায় ওরা।

||

-” অগস্ত্য, তুমি আমার দেশকে বাঁচিয়েছ। তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বল তুমি কী চাও? যত সোনা, যত লোহা তোমার লাগে আমি দেব। তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছে দেবে আমার ব্যক্তিগত সেনারা। ”

ফারাও হাতসেপসুতের সভায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন অগস্ত্য আর ইরতেনসেনু। আজ অগস্ত্যের ফিরে যাওয়ার দিন। রানীর কথা শুনে স্মিত হাসলেন তিনি,
-” আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই রানী, আমার আবিষ্কারকে একটি মহৎ কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার জন্য। আমার দেশে সোনা, লোহার কোন অভাব নেই। আমার কোন লোভও নেই ওতে। আমি অন্য কিছু চাইতে এসেছি আজ আপনার কাছে।”

-” বলো, নির্দ্বিধায় বলো। আমার দেশের বিজ্ঞানের পাঠ তুমি করবে বলেছিলে না? রাজ প্রাসাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার প্রবেশাধিকার আমি তোমায় দিলাম, আগে কখনও কোন ভীনদেশির জন্য এর দ্বার খোলেনি। তুমি তোমার ইচ্ছা মতো প্যাপিরাসের পুঁথি নিয়ে যেতে পারো।”

-” আবারো ধন্যবাদ জানাই আপনাকে। কিন্তু সেই পুঁথির যা জ্ঞান তার উৎসটিকে যদি চাই আমি, দেবেন?”

অগস্ত্যের এই কথা হাতসেপসুতের বোধগম্য হল না। এবারে মুখ খুললেন ইরতেনসেনু। লজ্জা মাখানো স্বরে বললেন,
-” আমারও একটি ইচ্ছা আছে। আমি অগস্ত্যের সাথে ওর দেশে যেতে চাই। বাকি জীবনটা কাটাতে চাই ওর সাথে।”

ফারাও হাতসেপসুত না বলেননি। অগস্ত্য আর ইরতেনসেনুর ইচ্ছা একই। দুই দুর্লভ মণি একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে। এখন তাদের আলোয় আলোকিত হবে সিন্ধু নদের উপত্যকার দেশ, ভারতবর্ষ।

সেইদিন বিকালে যাত্রা শুরু করল তারা। সূর্যের নরম আলোয় ওদের লম্বা হতে থাকা ছায়া মিলিয়ে যেতে লাগল মিশরের দিগন্তে। ইরতেনসেনুর একটি নতুন নাম ভেবেছেন অগস্ত্য, যে নামে তিনি ডাকবেন তাকে, যে নামে পরে গোটা দেশ চিনবে তাকে, সহস্রযুগ ধরে।

লোপামুদ্রা।

সমাপ্ত

—————————————————————

গল্পটির বেশ অনেকটা অংশই কাল্পনিক। যেটুকুর অস্তিত্ব ইতিহাসে আছে তা হল-

১. হাতসেপসুতের ফারাও হওয়া। আমুন-রা র স্বপ্নাদেশ পাওয়া।

২. অগস্ত্য সংহিতায় ব্যাটারি বানানোর পদ্ধতির উল্লেখ।

৩. মিশরের দানদেরার মন্দিরের গায়ের আশ্চর্য খোদাই, যাকে দেখতে অবিকল লাইট বালবের মতো।

৪. বিদর্ভের রাজসভায় অগস্ত্যের সাথে লোপামূদ্রার আকষ্মিক আবির্ভাব।

৫. হাতসেপসুত, অগস্ত্য, লোপামূদ্রা তিনজনই প্রায় একই সময় পৃথিবীতে ছিলেন। যীশুর জন্মের প্রায় ১৫০০ বছর আগে। সেই সময় ভারতবর্ষের সাথে মিশরের বানিজ্যিক যোগাযোগও ভাল রকমের ছিল।

লেখা ~ অনির্বাণ ঘোষ
অলংকরণ ~ শুভম ভট্টাচার্য

One thought on “আলোর উৎসে – ২ – অনির্বাণ ঘোষ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.