আনাড়ি টকিজ : পর্ব ৩ : সাউন্ড ডিজাইনিং

আদতে আনাড়ি

আগের দিন বলেছিলাম সাউন্ডের আউটার আর ইনার ওরিএন্টেশনের কথা, আজ বলছি diagetic আর non-diagetic সাউন্ডের কথা। Diagetic সাউন্ড এর সোর্স রিয়ালিস্টিক, অর্থাৎ যে শব্দ পর্দার চরিত্ররাও শুনতে পাবে, শুধুমাত্র অডিয়েন্সের শোনার জন্য নয়। এর উদাহরণ হল সংলাপ এবং ফলি। এর ঠিক উল্টোটাই হল non-daigetic সাউন্ড, যার কোন সোর্স আমরা দেখতে পাই না, এবং আমাদের পর্দার চরিত্ররাও যে গুলো শুনতে পারে না। যে কোন আবহ সঙ্গীত অথবা ধরুন কমেডি শো এর লাফটার ট্র্যাক পড়বে এর মধ্যে।

প্রথম দিন বলেছিলাম যে আউটডোর শ্যুটিং এর সাউন্ড বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফেলে দেওয়া হয়। পোস্ট প্রোডাকশনের সময়ে স্টুডিওতে অভিনেতারা এসে লিপ মিলিয়ে আবার ডাবিং করে দিয়ে যান। পশ্চিমে এই ধাপকে বলে অটোমেটিক ডায়লগ রিপ্লেসমেন্ট বা ADR। যদি শ্যুটিং সেটে বা স্টুডিও ফ্লোরে হয়, যেখানে বাইরের আওয়াজ ঢোকেনা , সেক্ষেত্রে শ্যুটিং এর সময়ে রেকর্ড করা ডায়লগ সিনেমাতে ব্যবহার করা যায়। খুব কম ক্ষেত্রেই আউট ডর শ্যুটিং এর সময় রেকর্ড করা সংলাপে সিনেমায় থাকে, একে বলে ‘সিঙ্ক সাউন্ড’ এ কাজ করা। নব্বই এর দশক অবধি এই দশে খুব কম সিনেমাতেই সিঙ্ক সাউন্ডে কাজ হত। আমার জান আলাগান আর দিল চাহতা হ্যায় সেই প্রথম দিকের সিনেমা যারা মূল শ্যুটিং এর দিনে ডায়লগ রেকর্ড করেছিল,এবং সেটাকেই ছবিতে রেখেছিল। একটা সিনেমার রিয়েলিজমের কারণ গুলোর মধ্যে এই সিঙ্ক সাউন্ড হল একটা। সময়ের সাথে সাথে টেকনলজি আরো উন্নত হওয়ার জন্য এখন এই ট্রেন্ডটা আরো বেড়েছে। Diagetic সাউন্ডের ক্ষেত্রে যেহেতু সাউন্ড ডিজাইনারের কাছে ভিজ্যুয়াল ক্ল্যু থাকে তাই ফলি বা ডাবিং এর কাজ তুলনামুলক ভাবে সহজ হয়। মুশকিলটা হয় non-diagetic সাউন্ডের সময়ে। গদা কাজ করতে চাইলে এই কাজটা কঠিন নয়, যেমন হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেলে নায়িকার মুখে তিনবার জুম আর পিছনে বাজা ধুম তা না আন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। কিন্তু ধরুন সিনেমাটা যদি হয় ‘গ্রাভিটি’ তাহলে?

মহাকাশে শব্দের তরঙ্গের পরিবহণের জন্য কোন মাধ্যম নেই, তবে শব্দ কিন্তু কোন কঠিন মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। তাই কো এক চরিত্রের হাতে থাকা কোন বস্তুর আওয়াজ তার নিজের পরণের জামার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তার কানে যাবে। তার মানে দর্শকেরও সেটা শুনতে পাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা আর বাকী পাঁচটা আওয়াজের থেকে আলাদা হবে, হবে চাপা,বদ্ধ। সাথে দেওয়া সিনতায় খেয়াল করে দেখুন যখন চরিত্র কিছু একটা ধরছে তখন আমরা তার আওয়াজ পাচ্ছি। কিন্তু সেটা ছাড়া যেকোন অন্য অব্জেক্টের সাথে আরেকটা অব্জেক্টের ধাক্কা লাগা বা ভেঙেচুড়ে যাওয়াতেও কোন আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। এক মাত্র ব্যতিক্রম হল যখন সেই ধাক্কাটা এমন কিছুর সাথে লাগছে যেটা সান্দ্রা বা জর্জের শরীরের সাথে জুড়ে আছে।

আলফানসো কুয়ারনের কল্পনা অনুযায়ী রি-রেকর্ডিং মিক্সার স্কিপ লিভসে এর টিম ফলি তৈরি করে ট্রান্সডিউসার রেকর্ডিং এর মাধ্যমে। যেটা সাধারণ এয়ার বর্ন অডিওর বদলে ভাইব্রেশন রেকর্ড করে। সিনেমার ডায়লগ গুলো কিছু ক্ষেত্রে অভিনেতাদের প্র্যাক্টিস সেশন থেকে নেওয়া, কিছু ক্ষেত্রে শ্যুটিং এর সময়ে নেওয়া আর কিছু ক্ষেত্রে ADR। শ্যুটিং এর সময় বুলক এবং ক্লুনি যে হেলমেট পরে থাকতেন তার মধ্যে মিক(mic) লাগানো থাকত। সেই মিক গুলো মূলত ডায়লগ এবং নিঃশ্বাস,প্রশ্বাসের আওয়াজ রেকর্ড করেছে। কিন্তু এখানেই কাজ শেষ নয়, মহাশূন্যে সাউন্ড হল জিওগ্রাফিকালি ল্যাটেরাল। মানে যদি আপনার পিছনে কেউ টোকা মারে তাহলে আওয়াজটা পরিশকার ভাবে পিছন থেকেই আসবে। এটা বোঝানোর জয় ভয়েস প্যান করানো যায়। মানে ধরুন পরদায় সান্দ্রা গোলগোল ঘুরছেন, সেই অনুযায়ী সাউন্ডের সোর্সটাও ঘুরতে থাকবে। এই কারণে প্রথমত দর্শক বুঝতে পারে যে চরিত্ররা কে কোথায় আছে, আর তার সাথে দর্শকের মনে একটা অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় যেটা গোটা গ্র্যাভিটি সিনেমাটার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

এই সুযোগে আরেকটা জিনিস বলে রাখি। যেটা ভাল সাউন্ড ডিজাইনিং এর মূল মন্ত্র। সেটা হল সাউন্ডের সোর্স দর্শকের(পড়ুন ক্যামেরার) যত কাছে থাকবে সেই আওয়াজটাও তত বেশি জোরে এবং পরিষ্কার শোনা যাবে। এই দুরত্বটা বাড়লে আওয়াজের তিব্রতা কমে যাবে এবং তা অন্য আওয়াজের সাথে মিশে যাবে। তাই সিনে যদি অভিনেতা হেঁটে যান আর ক্যামেরা তার পিছনে হাঁটে তাহলে সাউন্ড ডিজাইনারকেও বুম হাতে নিতে অভিনেতাকে ফলো করতে হবে। এই কাজটায় গন্ডগোল হলে সেটাকে বলে ডপলার এফেক্ট।

যাই হোক, এবারে ফিরি গ্র্যাভিটির আবহতে। আমার দেখা সেরা কাজগুলোর একটা এটা। কাজটা কঠিন ও। একাধারে ছবিকে রিয়ালিস্টিক রাখা হচ্ছে আবার তার সাথেই মিউজিক দিয়ে দর্শককে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে তাদের এখন কী অনুভব করা উচিত। কখনও তীব্র হতে থাকা শব্দের পরেই অপার শূন্যতা, দর্শককে চুড়ান্ত উৎকন্ঠার মধ্যে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া। পুরো ছবির মুড তৈরি করেছে এই আবহ। জানি এই ছবি দেখেননি এমন মানুষ এই গ্রুপে কমই আছেন। পরেরবারে ছবিটা দেখলে একটু ভাল হেডফোন বা স্পিকারে দেখুন, আর মন দিয়ে শুনুন। আমার বিশ্বাস এমন অনেক কিছু পাবেন যেগুলো আগের বারে খেয়াল করেননি।

©এলজা রয়

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.